পোস্টগুলি

রমজান: দুর্বল বান্দার জন্য আল্লাহর রহমত

  প্রিয় রমজান আমাদের সামনে হাজির হয়েছে। রমজান শুধু একটি মাস নয়, এটি আল্লাহ–তাআলার পক্ষ থেকে বান্দার জন্য বিশেষ এক সুযোগ। কেউ এই মাসকে স্বাগত জানায় পরিপূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে, আবার কেউ আসে অসুস্থ শরীর, ক্লান্ত মন আর অপূর্ণ ইচ্ছা নিয়ে। কিন্তু রমজানের দরজা সবার জন্যই খোলা—সুস্থ ও অসুস্থ, শক্ত ও দুর্বল, প্রস্তুত ও অপ্রস্তুত সবার জন্য। এই লেখা তাঁদের জন্য, যাঁরা চাইছেন কিন্তু পারছেন না, চেষ্টা করছেন কিন্তু পিছিয়ে পড়ছেন। আবার তাঁদের জন্যও, যাঁরা পারছেন—তাঁরা যেন ভুলে না যান যে আল্লাহ–তাআলা বান্দার শুধু আমল নয়, বরং অন্তর দেখেন। ১. সবার প্রস্তুতি এক নয় আমরা জানি সবার প্রস্তুতি কখনো এক হয় না। কেউ অনেক আগেই পরিকল্পনা গুছিয়ে ফেলেছেন, কেউ আবার হয়তো অসুস্থতা, ব্যস্ততা বা সফরের কারণে পিছিয়ে আছেন। এতে অনেকের মনে আফসোস কাজ করে। কিন্তু আল্লাহ–তাআলা কাউকে তাঁর বাস্তবতার বাইরে দাঁড় করিয়ে বিচার করেন না। কোরআনে বলা হয়েছে, “আল্লাহ কাউকে তার সাধ্যের বাইরে দায়িত্ব দেন না।” (সুরা আল-বাকারা, আয়াত: ২৮৬) ২. আল্লাহ অন্তরের খবর জানেন আমরা যাঁর ইবাদত করতে চাই, তিনি আমাদের পরিস্থিতি বোঝেন। কে কতটা পারছে আর কে কতটা চ...

মঙ্গোলীয় ঝঞ্ঝা প্রতিরোধ ও ইসলামের ইতিহাসের বাঁকবদল

  ৯১ হিজরির পহেলা রমজানে আন্দালুস বিজয়ের যে প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছিল, তার প্রায় ৬০০ বছর পর ৭০২ হিজরির ২ রমজানে সিরিয়ার মাটিতে রচিত হয়েছিল আরেক মহাকাব্য। সেদিন মঙ্গোলীয় বাহিনী বা তাতারদের সেই প্রলয়ঙ্করী তুফানকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল মুসলিমরা, যারা ইতিপূর্বে অর্ধেক পৃথিবীকে তাদের ঘোড়ার খুরের নিচে পিষ্ট করেছিল। ‘শাকহাবের যুদ্ধ’ (Battle of Shaqhab) কেবল একটি সামরিক বিজয় ছিল না, বরং এটি ছিল মুসলিম সভ্যতার অস্তিত্ব রক্ষার এক চূড়ান্ত লড়াই। মঙ্গোলীয় আগ্রাসন সপ্তম হিজরি শতকে মুসলিম বিশ্ব এক ভয়াবহ সংকটের মুখোমুখি হয়। পূর্ব দিক থেকে আসা মঙ্গোলীয় ঝঞ্ঝা তাসের ঘরের মতো গুঁড়িয়ে দিয়েছিল আব্বাসীয় খেলাফত ও আইয়ুবীয় সালতানাতকে। যদিও ৬৫৮ হিজরির ২৫ রমজানে ঐতিহাসিক ‘আইন জালুত’ যুদ্ধে সুলতান সাইফউদ্দিন কুতুজের নেতৃত্বে মুসলিমরা বড় বিজয় অর্জন করেছিল, তবুও মঙ্গোলদের সিরিয়া ও মিশর দখলের লালসা কমেনি। (ইমাম জাহাবি,  সিয়ারু আলামিন নুবালা , ২৩/২০০, মুয়াসসাসাতুর রিসালাহ, বৈরুত, ১৯৮৫) সুলতান আল-নাসির মুহাম্মদ ইবনে কালাউনের শাসনামলে এই সংকট চূড়ান্ত রূপ নেয়। মঙ্গোল নেতা গাজান খান এক লাখেরও বেশি সেনার এক বিশাল বাহ...

