পোস্টগুলি

মৃত্যুর চোখে মানুষের ৪ স্তর: ইমাম গাজালির কালজয়ী দর্শন

  ইমাম গাজালি মৃত্যুর মনস্তাত্ত্বিক গভীরতা এবং মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে মানুষের বিভিন্ন শ্রেণির যে সূক্ষ্ম চরিত্রচিত্রণ তুলে ধরেছেন, তা মানবচৈতন্যকে নাড়া দেওয়ার মতো এক অতুলনীয় আধ্যাত্মিক দর্পণ। ইসলামি দর্শনে মৃত্যু হলো নশ্বর জগত থেকে অবিনশ্বর চিরন্তন জীবনে উত্তরণের এক প্রবেশদ্বার। ইমাম গাজালি  মৃত্যুর বাস্তবতা ও মানুষের আত্মিক অবস্থানের স্তরগুলো সেভাবেই বিশ্লেষণ করেছেন। মৃত্যুর অনিবার্যতা মহাবিশ্বের কোনো সুরক্ষিত প্রাচীর, রাজপ্রাসাদ কিংবা আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান মানুষকে মৃত্যুর হাত থেকে নিষ্কৃতি দিতে পারে না। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ ঘোষণা করেছেন, ‘তোমরা যেখানেই থাকো না কেন, মৃত্যু তোমাদের স্পর্শ করবেই—এমনকি যদি তোমরা সুউচ্চ সুদৃঢ় দুর্গেও অবস্থান করো।’ (সুরা নিসা, আয়াত: ৭৮) মানুষ পার্থিব জীবনে যত আত্মরক্ষার দেয়ালই তুলুক না কেন, মৃত্যু থেকে পলায়নের কোনো সুযোগ নেই।তিনি বলেন, ‘বলুন, তোমরা যে মৃত্যু থেকে পলায়ন করছ, তা নিশ্চিতভাবেই তোমাদের মুখোমুখি হবে। অতঃপর তোমাদের উপস্থিত করা হবে অদৃশ্য ও দৃশ্যের পরিজ্ঞাতা আল্লাহর সমীপে; আর তিনি তোমাদের জানিয়ে দেবেন যা কিছু তোমরা করতে।’ (সুরা জুমুআ, আ...

নবীজির দৃষ্টিতে প্রকৃত বুদ্ধিমানের মানদণ্ড কী

  জাগতিক মাপকাঠিতে সাধারণত বিপুল বিত্তবৈভব, ক্ষমতা, কূটনৈতিক চাতুর্য কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক উচ্চ ডিগ্রির অধিকারীকে সফল ও প্রখর বুদ্ধিমান মনে করা হয়। যে ব্যক্তি পার্থিব স্বার্থ হাসিলে যত বেশি কৌশলী, সমাজ তাকে তত বেশি চতুর বা বাস্তববুদ্ধিসম্পন্ন বলে বাহবা দেয়। কিন্তু ইসলামি জীবনদর্শনে দূরদর্শিতা ও বুদ্ধিমত্তার সংজ্ঞা সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র। ইসলামে বুদ্ধি শুধু পার্থিব অর্জনের কোনো ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য হাতিয়ার নয়; বরং বুদ্ধি হলো সেই আধ্যাত্মিক ও নৈতিক বিবেক, যা মানুষকে ক্ষণস্থায়িত্বের মায়া কাটিয়ে চিরন্তন সত্য ও অনন্ত জীবনের প্রস্তুতিতে পরিচালিত করে। দীর্ঘ আশা ও আত্মপ্রবঞ্চনা মানুষের মনস্তাত্ত্বিক বিচ্যুতির অন্যতম প্রধান কারণ হলো ‘তুলুল আমাল’ বা অবাস্তব দীর্ঘ আশা পোষণ করা। মানুষ প্রতিনিয়ত ভাবে, ‘আমি তো এখনো যুবক, জীবন উপভোগের কত প্রহর সামনে পড়ে আছে; পরিণত বয়সে গিয়ে তওবা করব এবং সৎপথে ফিরে আসব।’ মানুষের আত্মিক ধ্বংসের মূল কারণ দুটি, একটি হলো প্রবৃত্তির দাসত্ব, অপরটি দীর্ঘ আশা; এই দীর্ঘ আশাই মানুষের অন্তর থেকে আখেরাতের ভাবনা মুছে দেয় এবং পার্থিব সম্পদে মোহগ্রস্ত করে রাখে। ইমাম গাজালি (রহ.) ইমাম গাজাল...

