পোস্টগুলি

সামাজিক নিরাপত্তা রক্ষায় ইসলামের ৫ মূলনীতি

  সমাজে যখন ভয়ভীতি জেঁকে বসে এবং মানুষের মধ্যে আস্থার অভাব দেখা দেয়, তখন অর্থনৈতিক বা সাংস্কৃতিক উন্নতি থমকে যেতে বাধ্য। বর্তমানে সামাজিক নিরাপত্তাকে কেবল রাষ্ট্রীয় আইন বা অর্থনৈতিক বিমার ফ্রেমে দেখা হলেও ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গিতে এটি আরও গভীর ও ব্যাপক। ইসলাম মনে করে, নাগরিকের জানমাল, ইজ্জত ও মৌলিক অধিকারের সুরক্ষা নিশ্চিত করাই হলো সামাজিক নিরাপত্তার মূল লক্ষ্য। নিরাপত্তার আধুনিক ধারণা সামাজিক নিরাপত্তার আধুনিক ধারণাটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায় উনবিংশ শতাব্দীতে। ১৮৮০-এর দশকে জার্মান চ্যান্সেলর অটো ফন বিসমার্ক শ্রমিকদের জন্য সামাজিক বিমা চালু করেন। পরে ১৯৩৫ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন ডি রুজভেল্ট সামাজিক নিরাপত্তা আইন পাস করেন। তবে ইসলাম এই আধুনিক কাঠামোর অনেক আগেই একটি মানবিক ও কার্যকর নিরাপত্তা মডেল পেশ করেছে। ইসলামের এই মডেলে কেবল আইন নয়, বরং নৈতিকতা ও ধর্মীয় দায়বদ্ধতাকে প্রধান্য দেওয়া হয়েছে। আত্মিক প্রশান্তিই পূর্বশর্ত ইসলামি দর্শনে নিরাপত্তার শুরু হয় মানুষের ভেতর থেকে। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘জেনে রেখো, আল্লাহর স্মরণেই কেবল চিত্ত প্রশান্ত হয়।’ (সুরা রাআদ, আয়াত: ২৮) একজন মানুষ...

পরকালে শয়তানের দায়মুক্তি আর অনুসারীদের আক্ষেপ

  মানুষের চিরশত্রু ইবলিস শয়তান। দুনিয়ার জীবনে সে মানুষকে নানা কৌশলে প্রলোভন দেখায় এবং পাপে লিপ্ত করে। কিন্তু পরকালের কঠিন সময়ে এই ইবলিসই তার অনুসারীদের সঙ্গে যে আচরণ করবে, তা অত্যন্ত ভয়াবহ। কোরআনের বিভিন্ন আয়াতে সেই চরম সত্যটি ফুটিয়ে তোলা হয়েছে, যা থেকে বর্তমান সময়ের মানুষের জন্য অনেক শিক্ষণীয় বিষয় রয়েছে। হাশরের ময়দানে চরম ক্ষোভ দুনিয়াতে যারা শয়তানের প্রলোভনে পড়ে পথভ্রষ্ট হয়, পরকালে তাদের অবস্থা হবে অত্যন্ত করুণ। সেদিন তারা নিজেদের পথভ্রষ্টকারীদের ওপর প্রচণ্ড ক্ষোভে ফেটে পড়বে। পবিত্র কোরআনে সেই দৃশ্যটি এভাবে বর্ণিত হয়েছে: ‘কাফেররা বলবে, হে আমাদের প্রতিপালক, যেসব জিন ও মানুষ আমাদের পথভ্রষ্ট করেছিল, তাদের আমাদের দেখিয়ে দিন; আমরা তাদের আমাদের পায়ের নিচে রাখব, যাতে তারা চরম লাঞ্ছিত হয়।’ (সুরা ফুসসিলাত, আয়াত: ২৯)এই আয়াতে যারা পথভ্রষ্ট হয়েছে, তাদের মনের তীব্র আক্রোশ ফুটে উঠেছে। তারা চাইবে তাদের সেই তথাকথিত নেতাদের—চাই তারা জিন হোক বা মানুষ—পায়ের নিচে পিষ্ট করতে। তারা মনে করবে, এদের কারণেই আজ তাদের এই দুরবস্থা। তাফসিরে ওয়াসিত -এ বলা হয়েছে, তারা সেদিন তাদের ওপর চরম ঘৃণা ও রাগে পা দিয়ে মাড়...

