পোস্টগুলি

নতুন চাঁদ দেখার সুন্নাহ আমল

  হিজরি বর্ষপঞ্জি পুরোপুরি চাঁদের আবর্তনের ওপর নির্ভরশীল। আকাশে নতুন চাঁদের উদয় মানে একটি হিজরি মাসের সমাপ্তি এবং নতুন একটি মাসের আগমন। ইসলামে নতুন চাঁদ দেখা আল্লাহর দরবারে কৃতজ্ঞতা ও কল্যাণ প্রার্থনার এক বিশেষ সুযোগ। মহানবী (সা.) আকাশে নতুন চাঁদ দেখলে উম্মতকে সঙ্গে নিয়ে একটি বিশেষ দোয়া পাঠ করতেন। চাঁদ দেখে নবীজির আমল রাসুল (সা.) যখনই নতুন চাঁদ দেখতেন, তখন দোয়া পড়তেন, “আল্লাহু আকবার, আল্লাহুম্মা আহিল্লাহু আলাইনা বিল আমনি ওয়াল ঈমানি, ওয়াসসালামাতি ওয়াল ইসলামি, ওয়াত্তাওফিকি লিমা তুহিব্বু ওয়া তারদা, রাব্বুনা ওয়া রাব্বুকাল্লাহ।” অর্থ: আল্লাহ মহান। হে আল্লাহ, তুমি এই নতুন চাঁদকে আমাদের ওপর উদিত করো নিরাপত্তা, ইমান, শান্তি ও ইসলামের সাথে। এবং তুমি যা ভালোবাসো ও পছন্দ করো, তার তাওফিক (সফলতা) দান করো। (হে চাঁদ!) আমাদের এবং তোমার রব হলো আল্লাহ। (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৩৪৫১)চাঁদ দেখার সময় এই দোয়াটি পাঠ করা মোস্তাহাব বা অত্যন্ত প্রশংসনীয় একটি আমল, যা মানুষের অন্তরকে প্রকৃতির নিদর্শনের মাধ্যমে স্রষ্টার আরও কাছাকাছি নিয়ে যায়। (ইমাম ইবনে তাইমিয়া, মাজমুউল ফাতাওয়া, ২৪/৪৪৭, মাকতাবাতুল ওবাইকান, রিয়...

বৈদেশিক ঋণ নাকি স্বনির্ভরতা: ইসলামের প্রস্তাব কী

  আধুনিক ধনতান্ত্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় ঋণ নেওয়াকে অত্যন্ত স্বাভাবিক এবং উন্নয়নের অন্যতম অনুঘটক মনে করা হলেও, এর সুদূরপ্রসারী কুফল আজ আমাদের সামষ্টিক অর্থনীতিতে স্পষ্ট। ঋণের বোঝা এবং সুদের চক্রে পড়ে অনেক উন্নয়নশীল দেশই তাদের সার্বভৌমত্ব ও অর্থনৈতিক নীতি নির্ধারণের স্বাধীনতা হারাচ্ছে। বাজেট ঘাটতি মেটাতে গিয়ে এই যে ক্রমাগত বৈদেশিক ঋণ-নির্ভরতা ও সুদের ফাঁদ, এর বিপরীতে আত্মনির্ভরশীলতা ও স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের ব্যাপারে ইসলামের অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি কী, তা তলিয়ে দেখা প্রয়োজন। রাষ্ট্র যখন বড় বড় উন্নয়ন প্রকল্পের অজুহাতে বিদেশি সংস্থাগুলোর কাছ থেকে শর্তযুক্ত ঋণ নেয়, তখন প্রকারান্তরে পুরো জাতিই সেই ঋণের জালে বন্দি হয়ে পড়ে। ঋণের ব্যাপারে ইসলামের অবস্থান ইসলাম ব্যক্তিগত বা রাষ্ট্রীয়—কোনো পর্যায়েই অহেতুক বা বিলাসী ঋণ নেওয়া সমর্থন করে না; বরং ঋণমুক্ত স্বাচ্ছন্দ্যময় জীবনযাপনের ওপর জোর দেয়। একান্ত বাধ্য না হলে ঋণ নেওয়াকে ইসলামে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে, কারণ ঋণ মানুষের মানসিক স্বাধীনতা ও সামাজিক মর্যাদা হরণ করে। রাসুল (সা.) নিয়মিত দোয়ায় ঋণ থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করতেন। সাহাবিরা একবার জিজ্...

