পোস্টগুলি

সুফিয়ান সাওরি: ক্ষমতার দুয়ার ছেড়ে পালানো এক ইমাম

  আব্বাসীয় খেলাফতের শুরুর দিকের কথা। খলিফা আবু জাফর আল-মানসুর কুফার কাজির পদটি দিতে চাইলেন এমন একজন আলেমকে, যাঁর নাম তখন ইরাকের হাদিসচর্চার পাড়ায় ছড়িয়ে গেছে। প্রস্তাবের সঙ্গে একটি শর্তও ছিল। রাষ্ট্রের নীতির বিরুদ্ধে কোনো রায় দেওয়া যাবে না। সুফিয়ান ইবনে সাঈদ আস-সাওরি পদটি নিলেন না। ঐতিহ্যে বলা আছে, এরপর তিনি কুফা ছেড়ে যান এবং জীবনের বাকি অংশ কাটান আত্মগোপনে, এক শহর থেকে আরেক শহরে। পদ ফিরিয়ে দিয়ে যিনি পালিয়ে বেড়ালেন, তিনি পরে মুসলিম বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী মুহাদ্দিস ও ফকিহ বলে স্বীকৃতি পেলেন। আজ তাঁর নামে কোনো ‘মাজহাব’ চালু নেই। তবু হাদিস ও ফিকহের ইতিহাসে তিনি রয়ে গেছেন অমর হয়ে। তাঁর পিতা সাইদ ইবনে মাসরুক ছিলেন তাবেয়ি, নির্ভরযোগ্য হাদিসবিশরাদ, ইমাম শা’বির শিষ্য। সুফিয়ানের দুই ভাই ওমর ও মুবারকও পিতার কাছ থেকে হাদিস বর্ণনা করেছেন। কুফার ইলমি ঘরে জন্ম সুফিয়ান সাওরির জন্ম ৯৭ হিজরিতে, ইংরেজি হিসাবে ৭১৫ বা ৭১৬ সালে। জীবনীকারদের মধ্যে এ নিয়ে বড় মতভেদ নেই। ইমাম জাহাবি তাঁর জন্মসাল নিয়ে লিখেছেন, সবাই একমত যে সেটি ৯৭ হিজরি। কিছু বর্ণনায় অবশ্য ৯৫, ৯৬ বা ৯৮ সালের কথাও আছে। ...

মসজিদের পাশে যে নারী আহতদের সেবা করতেন

  খন্দকের যুদ্ধ চলছে। শত্রুর একটি তির এসে বিঁধল সাদ ইবনে মুয়াজের (রা.) হাতের শিরায়, প্রচণ্ড রক্তক্ষরণ হচ্ছিল। আনসার সাহাবিদের অন্যতম নেতা তিনি। রাসুল (সা.) নির্দেশ দিলেন, ‘তাঁকে এমন এক নারীর কাছে নিয়ে যাও, যিনি আহতদের চিকিৎসা করেন।’ সেই নারীর নাম রুফাইদা। হাদিসের বর্ণনা তাঁকে ইতিহাসে এমন এক জায়গা দিয়েছে, যেখানে আধুনিক নার্সিংয়ের ইতিহাসেও তাঁর নাম শ্রদ্ধার সঙ্গে নেওয়া হয়। কে ছিলেন রুফাইদা তাঁর নাম রুফাইদা আল-আসলামিয়া। ইবনে সাদ তাঁর আরেক নাম বলেছেন কুআইবা বিনতে সাদ আল-আসলামিয়া। (আত-তাবাকাতুল কুবরা, ৮/২৯১, দারু সাদির, বৈরুত, ১৯৬৮) ‘আল-আসলামিয়া’ নিসবত অনুযায়ী তিনি বনু আসলাম গোত্রের নারী। তবে আধুনিক অনেক লেখায় তাঁকে খাজরাজ গোত্রের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।ইবনে হাজার লিখেছেন, রুফাইদা হিজরতের পর নবীজির কাছে বাইআত গ্রহণ করেন। (আল-আসকালানি, তাহজিবুত তাহজিব, ১২/৪২৬, দাইরাতুল মাআরিফ আন-নিজামিয়্যাহ, হায়দরাবাদ, ১৯০৭) এ বর্ণনা অনুযায়ী তিনি মদিনায় নবীজির আগমনের আগে ইসলাম গ্রহণকারী নন। তাঁর পিতা সাদ আল-আসলামি চিকিৎসক ছিলেন এবং কন্যাকে চিকিৎসা শিখিয়েছেন। মসজিদের পাশের তাঁবু রুফাইদা...

