পোস্টগুলি

কায়লুলা: দুপুরে প্রশান্তির সুন্নাহ আমল

  ফজরে উঠে একটানা কাজ, পড়াশোনা বা সংসারের দায়িত্ব সামলানোর পর বেলা দুইটা কিংবা তিনটার দিকে শরীর যেন আর চলতেই চায় না। শরীর ও ব্রেন—দুটোই তখন বিশ্রাম চায়। এমন সময় আমরা অনেকেই ভাবি, এক কাপ কড়া চা বা কফিই বুঝি এই ক্লান্তি দূর করার সবচেয়ে ভালো উপায়। অথচ আমাদের প্রিয় রাসুল (সা.) এই পরিশ্রান্ত ভাব কাটানোর এমন একটি সহজ, স্বাস্থ্যকর ও প্রশান্তিকর অভ্যাস শিখিয়ে গেছেন, যা শরীরকে সতেজ করার পাশাপাশি ইবাদতের শক্তিও জোগায়। আরবিতে এই অভ্যাসের নাম কায়লুলা। কায়লুলা মানে কী আরবি ‘কায়লুলা’ শব্দের অর্থ হলো দুপুরের দিকে কিছু সময়ের জন্য বিশ্রাম নেওয়া। অর্থাৎ কায়লুলা মানে দুপুরবেলার অল্প সময়ের বিশ্রাম বা হালকা ঘুম। দুপুরের কাজের ফাঁকে শরীর ও মনকে সতেজ করার জন্য মাত্র ১৫ থেকে ৩০ মিনিটের একখণ্ড বিশ্রাম বা হালকা ঘুমই হচ্ছে কায়লুলা। একে আমরা অনেকে ভাতঘুম বলে থাকি। তবে এটি শুধু ঘুমের নাম নয়; বরং শরীরকে আরাম দেওয়া ও শক্তি ফিরে পাওয়ার উদ্দেশ্যে স্বল্প সময়ের বিশ্রামও এর অন্তর্ভুক্ত। তাই ঘুম না এলেও কিছুক্ষণ শান্ত হয়ে চোখ বন্ধ করে শুয়ে থাকলেও কায়লুলার উদ্দেশ্য পূরণ হবে। কায়লুলা কেন জরুরি কায়লুলা সবার জন্যই উপকারী ...

বিপদ কি আল্লাহর দেওয়া দুনিয়ার শাস্তি

  আমাদের জীবনে কখনো কখনো এমন অনাকাঙ্ক্ষিত বিপদ–মুসিবত ও একাকিত্ব আসে, বাহ্যিকভাবে যেখান থেকে বের হওয়ার আর কোনো উপায় চোখে পড়ে না। তখন স্বাভাবিকভাবেই আমাদের মনে প্রশ্ন জাগে, আল্লাহ কি আমার ওপর অসন্তুষ্ট? এই দ্বিধাগ্রস্ততার সুযোগ নিয়ে শয়তান মানসিকভাবে প্রবঞ্চনা দেয় যে এই বিপদ শুধুই আল্লাহর গজব বা অসন্তুষ্টির ফল। আর এর চূড়ান্ত পরিণতি হিসেবে তীব্র হতাশা আমাদের গ্রাস করে ফেলে। কখনো কখনো এই হতাশার দরুন আমরা আল্লাহর পথ থেকে অনেক দূরে সরে যাই। প্রশ্ন হচ্ছে, সত্যিই কি বিপদ–মুসিবত কিংবা একাকিত্ব বান্দার জন্য শাস্তি? ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে এই প্রশ্নের কোনো একক বা সুনির্দিষ্ট উত্তর নেই। আমাদের পক্ষে কোনো দিনই নিশ্চিত করে জানা সম্ভব নয়, আল্লাহ কেন এই নির্দিষ্ট বিপদটি পাঠিয়েছেন; কারণ এর প্রকৃত হেকমত একমাত্র তিনিই জানেন। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহর অনুমতি ছাড়া কোনো বিপদই আপতিত হয় না।’ (সুরা আত-তাগাবুন, আয়াত: ১১)। এ প্রসঙ্গে কালজয়ী চিন্তাবিদ ইমাম ইবনুল কাইয়িম (রহ.) চমৎকার একটি মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, একই বিপদ বা কষ্ট একজনের জন্য রহমত হতে পারে, আবার অন্যজনের জন্য শাস্তি হ...

