পোস্টগুলি

মুমিন কেন হতাশ হয় না

  কখনো কখনো মানুষ এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে পারে, যখন নিজের জীবনটাকেই অর্থহীন মনে হবে। অনেক চেষ্টার পরও যখন কাঙ্ক্ষিত ফলাফল না আসে, মানুষ তখন হতাশায় ভুগতে থাকে। অথচ মুমিনের জীবনে হতাশার কোনো স্থান নেই। পরিস্থিতি যত কঠিনই হোক, আল্লাহর রহমত তার চেয়েও বিস্তৃত। আল্লাহ চাইলে মুহূর্তেই সমস্ত দৃশ্যপট বদলে যেতে পারে। কোরআন-হাদিসে এমন কিছু পথনির্দেশনা রয়েছে, যা বিপর্যস্ত হৃদয়কে নতুন করে আশাবাদী হতে শেখায়। এমন ৭ নির্দেশনা আলোচনা করা হলো। ১. কষ্টকে শেষ পরিণতি না ভাবা দুঃসময়ে মানুষ সবচেয়ে বড় যে ভুলটি করে, তা হলো, বর্তমানের কষ্টকে ভবিষ্যতেরও বাস্তবতা মনে করা। আজ যে দরজা বন্ধ, কালও তা বন্ধ থাকবে, এমন ধারণা ধীরে ধীরে মনকে দুর্বল করে দেয়। অথচ জীবনের কোনো অবস্থাই স্থায়ী নয়। আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই কষ্টের সঙ্গে স্বস্তি রয়েছে।’ (সুরা ইনশিরাহ, আয়াত: ৫) লক্ষ্য করার বিষয় হলো, পরের আয়াতেও একই ঘোষণা পুনরায় এসেছে। যেন আল্লাহ মানুষকে আশ্বস্ত করছেন, কষ্টের আড়ালে স্বস্তি আসছে, অন্ধকারের পর আলো আসবেই। তাই কঠিন সময়কে জীবনের শেষ সিদ্ধান্ত মনে না করে ধৈর্য ধরে সামনে এগিয়ে যেতে হবে। ২. আল্লাহর ওপর আস্থা হতাশার ...

সুরা মুজ্জাম্মিল: আল্লাহ যেভাবে নবীজিকে নেতৃত্বের শিক্ষা দিয়েছেন

  সফল মানুষদের দৈনন্দিন রুটিন নিয়ে আজকাল কত আলোচনা হয়। কারও সফলতার মূলমন্ত্র রাতে দ্রুত ঘুম। কারও নিয়মিত জার্নাল লেখা। কারও বড় বড় স্বপ্ন দেখা। কিন্তু ইতিহাসের সবচেয়ে প্রভাবশালী মানুষটির সফল জীবনের রহস্য কী ছিল, তা কি কখনো ভেবে দেখেছেন? নবুয়তের শুরুর দিনগুলোতে নবীজির কাছে আল্লাহর পক্ষ থেকে যে নির্দেশ বারবার আসত, তা ছিল রাতের ইবাদত বা কিয়ামুল লাইল। যিনি সারা দিন মানুষের জন্য কাজ করেন, ইসলামের দাওয়াত দেন, যুদ্ধে নেতৃত্ব দেন, অন্য সব ইবাদত বাদ দিয়ে তাঁকে কেন রাতের ইবাদত করতে গুরুত্বের সঙ্গে বলা হলো? কারণ, যে শক্তি দিয়ে দিনের বিশাল দায়িত্ব পালন করতে হয়, সেই শক্তি তৈরি হয় রাতের ইবাদতে। কোরআনের নির্দেশনা রাতে দাঁড়িয়ে ইবাদত করাই ছিল আল্লাহর প্রথম নির্দেশগুলোর একটি। আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘হে বস্ত্রাবৃত, রাতে দাঁড়াও, তবে অল্প সময় বাদে। অর্ধরাত অথবা তার চেয়ে একটু কম অথবা তার চেয়ে একটু বেশি। আর কোরআন পাঠ করো ধীরে ধীরে স্পষ্টভাবে।’ (সুরা মুজ্জাম্মিল, আয়াত: ১-৪) এই আয়াতে আল্লাহ নবীজিকে ডেকেছেন মুজ্জাম্মিল বলে; যার অর্থ যিনি কাপড়ে নিজেকে জড়িয়ে নেন। ওহির প্রথম অভিজ্ঞতার পর মহ...

