পোস্টগুলি

সভ্যতা রক্ষা ও বিপর্যয় রোধে কোরআনের অনন্য দর্শন

  প্রাক-ইসলামি আমলে এমন অনেক জাতি ছিল, যারা শক্তি, প্রাচুর্য ও অহমিকায় মত্ত ছিল। তারা দিগ্বিদিকে বিজয়ের পতাকা উড়িয়েছে, রাজত্বের সীমানা বিস্তার করেছে এবং অন্য জাতির ঐশ্বর্য-সম্পদ কেড়ে নিয়েছে। তাদের অনুসৃত পদ্ধতি ছিল বর্বর ও পাশবিক। কোনো ন্যায়নীতির তোয়াক্কা তারা করত না। বিভিন্ন শহর দখল করার সময় তারা নাগরিক স্থাপত্য ও সভ্যতা অবলীলায় ধ্বংস করে দিত। মানুষের ঘরবাড়ি লুণ্ঠন করত এবং স্থানীয়দের দাসে পরিণত করত। বিজয়ের পর তারা এমন প্রশাসক নিযুক্ত করত, যারা সাধারণ মানুষের ওপর অমানবিক অত্যাচার চালিয়ে যেত। ইতিহাসজুড়ে বিজয়ী শক্তিগুলোর চরিত্র ছিল এমনই। প্রাচীন শেবা নগরের রানি বিলকিস এই বাস্তবতাই ফুটিয়ে তুলেছিলেন, যখন তাঁর কাছে সোলাইমান (আ.)-এর চিঠি পৌঁছেছিল। তিনি বলেছিলেন, ‘রাজা-বাদশাহরা যখন কোনো জনপদে প্রবেশ করে, তখন তা বিপর্যস্ত করে দেয় এবং সেখানকার মর্যাদাবান ব্যক্তিদের অপদস্থ করে।’ (সুরা নামল, আয়াত: ৩৪) ইসলাম কঠোরভাবে দুর্নীতি ও বিপর্যয় সৃষ্টির বিরুদ্ধে সতর্ক করেছে। ইসলাম তার অনুসারীদের অন্তর থেকে এই ঘৃণ্য ব্যাধি আমূলে উপড়ে ফেলেছে। প্রতি যুগেই বিভিন্ন জাতির হাতে সংঘটিত এমন নৃশংসতা ও বর্বরতার গল...

আল্লাহর ওপর ভরসা করার ৬ উপকারিতা

  ইসলামি জীবনদর্শনে ‘তাওয়াক্কুল’ বা আল্লাহর ওপর ভরসা রাখা ইমানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। এই গুণের অধিকারী ব্যক্তি শুধু মানসিক প্রশান্তিই পান না, বরং দুনিয়া ও আখেরাতে বিশেষ মর্যাদাও লাভ করেন। তাওয়াক্কুলের ছয়টি উল্লেখযোগ্য লাভ নিচে আলোচনা করা হলো। ১. আল্লাহই যথেষ্ট হয়ে যান যিনি মহান আল্লাহর ওপর পরিপূর্ণ ভরসা করেন, আল্লাহ তাঁর সবকিছুর দায়দায়িত্ব নিজ জিম্মায় নিয়ে নেন। তখন ওই ব্যক্তির মনে কোনো জাগতিক পেরেশানি থাকে না। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘আর যে আল্লাহকে ভয় করে তিনি তার জন্য সংকট থেকে উত্তরের পথ বের করে দেন এবং এমন স্থান থেকে তার জীবিকার ব্যবস্থা করে দেন যা সে ভাবতেও পারে না। আর যে আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করে তিনি তার জন্য যথেষ্ট।’ (সুরা তালাক, আয়াত: ২-৩) অন্য আয়াতে বলা হয়েছে, ‘হে নবী, আপনার ও আপনার অনুসারী মুমিনদের জন্য আল্লাহই যথেষ্ট।’ (সুরা আনফাল, আয়াত: ৬৪) ২. শত্রুর বিরুদ্ধে ঐশ্বরিক সাহায্য আল্লাহর ওপর ভরসাকারীকে তিনি কখনো শত্রুর হাতে ছেড়ে দেন না। বরং শত্রুর মোকাবিলা করার শক্তি ও সাহস জোগান। ইসলামের ইতিহাসে এর ভূরি ভূরি প্রমাণ রয়েছে। সাহাবিদের তাওয়াক্কুল সম্পর্কে কোরআনে বর্ণ...

