পোস্টগুলি

অন্যের ঘরে প্রবেশ: ইসলাম যেভাবে অনুমতি নিতে বলে

  অন্যের ঘরে বা ব্যক্তিগত স্থানে হঠাৎ প্রবেশ করে কাউকে অপ্রস্তুত বা বিব্রতকর অবস্থায় ফেলা সামাজিক অপরাধ। এ জন্যই ইসলাম অন্যের গৃহে প্রবেশের ক্ষেত্রে অনুমতি প্রার্থনাকে একটি অপরিহার্য নৈতিক ও ধর্মীয় বিধান করেছে। কোরআনের নির্দেশ  কারও ঘরে প্রবেশের আগে অনুমতি নেওয়া কোরআনের অলঙ্ঘনীয় আদেশ। আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনগণ, তোমরা নিজেদের ঘর ছাড়া অন্য কারও ঘরে প্রবেশ কোরো না, যতক্ষণ না তোমরা অনুমতি নাও এবং গৃহবাসীদের সালাম দাও। এটিই তোমাদের জন্য উত্তম, যাতে তোমরা উপদেশ গ্রহণ করো।’ (সুরা নুর, আয়াত: ২৭) পরের আয়াতে ব্যক্তিগত পরিসরের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে আরও স্পষ্ট বলা হয়েছে, ‘যদি তোমরা ঘরে কাউকে না পাও, তবে অনুমতি না দেওয়া পর্যন্ত সেখানে প্রবেশ কোরো না। আর যদি তোমাদের বলা হয় ফিরে যাও, তবে ফিরে যাবে; এটিই তোমাদের জন্য অধিকতর পরিচ্ছন্ন ও পবিত্র পদ্ধতি।’ (সুরা নুর, আয়াত: ২৮) অনুমতি প্রার্থনার সুন্নাহ পদ্ধতি অনুমতি চাওয়ার সঠিক নিয়ম হলো, আগে সালাম দেওয়া, তারপর প্রবেশের অনুমতি প্রার্থনা করা। এক ব্যক্তি নবীজির কাছে এসে সালাম না দিয়েই ঘরের বাইরে থেকে বলল, ‘আমি কি ভেতরে ঢুকব?’ নবীজি (সা.) তাঁর খাদেমকে ব...

মন ভেঙে গেলে যে প্রার্থনা শান্তি দেবে

  হাত থেকে অসাবধানতাবশত কাচ, মাটি বা সিরামিকের কোনো পাত্র মেঝেতে পড়ে ভেঙে গেলে সাধারণত আমরা কী করি? প্রিয় জিনিসটি নষ্ট হওয়ার বেদনায় কিছুক্ষণ হয়তো মন খারাপ থাকে, তারপর ভাঙা টুকরাগুলো জড়ো করে ডাস্টবিনে ফেলে দিই। কিন্তু জাপানি সংস্কৃতির একটি ঐতিহ্যবাহী দৃষ্টিভঙ্গি একেবারেই ভিন্ন। তারা কোনো ভাঙা পাত্রের টুকরা ফেলে দেয় না; বরং তার প্রতিটি ফাটল ও জোড়ামুখ সোনা বা রুপার গুঁড়া মেশানো বিশেষ রেজিন দিয়ে নিখুঁতভাবে জুড়ে দেয়। একে বলে ‘কিনৎসুকুরোই’ (সোনার প্রলেপে মেরামত)। পাত্রটিতে ফাটল যত বেশি থাকে, সোনার প্রলেপ সেখানে তত বেশি লাগে। রূপ নেয় এক অনন্য শিল্পকর্মে। ভাঙনচিহ্ন আড়াল করার বদলে তারা সেটিকে গর্বের সঙ্গে দৃশ্যমান করে তোলে। একজন বিশ্বাসী মানুষের দৃষ্টিতে এটি মানবজীবনের এক চিরন্তন আধ্যাত্মিক সত্যের রূপক। দুঃখ-কষ্টই মানুষকে অহমিকা ভেঙে আল্লাহর সামনে সমর্পিত হওয়ার সুযোগ করে দেয়। যখন সব অবলম্বন ব্যর্থ প্রমাণিত হয়, তখন সেজদায় অশ্রুসিক্ত চোখে সে বলে, ‘আল্লাহ, আপনি ছাড়া তো আমার আর কোনো আশ্রয় নেই।’ জীবনের ফাটল ও মানবিক ভাঙন জীবনচলার পথে কতবার যে আমাদের অন্তর ভেঙে চুরমার হয়ে যায়! কোনো বড় ব্যর্থতা, প...

