পোস্টগুলি

কন্যাসন্তান: ইসলাম যা বদলে দিয়েছে

 আরবের জাহেলি সমাজে কন্যাসন্তানের জন্ম ছিল লজ্জার বিষয়। কোরআন সেই মানসিকতার ছবি এঁকেছে তীক্ষ্ণভাবে—‘তাদের কাউকে যখন কন্যাসন্তানের সুসংবাদ দেওয়া হয়, তখন তার মুখ কালো হয়ে যায় এবং সে অসহ্য যন্ত্রণায় ভোগে।’ (সুরা নাহল, আয়াত: ৫৮) শুধু মানসিকতার বর্ণনা নয়, সেই সমাজে শিশুকন্যাকে জীবন্ত মাটিচাপা দেওয়ার প্রথাও ছিল। ইসলাম এই প্রথার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল সরাসরি আইনি ও নৈতিক অবস্থান নিয়ে। সেই ইতিহাস থেকে দেড় হাজার বছর পরেও পৃথিবীর নানা প্রান্তে কন্যাসন্তানকে বোঝা মনে করার মানসিকতা টিকে আছে। তাই প্রশ্নটা এখনো প্রাসঙ্গিক—ইসলাম কন্যাসন্তানের জন্য আসলে কী নিশ্চিত করেছিল? ১. জীবনের অধিকার সবচেয়ে মৌলিক প্রশ্ন থেকে শুরু করা যাক। কোরআন জাহেলি যুগের শিশুহত্যার প্রসঙ্গ তুলেছে কেয়ামতের বিচারের ভাষায়, ‘আর যখন জীবন্ত সমাহিত কন্যাকে জিজ্ঞাসা করা হবে, কী অপরাধে তাকে হত্যা করা হয়েছিল?’ (সুরা তাকভির, আয়াত: ৮-৯) ইমাম কুরতুবি তাঁর তাফসিরে লিখেছেন, এই আয়াতে প্রশ্নটা হত্যাকারীকে নয়, নিহতকে করা হয়েছে—যা অপরাধীর বিচারের চেয়েও তীব্র একটি বয়ান। (কুরতুবি, আল-জামি লি-আহকামিল কুরআন, ১০/০২, কায়রো) ২....

‘পিতা’ শব্দের ব্যবহার কোরআনে যেভাবে হয়েছে

  সন্তানের লালনপালনে নানা ত্যাগ ও কষ্ট-তিতিক্ষা থাকা সত্ত্বেও পিতৃত্ব আল্লাহর এক অনন্য অনুগ্রহ ও উপহার। তাই তো পবিত্র কোরআনে বর্ণিত নেককার বান্দাদের অন্যতম দোয়া হলো, ‘হে আমাদের পালনকর্তা, আমাদের স্ত্রীদের পক্ষ থেকে এবং আমাদের সন্তানের পক্ষ থেকে আমাদের জন্য চোখের শীতলতা দান করো।’ (সুরা ফুরকান, আয়াত: ৭৪) নিচে পবিত্র কোরআনের আলোকে পিতৃত্বের স্বরূপ, এর বৈশিষ্ট্য এবং একজন আদর্শ পিতার কোরআনি দৃষ্টান্ত তুলে ধরা হলো: পিতৃত্বের ধারণা ও ভাষাগত ব্যবহার ১. শাব্দিক অর্থ: ‘পিতা’ শব্দের আরবি প্রতিশব্দ হলো ‘আল-আব’। আরবি ভাষায় শব্দটির মূল উৎস মূলত দুটি অর্থে ব্যবহৃত হয় এক. কোনো কিছুর জন্য প্রস্তুত হওয়া বা সংকল্প করা, দুই. স্বদেশের প্রতি টান বা ব্যাকুলতা। লিসানুল আরব অভিধানে বলা হয়েছে, ‘উবুয়াহ’ বা পিতৃত্ব শব্দটি ‘আবা’ ধাতু থেকে আসতে পারে; যার অর্থ হলো কোনো কিছু গ্রহণে অস্বীকৃতি বা আত্মমর্যাদাবোধ। এই শাব্দিক বিশ্লেষণ থেকে বোঝা যায় ইসলামে বাবার ভূমিকার মধ্যে দুটি দিক রয়েছে; সন্তানকে সামাজিক ও আদর্শিক যত্নে গড়ে তোলার জন্য সদা প্রস্তুত থাকা ও সংকল্পবদ্ধ হওয়া। সন্তানকে সব ধরনের বিপদ-আপদ থেকে আগল...