পরকালে শয়তান যেভাবে তার প্রতারণার কথা স্বীকার করবে

মানুষের চিরশত্রু ইবলিশ শয়তান। মিথ্যা আশার জালে বন্দি করে সে মানুষকে এমন এক অতল গহ্বরে নিয়ে যায়, যেখান থেকে ফেরার কোনো পথ থাকে না। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ–তাআলা কেয়ামতের দিবসে পথভ্রষ্ট অনুসারী এবং শয়তানের মধ্যকার এক ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেছেন। ঘৃণার সেই মুহূর্ত পরকালের কঠিন মুহূর্তে অবিশ্বাসীরা যখন দেখবে যে তাদের সব সম্বল ধুলোয় মিশে গেছে এবং তারা দোজখের দ্বারপ্রান্তে, তখন তাদের অন্তরে ক্ষোভের সৃষ্টি হবে। তারা সেই সব মানুষ ও শয়তানকে খুঁজবে যারা তাদের বিভ্রান্ত করেছিল। অথচ দুনিয়াতে তাদের পরম বন্ধু বা আদর্শ মেনেছে তারা। বন্ধুত্ব সেদিন চরমতম শত্রুতায় রূপ নেবে। কোরআনের ভাষায়, “কাফেররা বলবে, হে আমাদের প্রতিপালক, জিন ও মানুষের মধ্যে যারা আমাদের পথভ্রষ্ট করেছিল, তাদের আমাদের দেখিয়ে দিন; আমরা তাদের আমাদের পায়ের নিচে রাখব, যাতে তারা নিকৃষ্টতরদের (আসফালিন) অন্তর্ভুক্ত হয়।” (সুরা ফুসসিলাত, আয়াত: ২৯) এই আয়াতে পায়ের নিচে রাখার আকাঙ্ক্ষা থেকে তাদের হৃদয়ে ফুটতে থাকা ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটে। অথচ দুনিয়াতে তাদের পরম বন্ধু বা আদর্শ মেনেছে তারা। বন্ধুত্ব সেদিন চরমতম শত্রুতায় রূপ নেবে।আল্লামা তানতাভি লিখেছেন, তার...

ওহি ও বুদ্ধিবৃত্তি: ইসলামি জ্ঞানতত্ত্বের ভারসাম্য

  ওহি ও বুদ্ধিবৃত্তির  সম্পর্ক ইসলামে গুরুত্বপূর্ণ।  এই সম্পর্কে একটি  জ্ঞানতাত্ত্বিক ভারসাম্য কাজ করে। আকল (বুদ্ধিবৃত্তি) ছাড়া নকল (বর্ণনা) অন্ধ অনুকরণে পরিণত হয়, আর নকল ছাড়া আকল সীমাহীন আপেক্ষিকতা ও বিভ্রান্তিতে পতিত হয়। ইসলামি সভ্যতার বড় বড় বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্য ও কাঠামোতে এই ভারসাম্য রক্ষার প্রচেষ্টা লক্ষ্যণীয়। উসুলুল ফিকহ, কাওয়াইদুল ফিকহ, ইলমুল কালাম, নকদুল হাদিস, তাসাউফ, মাকাসিদে শরিয়াসহ শাস্ত্রীয় আয়তনে এর নমুনা বহুবিস্তৃত। ইসলামি জ্ঞানতত্ত্বের ইতিহাস মূলত আকল ও নকলের সৃজনশীল সমন্বয়ের ইতিহাস। আকলের কাজ  ওহির উদ্দেশ্য, হিকমাহ ও প্রয়োগ বুঝতে সাহায্য করা। যেমন, কোরআন ন্যায়বিচারের আদেশ দেয়। কিন্তু কোন সামাজিক কাঠামোতে কীভাবে ন্যায় প্রতিষ্ঠিত হবে, তা বুঝতে আকলের প্রয়োজন। কোরআন সুদ নিষিদ্ধ করে। কিন্তু আধুনিক অর্থনীতির জটিল  কাঠামোয় সুদের রূপ শনাক্ত করতে বুদ্ধিবৃত্তিক বিশ্লেষণ প্রয়োজন। কোরআন মানবমর্যাদার কথা বলে। কিন্তু প্রযুক্তি, বায়োপলিটিক্স বা ডিজিটাল নজরদারির যুগে সেই মর্যাদার সুরক্ষা কীভাবে হবে, তা উদঘাটনে আকল অপরিহার্য। যে আকল ওহির সত্যতা চিনতে পারে, ওহ...

