পোস্টগুলি

মুসলিম সভ্যতায় অতিথি আপ্যায়নের শিষ্টাচার

  অতিথি সেবাকে ইমানের অংশ এবং মানবীয় মর্যাদার এক অনন্য মাপকাঠি হিসেবে স্থান দিয়েছে ইসলাম। সপ্তম শতাব্দীতে আরব উপদ্বীপে যে সভ্যতার সূচনা হয়েছিল, তা সময়ের পরিক্রমায় এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপের বিশাল অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে এবং স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে মিশে গিয়ে এক বর্ণাঢ্য সামাজিক ঐতিহ্যের জন্ম দেয়। (ফিলিপ কে. হিটি, হিস্ট্রি অব দ্য আরবস্ , পৃষ্ঠা ৩১২, ম্যাকমিলান অ্যান্ড কোং, লন্ডন, ১৯৬৪) এই সভ্যতার অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হলো মেহমানদারি বা অতিথি আপ্যায়ন। এটি শুধু একটি সামাজিক প্রথা বা লৌকিকতা নয়, বরং আত্মশুদ্ধি, ইবাদত এবং পারস্পরিক সৌহার্দ্য স্থাপনের সুমহান মাধ্যম। (ইমাম গাজালি, ইহইয়ায়ু উলুমিদ্দিন , ২/৩৪৮, দারুল মাআরিফা, বৈরুত, ২০০৪) ইসলামে মেহমানদারির গুরুত্ব ইসলাম ধর্মে অতিথির আগমনকে পরম সৌভাগ্য এবং আল্লাহর বিশেষ রহমত হিসেবে গণ্য করা হয়। কোরআনে নবী ইব্রাহিম (আ.)-এর মেহমানদারির চমৎকার একটি ঘটনা উল্লেখ রয়েছে, যেখানে তিনি অচেনা মেহমানদের (যাঁরা মূলত ফেরেশতা ছিলেন) আপ্যায়নের জন্য দ্রুত নিজ ঘরে গিয়ে একটি তাজা ভুনা বাছুর নিয়ে হাজির হয়েছিলেন। (সুরা জারিয়াত, আয়াত: ২৪-২৭) এটি অতিথ...

বিদ্রোহের সময়ে প্রথম খলিফা আবু বকরের ৩ দূরদর্শী সিদ্ধান্ত

  ইসলামের প্রথম খলিফা আবু বকরের ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে অনেকের মনেই ধারণা, তিনি অতি কোমল হৃদয়, প্রগাঢ় আবেগ এবং অশ্রুসিক্ত স্বভাবের একজন সাধক মানুষ। তাঁর দূরদর্শী রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও সংকট মুহূর্তের দৃঢ়তাকে প্রায়শই আড়াল করা হয়। নবীজির ওফাতের পর ইসলামি রাষ্ট্র যখন অস্তিত্বের সংকটে নিপতিত হয়েছিল, তখন ওমর ইবনুল খাত্তাবের মতো শক্তিশালী সাহাবিও কৌশলগত নমনীয় নীতির পরামর্শ দিয়েছিলেন। কিন্তু সেই কঠিন সন্ধিক্ষণে আবু বকর সিদ্দিক (রা.) অবিচল পাহাড়ের মতো দাঁড়িয়েছিলেন এবং তিনটি সাহসী ও দূরদর্শী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিলেন; যা শুধু ইসলামি রাষ্ট্রের ভিত্তিই সুসংহত করেনি; বরং ইসলামের বিধান ও মৌলিক কাঠামোকে রক্ষা করেছিল। ১. ওসামার বাহিনী প্রেরণ ওফাতের ঠিক কয়েক দিন পূর্বে নবীজি (সা.) ওসামা ইবনে জায়েদের নেতৃত্বে রোমান সীমান্তে পাঠানোর জন্য একটি সেনাদল প্রস্তুত করেছিলেন। কিন্তু বাহিনী মদিনার উপকণ্ঠে পৌঁছতেই নবীজির বিদায়ের সংবাদ আসে। এ সময় সমগ্র আরব উপদ্বীপে বিদ্রোহ ও স্বধর্মত্যাগের (রিদ্দা) আগুন জ্বলে ওঠে। মদিনা যখন চতুর্দিক থেকে বিদ্রোহী ও শত্রুগোত্রগুলোর আক্রমণের আশঙ্কায় মারাত্মক হুমকির মুখোমুখ...

