‘আমি তোমাদের জন্য আশঙ্কা করছি’
পবিত্র কোরআনে নবীগণের দাওয়াতের যে চিত্র অঙ্কিত হয়েছে, তাতে একটি বিশেষ বাক্য বারবার প্রতিধ্বনিত হতে দেখা যায়, ‘ইন্নি আখাফু আলাইকুম’ অর্থাৎ ‘নিশ্চয়ই আমি তোমাদের জন্য (আজাবের) আশঙ্কা করছি’।
এই বাক্যটি কেবল একটি সতর্কবার্তা নয়, বরং এটি ছিল তাঁদের হৃদয়ের গভীরে প্রোথিত মমতা, দরদ এবং উম্মতের প্রতি নিখাদ ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ। একজন ধর্ম প্রচারকের দাওয়াতের ভাষা কেমন হওয়া উচিত এবং মানুষের প্রতি তাঁর মমত্ববোধের গভীরতা কতটুকু হওয়া প্রয়োজন, এই বাক্যটি তার এক অনন্য মাইলফলক।
কোরআনের দর্পণে নবীগণের আর্তি পবিত্র কোরআনে আটটি ভিন্ন ভিন্ন স্থানে নবীগণের এই আকুল আশঙ্কার কথা বর্ণিত হয়েছে।
হজরত নুহ (আ.)
মানবজাতির প্রথম রাসুল হজরত নুহ (আ.) তাঁর জাতিকে মূর্তিপূজা ছেড়ে এক আল্লাহর ইবাদতের আহ্বান জানিয়েছিলেন। দীর্ঘ ৯৫০ বছরের দাওয়াতি জীবনে তিনি অত্যন্ত কাতর কণ্ঠে বলেছিলেন, “আমি তোমাদের নিকট আমার পালনকর্তার বার্তা পৌঁছে দিচ্ছি এবং তোমাদের নসিহত করছি।” (সুরা আরাফ, আয়াত: ৬২)
তিনি তাঁর জাতির অবাধ্যতা দেখে শঙ্কিত হয়ে বলেছিলেন, “নিশ্চয়ই আমি তোমাদের ওপর এক মহা দিবসের আজাবের আশঙ্কা করছি।” (সুরা আরাফ, আয়াত: ৫৯)
অন্যত্র এসেছে, তিনি বলেছিলেন, “আমি তোমাদের ওপর এক যন্ত্রণাদায়ক দিবসের আজাবের আশঙ্কা করছি।” (সুরা হুদ, আয়াত: ২৬)
হজরত হুদ (আ.)
আদ জাতির নিকট প্রেরিত নবী হজরত হুদ (আ.)-ও একই ভাষায় তাঁর জাতিকে সতর্ক করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, “নিশ্চয়ই আমি তোমাদের ওপর এক মহা দিবসের আজাবের আশঙ্কা করছি।” (সুরা শুআরা, আয়াত: ১৩৫)
আহকাফ প্রান্তরে তিনি যখন তাঁর জাতিকে একত্ববাদের কথা বলছিলেন, তখনও তাঁর কণ্ঠে ছিল একই সুর, “তোমরা আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো ইবাদত করো না। আমি তোমাদের ওপর এক মহাদিবসের শাস্তির আশঙ্কা করছি।” (সুরা আহকাফ, আয়াত: ২১)
হজরত শুআইব (আ.)
মাদইয়ানবাসীর প্রতি প্রেরিত ‘খতিবুল আম্বিয়া’ হজরত শুআইব (আ.) যখন দেখলেন তাঁর জাতি মাপে কম দিচ্ছে এবং ব্যবসায়িক লেনদেনে অবিচার করছে, তখন তিনি তাঁদের পার্থিব প্রাচুর্যের মধ্যেও আসন্ন বিপদের ছায়া দেখতে পেয়েছিলেন।
তিনি বলেছিলেন, “হে আমার জাতি, আমি তোমাদেরকে সচ্ছল অবস্থায় দেখছি, কিন্তু আমি তোমাদের ওপর এমন এক দিনের আজাবের আশঙ্কা করছি যা তোমাদের পরিবেষ্টন করে ফেলবে।” (সুরা হুদ, আয়াত: ৮৪)
নবী মুসার সমকালীন মুমিন ব্যক্তি
ফেরাউনের রাজদরবারে অবস্থানকারী সেই অলৌকিক মুমিন ব্যক্তিটি, যিনি নিজের ইমান গোপন রেখেছিলেন, তিনিও যখন ফেরাউনের সম্প্রদায়কে সত্যের পথে আহ্বান জানান, তখন তাঁর ভাষাতেও নবীদের সেই দরদ ফুটে উঠেছিল।তি
নি বলেছিলেন, “হে আমার সম্প্রদায়, আমি তোমাদের ওপর নুহ, আদ ও সামুদ জাতির মতো মহাবিপর্যয়ের দিনের আশঙ্কা করছি।” (সুরা গাফির, আয়াত: ৩০)।
তিনি আরও বলেছিলেন, “হে আমার সম্প্রদায়, আমি তোমাদের জন্য সেই আর্তনাদের দিনের (কেয়ামত) আশঙ্কা করছি।” (সুরা গাফির, আয়াত: ৩২)
মহানবী মুহাম্মদ (সা.)