ক্যারিয়ার নির্বাচনে ইসলাম যেভাবে সাহায্য করে

  উচ্চমাধ্যমিকের গণ্ডি পেরিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশের সন্ধিক্ষণটি প্রতিটি শিক্ষার্থীর জীবনের অন্যতম সংবেদনশীল বাঁক। এই মোড়ে এসে তরুণ মনস্তত্ত্ব তীব্র অনিশ্চয়তা ও সিদ্ধান্তহীনতায় পতিত হয়। সমাজে অল্প কিছু শিক্ষার্থী হয়তো শুরু থেকেই নিজেদের লক্ষ্য সম্পর্কে নিশ্চিত থাকে; কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠের চিত্রটি বিপরীত। অভিভাবকদের আকাশচুম্বী প্রত্যাশা, সামাজিক মর্যাদার মোহ এবং নিজের সহজাত ভালোলাগার টানাপোড়েনে উচ্চশিক্ষার পাঠ্যবিষয় ও ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ার নির্বাচন কঠিন হয়ে পড়ে। ক্যারিয়ার ও বিষয় নির্বাচনের পাঁচটি মৌলিক দিক তুলে ধরা হলো। ১. ইস্তিখারার নামাজ সিদ্ধান্তহীনতার মুহূর্তে একজন মুমিনের প্রধান আত্মিক অবলম্বন হলো ‘সালাতুল ইস্তিখারা’ বা আল্লাহর কাছে কল্যাণ প্রার্থনার বিশেষ নামাজ। মহানবী (সা.) সাহাবিদের কোরআনের সুরা যেভাবে মুখস্থ করাতেন, ঠিক সেভাবেই জীবনের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ইস্তিখারা করার শিক্ষা দিতেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১১৬২) ইস্তিখারার ফলাফল প্রকাশ পায় অন্তরের গভীর প্রশান্তি, আত্মবিশ্বাস এবং বাস্তব পরিস্থিতির অনুকূল প্রবাহের মাধ্যমে। ইবনে হাজার আসকালানি উল্লেখ করেছেন, ইস্তিখারার সারকথা...

