পোস্টগুলি

অতিবৃষ্টি–অনাবৃষ্টির খোদায়ি রহস্য ও মুমিনের করণীয়

  বৃষ্টি আল্লাহ তাআলার অসংখ্য নেয়ামতের একটি এবং তাঁর কুদরতের জীবন্ত এক প্রকাশ। বৃষ্টির মাধ্যমেই তিনি মৃত জমিন পুনরুজ্জীবিত করেন, শস্য ফলান, মানুষ ও অন্যান্য প্রাণীর জীবিকার ব্যবস্থা করেন। কিন্তু বৃষ্টি একেবারে বন্ধ হয়ে গেলে যেমন পানির সংকট আর দুর্ভিক্ষ নেমে আসে, তেমনি দীর্ঘদিন অবিরাম বৃষ্টিও মানুষের জন্য পরিণত হয় বিপদ আর মনস্তাত্ত্বিক পরীক্ষায়। ইসলাম আমাদের শেখায়, অতিবৃষ্টি আর অনাবৃষ্টি—দুটিকেই আল্লাহর পক্ষ থেকে পরীক্ষা হিসেবে দেখতে, আর অনুশোচনা নিয়ে তাঁর দিকেই ফিরে যেতে। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেছেন, ‘আমি আকাশ থেকে পরিমিত পরিমাণে পানি বর্ষণ করি।’ (সুরা মুমিনুন, আয়াত: ১৮) এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, জীবনের জন্য যা অপরিহার্য, তা নির্ধারিত পরিমাণের চেয়ে বেশি হয়ে গেলেও কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। যে পানির অপর নাম জীবন, সেই পানিই প্রয়োজনের বেশি বর্ষিত হলে প্লাবন নামে, জনজীবন দুর্বিষহ হয়ে ওঠে। তাই প্রজ্ঞাময় আল্লাহ সাধারণত পরিমিতভাবেই বৃষ্টি দেন। কখনো তিনি মাত্রা বাড়িয়ে দেন, কখনো বৃষ্টিহীন রেখে দেন—যা আসলে মানুষের জন্য একেকটা সতর্কবার্তা। কোরআনে বলা হয়েছে, ‘স্থলে ও সমুদ্রে বিপর্...

হোদাইবিয়া: আল্লাহর পরিকল্পনা যেভাবে বাস্তবায়িত হয়

  আমরা জীবনটাকে ছক কষে সাজাতে ভালোবাসি। ক্যারিয়ারের গ্রাফ কোন দিকে যাবে, সন্তানের ভবিষ্যৎ কেমন হবে, সংসারটা কীভাবে গোছাবে—সবকিছুরই একটা মনগড়া নকশা আমরা এঁকে রাখি মনে মনে। তারপর একদিন একটা চাকরির আবেদন প্রত্যাখ্যাত হয়, বছরের পর বছরের একটা সম্পর্ক হুট করে ভেঙে যায়, কিংবা পরিবারে নেমে আসে আকস্মিক কোনো বিপর্যয়। নকশাটা তখন কাগজেই থেকে যায়, বাস্তবতা চলে যায় অন্য পথে। আর মনে জাগে সেই চেনা প্রশ্নটা, আমার সাথেই কেন এমন হলো? এই প্রশ্নের মুখোমুখি হওয়াটাই আসলে তাওয়াক্কুলের আসল পরীক্ষা—আল্লাহর প্রজ্ঞার ওপর ভরসা রাখার পরীক্ষা। আমরা ভুলে যাই, আল্লাহ শুধু সর্বশক্তিমান নন, তিনি আল-হাকিম, পরম প্রজ্ঞাময়ও বটে। তাঁর সিদ্ধান্তের পেছনের হিসাবটা আমাদের সীমিত চোখ দিয়ে সঙ্গে সঙ্গে দেখা যায় না। ইসলামের ইতিহাসে এই সত্যটা যত স্পষ্টভাবে ধরা পড়েছে, তার সবচেয়ে ভালো উদাহরণ বোধ হয় হোদাইবিয়ার সন্ধি। যে স্বপ্ন দিয়ে কাহিনিটা শুরু হিজরতের ছয় বছর পর নবীজি (সা.) একটা স্বপ্ন দেখলেন, তিনি সাহাবিদের নিয়ে মক্কায় ঢুকছেন, নিরাপদে ওমরাহ সম্পন্ন করছেন। নবীর স্বপ্ন যেহেতু ওহিরই অংশ, তিনি মদিনায় এই সুসংবাদ জানা...