রমজানের ফজিলত ও রোজার বিধিবিধান

  সিয়াম সাধনার মাস রমজান; তাকওয়ার মাস রমজান। সিয়াম হলো ‘সওম’–এর বহুবচন। এর অর্থ বিরত থাকা। ফারসি, উর্দু, হিন্দি ও বাংলায় সওম বা সিয়ামকে ‘রোজা’ বলা হয়।  আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘রমজান মাস, এতে মানুষের দিশারি এবং সৎ পথের সুস্পষ্ট নিদর্শন ও সত্যাসত্যের পার্থক্যকারীরূপে কোরআন অবতীর্ণ হয়েছে। তোমাদের মধ্যে যারা এই মাস পাবে, তারা যেন এই মাসে সিয়াম ব্রত পালন করে।’ (সুরা-২ বাকারা, আয়াত: ১৮৫)  হিজরি চান্দ্রবর্ষের নবম মাস রমজান। রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের মাস রমজান। এ মাসের প্রধান ইবাদত ‘সিয়াম’ বা রোজা পালন করা। আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমাদের জন্য সিয়ামের (রোজার) বিধান দেওয়া হলো, যেমন সিয়ামের বিধান তোমাদের পূর্ববর্তী উম্মতগণকে দেওয়া হয়েছিল; যাতে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারো।’ (সুরা-২ বাকারা, আয়াত: ১৮৩)  রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি ইমানের সঙ্গে সওয়াবের আশায় রমজান মাসে সিয়াম পালন করবে, তার অতীতের সব গুনাহ মাফ করে দেওয়া হবে।’ (বুখারি: ৩৭)  তারাবিহ নামাজ রমজানের বিশেষ উপহার। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি ইমানের সঙ্গে সওয়াবের নিয়তে রমজান মাসে রাত জেগে ইবাদত করবে...

আন্দালুস বিজয় ও মসজিদে নববিতে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা

  পবিত্র রমজান মাস মুসলিম উম্মাহর এটি ‘মহা বিজয়ের মাস’ হিসেবেও স্বীকৃত। নবুয়তের যুগে ঐতিহাসিক বদর যুদ্ধের মাধ্যমে এই মাসেই ইসলামের প্রথম বিজয় এসেছিল। রমজানেই মক্কা বিজয়ের মাধ্যমে চূর্ণ হয়েছিল আরবের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত পৌত্তলিকতা। খেলাফতের যুগে পারস্য বিজয়ের অন্যতম সোপান কাসিদিয়া যুদ্ধ কিংবা পরবর্তীতে তাতারদের দর্প চূর্ণকারী আইন জালুত যুদ্ধ—সবই ছিল রমজানের অমর উপাখ্যান। তবে এই সোনালি ইতিহাসের পাতায় ‘আন্দালুস’ বা স্পেন বিজয়ের গল্পটি সবচেয়ে বিয়োগান্তক। ৯১ হিজরির পহেলা রমজানে একটি ছোট এবং সতর্ক সামরিক অভিযানের মাধ্যমে যে পথচলা শুরু হয়েছিল, তা পরবর্তী ৮০০ বছর ইউরোপের বুকে মুসলিম সভ্যতার বাতিঘর হয়। মুসা ইবনে নুসাইরের দূরদর্শিতা আফ্রিকায় ইসলামি শাসন সুসংহত হওয়ার পর মুসলিম সেনাপতি মুসা ইবনে নুসাইরের দৃষ্টি পড়েছিল ভূমধ্যসাগরের ওপারের ভূখণ্ড আন্দালুসের দিকে। তৎকালীন আন্দালুস ছিল গথিক রাজা ‘লড্রিক’-এর (Loderick) শাসনাধীন। লড্রিকের জুলুম, মাত্রাতিরিক্ত কর এবং দাসত্বে সাধারণ মানুষ ছিল অতিষ্ঠ। ঠিক সেই সময়ে স্পেনের সেউটা (Ceuta) অঞ্চলের গভর্নর জুলিয়ান রাজা রড্রিকের ওপর ব্যক্তিগত প্রতিশোধ নেওয়ার ...

বরকতময় রমজান

  পবিত্র মাহে রমজানের বরকত নিয়ে কোরআন ও হাদিসে অসংখ্য বর্ণনা রয়েছে। মাহে রমজানের বরকত নিঃসন্দেহে অপার অসীম। পুরো মাস রমজানের রোজা রেখে আল্লাহর প্রিয় বান্দাগণ তাঁর আরও প্রিয় হয়ে ওঠেন। বরকতের নদী উপচে পরে মহান বান্দার ওপর। রোজাদার বান্দার জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে রয়েছে বিশেষ পুরস্কার।   হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে আছে, আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেন, যে ব্যক্তি ইমান অবস্থায় আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি ও সওয়াবের নিয়তে রমজানের রোজা রাখবে, তার অতীতের সকল পাপ মাফ করে দেওয়া হবে। (সহিহ বুখারি, হাদিস, ১৮০২) রমজানের পুরো মাসেই রয়েছে বরকতের বিভিন্ন দিক। হাদিসে এসেছে, রমজানের প্রথম দিনে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইবাদতকে নিরবচ্ছিন্ন রহমত দ্বারা আচ্ছাদিত করে নেন। অর্থাৎ রমজানের প্রতিটি ইবাদতের সঙ্গে আল্লাহর বিশেষ রহমত ও বরকত দান করেন। (সহিহ ইবনে খুজায়মা) পুরো মাস রমজানের রোজা রেখে আল্লাহর প্রিয় বান্দাগণ তাঁর আরও প্রিয় হয়ে ওঠেন। বরকতের নদী উপচে পরে মহান বান্দার ওপর। কোরআন অবতরণের মাস পবিত্র রমজান মাসেই মহাগ্রন্থ কোরআন অবতীর্ণ হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, রমজান মাস, এতে নাজিল হয়েছে কোরআন...

