পোস্টগুলি

ইমাম ইবনে কাসির: শতাব্দী পেরিয়েও কেন প্রাসঙ্গিক

  ইতিহাসের গতিপথ বদলে দেওয়া মনীষীদের কলম কেবল শব্দ বা বাক্য রচনা করে না; বরং যুগের সামষ্টিক আকিদা, মনস্তত্ত্ব ও জীবনদর্শনকে নির্মাণ করে। জ্ঞানচর্চার দীর্ঘ পথপরিক্রমায় মুসলিম উম্মাহ এমন কিছু ক্ষণজন্মা গবেষকের দেখা পেয়েছে, যাঁদের কাজ শতাব্দী পেরিয়েও সমভাবে প্রাসঙ্গিক। অষ্টম হিজরির প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ, মুহাদ্দিস ও ফকিহ হাফেজ ইবনে কাসির (রহ.) ছিলেন তেমনই এক মহান ব্যক্তিত্ব। আজ এত বছর পরও ইসলামি চিন্তাজগতে তাঁর প্রতিটি কাজ নির্ভরযোগ্যতা, বুদ্ধিবৃত্তিক সততা ও অনন্য ভারসাম্যের এক জীবন্ত প্রতীক হিসেবে মূল্যায়িত হয়। সংগ্রামমুখর শৈশব হিজরি ৭০১ সনে সিরিয়ার ঐতিহাসিক বসরা নগরীতে ইবনে কাসির জন্মগ্রহণ করেন, যা ছিল সেকালের ইলমি চর্চার এক অনন্য কেন্দ্র। শৈশবের প্রারম্ভেই তিনি পিতৃস্নেহ হারান। ফলে এক কঠিন সামাজিক ও আর্থিক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে তাঁর জীবন শুরু হয়। পিতার মৃত্যুর পর পরিবারের সঙ্গে তিনি দামেস্কে চলে আসেন। এই স্থান পরিবর্তন তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ অমর কীর্তি হলো ‘তাফসিরে ইবনে কাসির’। এর মূল শক্তি হলো—কোরআনের আয়াত দ্বারা কোরআনের ব্যাখ্যা এবং সহিহ হাদিসের যথাযথ প্রয়োগ। ...

বাজেট, মূল্যস্ফীতি ও সাধারণ মানুষের জীবন: ইসলাম কী বলে

  প্রতিবার বাজেটের পর সাধারণ মানুষের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ থাকে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম নিয়ে। দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির গতিপ্রকৃতি কিংবা মেগা প্রকল্পের বরাদ্দের চেয়েও তাদের কাছে বাজেটের সবচেয়ে বড় অর্থ—বাজার খরচ কমবে না বাড়বে। চাল, ডাল, তেল, চিনি আর ওষুধের দাম কি উঠবে না নামবে। বর্তমান বাজারে মূল্যস্ফীতির যে চাপ, তার সঙ্গে নতুন বাজেটের কর প্রস্তাবনা ও বাজার ব্যবস্থাপনার সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড়। এই পরিস্থিতিতে বাজার নিয়ন্ত্রণ, মূল্যস্ফীতি, সিন্ডিকেট এবং কৃত্রিম সংকটের মুখে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা নিয়ে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি ও নির্দেশনা কী, তা জানা দরকার। যেহেতু ইসলাম শুধু কিছু আনুষ্ঠানিক ইবাদতের সমষ্টি নয়, বরং এটি একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান। মানুষের অর্থনৈতিক জীবন যাতে শোষণমুক্ত, সহজ ও ভারসাম্যপূর্ণ হয়, ইসলামে তার স্পষ্ট রূপরেখা রয়েছে। যারা বাজারকে অস্থিতিশীল করে তোলে, তারা মূলত সমাজের অসহায় মানুষের পকেট কাটে। ইসলাম মনে করে, এ ধরনের উপার্জন কোনোভাবেই বরকতময় হতে পারে না। মজুতদারি ও কৃত্রিম সংকটে ইসলাম বাজারের স্বাভাবিক নিয়ম হলো, পণ্যের সরবরাহ ও চাহিদার ওপর ভিত্তি করে দাম নির্ধারিত হবে। কিন্ত...

