পোস্টগুলি

বন্ধকি সম্পত্তি ব্যবহার: কখন বৈধ, কখন নয়

  ঋণদাতা যেন তার দেওয়া ঋণের ব্যাপারে নিশ্চিন্ত থাকতে পারে এবং নির্ধারিত সময়ে তা ফেরত পাওয়ার নিশ্চয়তা পায়, সেজন্য ইসলামি আইনে ‘রাহন’ বা বন্ধকি ব্যবস্থার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। বন্ধক বলতে এমন কোনো সম্পদকে বোঝায়, যা ঋণের বিপরীতে ঋণদাতার কাছে গচ্ছিত রাখা হয়। যদি ঋণগ্রহীতা নির্দিষ্ট সময়ে ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হয়, তবে সেই সম্পদ থেকে ঋণের সমপরিমাণ অর্থ উসুল করে নেওয়া যায়। প্রশ্ন হলো, যতদিন সম্পদটি বন্ধক অবস্থায় থাকবে, ততদিন এই সম্পদ থেকে কে সুবিধা ভোগ করবে? ঋণদাতা, নাকি ঋণগ্রহীতা (যিনি ওই সম্পদের মূল মালিক)? বিশ্লেষণ তুলে ধরা হলো। বন্ধকগ্রহীতা কি সম্পত্তি ব্যবহার করতে পারবেন যিনি ঋণ দিয়েছেন এবং যার কাছে বন্ধকি সম্পত্তি গচ্ছিত আছে, তার জন্য ওই সম্পত্তি ব্যবহার করার ক্ষেত্রে বেশ কয়েকটি পরিস্থিতি হতে পারে: ১. ব্যবহারের শর্ত থাকলে: যদি ঋণ দেওয়ার সময় চুক্তিতেই শর্ত জুড়ে দেওয়া হয় যে ঋণদাতা বন্ধকি সম্পত্তি ব্যবহার করতে পারবে, তবে ইসলামি আইনে তা সম্পূর্ণ অবৈধ ও হারাম। ইসলামের একটি সর্বসম্মত ও স্বতঃসিদ্ধ মূলনীতি হলো, “যে ঋণ কোনো সুবিধা টেনে আনে, তা-ই সুদ।” (ইমাম বাইহাকি, আস-সুনান আস-সুগরা, ৪/৩৫৩, মাকত...

মসজিদে আদদাস: যেখানে নবীজির সঙ্গে এক খ্রিষ্টান দাসের দেখা

  নবুয়তের দশম বছর ছিল নবীজির (সা.) জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়; সিরাতে যাকে বলা হয় ‘আমুল হুজন’ (দুঃখের বছর)। এ বছর তিনি হারান তাঁর সবচেয়ে বড় আশ্রয়স্থল চাচা আবু তালিব ও পঁচিশ বছরের সঙ্গী হজরত খাদিজাকে। মক্কার নির্যাতন যখন সীমা ছাড়িয়ে গেল, তিনি একটা নিরাপদ ঘাঁটির আশায় মক্কা থেকে প্রায় আশি কিলোমিটার দূরে পাহাড়ি শহর তায়েফের দিকে পা বাড়ালেন। (ইবনে কাসির, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৩/১৩২, দারু হিজর, কায়রো, ১৯৯৭) তারা শহরের বখাটে ছেলেপেলে আর দাসদের লেলিয়ে দেন নবীজির পেছনে। তারা পাথর ছুড়তে থাকে, নবীজির পবিত্র শরীর রক্তাক্ত হয়ে যায়, জুতাও রক্তে ভিজে ওঠে। কিন্তু তায়েফের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরা দাওয়াত গ্রহণ তো দূরের কথা, চরম উপহাসের সাথে তাঁকে ফিরিয়ে দেযন। তারা শহরের বখাটে ছেলেপেলে আর দাসদের লেলিয়ে দেন নবীজির পেছনে। তারা পাথর ছুড়তে থাকে, নবীজির পবিত্র শরীর রক্তাক্ত হয়ে যায়, জুতাও রক্তে ভিজে ওঠে। পরবর্তী সময়ে আয়েশা (রা.) একবার জিজ্ঞেস করেছিলেন, ওহুদের দিনের চেয়েও কঠিন কোনো দিন কি তাঁর জীবনে এসেছিল? জবাবে নবীজি তায়েফের এই দিনের কথাই বলেছিলেন; যা তাঁর জীবনের সবচেয়ে দীর্ঘ ও...