কর্মক্ষেত্রে মানসিক চাপ: মহানবী (সা.) কীভাবে কাজের চাপ সামলাতেন

  পেশাগত জীবনে কর্মক্ষেত্রে ‘মানসিক চাপ’ (স্ট্রেস) একটি নিত্যনৈমিত্তিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কাজের ডেডলাইন, টার্গেট পূরণ এবং বহুমুখী দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে অনেকেই চরম মানসিক অবসাদের (বার্নআউট) শিকার হন।  অথচ বলা যায়, মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি কাজের চাপ ও বহুমুখী দায়িত্ব পালন করেছেন মহানবী (সা.)। তিনি একাধারে একজন নবী, রাষ্ট্রপ্রধান, সেনাপতি, প্রধান বিচারপতি, শিক্ষক ও একজন সংসারী মানুষ ছিলেন। এত বিশাল দায়িত্বের বোঝা কাঁধে থাকার পরও তিনি কখনো মানসিক অবসাদে ভেঙে পড়েননি বা খিটখিটে মেজাজের হননি। কাজের প্রচণ্ড চাপ সামলাতে নবীজি যে কৌশলগুলো অবলম্বন করতেন, তা আজকের কর্মজীবীদের জন্য আদর্শ হতে পারে। ১. কাজের ফাঁকে নামাজের মাধ্যমে ‘ব্রেক’ টানা কাজ করতে থাকলে মানুষের মস্তিষ্ক ক্লান্ত হয়ে পড়ে। আধুনিক বিজ্ঞান কাজের ফাঁকে বিরতির (মেডিটেশন) কথা বলে। নবীজির জীবনে যখনই কাজের চাপ বাড়ত বা কোনো চিন্তার বিষয় সামনে আসত, তিনি নামাজে দাঁড়িয়ে যেতেন। নামাজের এই সময়টা ছিল তাঁর জন্য সব ধরনের জাগতিক চাপ থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হওয়ার সুযোগ। তিনি সাহাবি বিলালকে বলতেন, নামাজের মাধ্যমে আমার প্রশান্তির ব্যবস্...

অজু ছাড়া মোবাইল ফোনে কোরআন পড়া যাবে কি

  ডিজিটাল যুগে মোবাইল ফোন, ট্যাবলেট বা কম্পিউটারের স্ক্রিনে কোরআন পাঠের প্রচলন বৃদ্ধি পেয়েছে। কর্মব্যস্ত জীবনে বা যাতায়াতের পথে স্মার্টফোনের কোরআন অ্যাপ থেকে পাঠ করা সহজ। তবে ফিকহ বা ইসলামি আইনশাস্ত্রের একটি বহুল আলোচিত প্রশ্ন হলো, ছাপানো কোরআন শরিফ স্পর্শ করার জন্য যেমন অজুর বাধ্যবাধকতা রয়েছে, মোবাইল ফোনে কোরআন পড়ার ক্ষেত্রেও কি একই বিধান প্রযোজ্য?  বিশ্লেষণ করা হলো। ছাপানো কোরআন স্পর্শের বিধান কোরআন শরিফ (মুসহাফ) অজু ছাড়া স্পর্শ করা ইসলামে সর্বসম্মতভাবে নিষিদ্ধ। আল্লাহ এর মূলনীতি নির্ধারণ করে দিয়েছেন, ‘যারা পূর্ণ পবিত্র, তারা ছাড়া অন্য কেউ তা (কোরআন) স্পর্শ করবে না।’ (সুরা ওয়াকিয়া, আয়াত: ৭৯) সাহাবি আমর ইবনে হাজমকে লেখা এক চিঠিতে মহানবী (সা.) নির্দেশ দিয়েছেন, ‘পবিত্র ব্যক্তি ছাড়া অন্য কেউ যেন কোরআন স্পর্শ না করে।’ (মুওয়াত্তা ইমাম মালিক, হাদিস: ৪৬৮) এই হাদিস ও আয়াতের ভিত্তিতে চার মাজহাবের ফকিহগণ একমত যে অজু ছাড়া ছাপানো কোরআন শরিফের পাতা বা লেখা হাত দিয়ে ধরা নাজায়েজ। মুঠোফোনের কোরআন কি ‘মুসহাফ’ মোবাইল ফোন বা ডিজিটাল ডিভাইসের স্ক্রিনে দৃশ্যমান কোরআনের আয়াতের ফিকহি মর্যাদা ছাপানো...

সন্তানের ওপর বাবা-মায়ের বদদোয়া: পরিণতি কী

  অনেক সময় সন্তানের অবাধ্যতা, ঔদ্ধত্য বা ভুল আচরণের কারণে বাবা-মা চরম কষ্ট পান এবং রাগের বশবর্তী হয়ে সন্তানকে অভিশাপ বা বদদোয়া দিয়ে বসেন। ইসলামের দৃষ্টিতে বাবা-মায়ের এই বদদোয়া সন্তানের ইহকাল ও পরকালের জন্য এক ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে। আলোচনা করা হলো। বাবা-মায়ের দোয়া দ্রুত কবুল হয় আল্লাহর কাছে একজন পিতা বা মাতার দোয়ার যে মর্যাদা, তা অন্য কারও দোয়ার ক্ষেত্রে নেই। বাবা-মা যখন অন্তর থেকে সন্তানের জন্য দোয়া করেন, তা যেমন আল্লাহর আরশে সরাসরি পৌঁছে যায়, তেমনি তাঁরা যখন কষ্টে বা রাগে বদদোয়া করেন, সেটিও অত্যন্ত দ্রুত কবুল হয়ে যায়। মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘তিন ব্যক্তির দোয়া নিঃসন্দেহে কবুল হয়—মজলুমের দোয়া, মুসাফিরের দোয়া এবং সন্তানের ওপর পিতা-মাতার দোয়া।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ১৫৩৬) সুতরাং, বাবা-মায়ের সামান্য রাগও সন্তানের জীবনের সমস্ত বরকত ও কল্যাণ নষ্ট করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। রেগে বদদোয়া করায় নিষেধাজ্ঞা সন্তান যতই অবাধ্য হোক না কেন, ইসলাম পিতা-মাতাকে রাগের মাথায় বদদোয়া দিতে নিষেধ করেছে। কারণ, রাগের বশবর্তী হয়ে দেওয়া বদদোয়া যদি আল্লাহর দোয়া কবুলের বিশেষ মুহূর্তের সঙ্গে মিলে যায়, তবে তা স...

