পোস্টগুলি

‘তারাও তোমাদের মতো মানুষ’

  এক. নবীজি মৃত্যুশয্যায়। বলতে গিয়েও থেমে থেমে আসছে তাঁর কথামালা—বাক্য পূর্ণতা পায় না! এর মধ্যে প্রবল শক্তি নিয়ে তিনি উচ্চারণ করে উঠলেন—‘আস-সলাত, আস-সলাত, ওয়া মা মালাকাত আইমানুকুম—‘নামাজ এবং তোমাদের মালিকানাধীন দাস-দাসী’। জড়িয়ে আসে নবীজির জবান। শেষ সময়ে, যখন মৃত্যুযন্ত্রণায় কথা সরছে না তাঁর পবিত্র জবানে, তখন, সেই অন্তিম মুহূর্তে তিনি উচ্চারণ করে উঠলেন এক সতর্কবাণী—‘তোমরা নামাজ আদায়ে কোনো প্রকার অবহেলা করো না এবং সদাচার করো তোমাদের কর্তৃত্বাধীন দাস-দাসীর সঙ্গে। তাদের হক আদায়ে ত্রুটি রাখবে না সামান্য পরিমাণও।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ১৬২৫) উম্মে সালামা উপস্থিত ছিলেন তখন নবীজির শিয়রে। তিনি জীবনভর নবীজির অন্য সকল উপদেশের মতো এই অন্তিম নির্দেশেরও বাস্তবায়ন করে দেখান সর্বাত্মকভাবে। দাসী-বাঁদির সঙ্গে তাঁর আচরণ প্রবাদে পরিণত হয়। তাদের হক আদায়ের সর্বোচ্চ দৃষ্টান্ত প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। অন্ন-বস্ত্র- বাসস্থান—একজন মানুষের মৌলিক অধিকার। উম্মে সালামা তাঁর দাসী-বাঁদির সকল মৌলিক অধিকার আদায়ে ছিলেন বিশেষ উদ্যোগী। সমাজের অত্যধিক ভালো মানুষ হিসেবে যাদের আমরা জানি, তাদের পরিচারক-পরিচারিকারাও অন্যান...

মদিনার সার্বভৌমত্ব রক্ষায় মহানবীর ৫ কৌশল

  স্বাধীনতা মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে মানবজাতির জন্য একটি নেয়ামত। ইসলাম কেবল পারলৌকিক মুক্তির কথা বলে না, বরং একটি স্বাধীন ও ইনসাফভিত্তিক সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনের পথনির্দেশ দেয়। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনচরিত পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, তিনি নবুয়তি মিশনের পাশাপাশি একটি স্বাধীন ভূখণ্ড প্রতিষ্ঠা এবং এর সার্বভৌমত্ব রক্ষায় অত্যন্ত বৈজ্ঞানিক ও দূরদর্শী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন। মদিনা ছিল সেই আদর্শের বাস্তব রূপ। ১. স্বাধীনতার আইনগত ভিত্তি ও স্বীকৃতি মদিনায় হিজরতের পর তাঁর প্রথম কাজ ছিল একটি লিখিত সংবিধান প্রণয়ন করা, যা ইতিহাসে ‘মদিনার সনদ’ নামে পরিচিত। একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্য আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ স্বীকৃতি অত্যন্ত জরুরি। এই সনদের মাধ্যমে মদিনাকে একটি ‘হারাম’ বা পবিত্র নিরাপদ অঞ্চল হিসেবে ঘোষণা করা হয়। সনদের অন্যতম ধারা ছিল, “মদিনার ওপর কোনো বহিঃশত্রু আক্রমণ করলে মুসলিম, ইহুদি ও অন্যান্য সম্প্রদায় ঐক্যবদ্ধভাবে তা প্রতিহত করবে।” (ইবনে হিশাম,  আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যাহ , ২/১৪৭-১৫০, বৈরুত: দারুল কিতাব আল-আরাবি, ১৯৯০) এর মাধ্যমে তিনি কেবল মুসলিমদের নয়, বরং মদিনার সকল নাগরিককে দেশরক্ষার ...

