পোস্টগুলি

ইয়াফুর: এক নির্বাক প্রাণীর নবীপ্রেম

  মহানবী (সা.) ছিলেন সমগ্র সৃষ্টিজগতের জন্য মহান আল্লাহর এক বিশেষ রহমত। তাঁর অসীম মমতার ছায়া যেমন অসহায় মানুষকে আশ্রয় দিয়েছে, তেমনি পশুপাখি ও নির্বাক জীবজন্তুও তাঁর সস্নেহ সান্নিধ্যে খুঁজে পেয়েছে পরম নিরাপত্তা। নবীজির প্রতি প্রকৃতির এই অবোধ প্রাণিকুলের ভালোবাসা ছিল অত্যন্ত গভীর ও বিস্ময়কর, যা কখনো কখনো মানুষের অনুরাগকে হার মানাত। রাজকীয় উপহার ঐতিহাসিক হোদাইবিয়ার সন্ধির পর নবীজি (সা.) বেশ কয়েকজন বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধানের কাছে পত্র পাঠান। তাঁদের মধ্যে মিসরের বাদশাহ মুকাওকিস অন্যতম। তাঁর কাছে সাহাবি হাতিব ইবনে আবি বালতাআ (রা.)-কে দূত হিসেবে পাঠানো হয়। মুকাওকিস অত্যন্ত ধীমান ছিলেন এবং ইঞ্জিল কিতাবের জ্ঞান রাখতেন। তাই নবীজির সত্যতা সম্পর্কে নিশ্চিত হলেও মসনদ হারানোর ভয়ে তিনি ইসলাম গ্রহণ থেকে বিরত থাকেন।তবে নবীজির জন্য কিছু উপঢৌকন পাঠান। তাতে ছিল স্বর্ণ, মোলায়েম কাপড়, নিজস্ব খচ্চর দুলদুল এবং ‘ইয়াফুর’ নামের একটি গাধা। (ইবনুল কাইয়িম,  জাদুল মাআদ,  ১/১১৬, মুয়াসসাসাতুর রিসালাহ, বৈরুত: ১৯৯৪ খ্রি.) হাতিব (রা.) যখন উপহারসামগ্রী নিয়ে মদিনায় ফিরে আসেন, তখন নবীজি (সা.) মুকাওকিসের রাজনৈতিক ...

প্রাণীর অধিকারে ইসলামের দর্শন

  আল্লাহ যত জীব সৃষ্টি করেছেন, ইসলাম তাদের প্রত্যেকের জন্য নির্দিষ্ট অধিকার নির্ধারণ করে দিয়েছে।  ইসলাম অধিকারের বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেয়; কারণ এগুলো হলো ‘আমানত’, যা তার প্রাপকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন। এর অর্থ হলো, মানুষ তার প্রতিটি কাজের জন্য দায়বদ্ধ, চাই সেই কাজটি আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্কিত হোক, কিংবা মানুষ অথবা প্রকৃতির (জড় পদার্থ, উদ্ভিদ ও প্রাণী) সঙ্গে সম্পর্কিত হোক। প্রাকৃতিক পরিবেশের অধিকার (যার মধ্যে রয়েছে নদী-নালা, সাগর, উপত্যকা, পাহাড়, সজীব ফসল ও মনোরম বাগান এবং উপকারী ও সুন্দর প্রাণিকুল) হলো, এগুলোর সংরক্ষণ করা এবং এগুলোকে ধ্বংস বা নষ্ট না করা। ফসল এবং পশুপাখি ধ্বংস করা হলো ফাসাদ বা বিপর্যয়ের নিকৃষ্টতম রূপ, যা আল্লাহ–তাআলা ঘৃণা করেন। রাসুল (সা.) প্রত্যেক মানুষকে এই আহ্বান জানিয়েছেন যেন তারা পৃথিবীকে সবুজ ও সুন্দর করার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করে, এমনকি চরম সংকটের মুহূর্তেও। তিনি বলেছেন, “যদি কেয়ামত শুরু হওয়ার উপক্রম হয় এবং তোমাদের কারো হাতে একটি গাছের চারা থাকে, তবে সে যেন সম্ভব হলে চারাটি রোপণ করে দেয়।” (বুখারি, আল-আদাবুল মুফরাদ, হাদিস: ৪৭৯)এম...

