পোস্টগুলি

মহানবীর সাহসিকতা থেকে শিক্ষা

  ভয় ও বিপদের মুহূর্তে মানুষের আসল চরিত্র ফুটে ওঠে। ইতিহাসের পাতায় দেখা যায়, চরম সংকটে অনেক শক্তিশালী ব্যক্তিও খেই হারিয়ে ফেলেন। কিন্তু বিশ্বনবী মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবন পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, চরম বিপদেও তাঁর সাহসিকতা, ধৈর্য এবং বুদ্ধিমত্তা ছিল অতুলনীয়। তাঁর এই বীরত্ব কেবল বাহুবল ছিল না; বরং তা ছিল মহান আল্লাহর ওপর অগাধ বিশ্বাস এবং ইনসাফ কায়েমের দৃঢ় সংকল্পের বহিঃপ্রকাশ। আল্লাহর রাসুল (সা.)-এর বীরত্বগাথা থেকে কিছু উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত ও শিক্ষা নিচে তুলে ধরা হলো: হিজরতের রাতের নির্ভীকতা মক্কার কাফেররা যখন রাসুল (সা.)-কে হত্যার জন্য তাঁর ঘর ঘেরাও করেছিল, তখন তিনি বিন্দুমাত্র বিচলিত হননি। তিনি অত্যন্ত শান্তভাবে তাদের সারির মাঝখান দিয়ে সুরা ইয়াসিনের আয়াত তেলাওয়াত করতে করতে বেরিয়ে যান। শত্রুরা তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে থাকলেও আল্লাহ তাদের চোখে পর্দা ফেলে দিয়েছিলেন। নিজের জীবনের চরম ঝুঁকিতেও তাঁর এই অবিচল থাকা কেবল একজন নবী এবং অকুতোভয় নেতার পক্ষেই সম্ভব। রণক্ষেত্রের অগ্রসেনানী আল্লাহর রাসুল (সা.) কেবল নির্দেশ দিয়েই ক্ষান্ত হতেন না, বরং যুদ্ধের ময়দানে তিনি থাকতেন সবচেয়ে সামনের সারিতে। হজরত আলীর সা...

স্নেহময়ী মাতৃক্রোড়ে, নীড়ে ফেরা

  ‘তিনি (হালিমা) বললেন, “আমি তোমার জন্য আল্লাহর নিকট আশ্রয় চাই!” তারপর তিনি একটি উট প্রস্তুত করেন। সওয়ারির ওপর আমাকে সামনে বসিয়ে তিনি বসেন পেছনে। পরিশেষে আমরা আমার মায়ের নিকট পৌঁছালাম। তিনি (হালিমা) বললেন, “আমার ওপর অর্পিত দায়দায়িত্ব আমি নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করেছি।” তারপর তিনি আমার ঘটনা সম্পর্কে আমার মাকে অবহিত করেন।’ ঘটনাটির সংক্ষিপ্ত বর্ণনা আনাস (রা.) থেকে শুনে নেওয়া যাক— আল্লাহর রাসুল (সা.)-এর কাছে জিবরাইল (আ.) এলেন, তখন তিনি শিশুদের সঙ্গে খেলছিলেন। তিনি তাঁকে ধরে শোয়ালেন এবং বক্ষ বিদীর্ণ করে তাঁর হৎপিণ্ডটি বের করে আনলেন। তারপর তিনি তাঁর বক্ষ থেকে একটি রক্তপিণ্ড বের করলেন এবং বললেন, এ অংশটি শয়তানের। এরপর হৎপিণ্ডটিকে একটি স্বর্ণের পাত্রে রেখে জমজমের পানি দিয়ে ধৌত করলেন এবং তার অংশগুলো জড়ো করে আবার তা যথাস্থানে পুনঃস্থাপন করলেন। তখন ওই শিশুরা দৌড়ে তাঁর দুধমায়ের কাছে গেল এবং বলল, মুহাম্মদকে হত্যা করা হয়েছে। কথাটি শুনে সবাই সেদিকে এগিয়ে গিয়ে দেখল তিনি ভয়ে বিবর্ণ হয়ে আছেন! আনাস (রা.) বলেন, ‘আমি আল্লাহর রাসুল (সা.)-এর বক্ষে সে সেলাইয়ের চিহ্ন দেখেছি।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৩১০) নবীজি (সা....

