পোস্টগুলি

যেভাবে অনিবার্য যুদ্ধ থেকে বাঁচল মক্কাবাসী

  নবীজির ৩৫ বছরের একটি ঘটনা মক্কায় তোলপাড় তোলে। সে বছর মক্কায় ভয়াবহ এক বন্যা হয়। সেই বন্যায় ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় কাবাঘরের দেয়াল। সেকালে কাবাঘরের ওপরে কোনো ছাদ ছিল না। এর উচ্চতা ছিল আবার মাত্র ৯ হাত। খোলা ছাদের সুযোগে কাবাঘরে উৎসর্গিত মানতকারীদের স্বর্ণালংকার প্রায়ই চুরি হয়ে যেত। ফলে কাবাঘর সংস্কারের প্রয়োজন দেখা দিল ভীষণভাবে। আল্লাহর ঘর পুনর্নির্মাণের পরিপ্রেক্ষিতে দাঁড়িয়ে কোরাইশের নেতারা নির্ধারণ করল এক অবাক করা নীতি। কাবাঘরের সংস্কারকাজে কোনো অবৈধ অর্থ ব্যবহার করা হবে না। বেশ্যাবৃত্তির অর্থ, সুদের অর্থ, ডাকাতির অর্থ নির্মাণকাজে দান করা যাবে না। আল্লাহর ঘরের নির্মাণকাজে ব্যবহার হবে আল্লাহর পথের হালাল অর্থ। কাবাঘর ভাঙতে গিয়ে কোরাইশের নেতারা দ্বিধায় পড়ে গেল। কে করবে পয়লা আঘাত? যদি ঐশ্বরিক কোনো আজাব নেমে আসে আঘাতকারীর ওপর! লোকেরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে মেনে নিল নেতাদের সিদ্ধান্ত। আল্লাহর ঘরের সম্মান এতটাই দখল করে রেখেছিল অন্ধকার যুগের সেই অজ্ঞ মানুষগুলোর হৃদয়। শুধু এটুকুই নয়, যেকোনো স্থাপনা পুনর্নির্মাণের আগে অনিবার্যভাবেই তা ভাঙতে হয়। কাবাঘর ভাঙতে গিয়ে কোরাইশের নেতারা দ্বিধায় পড়ে গেল...

রাষ্ট্রক্ষমতা কি অধিকার, না আমানত

  রাষ্ট্রক্ষমতা অনেকের কাছে সম্মান, প্রভাব কিংবা কর্তৃত্বের প্রতীক। কিন্তু একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত সাফল্য কি ক্ষমতার প্রদর্শনে, নাকি মানুষের কল্যাণে?  ইসলামের দৃষ্টিতে নেতৃত্ব ক্ষমতা ভোগের উপায় নয়; এটি একটি মহান আমানত, কঠিন পরীক্ষা এবং পরকালে জবাবদিহির বিষয়। কারণ, একজন রাষ্ট্রপ্রধানের প্রতিটি সিদ্ধান্ত কোটি মানুষের জীবন, জীবিকা, নিরাপত্তা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক কল্যাণকে প্রভাবিত করে। তাই ইসলামি রাষ্ট্রদর্শনে উন্নয়নের প্রকৃত লক্ষ্য কেবল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বা জিডিপি বৃদ্ধি নয়; বরং ন্যায়ভিত্তিক, স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও জনকল্যাণমুখী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ–তাআলা নির্দেশ দিয়েছেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দেন, তোমরা যেন আমানত তার হকদারদের কাছে পৌঁছে দাও এবং মানুষের মধ্যে বিচার করলে ন্যায়বিচারের সঙ্গে বিচার করো।’ (সুরা নিসা, আয়াত: ৫৮) এই আয়াত রাষ্ট্রক্ষমতার মৌলিক দর্শন স্পষ্ট করে দেয়। ক্ষমতা কোনো ব্যক্তিগত সম্পদ নয়; এটি জনগণের আমানত। তাই রাষ্ট্র পরিচালনার প্রতিটি সিদ্ধান্তে ন্যায়বিচার, সততা ও জনস্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। ইবনে তাই...

