পোস্টগুলি

‘লাইক-শেয়ারের’ ভিড়ে কোরবানির নিয়ত নষ্ট হচ্ছে না তো

  পবিত্র ঈদুল আজহা আমাদের ত্যাগ, আত্মশুদ্ধি এবং মহান আল্লাহর প্রতি নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের শিক্ষা দেয়। তবে বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তির উৎকর্ষ ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের জোয়ারে আমাদের এই পবিত্র ইবাদতের মূল সুরটি এক নতুন মনস্তাত্ত্বিক সংকটের মুখোমুখি হয়েছে। কোরবানির পশু কেনা থেকে শুরু করে জবাই—সবকিছুর ছবি ও ভিডিও এখন ফেসবুক, টিকটক বা ইনস্টাগ্রামে প্রকাশ করার এক তীব্র প্রতিযোগিতা চলছে। পশুর দাম, জাত, কিংবা ওজনের বড়াই করে ভিউ বা ‘লাইক-শেয়ার’ পাওয়ার এই মানসিকতা আমাদের নিয়তকে কতটুকু কলুষিত করছে, তা ভাবার সময় এসেছে। ইসলামে লোকদেখানো মনোভাব বা ‘রিয়া’ ইবাদত ধ্বংসের অন্যতম কারণ। পশু কেনার সময় মনে যদি এই সুপ্ত বাসনা থাকে যে লোকে আমাকে ধনী বলবে, পশুর দাম শুনে বাহবা দেবে, তবে সেই কোরবানি আল্লাহর দরবারে পণ্ডশ্রমে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। নিয়তের একনিষ্ঠতা ইবাদতের মূল ইসলামে যেকোনো আমল কবুল হওয়ার প্রধানতম শর্ত হলো নিয়তের বিশুদ্ধতা, যা শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য হতে হবে। কোরবানি কোনো সামাজিক উৎসব বা আভিজাত্য প্রদর্শনের মাধ্যম নয়। রাসুল (সা.) এই বিষয়ে উম্মতকে কঠোরভাবে সতর্ক করে গেছেন। তিনি বলেছেন, “নিশ্চয...

ভাগের কোরবানিতে গোশত বণ্টন করার নিয়ম কী

  কোরবানির গোশত আত্মীয়স্বজন, গরিব ও অসহায়দের হাতে তুলে দেওয়া অত্যন্ত সওয়াব ও ফজিলতের কাজ। সমাজে যে পদ্ধতিতে বণ্টন করলে প্রকৃত গরিব ও দুস্থ মানুষের অধিকার নিশ্চিত হবে, সেভাবেই সুষম বণ্টনের উদ্যোগ নেওয়া উচিত। কোরবানির গোশত সম্পর্কে মহান আল্লাহ স্পষ্ট নির্দেশনা দিয়ে বলেছেন, ‘এরপর তোমরা তা থেকে আহার করো এবং দুস্থ-অভাবগ্রস্তকে আহার করাও।’ (সুরা হজ, আয়াত: ২৮) আল্লাহ আরও বলেন, ‘এরপর তা থেকে তোমরা আহার করো এবং আহার করাও তাকে, যে অভাব থাকা সত্ত্বেও কারও কাছে হাত পাতে না এবং তাকেও, যে নিজের অভাবের কথা প্রকাশ করে হাত পাতে।’ (সুরা হজ, আয়াত: ৩৬)। রাসুল (সা.) কোরবানির গোশতের ব্যবহার সম্পর্কে উম্মতকে নির্দেশনা দিয়ে বলেছেন, ‘তোমরা নিজেরা খাও, অন্যকে আহার করাও এবং সংরক্ষণ করো।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৫৬৯) গোশত বণ্টনের মুস্তাহাব পদ্ধতি শরিয়তে কোরবানিদাতার জন্য গোশত বণ্টনের মুস্তাহাব পন্থা হলো, পুরো গোশতকে সমান তিন ভাগে ভাগ করা। এক ভাগ নিজের পরিবারের জন্য, এক ভাগ আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীদের জন্য এবং বাকি এক ভাগ গরিব-মিসকিনদের জন্য রাখা ইসলামের দৃষ্টিতে বাঞ্ছনীয়। (আল্লামা ইবনে আবেদিন শামি, রাদ্দুল মুহতা...

