পোস্টগুলি

মা যদি আর্থিক প্রতারণা করেন সন্তানের করণীয় কী

  পৃথিবীতে সন্তানের সবচেয়ে নিরাপদ, নির্ভরযোগ্য ও ভালোবাসার স্থান হলেন মা। কিন্তু সেই মা-ই যদি সন্তানের সঙ্গে মিথ্যা বলেন, প্রতারণামূলক আর্থিক দেনা তৈরি করেন কিংবা মানসিক কষ্টের কারণ হন—তখন সন্তানের মনের অবস্থা কেমন হয়? মাতৃত্বের সুউচ্চ মর্যাদার কারণে তখন এক জটিল নৈতিক টানাপোড়েন শুরু হয়।  এমন সংবেদনশীল পারিবারিক সংকটে সন্তানের করণীয় কী? কীভাবে সম্মান বজায় রেখে এই অন্যায়ের প্রতিকার করা যায়? ইসলাম একটি ভারসাম্যপূর্ণ জীবনব্যবস্থা। একদিকে ইসলাম পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণের চূড়ান্ত নির্দেশ দেয়, অন্যদিকে যে কারও প্রতারণাকে অন্যায় হিসেবে চিহ্নিত করে। পিতা-মাতার ভুলত্রুটি নীরবে সহ্য করে নিজেকে ও সন্তানদের সংকটের মুখে ঠেলে দেওয়া ইসলামের আদব নয়; বরং প্রজ্ঞা, নম্রতা ও দৃঢ়তার সঙ্গে সীমারেখা নির্ধারণ করাই ইসলামের নির্দেশ। ইসলাম পিতা-মাতাকে নিষ্পাপ বলে ঘোষণা করেনি। বয়সের ভার, একাকীত্ব কিংবা মানসিক বিচ্যুতির কারণে অনেক সময় পিতা-মাতা আর্থিক লোভ বা অনিয়মে জড়িয়ে পড়তে পারেন। মায়ের মর্যাদা ও মানবিক সীমাবদ্ধতা ইসলামে মায়ের স্থান সবার ঊর্ধ্বে। এক ব্যক্তি নবীজিকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আমার উত্তম সাহচর্য পাওয়...

মন্দ ধারণার সুযোগ না দেওয়া: নবীজির জীবন থেকে একটি শিক্ষা

  মানব মনস্তত্ত্বের এক অদ্ভুত প্রবণতা হলো অনুমাননির্ভরতা। অনেক সময় বাস্তব কোনো ভিত্তি বা স্পষ্ট প্রমাণ ছাড়াই মানুষের মনে এমন কিছু অলীক ধারণা জন্ম নেয়, যা ধীরে ধীরে ব্যক্তির চিন্তাকে বিষাক্ত করে তোলে। এই অমূলক ধারণা যখন কথায় কিংবা আচরণে প্রকাশ পায়, তখন পারিবারিক বন্ধন থেকে শুরু করে বৃহত্তর সামাজিক সৌহার্দ্য পর্যন্ত ভেঙে পড়ে। ইসলাম তাই শুধু মানুষকে মন্দ ধারণা থেকে বেঁচে থাকার নির্দেশ দিয়েই ক্ষান্ত হয়নি; বরং এমন সব পরিস্থিতি ও আচরণ সচেতনভাবে এড়িয়ে চলার শিক্ষা দিয়েছে, যা অন্যের মনে সামান্যতম সন্দেহের বীজ বপন করতে পারে। ইসলাম তাই শুধু মানুষকে মন্দ ধারণা থেকে বেঁচে থাকার নির্দেশ দিয়েই ক্ষান্ত হয়নি; বরং এমন সব পরিস্থিতি ও আচরণ সচেতনভাবে এড়িয়ে চলার শিক্ষা দিয়েছে, যা অন্যের মনে সামান্যতম সন্দেহের বীজ বপন করতে পারে। অর্থাৎ নিজের দিক থেকে শতভাগ নিষ্পাপ থাকার পাশাপাশি অন্যের চোখেও যেন নিজের কর্ম বা অবস্থান নিয়ে কোনো বিভ্রান্তি না জন্মে—সেই সামাজিক দূরদর্শিতা নিশ্চিত করাই হলো নবীজির জীবনাদর্শ। সব ধারণাই নিষিদ্ধ নয়; কিন্তু প্রমাণহীন নেতিবাচক ধারণা মানুষকে অন্যায়ের দিকে ধাবিত করে। তাই মুমিনের দায়...

