পোস্টগুলি

অজ্ঞতা ও জ্ঞানবিকৃতি: জাহালাতের স্বরূপ

  ফিতরাতি বাস্তুবিদ্যার জ্ঞানতত্ত্বে জাহালাতের আলোচনা ছাড়া ইলমের বোঝাপড়া কখনো পূর্ণ হতে পারে না। কারণ, জ্ঞান কেবল আলোর উপস্থিতি নয়; জাহালাত সেই অন্ধকার, যার মধ্যে আলো নিজের অর্থ হাসিল করে। যে দর্শন কেবল সত্যের উৎপত্তি ব্যাখ্যা করে, কিন্তু অসত্যের উৎপত্তি ব্যাখ্যা করতে পারে না, তার জ্ঞানতত্ত্ব নাতামাম থেকে যায়। অতএব ফিতরাতি বাস্তুবিদ্যার সামনে একটি মৌলিক সওয়াল হাজির হয়—মানুষ কেন ভুল জানে? কেন সত্য হাজির থাকার পরও তাকে ইনকার করে? কেন একই কায়েনাত, একই ফিতরাত এবং একই ইনসানি অভিজ্ঞতার মধ্যে থেকেও মানুষ পরস্পরবিরোধী বাস্তবতার নির্মাণ করে? এমন প্রশ্নগুলোর উত্তর তলবই জাহালাতের দর্শনের মতলব। এখানে একটি মৌলিক তফাত নির্ধারণ করে রাখি। অজ্ঞতা মানেই তথ্যের অভাব নয়। অনেক সময় মানুষ জানে না, কারণ জানার সুযোগ পায়নি; এটি জ্ঞানগত অপূর্ণতা। কিন্তু আরও গভীর একধরনের জাহালাত রয়েছে। যেখানে জেনেও মানুষ সত্যকে বিকৃত করে, আংশিক সত্যকে পূর্ণ সত্য বলে দাবি করে, অথবা নিজের স্বার্থের অনুকূলে হাকিকতকে পুনর্নির্মাণ করে। প্রথমটি সীমাবদ্ধতা; দ্বিতীয়টি বিকৃতি। ফিতরাতি বাস্তুবিদ্যার প্রধান আলোচ্য এই দ্বিতীয় ...

প্রশংসা পেলে মুমিনের ৫ করণীয়

  মানুষ প্রশংসা শুনতে ভালোবাসে। কেউ আমাদের কাজের প্রশংসা করলে ভালো লাগে। কেউ যোগ্যতা স্বীকার করলে আত্মবিশ্বাস বাড়ে। কখনো একটি সুন্দর কথা দিনের ক্লান্তি দূর করে দেয়। কিন্তু অন্যের প্রশংসা একধরনের পরীক্ষা। নিন্দা মানুষকে যেমন কষ্ট দেয়, প্রশংসা তেমনি মানুষকে নিজের সম্পর্কে ভুল ধারণায় ফেলতে পারে। মানুষ যখন বারবার বলে, ‘আপনি অনেক ভালো’, ‘আপনি অনেক জ্ঞানী’, ‘আপনার মতো মানুষ হয় না’ তখন অজান্তেই নিজের ভেতরে অহংকার জন্ম নিতে পারে। নিজের ব্যাপারে পবিত্রতার ধারণা হতে পারে। অথচ আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘তোমরা নিজেদের পবিত্র দাবি করো না। কে মুত্তাকি, তিনি তা ভালোভাবে জানেন।’ (সুরা নাজম, আয়াত: ৩২) প্রশংসা পেলে মুমিনের করণীয় সম্পর্কে উল্লেখ করা হলো। ১. আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করা কেউ আপনার জ্ঞান, সুন্দর ব্যবহার কিংবা কোনো ভালো কাজের প্রশংসা করলে মনে রাখুন, এই গুণ আপনার নিজের তৈরি নয়। আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘তোমাদের কাছে যে নেয়ামত আছে, তা আল্লাহর পক্ষ থেকে।’ (সুরা নাহল, আয়াত: ৫৩) তাই প্রশংসা শুনে অন্তরে বলা যায়, আলহামদুলিল্লাহ, ‘সব প্রশংসা আল্লাহর জন্য।’ কারণ মানুষ প্রশংসা করেছে বটে, কিন্তু যে গুণের কারণে প্রশ...

