পোস্টগুলি

প্রতিষ্ঠানের কর্মী কি ‘রিসোর্স’ না ‘আমানত’

  অনেক সময় দেখা যায়, একটা প্রতিষ্ঠানের মালিক মুসলিম, কর্মীদের ৯০ শতাংশ মুসলিম; তবু সেখানে ধর্মীয় মূল্যবোধের কোনো ছাপ থাকে না। কেন? হতে পারে অফিসে নামাজঘর আছে, আজান শোনা যায়, অনুষ্ঠানে কোরআন তেলাওয়াত হয়। কিন্তু একটু গভীরে দেখলেই বোঝা যায়, সময়ের বিন্যাস, ভাষা, ব্যবস্থাপনার রীতি, সাফল্যের সংজ্ঞা—সবকিছুই ধার করা এমন এক মডেল থেকে, যা বানিয়েছেন সম্পূর্ণ ভিন্ন বিশ্বদৃষ্টির মানুষ। কোনো ব্যবস্থাপনা কাঠামোই আসলে নিরপেক্ষ নয়—প্রতিটির পেছনে তার নির্মাতার একটা বিশ্বাস লুকিয়ে থাকে। সেই বিশ্বাস কি মানুষকে আল্লাহর সম্মানিত বান্দা ভাবে, নাকি স্প্রেডশিটের একটা ‘রিসোর্স’? এই প্রশ্নটা না করলে যা থাকে, তা একটা ধর্মহীন কাঠামো—যার ওপর শুধু কিছু ধর্মীয় প্রতীক জুড়ে দেওয়া হয়েছে। এটা কীভাবে হলো, তার একটা ঐতিহাসিক ব্যাখ্যাও আছে। ওসমানিয়া সাম্রাজ্যের শেষ দিকে ইউরোপকে ধরার তাড়নায় মুসলিম সমাজ ধীরে ধীরে আল্লাহ–ভরসা আর অল্পেতুষ্টির মতো গুণকে ‘অলসতা’ ভাবতে শুরু করে, আর উৎপাদনশীলতাকেই নতুন মানদণ্ড করে তোলে। (মেলিস হাফেজ, ইনভেন্টিং লেজিনেস, কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটি প্রেস, ২০২১) সেই ধারা আজও চলছে—মুসলিম বিশ...

বস্তু থেকে আয়াত: প্রকৃতি-পাঠের এক তাওহিদি রূপান্তর

  ফিতরাতি বাস্তুবিদ্যা আধুনিক পরিবেশচিন্তার একটি মৌলিক সওয়ালকে সামনে আনে। সেটা হলো, আমরা প্রকৃতিকে কী হিসেবে দেখি—বস্তু হিসেবে, নাকি অর্থবাহী বাস্তবতা হিসেবে? আধুনিক যুগে প্রকৃতির প্রধান পাঠ গড়ে উঠেছে পর্যবেক্ষণ, পরিমাপ ও নিয়ন্ত্রণের আন্দাজকে কেন্দ্র করে। এই দৃষ্টিভঙ্গি বিজ্ঞানের বহু গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতির রাহা উন্মুক্ত করেছে, প্রকৃতির কার্যকারণ, গঠন ও প্রক্রিয়া সম্পর্কে মানবজাতিকে গভীর জ্ঞান দিয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে এই পাঠের একটি সীমাও রয়েছে। যখন প্রকৃতিকে প্রধানত একটি সম্পদব্যবস্থা বা উপযোগমূলক কাঠামো হিসেবে দেখা হয়, তখন তার মূল্য ক্রমশ তার ব্যবহারিক কার্যকারিতার সরহদে আবদ্ধ হয়ে পড়ে। বন তখন কাঠের উৎস, নদী পানিসম্পদের বাহক, পাহাড় খনিজের ভান্ডার এবং জীববৈচিত্র্য অর্থনৈতিক উৎপাদনশীলতার উপাদানে পরিণত হয়। নদীর উদাহরণ এ ক্ষেত্রে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। আধুনিক হাইড্রোলজি নদীকে জলপ্রবাহ, অববাহিকা, ক্ষয় ও সঞ্চয়ের একটি জটিল ভৌত ব্যবস্থা হিসেবে ব্যাখ্যা করে। ফলে প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক অংশীদারত্বে থাকে না, প্রভুত্বের দিকে চলে যায়। ফিতরাতি বাস্তুবিদ্যা এই সীমাবদ্ধতার বিপরীতে একটি বিকল্প পা...