হোদাইবিয়ার সন্ধি: দৃশ্যত আপস, প্রকৃতপক্ষে এক মহাবিজয়

  হিজরি ষষ্ঠ সনের জিলকদ মাস। আল্লাহর রাসুল (সা.) স্বপ্নে দেখলেন তিনি সাহাবিদের নিয়ে পবিত্র মক্কায় প্রবেশ করছেন এবং ওমরাহ পালন করছেন। নবীদের স্বপ্ন ওহির অংশ। ফলে এই আনন্দ সংবাদে মদিনার ঘরে ঘরে খুশির জোয়ার বয়ে গেল। দীর্ঘ ছয় বছর পর জন্মভূমির টানে আর বাইতুল্লাহর জিয়ারতের আকাঙ্ক্ষায় ১,৪০০ সাহাবিকে সাথে নিয়ে রাসুল (সা.) মক্কার পথে রওনা হলেন। সঙ্গে যুদ্ধের কোনো সরঞ্জাম নেই, আছে কেবল কোরবানির পশু। এই যাত্রা কেবল একটি ধর্মীয় সফর ছিল না, বরং এটি ছিল এক সুদূরপ্রসারী ‘রাজনৈতিক ও প্রচারণামূলক’ মহাপরিকল্পনা। কৌশলগত ও রাজনৈতিক বিজয় রাসুল (সা.) ইহরাম বেঁধে মক্কার দিকে রওনা হয়ে আরবের গোত্রগুলোর কাছে একটি শক্তিশালী বার্তা দিলেন। জনমত গঠন:  আরবরা দেখল মুহাম্মদ (সা.) কাবার সম্মান করেন এবং তিনি যুদ্ধ করতে নয়, বরং জিয়ারত করতে এসেছেন। এটি কোরাইশদের সেই অপপ্রচারকে ধূলিসাৎ করে দিল যে—মুসলমানরা একটি উগ্র গোষ্ঠী। কোরাইশদের উভয়সংকট:  কোরাইশরা যদি ওমরাহ করতে বাধা দেয়, তবে পুরো আরবের কাছে তারা নিন্দিত হবে। আর যদি প্রবেশ করতে দেয়, তবে তাদের দাপট নষ্ট হবে। এই মনস্তাত্ত্বিক চাপে কোরাইশরা সন্ধি করতে বাধ্...

সা’দ ইবনে মুআজের রুমাল

  আরব মরুভূমির তপ্ত বালুকারাশিতে একদিন এক জান্নাতি সুসংবাদ প্রতিধ্বনিত হয়েছিল। সহিহ বুখারির একটি বর্ণনায় এসেছে, নবীজিকে একবার অত্যন্ত চমৎকার ও কোমল একটি জুব্বা উপহার দেওয়া হয়। সাহাবিরা সেটি হাতে নিয়ে এর মসৃণতা ও কারুকার্য দেখে বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে পড়লেন। তাঁদের চোখেমুখে যখন সেই পার্থিব বিলাসিতার প্রতি মুগ্ধতা, তখন নবীজি (সা.) স্মিত হাস্যে এক চিরন্তন সত্য উন্মোচন করলেন। তিনি বললেন, “তোমরা কি এর কোমলতা দেখে অবাক হচ্ছ? জান্নাতে সা’দ ইবনে মুআজের রুমালগুলো এর চেয়েও উত্তম এবং অধিকতর কোমল।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৮০২) অর্থাৎ, এই ‘রুমাল’ কেবল এক টুকরো কাপড় নয়; এটি হলো সেই অমর বীরত্বের স্বীকৃতি, যা অর্জন করতে সা’দ ইবনে মাআজকে পাড়ি দিতে হয়েছিল ত্যাগ ও ইমানের অগ্নিপরীক্ষা। মাত্র ৩৬ বছরের সংক্ষিপ্ত জীবন, যার মধ্যে ইসলামের ছায়াতলে ছিলেন মাত্র ছয়টি বছর। কিন্তু এই অল্প সময়েই তিনি ইতিহাসের পাতায় এমন এক অক্ষয় পদচিহ্ন এঁকে গেছেন, যার বিদায়বেলায় মহান আল্লাহর আরশ পর্যন্ত কেঁপে উঠেছিল। আনসারদের ধ্রুবতারা ও এক মহাবিপ্লব মদিনার ইতিহাসে আউস ও খাজরাজ গোত্রের ইসলাম গ্রহণ ছিল এক বিস্ময়কর বাঁক। বর্তমান যুগে অনেক...

নবীজি (সা.)-এর ৭ জন কৃষ্ণাঙ্গ সাহাবি

  ইসলামে কৃষ্ণাঙ্গ সাহাবিদের কথা উঠলে সবার আগে হযরত বিলাল ইবনে রাবাহ (রা.)-এর নাম মনে আসে। কিন্তু ইসলামের সোনালী ইতিহাসে আরও অনেক মহান ব্যক্তিত্ব ছিলেন যাঁদের গায়ের রঙ ছিল কালো বা তামাটে। বর্তমান সময়ের সুদানি বা ইথিওপিয়ানদের মতো তাঁদের গায়ের রঙও ছিল কৃষ্ণাঙ্গ। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর এমন ৭ জন সাহসী ও অনুগত সাহাবীর সংক্ষিপ্ত পরিচিতি নিচে তুলে ধরা হলো: ১. উম্মে আইমান (রা.) তাঁর আসল নাম ছিল বারাকাহ। তিনি ছিলেন নবীজির পিতা আবদুল্লাহর দাসী। আমিনা (রা.)-এর ইন্তেকালের পর উম্মে আইমানই নবীজিকে মায়ের মমতায় বড় করে তোলেন। রাসুল (সা.) তাঁকে ‘মা’ বলে ডাকতেন। তিনি মক্কার শুরুর দিকের মুসলিমদের একজন এবং মদিনায় হিজরতকারী সাহাবিদের অন্তর্ভুক্ত। ২. ওসামা বিন জায়েদ (রা.) ওসামা (রা.) ছিলেন নবীজির অত্যন্ত প্রিয়ভাজন। তাঁর পিতা জায়েদ বিন হারিসা (আরব) এবং মা উম্মে আইমান (ইথিওপিয়ান) দুজনেই ক্রীতদাস ছিলেন এবং রাসুল (সা.) তাঁদের মুক্ত করে দেন। ওসামা (রা.) কুচকুচে কালো বর্ণের ছিলেন। নবীজি তাঁর ইন্তেকালের ঠিক আগে এই কিশোর ওসামাকে রোমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রধান সেনাপতি নিযুক্ত করেন, যা ছিল বর্ণবাদে...