চাচার সঙ্গে শামে: কিশোর নবীর প্রথম দূরযাত্রা

  প্রাচীন আরবের অর্থনীতি দাঁড়িয়ে ছিল দূরপাল্লার বাণিজ্য কাফেলার ওপর। রুক্ষ ভূগোলের কারণে কৃষিতে অনগ্রসর কোরাইশদের জীবিকা প্রায় পুরোপুরি নির্ভর করত এই কাফেলা-বাণিজ্যের ওপর। কোরআনেই এই ঐতিহ্যকে ‘শীত ও গ্রীষ্মকালীন সফর’ নামে চিহ্নিত করা হয়েছে। (সুরা কুরাইশ, আয়াত: ২) কৈশোরের শুরুতে চাচা আবু তালিবের সঙ্গী হয়ে মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনের প্রথম আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা ঘটে এমনই এক শাম সফরে। এই যাত্রার সঙ্গেই জড়িয়ে আছে সিরাত সাহিত্যের অন্যতম আলোচিত ঘটনা—খ্রিষ্টান সাধু বাহিরার সঙ্গে সাক্ষাৎ। ঘটনাটির মূল কাঠামো নিয়ে সিরাতের উৎসগুলোর মধ্যে বড় কোনো মতভেদ নেই, তবে দূরত্ব, বয়স আর তারিখের মতো খুঁটিনাটি জায়গায় কতটা নিশ্চিত হওয়া যায়, তা আলাদা করে যাচাই করা দরকার। দূরত্ব ও কাফেলার গতি তৎকালীন কাফেলার গন্তব্য ছিল শামের সীমান্ত শহর বসরা (বুসরা আল–শাম), আজকের সিরিয়ার দক্ষিণাঞ্চলে জর্ডান সীমান্তের কাছে অবস্থিত এক ঐতিহাসিক নগরী, যা ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকাভুক্ত এবং প্রাচীনকালে রোমান আরবিয়া প্রদেশের রাজধানী ছিল। মক্কা থেকে বুসরা পর্যন্ত দূরত্বের হিসাবে বিভিন্ন উৎসে কিছুটা তারতম্য দেখা যায়...

ইসলাম সম্পর্কে প্রচলিত ৬টি ভুল ধারণা

  ইসলামের সূচনালগ্ন থেকেই এর মূল শিক্ষা, দর্শন ও মূলনীতির বিরুদ্ধে নানা অপপ্রচার ও বিভ্রান্তি ছড়ানো হয়েছে। আধুনিক বিশ্বব্যবস্থায় বস্তুনিষ্ঠ তথ্যের অভাব, একপেশে গণমাধ্যম এবং পক্ষপাতমূলক বয়ানের কারণে অনেকের মনেই ইসলাম সম্পর্কে নানা ভ্রান্ত ধারণা বাসা বেঁধেছে। অনেকে মনে করেন ইসলাম বুঝি সহিংসতা উসকে দেয়, নারীর অধিকার খর্ব করে, কোরআন মানুষের রচিত সাহিত্য কিংবা ইসলাম কোনো নির্দিষ্ট জাতির শ্রেষ্ঠত্বকে সমর্থন করে। অথচ বস্তুনিষ্ঠ দৃষ্টিতে সত্য অনুসন্ধান করলে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে এসব প্রচারণা ইসলামের মূল শিক্ষার সম্পূর্ণ বিপরীত। প্রচলিত এমন ছয়টি ভুল ধারণা ও তার নেপথ্য সত্য নিচে বিশ্লেষণ করা হলো: ‘আল্লাহ’ কোনো বিশেষ গোত্রীয় দেবতার নাম নয়; এটি একটি আরবি শব্দ, যা মূলত ‘আল-ইলাহ’ থেকে এসেছে। আরবিভাষী খ্রিষ্টান ও ইহুদিরাও স্রষ্টা বোঝাতে প্রাচীনকাল থেকেই ‘আল্লাহ’ শব্দ ব্যবহার করে আসছেন। ১. আল্লাহ কি কোনো বিশেষ জাতির দেবতা ইসলাম সম্পর্কে একটি বহুল প্রচলিত অপপ্রচার হলো, ‘আল্লাহ’ নাকি কোনো বিশেষ উপজাতীয় বা প্রাচীন আরবের ‘চাঁদের দেবতা’ (মুন গড)। এটি মূলত ভাষাতাত্ত্বিক অজ্ঞতা ও ঐতিহাসিক সত্য বিকৃতির ফল। ‘...

উম্মতকে মহানবী (সা.) কতটা ভালোবাসতেন

  সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ রাসুল মুহাম্মদ (সা.)-এর হৃদয়ে উম্মতের জন্য যে পরম মমতা, ব্যাকুলতা ও গভীর দরদ ছিল, তা মানব ইতিহাসের এক অনন্য অধ্যায়। উম্মতের সামান্যতম কষ্টে তাঁর হৃদয় ব্যথিত হতো। মানুষ যাতে দোজখের আগুন থেকে রক্ষা পায়, সে জন্য তিনি প্রতিনিয়ত ব্যাকুল থাকতেন। কোরআনে তাঁর এই অন্তর্বেদনার চিত্র তুলে ধরে আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘ওরা এই বাণীতে বিশ্বাস না করলে সম্ভবত তাদের পেছনে পরিতাপ করতে করতে আপনি নিজের প্রাণ বিসর্জন দেবেন।’ (সুরা কাহফ, আয়াত: ৬) অন্য আয়াতে নবীজির পরিচয় দিতে গিয়ে বলা হয়েছে, ‘তোমাদের মধ্য থেকেই তোমাদের কাছে একজন রাসুল এসেছেন, তোমাদের যে কষ্ট হয় তা তাঁর জন্য অত্যন্ত পীড়াদায়ক; তিনি তোমাদের কল্যাণের জন্য ব্যাকুল আর মুমিনদের প্রতি পরম স্নেহশীল ও দয়াবান।’ (সুরা তাওবা, আয়াত: ১২৮) উম্মতের প্রতি নবীজির এই গভীর ভালোবাসা ও উৎকণ্ঠার কিছু অনন্য দিক কোরআন ও হাদিসে অত্যন্ত হৃদয়স্পর্শী ভাষায় উঠে এসেছে: অদেখা উম্মতকে দেখার ব্যাকুলতা কেয়ামত পর্যন্ত যত বিশ্বাসী দুনিয়ায় আগমন করবে, তাদের দেখার জন্য নবীজির গভীর তৃষ্ণা ছিল। একবার তিনি একটি কবরস্থানে এসে সালাম দিলেন এবং বললেন, ‘আমার বড় ইচ্ছা ...