ইসলামে বিনোদন: রূপরেখা ও নীতিমালা (১)

  মানুষ হিসেবে আমরা কোনো যান্ত্রিক সত্তা নই। আমাদের আবেগ, অনুভূতি, ইচ্ছা ও স্বাধীনতা আছে। আমরা যাচাই-বাছাই করতে পারি, সিদ্ধান্ত নিতে পারি। আমরা ক্লান্ত হই, কখনো-সখনো অবসাদেও ভুগি। আমরা সব সময় সিরিয়াস ও কর্মমুখর থাকতে পারি না। এতে আমাদের মানসিক উদ্দীপনা ও কাজের আগ্রহ কমে যায়। এ জন্যই মানুষ হিসেবে আমাদের দরকার মানসিক ও শারীরিক বিশ্রাম এবং বিনোদন; যাতে আমরা ক্লান্তি, বিষণ্নতা ও একঘেয়েমি ঝেড়ে ফেলে আবার ফিরতে পারি বাস্তব জীবনের নানা ব্যস্ততায়। এই ধারণার চমৎকার সমর্থন পাওয়া যায় একটি বিখ্যাত হাদিসে। রাসুল (সা.)-এর একজন লিপিকার ছিলেন হজরত হানজালা উসাইদি (রা.)। তিনি বর্ণনা করেন, ‘আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসুল, হানজালা তো মুনাফিক হয়ে গেছে। আল্লাহর রাসুল বললেন, ব্যাপার কী? আমি বললাম, আমরা যখন আপনার কাছে থাকি, আপনি আমাদের জান্নাত-জাহান্নামের কথা স্মরণ করিয়ে দেন; মনে হয় যেন আমরা তা চোখেই দেখতে পাচ্ছি। কিন্তু এরপর যখন আপনার কাছ থেকে বের হয়ে স্ত্রী, সন্তান-সন্ততি ও ধন-সম্পদের মাঝে যাই, তখন এর অনেক কিছু ভুলে যাই। আল্লাহর রাসুল বললেন, যে সত্তার হাতে আমার প্রাণ, আমি তাঁর শপথ করে বলছি—আমার কাছে থাকাকা...