স্ক্রিনশট সংস্কৃতি: এক ক্লিকে চার পাপ

  তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আমাদের বাক্‌স্বাধীনতার অবারিত সুযোগ দিয়েছে। কিন্তু এই একই সুযোগ জন্ম দিয়েছে এক ধ্বংসাত্মক সংস্কৃতির, যাকে বলা যায় ‘স্ক্রিনশট সংস্কৃতি’। কারও ব্যক্তিগত চ্যাটের কথোপকথন, বহু বছর আগের কোনো ভুল মন্তব্য, বা অসতর্ক মুহূর্তের কোনো বার্তার ছবি তুলে অনলাইনে ভাইরাল করে দেওয়া এখন নিত্যদিনের ঘটনা। মজার বিষয় হলো, একটা স্ক্রিনশট শেয়ার করার এই একটামাত্র ক্লিকে আসলে একসঙ্গে চারটি আলাদা পাপ ঘটে যায়। কোরআন-হাদিসে প্রতিটির জন্য আলাদা আলাদা সুস্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা আছে। ৪টি স্তর ভেঙে ভেঙে দেখানো হলো। কারও সঙ্গে সামান্য দ্বিমত হলেই তার পুরোনো গোপন মেসেজ ফাঁস করে দেওয়ার প্রবণতা—এই মোনাফেকি বৈশিষ্ট্যেরই হুবহু ডিজিটাল রূপ। ১. গোপনীয়তা লঙ্ঘন: অপরাধের শুরু স্ক্রিনশট সংস্কৃতি শুরু হয় আসলে স্ক্রিনশট নেওয়ার অনেক আগে থেকে। পুরোনো চ্যাট ঘেঁটে দেখা, কারও অতীতের ভুল খুঁজে বের করার চেষ্টা থেকে। এই ‘গোয়েন্দাগিরি’ নিয়ে কোরআনের নির্দেশ স্পষ্ট, ‘হে মুমিনগণ, তোমরা একে অপরের গোপন অনুসন্ধান করো না এবং একে অপরের গিবত করো না।’ (সুরা হুজুরাত, আয়াত: ১২) লক্ষণীয়, এই আয়াতে...

পাড়ায় একটি ‘মুসলিম পাঠকেন্দ্র’ গড়ে তোলার গল্প

  হেরা গুহার সেই নিঃসঙ্গ অন্ধকারে ইসলামের প্রথম বাণী নেমেছিল একটি মাত্র শব্দ নিয়ে—‘ইকরা’, পড়ো। (সুরা আলাক, আয়াত: ১) এই একটি শব্দই মুসলিম সভ্যতার ভিত গড়ে দিয়েছিল পড়ার সংস্কৃতির ওপর। কোরআন হয়ে উঠেছিল মুসলিম উম্মাহর প্রথম সংকলিত গ্রন্থ, আর আব্বাসীয় আমলে সেই অনুরাগ থেকেই জন্ম নিয়েছিল অসংখ্য পাবলিক ও ব্যক্তিগত পাঠাগার। বাগদাদের বাইতুল হিকমাহ, জ্ঞানের সেই গৃহ ছিল তখনকার বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ গ্রন্থাগার; তার ধ্বংসযজ্ঞের কথা আজও ইতিহাসপ্রেমীদের মনে দাগ কাটে। অতীত তো সোনালি ছিল; কিন্তু বর্তমানে যদি নিজের পাড়ার দিকে তাকাই, তাহলে কেমন অনুভূতি হয়? আমাদের অনেকের কাছেই পড়া এখনো খুব একটা কাজের না। অভিভাবকেরা আক্ষেপ করেন সন্তান স্মার্টফোনের স্ক্রিনে বুঁদ হয়ে থাকে বলে। অথচ বিকল্প কিছু হাতের কাছে তুলে দেওয়ার কথা ভাবেন না। উপন্যাসের চরিত্রের ভুলত্রুটি থেকেও মানুষ শেখে, শিশুদের কল্পনাশক্তি বাড়ে রূপকথায়। তবে এখানে সতর্কতা জরুরি—শুধু লেখকের নাম মুসলিমসুলভ হলেই বই তোলা যাবে না। আর যদি ভাবেনও, বইয়ের দাম এখন চাল-ডালের মতোই আকাশছোঁয়া। তাহলে কীভাবে নিজেদের আর সন্তানদের জন্য একটা সুস্থ পাঠাভ্যাস...

অনলাইনে নারীর চরিত্র হনন: ইসলামের বিধান কী

  সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখা একটি মন্তব্য, একটি পোস্ট বা একটি শেয়ার মুহূর্তের মধ্যেই অসংখ্য মানুষের কাছে পৌঁছে যায় এবং কারও সম্মান, ব্যক্তিগত জীবন কিংবা সামাজিক অবস্থানকে গভীরভাবে প্রভাবিত করতে পারে। তাই একজন মুসলমানের জন্য অনলাইন ও অফলাইন—উভয় ক্ষেত্রেই ভাষা ব্যবহারে সংযম, সতর্কতা ও সত্যনিষ্ঠা অপরিহার্য। বিশেষ করে কোনো নারীকে প্রমাণ ছাড়া ‘দুশ্চরিত্রা’ বলা বা তাঁর চরিত্র নিয়ে ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য করা ইসলামের দৃষ্টিতে অত্যন্ত গুরুতর বিষয়। কোরআন ও সুন্নাহ এ ধরনের অপবাদ থেকে কঠোরভাবে সতর্ক করেছে এবং মানুষের সম্মান রক্ষাকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। কারও প্রতি ব্যভিচারের ইঙ্গিত করে সম্মানহানি করা বা তার যৌন চরিত্র নিয়ে ভিত্তিহীন অভিযোগ তোলা ইসলাম কখনোই সমর্থন করে না। ইসলামে যৌন–চরিত্রের মর্যাদা ইসলাম মানুষের জীবন, ধর্ম, বিবেক, সম্পদ ও বংশ—এই মৌলিক বিষয়গুলোর সুরক্ষাকে শরিয়তের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য হিসেবে বিবেচনা করে। (ইমাম শাতিবি, আল-মুয়াফাকাত, ২/১৭) তাই কারও প্রতি ব্যভিচারের ইঙ্গিত করে সম্মানহানি করা বা তার যৌন চরিত্র নিয়ে ভিত্তিহীন অভিযোগ তোলা ইসলাম কখনোই সমর্থন করে না। মানুষ ম...

