পোস্টগুলি

বুবুর লাম্বুক’ আর বর্ণিল রমজান বাজারের দেশে

  মালয়েশিয়ার রমজান এক অনন্য আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতার নাম। এখানকার ইফতারের আয়োজন থেকে শুরু করে তারাবির আমেজ—সবকিছুতেই রয়েছে মালয় সংস্কৃতির নিজস্ব ছাপ। বিশেষ করে আধুনিক মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরের আকাশচুম্বী ভবনের নিচে যখন ঐতিহ্যবাহী ‘রমজান বাজার’ বসে, তখন এক অন্যরকম দৃশ্য তৈরি হয়। ভালোবাসার এক বাটি খিচুড়ি মালয়েশিয়ার রমজানের সমার্থক নাম হলো ‘বুবুর লাম্বুক’। এটি মূলত চাল, গরুর মাংস (বা চিংড়ি), নারকেলের দুধ এবং প্রচুর মশলা দিয়ে তৈরি এক ধরণের ঘন খিচুড়ি বা স্যুপ। কুয়ালালামপুরের বিখ্যাত কাম্পুং বারু মসজিদে প্রতিদিন বড় বড় ডেকচিতে এই খিচুড়ি রান্না করা হয়। আসরের পর থেকে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে হাজার হাজার মানুষ এই খাবার সংগ্রহ করেন। এটি সম্পূর্ণ বিনামূল্যে বিতরণ করা হয়।  অনেকে বাড়িতেও এটি তৈরি করে প্রতিবেশী ও পথচারীদের মধ্যে বিলিয়ে দেন। রমজান বাজার আসরের নামাজের পর মালয়েশিয়ার রাজপথগুলোতে বসে শত শত ‘বাজার রামাদান’ (Pasar Ramadan)। এখানে পাওয়া যায় ঐতিহ্যবাহী লেমাং—যা বাঁশের নলের ভেতর কলাপাতায় মোড়ানো চাল ও নারকেলের দুধ দিয়ে রান্না করা হয়। এছাড়া আছে মুর্তাবাক এবং বিখ্যাত মিষ্টি পুতু পিরিং।...

বরকত ও বৈচিত্র্যে সুবাসিত শামের রমজান

  সিরীয়দের কাছে রমজান হলো বরকতের মাস। দামেস্কের সরু গলি থেকে শুরু করে উত্তর সিরিয়ার প্রান্তিক জনপদ—সবখানেই এই মাসের আলাদা এক সুবাস পাওয়া যায়। ইসলামের ইতিহাসে এই ভূখণ্ড ‘শাম’ নামে পরিচিত। যদিও সময় এখন প্রতিকূল, তবুও সিরীয় সংস্কৃতিতে রমজানের জৌলুস আজও টিকে আছে তাদের দস্তরখানে, আতিথেয়তায় এবং প্রতিবেশীর সঙ্গে খাবার ভাগ করে নেওয়ার চিরায়ত অভ্যাসে। পাতে পাতে বৈচিত্র্য  সিরিয়ার ইফতারের টেবিলকে বলা হয় ‘সুফরা’। একটি আদর্শ সিরীয় ইফতারে খাবারের বৈচিত্র্য চোখ ধাঁধিয়ে দেওয়ার মতো। ইফতার শুরু হয় মূলত খেজুর এবং এক বাটি ‘শোরবা’ বা স্যুপ দিয়ে। এরপর আসে সিরিয়ার সবচেয়ে জনপ্রিয় সালাদ ‘ফাত্তুশ’। ভাজা রুটির কুচি, পুদিনা পাতা, সুমাক মশলা আর ডালিমের রস দিয়ে তৈরি এই সালাদ ছাড়া সিরীয়দের ইফতার যেন অসম্পূর্ণ। প্রধান খাবারের মধ্যে থাকে ‘কিববেহ’—যা মাংস এবং গুঁড়ো গম (বুরগুল) দিয়ে তৈরি এক বিশেষ পদ। এছাড়া আছে ‘মাহশি’, যা মূলত আঙুর পাতা বা বাঁধাকপির ভেতরে চাল ও মাংসের পুর দিয়ে তৈরি করা হয়।  সিরীয়দের প্রিয় আরেকটি পদ হলো ‘ফাত্তাহ’। দই, সেদ্ধ ছোলা এবং মুচমুচে রুটির সংমিশ্রণে তৈরি এই খাব...