নবীজি যেভাবে হাসতেন

  আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘আর তিনিই হাসান এবং তিনিই কাঁদান; আর তিনিই মৃত্যু দান করেন এবং তিনিই জীবন দেন।’ (সুরা নাজম, আয়াত: ৪৩-৪৪) নবীজির পবিত্র জীবনেও ছিল আনন্দ-বেদনা, হাসি ও কান্নার মানবিক অনুভূতি; তবে তাঁর সেই হাসি ছিল সংযম, গাম্ভীর্য ও মার্জিত রূপের এক অনুপম বহিঃপ্রকাশ। তিনি বলেছেন, ‘তোমার ভাইয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে তোমার মুচকি হাসি দেওয়াও একটি সদকা।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ১৯৫৬) ইসলামে হাসির তিন স্তর ইসলামি আইনশাস্ত্র ও ভাষার বিশ্লেষণে মানুষের হাসিকে প্রধানত তিনটি স্তরে ভাগ করা হয়েছে: ১. মুচকি হাসি: এটি হাসির সর্বোত্তম স্তর। এতে কোনো শব্দ বা আওয়াজ হয় না; কেবল মুখমণ্ডলে মৃদু প্রসন্নতা ও ঠোঁটের কোণে হাসির রেখা ফুটে ওঠে। নবীজির অধিকাংশ হাসিই ছিল তাবাসসুম বা মুচকি হাসি। এটি উম্মতের জন্য অন্যতম প্রিয় সুন্নাত। ‘আমি নবীজি কখনো এমনভাবে মুখ খুলে অট্টহাসি দিতে দেখিনি, যাতে তাঁর আলজিভ দেখা যায়; বরং তিনি সর্বদা মৃদু মুচকি হাসতেন। আয়েশা (রা.), সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬০৯২ ২. সাধারণ হাসি: এ ধরনের হাসিতে মানুষের মুখ কিছুটা প্রসারিত হয় এবং দাঁত বা মাড়ির দাঁত প্রকাশিত হতে পারে, কিন্তু দূর থেকে শোনা যা...

মুসলিম পরিবার গঠনে নারী যেভাবে ভূমিকা রাখে

  একটি সুস্থ, সুশৃঙ্খল ও নৈতিক সমাজব্যবস্থার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয় পরিবারের অভ্যন্তরে। আর সেই পরিবারের আত্মিক কেন্দ্রবিন্দু হলো নারী। ইসলামে নারীর মর্যাদা ও অধিকারকে এতটাই গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে যে পবিত্র কোরআনে একটি স্বতন্ত্র সুরার নামকরণ করা হয়েছে ‘সুরা নিসা’ (নারী)। মানবজাতির সৃষ্টি পরম্পরা ও দাম্পত্য সম্পর্কের গভীর তাৎপর্য তুলে ধরে আল্লাহ–তাআলা পৃথিবীর বুকে নর–নারীর সৃষ্টিকে তাঁর কুদরতের অন্যতম বড় নিদর্শন হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘আর তাঁর নিদর্শনাবলির মধ্যে অন্যতম হলো—তিনি তোমাদের মধ্য থেকেই তোমাদের সঙ্গিনীদের সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে প্রশান্তি লাভ করতে পারো এবং তিনি তোমাদের মধ্যে পারস্পরিক ভালোবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন। নিশ্চয়ই এতে চিন্তাশীল সম্প্রদায়ের জন্য বহু নিদর্শন রয়েছে।’ (সুরা রুম, আয়াত: ২১) দাম্পত্যের মূল ভিত্তি প্রশান্তি, ভালোবাসা ও সহানুভূতি স্বামী–স্ত্রীর পারস্পরিক আস্থা, গভীর মমত্ব ও সহযোগিতার ভিত্তিতেই একটি আদর্শ পরিবার গড়ে ওঠে। দাম্পত্য সম্পর্কের মূল উদ্দেশ্য শুধু শারীরিক সাহচর্য নয়; বরং তা হলো আত্মিক ও মানসিক আশ্রয়। পবিত্র কোরআ...

কোরআন যেভাবে অবিশ্বাসীদের কথা বলে

  কোরআন যখন কোনো উপমা দেয়, তখন একটি পরিচিত দৃশ্যের আড়ালে মানুষের জন্য গভীর কোনো সত্যকে তুলে ধরে। কখনো একটি বৃক্ষের মাধ্যমে ভালো ও মন্দ কথার পরিণতি বোঝায়, কখনো পিঁপড়ার আচরণ দিয়ে সামাজিক দায়িত্বের শিক্ষা দেয়। আবার মরীচিকা ও সমুদ্রের অন্ধকারের দৃশ্যের মাধ্যমে মানুষের আমল ও কুফরের ভয়াবহ পরিণতি চোখের সামনে তুলে ধরে। ইতিপূর্বে আমরা প্রাণপ্রকৃতির বেশ কিছু চমৎকার উপমা দেখেছি। এখানে আরও কয়েকটি উপমা উপস্থাপন করা হলো। ৮. বৃক্ষ দিয়ে ভালো ও মন্দ বাক্যের উপমা আল্লাহ-তাআলা বলেন, ‘আপনি কি লক্ষ্য করেন না আল্লাহ কীভাবে উপমা দিয়ে থাকেন? সৎবাক্যের তুলনা উৎকৃষ্ট গাছ, যার মূল সুদৃঢ় ও যার শাখা-প্রশাখা ওপরে বিস্তৃত, যা সব সময় তার রবের অনুমতিক্রমে তার ফলদান করে। আর আল্লাহ মানুষের জন্য উপমাসমূহ পেশ করে থাকেন, যাতে তারা শিক্ষা গ্রহণ করে। আর মন্দ বাক্যের তুলনা এক মন্দ গাছ, যার মূল ভূপৃষ্ঠ হতে বিচ্ছিন্নকৃত, যার কোনো স্থায়িত্ব নেই।’ (সুরা ইব্রাহিম, আয়াত ২৪-২৬) ৯. পিঁপড়ার দলবদ্ধতা দিয়ে উপমা ‘যখন তারা পিপীলিকা–অধ্যুষিত উপত্যকায় পৌঁছাল, তখন এক পিপীলিকা বলল, হে পিপীলিকাদল! তোমরা তোমাদের বাসায় প্রবেশ করো, নয়তো সু...

