পোস্টগুলি

তিন সাহাবির তওবার ঘটনা

  এক. ইসলামের ইতিহাসে কঠিনতম একটি যুদ্ধের নাম তাবুক যুদ্ধ। প্রচণ্ড গরম, দীর্ঘ পথ, খাদ্য ও বাহনের সংকট মিলিয়ে এটি ছিল সাহাবিদের ইমান ও ত্যাগের বাস্তব পরীক্ষা। এই অভিযানে অধিকাংশ সাহাবি অংশগ্রহণ করলেও তিনজন সত্যনিষ্ঠ সাহাবি অনুপস্থিত থেকে যান। তাঁরা হলেন কাব ইবনে মালিক, মুরারা ইবনে রাবি ও হিলাল ইবনে উমাইয়া (রা.)। কাব ইবনে মালিক (রা.) নিজেই এই ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন। তিনি বলেন, তাবুক অভিযানের সময় তার কোনো অভাব ছিল না। আগের যে-কোনো সময়ের চেয়ে তিনি বেশি সচ্ছল ছিলেন‌ তখন। তবুও আজ যাবো, কাল যাবো করতে করতে দেরি করে ফেলেন। একসময় দেখলেন, রাসুল (সা.) ও সাহাবিরা যুদ্ধের জন্য রওনা হয়ে গেছেন।  শিক্ষা:  সৎকাজে বিলম্ব করা অনুচিত। এতে অনেক সময় পুরো কাজটিই বিনষ্ট হয়ে যায়। কেবল ভালো কাজের ইচ্ছা থাকলেই হয় না, দ্রুত এটাকে কাজে রূপ দিতে হয়। দুই. অন্য দুই সাহাবিও একইভাবে পিছিয়ে পড়েন। তারা কেউই মুনাফেক ছিলেন না। ছিলেন প্রকৃত ইমানদার ও সৎ মানুষ। তবু মানুষের জীবনে কখনো কখনো দুর্বলতা এসেই যায়। প্রকৃত ইমানদারও ভুল করতে পারে, তবে তাঁর আসল পরিচয় হলো ভুলের ওপর স্থির না থাকা এবং আল্লাহর ন...

নেক আমলে অবিচল রাখবে যে ১০ আয়াত

  ভালো কাজ শুরু করা সহজ, কিন্তু তাতে আমৃত্যু অবিচল থাকা বা ‘ইস্তিকামাহ’ বজায় রাখা বেশ কঠিন। শয়তানের প্ররোচনা আর জাগতিক ব্যস্ততার ভিড়ে অনেক সময় আমাদের নেক আমলের ধারাবাহিকতা নষ্ট হয়ে যায়। আমলে দৃঢ়তা ও নিষ্ঠা ধরে রাখার জন্য পবিত্র কোরআনের ১০টি শক্তিশালী অনুপ্রেরণা তুলে ধরা হলো: ১. অবিচলদের জন্য জান্নাতের সুসংবাদ যারা একবার আল্লাহকে স্বীকার করে আমৃত্যু সেই পথে অবিচল থাকে, ফেরেশতারা তাদের সাহস ও অভয় দিতে জান্নাতের বার্তা নিয়ে অবতীর্ণ হন। উচ্চারণ:  ইন্নাল্লাযিনা কালু রাব্বুনাল্লাহু ছুম্মাস তাকামু তাতানাযযালু আলাইহিমুল মালাইকাহ। অর্থ:  নিশ্চয়ই যারা বলে, আমাদের রব আল্লাহ, অতঃপর তারা অবিচল থাকে, তাদের কাছে ফেরেশতারা অবতীর্ণ হয় এবং বলে, তোমরা ভয় পেয়ো না, দুঃখ করো না এবং সেই জান্নাতের সুসংবাদ গ্রহণ করো যার প্রতিশ্রুতি তোমাদের দেওয়া হয়েছিল। (সুরা ফুসসিলাত, আয়াত: ৩০) ২. আদেশের পূর্ণ আনুগত্য দিনের পর দিন একই আদর্শে অবিচল থাকা একটি বড় পরীক্ষা। রাসুল (সা.)-কেও আল্লাহ এই দৃঢ়তা বজায় রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। উচ্চারণ:  ফাস্তাকিম কামা উমিরতা ওয়া মান তাবা মা'আকা। অর্থ:  অতএব তুমি অবিচল...

