পোস্টগুলি

রবিউল আউয়াল মাসের বিশেষ ৪ মর্যাদা

  যে সময় মহানবী (সা.) পৃথিবীতে তাঁর প্রথম কদমটি রেখেছিলেন, সেটি ছিল রবিউল আউয়াল মাস এবং যখন তাঁর বয়স চল্লিশ বছর পূর্ণ হলো, তখনো এই মাসেই তাঁকে সোপর্দ করা হয়েছিল জগৎশুদ্ধির কাজ।  সুতরাং এ হিসেবে বলা যেতে পারে যে রবিউল আউয়ালই এই সর্বজনীন রহমত বিকাশের শুরুক্ষণ। এ কারণেই যখন মোবারক এই মাস আসে, তখন মুসলমানদের হৃদয়ে সেই মহান অস্তিত্বের স্মরণ সজীব হয়ে ওঠে এবং বিভিন্ন ধরনের খুশি ও আনন্দের প্রকাশ ঘটানো হয়ে থাকে। আল্লাহ–তাআলার বড় কোনো নেয়ামতের স্মরণে আনন্দিত হওয়া কোনো খারাপ জিনিস নয়। বরং শরিয়তের সীমারেখা অতিক্রম না করলে এটি একটি পর্যায় পর্যন্ত প্রশংসনীয় বটে। রবিউল আউয়াল মাসের মর্যাদা রবিউল আউয়াল আরবি বর্ষপঞ্জিকার তৃতীয় মাস। শাব্দিক অর্থ প্রথম বসন্ত। মহিমান্বিত রবিউল আউয়াল মাসটি তাৎপর্যপূর্ণ হওয়ার অনেকগুলো দিক আছে। প্রথম দিক বিশ্বমানবতার মুক্তির দূত, মহানবী মুহাম্মদ (সা.) পৃথিবীতে আগমন করেন রবিউল আউয়াল মাসে। দ্বিতীয় দিক রবিউল আউয়াল মাসেই নবীজি নবুয়তপ্রাপ্ত হয়েছেন। তৃতীয় দিক আল্লাহর রাসুল (সা.) প্রিয় মাতৃভূমি মক্কা মোকাররমা ছেড়ে মদিনা মোনাওয়ারায় হিজরত করেন এবং যেদিন তিনি মদিনায় পৌঁছান, ত...

প্রচলিত ইসলামি ব্যাংকিং কতটা শরিয়া অনুসরণ করছে

  ইসলামি ব্যাংকিং কি শুধু একটি সুদমুক্ত আর্থিক ব্যবস্থা, নাকি এটি ন্যায় ও ভারসাম্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত এক পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক দর্শন? প্রশ্নটি শুধু সাধারণ আমানতকারীদের নয়; বরং বর্তমান বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ইসলামিক অর্থনীতিবিদ, ফকিহ এবং আর্থিক নীতি-নির্ধারকদেরও। বিগত পাঁচ দশকে ইসলামি ব্যাংকিং বৈশ্বিক অর্থব্যবস্থায় এক বিস্ময়কর রূপান্তর ঘটিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ছাড়িয়ে ইউরোপ, আমেরিকা ও দূরপ্রাচ্যেও এর উপস্থিতি এখন দৃশ্যমান। বিশ্বজুড়ে ইসলামি অর্থায়ন আজ ট্রিলিয়ন ডলারের এক সুবিশাল শিল্পে রূপ নিয়েছে। কিন্তু এই অভাবনীয় সম্প্রসারণের বিপরীতে একটি কাঠামোগত প্রশ্ন ক্রমশ জোরালো হচ্ছে—ইসলামি ব্যাংকিং কি তার মূল দার্শনিক চেতনা বাস্তবায়ন করতে পেরেছে, নাকি ক্ষেত্রবিশেষে এটি প্রচলিত ব্যাংকিংয়েরই একটি ‘শরিয়া সংস্করণ’ হয়ে উঠেছে? বৈশ্বিক সম্পদের পরিমাণ বাড়লেও গুণগত পরিপালন নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আত্মসমালোচনামূলক গবেষণা চলছে। শুধু ‘রিবা’ বর্জন নয় অনেকেই ইসলামি ব্যাংকিংকে কেবল ‘সুদ এড়ানো’র বিকল্প মনে করেন। অথচ কোরআনের দৃষ্টিতে এটি একটি আংশিক ধারণা। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘আল্লাহ ব্যবসাকে ...