কোরআন পাঠে দুই জগতের ৫ লাভ

  পবিত্র কোরআন মহান আল্লাহর নাজিলকৃত সর্বশেষ আসমানি গ্রন্থ। এটি মানবজাতির জন্য হেদায়েত, রহমত ও জীবন পরিচালনার পূর্ণাঙ্গ নির্দেশনা। কোরআন পাঠ করা একজন মুমিনের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। এর মাধ্যমে মানুষ আল্লাহর বাণী পাঠ করার পাশাপাশি আত্মিক প্রশান্তি লাভ করে, ইমানকে দৃঢ় করে এবং সৎপথে চলার অনুপ্রেরণা পায়। কোরআন পাঠের উপকারিতা ও ফজিলত অপরিসীম। ১. প্রতিটি অক্ষরে পুণ্য লাভ হয় কোরআন পাঠের একটি বিশেষ ফজিলত হলো, এর প্রতিটি অক্ষর পাঠের বিনিময়ে নেকি লাভ হয়। এটি মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে মুমিনদের জন্য এক বিশেষ অনুগ্রহ। নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর কিতাবের একটি অক্ষর পাঠ করবে, তার জন্য এর বিনিময়ে একটি নেকি (পুণ্য) রয়েছে। আর একটি নেকি দশ গুণ বৃদ্ধি করা হয়।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৯১০) ২. ইমান বৃদ্ধি করে পবিত্র কোরআন আল্লাহর বাণী। এর আয়াত পাঠ ও অর্থ অনুধাবনের মাধ্যমে আল্লাহর মহত্ত্ব, ক্ষমতা, রহমত এবং পরকাল সম্পর্কে মানুষের উপলব্ধি গভীর হয়। ফলে ইমান দৃঢ় হয় এবং আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা, ভয় ও আনুগত্য বৃদ্ধি পায়। কোরআনে আল্লাহ–তায়ালা মুমিনদের গুণ বর্ণনা করে বলেন, ‘আর যখন তাদের কাছ...

প্রতিদিন নিজেকে নিরাপদ রাখতে যে আমল করবেন

  প্রকৃত নিরাপত্তা আল্লাহর পক্ষ থেকেই আসে। তাই বিপদ থেকে বাঁচতে ইসলাম যেমন বাস্তবসম্মত সতর্কতা অবলম্বনের শিক্ষা দিয়েছে, তেমনি কোরআন-হাদিসে বর্ণিত কিছু দোয়া ও আমলের মাধ্যমে আল্লাহর আশ্রয় চাইতেও উৎসাহিত করেছে। নিজেকে নিরাপদ রাখার এমন কয়েকটি আমল হলো: সকাল-সন্ধ্যায় তিন কুল পাঠ সুরা ইখলাস, ফালাক ও নাস—তিনটি সুরাকে একসঙ্গে ‘তিন কুল’ বলা হয়। সুরাগুলো মুমিনের আত্মিক সুরক্ষার গুরুত্বপূর্ণ আমল। সুরা ইখলাসে আল্লাহর একত্ববাদের ঘোষণা রয়েছে। আর সুরা ফালাক ও নাসে যাবতীয় অনিষ্ট থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাওয়া হয়েছে। রাসুল (সা.) বলেন, ‘তুমি সকাল-সন্ধ্যায় তিনবার সুরা ইখলাস ও দুই মুআওয়িজাত (ফালাক ও নাস) পাঠ করো। তা তোমার জন্য সবকিছুর বিপরীতে যথেষ্ট হবে।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৫০৮২) ঘুমানোর আগে তিন কুল পড়ে শরীরে ফুঁ দেওয়ার একটি বিশেষ পদ্ধতিও হাদিসে বর্ণিত হয়েছে। আয়েশা সিদ্দিকা (রা.) বলেন, নবীজি প্রতি রাতে বিছানায় যাওয়ার সময় দুই হাত এক করে এই তিন সুরা পাঠ করে তাতে ফুঁ দিতেন। এরপর দুই হাত দিয়ে শরীরের যতটুকু সম্ভব মুছতেন। মাথা, মুখমণ্ডল ও শরীরের সামনের অংশ থেকে শুরু করতেন। এভাবে তিন...