পোস্টগুলি

প্রজাদের পাহারাদার যখন খলিফা নিজে

  ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা ওমর (রা.)-এর শাসনকালকে ইসলামি ইতিহাসের স্বর্ণযুগ বলা হয়। রাষ্ট্র পরিচালনার প্রতিটি ক্ষেত্রে তিনি এমন কিছু যুগান্তকারী ও বৈপ্লবিক পদ্ধতির প্রবর্তন করেছিলেন, যা আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও সমাজসংস্কারকদের জন্য আজও পরম বিস্ময়ের বিষয়। তিনি জনগণের নিরাপত্তা বিধানের লক্ষ্যে যে দূরদর্শী পদক্ষেপ নিয়েছিলেন, তার অন্যতম ছিল রাতের পাহারাদারি ব্যবস্থাপনা। বর্তমানের সুশৃঙ্খল পুলিশি ব্যবস্থার যে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ আমরা দেখি, মদিনার পুণ্যভূমিতে তার আদি রূপ দেখা যায়। অনেক ইতিহাসবিদের মতে, তাঁর এই উদ্ভাবনী কর্মতৎপরতা থেকেই আজকের পুলিশি ব্যবস্থার বীজ বপন করা হয়েছিল। প্রহরা ব্যবস্থা থেকে পুলিশি ব্যবস্থাপনা ইসলামের প্রথম খলিফা আবু বকর সিদ্দিক (রা.)-এর শাসনামলে প্রহরীদলের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)। এরপর ওমর (রা.) খলিফা হলে তাঁর আমলে এই ব্যবস্থা আরও প্রাতিষ্ঠানিক ও বিস্তৃত রূপ পায়। ওমর (রা.) নিজেই এই কঠিন দায়িত্ব পালনে রাজপথে নেমে আসতেন। কখনো তাঁর সঙ্গে থাকতেন আসলাম, আবার কখনো সাহাবি আবদুর রহমান ইবনে আওফ (রা.)।প্রাথমিক পর্যায়ে এই ব্যবস্থার ...

কোরআনের বর্ণনায় পিতৃত্ব

  পিতৃত্বকে কোরআন মানুষের অন্যতম শক্তিশালী বন্ধন হিসেবে গণ্য করে। কারণ, এই সম্পর্কের সঙ্গে জড়িয়ে আছে অনেক বৈষয়িক ও নৈতিক অধিকার এবং দায়িত্ব। পিতৃত্ব একজন মানুষের ওপর অনেক বড় দায়িত্বের বোঝা তৈরি করলেও একে আল্লাহর পক্ষ থেকে বান্দাদের জন্য একটি বিশেষ উপহার ও অনুগ্রহ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই কারণেই নেককার বান্দাদের দোয়া ছিল এমন, ‘হে আমাদের পালনকর্তা, আপনি আমাদেরকে এমন স্ত্রী ও সন্তানাদি দান করুন যারা আমাদের চক্ষু শীতল করবে’ (সুরা ফুরকান, আয়াত: ৭৪)। পিতৃত্বের ধারণা ও ব্যবহার আরবিতে ভাষাগতভাবে ‘আব্ব’ (পিতা) শব্দের মূল অর্থ প্রস্তুতি গ্রহণ করা এবং ইচ্ছা পোষণ করা। যেমন বলা হয়, ‘লোকটি যাওয়ার জন্য আ-ব্বা (তৈরি হয়েছে)’, অর্থাৎ সে প্রস্তুতি নিয়েছে এবং যাওয়ার সংকল্প করেছে। এ ছাড়া ‘আব্ব’ শব্দ দ্বারা স্বদেশের প্রতি টান বা আকাঙ্ক্ষাও বোঝানো হয়। ‘লিসানুল আরব’ অভিধানে উল্লেখ আছে যে ‘উবুয়্যাহ’ (পিতৃত্ব) শব্দটি তিন অক্ষরবিশিষ্ট মূল ধাতু (আলিফ, বা, ইয়া) থেকে এসেছে, যার অর্থ হলো কোনো কিছু থেকে বিরত থাকা বা বাধা দেওয়া।এখান থেকে পিতৃত্বের কয়েকটি অর্থ স্পষ্ট হয়: ১. এটি সামাজিক ও শিক্ষামূলকভাবে সন্তানক...