বদর যুদ্ধের নেপথ্যে: রহস্যময় কিছু স্বপ্ন ও তার ব্যাখ্যা

  বদর যুদ্ধের অন্যতম একটি বিস্ময়কর ও অলৌকিক দিক ছিল স্বপ্ন। যুদ্ধের প্রেক্ষাপট, রণকৌশল ও জয়-পরাজয়ের পেছনে মনস্তাত্ত্বিক জগতের যার গভীর প্রভাব ছিল।  যুদ্ধ শুরুর পূর্বমুহূর্তে এবং যুদ্ধ চলাকালীন মুসলিম ও মুশরিক উভয় শিবিরে বেশ কিছু তাৎপর্যপূর্ণ স্বপ্ন দেখা গিয়েছিল। এই স্বপ্নগুলো একদিকে মুসলমানদের ইমানি শক্তিকে দৃঢ় করেছিল এবং অন্যদিকে কোরাইশদের মনে পরাজয়ের আগাম ভীতি সৃষ্টি করেছিল। (আব্দুল মুইন মুহাম্মদ আত-তালফাহ, আহলামু গাজওয়াতি বদর: আনওয়াউহা ওয়া আকাতিফুহা, মাজাল্লাতুশ শারিয়াহ ওয়াল উলুমিল আরাবিয়্যাহ, ভলিউম: ২, পৃষ্ঠা: ১২, ইমাম মুহাম্মদ ইবনে সাউদ ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়, রিয়াদ, ২০০৮) ইসলামে স্বপ্নের অবস্থান ও প্রকারভেদ ইসলামের প্রাথমিক যুগে ওহির সূচনা হয়েছিল স্বপ্নের মাধ্যমে। আয়েশা (রা.) বলেন, “নবীজির ওহির সূচনা হয়েছিল ঘুমের মধ্যে সত্য স্বপ্নের মাধ্যমে। তিনি যে স্বপ্নই দেখতেন, তা সকালের সূর্যের আলোর মতো বাস্তব হয়ে প্রকাশ পেত।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩) হাদিসে স্বপ্নকে নবুয়তের অংশ হিসেবেও উল্লেখ করা হয়েছে। মহানবী (সা.) বলেছেন, “একজন মুসলিমের সত্য স্বপ্ন হলো নবুয়তের ছে...

ইসলামকে কেন ‘মধ্যপন্থী’ ধর্ম বলে

  মানবজীবনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ভারসাম্য রক্ষা করা। বিশ্বাস ও কর্মে, ইবাদত ও দায়িত্বে, অধিকার ও কর্তব্যে—প্রতিটি ক্ষেত্রে যথাযথ সীমা নির্ধারণ করা সহজ নয়। ধর্মীয় আবেগ মানুষকে বাড়াবাড়ির দিকে নিয়ে যায়, আবার সহজতার প্রবণতা তাকে দায়িত্ব পালনে শিথিল করে তোলে। অথচ ইসলামের জীবনদর্শন এসব একপেশে প্রবণতার ঊর্ধ্বে। ইসলাম মানুষকে এমন এক জীবনপদ্ধতি উপহার দিয়েছে, যেখানে প্রতিটি বিষয়ে তার যথাযথ মর্যাদা ও পরিসর রয়েছে। এই ন্যায়নিষ্ঠ ও ভারসাম্যপূর্ণ জীবনদৃষ্টিই ইসলামের মধ্যপন্থা। মধ্যপন্থার নামে সত্য ও মিথ্যার মধ্যে সমন্বয়, হালাল-হারামের সীমারেখা অস্পষ্ট করা, অন্যায়ের সঙ্গে সমঝোতা কিংবা ধর্মীয় বিধানকে ব্যক্তিগত পছন্দ অনুযায়ী পরিবর্তন করার সুযোগ নেই। মধ্যপন্থার ধারণা মধ্যপন্থা বলতে দুটি চরম অবস্থানের মাঝখানে দাঁড়ানোকে বোঝায় না। বরং এর অর্থ হলো, সত্য ও ন্যায়ের মানদণ্ডে অবিচল থেকে প্রতিটি বিষয়ে যথাযথ অবস্থান গ্রহণ করা; সীমালঙ্ঘন ও অবহেলা—উভয় থেকে মুক্ত থাকা। এটি মানুষের ব্যক্তিগত পছন্দের বিষয় নয়, বরং আল্লাহর নির্দেশনা ও নবীজির আদর্শের আলোকে নির্ধারিত জীবননীতি। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ–তাআলা মুসলিম জাতি...

পথিককে রাস্তা বলে দেওয়া: একটি ভুলে যাওয়া সুন্নত

  গুগল ম্যাপের যুগে পথ হারানো আর পথ জিজ্ঞেস করা, দুটোই যেন অপ্রয়োজনীয় হয়ে উঠেছে। তবু নেটওয়ার্ক থাকে না, ম্যাপ ভুল মোড় দেখায়, আর অচেনা শহরে সন্ধ্যা নামে। তখন ফোন পকেটে রেখে আমাদের তাকাতে হয় পাশের মানুষটির দিকে। এ সময়ে পথ জিজ্ঞেস করে অনেককে বিরক্ত মুখ দেখতে হয়, কখনো অবজ্ঞা, কখনো ভুল ইশারা। অথচ মহানবী (সা.) পথহারাকে পথ দেখানোকে ইবাদত বলে গণ্য করেছেন। রাস্তারও হক আছে রাস্তায় বসে আড্ডা দেওয়া নিয়ে সাহাবিদের সঙ্গে নবীজির একটি কথোপকথন হাদিসে এসেছে। নবীজি (সা.) বললেন, ‘তোমরা রাস্তায় বসা থেকে সতর্ক থাকো।’ সাহাবিরা বললেন, তাঁদের তো মজলিসে বসতেই হয়, সেখানেই কথাবার্তা হয়। তোমার ভাইয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসা তোমার জন্য সদকা, সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করা সদকা, পথহারা মানুষকে পথ দেখানো সদকা। তখন তিনি বললেন, ‘যদি বসতেই হয়, তবে রাস্তার হক আদায় করো।’ রাস্তার হক কী জানতে চাইলে তিনি বললেন, দৃষ্টি অবনত রাখা, কষ্ট না দেওয়া, সালামের জবাব দেওয়া, সৎ কাজের আদেশ করা ও অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করা। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৪৬৫) এই হাদিসের বর্ণনার সঙ্গে মিল আছে এমন অন্য একটি বর্ণনায়...

