পোস্টগুলি

দুনিয়ায় থেকেও যেভাবে পরকালের পথিক হব

  মানুষের পার্থিব জীবন যেন দুটি প্রবল স্রোতের মোহনায় দাঁড়িয়ে থাকা এক তরি। একদিকে জাগতিক জীবনের তীব্র আকর্ষণ—জীবিকা, পরিবার, শিক্ষা, পেশাগত সাফল্য ও ভবিষ্যৎ বিনির্মাণের অন্তহীন ব্যস্ততা। অন্যদিকে পরকালের অবিরাম ডাক—ইবাদত, আত্মশুদ্ধি, নৈতিক দায়বদ্ধতা ও অনন্ত জীবনের পাথেয় সংগ্রহ। প্রশ্ন হলো, এই দুই বিপরীতমুখী স্রোতের টানাপোড়েনে একজন মুমিন কীভাবে ভারসাম্য বজায় রেখে নিজের সঠিক পথটি চিনে নেবে? ইসলামে ভারসাম্যের দর্শন ইসলাম বৈরাগ্যবাদকে সমর্থন করে না; আবার পার্থিব মোহে অন্ধ হয়ে পরকালকে বিসর্জন দিতেও নিষেধ করে। বরং ইসলাম শেখায় দুনিয়াকে পরকালের পাথেয় অর্জনের মাধ্যম বা ‘শস্যক্ষেত্র’ হিসেবে গ্রহণ করতে। এখানে মানুষ যেমন বীজ বপন করবে, অনন্ত জীবনে তেমনই ফসল ঘরে তুলবে। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ–তাআলা বলেছেন, ‘আর আল্লাহ তোমাকে যা দিয়েছেন, তা দিয়ে পরকালের আবাস অনুসন্ধান করো এবং দুনিয়া থেকে তোমার অংশ ভুলে যেয়ো না।’ (সুরা কাসাস, আয়াত: ৭৭) পার্থিব জীবনের স্বরূপ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ইমাম গাজালি লিখেছেন, ‘দুনিয়া পরকালের জন্য একটি মনজিল বা সরাইখানা মাত্র; শরীর একটি বাহন এবং মানুষের যাবতীয় পার্থিব কাজকর্ম সেই বা...

বিপরীত লিঙ্গের প্রতি নিষিদ্ধ আকর্ষণ: আত্মশুদ্ধির ৩ উপায়

  তারুণ্যের অন্যতম স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য হলো প্রবল আবেগ এবং বিপরীত লিঙ্গের প্রতি মনোদৈহিক আকর্ষণ। এই সংবেদনশীল বয়সে অনেকেই ক্ষণিক মুগ্ধতা বা তীব্র জৈবিক টানকে শাশ্বত ‘ভালোবাসা’ বলে ভুল করে বসেন। কোনো যুগল যখন ইসলামের নির্ধারিত সীমারেখা অতিক্রম করে বিবাহবহির্ভূত ঘনিষ্ঠতায় জড়িয়ে পড়ে, তখন অন্তরে জন্ম নেয় তীব্র আত্মগ্লানি ও মানসিক অস্থিরতা। বিশেষ করে একজন বিশ্বাসী তরুণ বা তরুণীর মনে চরম নৈতিক টানাপোড়েন শুরু হয়—ভালোবাসার নামে এই আচরণ কি ইসলাম অনুমোদন করে? আর যদি তা ভুল হয়ে থাকে, তবে আল্লাহর কাছে পাপমুক্তির উপায় কী? ইসলাম নারী ও পুরুষের পারস্পরিক আকর্ষণকে স্বভাবজাত বিষয় হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে তাকে বৈধ বিয়ের মাধ্যমে পবিত্র পারিবারিক কাঠামোয় রূপ দেওয়ার নির্দেশ দেয়। প্রেম বনাম জৈবিক মোহ অনেকেই সঙ্গীর নৈতিক চরিত্র, মানসিক পরিপক্বতা কিংবা দীর্ঘমেয়াদি সামঞ্জস্যের বিষয়টি বিবেচনা না করে নিছক বাহ্যিক রূপ ও শারীরিক আকর্ষণের টানে ‘প্রেম’ ভাবতে শুরু করেন। আর তোমরা ব্যভিচারের কাছেও যেয়ো না; নিশ্চয়ই এটি এক মারাত্মক অশ্লীলতা এবং অত্যন্ত নিকৃষ্ট পথ। সুরা ইসরা, আয়াত: ৩২ এটি মূলত সাময়িক আবেগপ্রবণ মোহ। ইমাম ইব...

