পোস্টগুলি

‘আমি কোরআন অবতীর্ণ করেছি, আমিই সংরক্ষক’

  সপ্তম শতাব্দীতে মক্কায় যখন মহানবী (সা.) মহান আল্লাহর বাণী প্রচার শুরু করলেন, তখন কোরাইশ নেতারা একে স্তব্ধ করতে নানামুখী ষড়যন্ত্র ও উপহাসের আশ্রয় নিয়েছিল। তারা কেবল সত্যকে অস্বীকারই করেনি, বরং আল্লাহর নবীজির ব্যক্তিত্ব এবং তাঁর ওপর অবতীর্ণ মহাগ্রন্থ কোরআনকে নিয়ে চরম ধৃষ্টতা প্রদর্শন করেছিল। মক্কার সেই উত্তাল সময়ের প্রেক্ষাপটেই সুরা হিজরের প্রথম দিকের আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়, যেখানে একদিকে কাফেরদের বিদ্রূপের চিত্র ফুটে উঠেছে, অন্যদিকে কেয়ামত পর্যন্ত কোরআন অবিকৃত থাকার এক মহাজাগতিক সিদ্ধান্ত জানানো হয়েছে। কাফেরদের স্পর্ধা ও অবমাননাকর সম্বোধন মক্কার কাফেররা আল্লাহর রাসুল (সা.)-কে নানাভাবে উত্ত্যক্ত করত। সুরা হিজরের ৬ নম্বর আয়াতে তাদের সেই আচরণের বর্ণনা পাওয়া যায়। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তারা বলে, হে ওই ব্যক্তি, যার ওপর ‘জিকির’ (কোরআন) অবতীর্ণ হয়েছে, তুমি তো নিশ্চয়ই একজন উন্মাদ।’ (সুরা হিজর, আয়াত: ৬) এখানে লক্ষণীয় যে, তারা ‘যার ওপর কোরআন অবতীর্ণ হয়েছে’ বলে সম্বোধন করেছিল ঠিকই, কিন্তু তা বিশ্বাসের জায়গা থেকে নয়, বরং উপহাস বা ব্যঙ্গ করার ছলে। তারা বিশ্বাসই করত না যে মুহাম্মদ (সা.)-এর ওপর কোনো ...

ভালো কাজ করতে চাই, কিন্তু পারছি না

  খবর বা সামাজিক মাধ্যমের ফিড বারবার রিফ্রেশ করা হচ্ছে। গাজার আরেকটি ভিডিও। আরেকটি মৃত্যুর খবর। আপনার বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি আছে, হয়তো আরামদায়ক চাকরিও আছে, তথ্যের সহজলভ্যতাও আছে—তবুও বারবার মনে হচ্ছে, অর্থপূর্ণ কিছু করার ক্ষমতা আপনার নেই। এই নিষ্পেষক মানসিক ভারটির আরবিতে একটি নাম আছে—ইজ্‌য। ‘ইজ্‌য’কে প্রায়শই ‘অপারগতা’ বা ‘অক্ষমতা’ হিসেবে অনুবাদ করা হয়, কিন্তু এই অনুবাদগুলো এর গভীরতাকে ধরতে পারে না। এটি ‘কাস্‌ল’ বা আলস্য নয়; যখন আপনি অলস হন, তখন আপনার কিছু করার ইচ্ছা থাকে, কিন্তু মন সায় দেয় না। কিন্তু ‘ইজ্‌য’ হলো যখন আপনি কাজ করতে চান, কিন্তু ব্যক্তিগত পরিস্থিতি (যেমন: অর্থ, সময় বা সম্পদের অভাব) কিংবা বাহ্যিক সীমাবদ্ধতা (যেমন: রাজনীতি, ভৌগোলিক দূরত্ব বা পদ্ধতিগত বাধা)—যে কোনো কারণেই হোক না কেন, নিজেকে পুরোপুরি শক্তিহীন বা অসহায় মনে করেন। আপনার বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি আছে, হয়তো আরামদায়ক চাকরিও আছে, তথ্যের সহজলভ্যতাও আছে—তবুও বারবার মনে হচ্ছে, অর্থপূর্ণ কিছু করার ক্ষমতা আপনার নেই। অপরাগতা কখন দেখা দেয় এটা আমাদের দৈনন্দিন জীবনে অসংখ্য উপায়ে প্রকাশ পায়। নিম্নলিখিত পরিস্থিতিগ...

