পোস্টগুলি

সাহাবি হিন্দের হিজরত: মাতৃভূমি ত্যাগের বেদনাকাব্য

  হিজরতের আদেশ চলে এসেছে। মক্কার মুসলমানরা ভেতরে-ভেতরে প্রস্তুত হচ্ছেন স্বদেশ ত্যাগ করার জন্য। কিন্তু দেশ ছেড়ে যাওয়া তো সহজ কাজ নয়। যে দেশের আবহাওয়া ও আলো-বাতাসে বেড়ে ওঠা, শৈশব-কৈশোর পার হয়েছে যে দেশের জমিনে হেঁটে ও দৌড়ে, তা ছেড়ে অচেনা কোনো বিদেশ-বিভুঁইয়ে যাত্রার যে কী যন্ত্রণা, তা শুধু ভুক্তভোগী বুঝতে পারেন। এক. স্বদেশ ত্যাগের কথা ভেবে মন ভেঙে যায় হিন্দের। তার পুরো নাম হিন্দ বিনতে আবি উমাইয়া আল-মাখজুমিয়া। তিনি ছিলেন মক্কার অন্যতম শীর্ষ ধনকুবের আবু উমাইয়া সুহাইলের দুলালি। জীবনভর কাটিয়েছেন চরম রাজকীয় আয়েশের মধ্যে। দুঃখ বা অভাব কী জিনিস, তা তিনি জানতেন না। দাস-দাসীর পরিবেষ্টনে বড় হওয়া এই নারী না চাইতেই হাতের কাছে হাজির পেয়েছেন সুখের তাবৎ আয়োজন। বাবার বাড়ি ছেড়ে যখন স্বামী আবদুল্লাহ ইবনে আবদুল আসাদের ঘরে এলেন, সেখানেও দেখা পেলেন রাশি রাশি সুখ ও ঐশ্বর্যের। পরনে থাকত সারাক্ষণ দামি রেশমের পোশাক, হাতে-কানে-গলায় বাহারি অলংকার। নিত্যনতুন প্রসাধনীতে রাঙিয়ে রাখতেন চিবুক ও ওষ্ঠাধর। রাজকুমারীর মতো জীবন কাটাতেন হিন্দ। স্বামী আবদুল্লাহর গভীর আদর, সোহাগ ও ভালোবাসায় যেন এক স্বপ্নরাজ্যে বিচরণ করতেন...

পরিবেশ সুরক্ষায় ইসলামের টেকসই রূপরেখা

  পরিবেশ বিপর্যয় ও জলবায়ু পরিবর্তন পৃথিবীর অন্যতম প্রধান ও মারাত্মক সমস্যা। মানুষের সীমাহীন লোভ, প্রাকৃতিক সম্পদের যথেচ্ছ ব্যবহার এবং শিল্পায়নের নামে প্রকৃতির ওপর চালানো শোষণ আজ পুরো পৃথিবীকে এক অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। ইসলাম পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা ও প্রকৃতির সুরক্ষায় এমন কিছু কালজয়ী নীতিমালা ও আইনি কাঠামো উপহার দিয়েছে, যা যেকোনো পরিবেশবাদী দর্শনের চেয়ে অনেক বেশি আধুনিক ও কার্যকর। ইসলামে পরিবেশের যত্ন নেওয়া সাময়িক নাগরিক ফ্যাশন বা লোকদেখানো চুক্তি নয়, বরং এটি মানুষের সামগ্রিক ইমান ও ঐশী দায়িত্বের অংশ। ইসলামে পরিবেশের প্রতি দায়িত্ব ইসলামি চিন্তাধারায় এই মহাবিশ্ব এবং এর মধ্যকার সমস্ত উপাদান—পানি, বাতাস, মাটি, পাহাড় ও উদ্ভিদ—মহান আল্লাহর সুনিপুণ সৃষ্টি এবং তাঁর পরম ক্ষমতার বাস্তব নিদর্শন। প্রকৃতিকে মানুষের কল্যাণে নিয়োজিত করা হলেও মানুষকে এর ওপর স্বেচ্ছাচারী মালিকানা দেওয়া হয়নি। মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে ‘খলিফা’ (প্রতিনিধি) হিসেবে, যার মূল দায়িত্ব পৃথিবীর বুক থেকে বিপর্যয় দূর করা এবং এর প্রাকৃতিক সুষমা বজায় রাখা। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ–তাআলা এই ভারসাম্য বজায় রাখার তাগিদ দিয়ে ঘোষণা ক...

দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাটাতে নবীজির শেখানো এক অনন্য আমল

আমাদের জীবনটা আসলে অসংখ্য ছোট-বড় সিদ্ধান্তের সমষ্টি। প্রতিটি মোড়েই আমাদের কোনো না কোনো বেছে নেওয়ার মুখোমুখি হতে হয়। কখনো সিদ্ধান্তটা হয় ক্যারিয়ার নিয়ে—এই চাকরিটা কি আমি নেব, নাকি আরও ভালো কিছুর জন্য অপেক্ষা করব? কখনো সিদ্ধান্তটা হয় জীবনসঙ্গী নির্বাচন নিয়ে—এই মানুষটাকে কি জীবনসাথী হিসেবে গ্রহণ করা ঠিক হবে, নাকি ‘না’ বলে দেওয়া উচিত? অনেকে এমন পরিস্থিতিতে ‘ইস্তিখারা’ (আল্লাহর কাছে কল্যাণ প্রার্থনার নামাজ) করার পরেও মনের ভেতর পুরোপুরি সুনিশ্চিত হতে পারেন না। এই মানসিক অস্থিরতা ও সিদ্ধান্তহীনতা দূর করতে নবীজি (সা.) একটি সংক্ষিপ্ত কিন্তু শক্তিশালী একটি দোয়া শিখিয়েছেন। জীবনের দোলাচলে নবীজির উপহার হজরত আলি ইবনে আবি তালিব (রা.) বলেন, নবীজি তাঁকে লক্ষ্য করে বলেছেন, “তুমি বলো: ‘আল্লাহুম্মাহদিনী ওয়া সাদ্দিদনী’ (হে আল্লাহ, আমাকে সত্য পথ দেখান এবং সঠিকতায় অবিচল রাখুন)।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৭২৫) নবীজি আলিকে চাওয়ার জন্য দীর্ঘ কোনো তালিকা দেননি। বরং মাত্র দুটি শব্দের একটি ছোট্ট বাক্য শিখিয়ে দিয়েছেন, যা জীবনের সব ধরনের চাহিদাকে নিজের ভেতর ধারণ করে। পরবর্তী জীবনে আলি (রা.) একজন মহান নেতা, বিচক্ষণ বিচার...