দুনিয়ার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে কোরআনের ১০ আয়াত

  পার্থিব জীবনকে পবিত্র কোরআনে একটি ‘পরীক্ষাগার’ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। এখানে আমাদের ধন-সম্পদ, সন্তান-সন্ততি এবং সামর্থ্য—সবই সেই পরীক্ষার একেকটি অনুষঙ্গ। এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া এবং প্রকৃত সাফল্য লাভের জন্য আল্লাহ–তাআলা কোরআনে কিছু সুনির্দিষ্ট নীতিমালা দিয়েছেন। জীবন-সংগ্রামের এই পরীক্ষায় সফল হতে সহায়ক এমন ১০টি আয়াত: ১. সম্পদ ও সন্তান দুনিয়ার পরীক্ষা আমাদের চারপাশের মায়া ও মমতা অনেক সময় আমাদের মূল লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত করে। মনে রাখতে হবে, এগুলো আমাদের সামর্থ্য প্রমাণের একেকটি মাধ্যম মাত্র। উচ্চারণ:  ওয়া'লামু আন্নামা আমওয়ালুকুম ওয়া আওলাদুকুম ফিতনাহ। ওয়া আন্নাল্লাহা ইনদাহু আজরুন আযিম। অর্থ:  আর জেনে রাখো, তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি তো পরীক্ষা মাত্র। আর আল্লাহর কাছে রয়েছে মহাপুরস্কার। (সুরা আনফাল, আয়াত: ২৮) ২. পবিত্র উপার্জন থেকে ব্যয় সাফল্যের প্রথম ধাপ হলো উপার্জনের স্বচ্ছতা। কেবল হালাল ও পবিত্র সম্পদ থেকে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ব্যয় করলেই সেই পরীক্ষা সার্থক হয়। উচ্চারণ:  ইয়া আইয়্যুহাল্লাযিনা আমানু আনফিকু মিন তাইয়্যিবাতি মা কাসাবতুম। অর্থ:  হে মুমিনগণ! ত...

ফিতনার ভয়াবহতা থেকে বাঁচার উপায়

ইসলামে ‘ফিতনা’ শব্দটি একাধিক অর্থে ব্যবহৃত হয়। এর মধ্যে রয়েছে পরীক্ষা-নিরীক্ষা, বিপদ-মুসিবত, শাস্তি, বিভ্রান্তি ও মতবিরোধ। কোরআনে আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘মানুষ কি মনে করে, আমরা ঈমান এনেছি বললেই তাদেরকে পরীক্ষা না করে ছেড়ে দেওয়া হবে?’ (সুরা আনকাবুত, আয়াত: ২) ফিতনা শুধু কষ্ট বা বিপদ নয়, বরং ভালো অবস্থাও এক ধরনের পরীক্ষা হতে পারে। এর মাধ্যমে মানুষের ইমান, ধৈর্য ও সত্যনিষ্ঠা প্রকাশ পায়। ফিতনার প্রকারভেদ ১.  প্রবৃত্তির ফিতনা:  যা মানুষের কামনা-বাসনা ও দুনিয়ার আকর্ষণের মাধ্যমে আসে। যেমন—নারী, সম্পদ ও ভোগ-বিলাসের মোহ। ২.   সন্দেহের ফিতনা:   যা বিভ্রান্তি, ভুল ব্যাখ্যা ও ভুল আকিদার মাধ্যমে আসে। যেমন—বিদআত ও ইসলামের বিকৃতি।   ফিতনার কারণসমূহ প্রবৃত্তির অনুসরণ:  মানুষ যখন নিজের ইচ্ছাকে সত্যের উপরে বসায়, তখন তার বিবেক অন্ধ হয়ে যায়। আল্লাহ বলেন, ‘তুমি খেয়াল-খুশির অনুসরণ করো না, তাহলে তা তোমাকে আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত করবে।’ (সুরা সদ, আয়াত: ২৬) ভারসাম্যহীনতা:  ধর্মীয় ক্ষেত্রে অতিরিক্ত কঠোরতা বা শিথিলতা—উভয় চরমপন্থাই বিভ্রান্তি জন্ম দেয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বাড়াবাড়ি করা থ...

সিরাত ,মুহাম্মাদ (সা.) যেদিন নবী হলেন

  নবীজি বসে আছেন চাদর মুড়ি দিয়ে। কিছু সময় আগেও ঠকঠক করে কাঁপছিলেন তিনি। যেনবা প্রবল জ্বরে আক্রান্ত। আজ বাইরে থেকে এসে ঘরে প্রবেশ করেন যখন, তখন থেকেই কাঁপছেন তিনি। ঘরে ঢুকেই প্রিয়তমা খাদিজাকে উদ্দেশ্য করে বলেন—‘আমাকে চাদরে মুড়ে দাও! আমাকে চাদরে মুড়ে দাও!’ এমন সময় ফেরেশতা জিব্রাইল (আ.) এসে বললেন, “হে চাদরাবৃত, উঠুন, মানুষকে সতর্ক করুন। মাহাত্ম্য ঘোষণা করুন আপনার প্রতিপালকের। আপনার পোশাক-পরিচ্ছদ পবিত্র রাখুন এবং দূরে থাকুন অপবিত্রতা থেকে।” (সুরা মুদ্দাসসির, আয়াত: ১-৫) এই ঘটনার কিছু দিন আগের ঘটনা। মক্কার আকাশজুড়ে সে–সময় অন্ধকার। মানুষ সব ডুবে আছে প্রতিমার উপাসনায়। একত্ববাদের যে সুরভি মক্কার বাতাসে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন আল্লাহর নবী ইব্রাহিম (আ.), কল্পিত দেবতাদের কদর্য গন্ধে তা আজ বিলীয়মান। মানুষের মধ্যে মানবতা নেই। চারপাশজুড়ে কেবল হানাহানি, গোত্রীয় বিদ্বেষ আর অকারণ রক্তপাত! মুহাম্মদ প্রত্যহ এমন মন-খারাপ-করা দৃশ্যাবলি দেখে চলেন। চেনামুখ মানুষগুলোর এমন চারিত্রিক অধঃপতন, জাতিগত অবক্ষয় দেখে দেখে তিনি ক্লান্ত বোধ করেন। হৃদয় তাঁর হয়ে ওঠে ব্যথাভার। মুহাম্মদ প্রত্যহ এমন মন-খারাপ-করা দৃশ্যাবলি দেখে চ...