যে ৭ কারণে পাপে লিপ্ত হয় মানুষ

  মানুষ স্বভাবগতভাবে দুর্বল। মহান আল্লাহ তাকে বিবেক, জ্ঞান ও সঠিক পথের নির্দেশনা দিয়েছেন, আবার পরীক্ষা নেওয়ার জন্য প্রবৃত্তি ও শয়তানের প্ররোচনাও রেখেছেন। ফলে জীবনের নানা পর্যায়ে মানুষ পাপে লিপ্ত হয়ে পড়ে। পাপ বান্দা ও তার প্রতিপালকের মধ্যকার সম্পর্ক দুর্বল করে আখেরাতের সফলতাকে বিপন্ন করে তোলে। তাই পাপের কারণগুলো জানা এবং সেগুলো থেকে বেঁচে থাকার চেষ্টা করা প্রত্যেক মুসলমানের জন্য অপরিহার্য। ১. ইমানের দুর্বলতা পাপের অন্যতম প্রধান কারণ হলো ইমানের দুর্বলতা। যখন মানুষের হৃদয়ে আল্লাহর প্রতি ভয় ও জবাবদিহির অনুভূতি কমে যায়, তখন সে সহজেই পাপের দিকে ঝুঁকে পড়ে। কারো অন্তরে যদি এই অনুভূতি জাগ্রত থাকে যে আল্লাহ তাকে দেখছেন এবং তার প্রতিটি কথা ও কাজের হিসাব নেওয়া হবে, তাহলে পাপ করার আগে সে বহুবার চিন্তা করবে। রাসুল (সা.) বলেন, ‘ব্যভিচারী যখন ব্যভিচার করে, তখন সে (পূর্ণ) ইমানদার থাকে না।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৭৮২) অর্থাৎ ইমান যত শক্তিশালী হবে, পাপ থেকে দূরে থাকা তত সহজ হবে। ইমান দুর্বল হলেই পাপাচারে লিপ্ত হওয়ার আশঙ্কা বেড়ে যায়। ২. শয়তানের কুমন্ত্রণা মানবজাতির চিরশত্রু শয়তান। আদম (...

কোরআনের ভাষাগত চ্যালেঞ্জে আরবদের বুদ্ধিবৃত্তিক পরাজয়

  মানব ইতিহাসের ধারায় যখনই কোনো নবী বা রাসুল প্রেরিত হয়েছেন, তাঁদের মোজেজা বা অলৌকিক নিদর্শনের প্রকৃতি নির্ধারিত হয়েছে সেই সময়ের সামাজিক শ্রেষ্ঠত্বের মানদণ্ড ও বুদ্ধিবৃত্তিক প্রেক্ষাপট অনুসারে। নবী মুসা (আ.)-এর যুগে জাদুর ব্যাপক প্রচলনের কারণে লাঠি সাপে রূপান্তরের ঘটনা ছিল প্রাসঙ্গিক। নবী ইসা (আ.)-এর সময় চিকিৎসাশাস্ত্রের উন্নতি ঘটার কারণে কুষ্ঠরোগ নিরাময় ছিল বিস্ময়কর। কিন্তু সপ্তম শতাব্দীতে আরবে যে নবী আবির্ভূত হলেন, তাঁর জাতির কাছে মৌলিক গৌরবের বিষয় ছিল শব্দের শিল্প ও বাগ্মিতা। সাহিত্য, কবিতা, ভাষা ও ব্যাকরণে তারা ছিল অগ্রগামী। এগুলোই ছিল তাদের গর্ব ও প্রতিযোগিতার বিষয়। মরুচারী সেই জাতির বাগ্মী ও কবিদের স্তব্ধ করে দিয়েছে কোরআনের ভাষাগত উৎকর্ষ ও আধিপত্য। তাদের সামনে যে অলৌকিক চ্যালেঞ্জ পেশ করেছে কোরআন, তা ইতিহাসের অনন্য বুদ্ধিবৃত্তিক মহাকাব্য। আরবরা ছিল জন্মগতভাবে ভাষা ও সাহিত্যের অনুরাগী। তারা দাবি করত, বিশুদ্ধ ও সুন্দর করে কথা বলা শুধু তাদেরই অধিকার। অবশিষ্ট বিশ্ব তাদের কাছে ছিল ‘আজম’ বা বোবা। ভাষা যেখানে বীরত্বের পরিচয় প্রাচীন আরবরা ছিল জন্মগতভাবে ভাষা ও সাহিত্যের অনুরাগী। তারা...

