পোস্টগুলি

সংসারের টানাপোড়েনে নবীজির ভালোবাসার শিক্ষা

  অনেকেই মনে করেন, নবীজির সংসারে কখনো কোনো মতভেদ, অভিমান কিংবা মনোমালিন্য হয়নি। কিন্তু হাদিসের পাতাগুলো আমাদের অন্য এক বাস্তবতার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়। সেখানে দেখা যায়, নবীজির স্ত্রীদেরও ছিল স্বাভাবিক চাওয়া-পাওয়া, অনুভূতি, আবেগ ও অভিমান। আর নবীজিও তাঁদের এই স্বাভাবিক মানবিক দিকগুলোকে অসাধারণ ধৈর্য, প্রজ্ঞা ও ভালোবাসার মাধ্যমে সামাল দিয়েছেন। নবীজির জীবন ছিল দুনিয়াবিমুখ। তিনি কখনো বিলাসিতাকে জীবনের লক্ষ্য বানাননি। তাঁর ঘরে অনেক সময় দিনের পর দিন চুলা জ্বলত না। খেজুর ও পানি দিয়েই দিন কেটে যেত। অথচ তিনি চাইলে পৃথিবীর সব সম্পদ তাঁর পায়ের নিচে এসে জমা হতে পারত। কিন্তু তিনি বেছে নিয়েছিলেন সরল জীবন, কারণ তাঁর লক্ষ্য ছিল আখেরাতের সফলতা। অন্যদিকে নারীর স্বাভাবিক প্রকৃতি হলো একটু স্বাচ্ছন্দ্য কামনা করা। সুন্দর পোশাক, কিছুটা আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্য কিংবা পরিবারের প্রয়োজনীয় জিনিসের প্রত্যাশা করা কোনো অপরাধ নয়। তাই নবীজির স্ত্রীরাও মাঝে মাঝে নবীজির কাছে কিছু অতিরিক্ত ভরণপোষণের আবেদন করতেন। আশ্চর্যের বিষয় হলো, তিনি কখনো এটিকে তাঁদের চরিত্রগত দুর্বলতা হিসেবে দেখেননি। বরং এটিকে মানুষের স্বাভাবিক চাহিদা ...

আশুরার প্রাচীন সংস্কৃতি ও ইতিহাস-বিবর্তনের গল্প

  মহররম মাসের ১০ তারিখ—আশুরা। বাঙালি মুসলিম সমাজের কাছে এই দিন মানেই কারবালার শোক, ইমাম হোসাইন (রা.)-এর শাহাদাতের বেদনাদায়ক স্মৃতি। কিন্তু ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, আশুরার তাৎপর্য কেবল কারবালার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। কারবালার বহু শতাব্দী আগে থেকেই এই দিন মানবসভ্যতার বিভিন্ন ঘটনার সঙ্গে যুক্ত ছিল এবং একাধিক সংস্কৃতিতে বিশেষ গুরুত্ব বহন করত। হিব্রু ঐতিহ্য ও আশুরার সংযোগ মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) মদিনায় হিজরতের পর দেখলেন, সেখানকার ইহুদি সম্প্রদায় ১০ মহররম বিশেষ রোজা পালন করছে। কারণ জানতে চাইলে তারা বলল, এই দিনে আল্লাহ বনি ইসরাইলকে ফেরাউনের হাত থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন এবং হজরত মুসা (আ.) কৃতজ্ঞতাস্বরূপ রোজা রেখেছিলেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২০০০) মহানবী (সা.) বললেন, ‘মুসা (আ.)-এর সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক তোমাদের চেয়ে ঘনিষ্ঠ এবং তিনিও এই দিনে রোজা রাখলেন।’ এই বিবরণ থেকে স্পষ্ট যে আশুরার শিকড় আব্রাহামিক ঐতিহ্যের গভীরে প্রোথিত। কেউ কেউ ইহুদিদের ইওম কিপুরের সঙ্গে আশুরার মিল খোঁজেন—উভয় ক্ষেত্রেই উপবাস ও আত্মশুদ্ধির ধারণা আছে। তবে এই তুলনা বিতর্কিত ও দুটি ভিন্ন ধর্মীয় ঐতিহ্যের প্রসঙ্গকে স...