কদর রাতের প্রস্তুতি ও পরিকল্পনা

  রমজানের শেষ দশ রাত মুসলিমদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও মহিমান্বিত সময়। এই রাতগুলোর যেকোনো একটি হতে পারে লাইলাতুল কদর, যে রাত সম্পর্কে কোরআনে বলা হয়েছে—এটি হাজার মাসের চেয়েও উত্তম। একজন মুমিনের জন্য এই রাতগুলোকে ইবাদত, জিকির ও দোয়ার মাধ্যমে কাটানো পরম সৌভাগ্যের বিষয়। এই বরকতময় রাতকে সুন্দরভাবে কাজে লাগানোর জন্য কিছু প্রস্তুতি ও করণীয় আমল নিচে দেওয়া হলো: প্রস্তুতি ও পরিকল্পনা কদরের রাত ইবাদতে কাটানোর জন্য দিনের বেলায় কিছুটা ঘুমিয়ে নিন। এতে রাত জেগে ইবাদত করার শক্তি পাবেন। মাগরিবের পর থেকে সময়গুলো যেন পুরোপুরি ইবাদতে ব্যয় করতে পারেন, সে জন্য প্রয়োজনীয় কাজগুলো আগেই সেরে রাখুন। ইফতার ও মাগরিব:  সূর্যাস্তের সঙ্গে সঙ্গেই সুন্নাহ অনুযায়ী ইফতার করুন। অতিরিক্ত ইফতার না খেয়ে পুষ্টিকর খাবার খান, যেন ক্লান্তিতে ঘুম না আসে। মাগরিবের নামাজ খুশু-খুজুর সঙ্গে দীর্ঘ রুকু ও সিজদার মাধ্যমে আদায় করুন। নামাজের পর নির্ধারিত জিকিরগুলো (সুবহানাল্লাহ ৩৩ বার, আলহামদুলিল্লাহ ৩৩ বার, আল্লাহু আকবার ৩৩ বার) সম্পন্ন করুন। সাইয়্যিদুল ইস্তিগফার:  সন্ধ্যার দোয়া ও জিকিরগুলো মনোযোগ দিয়ে পড়ুন। বিশেষ করে ...

মেসোপটেমীয় ঐতিহ্য আর আতিথেয়তার অনন্য উপাখ্যান

  ইরাকের রমজান যেন প্রাচীন ব্যবিলনীয়, সুমেরীয় এবং আব্বাসীয় ঐতিহ্যের এক জীবন্ত জাদুঘর। বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে দেখা যায়, মুদ্রাস্ফীতি বা দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি থাকলেও ইরাকিদের হৃদয়ের প্রশস্ততা এবং আতিথেয়তায় কোনো ভাটা পড়েনি। বিশ্বের প্রথম ‘কুকবুক’ ইরাকিদের রান্নার হাত হাজার বছরের পুরনো। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ে সংরক্ষিত ১৭৫০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দের তিনটি প্রাচীন মাটির ফলক বা কিউনিফর্ম স্ক্রিপ্টকে বলা হয় বিশ্বের প্রথম রান্নার বই। মজার ব্যাপার হলো, সেই সাড়ে তিন হাজার বছর আগের ‘তশরীব’ বা ‘খুবজ আল-আরুক’ (বিশেষ রুটি) আজও ইরাকি ইফতারের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ইফতারের রাজকীয় পদ ইরাকের ইফতারে মাছের প্রাধান্য চোখে পড়ার মতো, যা অন্য অনেক আরব দেশে বিরল। মাসকুফ:  এটি ইরাকের জাতীয় খাবার। কার্প জাতীয় মাছকে পিঠের দিক দিয়ে চিরে বিশেষ মশলায় মাখানো হয়। এরপর কাঠের খুঁটিতে গেঁথে আগুনের পাশে রেখে অত্যন্ত ধীরগতিতে ঝলসানো হয়। ৪,৫০০ বছর আগের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনেও এই মাসকুফ রান্নার প্রমাণ পাওয়া গেছে। দোলমা ও দুলাইমিয়া:  আঙুর পাতা বা সবজির ভেতরে মাংস ও চালের পুর দিয়ে তৈরি ‘দোলমা’ এবং আ...

জাহান্নাম থেকে মুক্তি মানবজীবনের শ্রেষ্ঠ সফলতা

  ইসলামি বিধানের উদ্দেশ্য হলো দুনিয়ায় শান্তি ও পরকালে মুক্তি। আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘জীবমাত্রই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে। কিয়ামতের দিন তোমাদের কর্মফল পূর্ণমাত্রায় দেওয়া হবে। যাকে অগ্নি হতে দূরে রাখা হবে এবং জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে, সে-ই সফলকাম এবং পার্থিব জীবন ছলনাময় ভোগ ব্যতীত কিছুই নয়।’ (সুরা-৩ আলে ইমরান, আয়াত: ১৮৫) নাজাত বা মোহমুক্তির উপায় হলো তওবা ও ইস্তিগফার করা। তওবা মানে হলো পাপ ছেড়ে পুণ্যে মনোনিবেশ করা। ইস্তিগফার হলো কৃত অপরাধের জন্য লজ্জিত ও অনুতপ্ত হয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করা এবং আবার ওই অপরাধ বা পাপ না করার অঙ্গীকার করা ও দৃঢ়সংকল্প হওয়া। রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের মাস রমজান। সব ধরনের কলুষতা, মলিনতা, আবিলতা ও পাপ-পঙ্কিলতা থেকে মুক্ত হওয়াই রমজান মাসে সিয়াম পালনের মূল লক্ষ্য। নাজাত মানে মুক্তি, মুক্তি পাওয়া, মুক্তি দেওয়া, মুক্ত হওয়া ও মুক্ত করা। রমজানের নাজাতের অর্থ হলো এই মাসে মানুষ পাপতাপ থেকে মুক্ত হবে, জাহান্নাম থেকে মুক্ত হবে; পাপের আকর্ষণ থেকে মুক্ত হবে। তাগুত ও গায়রুল্লাহর মহব্বত থেকে মুক্ত হবে, দুনিয়ার মহব্বত থেকে মুক্ত হবে। আল্লাহর আজাব ও গজব থেকে মুক্ত হবে। রাসুলুল্লাহ (স...