যাঁর প্রেমে জান্নাত মেলে

  মানুষের হৃদয়ে ভালোবাসা এক গভীর ও সঞ্জীবনী অনুভূতি। মানুষ যাকে ভালোবাসে, তার স্বভাব ও গুণাবলি নিজের জীবনে ধারণ করতে চায়, তার আদর্শকে জীবনের পাথেয় বানায়। একজন মুমিনের জীবনে সবচেয়ে পবিত্র ও মহিমান্বিত ভালোবাসা হলো মহান আল্লাহর প্রেরিত রাসুল হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসা। রাসুলের প্রতি ভালোবাসা নিছক মৌখিক ভাবাবেগের বিষয় নয়; বরং তাঁর সুন্নতের পরিপূর্ণ অনুবর্তন, জীবনাচরণের প্রতিফলন এবং তাঁর নির্দেশিত পথে নিজেকে সঁপে দেওয়াই হলো প্রকৃত ভালোবাসার প্রমাণ। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ–তাআলা দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করেছেন, ‘নিশ্চয়ই তোমাদের জন্য আল্লাহর রাসুলের মধ্যে রয়েছে সর্বোত্তম আদর্শ।’ (সুরা আহজাব, আয়াত: ২১) একজন মুসলিমের সামগ্রিক জীবনে রাসুলের চরিত্রই একমাত্র অনুকরণীয় মাপকাঠি। ভালোবাসার স্বরূপ ও শর্ত নবীপ্রেমের দাবি মুখে প্রকাশ করা সহজ, কিন্তু এর সত্যতা প্রমাণিত হয় কর্মে ও চরিত্রে। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত পূর্ণ মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না আমি তার কাছে তার পিতা, সন্তান ও সমগ্র মানবজাতির চেয়ে অধিক প্রিয় হই।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৫) এই ভালোবাসা হতে হবে নিজের প্র...

নবীজির রওজায় হাজির হওয়ার আদব

  মদিনা মুনাওয়ারা—যে মাটির ধূলিকণায় রাসুল (সা.) ও তাঁর মহান সাহাবিদের পদচিহ্ন আঁকা, যে নগরী থেকে বিশ্বময় ছড়িয়ে পড়েছিল তাওহিদের আলো, সেই মদিনায় উপস্থিত হওয়া একজন মুমিনের জীবনে পরম সৌভাগ্যের বিষয়। কেউ মক্কায় গেলে রাসুলের পবিত্র রওজা জিয়ারতের সুযোগ হাতছাড়া করা অত্যন্ত বেদনার। হাদিসে রাসুল (সা.) জিয়ারতের গভীর গুরুত্ব তুলে ধরে ইরশাদ করেছেন, ‘যে ব্যক্তি আমার রওজা জিয়ারত করল, তার জন্য আমার শাফায়াত অবধারিত হয়ে গেল’ (সুনানে দারাকুতনি, হাদিস: ২৬৯৫) রওজার সামনে কোনো ধরনের উচ্চবাচ্য করা, ছবি বা সেলফি তোলার উন্মাদনায় মগ্ন হওয়া কিংবা পেছনে থাকা মানুষকে ঠেলে ভিড় তৈরি করা কঠোরভাবে পরিহার করতে হবে। ভালোবাসার সফর মদিনার পথে যাত্রা শুরু করার পর থেকেই অন্তরে নবীপ্রেম ও শ্রদ্ধা জাগ্রত রাখা বাঞ্ছনীয়। পথের পুরোটা সময় অধিক পরিমাণে দরুদ শরিফ পাঠ, ইস্তিগফার ও আত্মশুদ্ধির ভাব বজায় রাখা এই সফরের প্রধান পাথেয়। ইসলামের মনীষীরা এই পুণ্যভূমিতে প্রবেশের সময় গভীর বিনম্রতা বজায় রাখতেন। বর্তমান সময়ে উড়োজাহাজ, দ্রুতগতির ট্রেন বা বাসে চড়ে যাতায়াত স্বাভাবিক বিষয়; তবে বাহন যা–ই হোক না কেন, অন্তরের অবস্থান যেন সর্বদা শ্রদ...