পোস্টগুলি

যেভাবে ঘৃণা রূপ নিল ভালোবাসায়

  ইসলামের ইতিহাসে এমন বহু দৃষ্টান্ত রয়েছে, যেখানে চরম পাষাণ হৃদয় মোমের মতো গলেছে, শত্রু পরিণত হয়েছে বন্ধুতে এবং অন্ধকারের যাত্রী খুঁজে পেয়েছে হেদায়েতের অমল আলো। সাহাবি সুমামা ইবনে উসাল (রা.)-এর ইসলাম গ্রহণের ঘটনা এমনই এক ঐতিহাসিক ও বিস্ময়কর অধ্যায়। একসময় যিনি ছিলেন ইসলামের ঘোরতর বিরোধী এবং নবীজির প্রতি যাঁর অন্তরে ছিল অন্ধ বিদ্বেষ, তিনিই পরবর্তী সময়ে নবীজির প্রেমে আত্মহারা একনিষ্ঠ অনুসারীতে পরিণত হন। তাঁর অন্তরের পর্বতসম ঘৃণার জায়গা দখল করে নিয়েছিল অকৃত্রিম ভালোবাসা; আর বৈরিতার জায়গায় জন্ম নিয়েছিল ইস্পাতকঠিন ইমান। এই রূপান্তরের পেছনে কোনো সামরিক শক্তি বা জোরজবরদস্তি ছিল না; এর পেছনে কাজ করেছিল নবীজির অনুপম চরিত্রমাধুর্য, বন্দীর প্রতি মানবিক আচরণ ও অতুলনীয় ক্ষমার শক্তি। রাসুল (সা.) মসজিদে প্রবেশ করে বন্দীর দিকে তাকাতেই তাঁকে চিনতে পারলেন। তিনি সাহাবিদের জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তোমরা কি জানো, কাকে বন্দী করে এনেছ?’ ইয়ামামার প্রতাপশালী নেতা হিজরি ষষ্ঠ সন। ইসলামের শান্তির দাওয়াত তখন মক্কা ও মদিনার গণ্ডি পেরিয়ে সমগ্র আরব উপদ্বীপে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) সমকালীন বিভিন্ন রাজা, গোত্রপ্...

অবলা প্রাণীরা কি পরকালে প্রতিদান পাবে

  মানুষের নিষ্ঠুরতার শিকার হয়ে তাদের কেন অবর্ণনীয় যন্ত্রণা সহ্য করতে হয় প্রাণীদের? পরম দয়াময় কি এই অবলা প্রাণীদের ওপর জুলুম হতে দেন? আর পরকালেই বা তাদের পরিণতি কী হবে? তারা কি তাদের এই নিদারুণ কষ্টের কোনো প্রতিদান পাবে? ইসলামি বিশ্বাসের মূল ভিত্তি হলো, মহান আল্লাহ ‘আল-আদল’ অর্থাৎ পরম ন্যায়বিচারক। তাঁর রাজত্বে অণু পরিমাণ অবিচারও উপেক্ষিত থাকে না। সৃষ্টির প্রতিটি স্পন্দনের হিসাব যেমন তাঁর কাছে রয়েছে, তেমনি অবলা প্রাণীর দীর্ঘশ্বাসও বৃথা যায় না। পশুদেরও পুনরুত্থান ঘটবে অনেকে মনে করেন পুনরুত্থান শুধু মানুষের জন্যই নির্দিষ্ট। কিন্তু কোরআন বলছে, “ভূমণ্ডলে বিচরণকারী এমন কোনো প্রাণী নেই এবং দুই ডানা দিয়ে আকাশে ওড়ে এমন কোনো পাখি নেই, যারা তোমাদের মতোই এক একটি সম্প্রদায় বা জাতি নয়। আমি কিতাবে কোনো কিছুই বাদ দিইনি; অতঃপর তাদের সবাইকে তাদের আল্লাহর সমীপে একত্র করা হবে।” (সুরা আনআম, আয়াত: ৩৮)অনুরূপভাবে কেয়ামতের অন্যতম চূড়ান্ত আলামত হিসেবে পশুপাখির পুনরুত্থানকে উল্লেখ করে বলা হয়েছে, “এবং যখন বন্য পশুপাখিদেরকে একত্র করা হবে।” (সুরা তাকবির, আয়াত: ৫) এই আয়াতসমূহ দ্ব্যর্থহীনভাবে প্রমাণ করে যে, এই প...

কাবিনে দেনমোহর বাড়িয়ে লেখা: ইসলামের বিধান কী

  কনেপক্ষ নিজেদের বংশমর্যাদা ও আভিজাত্য প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে লাখ লাখ বা কোটি টাকার দেনমোহর দাবি করে। অনেক সময় বরপক্ষও ভাবে, ‘দেনমোহর তো শুধু কাগজে লেখার বিষয়, কে আর নগদ দেয়!’—এমন ঠুনকো যুক্তিতে দলিলে স্বাক্ষর করে বসে। কাবিনে লেখা দেনমোহর কি শুধু সামাজিক প্রদর্শনী? নাকি এটি একটি অলঙ্ঘনীয় আর্থিক দায়? মহান আল্লাহর পবিত্র বিধানের সঙ্গে দ্বিমুখী আচরণের পরিণতিই বা কী? উপহার নাকি অধিকার দেনমোহর হলো নারীর একান্ত ব্যক্তিগত অধিকার, যা আল্লাহ পুরুষের ওপর বাধ্যতামূলক ফরজ করে দিয়েছেন, “তাদেরকে তাদের নির্ধারিত মোহর ফরজ দায়িত্ব হিসেবে প্রদান করো।” (সুরা নিসা, আয়াত: ২৪) গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, দেনমোহরের অর্থ সম্পূর্ণভাবে স্ত্রীর সম্পত্তি। কনের পিতা-মাতা, অভিভাবক বা আত্মীয়দের এই সম্পদে বিন্দুমাত্র অধিকার নেই। স্ত্রী যদি নিজের পূর্ণ স্বাধীনতায় কোনো চাপ ছাড়া দেনমোহরের কিছু অংশ ক্ষমা করেন, তবেই শুধু স্বামী তা থেকে অব্যাহতি পেতে পারে; অন্যথায় পিতা বা অভিভাবকের ক্ষমা করার কোনো বৈধ অধিকার নেই। স্বাক্ষর করলে কি আর ‘লোকদেখানো’ থাকে অনেকের ধারণা, কাগজে শুধু সম্মানের খাতিরে বড় অঙ্ক লেখা হয়েছিল। কিন্তু ইসলামি...

নবীযুগে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ৫ উদাহরণ

  ইসলাম মানুষকে দিয়েছে সম্মান ও চিন্তার স্বাধীনতা। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আমি তো আদম সন্তানদের মর্যাদা দান করেছি, তাদের স্থলে ও জলে চলাচলের বাহন দিয়েছি এবং তাদের উত্তম জীবনোপকরণ দিয়েছি; আর আমি আমার সৃষ্টিজগতের অনেকের ওপর তাদের শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছি।’ (সুরা আল-ইসরা: ৭০) মানুষ স্বাধীনভাবে জন্মেছে। আল্লাহ তাকে ভালো ও মন্দের পথ চেনাতে সক্ষম করেছেন। তাই ইসলামে মানুষের ওপর কোনো জোরজবরদস্তি নেই। এটিই ইসলামের মূল বাণী। ইসলামে নবীজির সঙ্গেও আলোচনার সুযোগ ছিল। সাহাবিরা প্রয়োজনে তাঁর সঙ্গে যুক্তিপূর্ণ বিতর্ক করতেন। রাসুল (সা.) কখনোই তাঁদের কণ্ঠরোধ করেননি। নিচে কয়েকটি উদাহরণ দেওয়া হলো— ১. খাউলার বিতর্ক ও আল্লাহর সমাধান খাউলা বিনতে সা’লাবার স্বামী তাঁকে ‘জিহার’ (তালাকের একটি রূপ) করেছিলেন। রাসুল (সা.) তাঁকে বলেছিলেন, ‘তুমি তোমার স্বামীর জন্য এখন হারাম।’ কিন্তু খাউলা (রা.) দমে যাননি। তিনি বারবার নবীজির কাছে নিজের অসহায়ত্বের কথা বলছিলেন এবং আল্লাহর কাছে দোয়া করছিলেন।আল্লাহ–তাআলা তাঁর কথা শুনে সুরা মুজাদিলার শুরুতে আয়াত নাজিল করলেন—‘আল্লাহ তার কথা শুনেছেন যে নারী তার স্বামীর বিষয়ে তোমার (নবীজির) সঙ্গে ...

ভাইয়ের অজান্তে মানিব্যাগ থেকে টাকা নেওয়া কি চুরি

  ‘আপন ভাইয়ের সম্পদই তো, পরের তো নয়’—এই ভ্রান্ত ধারণার বশবর্তী হয়ে অনেকেই নিজের ভাই কিংবা নিকটাত্মীয়ের মানিব্যাগ বা ড্রয়ার থেকে তাঁর অনুমতি ছাড়াই গোপনে টাকা নিয়ে নেন। অনেকে নিজের অপরাধবোধ হালকা করেন এই ভেবে যে ‘আমি তো চুরি করছি না, শুধু ধার নিচ্ছি এবং হিসাব রাখছি, পরে সুবিধাজনক সময়ে পরিশোধ করে দেব।’ ইসলামের সুস্পষ্ট বিধান ও ইসলামি নীতিশাস্ত্রের মানদণ্ডে এই কাজটি কি আদৌ বৈধ? গোপনে নেওয়া এই টাকা কি চুরির পর্যায়ে পড়বে? ইসলামি ফিকহের আলোকে তা জানা জরুরি। ইসলামের অন্যতম মৌলিক উদ্দেশ্য হলো মানুষের ধনসম্পদের সুরক্ষা। কোনো অবস্থাতেই অন্যায়ভাবে অন্যের সম্পদ আত্মসাৎ করার অনুমতি দেওয়া হয়নি। অন্যের সম্পদের পবিত্রতা ইসলামের অন্যতম মৌলিক উদ্দেশ্য হলো মানুষের ধনসম্পদের সুরক্ষা (হিফজুল মাল)। কোনো অবস্থাতেই অন্যায়ভাবে অন্যের সম্পদ আত্মসাৎ করার অনুমতি দেওয়া হয়নি। কোরআনে আল্লাহ ঘোষণা করেছেন, “হে ইমানদারগণ, তোমরা পরস্পরের সম্পদ অন্যায়ভাবে আত্মসাৎ কোরো না, তবে পারস্পরিক সন্তুষ্টির ভিত্তিতে ব্যবসা-বাণিজ্যের মাধ্যমে অর্জিত হলে তা ভিন্ন।” (সুরা নিসা, আয়াত: ২৯) বিদায় হজের ঐতিহাসিক ভাষণে মুহাম্মদ (সা.) বলে...

তরুণ নেতৃত্ব গড়ে তুলতে নবীজির কালজয়ী ৭ পদক্ষেপ

  ইসলামের ইতিহাসের দিকে তাকালেও দেখা যায়, ইসলামের প্রথম যুগের বহু গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব তরুণ সাহাবিরাই পালন করেছেন। আলী ইবনে আবি তালিব, মুসআব ইবনে উমাইর, ওসামা ইবনে জায়েদ, আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস ও জায়েদ ইবনে সাবিত (রা.)-এর মতো তরুণেরা নবীজির হাতে গড়ে উঠেছিলেন। তাঁদের কেউ ছিলেন আলেম, কেউ প্রচারক, কেউ প্রশাসক, কেউ সেনাপতি। তাঁদের যোগ্যতা এক ছিল না। দায়িত্বও এক ছিল না। কিন্তু প্রত্যেকের মধ্যে রাসুল (সা.) এমন কিছু দেখেছিলেন, যা অন্যরা হয়তো তখনো দেখতে পায়নি। তরুণদের গড়ে তোলার ক্ষেত্রে তাই মহানবীর পদ্ধতি ছিল অত্যন্ত বাস্তবমুখী। তিনি উপদেশ দিয়েছেন, আবার দায়িত্বও দিয়েছেন। ভুল শুধরে দিয়েছেন, আবার আত্মবিশ্বাসও বাড়িয়েছেন। ইমান তৈরি করেছেন, আবার সেই ইমানের বাস্তব প্রয়োগের সুযোগও দিয়েছেন। ১. ভালোবাসার মাধ্যমে তরুণের হৃদয় জয় করা কোনো মানুষকে সংশোধন করতে হলে আগে তার হৃদয়ে জায়গা করে নিতে হয়। রাসুল (সা.)  তরুণদের সঙ্গে এমন সম্পর্ক তৈরি করেছিলেন, যাতে তারা নির্ভয়ে তাঁর কাছে নিজেদের কথা বলতে পারত। এর একটি অসাধারণ উদাহরণ সেই যুবক, যে নবীজির কাছে এসে ব্যভিচারের অনুমতি চেয়েছিল। সাহাবিরা তার কথায় ক্ষু...

রাখাল থেকে বণিক: তরুণ মুহাম্মদ (সা.)–এর শ্রম-সংস্থান

  হিলফুল ফুজুল চুক্তির (৫৯০ খ্রিষ্টাব্দ) পরের বছরগুলোতে তরুণ মুহাম্মদের জীবনে যে অধ্যায়টি শুরু হয়, তা রাজনীতির মতো সরব না হলেও সমাজ-অর্থনীতির বিচারে কম তাৎপর্যপূর্ণ নয়। প্রাচীন কোরাইশ সমাজে কায়িক শ্রম নিয়ে একধরনের অভিজাত অবজ্ঞা ছিল—গোত্রীয় সামন্তরা একে সাধারণত দাস বা দুর্বলদের কাজ মনে করত। কিন্তু চাচা আবু তালিবের পরিবারের ক্রমবর্ধমান আর্থিক টানাপোড়েনে পরনির্ভরশীল না থেকে মুহাম্মদ (সা.) বেছে নেন স্বোপার্জিত জীবিকার পথ। রাখালি জীবনের শুরু দাদা আবদুল মুত্তালিবের মৃত্যুর পর বনু হাশিমের অর্থনৈতিক ভিত অনেকটাই দুর্বল হয়ে পড়ে। হাজিদের পানি পান করানো (সিকায়াহ) আর খাদ্য জোগান দেওয়া (রিফাদাহ)—কাবার সম্মানজনক এই দুই দায়িত্ব আবু তালিবের কাঁধে এলেও তাঁর আর্থিক সামর্থ্য ছিল সীমিত, ফলে একপর্যায়ে রিফাদাহর দায়িত্ব তাঁকে সচ্ছল ভাই আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিবের হাতে ছেড়ে দিতে হয়। (ইবনে সাদ, আত-তাবাকাতুল কুবরা, ১/১১০, দারু সাদির, বৈরুত, ১৯৬৮) এই টানাপোড়েন প্রত্যক্ষ করেই বিশ বছর বয়সী মুহাম্মদ (সা.) মক্কার চারণভূমিতে মেষ চরানোর কাজ বেছে নেন। এই পেশাগত অভিজ্ঞতার একটি সাক্ষ্য হাদিসশাস্ত্...