পোস্টগুলি

শিশুর মনে ইমানের বীজ বপন করবেন কীভাবে

  শিশুর অন্তরে বিশ্বাসের বীজ রোপণ করা একটি সংবেদনশীল, মনস্তাত্ত্বিক ও মমতাময় শিল্প। রাসুল (সা.) মানবশিশুর এই সহজাত পবিত্রতার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে ঘোষণা করেছিলেন, “প্রত্যেক শিশুই ফিতরাত বা নিষ্কলুষ স্বভাবধর্মের ওপর জন্মগ্রহণ করে; অতঃপর তার মা-বাবাই তাকে ভুল জীবনাদর্শের দিকে পরিচালিত করে।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৩৫৮) শিশুর মন উর্বর এক টুকরো নরম মাটির মতো; সেখানে বিশ্বাসের ফুল ফোটাতে হলে প্রয়োজন বয়সের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ এক সুষম ও প্রজ্ঞাপূর্ণ শিক্ষাপদ্ধতি। মুখস্থ নয়, কৌতূহলের পাঠ আমাদের প্রচলিত ধারায় ধর্মশিক্ষার অর্থই দাঁড়িয়ে গেছে কিছু আরবি শব্দ তোতাপাখির মতো মুখস্থ করানো। এতে হয়তো স্মৃতিশক্তির কসরত হয়, কিন্তু শিশুর অন্তরে আল্লাহর প্রতি কোনো আত্মিক টান বা ভালোবাসার অনুরণন তৈরি হয় না।  বিশ্বাসের ভিত্তিটি গড়ে তুলতে হবে কৌতূহলোদ্দীপক পর্যবেক্ষণ পদ্ধতির মাধ্যমে। শিশুরা স্বভাবজাতভাবেই কৌতূহলী। তারা প্রতিনিয়ত চারপাশের জগতকে দেখে বিস্মিত হয়। একজন সচেতন অভিভাবক প্রকৃতির এই বিস্ময়কে স্রষ্টার পরিচয়ের সাথে যুক্ত করে দিতে পারেন। বাগানে ফোটা একটি রঙিন ফুল দেখিয়ে, আকাশের তারার মেলা দেখিয়ে কিংবা প...

আল্লাহর ভয় ও ভালোবাসার মধ্যে ভারসাম্য কীভাবে তৈরি হয়

  মুমিনের হৃদয়ে আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা থাকবে আবার তাঁর ভয়ও থাকবে। ভালোবাসা মানুষকে আল্লাহর দিকে টেনে নেয় আর ভয় তাকে আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে দূরে রাখে। এই দুটির কোনো একটিকে বাদ দিলে ইমানের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যেতে পারে। আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘তারা তাদের রবকে ভয় ও আশার সঙ্গে ডাকে।’ (সুরা আস-সাজদা, আয়াত: ১৬) এখানে ভয় ও আশাকে পাশাপাশি রাখা হয়েছে। মুমিন আল্লাহকে ভয় করে। কারণ, তিনি সর্বশক্তিমান এবং তাঁর অবাধ্যতার পরিণতি ভয়াবহ। আবার সে আল্লাহকে ভালোবাসে এবং তাঁর রহমতের আশা রাখে। কারণ, তিনি পরম দয়ালু ও ক্ষমাশীল। আল্লাহর ভয় মানে সারাক্ষণ আতঙ্কে থাকা নয়। এর অর্থ হলো, আল্লাহ আমাকে দেখছেন, তিনি আমার কথা ও কাজ জানেন এবং তাঁর অবাধ্যতার জবাবদিহি আমাকে করতে হবে—এ অনুভূতি অন্তরে জীবিত রাখা। এ ভয় মানুষকে গোপনে গুনাহ করা থেকে বিরত রাখে। আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘যে ব্যক্তি তার রবের সামনে দাঁড়ানোর ভয় রাখে, তার জন্য রয়েছে দুটি জান্নাত।’ (সুরা আর-রহমান, আয়াত: ৪৬)অন্যদিকে আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা মানুষকে শুধু শাস্তির ভয় থেকে ইবাদত করার স্তর পেরিয়ে নিয়ে যায়। সে নামাজ পড়ে শুধু জাহান্নাম থেকে বাঁচার জন্য নয়; সে নামাজ পড়ে ...