আল্লাহর ওপর আস্থা রাখার সহজ ৫ উপায়

  পরিস্থিতি সবসময় একরকম যায় না। কখনও এমন কিছুর মুখোমুখি হতে হয়, যার জন্য আমরা প্রস্তুত নই। তখন ভবিষ্যত নিয়ে দুশ্চিন্তায় হয় এবং মনে প্রশ্ন জাগে, ‘আমার সঙ্গেই কেন এমন হয়?’ মুমিন হবে ইতিবাচক মুমিনের জীবনদর্শন ভিন্ন রকম। সে জানে, মানুষ পরিকল্পনা করে, আর আল্লাহও পরিকল্পনা করেন। তবে আল্লাহর পরিকল্পনা  পূর্ণাঙ্গ, দূরদর্শী ও কল্যাণময়। এই আস্থা যদি অন্তরে বদ্ধমূল হয়ে যায়, তাহলে আর  ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে হয় না। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা কোনো বিষয়কে অপছন্দ করো, অথচ তাতে তোমাদের জন্য কল্যাণ রয়েছে; আবার কোনো বিষয়কে পছন্দ করো, অথচ তাতে তোমাদের জন্য অকল্যাণ রয়েছে। আল্লাহ জানেন, তোমরা জানো না।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ২১৬) কীভাবে আস্থা অর্জন করব আল্লাহর সিদ্ধান্তে আস্থা রাখা কঠিন কোনো বিষয় নয়। পাঁচটি উপায় অনুসরণ করলে খুব সহজেই তা অর্জন করা যায়।  ১. মনে করুন, ‘আমি কিছুই জানি না’ মানুষ বর্তমান পরিস্থিতি দেখে ভবিষ্যত সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেয়। আজকের ব্যর্থতাকে সে চূড়ান্ত ব্যর্থতা মনে করে বসে। অথচ সে জানে না, এই ব্যর্থতার ভেতরেই ভবিষ্যতের বড় কোনো কল্যাণ লুকিয়ে আছে। বিপদের সময় বারবার স্মরণ...

কাবা পুনর্নির্মাণ: মক্কায় এক নতুন নেতৃত্বের আত্মপ্রকাশ

  নবুয়তপ্রাপ্তির পাঁচ বছর আগে, আনুমানিক ৬০৫ খ্রিষ্টাব্দে (১৮ হিজরি পূর্ব), মক্কার কেন্দ্রীয় উপাসনালয় কাবা শরিফ এক গভীর সংকটের মুখে পড়ে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ আর কাঠামোগত দুর্বলতায় জীর্ণ এই প্রাচীন স্থাপনা পুনর্নির্মাণের উদ্যোগ নিতে গিয়ে কোরাইশ গোত্রগুলোর মধ্যে এমন তীব্র বিরোধের সৃষ্টি হয় যে তা প্রায় সশস্ত্র সংঘাতের দিকে গড়ায়। মুহাম্মদ (সা.)–এর বয়স তখন ৩৫ বছর, নবুয়ত পাওয়ার ৫ বছর পূর্বের ঘটনা। কাবা নির্মাণ ঘিরে উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে তিনি একটি সহজ অথচ বুদ্ধিদীপ্ত সমাধান দেন; যা সেই রাজনৈতিক অচলাবস্থা দূর করে। আর এই ঘটনাই তাঁকে মক্কার সব গোত্রের কাছে এক অবিসংবাদিত ব্যক্তিত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। কাবার পুনর্নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা ইসমাইল (আ.)-এর সময় থেকে কাবার উচ্চতা ছিল মাত্র নয় হাত (প্রায় ৪.৫ মিটার বা ১৩.৫ ফুট), চারপাশের দেয়াল ছিল মর্টার ছাড়া শুকনো পাথরের গাঁথুনি, কোনো ছাদ ছিল না। (আল-আজরাকি, আখবারু মাক্কা, ১/১৫৭, দারুল আন্দালুস, বৈরুত, ১৯৮৩) পুনর্নির্মাণের কিছুদিন আগে এক কোরাইশ নারীর অসাবধানতায় ধূপের স্ফুলিঙ্গ লেগে কাবার চাদর ও কাঠামোয় আগুন লাগে। এতে দেয়ালের পাথরের ভারবহন...

ব্যর্থতার ভাবনাকে মুমিন যেভাবে সাফল্যে পরিণত করে

 মুঠোফোনের স্ক্রিনে তাকিয়ে আছেন। পরীক্ষার রেজাল্ট এসেছে। যে নম্বরটা আশা করেছিলেন, সেটা নেই। বুকের ভেতর একটা হাহাকার শুরু হয়েছে। হাত কাঁপছে। মনে হচ্ছে, চোখের সামনে পুরো পৃথিবীটা ভেঙে পড়ল। মা–বাবাকে কী বলবেন? বন্ধুরা কী ভাববে? এত পরিশ্রম, এত স্বপ্ন, সবকিছু বৃথা গেল? জীবনে অনেক বড় হবার যে স্বপ্নটা দেখেছিলেন, সেটা হয়তো আর পূরণ হবে না। এত কষ্ট এত দোয়ার পরও দিনশেষে ব্যর্থদের কাতারেই আপনার ঠাঁই হলো। রেজাল্ট খারাপ হওয়ায় যদি আপনার মনেও এমন চিন্তা ঘুরপাক খায়, তবে এই লেখাটা আপনার জন্য। বিজ্ঞান কী বলছে মনোবিজ্ঞানে একটা ধারণা আছে, যার নাম সংকট-উত্তর বিকাশ (পোস্ট-ট্রমাটিক গ্রোথ)। গবেষণায় দেখা গেছে, জীবনের কঠিন সময় বা ব্যর্থতা মানুষকে শুধু ভেঙে দেয় না, বরং অনেক ক্ষেত্রে সেই মানুষটিকেই নতুন করে গড়ে তোলে। যে মানুষ একবার হোঁচট খেয়ে আবার উঠে দাঁড়ায়, তার মানসিক দৃঢ়তা আগের চেয়ে বেড়ে যায়। (টেডেশি, আর. জি. এবং ক্যালহাউন, এল. জি., ১৯৯৬, জার্নাল অব ট্রমাটিক স্ট্রেস, ৯/৩, ইন্টারন্যাশনাল সোসাইটি ফর ট্রমাটিক স্ট্রেস স্টাডিজ, আমেরিকা) যা হয়ে গেছে সেটা নিয়ে মন খারাপ না করে নতুন উদ্যমে কাজে লেগে প...