ধৈর্যকে অভ্যাসে পরিণত করার একটি সহজ কৌশল

  কল্পনা করুন, সারাদিনের হাড়ভাঙা খাটুনি শেষে আপনি বাসায় ফিরলেন। শরীর আর মস্তিষ্ক দুটোই চরম ক্লান্ত। ঠিক এই মুহূর্তে জীবনসঙ্গীর একটি সাধারণ মন্তব্য আপনার কানে বিষের মতো লাগল। স্বাভাবিক সময়ে যা আপনি এটি হেসে উড়িয়ে দিতেন, কিন্তু আজ মেজাজ হারিয়ে কড়া জবাব দিয়ে বসলেন। এরপর শুরু হলো কথার পিঠে কথা, তপ্ত হয়ে উঠল ঘরের পরিবেশ। দিনশেষে আপনার সঙ্গী হলো একরাশ অনুশোচনা। কিংবা ভাবুন অফিসের সেই সহকর্মীর কথা, যার একটি সূক্ষ্ম সমালোচনা আপনার আত্মবিশ্বাস টলিয়ে দিল এবং পরবর্তী কয়েক দিন কাজে মনোযোগ থাকল না। এই দুটি পরিস্থিতির মাঝে একটি সাধারণ সূত্র আছে—বিচক্ষণতা বা ধৈর্যের (সবর) লাগাম ধরার আগেই আবেগ আমাদের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিয়েছে। সেই ব্যক্তি শক্তিশালী নয় যে কুস্তিতে অন্যকে হারিয়ে দেয়, বরং প্রকৃত শক্তিশালী সেই যে রাগের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬১১৪ এই আবেগীয় ঝোড়ো হাওয়া থেকে বাঁচতে এবং সচেতনভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাতে একজন ভালো মুসলিম হিসেবে আমার কিছু কৌশল অবলম্বন করতে পারি। যা হতে পারে প্রতিকূল মুহূর্তে নিজের নপ্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করার একটি কার্যকর মাধ্যম। আবেগ বনাম প্রতিক্রিয়া আমর...

হীনমন্যতা যেভাবে মুসলিম উম্মাহর ক্ষতি করছে

ছবি
  ইসলামের ইতিহাসে মুসলিমদের বিশ্বমানের নেতৃত্বের উদাহরণ রয়েছে অসংখ্য। মুসলিমরা একসময় সমৃদ্ধ সাম্রাজ্যের নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং চিকিৎসা, গণিত, প্রাকৃতিক বিজ্ঞান ও আইনশাস্ত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। তাঁদের আবিষ্কার ও উদ্ভাবন আধুনিক সমাজের ভিত গড়ে দিয়েছে। কিন্তু আজকের মুসলিম বিশ্বে আমরা দেখতে পাচ্ছি, এই নেতৃত্বের অভাব প্রকট। উম্মাহর মধ্যে একটি গুরুতর হীনমন্যতা বাড়ছে। ব্যক্তি হিসেবে আমরা অমুসলিমদের তুলনায় নিজেদের হীন মনে করি, প্রতিষ্ঠান হিসেবে আমরা মূলধারার করপোরেশনের তুলনায় নিজেদের দুর্বল ভাবি এবং উম্মাহ হিসেবে আমরা অন্য জাতিগুলোর তুলনায় নিজেরা পিছিয়ে আছি বলে ধারণা করি। কেন এমন হচ্ছে এবং কী এর সমাধান? হীনমন্যতা হলো এমন একটি মানসিক অবস্থা, যেখানে ব্যক্তি নিজেকে অপর্যাপ্ত বা অযোগ্য মনে করেন—যুক্তিসংগত বিচারের ভিত্তিতে নয়, বরং আবেগের দ্বারা পরিচালিত হওয়ার কারণে। হীনমন্যতার প্রভাব হীনমন্যতা হলো এমন একটি মানসিক অবস্থা, যেখানে ব্যক্তি নিজেকে অপর্যাপ্ত বা অযোগ্য মনে করেন—যুক্তিসংগত বিচারের ভিত্তিতে নয়, বরং আবেগের দ্বারা পরিচালিত হওয়ার কারণে। এর ফলে আমরা অন্যদের সঙ্গে নিজেদের তুলনা ...

জীবনের প্রকৃত সফলতা কী

  মানুষের জীবনের প্রকৃত সফলতা কী—এই প্রশ্নটি যত পুরোনো, ততই গভীর। কেউ মনে করে ধন-সম্পদ, কেউ খ্যাতি, কেউ ক্ষমতা—এসবই সফলতার মাপকাঠি। কিন্তু বাস্তবে মানুষের জীবনের চূড়ান্ত সফলতা নির্ভর করে তার অন্তরের পরিশুদ্ধতা, তার চরিত্রের উন্নয়ন এবং তার লক্ষ্য কতটা সঠিকভাবে নির্ধারিত হয়েছে তার ওপর। ইসলামের ভাষায় এই অন্তরের পরিশুদ্ধতাকেই বলা হয় ‘তাজকিয়া’। এই তাযকিয়া ছাড়া মানুষ বাহ্যিকভাবে যতই সফল দেখাক না কেন, প্রকৃত সফলতার দরজায় পৌঁছানো সম্ভব নয়। কোরআনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, “যে ব্যক্তি নিজেকে পরিশুদ্ধ করতে পেরেছে, সেই-ই সফলকাম।” (সুরা শামস, আয়াত: ৯) যে ব্যক্তি নিজেকে পরিশুদ্ধ করতে পেরেছে, সেই-ই সফলকাম। সুরা শামস, আয়াত: ৯ এখানে পরিশুদ্ধতা বলতে শুধু পাপ থেকে দূরে থাকা বোঝায় না; বরং নিজের চিন্তা, অনুভূতি, আচরণ, ইচ্ছা—সবকিছুকে আল্লাহর সন্তুষ্টির দিকে পরিচালিত করাই প্রকৃত পরিশুদ্ধতা। অর্থাৎ মানুষের ব্যক্তিত্ব কেবল তার বাহ্যিক রূপ বা সামাজিক অবস্থান দিয়ে বিচার করা যায় না; তার অন্তরের অবস্থা, তার নৈতিকতা, তার আচরণ—সব মিলিয়ে গড়ে ওঠে তার প্রকৃত পরিচয়। মানুষের জীবনের একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো, তার ভেতরে যেমন ...