কেয়ামতের আগে পৃথিবী যেভাবে বদলে যাবে

  কেয়ামত কবে হবে, তা কেবল মহান আল্লাহই জানেন। তবে কেয়ামত আসার আগে পৃথিবীতে বেশ কিছু অস্বাভাবিক ও মহাজাগতিক পরিবর্তন দেখা দেবে, যেগুলোকে ইসলামি পরিভাষায় ‘আশরাতুস সাআ’ বা কেয়ামতের আলামত বলা হয়। ইসলামি চিন্তাবিদদের মতে, কেয়ামতের ছোট আলামতগুলোর অধিকাংশই ইতোমধ্যে প্রকাশ পেয়েছে। এখন অপেক্ষা কেবল ‘বড় আলামত’ বা মহাপ্রলয়ের চূড়ান্ত সংকেতগুলোর। নবীজিকে যখন কেয়ামত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, তখন তিনি সুনির্দিষ্ট সময়ের চেয়ে প্রস্তুতির ওপর বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি প্রশ্নকারীকে বলেছিলেন, “তুমি কেয়ামতের জন্য কী প্রস্তুতি নিয়েছ?” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৬৬৭) মূলত কেয়ামতের আলামতগুলো আলোচনার মূল উদ্দেশ্য হলো মুমিনদের ঈমানি সচেতনতা বৃদ্ধি করা এবং পরকালের পাথেয় সংগ্রহে উদ্বুদ্ধ করা। বড় আলামত বনাম ছোট আলামত কেয়ামতের আলামত মূলত দুই প্রকার। ছোট আলামতগুলো কেয়ামতের অনেক আগে থেকেই শুরু হয় এবং দীর্ঘ সময় ধরে চলে। যেমন—মহানবীর আগমন, ফেতনা বৃদ্ধি পাওয়া, অযোগ্যদের শাসনভার লাভ এবং মানুষের মধ্যে আমানতদারি কমে যাওয়া। অন্যদিকে, বড় আলামতগুলো কেয়ামতের ঠিক আগমুহূর্তে প্রকাশিত হবে। এগুলো হবে অত্যন্ত ভয়ংকর ও অলৌকিক প্রক...

সদকা শুধু ধনীদের জন্য নয়

  সাধারণ অর্থে আমরা সদকা বলতে কেবল অর্থকড়ি বা সম্পদ বিলিয়ে দেওয়াকে বুঝি। কিন্তু মহানবী (সা.) এই ধারণা আমূল বদলে দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, “প্রতিটি ভালো কাজই সদকা।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬০২১) এই কালজয়ী নির্দেশনাটি সমাজের প্রতিটি মানুষের জন্য পুণ্যের অবারিত দ্বার খুলে দিয়েছে। সদকার ব্যাপকতা হাদিস বিশারদ ইবনে বাত্তাল (র.)-এর মতে, এই হাদিসটি প্রমাণ করে, মানুষ যা কিছু ভালো কাজ করে বা বলে, তার প্রতিটিই তার আমলনামায় সদকা হিসেবে লিপিবদ্ধ হয়।  হাদিসের ভাষায় এই ভালো কাজকে বলা হয়েছে ‘মারুফ’। ইমাম রাগেব আল-ইসফাহানির মতে, শরিয়ত ও বিবেক যে কাজটিকে সুন্দর বলে সাব্যস্ত করে, তা-ই ‘মারুফ’।  অন্যদিকে ইবনে আবি জামরা (র.) মনে করেন, শরিয়তের দৃষ্টিতে যা কিছু পুণ্যময় কাজ হিসেবে স্বীকৃত, তার ওপরই ‘মারুফ’ শব্দটি প্রয়োগ করা হয়। (ইবনে হাজার আসকালানি,  ফাতহুল বারি,  ১০/৪৩৮, দারুল মা’রিফাহ, বৈরুত, ১৩৭৯ হিজরি)। এখানে ‘সদকা’ বলতে মূলত সওয়াব বা পরকালীন প্রতিদানকে বোঝানো হয়েছে। যদি এর সাথে সঠিক নিয়ত যুক্ত থাকে, তবে সেই প্রতিদান নিশ্চিত। সদকা কি শুধু ধনীদের জন্য ইসলামে সদকা কোনো নির্দিষ্ট শ্রেণির জ...

‘নিশ্চয়ই আমার জমিন প্রশস্ত’

  ইবরাহিম (আ.) তাঁর কওমকে একত্ববাদের পথে ডাকার জন্য সম্ভাব্য সব পথ ও পদ্ধতি অবলম্বন করেছিলেন। তিনি তাঁদের সঙ্গে সর্বোত্তম পন্থায় বিতর্ক করেছেন, যুক্তি দিয়েছেন এবং মূর্তিপূজার অসারতা প্রমাণ করেছেন। কিন্তু দীর্ঘ প্রচেষ্টার পরও তাঁদের হৃদয়ে বিশ্বাসের আলো জ্বলেনি। এমনকি যখন সমগ্র কওম কাঠ সংগ্রহ করে বিশাল অগ্নিকুণ্ড তৈরি করল এবং তাঁকে তাতে নিক্ষেপ করল। তাঁরা চাক্ষুষ দেখল, দাউ দাউ করে জ্বলা আগুন তাঁর কোনো ক্ষতিই করতে পারল না। কিন্তু এই চাক্ষুষ মোজেজাও তাঁদের অন্ধত্বের আবরণ সরাতে পারেনি।  মহাপ্রস্থানের কঠিন সিদ্ধান্ত যখন দাওয়াতের সব পথ রুদ্ধ হয়ে গেল এবং কওমের হেদায়েতের ব্যাপারে চরম হতাশা তৈরি হলো, তখন তিনি নিজের জন্মভূমি ত্যাগ করার কঠিন সিদ্ধান্ত নিলেন।পবিত্র কোরআনে তাঁর সেই ঘোষণার কথা এভাবে এসেছে, “তিনি বললেন, আমি আমার রবের উদ্দেশ্যে হিজরত করছি।” (সুরা আনকাবুত, আয়াত: ২৬) ইমাম ফখরুদ্দিন রাজি এই হিজরতের যৌক্তিকতা বিশ্লেষণ করে লিখেছেন, যখন একজন পথপ্রদর্শক তাঁর কওমকে সঠিক পথ দেখানোর জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করেন এবং তারা তাতে কোনো ভ্রূক্ষেপ করে না, তখন সেখানে অবস্থান করা বরং ক্ষতির কারণ হয়...

