পোস্টগুলি

বিপদের তীব্রতায় মৃত্যু কামনা: কী বলে ইসলাম

  বিপদের ঢেউ যখন ক্রমাগত আছড়ে পড়ে জীবন তীরে, তখন অনেকেই সহ্য করতে না পেরে মৃত্যুর কামনা করে। মনের অজান্তে অস্ফুট স্বরে বলে ওঠে কেউ, ‘এভাবে বেঁচে থাকার চেয়ে মৃত্যুই ভালো।’ তবে মুমিনের পথচলা অন্য সবার মতো নয়। সে বিশ্বাস করে, দুনিয়ার কোনো কিছুই দৃশ্যমান কারণ দ্বারা পরিচালিত হয় না। এর পেছনে রয়েছে সর্বজ্ঞ ও পরম প্রজ্ঞাবান রবের সিদ্ধান্ত। রাসুল (সা.) তার জীবদ্দশায় ৭ সন্তানের ৬ জনকেই হারিয়েছেন, একই বছর প্রিয় স্ত্রী খাদিজা (রা.) ও চাচা আবু তালিবের মৃত্যুতে গভীর শোক পেয়েছেন, তায়েফে রক্তাক্ত হয়েছেন। তারপরও তিনি প্রতিটি বিপদকে বানিয়েছেন আল্লাহর দিকে ফিরে যাওয়ার উপলক্ষ্য। দুনিয়া পরীক্ষার হল আল্লাহ–তাআলা পৃথিবীকে জান্নাত বানাননি, বানিয়েছেন পরীক্ষার হল। এখানে প্রাপ্তির মতো অপ্রাপ্তিও থাকবে, হাসির মতো কান্নাও থাকবে। তিনি বলেন, ‘আমি অবশ্যই তোমাদের কিছুটা ভয়, ক্ষুধা, ধনসম্পদ, জীবন ও ফল–ফসলের ক্ষতির মাধ্যমে পরীক্ষা করব। আর ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দিন।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৫৫) বিপদ আল্লাহর পরীক্ষারই অংশ। তাই বিপদ আসা মানেই আল্লাহ বান্দাকে পরিত্যাগ করেছেন, এমন ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। অনেক সময...

নবীজি কেন প্রশ্ন করতে এত উৎসাহ দিয়েছেন

  সাহাবিদের জীবন বিশ্লেষণ করলে একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য নজর কাড়ে, তা হলো—তাঁদের অপ্রতিরোধ্য জ্ঞানপিপাসা ও সত্য অনুসন্ধানের আকুলতা। তাই তাঁরা প্রচুর প্রশ্ন করতেন। পরকালের নাজাত, সামাজিক সংহতি এবং পার্থিব জীবনে সঠিক পথ চেনার জন্য তাঁরা সুযোগ পেলেই নবীজির কাছে প্রাজ্ঞ ও জীবনঘনিষ্ঠ প্রশ্ন নিয়ে উপস্থিত হতেন। সাহাবিদের এই প্রশ্ন করার অভ্যাসটি কেবল সাধারণ বা প্রথাগত কৌতূহল ছিল না; বরং তা ছিল আত্মশুদ্ধি, নীতিচর্চা ও ধর্ম শেখার এক সুনির্দিষ্ট ও জীবনমুখী পদ্ধতি। ভুল ধারণায় না থেকে জেনে নেওয়ার জন্য প্রশ্ন করা কেবল কোনো সাধারণ আদব নয়, বরং জীবনের সুরক্ষার জন্য অত্যন্ত জরুরি এক সুন্নত। অজ্ঞতার মহৌষধ প্রশ্ন করা ইসলামে প্রশ্ন করাকে অজ্ঞতার একমাত্র প্রতিষেধক বা চিকিৎসা হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। সাহাবি জাবের ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত এক প্রসিদ্ধ ঐতিহাসিক ঘটনায় এসেছে—একবার এক সফরে এক সাহাবির মাথায় আঘাত লেগে মারাত্মক ক্ষতের সৃষ্টি হয়। পরে তাঁর গোসলের প্রয়োজন (জুনুবি) হলে তিনি সঙ্গীদের জিজ্ঞেস করেন, তাঁর জন্য তায়াম্মুমের কোনো সুযোগ আছে কি না। সঙ্গীরা না জেনেই জানিয়ে দেন যে পানি থাকা অবস্থায় তাঁর জন্য ত...