শাওয়ালের ছয় রোজা: অল্প আমলে সারা বছরের সওয়াব

  রমজান শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু ইবাদত ও সওয়াব অর্জনের সেই দরজা এখনো বন্ধ হয়নি। আল্লাহ-তাআলা তাঁর বান্দাদের জন্য রমজানের পরও শাওয়াল মাসে একটি বিশেষ সুযোগ রেখে দিয়েছেন। সুযোগটি শুধু একটি আমল নয়; বরং মুমিনের জন্য ইবাদতের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। এ সুযোগের মূল্য অপরিসীম এবং এর প্রতিদান দীর্ঘস্থায়ী। কী সেই সুযোগ শাওয়াল মাসে ছয়টি নফল রোজা রাখাই হচ্ছে বিশেষ সেই সুযোগ। এই ছয়টি রোজা মূলত রমজানের প্রশিক্ষণকে ধরে রাখারই একটি বাস্তব প্রয়োগ। যারা রমজানে নিজেদের গুনাহ থেকে বাঁচিয়ে ইবাদতে অভ্যস্ত করেছেন, তাঁদের জন্য এটি সেই ধারাকে অব্যাহত রাখার সহজ পথ। ফজিলত ও হিসাব আমরা কি চাইলেই সারাবছর রোজা রাখতে পারব? মনে হয় না। কাজটা বেশ কঠিন। কিন্তু মাত্র ছয় দিন রোজা রাখার ফলেই আমরা সেই কঠিন কাজটির সওয়াব পেতে পারি ইনশাআল্লাহ। শাওয়ালের ছয়টি রোজা রাখলে কীভাবে তা এক বছর রোজা রাখার সমান হতে পারে? এ প্রসঙ্গে কোরআনের এই আয়াতের দিকে লক্ষ করা যায়: ‘যে ব্যক্তি একটি নেক আমল করল, তার জন্য থাকবে দশ গুণ প্রতিদান।’ (সুরা আনআম, আয়াত: ১৬০) শাওয়াল মাসের নফল রোজার প্রতিদান প্রকৃতপক্ষেই অপরিসীম। রাসুলুল্ল...

বুবুর লাম্বুক’ আর বর্ণিল রমজান বাজারের দেশে

  মালয়েশিয়ার রমজান এক অনন্য আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতার নাম। এখানকার ইফতারের আয়োজন থেকে শুরু করে তারাবির আমেজ—সবকিছুতেই রয়েছে মালয় সংস্কৃতির নিজস্ব ছাপ। বিশেষ করে আধুনিক মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরের আকাশচুম্বী ভবনের নিচে যখন ঐতিহ্যবাহী ‘রমজান বাজার’ বসে, তখন এক অন্যরকম দৃশ্য তৈরি হয়। ভালোবাসার এক বাটি খিচুড়ি মালয়েশিয়ার রমজানের সমার্থক নাম হলো ‘বুবুর লাম্বুক’। এটি মূলত চাল, গরুর মাংস (বা চিংড়ি), নারকেলের দুধ এবং প্রচুর মশলা দিয়ে তৈরি এক ধরণের ঘন খিচুড়ি বা স্যুপ। কুয়ালালামপুরের বিখ্যাত কাম্পুং বারু মসজিদে প্রতিদিন বড় বড় ডেকচিতে এই খিচুড়ি রান্না করা হয়। আসরের পর থেকে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে হাজার হাজার মানুষ এই খাবার সংগ্রহ করেন। এটি সম্পূর্ণ বিনামূল্যে বিতরণ করা হয়।  অনেকে বাড়িতেও এটি তৈরি করে প্রতিবেশী ও পথচারীদের মধ্যে বিলিয়ে দেন। রমজান বাজার আসরের নামাজের পর মালয়েশিয়ার রাজপথগুলোতে বসে শত শত ‘বাজার রামাদান’ (Pasar Ramadan)। এখানে পাওয়া যায় ঐতিহ্যবাহী লেমাং—যা বাঁশের নলের ভেতর কলাপাতায় মোড়ানো চাল ও নারকেলের দুধ দিয়ে রান্না করা হয়। এছাড়া আছে মুর্তাবাক এবং বিখ্যাত মিষ্টি পুতু পিরিং।...

বরকত ও বৈচিত্র্যে সুবাসিত শামের রমজান

  সিরীয়দের কাছে রমজান হলো বরকতের মাস। দামেস্কের সরু গলি থেকে শুরু করে উত্তর সিরিয়ার প্রান্তিক জনপদ—সবখানেই এই মাসের আলাদা এক সুবাস পাওয়া যায়। ইসলামের ইতিহাসে এই ভূখণ্ড ‘শাম’ নামে পরিচিত। যদিও সময় এখন প্রতিকূল, তবুও সিরীয় সংস্কৃতিতে রমজানের জৌলুস আজও টিকে আছে তাদের দস্তরখানে, আতিথেয়তায় এবং প্রতিবেশীর সঙ্গে খাবার ভাগ করে নেওয়ার চিরায়ত অভ্যাসে। পাতে পাতে বৈচিত্র্য  সিরিয়ার ইফতারের টেবিলকে বলা হয় ‘সুফরা’। একটি আদর্শ সিরীয় ইফতারে খাবারের বৈচিত্র্য চোখ ধাঁধিয়ে দেওয়ার মতো। ইফতার শুরু হয় মূলত খেজুর এবং এক বাটি ‘শোরবা’ বা স্যুপ দিয়ে। এরপর আসে সিরিয়ার সবচেয়ে জনপ্রিয় সালাদ ‘ফাত্তুশ’। ভাজা রুটির কুচি, পুদিনা পাতা, সুমাক মশলা আর ডালিমের রস দিয়ে তৈরি এই সালাদ ছাড়া সিরীয়দের ইফতার যেন অসম্পূর্ণ। প্রধান খাবারের মধ্যে থাকে ‘কিববেহ’—যা মাংস এবং গুঁড়ো গম (বুরগুল) দিয়ে তৈরি এক বিশেষ পদ। এছাড়া আছে ‘মাহশি’, যা মূলত আঙুর পাতা বা বাঁধাকপির ভেতরে চাল ও মাংসের পুর দিয়ে তৈরি করা হয়।  সিরীয়দের প্রিয় আরেকটি পদ হলো ‘ফাত্তাহ’। দই, সেদ্ধ ছোলা এবং মুচমুচে রুটির সংমিশ্রণে তৈরি এই খাব...