নবীজির ওপর যেভাবে ওহি নাজিল হত

  মক্কার অস্বীকারকারীরা প্রশ্ন তুলেছিল, কেন পুরো কোরআন একসঙ্গে নাজিল হলো না? আল্লাহ-তাআলা এর উত্তর দিয়েছেন এভাবে, “যাতে আমি এর মাধ্যমে তোমার অন্তরকে মজবুত করি এবং আমি তা স্পষ্টভাবে ক্রমে ক্রমে পাঠ করেছি।” (সুরা ফুরকান, আয়াত: ৩২) ২৩ বছর ধরে মানবজাতির পথপ্রদর্শক হিসেবে এই মহাগ্রন্থের অবতরণ প্রক্রিয়া ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ওহির তীব্রতা ওহি নাজিলের সময় নবীজিকে এক কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হতো। আয়েশা (রা.) বলেন, হারিস ইবনে হিশাম যখন নবীজিকে ওহি আসার পদ্ধতি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন, তিনি উত্তর দিলেন, “কখনো তা ঘণ্টার আওয়াজের মতো আমার কাছে আসে, আর এটিই আমার জন্য সবচেয়ে কঠিন হয়। এরপর যখন সেই অবস্থা শেষ হয়, তখন যা বলা হয়েছে তা আমি আত্মস্থ করে ফেলি। আবার কখনো ফেরেশতা মানুষের রূপ ধরে আমার সঙ্গে কথা বলেন।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২) আয়েশা (রা.) আরো বলেন, হাড়কাঁপানো শীতের দিনেও ওহি নাজিল শেষ হলে নবীজির কপাল থেকে ঘাম ঝরতে দেখা যেত। শুরুতে নবীজি (সা.) ওহি ভুলে যাওয়ার আশঙ্কায় দ্রুত জিহ্বা নাড়াতেন। তখন আল্লাহ-তাআলা অভয় দিয়ে আয়াত নাজিল করলেন, “তাড়াতাড়ি আয়ত্ত করার জন্য আপনি ওহি চলাকালে আপনার জিহ্বা...

তাড়াহুড়োর মনস্তত্ত্ব: কোরআন কী বলে

  প্রজেক্ট জমা দিলেন, বসের রিভিউ আসছে না বলে অস্থির লাগছে। পরীক্ষা দিলেন, ফল প্রকাশে দেরি হওয়ায় ঘুম নেই।  স্টার্টআপে বিনিয়োগ করলেন, ছয় মাসেও রিটার্ন নেই বলে মাথায় চাপ। মার্কেটিং ক্যাম্পেইন চালালেন, এক সপ্তাহেও বিক্রি বাড়েনি বলে হতাশা। এই যে ‘এখনই ফলাফল চাই’—এমন মানসিকতা আমাদের সবার মধ্যেই আছে। প্রশ্ন হলো, এটি সামলাব কীভাবে? পবিত্র কোরআন এ প্রশ্নের চমৎকার সমাধান দিয়েছে। ‘মানুষ তাড়াহুড়োপ্রিয়’ সুরা আম্বিয়ায় আল্লাহ বলছেন, ‘মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে তাড়াহুড়ো দিয়ে।’ (সুরা আম্বিয়া, আয়াত: ৩৭) লক্ষ্য করুন, আল্লাহ বলছেন না যে তাড়াহুড়ো করা গুনাহের কাজ; বরং বলছেন—এটি মানুষের স্বভাব। ইমাম ইবনে কাসির এই আয়াতের ব্যাখ্যায় লিখেছেন যে মানুষের সহজাত প্রকৃতিতেই তাড়াহুড়ো রয়েছে। সে দ্রুত ফলাফল চায়। এটি তার সৃষ্টিগত বৈশিষ্ট্য, দোষ নয়। (তাফসির আল-কুররআন আল-আজিম, বৈরুত: দারুল কুতুব আল-ইলমিয়্যাহ, ২০০০, ৩/১৭৪) সুরা ইসরায় আল্লাহ আরও স্পষ্ট করে বলেছেন, ‘মানুষ তো তাড়াহুড়োকারী।’ (সুরা ইসরা, আয়াত: ১১) সমস্যা তাড়াহুড়োয় নয় তাড়াহুড়ো স্বাভাবিক, কিন্তু এটি যখন আমাদের নিয়ন্ত্রণ করে ফেলে—তখনই বিপদ। ইমাম কুরতুবি বলে...