ধর্ষণ প্রতিরোধে ইসলামের ভাবনা ও বিধান

  ধর্ষণ বর্তমান বিশ্বের অন্যতম উদ্বেগজনক সামাজিক ব্যাধি। কেবল একটি ফৌজদারি অপরাধ বা শারীরিক নির্যাতনই নয়, এটি মূলত মানুষের সম্মান, নিরাপত্তা, স্বাধীনতা ও মৌলিক মানবাধিকারের ওপর চরম বর্বর আঘাত। প্রযুক্তির অভাবনীয় উৎকর্ষ ও আধুনিক আইনগত অগ্রগতির এই যুগেও যখন বিশ্বজুড়ে ধর্ষণের মতো নৃশংস অপরাধের রেখা ক্রমশ ঊর্ধ্বমুখী, তখন প্রমাণিত হয় যে কেবল শুষ্ক আইনি কড়াকড়ি বা শাস্তির ভয় দেখিয়ে মানুষের ভেতরের এই অসুস্থতা দমন করা সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন মানুষের চিন্তা, মনস্তত্ত্ব, চরিত্র এবং সামগ্রিক সামাজিক আচরণের আমূল সংস্কার। ইসলাম এই সমস্যাকে শুধু একটি বিচ্ছিন্ন অপরাধ হিসেবে দেখে না, বরং একে মানুষের ব্যক্তিক, পারিবারিক ও সামাজিক কাঠামোর এক গভীর নৈতিক সংকট হিসেবে বিবেচনা করে। তাই ধর্ষণ প্রতিরোধে ইসলাম এমন এক বহুমাত্রিক দর্শন উপস্থাপন করেছে, যেখানে মনস্তাত্ত্বিক আত্মশুদ্ধি, প্রাতিষ্ঠানিক নৈতিকতা, সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং দৃষ্টান্তমূলক কঠোর ন্যায়বিচারের এক অপূর্ব সমন্বয় ঘটেছে। লিঙ্গসমতার ইসলামি ধারণা ধর্ষণ মানসিকতার মূলে থাকে ক্ষমতা, আধিপত্য এবং অপরকে অবদমিত করার এক অসুস্থ বিকৃতি। ইসলাম সমাজ থেকে এই আদ...