মানসিক প্রশান্তি ফিরে পেতে মহানবী (সা.)-এর জীবন থেকে ৫ শিক্ষা

  মানুষের মন সুস্থ থাকলে চিন্তাধারা স্বচ্ছ হয়, সিদ্ধান্ত গ্রহণে দৃঢ়তা আসে, আত্মবিশ্বাস বাড়ে। বিপরীতে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত মানুষ প্রতিনিয়ত দ্বিধা আর অনিশ্চয়তায় ভোগেন, অতীতের ব্যর্থতা তাকে কুরে কুরে খায়, তিনি সমাজের মূলধারা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। আজকের অস্থির সময়ে মানুষ প্রশান্তির খোঁজে মনোরোগ বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হন। ওষুধ সাময়িকভাবে উদ্বেগ-বিষণ্ণতা কমায়, কিন্তু অনেক সময় তা কেবল উপসর্গ দমন করে, রোগের মূল উৎপাটন করে না। ‘আল্লাহর অনুমতি ছাড়া কোনো বিপদ আসে না। আর যে আল্লাহর ওপর ইমান রাখে, আল্লাহ তার অন্তরকে সঠিক পথ দেখান। কোরআন, সুরা তাগাবুন, আয়াত: ১১ স্থায়ী প্রশান্তির জন্য প্রয়োজন চিন্তার পরিবর্তন আর আত্মিক উন্নয়ন। আর এই পথের সবচেয়ে জীবন্ত দৃষ্টান্ত মহানবীর নিজের জীবন। তাঁর আচরণ, তাঁর সিদ্ধান্ত, তাঁর মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক—সবকিছুতেই লুকিয়ে আছে মানসিক সুস্থতার সূত্র। এখানে সেরকম ৫টি শিক্ষার কথা বলা হলো। ১. বিপদে ‘তাওয়াককুল’ উদ্বেগের একটা বড় উৎস হলো যা আমাদের নিয়ন্ত্রণে নেই, তা নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা। নবীজি (সা.) নিজে জীবনভর অসংখ্য বিপদ, বিরোধিতা আর ক্ষতির মুখোমুখি হ...

জুমার দিনে যে আমলের ফজিলত সবচেয়ে বেশি

  জুমার দিন সপ্তাহের শ্রেষ্ঠতম দিন; যার সঙ্গে জড়িয়ে আছে অসংখ্য ফজিলত ও দোয়া কবুলের বিশেষ মুহূর্ত। এই দিনকে কেন্দ্র করেই মুসলিম সমাজের সাপ্তাহিক বৃহত্তম ইবাদত ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। তাই প্রত্যেক মুমিনের কর্তব্য হলো জুমার দিনের মাহাত্ম্য হৃদয়ে ধারণ করা, এর ফজিলত সম্পর্কে অবগত হওয়া এবং কোরআন-সুন্নাহ নির্দেশিত আমলসমূহ যথাযথভাবে পালন করে এ দিনের বরকত ও রহমত থেকে পূর্ণভাবে উপকৃত হওয়া। জুমার দিনের অনেক ফজিলত হাদিস শরিফে এসেছে, নবীজি (সা.) বলেন, ‘সমস্ত দিনের নেতা হলো জুমার দিন। জুমার দিন আল্লাহ–তাআলার নিকট সবচেয়ে মহান দিবস। এমনকি তা আল্লাহ–তাআলার কাছে ঈদুল আজহা ও ঈদুল ফিতর তথা ইসলামের দুই ঈদের দিন থেকেও মহান।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ১০৮৪) এ দিনের সুন্নত হলো—ভালোভাবে পাক–পবিত্র হয়ে পরিষ্কার ও উত্তম জামাকাপড় পরিধান করে প্রথম ওয়াক্তে মসজিদে চলে যাওয়া এবং নামাজ ও দোয়া-জিকিরে মগ্ন থাকা। আরেক বর্ণনায় নবীজি (সা.) বলেন, ‘যেসব দিনের ওপর সূর্য উদিত হয়, সেসব দিনের মধ্যে সর্বোত্তম দিন হলো জুমার দিন। এই দিনেই আদম (আ.)-কে সৃষ্টি করা হয়েছে, এই দিনেই তাঁকে জান্নাতে প্রবেশ করানো হয়েছে এবং এই দিনেই তাঁক...