মহানবীর সাহসিকতা থেকে শিক্ষা

  ভয় ও বিপদের মুহূর্তে মানুষের আসল চরিত্র ফুটে ওঠে। ইতিহাসের পাতায় দেখা যায়, চরম সংকটে অনেক শক্তিশালী ব্যক্তিও খেই হারিয়ে ফেলেন। কিন্তু বিশ্বনবী মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবন পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, চরম বিপদেও তাঁর সাহসিকতা, ধৈর্য এবং বুদ্ধিমত্তা ছিল অতুলনীয়। তাঁর এই বীরত্ব কেবল বাহুবল ছিল না; বরং তা ছিল মহান আল্লাহর ওপর অগাধ বিশ্বাস এবং ইনসাফ কায়েমের দৃঢ় সংকল্পের বহিঃপ্রকাশ। আল্লাহর রাসুল (সা.)-এর বীরত্বগাথা থেকে কিছু উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত ও শিক্ষা নিচে তুলে ধরা হলো: হিজরতের রাতের নির্ভীকতা মক্কার কাফেররা যখন রাসুল (সা.)-কে হত্যার জন্য তাঁর ঘর ঘেরাও করেছিল, তখন তিনি বিন্দুমাত্র বিচলিত হননি। তিনি অত্যন্ত শান্তভাবে তাদের সারির মাঝখান দিয়ে সুরা ইয়াসিনের আয়াত তেলাওয়াত করতে করতে বেরিয়ে যান। শত্রুরা তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে থাকলেও আল্লাহ তাদের চোখে পর্দা ফেলে দিয়েছিলেন। নিজের জীবনের চরম ঝুঁকিতেও তাঁর এই অবিচল থাকা কেবল একজন নবী এবং অকুতোভয় নেতার পক্ষেই সম্ভব। রণক্ষেত্রের অগ্রসেনানী আল্লাহর রাসুল (সা.) কেবল নির্দেশ দিয়েই ক্ষান্ত হতেন না, বরং যুদ্ধের ময়দানে তিনি থাকতেন সবচেয়ে সামনের সারিতে। হজরত আলীর সা...

একজন মুসলিমের কাছে স্বাধীনতার অর্থ কী

  মানবসভ্যতার ইতিহাসে ‘স্বাধীনতা’ একটি চিরন্তন ও মহিমান্বিত শব্দ। তবে ইসলামের দৃষ্টিতে স্বাধীনতার সংজ্ঞা কেবল একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে শৃঙ্খলমুক্ত বসবাস নয়; বরং এর পরিধি আরও বিস্তৃত ও গভীর। একজন মুসলিমের কাছে স্বাধীনতা হলো—সৃষ্টিকর্তা ছাড়া অন্য সকল অপশক্তির দাসত্ব থেকে মুক্তি এবং মানুষের ওপর মানুষের প্রভুত্বের অবসান ঘটানো। ২৬ মার্চ আমাদের মহান স্বাধীনতা দিবসে ইসলামের আলোকে এই স্বাধীনতার প্রকৃত স্বরূপ অনুধাবন করা জরুরি। সৃষ্টির দাসত্ব থেকে স্রষ্টার দাসত্বে মুক্তি ইসলামি দর্শনে স্বাধীনতার মূল ভিত্তি হলো ‘তাওহিদ’ বা একত্ববাদ। একজন মুসলিম যখন ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ পাঠ করে, তখন সে কার্যত ঘোষণা দেয় যে—সে আল্লাহ ছাড়া আর কারো কাছে মাথা নত করবে না। সাহাবি রিবয়ি ইবনে আমের (রা.) পারস্যের সেনাপতি রুস্তমের দরবারে স্বাধীনতার এই কালজয়ী সংজ্ঞা দিয়েছিলেন, “আল্লাহ আমাদের পাঠিয়েছেন মানুষকে মানুষের দাসত্ব থেকে বের করে আল্লাহর দাসত্বে ফিরিয়ে নিতে এবং দুনিয়ার সংকীর্ণতা থেকে আখেরাতের প্রশস্ততার দিকে নিয়ে যেতে।” (ইবনে কাসির,  আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া,  ৭/৩৯-৪০, বৈরুত: দারুল কুতুব আল-ইলমিয়্যাহ, ১৯৮৬) ...

প্রথম মুসলিম নার্স, ইসলামের নবী যাকে যোদ্ধার সমান মর্যাদা দিয়েছিলেন

  সপ্তম শতকে প্রাতিষ্ঠানিক চিকিৎসা ব্যবস্থা ঠিক কেমন ছিল - তা নিয়ে বিস্তারিত জানা যায় না। সেই সময়ে মসজিদে নববীর আঙ্গিনায় মাটির দেওয়াল, খেজুর গাছের গুঁড়ি ও পাতা দিয়ে তৈরি এক সাধারণ তাঁবুতে অসুস্থদের শুশ্রূষা দিচ্ছেন একজন নারী। আহতদের ক্ষত ধুয়ে পরিষ্কার করা থেকে ব্যান্ডেজ বেঁধে দেয়া - সবই করছেন তিনি। রোগীদের সাথে তিনি এমন মমতাময়ী আচরণ করতেন যে তার সেবা কেবল চিকিৎসার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকত না, বরং অসুস্থ ব্যক্তির মধ্যে উৎসাহ ও আশার সঞ্চার করতো। ইসলাম ধর্মের ইতিহাসে নার্সিংয়ের স্থপতি রুফাইদাহ আল-ইসলামিয়া বা আসলামিয়া। তিনি ইসলাম ধর্ম গ্রহণকারী প্রথম নারীদেরও একজন। রুফাইদা আল-ইসলামিয়াকে নিয়ে গবেষণা করেছেন মুস্তাফা এম. বৌদ্রাক, মুতলাক বি. আল-মুতাইরি, ফাতিমা এস. আল-সুলামী এবং হিশাম এম. আল-ফায়াদ। তাদের গবেষণার তথ্য বলছে, খাজরাজ গোত্রের বনু আসলাম শাখার সদস্য রুফাইদা, ইয়াসরিব শহরে ৫৯৭ খ্রিস্টাব্দের দিকে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। ইয়াসরিব, ইসলামের নবী মক্কা থেকে হিজরত করার পর যা মদিনা আল-নবী বা মদিনা নামে পরিচিতি পায়। 'প্রথম মুসলিম নার্স এবং ইসলামি শিক্ষার পথিকৃৎ রুফাইদাহ আল-ইসলামিয়ার মূল্যায...

