পোস্টগুলি

‘বারিশ’ বিছানো রাজপথ আর ‘হুলুমুর’-এর অম্ল-মধুর স্বাদ

  সুদানের রমজান মানে উদারতার মাস। নীল নদের অববাহিকায় অবস্থিত এই দেশটিতে রমজান আসে এক অভূতপূর্ব সামাজিক সংহতি নিয়ে। রাজনৈতিক অস্থিরতা আর যুদ্ধের দামামার মধ্যেও সুদানিরা রাজপথে ঐতিহ্যের ‘বারিশ’ বিছাতে ভুল করেনি। ‘হুলুমুর’ এক জাদুকরী পানীয় সুদানি রমজানের সমার্থক শব্দ হলো ‘হুলুমুর’ বা ‘আরি লাল’। নামের অর্থ মিষ্টি-তেতো। প্রস্তুত প্রণালী:  এটি তৈরিতে কয়েক সপ্তাহ সময় লাগে। লাল ভুট্টার অঙ্কুরোদগম ঘটিয়ে তা শুকিয়ে গুঁড়ো করা হয়। এরপর আদা, দারুচিনি, এলাচ আর হরেক রকম ভেষজ মিশিয়ে লোহার তাওয়ায় সেঁকে পাতলা চাদরের মতো তৈরি করা হয়। বিশেষত্ব:  ইফতারের সময় এটি জলে ভিজিয়ে চিনি মিশিয়ে পান করা হয়। এর তীব্র সুগন্ধ দূর থেকে জানান দেয় যে রমজান এসেছে। ‘বারিশ’ ও রাজপথের ইফতার সুদানের সবচেয়ে গর্বের ঐতিহ্য হলো ‘ইফতার আল-শারে’ বা রাস্তার ইফতার। আসরের পর থেকে প্রতিটি পাড়ার পুরুষরা ঘর থেকে খাবার বের করে এনে রাস্তার ওপর খেজুর পাতার পাটি বিছিয়ে বসে পড়েন। এই পাটিকে সুদানে বলা হয় ‘বারিশ’। তাদের লক্ষ্য থাকে কোনো পথচারী বা মুসাফির যেন ইফতারের সময় একা না থাকে। এমনকি তারা চলন্ত গাড়ি থামিয়ে যাত্রীদের অনুরোধ করেন...

রমজানে নবীজি যেভাবে দান–সদকা করতেন

  রমজান মাস আল্লাহপ্রদত্ত এমন এক মহিমান্বিত মওসুম, যখন ইবাদত, ত্যাগ, সংযম ও দানশীলতার প্রতিটি আমল বহুগুণে মূল্যায়িত হয়। এ মাসে মানব-আত্মা বিশেষভাবে আলোকিত ও সংবেদনশীল হয়ে ওঠে। তাই দেখা যায়, মুহাম্মদ (সা.)–এর দানশীলতা রমজান মাসে অন্যান্য সময়ের তুলনায় বহুগুণ বৃদ্ধি পেত। হাদিসে এসেছে—রমজানে তাঁর দান ছিল প্রবহমান বায়ুর চেয়েও দ্রুত ও ব্যাপক। এই বর্ধিত দানশীলতার পেছনে রয়েছে একাধিক আধ্যাত্মিক, নৈতিক ও সামাজিক প্রজ্ঞা, যা মুসলিম জীবনের গভীরতম কল্যাণের সঙ্গে সম্পৃক্ত। প্রথমত,  রমজান মাসের মর্যাদা ও প্রতিদানের পরিমাণ অন্যান্য সময়ের তুলনায় বহুগুণে বৃদ্ধি পায়। এ মাসে একটি নফল ইবাদত ফরজের সমতুল্য এবং একটি ফরজ আদায়কারী সত্তর ফরজের সমান সওয়াবের অধিকারী হয়—এমন মর্মবাণী বিভিন্ন হাদিসে এসেছে। হজরত আনাস (রা.)-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, “সর্বোত্তম দান হলো রমজানের দান।” (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৬৬৩) রমজানে দান-সদকা অন্যের রোজা, নামাজ ও জিকিরের সহায়ক হয়ে ওঠে; ফলে সাহায্যকারী ব্যক্তি পরোক্ষভাবে ঐ সব ইবাদতের অংশীদার হয়ে যায়। অর্থাৎ এ মাসে দান করা কেবল একটি সামাজিক সহায়তা নয়, বরং তা বহুগুণ প্রতিদান ও আখির...