হাদিসের আলোয় তিন শ্রেণির বেহেশতি মানুষ

  হাদিসে কুদসিতে মহান আল্লাহ বলেন, ‘আমি আমার সব বান্দাকে একনিষ্ঠ (মুসলিম) হিসেবে সৃষ্টি করেছি। অতঃপর তাদের কাছে শয়তান এসে তাদের ধর্ম থেকে বিচ্যুত করে দেয়। আমি যেসব জিনিস তাদের জন্য হালাল করেছি, শয়তান তা হারাম করে দেয়। অধিকন্তু সে তাদের আমার সঙ্গে এমন বিষয়ে শিরক করার নির্দেশ দেয়, যে বিষয়ে আমি কোনো প্রমাণ পাঠাইনি।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৮৬৫) শয়তানের প্ররোচনায় পড়ে মানুষ অনেক সময় আল্লাহর বিধান ভুলে যায়। সৃষ্টির শুরুতে তাকে যে ইমানি একনিষ্ঠতা ও শুভ্রতা দেওয়া হয়েছিল, তা সে হারিয়ে ফেলে এবং অবাধ্যতার পথে হেঁটে অপরাধের অন্ধকারে শামিল হয়। তবে এই সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক পঙ্কিলতার মধ্যেও যাঁরা নিজেদের চরিত্র ও নৈতিকতা রক্ষা করতে পারেন, তাঁদের জন্য রয়েছে পরকালের পরম সুসংবাদ। এই হাদিসের পরবর্তী অংশে রাসুল (সা.) বেহেশতের স্থায়ী অধিবাসী হবেন—এমন তিন শ্রেণির মানুষের বৈশিষ্ট্যের কথা উল্লেখ করেছেন। এমন ক্ষমতার অধিকারী বা শাসক, যিনি ন্যায়পরায়ণ, দানশীল এবং নেক কাজের তৌফিকপ্রাপ্ত। এমন ব্যক্তি, যিনি অত্যন্ত দয়ালু এবং প্রত্যেক আত্মীয় ও মুসলমানের প্রতি কোমল হৃদয়ের অধিকারী। এমন অভাবী ব্যক্তি, যিনি চরিত্রবা...

মহানবী কেন ‘মাদায়েনে সালেহ’ দেখতে নিষেধ করেছেন

  বর্তমান সৌদি আরবের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত একটি প্রাচীন উপত্যকা ‘আল-উলা’। চোখধাঁধানো মরুভূমির প্রাকৃতিক দৃশ্য, বিলাসবহুল রিসোর্ট আর হাজার বছরের প্রাচীন পাথুরে স্থাপত্যের কারণে বিশ্বজুড়ে পর্যটকদের কাছে এটি এখন অন্যতম আকর্ষণীয় স্থান। প্রত্নতাত্ত্বিকদের মতে, এখানকার বিশাল পাহাড় কেটে তৈরি করা চোখধাঁধানো কারুকার্য ও স্থাপত্যশৈলী আধুনিক যুগের মানুষকেও রীতিমতো অবাক করে দেয়। কিন্তু একজন সাধারণ পর্যটকের চোখে আল-উলা কেবলই এক প্রাচীন সভ্যতার নান্দনিক নিদর্শন হলেও, একজন মুমিনের কাছে এবং ইসলামি ইতিহাসে এই স্থানের তাৎপর্য সম্পূর্ণ ভিন্ন ও অত্যন্ত ভয়াবহ। ইসলামি ঐতিহ্য অনুযায়ী, এই আল-উলা অঞ্চলটিই হলো ইতিহাসের অভিশপ্ত ও ধ্বংসপ্রাপ্ত জাতি ‘সামুদ’ (Thamud) এর বাসস্থান, যা ‘মাদায়েনে সালেহ’ (নবী সালেহের শহর) নামে পরিচিত। মানব ইতিহাসের এক চরম অহংকারী ও অবাধ্য জাতিকে আল্লাহ–তাআলা যেখানে তাঁর কঠিন আজাব দিয়ে চিরতরে মিটিয়ে দিয়েছিলেন, সেই স্থানটি আজ পর্যটকদের আনন্দ-বিনোদনের কেন্দ্রে পরিণত হচ্ছে। প্রশ্ন জাগে, যে স্থানে আল্লাহর গজব নাজিল হয়েছিল, সেখানে কি একজন মুসলমানের জন্য বিনোদনমূলক ভ্রমণে যাওয়া কিংবা...

ক্লান্তি ও অবসাদে ‘তাসবিহে ফাতিমি’: এক অপার্থিব উপহার

  আমাদের অনেকের ঘরেই এখন স্থায়ী বা সার্বক্ষণিক কোনো গৃহকর্মী বা সাহায্যকারী নেই। অধিকাংশ গৃহকর্মী এখন নিজ নিজ প্রয়োজনে ছুটিতে থাকেন। যাঁরা সব সময় কারও না কারও সাহায্য নিয়ে ঘরের দৈনন্দিন কাজগুলো করতে অভ্যস্ত, তাঁদের জন্য এই সময়টা বেশ কঠিন হয়ে যায়। আবার যাঁদের বাসায় আগে থেকেই কোনো সাহায্যকারী নেই, তাঁরাও প্রতিদিন একা হাতে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত সব সামলাতে সামলাতে মাঝেমধ্যে চরম বিরক্ত ও ক্লান্ত হয়ে পড়েন। সংসারের এমন ক্লান্তি আর অবিরাম পরিশ্রমের কথা মনে হলে অবলীলায় চলে আসে নবীকন্যা হজরত ফাতিমার কথা। তিনি ছিলেন নবীজির অতি আদরের কন্যা। অথচ তাঁর পার্থিব জীবন ছিল একেবারেই সাদামাটা ও সাধারণ। বিয়ের পর নতুন পথ চলতে গিয়ে স্বামী-স্ত্রী পারস্পরিক সমঝোতা করে নিয়েছিলেন। আলী (রা.) ঘরের বাইরের কাজগুলো করতেন, আর ফাতিমা (রা.) দেখতেন ঘরের ভেতরের সমস্ত বিষয়। তাই সংসারের সব কাজ তিনি একাই করতেন এবং অত্যন্ত আগ্রহের সঙ্গেই করতেন। তবে যেহেতু কাজগুলো ছিল কায়িক পরিশ্রমের, তাই তাঁর খুব কষ্ট হতো। সে যুগে তো আর এ যুগের মতো এত প্রাচুর্য, আধুনিক প্রযুক্তি ও নাগরিক সুযোগ-সুবিধা ছিল না। তিনি দূরবর্তী কূপ থেকে চামড়ার ব...

