পোস্টগুলি

‘যার আমানতদারি নেই তার ইমান নেই’

  ইসলামি জীবনদর্শনে যে কয়টি চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যকে ইমানের মাপকাঠি হিসেবে ধরা হয়েছে, তার মধ্যে ‘আমানত’ বা আমানতদারি অন্যতম। এটি কেবল কারো গচ্ছিত সম্পদ ফেরত দেওয়ার নাম নয়, বরং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে অর্পিত দায়িত্ব ও কর্তব্য যথাযথভাবে পালন করার এক মহান অঙ্গীকার। আমানতদারির অভাব মানেই ইমানের অপূর্ণতা। আল্লাহর রাসুল (সা.) যখনই খুতবা দিতেন, প্রায়শই একটি কথা বলতেন, “যার আমানতদারি নেই তার ইমান নেই, আর যার অঙ্গীকারের ঠিক নেই তার ধর্ম নেই।” (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ১২৪০৬) পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা মুমিনদের সতর্ক করে বলেছেন, “হে মুমিনগণ, তোমরা জেনে-শুনে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের সঙ্গে খেয়ানত করো না এবং তোমাদের পরস্পরের আমানতসমূহেরও খেয়ানত করো না” (সুরা আনফাল, আয়াত: ২৭)। এই আয়াতের আলোকে আমানতের পরিধি যে কত বিস্তৃত, তা অনুধাবন করা জরুরি। শরীরকে ইবাদতের উপযুক্ত রাখা এবং ব্যায়াম ও সুষম খাদ্যের মাধ্যমে একে রোগমুক্ত রাখার চেষ্টা করা আমানতদারির অংশ। আমানতের বিচিত্র রূপ ও প্রকারভেদ ১. সঠিক নেতৃত্ব বাছাই:  রাষ্ট্রীয় বা সামাজিক যেকোনো প্রক্রিয়ায় নিজের প্রতিনিধি নির্বাচন করা একটি বিশাল আমানত। ব্যক্তি যখ...

জিকির: অস্থির মনের মহৌষধ

  “অলস মস্তিষ্ক শয়তানের কারখানা। এই প্রবাদটি আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে কতটা সত্য, তা আমরা অনেকেই হাড়হাড় অনুভব করি। যখনই আমাদের হাত বা মন অবসর পায়, তখনই হাজারো অনর্থক চিন্তা, অতীত নিয়ে আফসোস আর ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশা আমাদের গ্রাস করতে শুরু করে। এমনকি অনেক সময় আমরা কাজ করছি ঠিকই, কিন্তু মন পড়ে আছে অন্য কোথাও। এই দ্বিধাগ্রস্ত মন কাজের গতি যেমন কমিয়ে দেয়, তেমনি বাড়ায় মানসিক ক্লান্তি। এই অবস্থা থেকে মুক্তির উপায় কী? মন নিয়ন্ত্রণের মূলমন্ত্র ইমাম শাফেয়ি (রহ.) একটি অসাধারণ কথা বলেছেন, “তুমি যদি তোমার নফসকে হক বা নেক কাজে ব্যস্ত না রাখো, তবে সে তোমাকে বাতিল ও গুনাহের কাজে ব্যস্ত করে দেবে।”  (মানাকিবুশ শাফিঈ) শয়তানের এই প্ররোচনা থেকে বাঁচার সবচেয়ে সহজ এবং শক্তিশালী উপায় হলো—জিকির। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে সবচেয়ে বেশি যে আমলের নির্দেশ দিয়েছেন, সেটি হলো তাঁর জিকির বা স্মরণ। জিকির কেন করবেন যিকির কেবল মুখে কিছু শব্দ উচ্চারণ নয়, বরং এটি আত্মাকে পরিশুদ্ধ করার এক ঐশ্বরিক প্রক্রিয়া। এর উপকারিতা অপরিসীম: ১. অন্তরের প্রশান্তি:  আজকের অশান্ত পৃথিবীতে মানসিক শান্তি সবচেয়ে দামি বস্তু। আল্লাহ বলেন...

