পোস্টগুলি

নসিহত: সমাজ সংস্কারের মূলমন্ত্র

  আমরা তথ্যের এক অতল মহাসাগরে বাস করছি। স্মার্টফোন আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কল্যাণে জ্ঞান এখন হাতের মুঠোয়। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, তথ্যের এই প্রাচুর্যের ভিড়েও আমরা অনেক সময় নৈতিকতা ও আত্মশুদ্ধির পথ হারিয়ে ফেলি। প্রচুর জানাশোনা থাকা সত্ত্বেও আমরা অনেক সময় অবলীলায় ভুলের ফাঁদে পা দিই। এখানেই ‘নসিহত’-এর অপরিহার্যতা। নসিহত মানে কেবল ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া উপদেশ নয়; বরং এটি হলো গভীর আন্তরিকতা, সতর্কতা এবং অন্যের মঙ্গলের জন্য এক নিঃস্বার্থ প্রেরণা। নসিহত কী নসিহত শব্দটির গভীরতা এর অর্থেই নিহিত: আভিধানিক অর্থ: কোনো কিছুকে খাঁটি করা, সুপথে পরিচালিত করা বা উপদেশ দেওয়া। প্রায়োগিক অর্থ: আল্লামা ইবনুস সালাহ (রহ.)-এর মতে, “নসিহত হলো এমন একটি ব্যাপক বিষয়, যা একজন মুসলিমের জন্য সব ধরনের কল্যাণকামিতাকে অন্তর্ভুক্ত করে এবং যা ইচ্ছা ও কর্ম—উভয় মাধ্যমেই প্রকাশ পায়।” কোরআনে নসিহত নবি-রাসুলদের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব ছিল মানুষকে নসিহত করা। পবিত্র কোরআনে এর গুরুত্ব বারবার এসেছে, “আমি তোমাদের কাছে আমার প্রতিপালকের বাণী পৌঁছে দিচ্ছি এবং আমি তোমাদের একজন বিশ্বস্ত নসিহতকারী।” (সুরা আরাফ, আয়াত: ৬৮) “আর উপদে...

জিজ্ঞাসা: দর্শন বনাম কোরআনের দৃষ্টিভঙ্গি

  মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব কারণ তার মধ্যে রয়েছে চিন্তা ও প্রশ্ন করার ক্ষমতা। শৈশব থেকেই মানুষ ‘কেন’ এবং ‘কীভাবে’—এই দুই শব্দের মাধ্যমে জগতকে চিনতে শুরু করে। জ্ঞানবিজ্ঞানের ইতিহাসে এই ‘জিজ্ঞাসা’ বা ‘প্রশ্ন’ করার গুরুত্ব অপরিসীম। তবে গতানুগতিক দার্শনিক প্রশ্ন এবং পবিত্র কোরআনের উপস্থাপিত প্রশ্নের মধ্যে এক মৌলিক পার্থক্য বিদ্যমান। দার্শনিক প্রশ্ন অনেক সময় কেবল প্রশ্নের খাতিরেই করা হয়, কিন্তু কোরআনের প্রশ্ন মানুষকে এক গভীর জীবনবোধ ও নৈতিক দায়বদ্ধতার দিকে নিয়ে যায়। দর্শনে প্রশ্নের সীমাবদ্ধতা পাশ্চাত্য বা প্রথাগত দর্শনের মূল ভিত্তি হলো প্রশ্ন করা। দার্শনিকরা মনে করেন, দর্শনে উত্তরের চেয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। দর্শন মূলত অস্তিত্ব, জ্ঞান ও মূল্যবোধের মতো বিষয়গুলো নিয়ে মানুষের ‘বিমূর্ত বুদ্ধি’ বা কেবল যুক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে কাজ করে। এতে দুটি বড় সীমাবদ্ধতা দেখা যায়: ১. ফলহীন জিজ্ঞাসা: অনেক ক্ষেত্রে দার্শনিকরা প্রশ্ন তুলেই ক্ষান্ত হন, উত্তরের সন্ধানে বা তা থেকে প্রাপ্ত জ্ঞানকে কর্মে রূপান্তরের ব্যাপারে তারা উদাসীন থাকেন। ২. অভিজ...