গল্প-উপন্যাস পড়া কি ইসলামে নিষিদ্ধ

  পবিত্র কোরআনে মানবজাতির হেদায়েতের জন্য অসংখ্য শিক্ষণীয় গল্প বা ‘কাসাস’ স্থান পেয়েছে। তবে যেকোনো সাধারণ কাজের মতোই সাহিত্য পাঠের ক্ষেত্রেও ইসলামে হালাল-হারামের সুস্পষ্ট সীমারেখা ও ফিকহি বিধান রয়েছে। বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে গল্প বা উপন্যাস পড়ার ক্ষেত্রে ইসলামের বিধানগুলো নিচে আলোচনা করা হলো। নীতিবাচক গল্প পাঠ যে উপন্যাসে মানবজীবনের বাস্তব চিত্র, নৈতিক মূল্যবোধ, দেশপ্রেম, ইতিহাস এবং ন্যায়ের বিজয় ফুটে ওঠে, তা পড়া ইসলামে সম্পূর্ণ বৈধ বা ‘মুবাহ’। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ নবীজিকে নির্দেশ দিয়েছেন, ‘সুতরাং আপনি এসব কাহিনি বর্ণনা করুন, যাতে তারা চিন্তা করে।’ (সুরা আরাফ, আয়াত: ১৭৬) যেসব সাহিত্য মানুষের চরিত্র গঠনে সাহায্য করে, তা পাঠ করাতে কোনো বিধিনিষেধ নেই। অনৈতিক সাহিত্যের বিধান উপন্যাস বা গল্পের নামে যেসব বইয়ে অবাধ যৌনতা বা অপরাধমূলক কাজকে আকর্ষণীয়ভাবে উপস্থাপন করা হয়, ইসলামি আইনে সেগুলো পড়া, কেনা বা প্রচার করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। কারণ, এগুলো মানুষের চরিত্র নষ্ট করে এবং পাপের প্রতি প্ররোচিত করে। কোরআনে বলা হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই যারা মুমিনদের মধ্যে অশ্লীলতার প্রসার কামনা করে, তাদের জন্য দুনিয়া ও প...

ঋণের বোঝা থেকে মুক্ত হতে মহানবী (সা.) যে উপায় দেখিয়েছেন

  ইসলামে ঋণ করাকে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে; এমনকি একজন শহীদের সব পাপ মাফ হয়ে গেলেও তার ঋণের দায় মাফ হয় না, যতক্ষণ না তা পরিশোধ করা হয়। তবে অভাব, অসুস্থতা বা ব্যবসায়িক ক্ষতির কারণে মানুষ বাধ্য হয়ে অনেক সময় ঋণের ফাঁদে পড়ে যায়। এই দুর্বিষহ অবস্থা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য মহানবী (সা.) উম্মতকে চমৎকার কিছু মানসিক, আধ্যাত্মিক ও প্রায়োগিক পথ দেখিয়েছেন। ১. ঋণ পরিশোধের সংকল্প ঋণমুক্তির প্রথম ও প্রধান শর্ত হলো—যেকোনো মূল্যে পাওনাদারের টাকা পরিশোধ করার দৃঢ় মানসিক সংকল্প (নিয়ত) থাকা। অনেকেই ঋণ নেওয়ার পর তা পরিশোধ করার কথা ভুলে যান বা গড়িমসি করেন। অথচ অন্তরে যদি পরিশোধের সত্যিকারের তাগিদ থাকে, তবে আল্লাহ গায়েবিভাবে তাকে সাহায্য করেন। মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি মানুষের সম্পদ (ঋণ হিসেবে) গ্রহণ করে তা পরিশোধ করার উদ্দেশ্যে, আল্লাহ তার পক্ষ থেকে তা পরিশোধের ব্যবস্থা করে দেন। আর যে ব্যক্তি তা গ্রহণ করে বিনষ্ট করার উদ্দেশ্যে, আল্লাহ তাকে ধ্বংস করে দেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৩৮৭) ২. নবীজির শেখানো বিশেষ দোয়া পাঠ দুশ্চিন্তা ও ঋণের পাহাড় থেকে মুক্তির জন্য নবীজি সাহাবিদের কিছু দোয়া শিখিয়েছেন। একবার হজরত ...