প্রচলিত কোরআনের অনুলিপিতে নানা রূপ কেন

  মসজিদে গিয়ে যখন আমরা কোরআন শরিফের একটি মুদ্রিত অনুলিপি হাতে নিতে চাই, দেখি, আলমারির তাকগুলোতে বিভিন্ন রূপ ও আকারের কোরআন। সাধারণত যিনি যেই লিপি পড়ে অভ্যস্ত, সেই অনুলিপিই তিনি খুঁজে নেন। কিন্তু কৌতূহল হয়, এত রকমের কোরআন কেন? অনুলিপিগুলোর মধ্যে মূল পার্থক্যটা আসলে কোথায়? বিশ্বজুড়ে কোরআনের ছাপা অনুলিপির একাধিক রূপ প্রচলিত রয়েছে। আমাদের সমাজে মূলত দুটি অনুলিপি সবচেয়ে বেশি দেখা যায়—একটি হলো সৌদি আরবের মদিনা থেকে প্রকাশিত ‘মদিনা মুসহাফ’ এবং অন্যটি হলো বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানে বহুল প্রচারিত ‘দক্ষিণ এশীয় মুসহাফ’। দেখতে সামান্য আলাদা মনে হলেও দুটি অনুলিপিই মূলত ‘হাফ্স’ পাঠরীতিতে মুদ্রিত। লিপিশৈলীর ভিন্নতা: ‘নাস্‌খ’ বনাম ‘নাস্তালিক’ অনুলিপিগুলোর দিকে তাকালে প্রথম যে পার্থক্যটি চোখে পড়ে, তা হলো এদের লিপিশৈলী। ইতিহাসে কোরআন অনুলেখনের জন্য বিভিন্ন সময়ে একাধিক লিপিশৈলী ব্যবহৃত হয়েছে। শুরুর দিকে হিজাজি বা কুফি লিপিতে কোরআন লেখা হতো। পরবর্তীকালে আরবি ক্যালিগ্রাফির প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে বহু বর্ণমালাশৈলী গড়ে ওঠে। বর্তমানে সৌদি আরবের মদিনা থেকে ছাপা অনুলিপিটি লেখা হয় সুষম ও প্রচলিত ‘নাস্‌খ’ লিপিশ...

রোম সম্রাটের সামনে ইমানের অগ্নিপরীক্ষা

  হিজরি ১৯ সাল। তখন খলিফা ওমর ইবনুল খাত্তাবের শাসনামল। রোমানদের বিরুদ্ধে অভিযানে প্রেরিত মুসলিম বাহিনীর অংশ হিসেবে রোমানদের হাতে বন্দী হন বিশিষ্ট সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনে হুজাফা আস-সাহমি (রা.)। (ইবনে আসাকির, তারিখু দিমাশক, ২৭/১২, দারুল ফিকর, বৈরুত, ১৯৯৫) রোমান সম্রাটের কাছে খবর পৌঁছাল, মুসলমানদের ইমান পাহাড়ের চেয়েও দৃঢ়; তাঁরা মৃত্যুকে ভয় পান না এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য অকাতরে জীবন বিলিয়ে দিতে প্রস্তুত। সম্রাট বিষয়টি নিজের চোখে পরীক্ষা করতে চাইলে তাঁর নির্দেশে বন্দী আবদুল্লাহ ইবনে হুজাফাকে রাজদরবারে হাজির করা হয়। (আল-আসকালানি, আল-ইসাবাহ ফি তামিয়িজিস সাহাবাহ, ৪/৫৬, দারুল কুতুব আল-ইলমিয়া, বৈরুত, ১৯৯৫) সব প্রলোভন ব্যর্থ সম্রাট তাঁর দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘আমি তোমার কাছে একটি প্রস্তাব পেশ করতে চাই। খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ করো, তাহলে তোমাকে মুক্ত করে দেব।’ তিনি দৃঢ়কণ্ঠে জবাব দিলেন, ‘এটা অসম্ভব।’ সম্রাট বললেন, ‘তুমি একজন বুদ্ধিমান যুবক। প্রস্তাব মেনে খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ করলে আমার রাজ্যের অর্ধেক তোমাকে দিয়ে দেব।’ তিনি এক কথায় বললেন, ‘এটাও সম্ভব না।’ এবার আরও বড় প্রলোভন দেখিয়ে সম্রাট ব...