ইসলামে শিশুর মাতৃদুগ্ধ পানের বিধান

  মহান আল্লাহ–তাআলা পরম করুণাময়, অতি দয়ালু। আল্লাহ মানুষ সৃষ্টি করার আগেই তার রিজিক তৈরি করে রেখেছেন। অনাগত সন্তানের জন্য তার ভূমিষ্ঠ হওয়ার আগেই মাতৃস্তনে শিশুর জন্য অনন্য শ্রেষ্ঠ খাবার ও পানীয় হিসেবে দুধ সৃষ্টি করে রেখেছেন। মানবসন্তান জন্মের পর মাতৃদুগ্ধই তার প্রথম সুপেয় পানীয় ও নিরাপদ খাদ্য, যা শিশুর স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত উপকারী। আল্লাহ–তাআলা নবজাতককে মায়ের বুকের দুধ পানের নির্দেশনা প্রদান করেছেন এবং শিশুকে মাতৃদুগ্ধ পান করানোর সময়সীমা সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে সুনির্দিষ্টভাবে বলেছেন, ‘যে স্তন্যপানকাল পূর্ণ করতে চায়, তার জন্য জননীরা তাদের সন্তানদের পূর্ণ দুই বছর দুধপান করাবে।’ (সুরা-২ বাকারা, আয়াত: ২৩৩) ‘আমি তো মানুষকে তার পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণের নির্দেশ দিয়েছি। জননী সন্তানকে কষ্টের পর কষ্ট সহ্য করে গর্ভধারণ করে এবং তার দুধ ছাড়ানো হয় দুই বছরে।’ (সুরা-৩১ লুকমান, আয়াত: ১৪) শিশুর জন্মের পর তাকে মায়ের বুকের শালদুধ দিতে হবে এবং ছয় মাস বয়স পর্যন্ত মাতৃদুগ্ধই শিশুর একমাত্র খাবার ও পানীয় হিসেবে যথেষ্ট। মাতৃদুগ্ধ এমন একটি সুষম খাদ্য, যার কোনো বিকল্প নেই। শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ালে মায়ের স...

আল্লাহকে যেভাবে ডাকলে তিনি সাড়া দেন

  দোয়া করতে বসেছেন। ভাবছেন আল্লাহর অসংখ্য নামের মধ্যে কোন নামে তাঁকে ডাকবেন, কোন নামের তাৎপর্যই–বা কী। মনের ভেতরে অনেক কথা জমে আছে—বলতে চান, কিন্তু কোন নামে ডাকলে আল্লাহ বেশি খুশি হবেন, বুঝতে পারছেন না। আল্লাহ এ সমস্যারও সমাধান দিয়ে রেখেছেন। তিনি নিজেই বলে দিয়েছেন কীভাবে তাঁকে ডাকতে হবে, কখন কোন নামে ডাকতে হয়। সেই নামগুলো জানলে দোয়া আর কঠিন মনে হবে না। গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষ যখন কাউকে নাম ধরে ডাকে তখন সেই সম্পর্ক অনেক বেশি ব্যক্তিগত ও গভীর হয়। নাম ধরে ডাকা মস্তিষ্কে এমন একটি সংযোগ তৈরি করে, যা সাধারণ যোগাযোগের চেয়ে অনেক বেশি প্রভাবশালী। (Carmody, D. P. & Lewis, M., 2006, Brain Research, 1116/1, এলসেভিয়ার, আয়ারল্যান্ড) কোরআনে নাম ধরে ডাকার নির্দেশনা আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘আর আল্লাহর জন্য রয়েছে সুন্দর নামসমূহ, সুতরাং সেই নামগুলো দিয়েই তাঁকে ডাকো।’ (সুরা আরাফ, আয়াত: ১৮০) মানে আল্লাহর নাম নিয়ে ডাকতে তিনিই বলেছেন। আল্লাহর প্রতিটি নামের মধ্যে নিহিত আছে এক গভীর তাৎপর্যপূর্ণ অর্থ। আর সেই অর্থের উপলব্ধি নিয়ে যখন তাঁকে নাম ধরে ডাকা হয়, তখন সেই ডাক আর সাধারণ থাকে না। হৃদয়ে...

কথায় কথায় বংশের গৌরব: কী বলে কোরআন

  সমাজে প্রায়ই দেখা যায়, অনেকে নিজের চরিত্র, যোগ্যতা কিংবা কর্মস্পৃহা বাড়াতে আগ্রহী নন, কিন্তু তাঁর পরিবার কতটা সম্ভ্রান্ত ছিল কিংবা পূর্বপুরুষের সমাজে কী প্রতিপত্তি ছিল—সেটি নিয়ে গর্বের শেষ নেই। ব্যক্তিমানুষের এই অহংকার শুধু সামাজিক জীবনেই নয়, ধর্মীয় ও পারিবারিক চিন্তাতেও এক বড় ধরনের স্থবিরতা তৈরি করে। মানুষ যখন মনে করতে শুরু করে যে তার রক্তে কোনো মহান ব্যক্তির ধারা বইছে বলেই সে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পার পেয়ে যাবে বা মর্যাদাবান হবে, তখনই তার নৈতিক ও আত্মিক অবক্ষয় শুরু হয়। ইসলামি জীবনদর্শনে ব্যক্তির এই মানসিকতাকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে ঘোষণা করা হয়েছে। কোরআন মানবজাতিকে শিখিয়েছে যে, প্রতিটি মানুষকে তার নিজের কাজের জন্যই জবাবদিহি করতে হবে; অন্যের সাফল্য দিয়ে নিজের আমলনামা ভারী করা যায় না। সুরা বাকারার ১৩৪ নম্বর আয়াতে আল্লাহ–তাআলা এই শাশ্বত নিয়মকে এক অনন্য ও কালজয়ী বাক্যে ফুটিয়ে তুলেছেন। যদি কেউ মহৎ বংশের পাশাপাশি সত্যের প্রতি পূর্ণ আনুগত্য রাখে, তবে তা নিশ্চয়ই প্রশংসনীয়। কিন্তু যদি সে শুধু বংশের দোহাই দেয় এবং ন্যায়নীতি বিসর্জন দেয়, তবে সেই বংশপরিচয় আল্লাহর বিচারে কোনো মূল্য বহন করে না। ঐতিহ...

