পোস্টগুলি

সফলতার মোহে শরীরের হক নষ্ট করছেন না তো

  বর্তমান করপোরেট দুনিয়ায় তরুণ প্রজন্মের মধ্যে অবিরাম খাটুনির এক নতুন জোয়ার এসেছে, যাকে বলে ‘হ্যাসেল কালচার’। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ২৪ ঘণ্টা কাজ করা, রাতে না ঘুমিয়ে প্রজেক্ট শেষ করা কিংবা ছুটির দিনেও নিজেকে ব্যস্ত রাখাকে একটি বীরোচিত ও ‘গ্ল্যামারাস লাইফস্টাইল’ হিসেবে প্রচার করা হচ্ছে। তথাকথিত উৎপাদনশীলতা ‘প্রোডাক্টিভিটি’ বাড়ানোর এই অন্ধ ইঁদুরদৌড়ে তরুণেরা যে জিনিসটি সবচেয়ে আগে কোরবানি দিচ্ছে, তা হলো তাদের রাতের ঘুম। রাত জেগে কাজ করাকে স্মার্টনেসের প্রতীক মনে করা হয়, অথচ এটি তার শরীর ও মনকে পঙ্গু করে দিচ্ছে। পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থার তৈরি করা এই দেহসর্বস্ব ও বস্তুগত সফলতার মোহের বিপরীতে ইসলামি জীবনদর্শন মানুষের শারীরিক সুস্থতা, রাতের ঘুম এবং জীবনের ভারসাম্যের ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্বারোপ করেছে। আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) আধ্যাত্মিক উন্নতির লোভে সারা রাত জেগে ইবাদত করতেন এবং প্রতিদিন রোজা রাখতেন। নবীজি তাঁকে ডেকে কঠোরভাবে নিষেধ করেন। রাত বিশ্রামের জন্য ইসলাম মানুষকে প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে জীবনযাপন করতে শেখায়। দিন ও রাতের যে প্রাকৃতিক চক্র, তার সঙ্গে মানুষের শরীরের এক ...

প্রাচুর্যের প্রতিযোগিতা যেভাবে আমাদের আল্লাহকে ভুলিয়ে রেখেছে

  মানুষের জীবনে প্রতিযোগিতা নতুন কোনো বিষয় নয়। সভ্যতার শুরু থেকেই মানুষ অন্যের চেয়ে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছে। কেউ সম্পদে, কেউ ক্ষমতায়, কেউ জ্ঞানে, আবার কেউ সামাজিক মর্যাদায় নিজেকে শ্রেষ্ঠ প্রমাণ করতে চেয়েছে। এই প্রবণতা মানুষের স্বভাবের অংশ। কিন্তু সমস্যা তখনই সৃষ্টি হয়, যখন প্রতিযোগিতার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে দুনিয়া, আর জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্য আড়ালে পড়ে যায়। প্রযুক্তির এই যুগে প্রতিযোগিতার রূপ পাল্টেছে। একসময় মানুষ নিজের বাড়ি, গাড়ি কিংবা পোশাক নিয়ে গর্ব করত। আজ মানুষ গর্ব করে তার ফলোয়ার সংখ্যা, লাইক, কমেন্ট, শেয়ার ও অনলাইন জনপ্রিয়তা নিয়ে। সমাজের চোখে সফলতার সংজ্ঞাও যেন বদলে গেছে। এখন অনেক ক্ষেত্রে একজন মানুষ কতটা জ্ঞানী, কতটা সৎ বা কতটা উপকারী—তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে সে কতটা পরিচিত এবং কতজন মানুষ তাকে অনুসরণ করছে। মক্কার অবিশ্বাসী কাফের ও মদিনার ইহুদিরা তৎকালীন সময়ে ব্যবসা-বাণিজ্যে বেশ সফল ছিল। তারা দামি পোশাক, উন্নত খাবার এবং বিলাসবহুল জীবনযাপন করত। এমনকি অনেক সময় আমরা একটি ঘটনার ভেতরে উপস্থিত থেকেও প্রকৃতপক্ষে সেখানে উপস্থিত থাকি না। কারণ, আমাদের মন পড়ে থাকে—কীভাব...