শত দুঃখ-দুর্দশার মধ্যেও বিশ্বাসে কীভাবে অবিচল থাকবেন

  এই অনিশ্চিত ও সংক্ষুব্ধ পৃথিবীতে মানসিক স্থিরতা এবং সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি বজায় রাখার একমাত্র উপায় হলো সুদৃঢ় বিশ্বাস বা ‘ইয়াকিন’। মানুষ হিসেবে দুনিয়ার সব দুঃখ-কষ্ট দূর করার ক্ষমতা আমাদের নেই। আর এই অক্ষমতার অনুভূতিই মূলত মানুষকে স্মরণ করিয়ে দেয় মহান আল্লাহর কথা। পবিত্র কোরআনের দ্বিতীয় সুরা ‘আল-বাকারা’-তে মানব ইতিহাসের এমন অনেক সংকট ও তার সমাধানমূলক শিক্ষা ছড়িয়ে রয়েছে, যা সুদৃঢ় বিশ্বাস অর্জনে আমাদের সহায়তা করবে। বনি ইসরাইলের ইতিহাস থেকে শিক্ষা মহান আল্লাহ বনি ইসরাইলদের ওপর ফেরাউনের নিষ্ঠুর অত্যাচারের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। কোরআনে বলা হয়েছে, “এবং স্মরণ করো, যখন আমি তোমাদের উদ্ধার করেছিলাম ফেরাউনের গোত্র থেকে; তারা তোমাদের কঠিন শাস্তি দিত, তোমাদের নবজাতক পুত্রসন্তানদের জবেহ করত এবং নারীদের জীবিত রাখত। আর এতে তোমাদের রবের পক্ষ থেকে এক মহাপরীক্ষা ছিল।” (সুরা বাকারা, আয়াত: ৪৯) আজকের যুগেও বিভিন্ন নিপীড়িত অঞ্চলে শিশুদের আর্তনাদ দেখি আমরা। মনে রাখা উচিত, যে এই চরম পরীক্ষা যেমন আল্লাহর পক্ষ থেকে আসে, তেমনি এই অত্যাচার থেকে মুক্তির একমাত্র মালিকও তিনি। পরীক্ষা ও আল্লাহর সাহায্যের নৈকট্য অনে...

কঠিন সময়ে সিদ্ধান্ত নিতে ইসলামের বাস্তবমুখী ৪ পদক্ষেপ

  জীবনের নানা বাঁকে এসে আমাদের এমন কিছু কঠিন ও সংবেদনশীল সিদ্ধান্তের মুখোমুখি হতে হয়, যার ওপর নির্ভর করে আমাদের ভবিষ্যৎ, ক্যারিয়ার, পরিবার ও সামগ্রিক শান্তি। কোনটা বেছে নেওয়া ঠিক হবে আর কোনটা পরিহার করা উচিত—এই দ্বিধাদ্বন্দ্বে মানুষ অনেক সময় দিকবিদিকশূন্য হয়ে পড়ে এবং এক ধরনের মানসিক উৎকণ্ঠা তৈরি হয়। ইসলাম সর্বাবস্থায় আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য নির্দিষ্ট ও সুসংহত একটি পথরেখা বাতলে দিয়েছে। ১. শান্ত থেকে যুক্তিবোধকে প্রাধান্য দেওয়া যেকোনো কঠিন সিদ্ধান্তের সামনে দাঁড়িয়ে প্রথম ও প্রধান কাজ হলো শান্ত থাকা এবং তাড়াহুড়ো না করা। আবেগ বা উত্তেজনার বশে হুট করে কোনো সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলা মোটেও প্রজ্ঞার পরিচয় নয়। ইসলামি জীবনদর্শনে কোনো বিষয়ে গভীর চিন্তাভাবনা, বিশ্লেষণ ও স্থিরতা বজায় রাখার ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। যখন আমরা না ভেবে কিংবা ক্ষণিকের আবেগে চালিত হয়ে তাড়াহুড়ো করে কোনো পদক্ষেপে পা বাড়াই, তখন তা সমাধানের চেয়ে নতুন নতুন সংকটই বেশি তৈরি করে। ওহুদ যুদ্ধের কঠিন পরিস্থিতিতে সাহাবিদের বিচ্যুতির পরও তাদের প্রতি ক্ষুব্ধ না হয়ে নবীজিকে আল্লাহ দয়া ও নম্রতা বজায় রাখার নির্দ...

ইসলামে ব্যবসা হালাল হওয়ার ৭ মূলনীতি

  ইসলাম একদিকে যেমন ন্যায়সঙ্গত ও বিশ্বস্ত ব্যবসাকে উৎসাহিত করেছে, অন্যদিকে অন্যায্য শোষণ, প্রতারণা ও সুদকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে। আমাদের প্রতিদিনের ছোট-বড় আর্থিক সিদ্ধান্তগুলো যেন ইসলামি বিধানের পরিপন্থী না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখা প্রতিটি মুসলিমের নৈতিক দায়িত্ব। ব্যবসার মাধ্যমে হালাল উপার্জনের ৭টি মৌলিক নীতি আলোচনা করা হলো: ১. ব্যবসাকে ইবাদত হিসেবে দেখা যেকোনো আর্থিক কর্মকাণ্ডে লাভের পূর্বে নিয়তকে সংশোধন করা প্রয়োজন। উপার্জনকে শুধু ধনসম্পদ পুঞ্জীভূত করার প্রতিযোগিতা না ভেবে স্রষ্টার সন্তুষ্টি অর্জনের মাধ্যম হিসেবে দেখলে মানুষের ব্যবসা থেকে লোভ ও প্রতারণা দূর হয়ে যায়। মহানবী (সা.) সততার সঙ্গে ব্যবসা পরিচালনাকারী ব্যবসায়ীদের উচ্চ মর্যাদার সুসংবাদ দিয়ে বলেছেন, “সচ্চরিত্র ও বিশ্বস্ত আমানতদার ব্যবসায়ী পরকালে নবী, সিদ্দীক ও শহীদদের সঙ্গে থাকবেন।” (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ১২০৯) “আমি কত বেশি মুনাফা করব?”—এই চিন্তার বদলে “আমার এই লেনদেন কি আল্লাহর পছন্দনীয়?”—মনস্তাত্ত্বিক এই পরিবর্তনই হালাল উপার্জনের মূল ভিত্তি। ২. শুধু হালাল পণ্য বিক্রি করা ব্যবসা তখনই পবিত্র হয়, যখন বিক্রীত পণ্যটি হালাল হয়।...