দান কেন পৃথিবীর এক শাশ্বত নিয়ম

  মানুষ হিসেবে আমরা যখন অন্যের জন্য ত্যাগের হাত বাড়িয়ে দিই, তখন কি আমরা স্রেফ একটি মানবিক কাজ করি, নাকি পৃথিবীর কোনো গূঢ় নিয়ম পালন করি? ‘দান’ কেবল আমরা স্কুলে বা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে শিখি না, এটি আমাদের জন্মের সঙ্গে মিশে থাকা সহজাত প্রবৃত্তি। ইসলামের ‘ফিতরাত’ থেকে শুরু করে বৌদ্ধধর্মের ‘কার্মা’ পর্যন্ত—পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি ধর্ম ও দর্শন একবাক্যে স্বীকার করে যে, ‘দান’ বা ‘বদান্যতা’ হলো এই পৃথিবীর এক অলিখিত নিয়ম। সহজাত স্বভাবের ডাক ইসলামি দর্শনে দানশীলতাকে মানুষের ‘ফিতরাত’ বা জন্মগত স্বভাব হিসেবে দেখা হয়। আল্লাহ তাআলা মানুষকে এমনভাবে সৃষ্টি করেছেন যে, তার ভেতরে দয়া ও অন্যের কল্যাণের প্রতি এক স্বাভাবিক আকর্ষণ রয়েছে। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, “আল্লাহর দেওয়া ফিতরাত (সহজাত স্বভাব), যার ওপর তিনি মানুষ সৃষ্টি করেছেন।” (সুরা রুম, আয়াত: ৩০)। একজন মুসলিম যখন সদকা করেন, তিনি কেবল তাঁর ধর্মীয় বিধান পালন করেন না, বরং তাঁর অন্তরের গহিনে থাকা সেই ‘ঐশী টান’ বা ফিতরাতকেই সাড়া দেন। ইসলামে দানকে কেবল অর্থ ব্যয় হিসেবে দেখা হয় না, বরং একে দেখা হয় আত্মিক পবিত্রতা অর্জনের মাধ্যম হিসেবে। আল্লাহ বলেন, “তাদের স...

আল-আজিজ, যিনি ইজ্জত দান করেন

  আল্লাহর ‘আল-আজিজ’ নামটি তাঁর অপরাজেয় ক্ষমতা, মহান সার্বভৌমত্ব এবং অপ্রতিরোধ্য শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশ করে। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘যে কেউ ইজ্জত কামনা করে, তবে সমস্ত ইজ্জত আল্লাহর জন্য।’ (সুরা ফাতির, আয়াত: ১০) এই নাম আমাদের শেখায়, প্রকৃত ইজ্জত একমাত্র আল্লাহর আনুগত্য ও তাঁর প্রতি সমর্পণের মাধ্যমে অর্জিত হয়। নিশ্চয়ই সমস্ত ইজ্জত আল্লাহর জন্য। সুরা ইউনুস, আয়াত: ৬৫ আল-আজিজ নামের অর্থ আল্লামা সা’দি (রহ.) ব্যাখ্যা করেছেন, ‘আল-আজিজ’ শব্দটি তিনটি মূল অর্থ বহন করে: ১. ইজ্জতুল কুওয়া:  মানে শক্তির ইজ্জত। আল্লাহর শক্তি অতুলনীয়। তাঁর ক্ষমতার সামনে সৃষ্টির কোনো শক্তি তুচ্ছ। ২. ইজ্জতুল ইমতিনা:  মানে অপ্রতিরোধ্যতার ইজ্জত। আল্লাহ স্বয়ংসম্পূর্ণ, কারও প্রয়োজন নেই। কেউ তাঁকে ক্ষতি বা উপকার করতে পারে না। তিনি ক্ষতিকারক, উপকারক, দানকারী, এবং প্রতিরোধক। ৩. ইজ্জতুল কাহর:  প্রতিটি সৃষ্টির ওপর বিজয়ের ইজ্জত। সমস্ত সৃষ্টি তাঁর কাছে নত। তাঁর ইচ্ছা ছাড়া কিছুই ঘটে না। তিনি বলেন, ‘যা তিনি চান তা হয়, আর যা তিনি চান না তা হয় না।’ (আল-বদর,  ফিকহুল আসমা , পৃ. ২৪৬) পবিত্র কোরআনে ‘আল-আজিজ’ ...

আল্লাহর নামের ওপর ইমান আনতে হয় কেন

  আল্লাহর তাওহিদ বা একত্ববাদ, তাঁর অসীম মহিমা ও পবিত্রতার স্বীকৃতি, মানুষের হৃদয়ে আলো জ্বালায়। তাওহিদের মধ্যে লুকিয়ে আছে আল্লাহর নাম ও গুণাবলির এককতা, যা আমাদের বিশ্বাসকে দৃঢ় করে এবং জীবনকে অর্থপূর্ণ করে। তাওহিদে আল্লাহর অসামান্য নাম ও গুণাবলির প্রতি ইমান আনা হয়, যা কোরআন মাজিদ ও রাসুল (সা.)-এর সুন্নাহ থেকে প্রমাণিত। এই বিশ্বাসে কোনো বিকৃতি, অস্বীকৃতি, সীমাবদ্ধতা বা সৃষ্টির সঙ্গে তুলনা নেই। আল্লাহর নাম ও গুণাবলির তাওহিদ হলো তাঁকে তাঁর প্রাপ্য সম্মানে অধিষ্ঠিত করা, তাঁর মহানুভবতার প্রতি পূর্ণ আনুগত্য প্রকাশ। একত্ববাদের ভিত্তি আল্লাহর নাম ও গুণাবলি শুধু কোরআন ও সুন্নাহর উৎস থেকেই গ্রহণ করা যায়। মানুষের কল্পনা বা ধারণা থেকে কোনো নাম বা গুণাবলি আরোপ করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। আল্লাহ বলেন, ‘তাঁর মতো কিছুই নেই, তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।’ (সুরা শুরা, আয়াত: ১১) এই আয়াত তাঁর অতুলনীয়তা ও পূর্ণতার ঘোষণা দেয়। তাওহিদের তিনটি মৌলিক ভিত্তি হলো: এই বিশ্বাসে কোনো বিকৃতি, অস্বীকৃতি, সীমাবদ্ধতা বা সৃষ্টির সঙ্গে তুলনা নেই। আল্লাহর নাম ও গুণাবলির তাওহিদ হলো তাঁকে তাঁর প্রাপ্য সম্মানে অধিষ্ঠিত করা, তাঁর ...