ইমাম ফখরুদ্দিন রাজির বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াই

  ক্ষমতার উৎস, বৈধতা ও সমাজ পরিচালনায় আলেমদের ভূমিকা কী হবে—ইমাম রাজির এ বিষয়ে একটি স্বতন্ত্র অবস্থান ছিল। তিনি ছিলেন হিজরি ষষ্ঠ শতকের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস, ফকিহ, দার্শনিক ও মুফাসসির। তাঁর তাফসিরে তিনি যে ধারণা তুলে ধরেছিলেন তার মর্মার্থ হলো—আলেমরাই প্রকৃত শাসক, কারণ তাঁদের কর্তৃত্বের উৎস বুদ্ধিবৃত্তিক শ্রেষ্ঠত্ব, যা কখনো বরখাস্ত করা যায় না; অন্যদিকে রাজা-বাদশাহদের কর্তৃত্ব নির্ভর করে নিছক জাগতিক শক্তির ওপর, যা সহজেই বদলে যেতে পারে। (ফখরুদ্দিন রাজি, মাফাতিহুল গাইব, খণ্ড: ৩২, বৈরুত: দারুল ফিকর, ১৯৮১) নাম–পরিচয় তাঁর পূর্ণ নাম মুহাম্মদ ইবনে ওমর ইবনে হোসাইন ইবনে হাসান আল-কুরাশি আত-তাইমি। তাঁর নামের শেষে ‘আল–বাকরি’ও যুক্ত করা হয়, কেননা, তিনি খলিফা আবু বকর সিদ্দিক (রা.)–এর বংশধর বলে পরিচিত। তিনি ৫৪৪ হিজরিতে (১১৪৯ খ্রি.) পারস্যের রাই শহরে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা জিয়াউদ্দিন ওমর ছিলেন শাফেয়ি মাজহাবের একজন পণ্ডিত, আশআরি ধর্মতাত্ত্বিক এবং রাই শহরের খতিব। রাজি তাই ইতিহাসে ‘ইবনুল খতিব’ নামেও পরিচিত হন। পিতার মৃত্যুর পর তিনি কামাল আস-সামআনি ও মাজদুদ্দিন আল-জিলির কাছে শিক্ষা গ্রহণ করেন। য...

দেহ ও মন সুস্থ রাখতে ইসলামের ৫টি মৌলিক শিক্ষা

  আল্লাহ–তাআলা মানবজাতিকে সৃষ্টি করেছেন একমাত্র তাঁর ইবাদত-বন্দেগি করার জন্য। আর এই ইবাদত যথাযথভাবে সম্পাদন করার জন্য শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ থাকা জরুরি। সুস্থ না থাকলে মানুষ ঠিকমতো পার্থিব কাজ যেমন করতে পারে না, তেমনি ধর্মীয় দায়িত্বও পালন করতে পারে না। নিজেকে সুস্থ রাখার প্রথম শর্ত হলো স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা। সুস্বাস্থ্য বজায় রাখতে এবং রোগব্যাধি প্রতিরোধ করতে শরিয়ত কিছু মৌলিক নিয়মনীতি নির্ধারণ করেছে, যা মানবজীবনের জন্য অপরিহার্য। ১.. পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে সুস্বাস্থ্য বজায় রাখতে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার ভূমিকা অপরিসীম। শরীর, পোশাক, বাসস্থান ও আশপাশের পরিবেশ পরিষ্কার রাখলে জীবাণুর বিস্তার রোধ হয় এবং বিভিন্ন সংক্রামক রোগ থেকে সুরক্ষা পাওয়া যায়। পরিচ্ছন্নতা মানুষের শারীরিক সুস্থতার পাশাপাশি মানসিক প্রশান্তি ও কর্মক্ষমতাও বৃদ্ধি করে। দৈহিক পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতাকে ইসলাম স্বভাবজাত বিষয় হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। হাদিসে বলা হয়েছে, ‘দশটি বিষয় মানুষের স্বভাবজাত (ফিতরাত)। ১. গোঁফ ছোট করা, ২. দাড়ি বৃদ্ধি করা, ৩. মিসওয়াক করা, ৪. নাকে পানি দিয়ে পরিষ্কার করা, ৫. নখ...

প্রযুক্তির যুগে মুমিনের সম্পর্কের নতুন বাস্তবতা

  মানুষ সামাজিক জীব। জন্মের পর পরিবার যেমন তার প্রথম আশ্রয়, তেমনি পরিবার থেকে বেরিয়ে মানুষের সবচেয়ে বড় আশ্রয় হয়ে ওঠে বন্ধু। বন্ধু কেবল অবসরের সঙ্গী নয়; সে চিন্তার সঙ্গী, চরিত্র গঠনের সহযাত্রী এবং জীবনের সুখ-দুঃখের অংশীদার। তাই ইসলাম বন্ধুত্বকে শুধু সামাজিক সম্পর্ক হিসেবে দেখেনি; বরং মানুষের ইমান, চরিত্র ও ভবিষ্যৎ জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত একটি বিষয় হিসেবে বিবেচনা করেছে। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে বন্ধুত্বের ধরনও বদলেছে। একসময় বন্ধুত্ব গড়ে উঠত দীর্ঘ পরিচয়, পারস্পরিক বিশ্বাস ও একসঙ্গে সময় কাটানোর মাধ্যমে। আজ প্রযুক্তির কল্যাণে কয়েক সেকেন্ডেই মানুষ ‘বন্ধু’ হয়ে যায়। একটি ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট, একটি ফলো কিংবা কয়েকটি মেসেজেই যেন সম্পর্কের সূচনা। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই দ্রুত তৈরি হওয়া সম্পর্কগুলো কি সত্যিই বন্ধুত্বের গভীরতা ধারণ করে? একসময় কোনো বন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে হলে তার বাড়িতে যেতে হতো। ফোন করতে হলেও আগে তার বাবা-মায়ের সঙ্গে কথা বলতে হতো। পরিবার জানত, সন্তান কার সঙ্গে মিশছে, কী ধরনের পরিবেশে যাচ্ছে। লেখক, বক্তা, খেলোয়াড় কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব—তাঁদের প্রতিদিনের পোস্ট...