মক্কার অনুর্বর উপত্যকায় বসতি ও ভাষার প্রশ্ন

  ইতিহাসে মক্কায় মানব বসতি স্থাপনের গল্পটি কী জানেন? কোন সে ঐশ্বরিক ইচ্ছা ও পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সঙ্গে তা জড়িয়ে আছে? একটি ফল-ফসলাদিহীন জনমানবশূন্য পাহাড়ি উপত্যকায় জননী হাজেরা আর ইসমাইলের মাধ্যমে মানব জীবনযাত্রা শুরু কোন সে উদ্দেশ্যে? প্রথমে শিশু ইসমাইল ও তাঁর জননীকে শুষ্ক প্রান্তরে রেখে যাওয়ার সময় আল্লাহর নিকট ইব্রাহিম (আ.)-এর দোয়াটি খেয়াল করুন, ‘হে আমাদের রব! আমি আমার বংশধরদের কিছু সংখ্যককে বসবাস করালাম অনুর্বর উপত্যকায় আপনার পবিত্র ঘরের কাছে, হে আমাদের রব! এ জন্য যে তারা যেন সালাত কায়েম করে। অতএব আপনি কিছু লোকের অন্তর তাদের প্রতি অনুরাগী করে দিন এবং ফলফলাদি দিয়ে তাদের আহারের ব্যবস্থা করুন।’ (সুরা ইব্রাহিম, আয়াত: ৩৭) এখন ইব্রাহিম (আ.) কীভাবে তাঁর স্ত্রী ও একমাত্র সন্তানকে এই মরুপ্রান্তরে রেখে গেলেন, সেই ঘটনা সহিহ বুখারি থেকে শোনা যাক। ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, নারী জাতি প্রথম ইসমাইল (আ.)-এর মাতা হাজরা থেকেই কোমরবন্ধ বানানো শিখেছে। হাজেরা সারা থেকে আপন গর্ভের নিদর্শনাবলি গোপন করার উদ্দেশ্যেই কোমরবন্ধ লাগাতেন। অতঃপর উভয়ের মনোমালিন্য চরমে পৌঁছালে আল্লাহর আদেশে ইব্রাহিম (আ.) হাজেরা ও ত...

ক্ষমা করার পদ্ধতি শেখায় কোরআনের ১০ আয়াত

  ক্ষমা কেবল একটি মানবিক গুণ নয়, এটি একটি মহৎ আত্মিক শক্তি। আমাদের চারপাশে অনেকেই হয়তো আমাদের সঙ্গে রূঢ় আচরণ করেন বা কষ্ট দেন। সেই কষ্ট মনে পুষে রেখে প্রতিহিংসা পরায়ণ হওয়ার চেয়ে ক্ষমা করে দেওয়া অনেক বেশি সম্মানের। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ ক্ষমাশীলতার যে অনন্য শিক্ষা দিয়েছেন, তার ১০টি বিশেষ দিক তুলে ধরা হলো: ১. ক্ষমাশীলদের জন্য আল্লাহর ভালোবাসা প্রতিশোধ নেওয়ার সামর্থ্য থাকার পরও যারা রাগ নিয়ন্ত্রণ করে মানুষকে ক্ষমা করেন, তাঁরাই প্রকৃত সৎকর্মশীল। উচ্চারণ:  ওয়াল কাযিমিনাল গাইযা ওয়াল আফিনা আনিন নাস, ওয়াল্লাহু ইউহিব্বুল মুহসিনিন। অর্থ:  যারা ক্রোধ সংবরণ করে এবং মানুষকে ক্ষমা করে দেয়। আর আল্লাহ সৎকর্মশীলদের ভালোবাসেন। (সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৩৪) ২. আল্লাহর ক্ষমা পেতে মানুষকে ক্ষমা করা আমরা নিজেরা যখন সব সময় স্রষ্টার কাছে ক্ষমার প্রত্যাশী, তখন আমাদেরও উচিত অন্য মানুষের ভুলগুলোকে উদারচিত্তে ক্ষমা করে দেওয়া। উচ্চারণ:  ওয়াল ইয়া'ফু ওয়াল ইয়াসফাহু, আলা তুহিব্বুনা আই ইয়াগফিরাল্লাহু লাকুম। অর্থ:  তারা যেন ক্ষমা করে এবং উপেক্ষা করে। তোমরা কি চাও না যে আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করুন...