বৈষম্যহীন সমাজ গঠনে মহানবী (সা.)-এর ঘোষিত ১০ নীতি

  ব্যক্তিগত সাফল্যের চেয়েও বড় সাফল্য হলো একটি ন্যায়নিষ্ঠ ও বৈষম্যহীন সমাজ গঠন করা। যেখানে মানুষের পরিচয় তার বংশ বা বর্ণে নয়, বরং তার কর্ম ও তাকওয়া বা চারিত্রিক শুদ্ধতায় নির্ধারিত হয়। আজ থেকে দেড় হাজার বছর আগে বিদায় হজে মানবাধিকারের যে সনদ মহানবী (সা.) ঘোষণা করেছিলেন, তা আধুনিক সময়ের যে-কোনো মতবাদের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী ও কার্যকর। একটি ইনসাফপূর্ণ সমাজ গড়ার ১০টি বৈপ্লবিক নির্দেশনা তুলে ধরা হলো: ১. বর্ণবাদ ও বংশীয় আভিজাত্যের অবসান সাফল্যের মানদণ্ড রক্ত বা বর্ণ নয়, বরং মানুষের আমল ও চরিত্র। বিদায় হজের ভাষণে নবীজি (সা.) বর্ণবাদের মূলে কুঠারাঘাত করেছিলেন। রাসুল (সা.) বলেছেন, “কোনো আরবের ওপর কোনো অনারবের এবং কোনো অনারবের ওপর কোনো আরবের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই; শ্রেষ্ঠত্ব শুধু তাকওয়ার (খোদাভীতি) ভিত্তিতে।” (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ২২৯৭৮) ২. আইনের শাসনে আপসহীনতা ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় ধনী-দরিদ্র বা আপন-পর ভেদাভেদ করা সাফল্যের অন্তরায়। নবীজি (সা.) তাঁর নিজের পরিবারের সদস্যদের ক্ষেত্রেও আইনের সমান প্রয়োগের কথা বলতেন। রাসুল (সা.) বলেছেন, “আল্লাহর কসম! যদি মুহাম্মদের কন্যা ফাতিমাও চুরি করত, তবে আম...

রবের আঙিনায় দাসের সমর্পণ

  হজ কেবল একটি সফর নয়, এটি মহান রবের সান্নিধ্য লাভের এক অনন্য আধ্যাত্মিক বিপ্লব। ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের মধ্যে হজ এমন এক ইবাদত, যেখানে শারীরিক শ্রম, আর্থিক ত্যাগ এবং গভীর মানসিক নিমগ্নতার সমন্বয় ঘটে। প্রতি বছর জিলহজ মাসে বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে লাখ লাখ মানুষ একই রঙে, একই ঢঙে একই খোদার সমীপে হাজির হন। এই মহামিলনের পেছনে যে অন্তর্নিহিত চেতনা কাজ করে, তা হলো প্রকৃত আধ্যাত্মিকতা এবং নিখাদ বিশ্বভ্রাতৃত্ব। ইহরাম: আমিত্ব বিসর্জনের পোশাক হজের প্রথম ধাপ হলো ইহরাম। যখন একজন হজযাত্রী তার স্বাভাবিক বাহারি পোশাক ত্যাগ করে সেলাইবিহীন দুটি সাদা কাপড় পরিধান করেন, তখন মূলত তিনি নিজের সামাজিক পদমর্যাদা, সম্পদ আর অহংকারকেই বিসর্জন দেন। ইহরামের এই সাদামাটা বেশ আমাদের মনে করিয়ে দেয় কবরের সফরের কথা। ইহরামের মাধ্যমে মানুষের ‘আমিত্ব’ ধুয়ে মুছে যায়। এখানে বাদশাহ আর ফকিরের মধ্যে কোনো পার্থক্য থাকে না; সবাই তখন এক আল্লাহর গোলাম। এই সাম্যই ইসলামের প্রকৃত সৌন্দর্য। তালবিয়া: রবের ডাকে সাড়া দেওয়া ইহরাম বাঁধার পর থেকে হাজিদের কণ্ঠে সার্বক্ষণিক ধ্বনিত হয়— ‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক’ (আমি হাজির হে আল্লাহ, আম...

আল্লাহর কুদরতের নিদর্শন মাকামে ইব্রাহিম

  হজরত ইব্রাহিম (আ.) যে পাথরে দাঁড়িয়ে কাবাঘর পুনর্নির্মাণ করেছিলেন, সেই পাথরটির নাম ‘মাকামে ইব্রাহিম’। এটি একটি অলৌকিক পাথর; নির্মাণের উচ্চতার প্রয়োজন অনুপাতে পাথরটিও উঁচু-নিচু হতো এবং পাথরটিতে নবী ইব্রাহিমের পায়ের ছাপ অঙ্কিত রয়েছে। (মুহাম্মদ শফি, তাফসিরে মাআরিফুল কুরআন, ২/১০৩, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, ঢাকা, ২০১০)  একটি শক্ত জড়বস্তুর প্রয়োজনানুসারে উঁচু-নিচু হওয়া ও কাদামাটির মতো নরম হয়ে নিজের মধ্যে পদচিহ্ন গ্রহণ করা আল্লাহ-তাআলার কুদরতের অনন্য নিদর্শন। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘এতে (কাবাগৃহে) রয়েছে সুস্পষ্ট নিদর্শনাদি, এরমধ্যে একটি হলো মাকামে ইব্রাহিম।’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ৯৭) এই পাথরের ওপর দাঁড়িয়েই ইব্রাহিম (আ.) হজের ঘোষণা দেন এবং তাঁর এই আহ্বান আল্লাহ-তাআলা অলৌকিকভাবে কেয়ামত পর্যন্ত আগমনকারী সকল মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছিলেন। বেহেশতি পাথর মাকামে ইব্রাহিম মূলত বেহেশতি পাথর। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই হাজরে আসওয়াদ ও মাকামে ইব্রাহিম জান্নাতের ইয়াকুত পাথরসমূহের অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ-তাআলা এ দুটির জ্যোতি নিস্তেজ করে দিয়েছেন। তিনি যদি এগুলোর আলো ম্লান না করতেন, ত...