‘হাউসে কাউসার’ উম্মতের জন্য আল্লাহর বিশেষ নেয়ামত

  হাউসে কাউসার হলো একটি পবিত্র পানির কূপ, যার পানি অত্যন্ত বিশুদ্ধ, সুমিষ্ট ও পবিত্র। কিয়ামতের দিন এই হাউস মুমিনদের তৃষ্ণা নিবারণের উৎস হবে। যে ব্যক্তি এটি থেকে একবার পান করবে, সে আর কখনো পিপাসার্ত হবে না। এটি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর উম্মতের জন্য কিয়ামতের দিনে বিশেষ উপহার হিসেবে উপস্থাপিত হবে। সুরা কাউসারে আল্লাহ বলেন: ‘নিশ্চয় আমি আপনাকে কাউসার দান করেছি।’ (সুরা কাউসার, আয়াত: ১) তাফসির অনুসারে, ‘কাউসার’ শব্দটি বহু অর্থ বহন করে, যার মধ্যে হাউসে কাউসার, জান্নাতের একটি নদী এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর উম্মতের জন্য অফুরন্ত নেয়ামত অন্তর্ভুক্ত। যার পানি অত্যন্ত বিশুদ্ধ, সুমিষ্ট ও পবিত্র। কিয়ামতের দিন এই হাউস মুমিনদের তৃষ্ণা নিবারণের উৎস হবে। হাদিসে হাউসে কাউসার রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘আমার হাউসের দৈর্ঘ্য এক মাসের পথের সমান। এর পানি দুধের চেয়ে সাদা, সুগন্ধ মিশকের চেয়ে উত্তম এবং পাত্রগুলো আকাশের তারকার মতো। যে এটি থেকে পান করবে, সে আর কখনো পিপাসার্ত হবে না।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬,৫৮১; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২,৩০০) তিনি আরও বলেন, ‘কিছু লোক আমার হাউসের কাছে আসবে, আমি তাদের চিনব এবং তারাও আমাকে চিনবে...

ঘুমকেও কীভাবে ইবাদতে রূপান্তর করবেন

  পবিত্র কোরআনের সর্বাধিক পঠিত সুরা হলো সুরা ফাতিহা। এর আয়াতগুলো আমাদের ঠোঁটের আগায় মুখস্থ থাকে, কিন্তু আমরা কি সত্যিই এই শব্দগুলোর গভীরতা অনুভব করি? বিশেষ করে পঞ্চম আয়াতের সেই অংশটি, “আমরা কেবল তোমারই ইবাদত করি এবং কেবল তোমারই সাহায্য চাই। (সুরা ফাতিহা, আয়াত: ৫) সুরা ফাতিহার এই আয়াত ইবাদতের এক অনন্য দর্শন ব্যাখ্যা করে। ইবাদত মানে কেবল জায়নামাজে দাঁড়িয়ে থাকা নয়; বরং সঠিক নিয়ত আর অন্তরের উপস্থিতির মাধ্যমে একজন মুমিন তার জীবনের অতি সাধারণ কাজগুলোকেও মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির মাধ্যম বা ইবাদতে রূপান্তর করতে পারেন। ইবাদত মানে হলো আল্লাহর দাসত্ব বা তাঁর গোলামি করা। আমরা যখন বলি ‘ইয়্যাকা নাবুদু’, তখন আমরা স্বীকার করি যে আমাদের জীবনের প্রতিটি স্পন্দন কেবল তাঁরই জন্য। ইবাদতের মূল নির্যাস কী সৃষ্টিকর্তার যথাযথ ইবাদত করার জন্য প্রথমে ‘ইবাদত’ শব্দের প্রকৃত অর্থ বোঝা প্রয়োজন। ইবাদত মানে হলো আল্লাহর দাসত্ব বা তাঁর গোলামি করা। আমরা যখন বলি ‘ইয়্যাকা নাবুদু’ (আমরা কেবল তোমারই ইবাদত করি), তখন আমরা স্বীকার করি যে আমাদের জীবনের প্রতিটি স্পন্দন কেবল তাঁরই জন্য। ইবাদতের মূলত তিনটি স্তর রয়েছে যা আমাদের আমল...