মহানবী (সা.)-এর শৈশব কেটেছে যে ঘরে

  ‘সে ও তার ভাই গৃহের পেছনে ভেড়া নিয়ে খেলা করছিল!’ (আল-মাতলিবুল আলিয়া)। ইবনু আব্বাস বলেন, হালিমা নবীজির সন্ধানে বের হলেন—এমন সময় যখন প্রাণীগুলো দুপুরে খেয়ে বিশ্রাম নেয়। তাঁকে তাঁর বোনের সঙ্গে পাওয়া গেল। হালিমা বললেন, ‘এই তপ্ত রোদে খেলছ?’ বোন বলল, ‘হে আম্মাজান, ভাইয়ের ওপর রোদ কোথায়! একটি মেঘখণ্ডকে আমি তাঁর ওপর ছায়া দিতে দেখছি; যখন সে দাঁড়িয়ে যায় তা থেমে যায়, যখন সে দৌড়ায় তা ছুটে চলে!’ (তাবাকাত ইবনে সা’দ)। কোথায় সেই গৃহ? কোথায় শৈশবের সেই খেলার মাঠ? সেখানকার লোকেরা কেন ও কীভাবে মক্কায় এসেছিল? মক্কা থেকে সেখানে পৌঁছানোর অভিজ্ঞতা কেমন ছিল? কতবার সেই পথ পাড়ি দিয়েছিলেন তিনি? কেনই-বা আবার মক্কায় ফিরে আসেন? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর কি কখনো খুঁজেছেন? মক্কা থেকে ১৫০ কিলোমিটার পূর্ব-দক্ষিণ এবং তায়েফ থেকে ৭০ কিলোমিটার দক্ষিণের একটি গ্রামের গল্প আমাদের সব প্রশ্নের সমাধান দেবে। বর্তমান হুদায়বিয়া মরুভূমিতে অবস্থিত মাইসান জেলায় ‘আশ-শুহাতা উপত্যকা’-এর গ্রামটির নাম ‘আদ-দাহাসিন’। এটাই দীর্ঘ দেড় হাজার বছর ধরে ‘বাওয়াদিউ আজ-জুআইবাত’ আর কখনো ‘কারিআতু হালিমা আস-সাআদিয়া’ নামে পরিচিতি পেয়েছে। নবীজি (সা.)-এর দু...

কে ছিলেন ইমাম আল-মাওয়ার্দি

  ইসলামি ইতিহাসের ক্লাসিক যুগের শ্রেণিবিন্যাস ও সুবিন্যস্তকরণের সময়ে যে কজন মনীষী তাঁদের মেধা ও প্রজ্ঞা দিয়ে জ্ঞানজগৎকে সমৃদ্ধ করেছেন, আবুল হাসান মাওয়ার্দি তাঁদের অন্যতম। তিনি একাধারে একজন প্রখ্যাত ফকিহ, বিজ্ঞ বিচারক এবং দূরদর্শী রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ছিলেন। ইসলামি রাজনীতির তাত্ত্বিক ভিত্তি বা ডকট্রিনাল কাঠামো নির্মাণে তাঁর অবদান আজও বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত। বিশেষ করে রাষ্ট্রদর্শন ও ফিকহ শাস্ত্রে তাঁর গভীর পাণ্ডিত্য তাঁকে এক অনন্য উচ্চতায় আসীন করেছে। জন্ম ও শিক্ষা পুরো নাম আবুল হাসান আলি ইবনে মুহাম্মদ ইবনে হাবিব আল-মাওয়ার্দি। ৯৭২ খ্রিষ্টাব্দে (৩৬৩ হিজরি) ইরাকের বসরা নগরীতে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাল্যকাল কাটে বসরাতেই। এখানে আবুল কাসিম আল-সাইমারির কাছে ফিকহ শিক্ষা করেন এবং পরবর্তী সময়ে শেখ আবু হামিদ আল-ইসফায়িনির কাছে জ্ঞানার্জনের উদ্দেশ্যে সফর করেন। তিনি বসরা ও বাগদাদে বহু বছর অধ্যাপনা করেছেন। মাওয়ার্দি এমন এক সময়ে জ্ঞানচর্চা করেছেন, যখন ইসলামি জ্ঞানজগৎ বর্ণনাভিত্তিক পদ্ধতি থেকে যুক্তিনির্ভর পদ্ধতিতে প্রবেশ করছিল। (শিরাজি,  আত-তাবাকাতুল ফুকাহা,  পৃ. ১১৫-১১৬, দারুল রায়েদ আল-আরাবি, ব...

হালাল উপার্জনের বহুমুখী সুফল

  ইসলাম শুধু উপার্জনের নির্দেশ দেয়নি, বরং সেই উপার্জন যেন অবশ্যই হালাল হয় এবং হারামের প্রতিটি ছায়া থেকে মুক্ত থাকে, তার প্রতি কঠোর তাগিদ দিয়েছে। এটি মূলত ‘তাকওয়া’র অংশ। কারণ, হারামের সংমিশ্রণ ঘটলে মানুষের আমল কবুল হয় না এবং তার দোয়া আরশে পৌঁছায় না। দোয়া কবুলের জন্য হালাল খাবার একবার রাসুল (সা.)-এর সামনে কোরআনের এই আয়াতটি পাঠ করা হলো, “হে মানবজাতি, পৃথিবীতে যা কিছু হালাল ও পবিত্র রয়েছে তা থেকে তোমরা ভক্ষণ করো” (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৬৮)। তখন সাহাবি সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.) দাঁড়িয়ে বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল, আল্লাহর কাছে দোয়া করুন যেন তিনি আমাকে ‘মুস্তাজাবুদ দাওয়াহ’ (যার দোয়া কবুল হয়) বানিয়ে দেন।’ নবীজি (সা.) তাকে চমৎকার একটি মূলনীতি শিখিয়ে দিলেন, “হে সাদ, তোমার খাবারকে পবিত্র (হালাল) করো, তবেই তুমি মুস্তাজাবুদ দাওয়াহ হতে পারবে। সেই সত্তার কসম যার হাতে মুহাম্মাদের প্রাণ, বান্দা যখন তার পেটে এক লোকমা হারাম খাবার ফেলে, তখন ৪০ দিন পর্যন্ত তার কোনো আমল কবুল হয় না।” (তাবারানি,  আল-আওসাত ; যদিও এটি সনদের দিক থেকে দুর্বল, তবে এর মূল বক্তব্য সহিহ মুসলিমের ১০১৫ নম্বর হাদিস দ্বারা প্রমাণি...