অন্তরের রোগে আক্রান্ত হওয়ার ১০ কারণ

  মানুষের সামগ্রিক অস্তিত্ব ও ব্যক্তিত্বের প্রকৃত সৌন্দর্য তার অন্তরের নির্মলতায় নিহিত। বাহ্যিক অবয়ব ও চালচলন আপাতদৃষ্টে যতই সুসংযত হোক না কেন, ভেতরের হৃদয় যদি ব্যাধিগ্রস্ত ও কলুষিত থাকে—তবে সেই বাহ্যিক সৌন্দর্য নিছক একটি খোলসমাত্র। ইসলামি জীবনদর্শনে মানুষের চিন্তা, বিশ্বাস, সংকল্প ও আচরণের কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণকক্ষ হলো এই অন্তর। রাসুল (সা.) মানবদেহে অন্তরের গুরুত্ব তুলে ধরে  দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করেছেন, ‘জেনে রেখো, শরীরের ভেতর একটি মাংসপিণ্ড রয়েছে; যদি তা সুস্থ ও পরিশুদ্ধ থাকে, তবে পুরো শরীরই সুস্থ থাকে। আর যদি তা বিকৃত ও ব্যাধিগ্রস্ত হয়ে পড়ে, তবে সমগ্র দেহই বিনষ্ট হয়ে যায়। আর জেনে রেখো, সেটিই হলো অন্তর।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫২) পবিত্র কোরআনেও মানবজীবনের পরম সাফল্যের মানদণ্ড নির্ধারণ করা হয়েছে আত্মশুদ্ধির ওপর, ‘নিশ্চয়ই সে ব্যক্তি সফলকাম হয়েছে, যে নিজেকে (অন্তরকে) পরিশুদ্ধ করেছে; আর সে ব্যর্থ হয়েছে, যে তা কলুষিত করেছে।’ (সুরা শামস, আয়াত: ৯-১০) মানুষের অন্তর কখনো হঠাৎ করে এক দিনে অনুভূতিহীন হয়ে পড়ে না; বরং ধারাবাহিক অবহেলা, পাপের পুনরাবৃত্তি ও কুপ্রবৃত্তির অনুসরণের মাধ্যমে তা...

বাসরের মোহ ত্যাগ করে ধর্মের পথে

  পার্থিব জীবনের পরম সুখ, পারিবারিক মোহ এবং নববিবাহিত জীবনের সব আকর্ষণ একনিমেষে তুচ্ছ করে আল্লাহর সন্তুষ্টিকে কীভাবে অগ্রাধিকার দিতে হয়—তার এক হৃদয়স্পর্শী উপাখ্যান রচিত হয়েছিল ওহুদ ময়দানে। এই কালজয়ী ইতিহাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র যুবক সাহাবি হজরত হানজালা ইবনে আবি আমির (রা.)। পিতা ও পুত্রের বিপরীত পথ ওহুদ যুদ্ধের সময় হানজালা (রা.) ছিলেন মাত্র ২৪ বছরের এক তেজোদৃপ্ত নওজোয়ান। ইসলামের আলো গ্রহণ করেছিলেন মাত্র দুই বছর আগে। তবে তাঁর পারিবারিক পটভূমি ছিল বেশ জটিল। তাঁর পিতা আবু আমির ছিল সেকালে মদিনার একজন প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব ও ধর্মপণ্ডিত। পূর্ববর্তী আসমানি কিতাবের উদ্ধৃতি দিয়ে সে সর্বদা আখেরি জামানার নবীর আগমনবার্তা প্রচার করত এবং জনগণকে তাঁর আনুগত্যের নসিহত করত। নববিবাহিত জীবনের সব আকর্ষণ একনিমেষে তুচ্ছ করে আল্লাহর সন্তুষ্টিকে কীভাবে অগ্রাধিকার দিতে হয়—তার এক হৃদয়স্পর্শী উপাখ্যান রচিত হয়েছিল ওহুদ ময়দানে। কিন্তু যখন সত্য সত্যিই মহানবী (সা.) মদিনায় এলেন, তখন আত্মগরিমা ও নেতৃত্বের মোহে আবু আমির সত্য মেনে নিতে অস্বীকার করল। নিজের পুত্র হানজালা ইসলাম গ্রহণ করে ধন্য হলেও পিতা ইমান আনলেন না। মহানবী...