হাসান বসরি: দাসের সন্তান থেকে জাতির বিবেক

 ইসলামের প্রথম শতাব্দী ছিল ইতিহাসের এক বিস্ময়কর সময়। তখন পৃথিবীতে একসঙ্গে হাঁটছিলেন নবীজির সাহাবি, তাবেয়ি ও নতুন মুসলিম সমাজের নির্মাতারা। মদিনার অলিগলিতে তখনো প্রতিধ্বনিত হতো ওহির যুগের স্মৃতি, আর বসরার মসজিদগুলোতে জন্ম নিচ্ছিল জ্ঞানচর্চার নতুন দিগন্ত। সেই সময়েই আবির্ভূত হন এমন এক মানুষ, যাঁর কণ্ঠে মানুষ শুনত কোরআনের আবেদন, চোখে দেখত তাকওয়ার দীপ্তি, আর জীবনে খুঁজে পেত দুনিয়াবিমুখ এক আল্লাহ ভীরু মানুষের প্রতিচ্ছবি। তিনি তাবেয়ি যুগের শ্রেষ্ঠ মনীষী—হাসান বসরি (রহ.)। তাঁর জীবন শুরু হয়েছিল এক অদ্ভুত ইতিহাস দিয়ে। পিতা ইয়াসার ও মাতা খাইরা—দুজনই ছিলেন ইরাক বিজয়ের সময় বন্দী হয়ে মদিনায় আসা মানুষ। যুদ্ধবন্দীদের মতো তাঁদেরও বিভিন্ন সাহাবির মধ্যে দাস হিসেবে বণ্টন করা হয়। পিতা ইয়াসার ও মাতা খাইরা—দুজনই ছিলেন ইরাক বিজয়ের সময় বন্দী হয়ে মদিনায় আসা মানুষ। যুদ্ধবন্দীদের মতো তাঁদেরও বিভিন্ন সাহাবির মধ্যে দাস হিসেবে বণ্টন করা হয়। ইয়াসার চলে যান বিশিষ্ট সাহাবি জায়েদ ইবনে সাবিতের ঘরে, আর খাইরা আশ্রয় পান নবীজির স্ত্রী উম্মে সালামার সান্নিধ্যে। (আল–হাসান আল–বাসরি হায়াতুহু ওয়া সিলাতুহ...

নবীজি যেভাবে দরিদ্রদের সদকা করতে শিখিয়েছেন

  মদিনায় দরিদ্র সাহাবিদের মনেও পরকালের সওয়াব অর্জনের তীব্র প্রতিযোগিতা ছিল। একবার দরিদ্র মুহাজিরদের দল নবীজির কাছে এসে বললেন, “ধনবান লোকেরা তো সব সওয়াব নিয়ে গেল! আমরা যেভাবে নামাজ–রোজা করি করি, তারাও করে। কিন্তু তারা দান-সদকা করে, দাস মুক্ত করে, হজ–ওমরাহ করে; যার সামর্থ্য আমাদের নেই।” মহানবী (সা.) বললেন, “আল্লাহ কি তোমাদের এমন অনেক কিছু দেননি যা তোমরা সদকা করতে পারো? প্রতিটি তসবিহ (সুবহানাল্লাহ) বলা একটি সদকা, প্রতিটি তাকবির (আল্লাহু আকবার) বলা একটি সদকা, প্রতিটি তাহমিদ (আলহামদুলিল্লাহ) ও তাহলিল (লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ) বলা একটি সদকা। ভালো কাজের আদেশ দেওয়া ও মন্দ কাজ থেকে বারণ করাও একটি সদকা। এমনকি তোমাদের পারস্পরিক দাম্পত্য সম্পর্কের মধ্যেও রয়েছে সদকার সওয়াব।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১০০৬)। সাহাবিরা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, মানুষ নিজের জৈবিক চাহিদা পূরণ করলেও কি সওয়াব পাবে? নবীজি বুঝিয়ে বললেন, অবৈধ উপায়ে চাহিদা মেটালে যেমন পাপ হতো, তেমনি বৈধ উপায়ে মেটানোতে সওয়াব রয়েছে। অন্য হাদিসে আছে, তিনি তাঁদের নামাজের পর ৩৩ বার সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ ও আল্লাহু আকবার বলার আমল শিখিয়ে দেন, যা তাঁদ...

যিনি ইসলামি আইনকে সুসংগঠিত রূপ দিয়েছিলেন

  ইতিহাসে যাঁরা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে কোটি কোটি মানুষের বিশ্বাস, চিন্তা ও ধর্মচর্চাকে আলোড়িত ও প্রভাবিত করেছেন, ইমাম আবু হানিফা (রহ.) তেমনই এক মনীষী। ফিকহশাস্ত্রের বিকাশ, ইজতিহাদের ধারা প্রতিষ্ঠা এবং ইসলামি আইনকে সুসংগঠিত রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান অনন্য। তাঁর জীবন শুধু একজন ফকিহের জীবনী নয়; বরং জ্ঞানসাধনা, নৈতিক দৃঢ়তা, স্বাধীনচেতা মনোভাব এবং সত্যের প্রতি আপসহীন অবস্থানের এক অনন্য ইতিহাস। জন্ম ও পরিচয় ইমাম আবু হানিফার মূল নাম নু’মান ইবনে সাবিত। তাঁর বংশপরিচয় নিয়ে কিছু ঐতিহাসিক আলোচনা থাকলেও অধিকাংশ নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিকের মতে, তাঁর পূর্বপুরুষ ‘যুত্বা’ ছিলেন বানু তাইমুল্লাহ ইবনে সা’লাবা গোত্রের মুক্ত দাস। ‘আবু হানিফা’ তাঁর আসল নাম নয়। এই উপনামের উৎপত্তি নিয়েও চমৎকার ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ রয়েছে। কুফার আঞ্চলিক ভাষায় লিখনের দোয়াতকে ‘হানিফা’ বলা হতো। তবে তাঁর নাতি ইসমাইলের বর্ণনানুসারে তাঁদের পরিবারের কেউ কখনো দাসত্বে আবদ্ধ ছিলেন না। দুই বর্ণনার সমন্বয়ে এটি স্পষ্ট যে পূর্বপুরুষ সূত্রে দাসত্বের সম্পর্ক থাকলেও তাঁর পিতা সাবিত কিংবা তিনি নিজে পূর্ণ স্বাধীন ও সম্মানজনক পরিবারের সন্তান ছিল...

