পোস্টগুলি

আশুরার রোজা পালনের সুন্নাহ পদ্ধতি

  ইসলামি বর্ষপঞ্জির প্রথম মাস মহররম। এটি ইসলামের চারটি সম্মানিত মাসের অন্যতম। এ মাসের দশম দিন ‘আশুরা’ নামে পরিচিত। ইসলামের ইতিহাসে এদিনের গুরুত্ব অত্যন্ত গভীর। এদিনকে কেন্দ্র করে রয়েছে নবী-রাসুলদের জীবনের নানা স্মরণীয় ঘটনা, তওবা কবুলের দৃষ্টান্ত এবং আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহের নিদর্শন। তাই এদিনের আমল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আশুরার একটি বিশেষ আমল হলো রোজা পালন করা। রাসুল (সা.) এ আমলের প্রতি বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছেন এবং এর গুরুত্বপূর্ণ ফজিলতের কথা বর্ণনা করেছেন। মহররম মাসের বিশেষ মর্যাদা আশুরার রোজার গুরুত্ব বুঝতে হলে মহররম মাসের মর্যাদা জানা প্রয়োজন। হাদিসে এ মাসকে ‘শাহরুল্লাহ’ বা ‘আল্লাহর মাস’ বলে অভিহিত করা হয়েছে, যা এ মাসের বিশেষ মর্যাদার প্রমাণ। রাসুল (সা.) বলেন, ‘রমজানের পর সর্বোত্তম রোজা হলো আল্লাহর মাস মহররমের রোজা।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১১৬৩) আশুরার রোজা মহররম মাসের ইবাদতের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এ ছাড়া এ মাসে বেশি বেশি নফল রোজা, তওবা, ইস্তিগফার ও নেক আমল করা মুমিনের জন্য অত্যন্ত কল্যাণকর। আশুরার রোজার বিধান ইসলামের প্রাথমিক যুগে আশুরার রোজা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে পালন করা হ...

মুসলিম সভ্যতায় গ্রন্থাগার ও আরকাইভাল সংস্কৃতি

  মধ্যযুগীয় আরবি সাহিত্যে একটি প্রবাদ বহুল প্রচলিত ছিল, ‘বই লেখা হয় কায়রোতে, অনুলিপি করা হয় বৈরুতে, আর পাঠ করা হয় বাগদাদে।’ এই প্রবাদ স্রেফ কথার কথা ছিল না; এটি ছিল ইসলামি সভ্যতার বিস্তৃত ভৌগোলিক পরিমণ্ডলে গড়ে ওঠা গ্রন্থাগার সংস্কৃতির এক জীবন্ত খতিয়ান। হিজরি নবম শতকের বিশ্বকোষ লেখক শিহাবুদ্দিন আল-কালকাশান্দি তিনটি রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী খিলাফতের গ্রন্থাগার সংস্কৃতির তুলনা করেছিলেন—বাগদাদের আব্বাসীয় বায়তুল হিকমাহ, কায়রোর ফাতেমীয় রাজকীয় গ্রন্থাগার এবং কর্দোবার উমাইয়া গ্রন্থাগার। এই তিনটিকেই তিনি মুসলিম বিশ্বের সর্ববৃহৎ ও সর্বাধিক রাজকীয় ‘খিজানাতুল কুতুব’ (বইয়ের ভান্ডার) বলে উল্লেখ করেছেন। (কালকাশান্দি, সুবহুল আশা ফী সিনাআতিল ইনশা , খণ্ড: ১৪, দারুল কুতুবিল মিসরিয়্যাহ, কায়রো, ১৯১৩–১৯২২ খ্রি.) মুসলিম সভ্যতায় গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠা শুধু যে রাজকীয় শৌখিনতা ছিল, তা নয়; বরং এটি খেলাফতের সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় বৈধতা প্রদর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে উঠেছিল। যে শাসকের গ্রন্থাগার যত সমৃদ্ধ, মুসলিম বিশ্বে তাঁর মর্যাদাও তত উচ্চ বলে গণ্য হতো। কর্দোবার অভিজাতদের অনুসরণে সাধারণ...