বিয়েতে বিলম্ব হলে কী আমল করবেন

  একটা সময় আমাদের সমাজে নির্দিষ্ট বয়সে পৌঁছালেই বিয়ে হয়ে যাওয়া ছিল স্বাভাবিক ঘটনা। কিন্তু বদলে যাওয়া সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতায় বিয়ের গড় বয়স আজ অনেকটাই পিছিয়ে গেছে। উচ্চশিক্ষা, ক্যারিয়ার গড়া, আকাশছোঁয়া মূল্যস্ফীতির বাজারে অর্থনৈতিক ভিত্তি তৈরি করা, এসব মিলিয়ে বিয়ের পিঁড়িতে বসতে বসতে জীবনের অনেকটাই সময় পার হয়ে যায়। এই বিলম্ব আজ আর নিছক ব্যক্তিগত বিষয় থাকে না। উপযুক্ত প্রস্তাব না আসা বা নানা কারণে বিয়ে ভেঙে যাওয়ায় বহু তরুণ-তরুণী মানসিক চাপে ভোগেন, তাঁদের অভিভাবকরাও সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে উৎকণ্ঠায় দিন কাটান। এই চাপ থেকে মুক্তি পেতে মানুষ আধ্যাত্মিক আমল ও দোয়ার আশ্রয় খোঁজেন। কিন্তু কোনটা সুন্নাহসম্মত আর কোনটা কেবলই লৌকিক প্রথা, তা চিনে নেওয়া জরুরি। বিলম্বের পেছনে এমন কল্যাণ লুকিয়ে থাকতে পারে, যা মানুষের সীমিত বুদ্ধি দিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে বোঝা সম্ভব নয়। তাই বাহ্যিক চেষ্টা জারি রেখেই আল্লাহর সময়ের ওপর ভরসা রাখতে হবে। বিলম্বকে ব্যর্থতা না ভাবা বিয়ের প্রস্তাব আসতে দেরি হওয়া বা মনের মতো জীবনসঙ্গী না পাওয়াকে সমাজ প্রায়ই ব্যর্থতা হিসেবে দেখে। কিন্তু একজন মু...

দুর্যোগে মানুষের পাশে দাঁড়ানো বড় ইবাদত

  শরীরের একটা আঙুলে কাঁটা ফুটলে সারা শরীর টের পায়—ঘুম নষ্ট হয়, জ্বর আসে, মনোযোগ সরে যায় সেই একটা বিন্দুতে। নবীজি (সা.) মুমিনদের পারস্পরিক সম্পর্ককে ঠিক এই উপমা দিয়েই বুঝিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘মুমিনদের পারস্পরিক ভালোবাসা, দয়া ও সহানুভূতির উদাহরণ একটা দেহের মতো। দেহের কোনো একটা অঙ্গ আক্রান্ত হলে সমস্ত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ অনিদ্রা ও জ্বরে আক্রান্ত হয়ে তার সঙ্গে সাড়া দেয়।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬০১১) এই একটা উপমাই আসলে ইসলামে দুর্যোগের মুহূর্তের নীতিশাস্ত্রের ভিত্তি। বন্যা, ভূমিকম্প, দুর্ভিক্ষ, মহামারি—যুগে যুগে যে নামেই বিপর্যয় আসুক, প্রশ্নটা সব সময় একই থাকে: শরীরের বাকি অংশ কি সাড়া দেবে, নাকি অসাড় থেকে যাবে? অন্যের সুখে সুখী হওয়া যত সহজ, দুঃখ ভাগ নেওয়া ঠিক তত কঠিন। আর এই কঠিন কাজটিই নবীজি মুমিনের সংজ্ঞার অংশ করে দিয়েছেন। একটি হাদিসের তিনটি স্তর হাদিসবিশারদগণ এই একটি হাদিসের মধ্যেই কাছাকাছি অর্থের তিনটি শব্দ খুঁজে পেয়েছেন: ‘তারাহুম’, ‘তাওয়াদ’ ও ‘তাআতুফ’। ‘তারাহুম’ হলো ইমানি ভ্রাতৃত্বের টানে সম্পূর্ণ নিঃস্বার্থভাবে একে অন্যের প্রতি দয়া-মায়ার আচরণ। ‘তাওয়াদ’ হলো এমন আচরণ, যা...

মহানবী (সা.) যেভাবে অজু করতেন

  ইসলামের অন্যতম একটি বিধান হলো অজু। নামাজের জন্য প্রতিদিন আমাদের অজু করতে হয়। অজুর বিধান কমবেশি সবারই জানা। তবে ইসলামে যেকোনো আমলের ক্ষেত্রে সুন্নাহসম্মত পদ্ধতিই অগ্রগণ্য। রাসুল (সা.) যে কাজ যেভাবে করেছেন, ঠিক সেভাবে করাই সুন্নত। এই লেখায় আমরা বিভিন্ন হাদিস থেকে সরাসরি রাসুলের অজুর পদ্ধতি দেখব। রাসুলের অজু ছিল অত্যন্ত নিখুঁত ও সুশৃঙ্খল। সবচেয়ে বড় কথা, তাঁর অজু ছিল সরাসরি মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে ফেরেশতা জিবরাইলের মাধ্যমে শেখানো। সাহাবিরা তাঁর অজু করার দৃশ্য যেভাবে প্রত্যক্ষ করেছেন, হাদিসের কিতাবগুলোতে তা বিস্তারিত বর্ণিত হয়েছে। এই পদ্ধতিগুলো অনুসরণের মাধ্যমেই অজু হতে পারে পূর্ণাঙ্গ ও সুন্নাহসম্মত। পানির পরিমাণ ও মিতব্যয়িতা রাসুল (সা.) সাধারণত প্রতিটি ফরজ নামাজের জন্যই নতুন করে অজু করতেন (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২১৪) তবে কখনো কখনো এক অজু দিয়ে একাধিক নামাজও আদায় করেছেন। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৭৭) অজুর জন্য তিনি সাধারণত এক ‘মুদ’ পরিমাণ পানি ব্যবহার করতেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২০১) সংখ্যাগরিষ্ঠ আলেমের মতে, মুদ হলো এমন একটি পাত্র, যাতে এক ও এক-তৃতীয়াংশ বাগদাদি ‘রতল’ পানি ধরে; আধুনিক ...