শিক্ষাদানে মহানবীর ১৫ কৌশল: উপমা, চিত্র ও যুক্তিনির্ভর সংলাপ

  বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ শিক্ষক মহানবী মুহাম্মদ (সা.)-এর শিক্ষাদান পদ্ধতি ছিল চিরআধুনিক ও বিজ্ঞানসম্মত। প্রথম পর্বে আমরা তাঁর হাতে-কলমে শিক্ষা, ধারাবাহিকতা ও প্রশ্নোত্তর পদ্ধতির মতো ছয়টি মৌলিক কৌশল নিয়ে আলোচনা করেছি। সুন্নাহর আলোকে তাঁর শিক্ষাদানের আরও কিছু কালজয়ী কৌশল তুলে ধরা হলো: ৭. উপমা ও উদাহরণের ব্যবহার জটিল বিষয়কে অধিকতর স্পষ্ট করার জন্য নবীজি (সা.) চাক্ষুষ উপমা দিতেন। তিনি বলেন, ‘যে মুমিন কোরআন পাঠ করে, তার উদাহরণ হলো কমলালেবুর মতো; যার ঘ্রাণ স্নিগ্ধ এবং স্বাদও খুব মিষ্টি। আর যে মুমিন কোরআন পাঠ করে না, তার উদাহরণ হলো খেজুরের মতো; যা সুস্বাদু কিন্তু ঘ্রাণহীন। সৎ সঙ্গীর উদাহরণ হলো কস্তুরী বিক্রেতার মতো এবং অসৎ সঙ্গীর উদাহরণ হলো কামারের হাপরের মতো।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৪৮২৯) তিনি সাহাবিদের চিন্তাশক্তি পরীক্ষা করতেন এবং উত্তীর্ণ হলে বাহবা দিতেন। মুআজ ইবনে জাবালকে ইয়েমেনে বিচারক হিসেবে পাঠান। তাঁর সিদ্ধান্ত গ্রহণের যোগ্যতা দেখে তিনি খুশি হয়ে তাঁর বুকে হাত দিয়ে মৃদু আঘাত করেন। ৮. দৃশ্যমান চিত্র বা রেখা অঙ্কন নবীজি মাঝেমধ্যে তাত্ত্বিক বিষয় সহজে বোঝানোর জন্য মাটির ওপর দাগ টেনে ছব...

ইসলামে প্রতিবন্ধীদের অপূর্ব অধিকার

  অধুনা বস্তুবাদী দুনিয়ায় মানবসমাজের যে অংশটি সবচেয়ে বেশি অবহেলিত, তারা ‘প্রতিবন্ধী’ হিসেবে পরিচিত। সমাজের এই স্তরে সেই ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত মনে করা হয়, যাঁরা সময়ের গতিধারা ও জীবনের দৌড়ে নিজেদের শারীরিক, স্থায়ী বা জন্মগত সীমাবদ্ধতার কারণে পিছিয়ে পড়েছেন। প্রতিবন্ধীদের প্রতি দয়া ও মায়া প্রদর্শন করা মানবিকতার দাবি। ইসলাম প্রতিবন্ধীদের বিভিন্ন অধিকার ও সুযোগ-সুবিধা স্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছে এবং ইসলামি আইনের (ফিকহ) একটি বড় অংশ তাঁদের অধিকার সুরক্ষার জন্য সুনির্দিষ্ট করা হয়েছে। অর্থনৈতিক অধিকার ইসলাম প্রতিবন্ধীদের ওপর কোনো ধরনের অর্থনৈতিক বোঝা চাপিয়ে দেয়নি এবং তাঁদের কঠোর জীবিকা উপার্জনের বাধ্যবাধকতা থেকে মুক্ত রেখেছে। পবিত্র কোরআনের যেসব আয়াত এবং হাদিসে দুর্বল ও অসহায়দের সঙ্গে সদাচরণ ও তাঁদের জন্য ব্যয়ের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, প্রতিবন্ধীরাও সেই নির্দেশনার অন্তর্ভুক্ত। ফিকহ শাস্ত্রের কিতাবগুলোতে ‘নিকটাত্মীয়দের ভরণপোষণ’ শিরোনামে যে বিবরণ রয়েছে, তার মূল কথাই হলো প্রতিবন্ধীদের জীবন ও জীবিকায় স্বজনদের সহযোগিতা করা। খলিফা ওমর (রা.) এক বৃদ্ধ অন্ধ লোককে ভিক্ষা করতে দেখেন। খোঁজ নিয়ে জানলেন, তিনি এ...