সময়ে বরকত পেতে মুমিনের ৫ অভ্যাস

  ইসলাম মানুষের দৈনিক রুটিন ও কর্মদক্ষতা বৃদ্ধির এক নিখুঁত মনস্তাত্ত্বিক নির্দেশনা দিয়েছে। দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের সুনির্দিষ্ট সময়সূচি এবং সকালের সোনালি সময়কে কাজে লাগানোর মাধ্যমেই একজন মানুষ তার জাগতিক ও আধ্যাত্মিক জীবনে সর্বোচ্চ সফল হতে পারে। ইসলামি শরিয়তের আলোকে সময় ব্যবস্থাপনার এমন পাঁচটি মূল নিয়ম নিচে আলোচনা করা হলো। ১. ফজর-পরবর্তী বরকত কাজে লাগানো ইসলামে সকালের প্রথম প্রহরকে দিনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং উৎপাদনশীল সময় হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। ফজর থেকে সূর্যোদয় পর্যন্ত সময়টুকু হলো রিজিক ও বরকত বণ্টনের সময়। এ সময়ে ঘুমিয়ে থাকা অলসতার লক্ষণ এবং এটি মানুষের মেধা ও কর্মক্ষমতা কমিয়ে দেয়। (ইমাম ইবনুল কাইয়িম আল-জাওজিয়্যাহ, আল-ফাওয়াইদ, /১/৬৮, দারুল কুতুব আল-ইলমিয়্যাহ, বৈরুত, ১৯৭৩) রাসুল (সা.) উম্মতের সকালের সময়ের জন্য বিশেষ দোয়া করে বলেছেন, ‘হে আল্লাহ, আপনি আমার উম্মতের জন্য তার সকালের সময়ে বরকত দান করুন।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ১২১২) ২. নামাজকে রুটিনের মূল কাঠামো বানানো অধিকাংশ মানুষ সময়ের পেছনে দৌড়ায়, কিন্তু মুমিন তার সময়কে সাজায় পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের সময়সূচি অনুযায়ী, যা চমৎকার একটি ...

প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় ইসলামের ৫ বিধান

  জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশ দূষণ বর্তমান বিশ্বের অন্যতম সবচেয়ে বড় সংকট। ইসলামে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করাকে মানুষের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব বা পৃথিবীতে ঐশী প্রতিনিধিত্বের (খিলাফত) অংশ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। পরিবেশ ও প্রকৃতি সুরক্ষায় ইসলামের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পাঁচটি নির্দেশনা এবং এর একাডেমিক বিশ্লেষণ তুলে ধরা হলো। ১. বৃক্ষরোপণ সদকায়ে জারিয়া ইসলামে গাছ লাগানো, বনায়ন করা এবং তার যত্ন নেওয়াকে সাধারণ কোনো সামাজিক কাজ নয়, বরং আমৃত্যু সওয়াব পাওয়ার মাধ্যম বা ‘সদকায়ে জারিয়া’ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। যদি কেয়ামত সংঘটিত হওয়ার মুহূর্তটিও এসে উপস্থিত হয় এবং তোমাদের কারও হাতে একটি গাছের চারা থাকে, তবে সে যেন তা রোপণ করে দেয়। মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ১২৯০২ বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে উৎপাদিত ফল, অক্সিজেন বা ছায়া থেকে মানুষ, পশুপাখি বা কীটপ্রত্যঙ্গ যা-ই উপকৃত হবে, তার সওয়াব রোপণকারীর আমলনামায় সদকা হিসেবে যুক্ত হতে থাকবে। (ইবনে হাজার আসকালানি, ফাতহুল বারি, ৫/৪, দারুল মা’রিফা, বৈরুত, ১৩৭৯ হিজরি) মহানবী (সা.) এ বিষয়ে কতটা জোর দিয়েছেন, তা তাঁর একটি যুগান্তকারী হাদিস থেকে স্পষ্ট হয়। তিনি ...

ইসলামে বিনোদন: রূপরেখা ও নীতিমালা (২)

  বিনোদনের সব উপায়কে যেমন ইসলাম নিষিদ্ধ করেনি, তেমনি সবগুলোকে আবার শর্তহীন বৈধও করে দেয়নি। এ ক্ষেত্রে ইসলাম একটি ভারসাম্যপূর্ণ পথ তৈরি করেছে; যা মানুষের জীবন, সমাজ, সময় ও কল্যাণের জন্য সবচেয়ে বেশি উপযোগী। বিনোদনের ক্ষেত্রে ইসলামের এমনই কিছু মূলনীতি নিচে আলোচনা করা হলো: বিনোদনে পাপের মিশ্রণ না ঘটানো সব ঐশী ধর্ম ও আসমানি কিতাবে শিরক হলো মহাপাপ। এ জন্য এটা পরিহার ছাড়া কোনো বৈধ বিনোদন সম্ভব নয়। এ ক্ষেত্রে কোরআনের শাশ্বত ঘোষণা হলো, ‘নিশ্চয় আল্লাহ তাঁর সঙ্গে শরিক করা ক্ষমা করবেন না। এটা ছাড়া অন্য সব পাপ যাকে ইচ্ছে মাফ করবেন এবং যে আল্লাহর সঙ্গে শরিক করল, সে এক মহাপাপ রচনা করল।’ (সুরা নিসা, আয়াত: ৪৮) এ ছাড়া বিনোদনের ক্ষেত্রে অন্যান্য কবিরা গুনাহ এড়িয়ে চলা জরুরি। না হলে সেটা বিনোদন না, বরং হয়ে উঠবে আল্লাহর বিরুদ্ধাচরণ। আল্লাহ বলেন, ‘যদি তোমরা নিষিদ্ধ বড় পাপ (কবিরা গুনাহ) হতে বিরত থাক, তাহলে আমি তোমাদের ছোট পাপগুলো ক্ষমা করে দেব এবং তোমাদের এক মহামর্যাদার স্থানে প্রবেশ করাব।’ (সুরা নিসা, আয়াত: ৩১) তোমরা তোমাদের মায়েদের পেটে ভ্রূণ অবস্থায় ছিলে। কাজেই নিজেদের খুব পবিত্র মনে কোরো না। কে তাকওয়া...