রুদ্ধ দুয়ার আর নিভৃত প্রার্থনার রমজান

  বিশ্বের অধিকাংশ দেশের মুসলিমদের কাছে রমজান আসে আনন্দ, উৎসব আর আধ্যাত্মিকতার বসন্ত নিয়ে, কিন্তু মিয়ানমারের মুসলিমদের কাছে রমজান যেন অগ্নিপরীক্ষা। বিশেষ করে রাখাইন রাজ্যের রোহিঙ্গা এবং দেশটির বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা মুসলিম সংখ্যালঘুদের জন্য রমজান মানে বাড়তি আতঙ্ক, বিধিনিষেধ আর অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রাম। যেখানে ইফতারের টেবিলে খাবারের চেয়ে রক্তের দাগ আর পোড়া গন্ধই বেশি পরিচিতি পেয়েছে গত কয়েক দশকে। অবরুদ্ধ উপাসনালয় মিয়ানমারের বৃহত্তম শহর ইয়াঙ্গুন থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রাম—সবখানে রমজানের দৃশ্যপট করুণ। ২০১৭ সাল থেকে ইয়াঙ্গুনের বেশ কিছু এলাকায় ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা মাদ্রাসাগুলো স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। বছরের পর বছর ধরে স্থানীয় মুসলিমরা যেখানে তারাবির নামাজ আদায় করতেন, হঠাৎ করেই প্রশাসন সেগুলো সিলগালা করে দেয়। এমনকি রাস্তায় দাঁড়িয়ে জামাতে নামাজ পড়ার চেষ্টা করলেও সরকারের পক্ষ থেকে তা ‘আইনশৃঙ্খলার পরিপন্থী’ হিসেবে গণ্য করা হয়। অনেক এলাকায় মুসলিমদের নিজেদের ঘরেও দলবদ্ধ হয়ে নামাজ পড়তে বাধা দেওয়া হয়। ফলে মিয়ানমারের মুসলিমদের রমজান কাটে নিভৃতে, বদ্ধ ঘরে অতি সন্তর্পণে আল্লা...

রমজানে কীভাবে নিজেকে সংযত রাখবেন

  রমজান মুমিনের জীবনে আত্মশুদ্ধির দীক্ষা নিয়ে আসে। পুরো এক মাসের সাধনা মানুষের হৃদয়কে পাপ ও অবাধ্যতা থেকে পরিষ্কার করে। হিংসা-বিদ্বেষ, ক্রোধ ও লোভের মতো অন্তরের রোগ থেকে আরোগ্য লাভের সুযোগ এনে দেয়। তাকওয়া অর্জন, আল্লাহর নৈকট্য লাভ ও আত্মসংযমের পথ খুলে দেয়। রোজাদার ব্যক্তি আত্মিক উন্নতির পাশাপাশি পরকালীন সাফল্য ও নেকি অর্জন করেন। এ ইবাদত তাকে জান্নাতের বিশেষ দরজা রাইয়ান লাভের মর্যাদায় উন্নীত করে। তাকওয়া অর্জন রমজানের প্রধান উদ্দেশ্য তাকওয়া অর্জন। মহান আল্লাহ বলেন, “হে ঈমানদারগণ, তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর, যাতে তোমরা মুত্তাকি হতে পার।” (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৮৩) তাকওয়া শব্দটি সাধারণভাবে আল্লাহর আনুগত্য ও ছোট-বড় সব পাপ থেকে বিরত থাকার অর্থে ব্যবহৃত হয়। রোজাদার ব্যক্তির কাজ হলো, কেবল বড় গুনাহ নয়, নিজেকে সব ধরনের গুনাহ থেকে দূরে রাখবেন। তাহলে তিনি আল্লাহর রহমত, করুণা ও ক্ষমা লাভ করবেন। রোজাদার ব্যক্তির কাজ হলো, কেবল বড় গুনাহ নয়, নিজেকে সব ধরনের গুনাহ থেকে দূরে রাখবেন। তাহলে তিনি আল্লাহর রহমত, করুণা ও ক্ষমা লাভ করবেন। আল্লাহর ...

রমজানে আল্লাহ–তাআলার ‘দানশীলতা’

  হাদিসে দানশীলতা ও বদান্যতা বোঝাতে যে আরবি শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে, তা হলো ‘আল-জূদ’। এ শব্দের ভেতরে কেবল দান করার অর্থই নিহিত নয়; বরং রয়েছে উদার হৃদয়, প্রশস্ত মানসিকতা, স্বতঃস্ফূর্ত দানপ্রবণতা এবং বিনিময়ের প্রত্যাশাহীন অনুগ্রহের গভীর তাৎপর্য। ইমাম ইবনে রজব হাম্বলি তার বিশ্লেষণে বলেন, ‘জূদ’ অর্থ হলো ব্যাপক ও প্রাচুর্যময় দান—এমন দান, যা সংকীর্ণতা বা হিসাব-নিকাশের মানসিকতা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত নয়। অর্থাৎ দানশীলতা এখানে কেবল একটি কাজ নয়; বরং এটি এক মহান চরিত্রগুণ, যা উদারতা ও মহত্ত্বের পরিচায়ক।  আল্লাহ–তাআলা নিজেকে ‘জাওয়াদ’—অর্থাৎ মহাদাতা এবং ‘কারীম’—অর্থাৎ পরম উদার বলে পরিচয় দিয়েছেন। এই ‘জূদ’ শব্দের সর্বোচ্চ ও পূর্ণাঙ্গ প্রতিফলন ঘটে স্বয়ং আল্লাহ–তাআলার সত্তায়। আল্লাহ–তাআলা নিজেকে ‘জাওয়াদ’—অর্থাৎ মহাদাতা এবং ‘কারীম’—অর্থাৎ পরম উদার বলে পরিচয় দিয়েছেন। আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, “নিশ্চয়ই আল্লাহ জাওয়াদ; তিনি দানশীলতা ভালোবাসেন। তিনি কারীম; উদারতা ভালোবাসেন।” (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৭৯৯)এই ঘোষণার মাধ্যমে বোঝা যায়, দানশীলতা কেবল একটি নৈতিক গুণ নয়; বরং এটি আল্লাহর প্রিয় একটি বৈশিষ্ট্য। যে ...