মসজিদে আদদাস: যেখানে নবীজির সঙ্গে এক খ্রিষ্টান দাসের দেখা

  আন্তরিকতা আর ভালোবাসার প্রতিদানে যদি মেলে শুধু নিষ্ঠুরতা আর অপমান, মানুষের মন ভেঙে পড়ে। কিন্তু ইসলাম আমাদের দেখায়, মানুষের প্রত্যাখ্যান যেখানে শেষ হয়, আল্লাহর রহমত সেখান থেকে শুরু। সৌদি আরবের তায়েফ শহরে আজও দাঁড়িয়ে আছে একটা ছোট্ট, শ্বেতশুভ্র মসজিদ, নাম ‘মসজিদ আদদাস’। মসজিদটি একটি ইট-পাথরের স্থাপনা মনে হলেও ইতিহাসের সবচেয়ে বেদনাদায়ক সফরের শেষে জ্বলে ওঠা এক আধ্যাত্মিক প্রদীপের স্মারকও বটে। সে বছর ‘দুঃখের বছর’ নবুয়তের দশম বছর ছিল নবীজির (সা.) জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়; সিরাতে যাকে বলা হয় ‘আমুল হুজন’ (দুঃখের বছর)। এ বছর তিনি হারান তাঁর সবচেয়ে বড় আশ্রয়স্থল চাচা আবু তালিব ও পঁচিশ বছরের সঙ্গী হজরত খাদিজাকে। মক্কার নির্যাতন যখন সীমা ছাড়িয়ে গেল, তিনি একটা নিরাপদ ঘাঁটির আশায় মক্কা থেকে প্রায় আশি কিলোমিটার দূরে পাহাড়ি শহর তায়েফের দিকে পা বাড়ালেন। (ইবনে কাসির, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৩/১৩২, দারু হিজর, কায়রো, ১৯৯৭) তারা শহরের বখাটে ছেলেপেলে আর দাসদের লেলিয়ে দেন নবীজির পেছনে। তারা পাথর ছুড়তে থাকে, নবীজির পবিত্র শরীর রক্তাক্ত হয়ে যায়, জুতাও রক্তে ভিজে ওঠে। কিন্তু তায়...

‘ট্রাভেল ভ্লগিং’: আল্লাহর পৃথিবীর দেখার চোখ যখন রিলসের মোহে বন্দী

  আজকের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দেয়ালে চোখ রাখলেই মনে হয়, পুরো সমাজটাই যেন এক যাযাবরবৃত্তে মেতে উঠেছে। ‘ট্রাভেল ভ্লগিং’ বা ঘুরতে গিয়ে ভিডিও বানানো এবং সেই ভ্রমণের প্রতি মুহূর্তের ছবি সামাজিক পাতায় ছড়িয়ে দেওয়া বর্তমান তরুণ প্রজন্মের অন্যতম বড় ট্রেন্ড। মেঘের ওপরে দাঁড়িয়ে সেলফি, পাহাড়ি ঝরনার সামনে লাইভ কিংবা অচেনা কোনো জনপদের খাবারের রিভিউ—এসবেই এখন বুঁদ সবাই। কিন্তু একটু গভীরভাবে তাকালেই একটি মারাত্মক মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তর নজরে পড়ে। আধুনিক এই ভ্লগিং সংস্কৃতির কারণে মানুষের ভ্রমণের মূল উদ্দেশ্য এখন আর প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ বা মানসিক প্রশান্তি নয়; বরং তা হয়ে উঠেছে কেবলই লাইক, ভিউ ও ভার্চ্যুয়াল জগতে নিজের আভিজাত্য জাহির করার মাধ্যম। বিনোদন ও ভালো লাগার ছদ্মবেশে এই যে তীব্র লোকদেখানো প্রদর্শনীর প্রতিযোগিতা, তা ইসলামের দৃষ্টিতেও মানুষের নিয়ত ও আত্মিক পরিশুদ্ধিকে এক বড় ধরনের সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে। ইসলামে ভ্রমণের দর্শন ইসলাম কিন্তু মানুষকে চারদেয়ালের মধ্যে বন্দী থাকার সংকীর্ণ জীবন শেখায় না; বরং ইসলামি জীবনদর্শনে পৃথিবী ঘুরে দেখা, স্রষ্টার সৃষ্টিশৈলী অবলোকন করা এবং তা থেকে শিক্ষা নেওয়াক...

আয়রোজগারে বরকত পেতে কোরআনের অপূর্ব ‘ফর্মুলা’

  ক্যালেন্ডারের দিকে তাকালেন। মাস শেষ হতে আরও দশ দিন বাকি। অথচ মানিব্যাগ ফাঁকা। বাড়িভাড়া, বাচ্চার স্কুলের বেতন, বাজারসদাই—এর বাইরে বিশেষ আর কোনো খরচ নেই। তারপরও এত তাড়াতাড়ি সব টাকা শেষ হলো কীভাবে? পরিশ্রমে কোনো কমতি রাখেননি। অফিসে সবার আগে আসেন, সবার পরে যান। ব্যবসায় রাত জেগে কাজ করেন। উপার্জন ভালোই হচ্ছে। তবু প্রতি মাসে একই সমস্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছে। মুঠোভর্তি বালুর মতো হাত ফসকে বেরিয়ে যাচ্ছে টাকাপয়সা। যা উপার্জন হচ্ছে, তা থাকছে না; আর যা থাকছে, তা পরিমাণে যথেষ্ট হচ্ছে না। মনের ভেতরে একটাই প্রশ্ন ঘুরছে, আমি কি ভুল কিছু করছি? এই প্রশ্নের উত্তর আছে কোরআনে। কোরআন বলছে, সমস্যাটা উপার্জনে নয়, বরকতে। আর বরকত আসে সম্পূর্ণ ভিন্ন পথে। গবেষণায় দেখা গেছে, যারা নিজের আয় ও সম্পদ নিয়ে সন্তুষ্ট, তারা আর্থিকভাবে সুশৃঙ্খল, স্থিতিশীল এবং মানসিক চাপমুক্ত থাকেন। (Emmons, R. A. & McCullough, M. E., 2003, Journal of Personality and Social Psychology, 84/2, আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন, ওয়াশিংটন ডিসি) সহজ করে বললে, যে মানুষ নিজের যা আছে তার জন্য আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করে। সে অয...

কথা দিলে কথা কি রাখতেই হয়: ইসলাম কী বলে

  আরবিতে প্রতিশ্রুতির জন্য দুটি শব্দ চলে—‘আহদুন’ আর ‘ওয়াদুন’। অর্থ মোটামুটি একই—চুক্তি, অঙ্গীকার, শপথ। সুনির্দিষ্ট কোনো লক্ষ্যে পরস্পরের সঙ্গে যে লিখিত বা মৌখিক বোঝাপড়া হয়, তা-ই প্রতিশ্রুতি। ছোট একটি শব্দ, কিন্তু ইসলামে এর ওজন অনেক ভারী। প্রতিশ্রুতি রক্ষা মানুষের সবচেয়ে মূল্যবান শিষ্টাচারগুলোর একটি। আর এর দায়টা শুধু সামাজিক নয়, সরাসরি আল্লাহর কাছে জবাবদিহির বিষয়। কেয়ামতের দিন হাশরের ময়দানে এই প্রতিশ্রুতি নিয়েই প্রশ্ন হবে। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘তোমরা প্রতিশ্রুতি পালন করো। নিশ্চয়ই প্রতিশ্রুতি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে।’ (সুরা বনি ইসরাইল, আয়াত: ৩৪) এমনকি আল্লাহও অঙ্গীকার করেন এই বিষয়টা একটু থমকে ভাবার মতো। আল্লাহর সৃষ্টির মধ্যে মানুষের মর্যাদা সর্বোচ্চ, আর সেই মর্যাদারই একটা প্রকাশ হলো, রুহ সৃষ্টির পর আল্লাহ নিজেই মানুষের কাছ থেকে তাঁকে রব হিসেবে মেনে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি নিয়েছিলেন। বিনিময়ে তিনিও মানুষের সঙ্গে অঙ্গীকার করেছেন। কোরআনের একাধিক জায়গায় এই ওয়াদার কথা এসেছে—‘যদি তোমরা কৃতজ্ঞতা স্বীকার করো, তবে তোমাদের নিয়ামত আরও বাড়িয়ে দেব।’ (সুরা ইবরাহিম, আয়াত ৭)বনি ...

‘শখের লাইফস্টাইল’: হারামের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে না তো

  নগদহীন অর্থনীতির এই যুগে মানুষের মানিব্যাগে এখন টাকার চেয়ে প্লাস্টিকের একটি কার্ড বেশি জায়গা জুড়ে থাকে। ‘বাই নাও, পে লেটার’ বা বিনা সুদে ইএমআইয়ের সংস্কৃতিতে সামর্থ্য না থাকলেও সর্বশেষ মডেলের ফোন, দামি রেস্তোরাঁয় খাওয়া বা ধারদেনায় বিদেশ ভ্রমণ—এসবকে এখন একধরনের ‘প্রগতিশীল লাইফস্টাইল’ হিসেবে দেখানো হয়। কিন্তু ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, সামর্থ্যের বাইরে গিয়ে ঋণে জীবন যাপন করা কোনো একক সমস্যা নয়; এটা একটার পর একটা স্তরে বাড়তে থাকা একটা ঝুঁকি, যার প্রতিটি স্তরের পরিণতি আগেরটার চেয়ে ভারী। তেমন চারটি স্তর আলোচনা হলো। ১: প্রতিদিনের মিথ্যা ও প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ ঋণের সবচেয়ে তাৎক্ষণিক ক্ষতি ঘটে চরিত্রে। মহানবী (সা.) নামাজে নিয়মিত দোয়া করতেন, ‘হে আল্লাহ, আমি আপনার কাছে পাপ এবং ঋণের বোঝা থেকে আশ্রয় চাচ্ছি।’ একজন সাহাবি জিজ্ঞেস করলেন, তিনি কেন ঋণ থেকে এত বেশি আশ্রয় চান। জবাবে তিনি বলেন, ‘মানুষ যখন ঋণগ্রস্ত হয়, তখন সে কথা বলতে গিয়ে মিথ্যা বলে এবং ওয়াদা করলে তা ভঙ্গ করে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৩৯৭) লক্ষণীয়, এখানে ঋণকে খারাপ বলা হয়নি, জরিমানা বা সুদের কারণে বলা হয়েছে। কেননা এট...