হাফসা বিনতে সিরিন: জ্ঞান ও তাকওয়ার আলোকবর্তিকা

  ইসলামি ইতিহাসের সোনালি অধ্যায়গুলোর দিকে তাকালে আমরা এমন কিছু মহীয়সী নারীর দেখা পাই, যাঁদের জ্ঞানতৃষ্ণা, প্রজ্ঞা এবং আমল পরবর্তী প্রজন্মের জন্য অনুকরণীয় আদর্শ হয়ে আছে। তাঁদেরই একজন তাবেয়ি যুগের শ্রেষ্ঠ নারী ফকিহ ও মুহাদ্দিস হাফসা বিনতে সিরিন। এই সময়ে, যখন ধর্মীয় জ্ঞান চর্চায় পুরুষদের পাশাপাশি নারীদের অংশগ্রহণ নিয়ে অনেকের মনে অস্পষ্টতা কাজ করে, তখন হাফসা বিনতে সিরিনের জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ইসলামে জ্ঞান অর্জনের পথ নারী-পুরুষ সবার জন্যই সমানভাবে উন্মুক্ত। পারিবারিক প্রেক্ষাপট ও শৈশব হাফসা বিনতে সিরিন ৩১ হিজরিতে খলিফা ওসমান (রা.)-এর আমলে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা সিরিন ছিলেন বিশিষ্ট সাহাবি আনাস ইবনে মালিকের মুক্ত করে দেওয়া গোলাম। সিরিন মূলত ইরাকের মরু অঞ্চল থেকে যুদ্ধবন্দী হিসেবে এসেছিলেন প্রথমে খালিদ বিন ওয়ালিদের মালিকানায় থাকলেও পরে আনাস ইবনে মালিক (রা.) তাঁকে কিনে নেন। পরবর্তীকালে সিরিন চুক্তির মাধ্যমে নিজের ও পরিবারের মুক্তি কিনে নেন। তবে আনাস ইবনে মালিকের সান্নিধ্যে থেকে এই পরিবারটি যে অমূল্য জ্ঞানতাত্ত্বিক সম্পদ অর্জন করেছিল, তা ছিল পার্থিব যে কোনো মূল্যের চেয়ে অনেক বেশি। ...

ইসলামের ইতিহাসে জনমত ও জনরোষ

  সাধারণত মনে করা হয়, ‘জনমত’ (পাবলিক অপিনয়ন) বিষয়টি আধুনিক গণতন্ত্রের আবিষ্কার। কিন্তু ইসলামের রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাসের পাতায় তাকালে দেখা যায়, মুসলিম সভ্যতায় ‘জনমত’ বা ‘আমজনতার রায়’ ছিল সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনার অন্যতম প্রধান শক্তি। ইসলামের স্বর্ণযুগে আমজনতা কেবল নীরব দর্শক ছিল না; বরং ফকিহদের তাত্ত্বিক আলোচনায় তাঁদের দেওয়া হয়েছিল ‘ইসমা’ বা অভ্রান্ততার মর্যাদা, আর বাস্তবে তাঁরা গড়ে তুলেছিলেন এমন সব আন্দোলন, যা প্রতাপশালী সুলতানদেরও পদত্যাগে বাধ্য করেছিল। আজকের এই নিবন্ধে আমরা আলোচনা করব কীভাবে ইসলামি ঐতিহ্যে জনমত একটি শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করেছে। ইমাম গাজ্জালি ও ইবনে তাইমিয়ার মতো মনীষীরা মনে করতেন, যে বিষয়ে পুরো উম্মাহ একমত হয়, সেখানে ভুলের কোনো স্থান নেই। ‘উম্মাহর ঐক্য’ বনাম ‘আলেমদের ঐক্য’ ইসলামি আইনশাস্ত্রে (উসুলুল ফিকহ) ‘ইজমা’ বা ঐক্যমত্য একটি মৌলিক দলিল। কিন্তু এই ঐক্যে সাধারণ মানুষের স্থান কোথায়? ইমাম আবু হাসান আমিদি (মৃ. ১২৩৪ খ্রি.) তাঁর ‘আল-ইহকাম’ গ্রন্থে একটি বৈপ্লবিক পার্থক্য তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, “যদি আমরা সাধারণ মানুষকেও ঐক্যের অন্তর্ভুক্ত করি, তবে তাকে বলা...

মুসলিম সিসিলির উত্থান-পতনের ইতিহাস

  ইউরোপের বুকে ইসলামের পদচিহ্নের কথা বললেই আমাদের চোখে ভেসে ওঠে স্পেনের আন্দালুস কিংবা অটোমান সাম্রাজ্যের বলকান বিজয়ের ছবি। কিন্তু ইতিহাসের পাতায় প্রায়ই অনালোচিত থেকে যায় ভূমধ্যসাগরের তীরে ইতালির দক্ষিণ উপকূলে অবস্থিত সিসিলি দ্বীপের কথা। দীর্ঘ ২০০ বছরের বেশি সময় এই দ্বীপ মুসলিম শাসনের অধীন ছিল, যা কেবল সামরিক বিজয় নয়, বরং জ্ঞানবিজ্ঞান ও সংস্কৃতির এক অনন্য মিলনস্থলে পরিণত হয়েছিল। সিসিলি বিজয়ের সূচনা সিসিলি বিজয়ের ইতিহাস শুরু হয় উত্তর আফ্রিকার আঘলাবি রাজবংশের হাত ধরে। আব্বাসীয় খলিফা হারুনুর রশিদের সময় ইব্রাহিম ইবনে আল-আঘলাব তিউনিসিয়ার কাইরাওয়ানে এই বংশের পত্তন করেন। তবে সিসিলি অভিযানের প্রেক্ষাপট ছিল বেশ নাটকীয়। ৮২৬ খ্রিষ্টাব্দে বাইজেন্টাইন নৌ কমান্ডার ইউফেমিয়াস বিদ্রোহ করে আঘলাবি আমির জিয়াদাতুল্লাহর দরবারে সাহায্য প্রার্থনা করেন। এ অভিযানে আমির জিয়াদাতুল্লাহ সেনাপতি হিসেবে নিযুক্ত করেন প্রখ্যাত ফকিহ (আইনবিদ) আসাদ ইবনে আল-ফুরাতকে। তিনি ইমাম মালিক ও ইমাম আবু হানিফার ছাত্রদের কাছে শিক্ষা লাভ করেছিলেন। মূলত একাধারে তাত্ত্বিক ও সমরকুশলী এই ব্যক্তিত্বের নেতৃত্বে ৮২৭ খ্রিষ্টাব্দে ১০ হাজ...