হাদিসে আলোকে মুমিনের ২০ গুণ

  ইমানদার আল্লাহ–তাআলার প্রিয় বান্দা। ইমানের আলোয় আলোকিত মানুষই দুনিয়ার পথচলায় সঠিক দিশা পায় এবং আখেরাতের অনন্ত জীবনে সফলতার অধিকারী হয়। পবিত্র কোরআন মুমিনদের এই সৌভাগ্যের কথা সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছে।  আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘তারাই নিজেদের পালনকর্তার পক্ষ থেকে সুপথপ্রাপ্ত, আর তারাই প্রকৃত সফলকাম।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ৫) তবে ইমান শুধু মুখের স্বীকৃতির নাম নয়, এর রয়েছে কিছু দৃশ্যমান আলামত, নৈতিক বৈশিষ্ট্য ও জীবনঘনিষ্ঠ দাবি। মানুষের অন্তরে ইমানের যে আলো জ্বলে, তার বিচ্ছুরণ আচরণ, চিন্তা, আমল ও জীবনদর্শনে প্রকাশ পায়। তাই প্রকৃত মুমিনকে চেনার জন্য তার কথার পাশাপাশি কর্ম ও চরিত্রের দিকেও তাকাতে হয়। ইমানের বাস্তবতা কেমন এক হাদিসে মুমিনের এমন ২০টি বৈশিষ্ট্যের কথা উঠে এসেছে, যার মধ্যে ইমানের মৌলিক বিশ্বাস, ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ আমল এবং উন্নত নৈতিক গুণাবলি সবই অন্তর্ভুক্ত। সাহাবি সুওয়াইদ ইবনে হারেস (রা.) বলেন, একবার তিনি তাঁর গোত্রের সাতজন লোককে সঙ্গে নিয়ে রাসুলের দরবারে উপস্থিত হন। তাঁদের চেহারা ও পোশাক দেখে সন্তুষ্ট হয়ে নবীজি জানতে চাইলেন, ‘তোমরা কারা?’ তাঁরা উত্তর দিলেন, ‘আমর...

আমাদের ‘সিরাত পাঠ’ কেন ফলপ্রসূ হচ্ছে না

  সিরাত মানে জীবনী। তবে নবীদের জীবনী, বিশেষ করে মহানবী (সা.)–এর জীবনীকে সিরাত বলা হয়ে থাকে। প্রতিবছর আমাদের দেশে বহু সিরাত মাহফিল, কুইজ প্রতিযোগিতা আর আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। বিশেষ করে সামনে রবিউল আউয়াল আসছে, আমরা বুক ফুলিয়ে দাবি করব, বিশ্বনবী মুহাম্মদ (সা.) আমাদের একমাত্র আদর্শ, জীবনের ধ্রুবতারা। শৈশব থেকেই স্কুল, কলেজ বা মাদ্রাসার বইয়ে আমরা তাঁর জীবনীর একটা নির্দিষ্ট ছক পড়ে বড় হই। কিন্তু এই দীর্ঘ সিরাত পাঠের প্রভাব আমাদের ব্যক্তিগত চরিত্র, পারিবারিক আচরণ বা ব্যবসায়িক লেনদেনে কতটুকু পড়ে? উত্তরটা আশাজাগানিয়া নয়। নবীজিকে জীবনের চেয়েও বেশি ভালোবাসার দাবি করলেও আমাদের দৈনন্দিন সততা বা পারিবারিক সহমর্মিতা সেই দাবির পক্ষে সাক্ষ্য দেয় না। এত দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়েও কেন সিরাতের প্রকৃত নির্যাস আমাদের জীবনে ধরা দেয় না? এটা ঠিক যে যত ঢাক ঢাক গুড় গুড়, তত যে সিরাত পড়া হয় তা–ও না। তবে আমার মনে হয়, যা পড়া হয়, তাতেও পদ্ধতিগত মোটাদাগে দুটি ঘাটতি আছে। কোরআনে বহু নবী-রাসুলের ইতিহাস বর্ণিত হলেও কোথাও সংগত কারণেই কোনো নবীর জন্মসাল, অবতীর্ণ হওয়ার ভৌগোলিক স্থানাঙ্ক বা যুদ্ধের দিনক্ষণের সানুপুঙ্খ...

নবীজির মা মারা যান কখন ও কোথায়

  নবীজির শৈশব শুরু হয়েছিল গভীর নিঃসঙ্গতা দিয়ে। জন্মের আগেই পিতৃহারা হওয়া শিশুটি মাত্র ছয় বছর বয়সে মাকেও হারান। সিরাত সাহিত্যের অন্যতম বেদনাদায়ক অধ্যায় মা আমেনার এই মৃত্যু। প্রাচীন ভূগোলবিদদের বিবরণ আর আধুনিক দূরত্ব-পরিমাপ মিলিয়ে দেখলে ঘটনাটির ভূগোল ও কালপঞ্জি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। মদিনা যাত্রার প্রেক্ষাপট দুধমাতা হালিমা সাদিয়ার কাছে শৈশবের প্রথম পর্ব কাটিয়ে মক্কায় ফেরার পর মা আমেনা তাঁর ছয় বছর বয়সী পুত্রকে নিয়ে ইয়াসরিবে (মদিনায়) যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। এর পেছনে পারিবারিক কারণ ছিল দুটি: এক. প্রয়াত স্বামী আবদুল্লাহর কবর জিয়ারত করা, দুই. প্রপিতামহ হাশিমের সূত্রে মদিনার বনু আদি ইবনে নাজ্জার গোত্রের আত্মীয়দের সঙ্গে শিশু মুহাম্মদের পরিচয় করিয়ে দেওয়া। (ইবনে সাদ, আত-তাবাকাতুল কুবরা, ১/১১৬, দারু সাদির, বৈরুত, ১৯৬৮) মা আমেনা, শিশু মুহাম্মদ আর তাঁদের বিশ্বস্ত পরিচারিকা উম্মে আইমান—এই ছোট্ট কাফেলাটি তৎকালীন প্রধান বাণিজ্যপথ ধরে মদিনায় পৌঁছে বনু নাজ্জারের পারিবারিক আবাসে প্রায় এক মাস অবস্থান করে। (ইবনে হিশাম, আবু মুহাম্মদ আবদুল মালিক, আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যাহ, ১/১৬৮, দারুল কি...