পরকালে শয়তান যেভাবে দায়মুক্তি ঘোষণা করবে

  মানুষ ভুল করে অনেক সময় নিজের দায় অন্যের ওপর চাপিয়ে দেয়। ‘ও আমাকে প্ররোচিত করেছে’, ‘বন্ধুরা না বললে আমি করতাম না’, ‘পরিস্থিতিই আমাকে বাধ্য করেছে’—এমন অনেক অজুহাত আমাদের পরিচিত। কিন্তু আল্লাহর আদালতে এসব অজুহাত কতটা কাজে আসবে? অপরাধীদের দাবি  কেয়ামতের দিন মানুষকে যখন হিসাবের মুখোমুখি করা হবে, তখন অপরাধীরা শয়তানকে দায়ী করতে থাকবে। বলবে, শয়তানই আমাদের পথভ্রষ্ট করেছে। কিন্তু সেদিন শয়তানও চুপ থাকবে না। সে নিজের দায় অস্বীকার করে বলবে, সে কাউকে জোর করেনি; শুধু ডেকেছে, আর মানুষ তার ডাকে সাড়া দিয়েছে। কোরআন সেই ভয়াবহ দৃশ্যের কথা স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে। শয়তানের ভাষ্য  পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘যখন সবকিছুর ফয়সালা হয়ে যাবে, তখন শয়তান বলবে, আল্লাহ তোমাদের সত্য প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন আর আমিও তোমাদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম, কিন্তু আমি তা ভঙ্গ করেছি। তোমাদের ওপর আমার কোনো ক্ষমতা ছিল না; আমি শুধু তোমাদের আল্লাহর অবাধ্যতা করার জন্য ডেকেছি, আর তোমরা আমার ডাকে সাড়া দিয়েছ।  সুতরাং এখন আমাকে দোষারোপ করো না, বরং নিজেদেরই দোষারোপ কর। না তোমাদের বিপদ মুক্তিতে আমি তোমাদের কোনো সাহায্য করতে পারব ...

কেউ যখন বলে, ‘আপনাকে আল্লাহর জন্য ভালোবাসি’—এর অর্থ কী

  ইসলামি সংস্কৃতিতে পরিচিত ও হৃদয়স্পর্শী বাক্য হলো, ‘আমি তোমাকে আল্লাহর জন্য ভালোবাসি।’ তবে অনেকে এই বাক্যের আসল বার্তাটি বুঝতে পারেন না। ভাবেন, কেন তিনি কি আমাকে সাধারণ মানুষ হিসেবে ভালোবাসতে পারছেন না? ভালোবাসার জন্য আবার কোনো কারণের প্রয়োজন কেন? ভালোবাসা একটি আত্মিক শক্তি রাসুল (সা.) ছিলেন আত্মিক শক্তি, সংযম ও সাহসিকতার সর্বোচ্চ প্রতীক। কিন্তু একই সঙ্গে তিনি ছিলেন পরিবারের সদস্য, সাহাবি ও শিশুদের প্রতি অসীম দয়ালু ও আবেগপ্রবণ। একদিন তিনি তাঁর আদরের দৌহিত্রকে পরম মমতায় চুম্বন করছিলেন। তখন পাশে বসা সাহাবি আকরা ইবনে হাবিস বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, ‘আমার ১০টি সন্তান রয়েছে, কিন্তু আমি কখনো তাদের কাউকে এমন চুম্বন করিনি!’ রাসুল (সা.) বললেন, যিনি অন্যের প্রতি দয়া করেন না, তাঁর ওপরও দয়া করা হয় না। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৯৯৭) ইসলামে ভালোবাসা ও আত্মিক উষ্ণতা শুধু অন্তরে চেপে রাখার বিষয় নয়; বরং তা সুন্দর আচরণের মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। রাসুল (সা.) পারস্পরিক সম্পর্কের উন্নয়ন ও ভালোবাসা বৃদ্ধির জন্য কয়েকটি সুন্দর অভ্যাসের শিক্ষা দিয়েছেন। তিনি উপহার আদান-প্রদানের নির্দেশ দিয়ে বলেছেন...

ইবনে খালদুনের ‘মুকাদ্দিমা’ পাঠ কেন আজও গুরুত্বপূর্ণ

  ইসলামি জ্ঞান-ঐতিহ্যের ইতিহাসে ইবনে খালদুন এমন একজন চিন্তাবিদ, যাঁর রচনা ইতিহাস, সমাজ, রাষ্ট্র, অর্থনীতি ও সভ্যতা সম্পর্কে চিন্তার ক্ষেত্রে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। তাঁর অমর গ্রন্থ আল-মুকাদ্দিমা শুধু একটি ঐতিহাসিক গ্রন্থের ভূমিকা নয়; বরং এটি মানবসমাজ ও সভ্যতার গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণের একটি সুসংবদ্ধ বুদ্ধিবৃত্তিক প্রয়াস। চতুর্দশ শতকের এই মুসলিম মনীষী ইতিহাসকে নিছক রাজা-বাদশাহ ও যুদ্ধের ঘটনাপঞ্জি হিসেবে দেখেননি; বরং ইতিহাসের অন্তর্নিহিত কারণ, সামাজিক শক্তি, অর্থনৈতিক কাঠামো, রাজনৈতিক ক্ষমতা এবং মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ককে বিশ্লেষণের বিষয় হিসেবে গ্রহণ করেছেন। ইবনে খালদুনের এই পদ্ধতি তাঁকে ইতিহাসচর্চার প্রচলিত ধারা থেকে স্বতন্ত্র করেছে। বিশেষত, তাঁর ‘আসাবিয়্যাহ’ বা সামাজিক সংহতির ধারণা, যাযাবর ও নগরজীবনের পারস্পরিক সম্পর্ক, রাষ্ট্রের উত্থান-পতনের বিশ্লেষণ এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে পর্যবেক্ষণ মুকাদ্দিমাকে বুদ্ধিবৃত্তিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থে পরিণত করেছে। ইবনে খালদুনের বিশ্লেষণের বিশেষত্ব হলো, তিনি রাজনৈতিক পতনকে শুধু কোনো একক শাসকের ব্যক্তিগত দুর্বলতার ফল হিসেবে দ...