নারীর প্রতি সহানুভূতি: ইসলাম কীভাবে মূল্যায়ন করে

  সুদূর অতীত থেকে সমকালীন সমাজ পর্যন্ত নারীজাতি যে বঞ্চনা, অবমাননা ও শারীরিক-মানসিক নিপীড়নের মুখোমুখি হয়েছে, তা যেকোনো সচেতন হৃদয়কে গভীরভাবে আলোড়িত করে। এই বাস্তবতার মুখে দাঁড়িয়ে অনেক বিবেকবান মানুষের অন্তরে, বিশেষ করে নারীদের মধ্যে, স্বজাতির প্রতি এক গভীর সহমর্মিতা ও বিশেষ পক্ষাবলম্বন তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। তবে একজন ধর্মপ্রাণ বিশ্বাসীর মনে এ ক্ষেত্রে এক সূক্ষ্ম আত্মজিজ্ঞাসা দেখা দিতে পারে: নারীর বঞ্চনার কারণে তাদের প্রতি অতিরিক্ত সমবেদনা অনুভব করা কি ইসলামের দৃষ্টিতে কোনো অন্যায় পক্ষপাতিত্ব বা পাপের কারণ? পুরুষবিদ্বেষ এড়িয়ে শুধু নারীর ন্যায্য অধিকার ও সুরক্ষায় ব্যথিত হওয়াকে ইসলামি নীতিশাস্ত্র কীভাবে মূল্যায়ন করে? স্বজাতির প্রতি ভালোবাসা বা তাদের দুর্দশায় ব্যথিত হওয়া মানুষের একটি স্বাভাবিক মানবিক প্রবণতা; ইসলামে এটি নিষিদ্ধ নয়। নিষিদ্ধ আসাবিো হলো যখন কেউ সত্য ও ইনসাফ বিসর্জন দিয়ে শুধু নিজের গোষ্ঠীর পক্ষ নিয়ে অন্যের ওপর অবিচার করে। ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.) পক্ষপাতিত্ব নাকি ন্যায়ের পক্ষ ইসলামে যে পক্ষপাতিত্বকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে, পরিভাষায় তাকে বলা হয় ‘আসাবিয়া’। অর্থাৎ সত্য-মিথ্...

সুখী দাম্পত্য জীবন পেতে ইসলামের ৫ কৌশল

  রাত নয়টা। অফিস থেকে ফিরলেন। কাপড় বদলে সোফায় বসলেন। হাতে ফোন। স্ত্রীও রান্নাঘরের কাজ শেষে পাশে এসে বসল। তার হাতেও ফোন। দুজন একই ঘরে। কিন্তু কেউ কারও দিকে তাকাচ্ছে না। খাবার টেবিলেও তেমন কথা হলো না। সন্তানের স্কুল, বাজারের হিসাব, বিদ্যুৎ বিল, এটুকুই। রাতে বিছানায় শুয়ে ভাবলেন, শেষ কবে দুজনে প্রাণ খুলে গল্প করেছিলেন? কবে শেষবার কোনো কারণ ছাড়াই একসঙ্গে হেসেছিলেন? মনে পড়ল না। এভাবেই চলছে জীবন। দিন দিন সংসারের প্রতি আগ্রহ হারাচ্ছেন। বর্ণিত কাল্পনিক দৃশ্যপট যদি আপনার জীবনের সঙ্গে মিলে যায়, তাহলে জেনে রাখুন, আধুনিক সময়ে এই সমস্যা দিন দিন বেড়েই চলছে। এক ঘরে বসবাস করেও আমরা একে অপরের থেকে শতবর্ষ দূরে। আসুন, জেনে নিই কোরআন এ ব্যাপারে কী বলে। তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য থেকেই সঙ্গী সৃষ্টি করেছেন, যেন তোমরা তাদের কাছে প্রশান্তি পাও। আর তিনি তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা ও দয়া দিয়েছেন। নিশ্চয়ই এতে চিন্তাশীল সম্প্রদায়ের জন্য নিদর্শন আছে। সুরা রুম, আয়াত: ২১ কোরআনের নির্দেশনা আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘আর তাঁর নিদর্শনগুলোর মধ্যে একটি হলো, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য থেকেই সঙ্গী সৃষ্টি করেছে...

ক্যারিয়ার নির্বাচনে ইসলাম যেভাবে সাহায্য করে

  উচ্চমাধ্যমিকের গণ্ডি পেরিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশের সন্ধিক্ষণটি প্রতিটি শিক্ষার্থীর জীবনের অন্যতম সংবেদনশীল বাঁক। এই মোড়ে এসে তরুণ মনস্তত্ত্ব তীব্র অনিশ্চয়তা ও সিদ্ধান্তহীনতায় পতিত হয়। সমাজে অল্প কিছু শিক্ষার্থী হয়তো শুরু থেকেই নিজেদের লক্ষ্য সম্পর্কে নিশ্চিত থাকে; কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠের চিত্রটি বিপরীত। অভিভাবকদের আকাশচুম্বী প্রত্যাশা, সামাজিক মর্যাদার মোহ এবং নিজের সহজাত ভালোলাগার টানাপোড়েনে উচ্চশিক্ষার পাঠ্যবিষয় ও ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ার নির্বাচন কঠিন হয়ে পড়ে। ক্যারিয়ার ও বিষয় নির্বাচনের পাঁচটি মৌলিক দিক তুলে ধরা হলো। ১. ইস্তিখারার নামাজ সিদ্ধান্তহীনতার মুহূর্তে একজন মুমিনের প্রধান আত্মিক অবলম্বন হলো ‘সালাতুল ইস্তিখারা’ বা আল্লাহর কাছে কল্যাণ প্রার্থনার বিশেষ নামাজ। মহানবী (সা.) সাহাবিদের কোরআনের সুরা যেভাবে মুখস্থ করাতেন, ঠিক সেভাবেই জীবনের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ইস্তিখারা করার শিক্ষা দিতেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১১৬২) ইস্তিখারার ফলাফল প্রকাশ পায় অন্তরের গভীর প্রশান্তি, আত্মবিশ্বাস এবং বাস্তব পরিস্থিতির অনুকূল প্রবাহের মাধ্যমে। ইবনে হাজার আসকালানি উল্লেখ করেছেন, ইস্তিখারার সারকথা...