ইসলামী জ্ঞান বিজ্ঞানের প্রতিটি শাখায় ইরানিদের অবিশ্বাস্য অবদান

  ইসলামী জ্ঞান বিজ্ঞানের প্রতিটি শাখায় ইরানিদের অবিশ্বাস্য অবদান —ডক্টর ইয়াসির কাদি আমি ইরানের সম্পূর্ণ ইতিহাস নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করতে যাচ্ছি না, তবে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মূল বিষয় অবশ্যই উল্লেখ করবো। আমি চাই সবাই জানুক, সেই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর মধ্যে একটি হলো, ইরানি পাণ্ডিত্য ইসলামকে রূপ দিয়েছিলো। এটি একটি অবিসংবাদিত বক্তব্য। সেই অঞ্চলের ইসলামী চিন্তাবিদগণ ইসলামকে রূপ দিয়েছিলেন। তাঁরা ইসলামী জ্ঞানের প্রতিটি শাখায় অবিশ্বাস্যভাবে অবদান রেখেছেন; আর প্রকৃতপক্ষে, নবিজীর হাদিসেও এই বিষয়টির ইঙ্গিত পাওয়া যায়। এই হাদিসগুলো তিরমিজি, মুস্তাদরাক আল-হাকিম, এবং অন্যান্য গ্রন্থেও পাওয়া যায় যে, রসূল (স) সালমান আল-ফারেসীর সাথে বসে ছিলেন, এবং তিনি বলেছিলেন, [لَوْ أَنَّ العِلْمَ فِي الثُّرَيَّا لَتَنَاوَلَهُ رَجُلٌ أَوْ رِجَالٌ مِنْ أَبْنَاءِ فَارِسَ], অন্য একটি বর্ণনায়, তিনি সালমানের দিকে ইঙ্গিত করে বলেছিলেন, [مِنْ قَوْمِ هَؤُلَاءْ]। “যদি জ্ঞান সবচেয়ে দূরের নক্ষত্রগুলোতেও রাখা হতো, পারস্যের লোকেরা এবং অন্য বর্ণনা মতে, সালমান আল-ফারেসীর লোকেরা গিয়ে সেই জ্ঞান ঠিকই অর্জন করে নিয়ে আসতো”। এই হাদ...

স্বল্পতম রোজার দেশে বৈচিত্র্যের ইফতার

  দক্ষিণ আফ্রিকায় রমজান মানে বৈচিত্র্যের মিলনমেলা। এখানে ভারতীয় মশলা, মালয় ঐতিহ্য আর খাঁটি আফ্রিকান সংস্কৃতির এক অদ্ভুত সংমিশ্রণ ঘটে। মাত্র ১২ লক্ষ মুসলিম নিয়ে গঠিত এই ছোট সম্প্রদায়টি দেশের অর্থনীতির প্রায় ৩০% নিয়ন্ত্রণ করে, যা তাদের রমজান আয়োজনকে করে তোলে অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণ। ‘ঈদ ফিস্ট’ ও রমজানের প্রস্তুতি এ–বছর রমজান উপলক্ষে জোহানেসবার্গে অনুষ্ঠিত হয়েছে আফ্রিকার অন্যতম বড় প্রদর্শনী ‘ঈদ ফিস্ট’। প্রায় ২০,০০০ দর্শনার্থী এই মেলায় অংশ নিয়েছেন। এখানে তুরস্কের পোশাক থেকে শুরু করে ভারতীয় মশলা—সবই পাওয়া যায়। বিশেষ করে তুর্কি পণ্যগুলো এবার দক্ষিণ আফ্রিকান মুসলিমদের কাছে ব্যাপক জনপ্রিয় হয়েছে। রমজান এলেই এখানকার ৫০০টিরও বেশি মসজিদকে সবুজ আলোয় রাঙানো হয়। বিশেষ করে জোহানেসবার্গের বিখ্যাত ‘নিজামি মসজিদ’ রমজানে এক আধ্যাত্মিক সৌন্দর্যের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। বৈচিত্র্যময় ইফতারের স্বাদ দক্ষিণ আফ্রিকার দস্তরখানে তিনটি ভিন্ন সংস্কৃতির খাবার দেখা যায়: মালয় ও ভারতীয় প্রভাব:  ইফতার শুরু হয় খেজুর আর হরেক রকমের স্ন্যাকস দিয়ে। এর মধ্যে সামোসা এবং কিমা বা পনির ভরা পেস্ট্রি অন্যতম। এরপর তারা মাগরিব...