কন্যাসন্তান: ইসলাম যা বদলে দিয়েছে

 আরবের জাহেলি সমাজে কন্যাসন্তানের জন্ম ছিল লজ্জার বিষয়। কোরআন সেই মানসিকতার ছবি এঁকেছে তীক্ষ্ণভাবে—‘তাদের কাউকে যখন কন্যাসন্তানের সুসংবাদ দেওয়া হয়, তখন তার মুখ কালো হয়ে যায় এবং সে অসহ্য যন্ত্রণায় ভোগে।’ (সুরা নাহল, আয়াত: ৫৮) শুধু মানসিকতার বর্ণনা নয়, সেই সমাজে শিশুকন্যাকে জীবন্ত মাটিচাপা দেওয়ার প্রথাও ছিল। ইসলাম এই প্রথার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল সরাসরি আইনি ও নৈতিক অবস্থান নিয়ে। সেই ইতিহাস থেকে দেড় হাজার বছর পরেও পৃথিবীর নানা প্রান্তে কন্যাসন্তানকে বোঝা মনে করার মানসিকতা টিকে আছে। তাই প্রশ্নটা এখনো প্রাসঙ্গিক—ইসলাম কন্যাসন্তানের জন্য আসলে কী নিশ্চিত করেছিল? ১. জীবনের অধিকার সবচেয়ে মৌলিক প্রশ্ন থেকে শুরু করা যাক। কোরআন জাহেলি যুগের শিশুহত্যার প্রসঙ্গ তুলেছে কেয়ামতের বিচারের ভাষায়, ‘আর যখন জীবন্ত সমাহিত কন্যাকে জিজ্ঞাসা করা হবে, কী অপরাধে তাকে হত্যা করা হয়েছিল?’ (সুরা তাকভির, আয়াত: ৮-৯) ইমাম কুরতুবি তাঁর তাফসিরে লিখেছেন, এই আয়াতে প্রশ্নটা হত্যাকারীকে নয়, নিহতকে করা হয়েছে—যা অপরাধীর বিচারের চেয়েও তীব্র একটি বয়ান। (কুরতুবি, আল-জামি লি-আহকামিল কুরআন, ১০/০২, কায়রো) ২....

‘পিতা’ শব্দের ব্যবহার কোরআনে যেভাবে হয়েছে

  সন্তানের লালনপালনে নানা ত্যাগ ও কষ্ট-তিতিক্ষা থাকা সত্ত্বেও পিতৃত্ব আল্লাহর এক অনন্য অনুগ্রহ ও উপহার। তাই তো পবিত্র কোরআনে বর্ণিত নেককার বান্দাদের অন্যতম দোয়া হলো, ‘হে আমাদের পালনকর্তা, আমাদের স্ত্রীদের পক্ষ থেকে এবং আমাদের সন্তানের পক্ষ থেকে আমাদের জন্য চোখের শীতলতা দান করো।’ (সুরা ফুরকান, আয়াত: ৭৪) নিচে পবিত্র কোরআনের আলোকে পিতৃত্বের স্বরূপ, এর বৈশিষ্ট্য এবং একজন আদর্শ পিতার কোরআনি দৃষ্টান্ত তুলে ধরা হলো: পিতৃত্বের ধারণা ও ভাষাগত ব্যবহার ১. শাব্দিক অর্থ: ‘পিতা’ শব্দের আরবি প্রতিশব্দ হলো ‘আল-আব’। আরবি ভাষায় শব্দটির মূল উৎস মূলত দুটি অর্থে ব্যবহৃত হয় এক. কোনো কিছুর জন্য প্রস্তুত হওয়া বা সংকল্প করা, দুই. স্বদেশের প্রতি টান বা ব্যাকুলতা। লিসানুল আরব অভিধানে বলা হয়েছে, ‘উবুয়াহ’ বা পিতৃত্ব শব্দটি ‘আবা’ ধাতু থেকে আসতে পারে; যার অর্থ হলো কোনো কিছু গ্রহণে অস্বীকৃতি বা আত্মমর্যাদাবোধ। এই শাব্দিক বিশ্লেষণ থেকে বোঝা যায় ইসলামে বাবার ভূমিকার মধ্যে দুটি দিক রয়েছে; সন্তানকে সামাজিক ও আদর্শিক যত্নে গড়ে তোলার জন্য সদা প্রস্তুত থাকা ও সংকল্পবদ্ধ হওয়া। সন্তানকে সব ধরনের বিপদ-আপদ থেকে আগল...