দৈনন্দিন কর্মব্যস্ততায় যেভাবে ইসলামকে প্রাধান্য দেবেন

  ইসলাম কোনো খণ্ডকালীন বা নিছক আনুষ্ঠানিক উপাসনাকেন্দ্রিক আচার নয়; বরং এটি সামগ্রিক জীবনের এক ভারসাম্যপূর্ণ দর্শন। মানবজীবনের স্বাভাবিক মনোদৈহিক ছন্দ ও আত্মিক প্রশান্তি অক্ষুণ্ণ রেখে কীভাবে একজন মানুষ কর্মক্ষম ও উৎপাদনশীল থাকতে পারে, ইসলামে রয়েছে তার সুস্পষ্ট রূপরেখা। আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক পর্যবেক্ষণ এবং কোরআন-সুন্নাহর শাশ্বত নির্দেশনার আলোকে পড়াশোনা ও কর্মজীবনে প্রেরণা পুনরুদ্ধার এবং একটি সুষম দিনলিপি গঠনের পাঁচটি মৌলিক দিক বিশ্লেষণ করা হলো। ১. নামাজকেন্দ্রিক সময় ব্যবস্থাপনা বস্তুবাদী সময় ব্যবস্থাপনায় ঘড়ির যান্ত্রিক কাঁটাকে প্রধান মানদণ্ড ধরা হলেও ইসলামি সময় ব্যবস্থাপনার কেন্দ্রবিন্দু হলো দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ। নামাজ কেবল একটি ধর্মীয় ফরজ বিধানই নয়, বরং এটি দিন ও রাতের বিভিন্ন প্রহরকে সুষমভাবে বিভক্ত করার এক স্বাভাবিক ছন্দ। আল্লাহর কাছে সর্বাধিক প্রিয় আমল তা-ই, যা নিয়মিত করা হয়, যদিও তা পরিমাণে অল্প হয়। সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৪৬৪ মহান আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই নির্দিষ্ট সময়ে নামাজ আদায় করা মুমিনদের ওপর ফরজ।’ (সুরা নিসা, আয়াত: ১০৩) যাঁরা পড়াশোনায় গভীর মনোযোগ চান কিংবা কর্মক্ষেত্রে শৃঙ্খল...

নবীজি (সা.) কীভাবে কম সময়ে এত বেশি কাজ করেছেন

  রাত ১২টা। চোখে ঘুম নেই। কম্পিউটার তখনো খোলা। অফিসের কাজ করেই যাচ্ছেন। কখন শেষ হবে, তা জানেন না। প্রচুর কাজ জমে আছে। ডেডলাইন মাথার ওপর। বাচ্চাটা কখন ঘুমিয়ে পড়েছে, খেয়ালই করেননি। স্ত্রীর সঙ্গে আজ সারা দিন ভালো করে দুটি কথাও হয়নি। অথচ কাজ তবু শেষ হচ্ছে না। সপ্তাহের পর সপ্তাহ এভাবেই যাচ্ছে। অফিস, মিটিং, টার্গেট। বাসায় ফিরে ক্লান্ত শরীর, খিটখিটে মেজাজ। পরিবারকে সময় দেওয়ার কথা ভাবলেই মনে হয়, সময় কোথায়? কর্মজীবন আর ব্যক্তিগত জীবনের মাঝে সমন্বয় করতে পারছেন না। সমাধান কী? কেউ কম সময় কাজ করেও ক্লান্ত হয়ে পড়েন, কারণ, কাজটি তিনি পছন্দ করছেন না। ফলে কাজটি তাঁর কাছে বোঝা বলে মনে হয়। সুতরাং প্রশ্ন হলো কাজটি আপনি মন থেকে করছেন কি না। বিজ্ঞান কী বলছে গবেষণায় দেখা গেছে, কাজ ও ব্যক্তিগত জীবনের মধ্যে সমন্বয় না থাকলে মানুষ দ্রুত ক্লান্ত হয়ে পড়ে ও মানসিক প্রশান্তি হারায়। যাঁরা কাজের সময় ও পরিবারের সময়ের মধ্যে একটি স্পষ্ট বিভাজন রাখতে পারেন, তাঁদের মানসিক সুস্থতা তুলনামূলক অনেক ভালো থাকে। (ক্রেইনার, জি ই, ২০০৬, জার্নাল অব অর্গানাইজেশনাল বিহেভিয়ার, ২৭/৪, জন উইলি অ্যান্ড সন্স) সাম্প্...