ইসলামে বিবাহের ৮ মহৎ উদ্দেশ্য

  আল্লাহর সৃষ্টিজগতের এক চিরায়ত ধারা হলো বিবাহ। এটি শুধু মানবজাতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং সমগ্র সৃষ্টিতে জোড়ায় জোড়ায় সৃষ্টি করা হয়েছে। (সুরা যারিআত, আয়াত: ৪৯) এবং এই বন্ধনই জীবনের পূর্ণতা এনে দেয়। বিবাহ হলো মানবসৃষ্ট কোনো চুক্তি নয়, বরং মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত এক পবিত্র বিধান। ইসলাম শুধু একজন ভালো ব্যক্তি সৃষ্টি করতে চায় না, বরং সেই ব্যক্তিকে নিয়ে একটি সুস্থ ও আদর্শ পরিবার নির্মাণ করতে চায়। আর এই পরিবার গঠনের ভিত্তি হলো বিবাহ। ইসলামের এই পবিত্র বিধানের বিপরীতে মানব ইতিহাসে প্রাচীন ও আধুনিক—উভয় যুগেই এমন কিছু ভ্রান্ত চিন্তাধারা ছিল, যা বিবাহকে প্রত্যাখ্যান করেছে। প্রাচীন পারস্যে ‘মানি’ ধর্মের মতো কিছু দার্শনিক মতবাদ জগৎকে মন্দ বা অকল্যাণকর মনে করে এর দ্রুত বিলুপ্তি চেয়েছিল, যার একটি মাধ্যম ছিল বিবাহ বর্জন। ইসলাম যেমন ব্যক্তিকে গঠন করতে চায়, তেমনি পরিবারকেও গঠন করতে চায়, যা সমাজের প্রাথমিক ও অপরিহার্য ভিত্তি। শায়খ ইউসুফ কারজাভি (রহ.) আবার, খ্রিষ্টান ধর্মের একটি অংশে কঠোর সন্ন্যাসবাদের প্রচলন ঘটে, যেখানে নারীকে প্রলুব্ধকারী হিসেবে দেখে বিবাহকে পাপ ও স্বর্গ থেকে দূরে থাকার কা...

কন্যা ফাতিমাকে নবীজির ৫ উপদেশ

  ইসলামে চারজন নারীকে নিখুঁত নারী হিসেবে বিবেচনা করা হয়: বিবি মরিয়ম, আসিয়া, খাদিজা (রা.) এবং ফাতিমা (রা.)। ফাতিমা ছিলেন নবীজির প্রিয় কন্যা। ইসলামের প্রাথমিক দিনগুলোতে তিনি ছিলেন শিশু। ধীরে ধীরে তিনি একজন কন্যা, স্ত্রী ও মা হিসেবে ইসলামের আদর্শ নারীর নিখুঁত উদাহরণ হয়ে আবির্ভূত হন। নিখুঁত নারী হিসেবে ফাতিমা (রা.) ফাতিমা (রা.) ইসলামের মহান নারীদের একজন। তিনি তাঁর পিতার নবুওয়তের মিশনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন এবং নারীদের জন্য একটি আদর্শ রোল মডেল। কোরআনে নবী–পরিবারের পবিত্রতা সম্পর্কে বলা হয়েছে: ‘তোমরা তোমাদের ঘরে অবস্থান করো এবং জাহিলিয়া যুগের মতো প্রদর্শনী করো না...আল্লাহ কেবল চান তোমাদের থেকে, হে নবীর পরিবার, সব অপবিত্রতা দূর করতে এবং তোমাদের পবিত্র ও নিষ্কলঙ্ক করতে।’ (সুরা আহযাব, আয়াত: ৩৩) শৈশব থেকেই তিনি তাঁর পিতামাতার ওপর কুরাইশদের নিপীড়ন ও অত্যাচার প্রত্যক্ষ করেছেন। এমনকি তিনি নিজেও কখনো কখনো কুরাইশদের উপহাসের শিকার হয়েছেন।  শক্তিমান নারী তিনি যখন খুব ছোট, মাত্র পাঁচ বছর বয়স, তখন নবীজি (সা.) মক্কার হিরা গুহায় প্রথম ওহি পান। শৈশব থেকেই তিনি তাঁর পিতামাতার ওপর...