কোরআনের আলোয় সন্তানের সঙ্গে বাবার সম্পর্ক

  কোরআন মাজিদ বিভিন্ন জায়গায় পিতৃত্বের প্রসঙ্গটি এনেছে এবং বিভিন্ন ধরনের বাবার উদাহরণ দিয়েছে। তার মধ্য থেকে আমরা কয়েকটি অনন্য বৈশিষ্ট্য খুঁজে পাই: ১. আদর্শের ভিন্নতা ও সততার মূলনীতি কোরআনে মূলত নেককার ও আদর্শবান বাবার চিত্রই বেশি ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। যেমন নুহ, ইব্রাহিম, ইয়াকুব ও লোকমান (আ.)। তবে এর বিপরীতে একজন অন্যায়কারী বা পথভ্রষ্ট বাবার উদাহরণও দেওয়া হয়েছে, তিনি হলেন ইব্রাহিম (আ.)-এর পিতা আজর। এর মাধ্যমে ইঙ্গিত করা হয়েছে যে পিতৃত্বের মূল ভিত্তিই হলো সততা ও কল্যাণ। ২. তরবিয়তে সক্রিয় অংশগ্রহণ কোরআনে বর্ণিত প্রতিটি বাবা সন্তানের তরবিয়ত গঠনে সরাসরি ভূমিকা রেখেছেন। নুহ (আ.)-এর নিজের অবাধ্য সন্তানকে প্লাবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বাঁচানোর আকুলতা; ইয়াকুব (আ.)-এর সন্তানদের প্রতিনিয়ত দেওয়া দিকনির্দেশনা এবং লোকমান হাকিমের তাঁর সন্তানকে দেওয়া তাওহিদ ও নৈতিকতার শিক্ষা এর বড় প্রমাণ।আমাদের সমাজে যে ধারণা প্রচলিত আছে—‘সন্তানের দেখভাল করা শুধু মায়ের কাজ আর বাবার কাজ শুধু টাকা আয় করা’—কোরআনের আলোকে এ ধারণার কোনো ভিত্তি নেই। ৩. পিতৃত্ব মানেই ত্যাগ ও সহনশীলতা কোরআনের পাতা ওলটালে দেখা যায়, পিতৃত্বের...

খলিফা ওমরের অর্থ ও বাজার ব্যবস্থাপনা

  দ্বিতীয় খলিফা হিসেব দায়িত্বগ্রহণের পর ওমর (রা.) যে দূরদর্শী নেতৃত্ব, আপসহীন প্রশাসনিক নীতি এবং জবাবদিহিমূলক শাসনব্যবস্থা গড়ে তোলেন, তা–ই এক কালজয়ী অর্থব্যবস্থার জন্ম দিয়েছিল। তাঁর অর্থব্যবস্থার চালিকা শক্তি ছিল খোদাভীতি। তিনি মনে করতেন, অন্তরে আল্লাহর ভয় না থাকলে উম্মাহর কাজে স্বচ্ছতা আসবে না এবং হাশরের ময়দানে পাকড়াও হওয়ার চিন্তা না থাকলে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব ঠিকমতো পালন করা সম্ভব নয়। (ড. আলি মুহাম্মাদ সাল্লাবি, আদ-দাওলাতুল ইসলামিয়া ফি আসরিল খুলাফায়ির রাশিদিন, পৃষ্ঠা: ১২১-১২২, মাকতাবাতুল ইমান, বৈরুত, ২০০২) একবার তিনি সাহাবি সালমান ফারসির কাছে জানতে চান, ‘আমি রাজা, না খলিফা?’ সালমান (রা.) উত্তরে বলেন, ‘আপনি রাষ্ট্র থেকে এক দিরহাম (রৌপ্যমুদ্রা) বা কমবেশি কর যা-ই আদায় করেন না কেন, তা যদি ঠিক খাতে খরচ না করেন, তবে আপনি খলিফা নন, রাজা।’ এ কথা শুনে তিনি কেঁদে ফেলেন। (ড. তহা হুসাইন, আশ-শাইখান আবু বাকার সিদ্দিক ওয়া উমার ইবনুল খাত্তাব, পৃষ্ঠা: ২৫৭, দারুল মাআরিফ, মিসর, ১৯৫৭) তাই ব্যক্তি জীবনে তিনি খুব সতর্ক থাকতেন এবং সাধারণ জীবনযাপন করতেন। আনাস ইবনে মালিক (রা.) বলেন, ‘আমি ওমরকে চৌদ্দ তাল...