অজ্ঞতা ও জ্ঞানবিকৃতি: জাহালাতের স্বরূপ

  ফিতরাতি বাস্তুবিদ্যার জ্ঞানতত্ত্বে জাহালাতের আলোচনা ছাড়া ইলমের বোঝাপড়া কখনো পূর্ণ হতে পারে না। কারণ, জ্ঞান কেবল আলোর উপস্থিতি নয়; জাহালাত সেই অন্ধকার, যার মধ্যে আলো নিজের অর্থ হাসিল করে। যে দর্শন কেবল সত্যের উৎপত্তি ব্যাখ্যা করে, কিন্তু অসত্যের উৎপত্তি ব্যাখ্যা করতে পারে না, তার জ্ঞানতত্ত্ব নাতামাম থেকে যায়। অতএব ফিতরাতি বাস্তুবিদ্যার সামনে একটি মৌলিক সওয়াল হাজির হয়—মানুষ কেন ভুল জানে? কেন সত্য হাজির থাকার পরও তাকে ইনকার করে? কেন একই কায়েনাত, একই ফিতরাত এবং একই ইনসানি অভিজ্ঞতার মধ্যে থেকেও মানুষ পরস্পরবিরোধী বাস্তবতার নির্মাণ করে? এমন প্রশ্নগুলোর উত্তর তলবই জাহালাতের দর্শনের মতলব। এখানে একটি মৌলিক তফাত নির্ধারণ করে রাখি। অজ্ঞতা মানেই তথ্যের অভাব নয়। অনেক সময় মানুষ জানে না, কারণ জানার সুযোগ পায়নি; এটি জ্ঞানগত অপূর্ণতা। কিন্তু আরও গভীর একধরনের জাহালাত রয়েছে। যেখানে জেনেও মানুষ সত্যকে বিকৃত করে, আংশিক সত্যকে পূর্ণ সত্য বলে দাবি করে, অথবা নিজের স্বার্থের অনুকূলে হাকিকতকে পুনর্নির্মাণ করে। প্রথমটি সীমাবদ্ধতা; দ্বিতীয়টি বিকৃতি। ফিতরাতি বাস্তুবিদ্যার প্রধান আলোচ্য এই দ্বিতীয় ...

প্রশংসা পেলে মুমিনের ৫ করণীয়

  মানুষ প্রশংসা শুনতে ভালোবাসে। কেউ আমাদের কাজের প্রশংসা করলে ভালো লাগে। কেউ যোগ্যতা স্বীকার করলে আত্মবিশ্বাস বাড়ে। কখনো একটি সুন্দর কথা দিনের ক্লান্তি দূর করে দেয়। কিন্তু অন্যের প্রশংসা একধরনের পরীক্ষা। নিন্দা মানুষকে যেমন কষ্ট দেয়, প্রশংসা তেমনি মানুষকে নিজের সম্পর্কে ভুল ধারণায় ফেলতে পারে। মানুষ যখন বারবার বলে, ‘আপনি অনেক ভালো’, ‘আপনি অনেক জ্ঞানী’, ‘আপনার মতো মানুষ হয় না’ তখন অজান্তেই নিজের ভেতরে অহংকার জন্ম নিতে পারে। নিজের ব্যাপারে পবিত্রতার ধারণা হতে পারে। অথচ আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘তোমরা নিজেদের পবিত্র দাবি করো না। কে মুত্তাকি, তিনি তা ভালোভাবে জানেন।’ (সুরা নাজম, আয়াত: ৩২) প্রশংসা পেলে মুমিনের করণীয় সম্পর্কে উল্লেখ করা হলো। ১. আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করা কেউ আপনার জ্ঞান, সুন্দর ব্যবহার কিংবা কোনো ভালো কাজের প্রশংসা করলে মনে রাখুন, এই গুণ আপনার নিজের তৈরি নয়। আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘তোমাদের কাছে যে নেয়ামত আছে, তা আল্লাহর পক্ষ থেকে।’ (সুরা নাহল, আয়াত: ৫৩) তাই প্রশংসা শুনে অন্তরে বলা যায়, আলহামদুলিল্লাহ, ‘সব প্রশংসা আল্লাহর জন্য।’ কারণ মানুষ প্রশংসা করেছে বটে, কিন্তু যে গুণের কারণে প্রশ...