পুণ্যবানরা কেন প্রভুর সান্নিধ্যে যেতে ব্যাকুল থাকেন

  মানুষের হৃদয়ে আল্লাহর প্রতি ভালোবাসার বীজ অঙ্কুরিত হলে জন্ম নেয় এক পবিত্র তৃষ্ণার—যাকে বলা হয় ‘শওক’ বা আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের ব্যাকুলতা। এই ব্যাকুলতা শুধু তাদের ভাগ্যে জোটে, যাদের একটি জীবন্ত অন্তর আছে। ব্যাকুলতার স্বরূপ আল্লাহর প্রতি ব্যাকুলতা মুমিনের আধ্যাত্মিক উন্নতির এক সুউচ্চ স্তর। ইমাম ইবনে রজব হাম্বলির মতে, আল্লাহর প্রতি গভীর ও প্রবল ভালোবাসা থেকেই এই ব্যাকুলতার জন্ম হয়। নবীজি (সা.) আল্লাহর কাছে এই মহান স্তরের প্রার্থনা করতেন। তিনি বলতেন, ‘হে আল্লাহ, আমি আপনার কাছে আপনার সাক্ষাতের আনন্দ এবং আপনার সান্নিধ্য লাভের ব্যাকুলতা প্রার্থনা করছি।’ (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ১৮৩২৫) ব্যাকুলতা অর্জনের জন্য প্রথম শর্ত আল্লাহকে চেনা, যাকে বলে ‘মারেফাত’। যখন মানুষের অন্তর্দৃষ্টি প্রসারিত হয়, তখন সে বিপদের মাঝেও আল্লাহর দান দেখতে পায়। এই ব্যাকুলতা অর্জনের জন্য প্রথম শর্ত আল্লাহকে চেনা, যাকে বলে ‘মারেফাত’। যখন মানুষের অন্তর্দৃষ্টি প্রসারিত হয়, তখন সে বিপদের মাঝেও আল্লাহর দান দেখতে পায়। মৃত্যু: প্রভুর কাছে ফেরার সেতু সাধারণ মানুষের কাছে মৃত্যু আতঙ্কের বিষয় হলেও আল্লাহর ব্যাকুল প্রেমিকদের কাছে ...