আশুরার তাৎপর্য ও কারবালার মাহাত্ম্য

  আরবিতে ‘আশারা’ মানে দশ, আর ‘আশুরা’ অর্থ দশম তারিখ। পরিভাষায় মহররমের ১০ তারিখকে আশুরা বলা হয়। আশুরা ইসলামের অন্যতম ফজিলতপূর্ণ দিবস। সৃষ্টির শুরু থেকে আশুরার দিনে অনেক তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা ঘটেছে। আল্লাহ–তাআলা এই দিনে আদম (আ.)-কে সৃষ্টি করেছেন। এই দিনে নুহ (আ.)-এর প্লাবন সমাপ্ত হয়েছে এবং তাঁর নৌকা তুরস্কের ‘জুদি’ পর্বতে গিয়ে থেমেছে। এই দিন ইব্রাহিম (আ.) নমরুদের অগ্নিকুণ্ড থেকে ৪০ দিন পর নিরাপদে মুক্ত হন। এই দিন ইউনুস (আ.) মাছের পেট থেকে মুক্তি পান। এই দিনে আইয়ুব (আ.) ১৮ বছর পর রোগমুক্তি লাভ করেন। এই দিনেই সুলাইমান (আ.) তাঁর হারানো রাজত্ব ফিরে পান। এই দিনে ইয়াকুব (আ.) হারানো পুত্র ইউসুফ (আ.)-কে ৪০ বছর পর ফিরে পান। এই দিনে ঈসা (আ.) জন্মগ্রহণ করেন এবং এই দিনই তাঁকে দুনিয়া থেকে আকাশে উঠিয়ে নেওয়া হয়। আশুরার দিনে আরও বহু ঐতিহাসিক ও অলৌকিক ঘটনা ঘটেছে। পূর্বে আশুরার রোজা ফরজ ছিল। দ্বিতীয় হিজরিতে রমজানের রোজা ফরজ হলে আশুরার রোজা সুন্নত হয়ে যায়। তবে সুন্নত রোজার মধ্যে আশুরার রোজা সর্বাধিক ফজিলতপূর্ণ। (আবু দাউদ, তিরমিজি, ইবনে মাজাহ, দারেমি ও মুসনাদে আহমাদ) নবীজি (সা.) মদিনায় এসে দেখতে পান, ইহুদির...

কারবালার মনস্তত্ত্ব: অন্যায়ের বিরুদ্ধে ‘না’ বলার সাহস

  ৬১ হিজরির মহররমে ফোরাত নদীর তীরে ঘটে যাওয়া কারবালার ঘটনা নিশ্চয় দুটি রাজনৈতিক পক্ষের সংঘর্ষ ছিল। তবে দর্শন ও মনস্তত্ত্বের দৃষ্টিতে দেখলে, এটি হলো ক্ষমতার চরম ভারসাম্যহীনতার মুখে দাঁড়িয়ে বিবেক ও নৈতিকতার পক্ষে একটি আপসহীন অবস্থানের দলিল। যখন একটি পুরো সমাজ ভয়, সুবিধাবাদ বা উদাসীনতায় ঢাকা পড়ে যায়, তখন একজন মানুষ কীভাবে সব চাপকে উপেক্ষা করে ‘না’ বলতে পারেন—ইমাম হোসাইন (রা.)-এর চরিত্র তারই এক দৃষ্টান্ত। আপসের মনস্তত্ত্ব ও নৈতিক সাহস যেকোনো অন্যায্য ব্যবস্থা টিকে থাকে মানুষের নীরব সম্মতির ওপর ভর করে। ইয়াজিদের ক্ষমতারোহণের সময় অধিকাংশ মানুষ নিরাপত্তার স্বার্থে বা বৈষয়িক কারণে চুপ ছিল। মনস্তত্ত্বে এই ঘটনাকে বলা হয় ‘কনফর্মিটি’ বা সামাজিক সম্মতির চাপ—যেখানে ব্যক্তি নিজের বিবেকের বিরুদ্ধে গিয়েও সংখ্যাগরিষ্ঠের অবস্থানকে মেনে নেয়। ইমাম হোসাইন (রা.) এই সম্মিলিত নীরবতাকে ভাঙার সিদ্ধান্ত নিলেন। তিনি জানতেন এর মূল্য কী হতে পারে। কিন্তু নৈতিকতার প্রশ্নে তিনি কোনো সুবিধাবাদী সমীকরণ করেননি।পবিত্র কোরআনে আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন, সত্যকে মিথ্যার সঙ্গে মিশ্রিত করতে এবং জেনেবুঝে সত্য গোপন ক...

কারবালা: উমাইয়া ‘প্রোপাগান্ডা’ ও সত্যের বয়ান

  একুশ শতকে ‘মিডিয়া ট্রায়াল’, ‘তথ্য যুদ্ধ’ বা ‘রাষ্ট্রীয় অপপ্রচার’ শব্দগুলো আমাদের কাছে পরিচিত। কোনো সত্য ঘটনাকে আড়াল করা বা ন্যায়সংগত আন্দোলনকে ‘বিদ্রোহ’ হিসেবে চিত্রিত করার কৌশল আমরা নিয়মিত দেখি। কিন্তু ৬১ হিজরির কারবালায় উমাইয়া শাসনযন্ত্র ঠিক একই ধরনের একটি সুপরিকল্পিত তথ্য নিয়ন্ত্রণ চালিয়েছিল। কারবালার ঘটনা তাই শুধু তরবারির যুদ্ধ ছিল না—এটি ছিল রাষ্ট্রীয় অপপ্রচার বনাম সত্যের একটি অসম লড়াই। উমাইয়াদের তথ্য নিয়ন্ত্রণ কৌশল যেকোনো স্বৈরাচারী ব্যবস্থা টিকে থাকে তথ্যের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণের ওপর। ইমাম হোসাইন (রা.) যখন মদিনা থেকে মক্কায় ও পরে কুফার উদ্দেশে রওনা হন, তখন দামেস্কের প্রশাসন সাধারণ মানুষের মনে একটি নির্দিষ্ট বয়ান গেঁথে দেওয়ার চেষ্টা করে—ইমাম হোসাইন (রা.) মুসলিম উম্মাহর ঐক্য নষ্ট করছেন এবং বৈধ আমিরের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করছেন। কুফা ও দামেস্কের জুমার খুতবা এবং জনসভাকে উমাইয়া প্রশাসকরা এই প্রচারণার প্রধান মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করতেন। ধর্মীয় ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হতো ‘আনুগত্যের’ ব্যাখ্যা।পবিত্র কোরআনে আল্লাহ, রাসুল ও দায়িত্বশীলদের আনুগত্যের নির্দেশ আছে (সুরা ন...