ইমাম আবু হানিফা: জীবন ও পাণ্ডিত্য

  ইমাম আবু হানিফা (র.)–কে অভিহিত করা হয় ‘ইমামুল আজম’ বা ‘মহান ইমাম’ নামে। তিনি ছিলেন ইসলামি আইনের সুশৃঙ্খল বিন্যাস এবং যৌক্তিক বিচার বিশ্লেষণ পদ্ধতির অন্যতম পথিকৃৎ। তাঁর প্রতিষ্ঠিত হানাফি মাজহাব আজ বিশ্বজুড়ে সবচেয়ে বেশি অনুসৃত। ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ, আফগানিস্তান, তুরস্ক, সিরিয়া, ইরাক ও মিশরে এই মাজহাবের অনুসারী সবচেয়ে বেশি। এই জনপ্রিয়তার পেছনে যেমন তাঁর অসাধারণ মেধা ও সুযোগ্য ছাত্রদের অবদান ছিল, তেমনি আব্বাসীয়, উসমানীয় ও মুঘল সাম্রাজ্যের মতো প্রভাবশালী মুসলিম রাজবংশগুলোর পৃষ্ঠপোষকতাও বড় ভূমিকা পালন করেছে। (মুহাম্মদ আকরাম নদভি,  আবু হানিফা: হিজ লাইফ, লিগ্যাল মেথড অ্যান্ড লিগেসি , পৃষ্ঠা: ১, কুবে পাবলিশিং, ২০১০) জন্ম ও পারিবারিক পরিচয় ইমাম আবু হানিফার প্রকৃত নাম নুমান ইবনে সাবিত। তিনি ৮০ হিজরিতে ইরাকের কুফা নগরীতে জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৫০ হিজরিতে মৃত্যুবরণ করেন। তিনি উমাইয়া খলিফা আবদুল মালিক ইবনে মারওয়ানের শাসনামলে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তাঁর ‘আবু হানিফা’ উপনামটি নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে নানা মত রয়েছে। কেউ মনে করেন তাঁর ‘হানিফা’ নামে এক কন্যা ছিল যে অল্প বয়সেই মারা যায়, আবার ক...

‘আমি তোমাদের জন্য আশঙ্কা করছি’

  পবিত্র কোরআনে নবীগণের দাওয়াতের যে চিত্র অঙ্কিত হয়েছে, তাতে একটি বিশেষ বাক্য বারবার প্রতিধ্বনিত হতে দেখা যায়, ‘ইন্নি আখাফু আলাইকুম’ অর্থাৎ ‘নিশ্চয়ই আমি তোমাদের জন্য (আজাবের) আশঙ্কা করছি’। এই বাক্যটি কেবল একটি সতর্কবার্তা নয়, বরং এটি ছিল তাঁদের হৃদয়ের গভীরে প্রোথিত মমতা, দরদ এবং উম্মতের প্রতি নিখাদ ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ। একজন ধর্ম প্রচারকের দাওয়াতের ভাষা কেমন হওয়া উচিত এবং মানুষের প্রতি তাঁর মমত্ববোধের গভীরতা কতটুকু হওয়া প্রয়োজন, এই বাক্যটি তার এক অনন্য মাইলফলক। কোরআনের দর্পণে নবীগণের আর্তি পবিত্র কোরআনে আটটি ভিন্ন ভিন্ন স্থানে নবীগণের এই আকুল আশঙ্কার কথা বর্ণিত হয়েছে। হজরত নুহ (আ.) মানবজাতির প্রথম রাসুল হজরত নুহ (আ.) তাঁর জাতিকে মূর্তিপূজা ছেড়ে এক আল্লাহর ইবাদতের আহ্বান জানিয়েছিলেন। দীর্ঘ ৯৫০ বছরের দাওয়াতি জীবনে তিনি অত্যন্ত কাতর কণ্ঠে বলেছিলেন, “আমি তোমাদের নিকট আমার পালনকর্তার বার্তা পৌঁছে দিচ্ছি এবং তোমাদের নসিহত করছি।” (সুরা আরাফ, আয়াত: ৬২) তিনি তাঁর জাতির অবাধ্যতা দেখে শঙ্কিত হয়ে বলেছিলেন, “নিশ্চয়ই আমি তোমাদের ওপর এক মহা দিবসের আজাবের আশঙ্কা করছি।” (সুরা আরাফ, আয়াত: ৫৯) অন্যত...