কোরআনে যেভাবে নামাজের কথা বলা হয়েছে

  পবিত্র কোরআনের পরতে পরতে নামাজের গুরুত্ব, মর্যাদা এবং ত্যাগকারীদের পরিণাম সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা এসেছে। অন্য সকল ইবাদত যেমন—জাকাত, রোজা বা হজ নির্দিষ্ট শর্ত সাপেক্ষে ফরজ হয়, কিন্তু নামাজ কোনো অবস্থাতেই ত্যাগ করার সুযোগ নেই। শারীরিক অসুস্থতা বা প্রতিকূল পরিবেশেও সামর্থ্য অনুযায়ী নামাজ আদায়ের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।  নামাজের মর্যাদা সম্পর্কে কোরআন কোরআনের দৃষ্টিতে নামাজ মুমিনের জন্য এক বড় অবলম্বন। যেকোনো বিপদ বা সংকটে ধৈর্যের পাশাপাশি নামাজের মাধ্যমে আল্লাহর সাহায্য চাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।  আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা ধৈর্য ও নামাজের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা করো; আর নামাজ অবশ্যই কঠিন, কিন্তু বিনয়ীদের জন্য নয়।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ৪৫) ইমাম ইবনে কাসির এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন, বিপদ-আপদ মোকাবিলায় ধৈর্য ও নামাজই হলো সবচেয়ে উত্তম হাতিয়ার। মহানবী (সা.) কোনো কঠিন সমস্যার সম্মুখীন হলে নামাজে দাঁড়িয়ে যেতেন। ( তাফসির আল-কুরআনিল আজিম,  ১/২৫০, দারু তাইয়িবাহ, রিয়াদ, ১৯৯৯) নামাজ মানুষের অন্তরকে নরম করে, অহংকার দূর করে এবং পাপাচার থেকে দূরে রাখে। নামাজ কায়েমের নির্দেশ পবিত্র কোরআনে বহ...

সামাজিক নিরাপত্তা রক্ষায় ইসলামের ৫ মূলনীতি

  সমাজে যখন ভয়ভীতি জেঁকে বসে এবং মানুষের মধ্যে আস্থার অভাব দেখা দেয়, তখন অর্থনৈতিক বা সাংস্কৃতিক উন্নতি থমকে যেতে বাধ্য। বর্তমানে সামাজিক নিরাপত্তাকে কেবল রাষ্ট্রীয় আইন বা অর্থনৈতিক বিমার ফ্রেমে দেখা হলেও ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গিতে এটি আরও গভীর ও ব্যাপক। ইসলাম মনে করে, নাগরিকের জানমাল, ইজ্জত ও মৌলিক অধিকারের সুরক্ষা নিশ্চিত করাই হলো সামাজিক নিরাপত্তার মূল লক্ষ্য। নিরাপত্তার আধুনিক ধারণা সামাজিক নিরাপত্তার আধুনিক ধারণাটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায় উনবিংশ শতাব্দীতে। ১৮৮০-এর দশকে জার্মান চ্যান্সেলর অটো ফন বিসমার্ক শ্রমিকদের জন্য সামাজিক বিমা চালু করেন। পরে ১৯৩৫ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন ডি রুজভেল্ট সামাজিক নিরাপত্তা আইন পাস করেন। তবে ইসলাম এই আধুনিক কাঠামোর অনেক আগেই একটি মানবিক ও কার্যকর নিরাপত্তা মডেল পেশ করেছে। ইসলামের এই মডেলে কেবল আইন নয়, বরং নৈতিকতা ও ধর্মীয় দায়বদ্ধতাকে প্রধান্য দেওয়া হয়েছে। আত্মিক প্রশান্তিই পূর্বশর্ত ইসলামি দর্শনে নিরাপত্তার শুরু হয় মানুষের ভেতর থেকে। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘জেনে রেখো, আল্লাহর স্মরণেই কেবল চিত্ত প্রশান্ত হয়।’ (সুরা রাআদ, আয়াত: ২৮) একজন মানুষ...