ডিপফেক: স্ক্রিনে দেখেই বিশ্বাস করার পাপ কি জানেন

  কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) হাত ধরে বর্তমানে সবচেয়ে বড় যে মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক সংকটটি তৈরি হয়েছে, তা হলো নিখুঁতভাবে মানুষের কণ্ঠ নকল করা (ভয়েস ক্লোনিং) এবং হুবহু মানুষের অবয়ব তৈরি করে ভুয়া ভিডিও বানানো, যাকে প্রযুক্তির ভাষায় বলা হচ্ছে ‘ডিপফেক’। এখন ইন্টারনেটে এমন সব ভিডিও বা অডিও ক্লিপ ছড়াচ্ছে, যা দেখে সাধারণভাবে বোঝার কোনো উপায় নেই যে এটি আসল, নাকি সম্পূর্ণ কৃত্রিম উপায়ে তৈরি করা মিথ্যা। বিনোদন, রাজনৈতিক ফায়দা কিংবা ব্যক্তিগত প্রতিশোধের হাতিয়ার হিসেবে এই ডিপফেক প্রযুক্তির মাধ্যমে মানুষের সম্মানহানি ও সামাজিক বিশৃঙ্খলা চরমে পৌঁছেছে। মানবসৃষ্ট মিথ্যার বিরুদ্ধে ইসলামের অবস্থান অত্যন্ত কঠোর ও দূরদর্শী। কোনো নেতার কণ্ঠ বা কোনো সাধারণ মানুষের ভিডিও ক্লিপ দেখেই তা সত্য বলে গ্রহণ করার সুযোগ নেই, যতক্ষণ না তার উৎস ও সত্যতা শতভাগ নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে। ইসলামে তথ্য যাচাইয়ের নীতি অনেকেই কোনো তথ্য বা ভিডিও ইন্টারনেটে আসামাত্রই মানুষ তা সত্য বলে ধরে নেয় এবং মুহূর্তের মধ্যে তা হাজার হাজার মানুষের কাছে শেয়ার করে দেয়। ইসলাম কোনো তথ্য অন্ধভাবে বিশ্বাস করতে এবং তা যাচাই না করে প্রচার করতে কঠোরভাবে...

সন্তানের কান্নাও যখন ‘কনটেন্ট’: ইসলাম যেভাবে দেখে

  ফেসবুকের ফিডে স্ক্রল করতে করতে এখন প্রায়ই চোখে পড়ে একটা নতুন ধরনের দৃশ্য— একটা অবুঝ শিশুর আধো বুলি, তার রাগ, তার কান্না, তার সবচেয়ে অসতর্ক মুহূর্তটাও ক্যামেরাবন্দী হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে ইন্টারনেটে। খোদ মা–বাবার হাতেই। একে বলা হচ্ছে ‘শেয়ারেন্টিং’, মানে সন্তানের ব্যক্তিগত জীবনের প্রদর্শন। ওপর থেকে দেখলে এটাকে মনে হতে পারে ভালোবাসার একটা প্রকাশ, স্মৃতি ধরে রাখার নিরীহ চেষ্টা। কিন্তু ভেতরে উঁকি দিলে দেখা যায় লাইক, ভিউ, ফলোয়ার আর স্পনসরশিপের বাণিজ্যিক টান, যেখানে শিশু আসলে হয়ে উঠেছে মা–বাবার কনটেন্ট বানানোর হাতিয়ার। ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে এই একটা প্রবণতার ভেতরেই লুকিয়ে আছে চার স্তরের সমস্যা, যা একের পর এক গভীর হতে থাকে। শৈশবে একটা শিশুর নিজের ভালো-মন্দ বা গোপনীয়তা বোঝার সামর্থ্য থাকে না। সেই সরলতার সুযোগ নিয়ে তার প্রতিটি মুহূর্তকে কোটি মানুষের সামনে উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। প্রথম স্তর: যে আমানত প্রথমেই নষ্ট হয় ইসলামে সন্তান কোনো ব্যক্তিগত সম্পদ নয়, বরং আল্লাহর পক্ষ থেকে মা–বাবার কাছে দেওয়া মূল্যবান আমানত। কোরআনে আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনগণ, তোমরা জেনেশুনে আল্লাহ ও তাঁর রাসু...