ইসলামে ‘মনোযোগ দিয়ে শোনা’র দর্শন

  মানুষের হৃদয়ে হেদায়েত পৌঁছানোর প্রধান প্রবেশপথ হলো কান। অথচ আজকের দুনিয়ায় আমাদের অধিকাংশ সমস্যার মূলে রয়েছে ‘শুনেও না শোনার’ প্রবণতা। আমরা কথা বলতে যতটা আগ্রহী, অন্যের কথা শুনতে ততটাই বিমুখ। ফলে আমাদের ঘর থেকে শুরু করে সমাজ ও রাষ্ট্রীয় পর্যায় পর্যন্ত ভুল বোঝাবুঝি, কলহ আর বিতণ্ডার মিছিল দীর্ঘ হচ্ছে। কোরআনের সতর্কবাণী আল্লাহ–তাআলা কোরআনে সেইসব মানুষের নিন্দা করেছেন যারা তাদের শ্রবণেন্দ্রিয়কে কার্যকর রাখে না। বলা হয়েছে, “হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের আনুগত্য করো এবং শোনার পর তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ো না। তোমরা তাদের মতো হয়ো না যারা বলে ‘আমরা শুনেছি’, অথচ তারা শোনে না।” (সুরা আনফাল, আয়াত: ২০-২১) অনেক বাবা-মা অভিযোগ করেন, সন্তান তাঁদের কথা শোনে না। কিন্তু তাঁরা নিজেরা কি সন্তানদের কথা মন দিয়ে শোনেন? বড়রা অনেক সময় ছোটদের জ্ঞানতৃষ্ণা বা মনের কথাকে অবজ্ঞা করে থামিয়ে দেন। অথচ শোনার এই গুণটি স্বয়ং আল্লাহর। তিনি ইবলিসের মতো অভিশপ্ত সত্তার যুক্তিহীন দাবিগুলোও মন দিয়ে শুনেছিলেন, যার বর্ণনা কোরআনের সাত জায়গায় এসেছে। মহানবীর শ্রবণ-উদারতা মহানবী (সা.) ছিলেন সর্বকালের সেরা শ্রোতা। তিনি মু...

নবীজির ঘুমের পদ্ধতি

  ঘুমানোর মতো প্রাত্যহিক কাজের ক্ষেত্রেও মহানবী (সা.) আমাদের চমৎকার সব দিকনির্দেশনা দিয়ে গেছেন। নবীজির ঘুমের পদ্ধতি ছিল অত্যন্ত সুশৃঙ্খল, যা শারীরিক সুস্থতা ও আধ্যাত্মিক উন্নতির জন্য সহায়ক। তিনি অতিরিক্ত ঘুমানোর পক্ষপাতি ছিলেন না, আবার শরীরের প্রয়োজনীয় বিশ্রাম থেকেও নিজেকে বঞ্চিত করতেন না। ইমাম ইবনুল কাইয়িম এ বিষয়ে লিখেছেন, নবীজি (সা.) তখনি ঘুমাতেন যখন ঘুমের একান্ত প্রয়োজন হতো। তিনি মাটির ওপর, চাটাইয়ে কিংবা সাধারণ বিছানায়—সব অবস্থাতেই ঘুমানোর অভ্যাস রেখেছিলেন। (জাদুল মাআদ, ১/১৫৬, মুয়্যাসসাসাতুর রিসালাহ, বৈরুত: ১৯৯৪) নবীজির বিছানা তাঁর শয্যা ছিল সাধাসিধা। আয়েশা (রা.) বলেন, “নবীজির বিছানা ছিল চামড়ার, যার ভেতরে ছিল খেজুর গাছের আঁশ।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৪৫৬ একবার হজরত ওমর (রা.) নবীজির পিঠে চাটাইয়ের দাগ দেখে কেঁদে ফেলেছিলেন। নবীজি (সা.) তাঁকে বললেন, “ওমর, তুমি কি এতে সন্তুষ্ট নও যে তাদের জন্য দুনিয়া আর আমাদের জন্য আখেরাত?” (মুসনাদে আহমদ, হাদিস: ১২১২) যেভাবে ঘুমাতেন তিনি সময়:  নবীজি (সা.) রাতের প্রথম অংশে ঘুমানোর চেষ্টা করতেন এবং শেষ অংশে ইবাদতের জন্য জেগে উঠতেন। (সহিহ বুখারি, হাদ...