দোয়া কি শুধু আরবিতেই করতে হবে

  বহু সাধারণ মুসলিমের মনে প্রায়শই দ্বিধাদ্বন্দ্ব দেখা দেয় যে আল্লাহর কাছে নিভৃতে ফরিয়াদ করার জন্য কি আরবি জানা বাধ্যতামূলক? যে ব্যক্তি আরবি ভাষার অর্থ বোঝে না, সে যদি মুখস্থ কিছু আরবি শব্দ উচ্চারণ করে, তবে কি তার অন্তরের আসল আকুতি প্রকাশ পায়? মাতৃভাষায় নিজের ব্যথা, অশ্রু ও অনুভূতি প্রকাশ করে আল্লাহর কাছে চাইলে কি সেই দোয়া কবুল হবে? আবার নামাজের ভেতর রুকু, সিজদা বা শেষ বৈঠকে মাতৃভাষায় দোয়া করার ফিকহি সীমারেখাই–বা কী? মানুষের ভাষার বৈচিত্র্য স্বয়ং আল্লাহর অন্যতম বড় কুদরতি নিদর্শন। তিনি ঘোষণা করেন, “আর তাঁর নিদর্শনাবলির মধ্যে অন্যতম হলো আকাশমণ্ডল ও পৃথিবীর সৃষ্টি এবং তোমাদের ভাষা ও বর্ণের বৈচিত্র্য; নিশ্চয়ই এতে জ্ঞানীদের জন্য নিদর্শন রয়েছে।” (সুরা রুম, আয়াত: ২২) নামাজ ও সাধারণ দোয়ার পার্থক্য এই মাসআলাটি সঠিকভাবে বোঝার মূল চাবিকাঠি হলো ‘নামাজ’ এবং ‘সাধারণ দোয়া’র পার্থক্য স্পষ্ট করা। নামাজ হলো একটি সুনির্দিষ্ট ইবাদত। মহানবী (সা.) নির্দেশ দিয়েছেন, ‘তোমরা সেভাবে নামাজ আদায় করো, যেভাবে আমাকে আদায় করতে দেখেছ।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৩১) নামাজের কিরাত, রুকু, সিজদা ও তাশাহুদে পঠিত শব্দাবলি আসম...

আরবি না জেনেও কোরআনের সঙ্গ পাওয়ার ৭ উপায়

  আল্লাহ কোরআনকে আরবি ভাষায় নাজিল করেছেন। আবার যেকোনো ভাষায় তা বোঝা সহজ করেছেন। এই লেখায় আমরা এমন সাতটি উপায় নিয়ে আলোচনা করব, যার মাধ্যমে আরবি না পড়তে বা না বুঝতে পারলেও কোরআনের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করা যায়। ১. উপযুক্ত অনুবাদ নির্বাচন করুন আপনার মাতৃভাষায় কোরআনের চমৎকার অনুবাদগুলো খুঁজে বের করুন। বিভিন্ন অনুবাদ পড়ে দেখুন কোনটি আপনার কাছে সহজবোধ্য ও হৃদয়গ্রাহী। শব্দ-শব্দ অনুবাদ ব্যবহার করলে কোরআনে বারবার ব্যবহৃত শব্দগুলোর অর্থ মনে রাখা সহজ হবে। একাধিক অনুবাদের তুলনামূলক পাঠ আয়াতের গভীর অর্থ উন্মোচনে সহায়ক। আজকাল ইন্টারনেটে বিভিন্ন ওয়েবসাইটে বিভিন্ন ভাষার অনুবাদ পাশাপাশি দেখার সুবিধা রয়েছে। ২. কোরআন তিলাওয়াত শুনুন আয়াতের অর্থ না বুঝলেও কোরআনের তিলাওয়াত মনোযোগ দিয়ে শোনা আধ্যাত্মিক উপকার বয়ে আনে। কোরআনের তিলাওয়াতের কয়েকটি ফজিলত হলো: শিফা ও রহমত: ‘আমি কোরআন থেকে এমন কিছু নাজিল করি, যা মুমিনদের জন্য শিফা ও রহমত...।’ (সুরা আল-ইসরা, আয়াত: ৮২) উপদেশ: ‘যার হৃদয় আছে বা যে মনোযোগ দিয়ে শোনে, তার জন্য এতে রয়েছে উপদেশ।’ (সুরা ক্বাফ, আয়াত: ৩৭) রহমত লাভ: ‘যখন কোরআন পড়া হয়, ত...