আশুরার রোজা পালনের সুন্নাহ পদ্ধতি

  ইসলামি বর্ষপঞ্জির প্রথম মাস মহররম। এটি ইসলামের চারটি সম্মানিত মাসের অন্যতম। এ মাসের দশম দিন ‘আশুরা’ নামে পরিচিত। ইসলামের ইতিহাসে এদিনের গুরুত্ব অত্যন্ত গভীর। এদিনকে কেন্দ্র করে রয়েছে নবী-রাসুলদের জীবনের নানা স্মরণীয় ঘটনা, তওবা কবুলের দৃষ্টান্ত এবং আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহের নিদর্শন। তাই এদিনের আমল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আশুরার একটি বিশেষ আমল হলো রোজা পালন করা। রাসুল (সা.) এ আমলের প্রতি বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছেন এবং এর গুরুত্বপূর্ণ ফজিলতের কথা বর্ণনা করেছেন। মহররম মাসের বিশেষ মর্যাদা আশুরার রোজার গুরুত্ব বুঝতে হলে মহররম মাসের মর্যাদা জানা প্রয়োজন। হাদিসে এ মাসকে ‘শাহরুল্লাহ’ বা ‘আল্লাহর মাস’ বলে অভিহিত করা হয়েছে, যা এ মাসের বিশেষ মর্যাদার প্রমাণ। রাসুল (সা.) বলেন, ‘রমজানের পর সর্বোত্তম রোজা হলো আল্লাহর মাস মহররমের রোজা।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১১৬৩) আশুরার রোজা মহররম মাসের ইবাদতের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এ ছাড়া এ মাসে বেশি বেশি নফল রোজা, তওবা, ইস্তিগফার ও নেক আমল করা মুমিনের জন্য অত্যন্ত কল্যাণকর। আশুরার রোজার বিধান ইসলামের প্রাথমিক যুগে আশুরার রোজা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে পালন করা হ...

মুসলিম সভ্যতায় গ্রন্থাগার ও আরকাইভাল সংস্কৃতি

  মধ্যযুগীয় আরবি সাহিত্যে একটি প্রবাদ বহুল প্রচলিত ছিল, ‘বই লেখা হয় কায়রোতে, অনুলিপি করা হয় বৈরুতে, আর পাঠ করা হয় বাগদাদে।’ এই প্রবাদ স্রেফ কথার কথা ছিল না; এটি ছিল ইসলামি সভ্যতার বিস্তৃত ভৌগোলিক পরিমণ্ডলে গড়ে ওঠা গ্রন্থাগার সংস্কৃতির এক জীবন্ত খতিয়ান। হিজরি নবম শতকের বিশ্বকোষ লেখক শিহাবুদ্দিন আল-কালকাশান্দি তিনটি রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী খিলাফতের গ্রন্থাগার সংস্কৃতির তুলনা করেছিলেন—বাগদাদের আব্বাসীয় বায়তুল হিকমাহ, কায়রোর ফাতেমীয় রাজকীয় গ্রন্থাগার এবং কর্দোবার উমাইয়া গ্রন্থাগার। এই তিনটিকেই তিনি মুসলিম বিশ্বের সর্ববৃহৎ ও সর্বাধিক রাজকীয় ‘খিজানাতুল কুতুব’ (বইয়ের ভান্ডার) বলে উল্লেখ করেছেন। (কালকাশান্দি, সুবহুল আশা ফী সিনাআতিল ইনশা , খণ্ড: ১৪, দারুল কুতুবিল মিসরিয়্যাহ, কায়রো, ১৯১৩–১৯২২ খ্রি.) মুসলিম সভ্যতায় গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠা শুধু যে রাজকীয় শৌখিনতা ছিল, তা নয়; বরং এটি খেলাফতের সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় বৈধতা প্রদর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে উঠেছিল। যে শাসকের গ্রন্থাগার যত সমৃদ্ধ, মুসলিম বিশ্বে তাঁর মর্যাদাও তত উচ্চ বলে গণ্য হতো। কর্দোবার অভিজাতদের অনুসরণে সাধারণ...