নবীজির পবিত্র নাম ও গুণবাচক উপাধি কী কী

  নবীজি (সা.) তখনো মাতৃগর্ভে। একদিন স্বপ্নে তাঁর মা আমেনাকে শুভসংবাদ দিয়ে বলা হলো, ‘আপনি এ উম্মতের সর্বশ্রেষ্ঠ নেতাকে গর্ভে ধারণ করেছেন। তিনি যখন ভূমিষ্ঠ হবেন, তখন তাঁর নাম রাখবেন মুহাম্মদ।’ (ইবনে হিশাম, আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যাহ, ১/৫৮, দারুল কিতাবিল আরাবি, বৈরুত) জন্মের পর পিতামহ আবদুল মুত্তালিব নবজাতককে কাবা চত্বরে নিয়ে আল্লাহর দরবারে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন এবং তাঁর নাম রাখেন ‘মুহাম্মদ’, যার অর্থ চিরপ্রশংসিত। মুহাম্মদ ছাড়াও নবীজির একাধিক নাম ও গুণবাচক উপাধি রয়েছে। কোনো কোনো গবেষক তাঁর বহুসংখ্যক নামের তালিকা উল্লেখ করলেও পবিত্র কোরআন ও হাদিসে সুনির্দিষ্ট কিছু মৌলিক নামের সুস্পষ্ট বিবরণ পাওয়া যায়। কোরআনে ‘মুহাম্মদ’ ও ‘আহমদ’ পবিত্র কোরআনে ‘মুহাম্মদ’ নামটি সুস্পষ্টভাবে ৪টি স্থানে উল্লেখ করা হয়েছে: সুরা আলে ইমরান : ‘আর মুহাম্মদ একজন রাসুল ছাড়া তো কিছু নন! তাঁর পূর্বে বহু রাসুল গত হয়েছেন...’ (আয়াত: ১৪৪) সুরা আহজাব : ‘মুহাম্মদ তোমাদের কোনো পুরুষের পিতা নন; বরং তিনি আল্লাহর রাসুল এবং শেষ নবী।’ (আয়াত: ৪০) সুরা মুহাম্মদ : ‘আর যারা ইমান এনেছে, সৎকর্ম করেছে এবং মুহাম্মদের প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছ...

স্ত্রীদের সঙ্গে নবীজির হাসিখুশি ভালোবাসা

  ইসলামি জীবনদর্শনে পরিবার হলো পরম প্রশান্তির ঠিকানা। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ–তাআলা দাম্পত্যের এই মূল সুর তুলে ধরে বলেছেন, ‘আর তাঁর নিদর্শনাবলির মধ্যে রয়েছে যে তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য থেকেই সঙ্গিনী সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে প্রশান্তি পাও এবং তিনি তোমাদের মধ্যে পারস্পরিক ভালোবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন।’ (সুরা রুম, আয়াত: ২১) রাসুল (সা.) ছিলেন একাধারে সফল রাষ্ট্রনায়ক ও অনুপম পরিবারের অভিভাবক। শত ব্যস্ততার মাঝেও তিনি স্ত্রীদের সঙ্গে আন্তরিক, প্রেমময় ও হাসিখুশি সময় কাটাতেন। তাঁর দাম্পত্য জীবন ছিল পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার অনন্য উপমা। খাদিজা (রা.): আজীবন কৃতজ্ঞতা খাদিজা (রা.)-এর জীবদ্দশায় নবীজি আর কোনো বিয়ে করেননি। তাঁদের ২৫ বছরের দাম্পত্য জীবন ছিল মানসিক নির্ভরতার প্রতীক। প্রথম ওহির প্রচণ্ড ভীতি ও আশঙ্কার মুহূর্তে খাদিজাই নবীজিকে পরম নির্ভরতায় অভয় দিয়েছিলেন। খাদিজা (রা.)-এর ওফাতের পরও রাসুল (সা.) গভীর শ্রদ্ধায় তাঁকে স্মরণ করতেন। ঘরে কোনো পশু জবাই হলে তিনি খুঁজে খুঁজে খাদিজার বান্ধবীদের বাড়িতে গোশত পাঠিয়ে দিতেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৮১৮) সাফিয়া (রা.): কোমলতা ও সম্মান প্...