কদর রাতের প্রস্তুতি ও পরিকল্পনা

  রমজানের শেষ দশ রাত মুসলিমদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও মহিমান্বিত সময়। এই রাতগুলোর যেকোনো একটি হতে পারে লাইলাতুল কদর, যে রাত সম্পর্কে কোরআনে বলা হয়েছে—এটি হাজার মাসের চেয়েও উত্তম। একজন মুমিনের জন্য এই রাতগুলোকে ইবাদত, জিকির ও দোয়ার মাধ্যমে কাটানো পরম সৌভাগ্যের বিষয়। এই বরকতময় রাতকে সুন্দরভাবে কাজে লাগানোর জন্য কিছু প্রস্তুতি ও করণীয় আমল নিচে দেওয়া হলো: প্রস্তুতি ও পরিকল্পনা কদরের রাত ইবাদতে কাটানোর জন্য দিনের বেলায় কিছুটা ঘুমিয়ে নিন। এতে রাত জেগে ইবাদত করার শক্তি পাবেন। মাগরিবের পর থেকে সময়গুলো যেন পুরোপুরি ইবাদতে ব্যয় করতে পারেন, সে জন্য প্রয়োজনীয় কাজগুলো আগেই সেরে রাখুন। ইফতার ও মাগরিব:  সূর্যাস্তের সঙ্গে সঙ্গেই সুন্নাহ অনুযায়ী ইফতার করুন। অতিরিক্ত ইফতার না খেয়ে পুষ্টিকর খাবার খান, যেন ক্লান্তিতে ঘুম না আসে। মাগরিবের নামাজ খুশু-খুজুর সঙ্গে দীর্ঘ রুকু ও সিজদার মাধ্যমে আদায় করুন। নামাজের পর নির্ধারিত জিকিরগুলো (সুবহানাল্লাহ ৩৩ বার, আলহামদুলিল্লাহ ৩৩ বার, আল্লাহু আকবার ৩৩ বার) সম্পন্ন করুন। সাইয়্যিদুল ইস্তিগফার:  সন্ধ্যার দোয়া ও জিকিরগুলো মনোযোগ দিয়ে পড়ুন। বিশেষ করে ...

মেসোপটেমীয় ঐতিহ্য আর আতিথেয়তার অনন্য উপাখ্যান

  ইরাকের রমজান যেন প্রাচীন ব্যবিলনীয়, সুমেরীয় এবং আব্বাসীয় ঐতিহ্যের এক জীবন্ত জাদুঘর। বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে দেখা যায়, মুদ্রাস্ফীতি বা দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি থাকলেও ইরাকিদের হৃদয়ের প্রশস্ততা এবং আতিথেয়তায় কোনো ভাটা পড়েনি। বিশ্বের প্রথম ‘কুকবুক’ ইরাকিদের রান্নার হাত হাজার বছরের পুরনো। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ে সংরক্ষিত ১৭৫০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দের তিনটি প্রাচীন মাটির ফলক বা কিউনিফর্ম স্ক্রিপ্টকে বলা হয় বিশ্বের প্রথম রান্নার বই। মজার ব্যাপার হলো, সেই সাড়ে তিন হাজার বছর আগের ‘তশরীব’ বা ‘খুবজ আল-আরুক’ (বিশেষ রুটি) আজও ইরাকি ইফতারের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ইফতারের রাজকীয় পদ ইরাকের ইফতারে মাছের প্রাধান্য চোখে পড়ার মতো, যা অন্য অনেক আরব দেশে বিরল। মাসকুফ:  এটি ইরাকের জাতীয় খাবার। কার্প জাতীয় মাছকে পিঠের দিক দিয়ে চিরে বিশেষ মশলায় মাখানো হয়। এরপর কাঠের খুঁটিতে গেঁথে আগুনের পাশে রেখে অত্যন্ত ধীরগতিতে ঝলসানো হয়। ৪,৫০০ বছর আগের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনেও এই মাসকুফ রান্নার প্রমাণ পাওয়া গেছে। দোলমা ও দুলাইমিয়া:  আঙুর পাতা বা সবজির ভেতরে মাংস ও চালের পুর দিয়ে তৈরি ‘দোলমা’ এবং আ...