উমাইয়া যুগে আরব কারিগরদের স্থাপত্যের মহিমা

  মুসলিম স্থাপত্যের ইতিহাস যেন এক জীবন্ত গল্প, যেখানে শিল্প, সংস্কৃতি আর ধর্মের মেলবন্ধন এক অপূর্ব সৌন্দর্য সৃষ্টি করেছে। দামেস্কের উমাইয়া মসজিদ, জেরুজালেমের কুব্বাতুস সাখরা (ডোম অব রক)—এই স্থাপত্যগুলো ইসলামের প্রথম শতাব্দীর গৌরবের সাক্ষী; কিন্তু পশ্চিমা ইতিহাসবিদদের কেউ কেউ দাবি করেন, এসব স্থাপত্য আরব বা মুসলিমদের সৃষ্টি নয়; বরং বাইজান্টাইন বা অন্য অমুসলিম কারিগরদের হাতে তৈরি। এই দাবি কি সত্য? নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে ইতিহাসের ভুল ব্যাখ্যা? মুসলিম স্থাপত্য কি আরবদের নয়? পশ্চিমা কিছু ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক মনে করেন, মুসলিম স্থাপত্যের মূল উৎস বাইজান্টাইন বা পারস্যের মতো পূর্ববর্তী সভ্যতা। তাঁরা বলেন, আরব মুসলিমদের এতে কোনো মৌলিক অবদান নেই। উদাহরণ হিসেবে তারা দামেস্কের উমাইয়া মসজিদ (৭০৬-৭১৪ খ্রিষ্টাব্দ) ও কুব্বাতুস সাখরা (৬৯১ খ্রিষ্টাব্দ) নির্মাণের কথা তুলে ধরেন। তাঁদের মতে, এই স্থাপত্যের জটিল মোজাইক ও নকশা বাইজান্টাইন কারিগরদের কাজ। এই দাবির পেছনে তারা কিছু ইসলামী ঐতিহাসিকের বর্ণনার দুর্বলতা ব্যবহার করেছেন।উদাহরণস্বরূপ ঐতিহাসিক মাকদিসি লিখেছেন, খলিফা ওয়ালিদ বিন আবদুল মালিক...

ইসলামে ভাষা, সাহিত্য ও বই

  ভাষা আল্লাহর দান সব ভাষাই আল্লাহর দান ও তাঁর কুদরতের নিদর্শন। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর তাঁর নিদর্শনাবলির মধ্যে রয়েছে আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টি এবং তোমাদের ভাষা ও বর্ণের বৈচিত্র্য। এতে জ্ঞানীদের জন্য অবশ্যই বহু নিদর্শন রয়েছে।’ (সুরা-৩০ রুম, আয়াত: ২২)। পবিত্র কোরআনের বর্ণনা, ‘দয়াময় রহমান আল্লাহ! কোরআন পাঠ শেখালেন; মনুষ্য সৃজন করলেন; তাকে ভাষা বয়ান শিক্ষা দিলেন।’ (সুরা-৫৫ আর রহমান, আয়াত: ১-৪)। আল্লাহ তাআলা কিতাব নাজিল করেছেন এবং নবী–রাসুলগণকে পাঠিয়েছেন তাঁদের স্বজাতির ভাষায়। কোরআন মাজিদে এসেছে, ‘আমি প্রত্যেক রাসুলকেই তঁার স্বজাতির ভাষাভাষী করে পাঠিয়েছি তাদের নিকট পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যা করার জন্য।’ (সুরা-১৪ ইবরাহিম, আয়াত: ৪)। মহাগ্রন্থ আল–কোরআন আরবি ভাষায় নাজিল করার কারণ সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা স্বয়ং ব্যাখ্যা প্রদান করেন এভাবে, ‘আমি অবতীর্ণ করেছি আরবি ভাষায় কোরআন, যাতে তোমরা বুঝতে পরো।’ (সুরা-১২ ইউসুফ, আয়াত: ২)। অর্থাৎ আরবদের কাছে আরবি নবী ও আরবি কিতাব আল–কোরআন নাজিল করা হয়েছে। কারণ, তাদের মাতৃভাষা আরবি; অনারবি ভাষায় নাজিল করলে তাদের বুঝতে এবং অনুসরণ করতে সহজ...