আল্লাহর পথে ব্যয়: একটি বীজের উপমা

  আল্লাহর পথে ব্যয়: একটি বীজের উপমা —নোমান আলী খান ভূমিকা: ------ কুরআনের সূরা বাকারায় আল্লাহ একটি বিখ্যাত উপমা দিয়েছেন। মুসলিম সমাজে তহবিল সংগ্রহের অনুষ্ঠানে এই আয়াতটি বারবার শোনা যায়, তাই অনেকেই এটির সাথে পরিচিত। আল্লাহ বলেছেন — "যারা আল্লাহর পথে তাদের সম্পদ ব্যয় করে, তাদের দৃষ্টান্ত হলো একটি বীজের মতো, যা থেকে সাতটি শীষ জন্মায়, আর প্রতিটি শীষে একশটি দানা থাকে। আল্লাহ যাকে ইচ্ছা বহুগুণে বাড়িয়ে দেন। আল্লাহ সর্বব্যাপী, সর্বজ্ঞ।" (২:২৬১) একটি থেকে সাতশো। তারপর আল্লাহ বলছেন, এর উপরেও তিনি যাকে ইচ্ছা বহুগুণে বাড়িয়ে দেন — অর্থাৎ সাতশো সংখ্যাটিও কেবল একটি শুরু। কিন্তু এই উপমাটি বিচ্ছিন্ন কোনো বক্তব্য নয়। এটি একটি দীর্ঘ ধারাবাহিক আলোচনার অংশ, যার শিকড় কয়েক আয়াত আগে থেকেই শুরু হয়েছে। সেই প্রেক্ষাপট না বুঝলে উপমাটির পূর্ণ শক্তি অনুভব করা সম্ভব নয়। জীবন ও মৃত্যুর থিম — আয়াতুল কুরসি থেকে শুরু: ----------------------------------------------------------------- এই উপমার কয়েক আয়াত আগেই রয়েছে আয়াতুল কুরসি। সেখানে আল্লাহর প্রথম পরিচয় দেওয়া হয়েছে এভাবে — আল্ল...

সাহাবি হিন্দের হিজরত: মাতৃভূমি ত্যাগের বেদনাকাব্য

  হিজরতের আদেশ চলে এসেছে। মক্কার মুসলমানরা ভেতরে-ভেতরে প্রস্তুত হচ্ছেন স্বদেশ ত্যাগ করার জন্য। কিন্তু দেশ ছেড়ে যাওয়া তো সহজ কাজ নয়। যে দেশের আবহাওয়া ও আলো-বাতাসে বেড়ে ওঠা, শৈশব-কৈশোর পার হয়েছে যে দেশের জমিনে হেঁটে ও দৌড়ে, তা ছেড়ে অচেনা কোনো বিদেশ-বিভুঁইয়ে যাত্রার যে কী যন্ত্রণা, তা শুধু ভুক্তভোগী বুঝতে পারেন। এক. স্বদেশ ত্যাগের কথা ভেবে মন ভেঙে যায় হিন্দের। তার পুরো নাম হিন্দ বিনতে আবি উমাইয়া আল-মাখজুমিয়া। তিনি ছিলেন মক্কার অন্যতম শীর্ষ ধনকুবের আবু উমাইয়া সুহাইলের দুলালি। জীবনভর কাটিয়েছেন চরম রাজকীয় আয়েশের মধ্যে। দুঃখ বা অভাব কী জিনিস, তা তিনি জানতেন না। দাস-দাসীর পরিবেষ্টনে বড় হওয়া এই নারী না চাইতেই হাতের কাছে হাজির পেয়েছেন সুখের তাবৎ আয়োজন। বাবার বাড়ি ছেড়ে যখন স্বামী আবদুল্লাহ ইবনে আবদুল আসাদের ঘরে এলেন, সেখানেও দেখা পেলেন রাশি রাশি সুখ ও ঐশ্বর্যের। পরনে থাকত সারাক্ষণ দামি রেশমের পোশাক, হাতে-কানে-গলায় বাহারি অলংকার। নিত্যনতুন প্রসাধনীতে রাঙিয়ে রাখতেন চিবুক ও ওষ্ঠাধর। রাজকুমারীর মতো জীবন কাটাতেন হিন্দ। স্বামী আবদুল্লাহর গভীর আদর, সোহাগ ও ভালোবাসায় যেন এক স্বপ্নরাজ্যে বিচরণ করতেন...