মুহাম্মদ (সা.)-ও এই বাক্যটি উচ্চারণ করেছেন। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, “আর তোমরা তোমাদের পালনকর্তার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো এবং তাঁর দিকেই ফিরে এসো... আর যদি তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও, তবে আমি তোমাদের ওপর এক মহা দিবসের আজাবের আশঙ্কা করছি।” (সুরা হুদ, আয়াত: ৩)
ভাষাতাত্ত্বিক ও তাফসিরি বিশ্লেষণ
আল্লামা ইবনে আশুর তাঁর সুবিখ্যাত তাফসির গ্রন্থে বলেন, নবীরা যখন বলেন ‘আমি তোমাদের জন্য আশঙ্কা করছি’, তখন এর দ্বারা প্রমাণিত হয় যে তাঁদের উপদেশ ছিল সম্পূর্ণ নিস্বার্থ এবং উম্মতের নিরাপত্তার প্রতি তাঁরা ছিলেন চূড়ান্ত পর্যায়ের যত্নশীল।
তাঁরা মানুষের ক্ষতিকে নিজেদের ক্ষতি হিসেবে গণ্য করতেন। ফলে নিজের সন্তান বা নিজের জীবনের জন্য মানুষ যেমন শঙ্কিত হয়, নবীগণ তাঁদের উম্মতের জন্য তেমনি শঙ্কিত হতেন। এটি ছিল মূলত তাঁদের হৃদয়ে গচ্ছিত উম্মতের প্রতি এক বিশাল রহমতের বহিঃপ্রকাশ। (আত-তাহরির ওয়াত-তানভির, ৮/১৮৯, দারু তিউনিসিয়া লিন-নাশর, তিউনিসিয়া, ১৯৮৪)
ইমাম ইবনে কাসির এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন, নবীরা জানতেন যে অবাধ্যতার পথ কত ভয়াবহ। তাই তাঁরা কোনো কঠোরতা বা জবরদস্তি নয়, বরং করুণার্দ্র হৃদয়ে মানুষকে সুসংবাদ এবং সতর্কবাণী শোনাতেন। তাঁদের এই ‘খওফ’ বা আশঙ্কা ছিল মূলত দয়ার নামান্তর। (তাফসিরুল কুরআনিল আজিম, ৩/৪২৯, দারু তৈয়বা, রিয়াদ, ১৯৯৯)
নবীদের দাওয়াত থেকে শিক্ষা
নবীদের এই বক্তব্য থেকে বর্তমান সময়ে ধর্ম প্রচারকদের ৩টি শিক্ষা নেবার আছে।
১. আন্তরিকতা ও শুভাকাঙ্ক্ষা: দায়ি বা ধর্মপ্রচারকের অন্তরে মানুষের প্রতি ঘৃণা নয়, বরং মায়া থাকতে হবে। তিনি মানুষকে দোজখের আগুন থেকে বাঁচাতে ব্যাকুল হবেন।
আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, “আমার ও তোমাদের দৃষ্টান্ত সেই ব্যক্তির মতো যে আগুন জ্বালাল এবং পতঙ্গরা তাতে ঝাঁপিয়ে পড়তে লাগল, আর সে তাদের বাধা দিচ্ছে। আমিও তোমাদের কোমর ধরে দোজখের আগুন থেকে টেনে ধরছি, অথচ তোমরা আমার হাত থেকে ফসকে আগুনে পড়তে চাইছো।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৪৮৩)
২. সহজবোধ্য ও নম্র ভাষা: নবীদের ভাষা ছিল অত্যন্ত কোমল এবং সরাসরি অন্তরে আঘাত করার মতো। ‘হে আমার সম্প্রদায়’ বলে সম্বোধন করে তাঁদের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করা হয়েছে। একজন দাঈকে অবশ্যই কর্কশ ভাষা পরিহার করে মমতাময়ী ভাষা গ্রহণ করতে হবে।
৩. নিস্বার্থ আত্মত্যাগ: নবীরা দাওয়াতের বিনিময়ে কোনো প্রতিদান চাইতেন না। তাঁদের একমাত্র চিন্তা ছিল মানুষের মুক্তি। আজকের দাঈদেরও ব্যক্তিগত স্বার্থ বা যশের উর্ধ্বে উঠে কেবল মানুষের কল্যাণ কামনায় নিমগ্ন থাকতে হবে।
মোটকথা, ‘আমি তোমাদের জন্য আশঙ্কা করছি’—এই বাক্যটি আসলে প্রতিটি মুমিনের হৃদয়ের স্পন্দন হওয়া উচিত। সমাজের পতনোন্মুখ অবস্থা দেখে যার অন্তর শঙ্কিত হয় না এবং মানুষের মুক্তির জন্য যার চোখে পানি আসে না, সে প্রকৃত হিতাকাঙ্ক্ষী হতে পারে না।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন