পোস্টগুলি

জিলহজ্জ মাসের প্রথম দশদিন: ইবাদতের বিশেষ মৌসুম

  আল্লাহ–তাআলা তাঁর প্রিয় বান্দাদের জন্য ইবাদত ও ক্ষমা প্রার্থনার অসংখ্য পথ খুলে রেখেছেন। বান্দাদের মধ্যে উৎসাহ, উদ্দীপনা ও প্রতিযোগিতার মনোভাব সৃষ্টির জন্য তিনি নির্দিষ্ট কিছু বিশেষ সময় ও সুযোগ দান করেছেন। এর মাধ্যমে বান্দারা অল্প সময়ে ও পরিশ্রমে অধিক সওয়াব অর্জন করতে পারে। রমজান মাস যেমন ইবাদতের মাস, লাইলাতুল কদর যেমন হাজার মাসের চেয়ে উত্তম রাত; তেমনি দিনের মধ্যে কিছু দিনকে আল্লাহ শ্রেষ্ঠত্বের মর্যাদা দিয়েছেন। রমজান ব্যতীত বছরের সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ দিনগুলোর অন্যতম হলো জিলহজ মাসের প্রথম ১০ দিন। যদিও এই দিনগুলো অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ, তবুও রমজানের মতো এতে শয়তান শৃঙ্খলাবদ্ধ থাকে না। ফলে এই সময়ে ইবাদতের প্রতিযোগিতা তুলনামূলক কঠিন হয়। কিন্তু যে ব্যক্তি আন্তরিকভাবে ইবাদতে অগ্রসর হবে, সেই সফল হতে পারবে। কোরআনে জিলহজের প্রথম ১০ দিনের গুরুত্ব সম্মানিত জিলহজ মাসের প্রথম ১০ দিনের গুরুত্ব এত বেশি যে আল্লাহ নিজে পবিত্র কোরআনে এই দিনগুলোর শপথ করেছেন। তিনি বলেন—‘ওয়াল ফজর, ওয়াল লায়ালিন আশর।’ অর্থ: ‘কসম ফজরের, এবং কসম ১০ রাতের।’ (সুরা ফাজ্‌র, আয়াত: ১-২) ইবনে কাসির (রহ.)-এর মতে, ‘১০ রাত’ বলতে জিলহজ মাসের...

মক্কা ও মদিনার যে ১০ স্থানে দোয়া কবুল হয়

  মক্কা ও মদিনা কেবল ইতিহাসের কেন্দ্র নয়, দোয়া কবুলের বিশেষ শহর হিসেবেও পরিচিত। কোরআন ও হাদিস থেকে এখানকার এমন কিছু নির্দিষ্ট স্থান ও মুহূর্তের কথা জানা যায়, যেখানে দোয়া কবুল হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা থাকে। ১. মসজিদুল হারাম: মক্কার কেন্দ্রে অবস্থিত এই পবিত্র মসজিদে এক রাকাত নামাজ অন্য যেকোনো মসজিদের এক লাখ রাকাতের সমান। (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ১৪০৬) ইবাদতের মর্যাদা যেখানে এত বেশি, সেখানে দোয়া কবুল হওয়ার সম্ভাবনাও অনেক বেশি। ২. তাওয়াফের সময়: কাবা শরিফকে ঘিরে তাওয়াফ করার সময় দোয়া কবুল হয়। বিশেষ করে রুকনে ইয়ামানি ও হাজরে আসওয়াদের মধ্যবর্তী স্থানে নবীজি (সা.) দুনিয়া ও আখেরাতের কল্যাণে দোয়া করতেন। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ১৮৯২)৩. মুলতাজাম: কাবা শরিফের দরজা ও হাজরে আসওয়াদের মধ্যবর্তী অংশ হলো মুলতাজাম। রাসুল (সা.) এখানে বুক ও মুখ লাগিয়ে দোয়া করেছেন। সাহাবায়ে কেরামও এখানে দোয়া করাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিতেন। (বাইহাকি, শুয়াবুল ইমান, হাদিস: ৩৭৬৭) ৪. সাফা ও মারওয়া: সাফা ও মারওয়া পাহাড়ের মাঝে সায়ি করা হজ ও ওমরাহর গুরুত্বপূর্ণ অংশ। নবীজি (সা.) সাফা পাহাড়ে উঠে কাবার দিকে মুখ করে দীর্ঘ দোয়া করতেন...

তাফাক্কুদিল আহওয়াল

  সীরাত থেকে আমরা অতি চমৎকার একটি ইসলামী শিষ্টাচার শিখতে পারি যা আমি মনে করি দুর্ভাগ্যবশত আমরা পরিত্যাগ করেছি। আর তা হলো কারো খোঁজ-খবর নেয়া যখন সে মানসিক চাপ বা কষ্টে থাকে এবং তার কষ্টের বোঝা নিজের কাঁধে ভাগ করে নেয়া। এটাকে বলা হয় [تَفَقُّدِ الْأَحْوَالْ] - (তাফাক্কুদিল আহওয়াল)। রসূল (স) তাঁর চারপাশের মানুষদের পর্যবেক্ষণ করতেন। তিনি খেয়াল করতেন কেউ অনুপস্থিত আছে কিনা। তিনি জিজ্ঞেস করতেন, “আবু হুরায়রা কোথায়? অমুক কোথায়? তাকে তো দেখতে পাচ্ছি না। সেই বয়স্ক নারীটি কোথায় যিনি মসজিদ পরিষ্কার করতেন”? তিনি হয়তো কাউকে কাঁদতে দেখতেন। তিনি কারো চোখের অশ্রু লক্ষ করতেন এবং নিজে গিয়ে তাদেরকে সান্ত্বনা দিতেন। প্রায়শই আমাদের উদ্বেগগুলো আমাদেরকে গ্রাস করে ফেলে, আর আমরা অন্য কারো স্মরণাপন্ন হই না। এটা একটা ভুল কাজ। তবে বিপরীত দিক থেকে এটা আমাদেরও একটা ভুল। আমরাও আমাদের বন্ধুদের খোঁজ নিতে যাই না। এটি একটি দ্বিমুখী রাস্তার মতো। নিজে কষ্টে পড়লে আপনার উচিত পরিবার এবং প্রিয়জনের স্মরণাপন্ন হওয়া। কিন্তু আবার আপনিই যদি কারো পরিবার এবং প্রিয়জন হয়ে থাকেন, তবে আপনারও উচিত তাদের খোঁজ-খবর নেয়া। যদি জানেন যে তার...

ইসলামের ‘জুহ্‌দ’ নাকি আধুনিক ‘মিনিমালিজম’: কোনটা বেশি সুন্দর

  আজকের দুনিয়ায় আমরা এমন এক সময় পার করছি, যেখানে চারপাশে শুধু অর্জনের দৌড়, কেনাকাটার চাপ আর ব্যস্ততার ভিড়। অনেক সময় মনে হয়, এত কিছুর মাঝেও আমাদের ভেতরে এক ধরনের শূন্যতা থেকেই যাচ্ছে। মাঝে মাঝে মনে হয় আমরা যত বেশি পাচ্ছি, তত বেশি যেন শান্তিটা হারাচ্ছি। এই অবস্থা নিয়েই ‘মিনিমালিস্টিক জীবনযাপন’ ধারণাটি বিশ্বজুড়ে আলোচনায় এসেছে। তবে ইসলামের দৃষ্টিতে এই ধারণা নতুন নয়; বরং এটি বহু আগেই ‘জুহ্‌দ’, ‘কানাআত’ এবং ‘ইসরাফ’ (অপচয়) পরিহার নীতির মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। মিনিমালিজম বলতে কী বুঝি সহজভাবে বললে, এটি এমন একটি জীবনযাপন, যেখানে মানুষ অপ্রয়োজনীয় জিনিস, চিন্তা ও ভোগবিলাস কমিয়ে এনে প্রয়োজনীয় এবং অর্থবহ বিষয়গুলোর ওপর বেশি মনোযোগ দেয়। এর মূল দর্শন হলো কমের মধ্যে বেশি শান্তি ও সন্তুষ্টি খুঁজে পাওয়া। তোমরা খাও ও পান করো, কিন্তু অপচয় করো না। নিশ্চয়ই তিনি অপচয়কারীদের পছন্দ করেন না। সুরা আরাফ, আয়াত: ৩১ তবে ইসলাম এই ধারণাকে শুধু বস্তুগত সীমাবদ্ধতায় সীমিত রাখে না; বরং হৃদয়ের পরিশুদ্ধতা, নিয়তের বিশুদ্ধতা এবং আল্লাহর প্রতি নির্ভরশীলতার সঙ্গে যুক্ত করে। ইসলামে ভারসাম্যের স...

জীবনে শৃঙ্খলা ফেরাতে কোরআনের এই ৭ শিক্ষা

  মানুষের প্রকৃত সৌন্দর্য তার বাহ্যিক রূপে নয়; বরং তার চরিত্রে। একজন মানুষের কথা, আচরণ, চিন্তা ও ব্যবহারের মাধ্যমেই তার ব্যক্তিত্ব ফুটে ওঠে। ইসলাম তাই সুন্দর চরিত্র গঠনের ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছে। মহানবী (সা.)-এর জীবন ছিল উত্তম চরিত্রের সর্বোচ্চ দৃষ্টান্ত। তিনি বলেছেন, “আমি মহৎ চরিত্রের পূর্ণতা দানের জন্যই প্রেরিত হয়েছি।” (মুসনাদে আহমদ, হাদিস: ৮৯৩৯ আজকের সমাজে সম্পর্কের টানাপোড়েন, অবিশ্বাস ও নৈতিক অবক্ষয়ের অন্যতম কারণ হলো চরিত্রের দুর্বলতা। তাই একজন মুমিনের জন্য নিজেকে পরিশুদ্ধ করা এবং উত্তম চরিত্র গঠনে সচেষ্ট হওয়া অত্যন্ত জরুরি। ১. আল্লাহভীতি উত্তম চরিত্রের মূল ভিত্তি হলো তাকওয়া বা আল্লাহভীতি। তাকওয়া ব্যতীত মানুষের নৈতিক জীবন কখনোই পূর্ণতা পায় না। আল্লাহ তাআলা বলেন, “নিশ্চয়ই তোমাদের মধ্যে আল্লাহর কাছে তিনিই সবচেয়ে বেশি মর্যাদাবান, যিনি সবচেয়ে বেশি খোদাভীরু।” (সুরা হুজুরাত, আয়াত: ১৩) তাকওয়া মানে সর্বদা এই বিশ্বাস রাখা যে আল্লাহ আমাকে দেখছেন। এই অনুভূতি যার মধ্যে থাকে, সে সহজেই অন্যায় থেকে নিজেকে বিরত রাখতে পারে। ২. সত্যবাদিতা সত্যবাদিতা চরিত্রের প্রাণ। সত্য বলা কে...

হজের জরুরি মাসআলা

  হজ একটি নির্দিষ্ট সময় ও পদ্ধতি-নির্ভর ইবাদত। সামর্থ্যবান প্রতিটি মুসলিমের ওপর জীবনে একবার হজ পালন করা ফরজ। হজের প্রস্তুতি ও আরকান-আহকাম নিয়ে পাঠকদের জরুরি কিছু জিজ্ঞাসার সমাধান দেওয়া হলো: ইহরাম ও তালবিয়া সুন্নাহ পদ্ধতি: ইহরামের আগে নখ ও চুল পরিষ্কার করে গোসল বা অজু করা সুন্নাত। পুরুষেরা দুটি সেলাইবিহীন সাদা চাদর পরবেন এবং পায়ের ওপরের হাড় খোলা থাকে এমন স্যান্ডেল ব্যবহার করবেন। মহিলারা স্বাভাবিক মার্জিত পোশাক পরবেন। (গুনয়াতুন নাসেক, পৃ. ৬৯) তালবিয়া: ইহরামের মূল বাক্য হলো তালবিয়া—‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক...’। এটি পূর্ণাঙ্গ পড়া জরুরি; এর কোনো অংশ ছেড়ে দেওয়া মকরূহ। (ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/১২৩) আরকান ও হজের মূল কার্যক্রম হজ শুদ্ধ হওয়ার জন্য তিনটি কাজ ফরজ: ১. ইহরাম বাঁধা, ২. ৯ জিলহজ আরাফাতের ময়দানে অবস্থান এবং ৩. তাওয়াফে জিয়ারত করা। এছাড়া সাফা-মারওয়া সাঈ করা, মুজদালিফায় অবস্থান ও শয়তানকে পাথর নিক্ষেপ করা ওয়াজিব। (রদ্দুল মুহতার, ২/৪৬৮) তাওয়াফ ও সাঈ: তাওয়াফের জন্য অজু থাকা শর্ত, কিন্তু সাঈর (সাফা-মারওয়া) জন্য অজু থাকা সুন্নাত। তাওয়াফ শেষে মাকামে ইব্রাহিমের পেছনে দুই রাকাত নামাজ পড়া ...

যেভাবে তৈরি হয়েছিল বিদায় হজের রূপরেখা

  হিজরি নবম বর্ষের হজ ইসলামের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী ঘটনা। এই হজের মাধ্যমেই মহান আল্লাহর ঘর পবিত্র কাবা শরিফ এবং হজ পালনের বিধানাবলিকে জাহেলিয়াতের দীর্ঘদিনের কুসংস্কার ও শিরকি আচার-আচরণ থেকে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত করা হয়। ইসলামের ইতিহাসে ‘সিদ্দিকি হজ’ নামে পরিচিত এই আয়োজন ছিল প্রকৃতপক্ষে দশম হিজরিতে মহানবীর ‘বিদায় হজে’র এক অপরিহার্য ও সুদূরপ্রসারী প্রস্তুতি। এই হজের মাধ্যমেই ঘোষণা করা হয়েছিল, এখন থেকে পবিত্র হারাম শরিফের বিধানাবলি শুধু একত্ববাদী মুসলিমদের জন্য নির্দিষ্ট। হজের ‘আমির’ নিযুক্তি তাবুক যুদ্ধ থেকে ফিরে মহানবী (সা.) মদিনায় রমজান, শাওয়াল ও জিলকদ মাস অতিবাহিত করলেন। এরপর নবম হিজরিতে আবু বকর সিদ্দিক (রা.)-কে মক্কায় পাঠালেন হজের আমির নিযু্ক্ত করে, যেন তিনি মানুষের হজ সম্পাদন করান। (ইবনে হিশাম, আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যাহ, ২/৫৪৩, সম্পাদনা: সাক্কা ও আবিয়ারি, মাকতাবা শামেলা) আবু বকরের কাফেলা মক্কার পথে রওয়ানা হওয়ার পর সুরা তাওবার প্রথম অংশ নাজিল হয়। নবীজি তখন আলি ইবনে আবু তালিব (রা.)-কে ডাকলেন এবং তাকে আবু বকরের পেছনে পেছে পাঠালেন। আরবের বিভিন্ন গোত্র তখনও হজ পালন করত বটে, কিন্...