শহীদ হতে ব্যাকুল এক সাহাবি

  মৃত্যু অমোঘ, কিন্তু সেই মৃত্যুই যখন কারও ললাটে সৌভাগ্যের তিলক এঁকে দেয়, তখন তা হয়ে ওঠে জীবনের শ্রেষ্ঠ অর্জন। ত্যাগের অগ্নিপরীক্ষায় উত্তীর্ণ এমন কিছু ক্ষণজন্মা মানুষের জীবনে পরম পাওয়া হয়ে আসে শাহাদত; তা-ও আবার স্বয়ং আল্লাহর রাসুলের (সা.)-এর পবিত্র হাতে। এর চেয়ে পরম তৃপ্তি ও মহিমান্বিত মৃত্যু আর কী হতে পারে? ইসলামের ইতিহাসে এমনই এক প্রোজ্জ্বল নক্ষত্র হলেন বিখ্যাত তরুণ সাহাবি আবদুল্লাহ জুল-বিজাদাইন ইবনে আবদুল উজ্জা আল-মুজানি। তিনি মুজায়না গোত্রের সন্তান এবং প্রসিদ্ধ সাহাবি আবদুল্লাহ বিন মুগাফফালের চাচা। তিনি রাসুলের সাহচর্য গ্রহণ করেন এবং তাঁর সঙ্গেই অবস্থান করতেন। তিনি ছিলেন অত্যন্ত কোমল হৃদয়ের অধিকারী (আওয়াহ), অত্যন্ত মর্যাদাবান এবং পবিত্র কোরআনের একনিষ্ঠ তিলাওয়াতকারী। আবদুল্লাহ (রা.) ছিলেন শৈশবে পিতৃহারা এতিম। পিতার কাছ থেকে কোনো সম্পদ পাননি। তবে তাঁর চাচা ছিলেন প্রভাবশালী ও ধনাঢ্য ব্যক্তি; তিনি আবদুল্লাহর দায়িত্ব নেন এবং তাঁর তত্ত্বাবধানেই আবদুল্লাহ বড় হন। যৌবনে উপনীত হলে চাচা তাঁকে অনেক উট, ভেড়া ও দাস–দাসী প্রদান করেন। আল্লাহর রাসুল মক্কা থেকে হিজরত করে মদিনায় এলে আবদুল্লাহর মন...

‘প্রত্যেকটি ভালো কাজই সদকা’

  ইসলামে ‘সদকা’ বা দান কেবল বিত্তশালীদের জন্য নির্ধারিত কোনো ইবাদত নয়, বরং এটি প্রতিটি মুমিনের জন্য প্রতিদিনের একটি জীবনধারা। নবীজি (সা.)-এর গভীর অর্থপূর্ণ সংক্ষিপ্ত বাণীগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো, “প্রত্যেকটি ভালো কাজই সদকা।” এই নির্দেশনার মাধ্যমে তিনি দানের ধারণাকে অর্থের গণ্ডি থেকে বের করে এনে এক বিশাল মানবিক ও নৈতিক দিগন্তে ছড়িয়ে দিয়েছেন। হাদিসের পাঠ ও অর্থ হজরত জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে আছে, আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, “প্রত্যেকটি নেক কাজ বা কল্যাণকর কাজই হলো সদকা।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬০২১) মুহাদ্দিসদের মতে, এখানে ‘সদকা’ মানে হলো আল্লাহর পক্ষ থেকে সওয়াব বা পুরস্কার। যদি কেউ সওয়াবের নিয়তে ভালো কাজ করে, তবে সে নিশ্চিতভাবে পুরস্কার পাবে। আর যদি নিয়ত ছাড়াও স্বাভাবিক পরোপকার করে, তবে তাতেও আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রতিদানের সম্ভাবনা থাকে। সদকার ব্যাপকতা: টাকা ছাড়াও যা করা সম্ভব ইসলামি আইনজ্ঞদের মতে, ‘মারুফ’ বা কল্যাণকর কাজ বলতে এমন প্রতিটি কথা বা কাজকে বোঝায়, যা শরিয়ত ও বিবেক অনুযায়ী সুন্দর। ইবনুল বাত্তাল (র.)-এর মতে, কোনো ব্যক্তি যা কিছু কল্যাণকর বলে বা করে, তা-ই তার জ...