ওহি ও বুদ্ধিবৃত্তি: ইসলামি জ্ঞানতত্ত্বের ভারসাম্য

  ওহি ও বুদ্ধিবৃত্তির  সম্পর্ক ইসলামে গুরুত্বপূর্ণ।  এই সম্পর্কে একটি  জ্ঞানতাত্ত্বিক ভারসাম্য কাজ করে। আকল (বুদ্ধিবৃত্তি) ছাড়া নকল (বর্ণনা) অন্ধ অনুকরণে পরিণত হয়, আর নকল ছাড়া আকল সীমাহীন আপেক্ষিকতা ও বিভ্রান্তিতে পতিত হয়। ইসলামি সভ্যতার বড় বড় বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্য ও কাঠামোতে এই ভারসাম্য রক্ষার প্রচেষ্টা লক্ষ্যণীয়। উসুলুল ফিকহ, কাওয়াইদুল ফিকহ, ইলমুল কালাম, নকদুল হাদিস, তাসাউফ, মাকাসিদে শরিয়াসহ শাস্ত্রীয় আয়তনে এর নমুনা বহুবিস্তৃত। ইসলামি জ্ঞানতত্ত্বের ইতিহাস মূলত আকল ও নকলের সৃজনশীল সমন্বয়ের ইতিহাস। আকলের কাজ  ওহির উদ্দেশ্য, হিকমাহ ও প্রয়োগ বুঝতে সাহায্য করা। যেমন, কোরআন ন্যায়বিচারের আদেশ দেয়। কিন্তু কোন সামাজিক কাঠামোতে কীভাবে ন্যায় প্রতিষ্ঠিত হবে, তা বুঝতে আকলের প্রয়োজন। কোরআন সুদ নিষিদ্ধ করে। কিন্তু আধুনিক অর্থনীতির জটিল  কাঠামোয় সুদের রূপ শনাক্ত করতে বুদ্ধিবৃত্তিক বিশ্লেষণ প্রয়োজন। কোরআন মানবমর্যাদার কথা বলে। কিন্তু প্রযুক্তি, বায়োপলিটিক্স বা ডিজিটাল নজরদারির যুগে সেই মর্যাদার সুরক্ষা কীভাবে হবে, তা উদঘাটনে আকল অপরিহার্য। যে আকল ওহির সত্যতা চিনতে পারে, ওহ...

কোরবানির শিক্ষা সারা বছর যেভাবে ধরে রাখব

  মানবজাতির ইতিহাসে কোরবানির দুটি ঘটনা বিশেষভাবে স্মরণীয়। একটি হাবিল ও কাবিলের কোরবানি, অন্যটি নবী ইব্রাহিম ও তাঁর পুত্র নবী ইসমাইল (আ.)-এর আত্মত্যাগের ঘটনা। এই দুই ইতিহাসের মধ্যে নিহিত রয়েছে ইমান, আন্তরিকতা ও আত্মোৎসর্গের গভীর শিক্ষা। হাবিলের কোরবানি কবুল হয়েছিল তাঁর আন্তরিকতার কারণে। পক্ষান্তরে কাবিলের কোরবানি প্রত্যাখ্যাত হয়েছিল তার অন্তরের অসততা ও কৃপণতার জন্য। পৃথিবীতে প্রথম কোরবানি  কোরবানির প্রথম ঘটনা সংঘটিত হয়েছিল হজরত আদম (আ.)-এর দুই পুত্র হাবিল ও কাবিলকে কেন্দ্র করে। তারা উভয়েই আল্লাহর জন্য কোরবানি পেশ করেছিলেন। হাবিল তাঁর উৎকৃষ্ট পশু কোরবানি করেন, আর কাবিল উৎসর্গ করেন নিম্নমানের শস্য। আল্লাহ–তাআলা হাবিলের কোরবানি কবুল করেন, কিন্তু কাবিলের কোরবানি প্রত্যাখ্যান করেন। এতে কাবিল ঈর্ষান্বিত হয়ে নিজ ভাই হাবিলকে হত্যা করে বসে। কোরআনে বলা হয়েছে, ‘যখন তারা উভয়েই একটি করে কোরবানি পেশ করেছিল, তাদের একজনের কোরবানি কবুল করা হলো আর অন্যজনেরটি কবুল করা হলো না। তখন সে বলল, ‘আমি অবশ্যই তোমাকে হত্যা করব।’ জবাবে অপরজন বলল, ‘আল্লাহ তো শুধু পরহেজগারদের (কোরবানিই) কবুল করেন।’ (সুরা মায়ি...