ইসলামের আলোকে প্রবীণদের প্রতি করণীয়

  মানুষ জন্মের পর শৈশব, কৈশোর ও যৌবন পার করে বার্ধক্যে উপনীত হয়। পবিত্র কোরআন মাজিদে বলা হয়েছে, ‘আল্লাহ তোমাদের সৃষ্টি করেন। অতঃপর তোমাদের মৃত্যু ঘটান। আর তোমাদের মধ্যে কেউ পৌঁছে যায় জরাগ্রস্ত বার্ধক্য বয়সে। ফলে জানার পরেও সে আর কিছুই জানবে না (অর্থাৎ জানা জিনিস ভুলে গিয়ে শিশুর মতো হয়ে যাবে)। নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বজ্ঞ ও সর্বশক্তিমান।’ (সুরা নাহল, আয়াত: ৭০) ‘তিনিই আল্লাহ, যিনি তোমাদের সৃষ্টি করেন দুর্বল অবস্থায়। অতঃপর দুর্বলতার পর শক্তি দান করেন। অতঃপর শক্তির পর দেন দুর্বলতা ও বার্ধক্য। তিনি যা চান তা–ই সৃষ্টি করেন। তিনিই সর্বজ্ঞ ও সর্বশক্তিমান।’ (সুরা রুম, আয়াত: ৫৪) শুভ্রকেশবিশিষ্ট বৃদ্ধ মুসলিমের বিশেষ মর্যাদার বিষয়ে আমর বিন শুআইব বর্ণনা করেন, ‘যদি কেউ সাদা চুলবিশিষ্ট হয়, আল্লাহ তার একটি মর্যাদা বৃদ্ধি করে দেন, পাপ মোচন করে দেন এবং একটি পুণ্য লিখে দেন।’ (মুসনাদে আহমাদ: ৬৯৩৭; আবু দাউদ: ৪২০২; ইবনু মাজাহ: ৩৭২১)। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যে মুসলিম সাদা চুলবিশিষ্ট হবে, কিয়ামতের দিন এটা তার জন্য জ্যোতি বা আলো হবে।’ (তিরমিজি: ১৬৩৪)। ‘নিশ্চয় শুভ্রচুলবিশিষ্ট মুসলিমকে সম্মান করাই আল্লাহকে সম্মা...

আল্লাহকে নবী সোলাইমান যেভাবে ভালোবাসতেন

  হজরত সোলাইমান (আ.) এমন বিস্ময়কর রাজত্বের অধিকারী ছিলেন, মানুষ ও জিন তো বটেই, অন্যান্য প্রাণীও ছিল যার অধীনস্থ। এই বিশাল সাম্রাজ্যের মাঝে ডুবে থেকেও তিনি আল্লাহকে ভুলে যাননি। রাজত্বের চেয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও জিকির ছিল তাঁর অধিক প্রিয়। আল্লাহর জন্য প্রিয় বস্তু উৎসর্গ একদিন বিকেলে তাঁর সামনে উৎকৃষ্ট ও দ্রুতগামী ঘোড়াগুলো পেশ করা হলো। সেগুলো দেখতে দেখতে সূর্য অস্তমিত হয়ে বৈকালীন নামাজের সময় পেরিয়ে গেল। তিনি উপলব্ধি করলেন, ঘোড়াগুলোর প্রতি মনোযোগ তাঁকে নামাজ থেকে গাফেল করে ফেলেছে। তিনি বললেন, ‘আমি আমার প্রতিপালকের স্মরণের তুলনায় এসব কল্যাণময় বস্তুর প্রতি বেশি ভালোবাসায় মগ্ন হয়ে পড়েছিলাম, যতক্ষণ না তা (সূর্য) আড়ালে চলে গেল।’ (সুরা সোয়াদ, আয়াত: ৩২) ঘোড়াগুলো তাঁর প্রিয় ছিল, তবু আল্লাহর ইবাদত থেকে গাফেল হওয়া তিনি মেনে নিতে পারেননি। তিনি আদেশ করলেন, ‘“এগুলো আমার কাছে ফিরিয়ে আনো।” তারপর সেগুলোর পা ও ঘাড়ে হাত বুলাতে (আঘাত করে হত্যা করতে) লাগলেন।’ (সুরা সোয়াদ, আয়াত: ৩৩) ঘটনাটি আল্লাহর ভালোবাসার একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা তুলে ধরে। দুনিয়ার বৈধ সৌন্দর্য ও প্রিয় বস্তু মানু...