ভিড়ের মাঝেও একা লাগে: কোরআনের ব্যাখ্যা কী

  ঘরভর্তি মানুষ। হাসি আছে, কথা আছে, খাবার টেবিলে গল্প আছে। কিন্তু আপনি বসে আছেন আর ভেতরে একটাই অনুভূতি—কেউ নেই। কেউ সত্যিকার অর্থে বোঝে না। সবাই আছে, তবু একটা শূন্যতা। যেন বুকের মাঝখানে একটা ফাঁকা জায়গা, যেটা কোনোভাবেই ভরছে না। এই অনুভূতিটার নাম একাকীত্ব। মজার ব্যাপার হলো, এটা নির্জনতায় আসে না, আসে ভিড়ের মাঝে। কোরআন বলছে, সমস্যাটা পরিবেশে নয়, বরং সংযোগে। এবং সেই সংযোগ কোথায় খুঁজতে হবে, সেটা দেড় হাজার বছর আগেই বলে দেওয়া হয়েছে। বিজ্ঞান কী বলছে গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘমেয়াদী একাকীত্ব শুধু মনকে নয়, শরীরও ভাঙে। এটি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দেয়, হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায় এবং মস্তিষ্কে স্ট্রেস হরমোনের মাত্রা এতটাই বাড়িয়ে তোলে যা দিনে পনেরোটি সিগারেট খাওয়ার সমান ক্ষতি করে। (Cacioppo, J. T. & Hawkley, L. C., 2003, 58/3, আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন, ওয়াশিংটন ডিসি) আধুনিক মনোবিজ্ঞান এর সমাধান হিসেবে বলছে, 'সংযোগ খোঁজো, মানুষের সঙ্গে থাকো।' কিন্তু একটু আগেই তো দেখলাম, মানুষের মাঝেও এই শূন্যতা থাকে। তাহলে সমস্যাটা কোথায়? কোরআন বলছে, সমস্যাটা পরিবেশে নয়, বরং সংযো...

‘ইসরায়েলি বর্ণনা’ কী এবং এগুলো কতটা নির্ভরযোগ্য

  ইসলামি জ্ঞানচর্চার মূল ভিত্তি কোরআন ও নির্ভরযোগ্য হাদিস। এ বিষয়ে কোনো দ্বিমত নেই। তবে তাফসির, ইতিহাস এবং নবীগণের কাহিনি পড়তে গেলে কিছু বর্ণনা এমন পাওয়া যায়, যা কোরআন ও হাদিসে সরাসরি নেই। এ ধরনের বর্ণনার বড় একটি অংশকে বলা হয় ‘ইসরায়েলি বর্ণনা’ বা ‘ইসরায়েলি রেওয়ায়েত’। এই বর্ণনাগুলোর কোনো কোনোটিতে আংশিক ঐতিহাসিক তথ্য থাকতে পারে, তবে সব কটি নির্ভরযোগ্য নয়। অনেক সময় এগুলো বিভ্রান্তি বা ভুল ধারণার জন্ম দিতে পারে। এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন আসে—ইসরায়েলি রেওয়ায়েত আসলে কী এবং এর গ্রহণ ও বর্জনের নীতিমালা কেমন হওয়া উচিত? এসব বর্ণনা কেবল তাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; কিছু সাহাবি ও তাবিয়িদের মাধ্যমে তা তাফসির ও ইতিহাসগ্রন্থেও স্থান পেয়েছে। তবে এগুলো ব্যবহারের মূল উদ্দেশ্য ছিল উপদেশ ও শিক্ষা গ্রহণ করা। ইসরায়েলি রেওয়ায়েত কী ইসরায়েলি রেওয়ায়েত বলতে সেই সব বর্ণনাকে বোঝায়, যা নবীদের কাহিনি, পূর্ববর্তী জাতির ইতিহাস অথবা সৃষ্টিজগতের অদৃশ্য বিষয়াবলির সঙ্গে সম্পর্কিত। এসব তথ্য মূলত বনী ইসরায়েল—অর্থাৎ ইহুদি ও খ্রিষ্টানদের ধর্মগ্রন্থ (তাওরাত ও ইনজিল) বা তাদের ধর্মীয় পণ্ডিতদের সূত্রে প্রচলিত হয়ে...