যেমন ছিল চার ইমামের পোশাক-পরিচ্ছদ ও জীবনযাপন

  ইসলামি আইনশাস্ত্রের ইতিহাসে চার মাজহাবের ইমাম হলেন ইমাম আবু হানিফা, ইমাম মালিক, ইমাম শাফেয়ি ও ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রহ.); যারা ‘চার ইমাম’ নামে খ্যাত। তারা ছিলেন সুরুচি, পরিচ্ছন্নতা ও আভিজাত্যের অনন্য প্রতীক। বর্তমান সময়ে অধিকাংশ মানুষের মনে আলেমদের জীবনযাত্রা সম্পর্কে যে কৃচ্ছ্রসাধনের চিত্র রয়েছে, তা মূলত ইতিহাসের সম্পূর্ণ বিপরীত। প্রত্যেকেই তাঁদের নিজস্ব উপায়ে সৌন্দর্য ও পোশাকের এক একটি ধারা তৈরি করেছিলেন। ইসলামে সুন্দর পোশাক ইসলাম ধূলিমলিন ও জীর্ণ অবয়ব ধারণ করাকে পছন্দ করে না, বরং মুমিনকে বাহ্যিক অবয়বে সুন্দর ও মজবুত অবস্থায় দেখতে চায়। কোরআনের একটি বাণীকে কেন্দ্র করে ইসলামের সৌন্দর্যতত্ত্ব গড়ে উঠেছে। আল্লাহ–তাআলা বলেছেন, “হে আদম সন্তান, প্রতি নামাজের সময় তোমাদের জিনাত গ্রহণ করো।” (সুরা আরাফ, আয়াত: ৩১) পরিচ্ছন্ন পোশাক পরিধান করা, উত্তম অবয়ব ধারণ করা এবং নিজের আভিজাত্য প্রকাশ করা নবুয়তের ছেচল্লিশ ভাগের এক ভাগ।” ইমাম মালিক ইবনে আনাস (রহ.) ফখরুদ্দিন রাজি (রহ.) লিখেছেন, এই আয়াতে ‘জিনাত’ বলতে শরীরের পরিচ্ছন্নতা, দামি পোশাক, সুগন্ধি এবং বাহনসহ সকল প্রকার নান্দনিক সৌন্দর্যকে বোঝানো হ...

বদর যুদ্ধের নেপথ্যে: রহস্যময় কিছু স্বপ্ন ও তার ব্যাখ্যা

  বদর যুদ্ধের অন্যতম একটি বিস্ময়কর ও অলৌকিক দিক ছিল স্বপ্ন। যুদ্ধের প্রেক্ষাপট, রণকৌশল ও জয়-পরাজয়ের পেছনে মনস্তাত্ত্বিক জগতের যার গভীর প্রভাব ছিল।  যুদ্ধ শুরুর পূর্বমুহূর্তে এবং যুদ্ধ চলাকালীন মুসলিম ও মুশরিক উভয় শিবিরে বেশ কিছু তাৎপর্যপূর্ণ স্বপ্ন দেখা গিয়েছিল। এই স্বপ্নগুলো একদিকে মুসলমানদের ইমানি শক্তিকে দৃঢ় করেছিল এবং অন্যদিকে কোরাইশদের মনে পরাজয়ের আগাম ভীতি সৃষ্টি করেছিল। (আব্দুল মুইন মুহাম্মদ আত-তালফাহ, আহলামু গাজওয়াতি বদর: আনওয়াউহা ওয়া আকাতিফুহা, মাজাল্লাতুশ শারিয়াহ ওয়াল উলুমিল আরাবিয়্যাহ, ভলিউম: ২, পৃষ্ঠা: ১২, ইমাম মুহাম্মদ ইবনে সাউদ ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়, রিয়াদ, ২০০৮) ইসলামে স্বপ্নের অবস্থান ও প্রকারভেদ ইসলামের প্রাথমিক যুগে ওহির সূচনা হয়েছিল স্বপ্নের মাধ্যমে। আয়েশা (রা.) বলেন, “নবীজির ওহির সূচনা হয়েছিল ঘুমের মধ্যে সত্য স্বপ্নের মাধ্যমে। তিনি যে স্বপ্নই দেখতেন, তা সকালের সূর্যের আলোর মতো বাস্তব হয়ে প্রকাশ পেত।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩) হাদিসে স্বপ্নকে নবুয়তের অংশ হিসেবেও উল্লেখ করা হয়েছে। মহানবী (সা.) বলেছেন, “একজন মুসলিমের সত্য স্বপ্ন হলো নবুয়তের ছে...