আরশ থেকে আসা বিশেষ উপহার

  আল্লাহর অসংখ্য নেয়ামতের মাঝেও আমাদের জন্য রয়েছে এক অনন্য ‘আসমানী উপহার’। এই বিশেষ উপহারটি হলো সুরা বাকারার শেষ দুই আয়াত (২৮৫-২৮৬)। এই দুই আয়াত কেবল কিছু শব্দের সমষ্টি নয়, বরং এটি সরাসরি আরশ থেকে আসা এক বিশেষ নুর। আসমান থেকে আসা বিশেষ বার্তা ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে এই উপহারের মাহাত্ম্য ফুটে ওঠে। একদিন জিবরাইল (আ.) নবীজির (সা.) কাছে বসে থাকা অবস্থায় হঠাৎ আসমান থেকে এক আওয়াজ শুনতে পেলেন। তিনি ওপরের দিকে তাকিয়ে বললেন, “এটি আসমানের এমন একটি দরজা, যা আজই প্রথমবারের মতো খোলা হলো; আগে কখনো খোলা হয়নি।” সেখান থেকে একজন ফেরেশতা অবতরণ করে নবীজিকে (সা.) সালাম দিয়ে এক অভূতপূর্ব সুসংবাদ দিলেন, “আপনাকে এমন দুটি নুরের সুসংবাদ দেওয়া হচ্ছে, যা আপনার আগে আর কোনো নবীকে দেওয়া হয়নি। একটি হলো সুরা ফাতিহা, আর অন্যটি সুরা বাকারার শেষাংশ।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৮০৬) কী আছে এই বিশেষ দুই আয়াতে এই আয়াতগুলোতে রয়েছে মুমিনের জীবনের পূর্ণাঙ্গ দর্শন এবং রবের কাছে আত্মসমর্পণের এক অকল্পনীয় আকুতি। আয়াত ২৮৫: এখানে মুমিনের ইমানের স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। ফেরেশতা, কিতাব এবং রাসুলগণের ওপর অটল বিশ্বাসের কথা ...

যেসব কারণে নারীদের রোজা ভাঙবে না

  নামাজ, রোজা, হজ, জাকাত ইত্যাদিতে নারী–পুরুষ উভয়েরই সমান সুযোগ ও দায়িত্ব রয়েছে। নারীরা রোজা পালনের পাশাপাশি তারাবিহর নামাজও পড়বেন এবং রমজানের অন্যান্য সুন্নত আমল, যেমন কোরআন তিলাওয়াত ও ইতিকাফ ইত্যাদিও আমল করবেন। আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘যদি কোনো বিশ্বাসী নারী বা পুরুষ সৎকর্ম করে, অবশ্যই তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে।’ (সুরা-৪ নিসা, আয়াত: ১২৪) নবীজি (সা.) বলেন, ‘কোনো নারী যদি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ঠিকমতো আদায় করে, রমজান মাসে রোজা পালন করে, নিজের সম্ভ্রম ও ইজ্জত আবরু রক্ষা করে এবং শরিয়াহসম্মত বিষয়ে স্বামীর আনুগত্য করে; সে জান্নাতের আটটি দরজার যেকোনো দরজা দিয়ে প্রবেশ করতে পারবে।’ (আবুদাউদ, ইবনে হিব্বান: ৪১৬৩, আল মুজামুল আওসাত, তাবরানী: ৪৭১৪; সহিহ্ আলবানী) মায়েরা রোজা অবস্থায় শিশুকে দুধ পান করালে রোজার কোনো ধরনের ক্ষতি হয় না এবং অজুও ভঙ্গ হয় না। মায়েদের স্তন থেকে দুগ্ধ নিঃসরণ হলেও রোজার বা অজুর ক্ষতি হয় না। কাটাছেঁড়া বা ক্ষতস্থান থেকে রক্ত বা তরল বের হলে রোজার কোনোরূপ ক্ষতি হয় না, তবে অজু ভঙ্গ হবে। বমি হলেও রোজার ক্ষতি হয় না, এতে অজু ভঙ্গ হয়। রোজা শুধু পানাহার ও রতিক্রিয়া দ্বারা বিনষ্ট হয়। নারীদের...