মিসরে ইবনে খালদুন: এক বহুমাত্রিক জীবনের শেষ অধ্যায়

  মুসলিম ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ সমাজবিজ্ঞানী ওলিউদ্দিন আবু জাইদ আবদুর রহমান ইবনে খালদুন আল-হাদরামি (মৃ. ১৪০৬ খ্রি.) মিসরীয়দের নিয়ে একটা চমৎকার পর্যবেক্ষণ লিখে গেছেন যে, তাদের মেজাজে যেন সব সময় আনন্দ আর ভবিষ্যৎ নিয়ে এক অদ্ভুত নিশ্চিন্ততা কাজ করে। মিসরকেই তিনি তাঁর বিখ্যাত আল–মুকাদ্দিমা গ্রন্থে সর্বোচ্চ প্রশংসা করে লিখেছেন, এটা বিশ্বের উদ্যান, মানবজাতির মিলনমেলা। এই পর্যবেক্ষণ ছিল মানবসভ্যতার ওঠাপড়া নিয়ে তার গভীর সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গির একটা অংশ। উত্তর আফ্রিকা ও আন্দালুসের রাজদরবারে দীর্ঘ রাজনৈতিক টানাপোড়েনে বিপর্যস্ত হয়ে ৭৮৪ হিজরিতে (১৩৮২ খ্রি.) ইবনে খালদুন মিসরে আশ্রয় নেন। জীবনের শেষ দুই দশক তিনি কাটান কায়রো শহরে, আর এই সময়ই তাঁর চিন্তাভাবনাকে এক বৈশ্বিক রূপ দেয়। কায়রোয় পৌঁছামাত্র ইবনে খালদুনের পরিচিতি ছড়িয়ে পড়ে। মামলুক সুলতান জাহির বারকুক তাঁকে সম্মানের সঙ্গে গ্রহণ করেন, আল-আজহারে বিশেষ শিক্ষাদানের আসন দেন। কায়রোয় নতুন জীবন কায়রোয় পৌঁছামাত্র ইবনে খালদুনের পরিচিতি ছড়িয়ে পড়ে। মামলুক সুলতান জাহির বারকুক তাঁকে সম্মানের সঙ্গে গ্রহণ করেন, আল-আজহারে বিশেষ শিক্ষাদানের...

মক্কার অনুর্বর উপত্যকায় বসতি ও ভাষার প্রশ্ন

  ইতিহাসে মক্কায় মানব বসতি স্থাপনের গল্পটি কী জানেন? কোন সে ঐশ্বরিক ইচ্ছা ও পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সঙ্গে তা জড়িয়ে আছে? একটি ফল-ফসলাদিহীন জনমানবশূন্য পাহাড়ি উপত্যকায় জননী হাজেরা আর ইসমাইলের মাধ্যমে মানব জীবনযাত্রা শুরু কোন সে উদ্দেশ্যে? প্রথমে শিশু ইসমাইল ও তাঁর জননীকে শুষ্ক প্রান্তরে রেখে যাওয়ার সময় আল্লাহর নিকট ইব্রাহিম (আ.)-এর দোয়াটি খেয়াল করুন, ‘হে আমাদের রব! আমি আমার বংশধরদের কিছু সংখ্যককে বসবাস করালাম অনুর্বর উপত্যকায় আপনার পবিত্র ঘরের কাছে, হে আমাদের রব! এ জন্য যে তারা যেন সালাত কায়েম করে। অতএব আপনি কিছু লোকের অন্তর তাদের প্রতি অনুরাগী করে দিন এবং ফলফলাদি দিয়ে তাদের আহারের ব্যবস্থা করুন।’ (সুরা ইব্রাহিম, আয়াত: ৩৭) এখন ইব্রাহিম (আ.) কীভাবে তাঁর স্ত্রী ও একমাত্র সন্তানকে এই মরুপ্রান্তরে রেখে গেলেন, সেই ঘটনা সহিহ বুখারি থেকে শোনা যাক। ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, নারী জাতি প্রথম ইসমাইল (আ.)-এর মাতা হাজরা থেকেই কোমরবন্ধ বানানো শিখেছে। হাজেরা সারা থেকে আপন গর্ভের নিদর্শনাবলি গোপন করার উদ্দেশ্যেই কোমরবন্ধ লাগাতেন। অতঃপর উভয়ের মনোমালিন্য চরমে পৌঁছালে আল্লাহর আদেশে ইব্রাহিম (আ.) হাজেরা ও ত...