কোরবানির আগে-পরে পশুর যত্ন: ইসলাম কী বলে

  পবিত্র ঈদুল আজহার মূল বাণী হলো আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে নিজের ভেতরের পশুত্ব ও অহংকারকে কোরবানি করা। তবে দুঃখজনক হলেও সত্য, প্রতিবছর কোরবানির ঈদ এলে পশুর প্রতি একধরনের সামষ্টিক অসচেতনতা ও নিষ্ঠুরতা আমাদের সমাজে লক্ষ্য করা যায়। হাটে পশুকে নির্মমভাবে পেটানো, ট্রাকে গাদাগাদি করে আনা, কিংবা জবাইয়ের সময় অপ্রয়োজনীয় কষ্ট দেওয়া—আমাদের প্রতিদিনের চিত্রে পরিণত হয়েছে। অথচ ইসলাম শুধু মানুষের প্রতি নয়, বরং অবলা পশুর প্রতিও দয়া ও মানবিক আচরণের কঠোর নির্দেশ দিয়েছে। কোরবানির ইবাদত কবুল হওয়ার জন্য পশুর প্রতি শরিয়তি শিষ্টাচার বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। শরীর পুরোপুরি ঠাণ্ডা হচ্ছে এবং প্রাণ সম্পূর্ণভাবে চলে যাচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত তার হাত-পা কাটা বা চামড়া আলাদা করা যাবে না। অবলা পশুর অধিকার ইসলামের দৃষ্টিতে পশুর ওপর সাধ্যের অতিরিক্ত বোঝা চাপানো বা তাকে শারীরিক কষ্ট দেওয়া মারাত্মক গুনাহের কাজ। কোরবানি করার অর্থ এই নয় যে জবাইয়ের আগ পর্যন্ত পশুটির ওপর যেকোনো ধরনের নিষ্ঠুরতা চালানো যাবে। রাসুল (সা.) পশুর প্রতি দয়া করার ব্যাপারে এতটাই সংবেদনশীল ছিলেন যে, তিনি একদা অভুক্ত একটি উট দেখে তার মালিককে ডেকে সতর...

প্রেমময় হজের অনন্য ৫ পুরস্কার

  হজ একটি প্রেমময় ইবাদতের নাম। আল্লাহ ও বান্দার মাঝে স্থাপিত গভীর ভালোবাসার অনন্য বহিঃপ্রকাশ ঘটে হজের মাধ্যমে। শ্বেতশুভ্র ইহরামের কাপড়ে সজ্জিত হয়ে বান্দার জবানে উচ্চারিত হতে থাকে ‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক’ ধ্বনি। আল্লাহর প্রেমে মাতোয়ারা হয়ে মুমিন বান্দা ছুটে যায় হৃদয়শীতল করা কাবার পবিত্র চত্বরে। তাওয়াফ, সাঈ, জিকির ও দোয়ার মাধ্যমে আল্লাহর সঙ্গে বান্দার সম্পর্ক গভীর থেকে গভীরতর হতে থাকে। এভাবে বান্দা তার জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য ‘তায়াল্লুক মাআল্লাহ’ তথা আল্লাহর সঙ্গে নিবিড় সম্পর্কের অনন্য উচ্চতায় অধিষ্ঠিত হয়। হজ সামর্থ্যবান মুসলমানের ওপর অবশ্যপালনীয় একটি বিধান। কোরআনে বলা হয়েছে, ‘মানুষের মাঝে যারা বাইতুল্লাহ শরিফে পৌঁছার সামর্থ্য রাখে তাদের ওপর আল্লাহর জন্য হজ করা ফরজ।’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ৯৭) হজ ইসলামের পঞ্চস্তম্ভের অন্যতম। আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেন, ইসলামের স্তম্ভ হচ্ছে পাঁচটি, ১. আল্লাহ ব্যতীত প্রকৃত কোনো উপাস্য নেই এবং নিশ্চয়ই মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসুল—এ কথার সাক্ষ্য প্রদান করা, ২. নামাজ পড়া, ৩. জাকাত আদায় করা, ৪. হজ সম্পাদন করা এবং ৫. রমজানের রোজা রাখা। (সহি...