কোরআন থেকে ‘বরকত’ লাভের ৭ উপায়

  কোরআন সম্পর্কে আল্লাহ নিজেই বলেছেন, ‘(হে রাসুল) এটি এক বরকতময় গ্রন্থ, যা আমি তোমার প্রতি নাজিল করেছি, যাতে মানুষ এর আয়াতের মধ্যে চিন্তা করে এবং যাতে বোধসম্পন্ন ব্যক্তিগণ উপদেশ গ্রহণ করে।’ (সুরা সোয়াদ, আয়াত: ২৯) এখন প্রশ্ন হচ্ছে, আমরা এই কোরআন থেকে কীভাবে বরকত গ্রহণ করব এবং কেনই-বা আমরা নিয়মিত কোরআন পড়া সত্ত্বেও এর আলোয় জীবন আলোকিতা করতে পারছি না? ১. নিয়মিত কোরআন পাঠ কোরআনকে নিজের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ বানিয়ে নিতে হবে। এমন যেন হয় যে কোরআন পাঠ না করলে মনের ভেতর একধরনের অশান্তি বিরাজ করে। এ জন্য এখন থেকেই প্রতিজ্ঞা করতে হবে যে আমি নিয়মিত কোরআন পাঠ করব। তবে এই পাঠ শুদ্ধভাবে হতে হবে। অশুদ্ধ কোরআন পাঠ কখনো কার্যকর হবে না। ২. বিশুদ্ধ পাঠের চেষ্টা করা কোরআনের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক তৈরি করতে হবে। এ জন্য কোরআন পড়ার সময় তাড়াহুড়া না করে ধীরে পড়ার নীতি অবলম্বন করতে হবে। আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘এবং ধীরস্থিরভাবে স্পষ্টরূপে কোরআন পাঠ করো।’ (সুরা মুজ্জাম্মিল, আয়াত: ৪) ৩. উঁচু আওয়াজে পাঠ করা একেবারে মনে মনে পাঠ না করে একটু উঁচু আওয়াজে পাঠ করা। এটি মৃত হৃদয়কে জাগ্রত করতে সহযোগিতা করে। হজরত কুরাইব (রাহ.) ...

ইসলামের ইতিহাসে ‘আলেম’ ব্যবসায়ীদের অজানা অধ্যায়

  ইসলামি সভ্যতার ইতিহাস শুধু কিতাব আর মাদ্রাসার চারদেয়ালে সীমাবদ্ধ ছিল না। জ্ঞান–বিজ্ঞানের চর্চার পাশাপাশি সেখানে চলেছিল এক বিশাল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। বহু মুহাদ্দিস, ফকিহ ও দার্শনিক একই সঙ্গে সফল ব্যবসায়ী ছিলেন—ইমাম জাহাবির সিয়ারু আলামিন নুবালা ও ইমাম সামআনির আল-আনসাব -এর মতো জীবনীগ্রন্থ ঘাঁটলে এই দিকটি স্পষ্ট হয়। এ ছাড়াও মধ্যযুগীয় মুসলিম সমাজে আলেমদের ব্যবসা-সংশ্লিষ্টতা নিয়ে গবেষণা করেছেন ইসরায়েলি সমাজবিজ্ঞানী হাইয়িম জে কোহেন। ইতিহাসবিদ অলিভিয়া রেমি কনস্টেবল তাঁর আন্দালুস বাণিজ্য–সংক্রান্ত গবেষণায় কোহেনের এই পরিসংখ্যান উদ্ধৃত করেছেন। গবেষণায় হাজারো আলেমের জীবনী পরীক্ষা করে দেখা গেছে, যাঁদের পেশার বিবরণ পাওয়া যায়, তাঁদের একটি বড় অংশ টেক্সটাইল, কৃষি-শস্য, ধাতু ও জুয়েলারি, সুগন্ধি, চামড়া, বই-প্রকাশনা, ব্যাংকিং ও সাধারণ বাণিজ্যের মতো বিভিন্ন পেশায় যুক্ত ছিলেন—টেক্সটাইল ও কাপড়শিল্প ছিল সবচেয়ে বড় খাত। ( জার্নাল অব ইকোনমিক অ্যান্ড সোশ্যাল হিস্ট্রি অব দ্য অরিয়েন্ট, ১৩/১৬-৬১, দ্য ইকোনমিক ব্যাকগ্রাউন্ড অ্যান্ড দ্য সেক্যুলার অকুপেশনস অব মুসলিম জুরিসপ্রুডেন্টস অ্যান্ড ট্...