পিতার শেকলে বন্দী দুই মুসলিম ভাইয়ের লড়াই

ছবি
  মক্কার কোরাইশ নেতা সোহাইল ইবনে আমরের ঘরটি আর সব ঘরের মতো সাধারণ সংসার ছিল না; ছিল নবুয়তের প্রথম যুগে পুরো মক্কার সামাজিক সংঘাতের এক খুদে প্রতিচ্ছবি। সোহাইল ইবনে আমর ছিলেন মক্কার শ্রেষ্ঠ বক্তা, প্রজ্ঞাবান বিচারক ও সামাজিক ক্ষমতার প্রতাপশালী প্রতীক। তাঁর দুই তরুণ সন্তান আবদুল্লাহ ইবনে সোহাইল ও আবু জান্দাল। দুই ভাই মুসলমান হলে ঘরে শুরু হলো মনস্তাত্ত্বিক ও ইমানি দ্বন্দ্ব। একদিকে পিতা ও গোত্রের দীর্ঘদিনের লালিত ঐতিহ্য, অন্যদিকে হৃদয়ের গহীনে জেগে ওঠা আসমানি বিশ্বাসের পরম সত্য। পরবর্তী জীবনে আবদুল্লাহ বদরের যুদ্ধে মুসলিমদের পক্ষে অংশ নেন, ইয়ামামার যুদ্ধে শহীদ হন। আর আবু জান্দাল হন হোদাইবিয়ার ঐতিহাসিক চরিত্র। যুদ্ধক্ষেত্রে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আবদুল্লাহ পুরো বদলে যান এবং চরম এক সাহসী পদক্ষেপ নেন। যেন তিনি এই অপেক্ষাতেই ছিলেন এতদিন। তিনি পিতার বাহিনী ত্যাগ করে এক লহমায় মুসলিম বাহিনীতে যোগ দেন। আবদুল্লাহ ইবনে সোহাইল বড় ভাই আবদুল্লাহ সত্যের আহ্বানে সাড়া দিতে একেবারেই দেরি করেননি। যেহেতু তাঁর পিতা সোহাইল ইবনে আমর ছিলেন মক্কার সামাজিক প্রভাবের এক মূর্তিমান প্রতিষ্ঠান, তাই আবদুল্লাহ যখন ইসলাম গ্র...

নবীজি কতটা পুণ্যের আকাঙ্ক্ষা করতেন

  মরুভূমির উত্তপ্ত বাতাসে উড়ছে ধুলোর রেণু। প্রখর রোদের তাপে ধূসর বালু যেন জ্বলন্ত অঙ্গার। এই পথ ধরে হেঁটে চলেছে ৩১৩ জনের একটি ছোট্ট কাফেলা। গন্তব্য বদরের প্রান্তর। এক চরম আর অসম যুদ্ধের মুখোমুখি হতে যাচ্ছেন তাঁরা। কাফেলার সবার সামনে হেঁটে চলছেন নবীজি (সা.)। তিনি কেবল এই বাহিনীর সেনাপতিই নন, সৃষ্টিজগতের সেরা মানুষ, দুই জাহানের কাণ্ডারি, মহান আল্লাহ প্রিয় বান্দা ও রাসুল। কিন্তু এই দীর্ঘ ও কঠিন সফরের রসদ একেবারে সামান্য। ৩০০-র বেশি মানুষের বিপরীতে উট রয়েছে মাত্র ৭০টি! কাউকে কষ্টে রেখে একা আরাম করার লোক তিনি নন। তাই যাত্রার শুরুতেই নিয়ম করে দিলেন, একটি উটে তিনজন করে পালাক্রমে চড়বে। তাঁর নিজের ভাগের উটটিতে তাঁর সঙ্গী হলেন দুজন—আলী আর আবু লুবাবা (রা.)। চলতে চলতে একসময় কাফেলার গতি ধীর হলো। এবার তাঁর উট থেকে নামার পালা।তিনি উটের পিঠ থেকে নামার উদ্যোগ করতেই আলী ও আবু লুবাবার বুক কেঁপে উঠল। মরুভূমির এই তপ্ত বালুতে আল্লাহর রাসুল (সা.) হেঁটে চলবেন আর তাঁরা পিঠে বসে আরাম করবে? যাঁকে ভালোবেসে নিজের জীবন বিলিয়ে দেওয়া যায়, তাঁর এই কষ্ট সহ্য করা সম্ভব নয়। দুজনে আকুল হয়ে নবীজিকে থামাতে চাইলেন। বললেন...