আবু তালহা (রা)-এর অবাক জীবন

  শহরে প্রবেশ করেন এক মুসাফির। চিন্তার ছাপ চেহারায়। পথচারীদের সাহায্যে তিনি মসজিদে নববিতে চলে আসেন। নবীজি (সা.) মসজিদেই ছিলেন৷ সঙ্গে সাহাবিরা৷ সামনে এগিয়ে যান মুসাফির। নবীজিকে সালাম করে বিনয়ের সঙ্গে জানান, ‘অনেক দূর থেকে এসেছি। মদিনায় কেউ পরিচিত নেই। থাকারও কোনো ব্যবস্থাপত্র হয়নি। আমাকে সাহায্য করুন, আল্লাহর রাসুল!’ নবীজি (সা.) তখনই সম্মানিতা স্ত্রীদের ঘরে খোঁজ লাগান—তাদের কারও ঘরে খাবার কিছু আছে কি না! একে একে সকলেই জানান, ‘ঘরে আজ খাবার কিছুই নেই!’ এবার সাহাবিদের দিকে ফিরে নবীজি (সা.) বলেন, ‘কেউ কী আছ, যে আল্লাহর এই বান্দাকে মেহমান বানাতে পারবে?’ নবীজির আহ্বানে এক সাহাবি দাঁড়িয়ে যান। জ্যোতির্ময় চেহারা৷ সবিনয়ে বলেন, ‘মেহমানকে আমি বাড়ি নিয়ে যাব।’ এটুকু বলে তখনই বেরিয়ে পড়েন। বাড়ি গিয়ে মেহমানের কথা জানিয়ে স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করেন, ‘ঘরে খাবার কিছু আছে?’ পরিকল্পনা মতো হয় সবকিছু। বাচ্চাদের নানান বাহানায় ঘুম পাড়িয়ে দেন ওদের মা। তারপর মেহমানের সামনে খাবার দিয়ে বাতি নিভিয়ে দেওয়া হয়। খেয়ে ওঠেন মেহমান। স্ত্রী জবাব দেন, ‘বাচ্চাদের জন্য সামান্য রান্না করেছি। এছাড়া কিছু নেই।’ সাহাবি বলেন, ‘কোনো অসু...

শয়তানের সবচেয়ে বড় লক্ষ্য

  শয়তানের সবচেয়ে বড় লক্ষ্য—আপনার সংবেদনশীলতা নষ্ট করে দেয়া শয়তানকে নিয়ে আমাদের একটা ভুল ধারণা আছে। আমরা ভাবি, সে বুঝি হঠাৎ ঝাঁপিয়ে পড়ে। একদিন সকালে এসে আপনাকে দিয়ে বিরাট কোনো পাপ করিয়ে ফেলবে। কিন্তু কুরআন তার কর্মপদ্ধতির যে ছবি আঁকে, তা এর ঠিক উল্টো। তার আসল শক্তি তাড়াহুড়োয় নয়। তার আসল শক্তি অপেক্ষায়। সূরা আ'রাফে আদম ও হাওয়া (আ)-এর ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে আল্লাহ একটি অসাধারণ শব্দ ব্যবহার করেছেন: فَدَلَّاهُمَا بِغُرُورٍ "সে প্রতারণার মাধ্যমে তাদের ধীরে ধীরে পদস্খলিত করল।" (সূরা আ'রাফ, ৭:২২) "দাল্লাহুমা।" আরবি 'দাল্লা' শব্দটি এসেছে 'দালউ' থেকে, যার অর্থ বালতি। আগের যুগে কুয়া থেকে পানি তোলা হতো দড়ি বাঁধা বালতি দিয়ে। বালতি কুয়ায় ফেলে টেনে টেনে তোলা—এর নাম 'আদলা দালওয়াহু'। এখন ভাবুন, বালতিটা কি এক টানে উঠে আসে? না। ধীরে ধীরে ওঠে। আর সেই প্রক্রিয়া যখন মাত্রাতিরিক্ত ধীর হয়, অস্বাভাবিক লম্বা সময় নেয়—তখন আরবিতে বলা হয় 'দাল্লা'। আল্লাহ শয়তানের কাজ বোঝাতে ঠিক এই শব্দটিই বেছে নিলেন। কেন? কারণ শয়তান আপনাকে ...