হারিয়ে যাওয়া মাজহাবগুলোর কথা

  ইসলামি ফিকহে আমরা সাধারণত চার মাজহাবের কথাই জানি—হানাফি, মালিকি, শাফেয়ি, হাম্বলি। তবে একটা সময় ছিল, যখন আরও বেশ কয়েকটি মাজহাব ছিল, বড় বড় আলেম ছিলেন, যারা ইসলামের শাস্ত্রীয় পরিসরে প্রতিটি ক্ষেত্রেই নিজের ‘ইজতিহাদি’ অভিমত ব্যক্ত করেছিলেন। ইমাম জালালুদ্দিন সুয়ুতি লিখেছেন, হিজরি পঞ্চম শতকের আগপর্যন্ত অন্তত দশটি সুসংগঠিত মাজহাবের অস্তিত্ব ছিল—সাহাবি থেকে ‘তাবে–তাবেয়ি’ পর্যন্ত প্রায় প্রত্যেক বড় আলেমেরই নিজস্ব ফকিহি অবস্থান ছিল। (সুয়ুতি, আল-হাভি লিল-ফাতাওয়ি, কায়রো, পৃ. ৩১২) এর কারণ হলো, হিজরি দ্বিতীয় ও তৃতীয় শতকে ইসলামি আইনের শাস্ত্রীয় গবেষণা ও উদ্ভাবন, যাকে ‘ইজতিহাদ’ বলে, তা ছিল তখন অনেক বেশি প্রাণবন্ত ও বহুমাত্রিক। পরে সেগুলো একে একে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। কীভাবে হলো এই বিলুপ্তি? রাজনীতি, অবহেলা, আর কখনো কখনো সরাসরি নিপীড়ন—কারণগুলো বিচিত্র। কয়েকটি মাজহাবের গল্প বলা যাক। আব্বাসীয় খলিফা মনসুরের দেওয়া বিচারপতির পদ প্রত্যাখ্যান করেন সুফিয়ান সাওরি এবং সরকারি চাপ থেকে বাঁচতে জীবনের শেষ দিকে আত্মগোপনে কাটান। ইমাম আওজায়ির মাজহাব আবদুর রহমান ইবনে আমর আল-আওজায়ি (মৃ.১৫৭ হি.) উমাইয়া ...

অমুসলিম দেশে উচ্চশিক্ষা ও নাগরিকত্ব গ্রহণ: ইসলাম কী বলে

  বর্তমান সময়ে উচ্চশিক্ষা, জীবিকানির্বাহসহ নানা প্রয়োজনে অমুসলিম দেশে গমন এবং সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাসের প্রবণতা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান হিসেবে মানুষের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রের মতো এ বিষয়েও সুনির্দিষ্ট নীতিমালা ও দিকনির্দেশনা প্রদান করেছে। ছোট-বড় সব কাজে ইসলামের নির্দেশনা মেনে চলাই একজন খাঁটি মুমিনের বৈশিষ্ট্য। একজন মুসলমানের ইমান, আমল, নৈতিকতা ও ধর্মীয় পরিচয় পৃথিবীর সবকিছুর চেয়ে মূল্যবান। কোনো মুসলমান যদি পড়াশোনা, জীবিকা বা অন্য কোনো প্রয়োজনে সেখানে যেতে চান, তবে ইসলামি ফিকহ ও ফতোয়ার আলোকে নির্দিষ্ট কিছু শর্তসাপেক্ষে তা বৈধ বা জায়েজ। প্রয়োজন ও উদ্দেশ্যের ভিন্নতার কারণে এর বিধানেও ভিন্নতা আসে। ছোট-বড় সব কাজে ইসলামের নির্দেশনা মেনে চলাই একজন খাঁটি মুমিনের বৈশিষ্ট্য। একজন মুসলমানের ইমান, আমল, নৈতিকতা ও ধর্মীয় পরিচয় পৃথিবীর সবকিছুর চেয়ে মূল্যবান। শিক্ষার উদ্দেশ্যে গমন শিক্ষার ব্যাপারে ইসলাম সর্বদাই বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে থাকে। কোরআনের প্রথম আয়াত নাজিল হয়েছে পড়ার আদেশ দিয়ে। অমুসলিমদের কাছ থেকে উপকারী জ্ঞান গ্রহণ করার দৃষ্টান্ত হাদিসেও বর্ণিত হয়েছে। রাসুল (সা.) বদরের ...