পাকা চুলে রং করার বিধান কী

  চুল মানুষের স্বাভাবিক সৌন্দর্যের একটি অংশ। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চুলে পাক ধরা স্বাভাবিক। তবে অনেকের অল্প বয়সেই চুল সাদা হয়ে যায়। নানা কারণে এমনটি হতে পারে। বিশেষ করে কোনো যুবতী নারীর অল্প বয়সেই চুল সাদা হয়ে গেলে তা তার স্বাভাবিক সৌন্দর্যে কিছুটা প্রভাব ফেলতে পারে। স্বামীও যদি বিষয়টি অপছন্দ করেন, তখন চুলের সাদা অংশ ঢাকার জন্য খেজাব ব্যবহার করার প্রয়োজনীয়তাও দেখা দিতে পারে। চুলে খেজাব ব্যবহারের অনুমতি চুলে খেজাব ব্যবহার করা ইসলামে নিষিদ্ধ নয়; বরং সাদা চুল পরিবর্তন করার ব্যাপারে নবীজি (সা.) সাহাবিদের উৎসাহ দিয়েছেন। হাদিসে এসেছে, ‘ইহুদি ও খ্রিষ্টানরা (চুল) রং করে না। অতএব, তোমরা তাদের বিরোধিতা করো।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৫৫৯) হাদিসটি বর্ণিত হয়েছে সহিহ বুখারির ‘খেজাব’ অধ্যায়ে। ইবনে হাজার আসকালানি (রহ.) এর ব্যাখ্যায় বলেন, ‘খেজাব বলতে মাথা ও দাড়ির পাকা চুলের রং পরিবর্তনের কথা বোঝানো হয়েছে।’ (ইবনে হাজার আসকালানি, ফাতহুল বারি বি-শরহি সহিহিল বুখারি, ১৮/২০২, আর-রিসালাহ আল-আলামিয়্যাহ, দিমাশক, ২০১৩) এ থেকে বোঝা যায়, সাদা চুলকে স্বাভাবিক রঙে পরিবর্তন করা নিষিদ্ধ নয়। তবে কোন রং এবং কোন পরি...

যে ৪ কারণে মুহাম্মদ (সা.) একজন অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব

  মানবসভ্যতার সূচনা থেকেই মানুষ এমন একজন পরিপূর্ণ নেতার সন্ধান করে এসেছে, যাঁর পদাঙ্ক অনুসরণ করে ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজের জটিল পথ পাড়ি দেওয়া সম্ভব। ইতিহাসের পাতায় বহু মহামানব, দার্শনিক, দিগ্বিজয়ী বীর ও ধর্মপ্রচারকের আবির্ভাব ঘটেছে; কিন্তু তাঁদের জীবনাদর্শ কি সব যুগের ও সর্বস্তরের মানুষের জন্য সর্বজনীন অনুকরণীয় আদর্শ হতে পেরেছে? এই মৌলিক দার্শনিক প্রশ্নের প্রামাণ্য উত্তর উপস্থাপন করেছেন ইতিহাসবিদ ও গবেষক সাইয়েদ সোলাইমান নদভি (রহ.)। কোনো ব্যক্তির জীবনচরিত মানবজাতির জন্য সর্বজনীনভাবে অনুকরণীয় হতে হলে তাতে চারটি বাস্তবসম্মত শর্তের উপস্থিতি অপরিহার্য। ১. ঐতিহাসিক প্রামাণিকতা যেকোনো আদর্শ জীবনচরিতের প্রথম ও প্রধানতম শর্ত হলো তার ঐতিহাসিক সত্যতা। যিনি অনুকরণীয় হবেন, তাঁর জীবনের প্রতিটি ঘটনা, বাণী, দৃষ্টিভঙ্গি এবং কর্মপদ্ধতি নিরেট সত্য হতে হবে; কোনো কাল্পনিক উপাখ্যান, লোকগাথা বা অস্পষ্ট কিংবদন্তি সেখানে থাকতে পারবে না। মানুষের স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্য হলো যে বিষয়ের ঐতিহাসিক সত্যতা নিয়ে সামান্যতম সংশয় থাকে, তাকে অন্তরের গভীর থেকে আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করা মানুষের পক্ষে সম্ভব হয় না। পৃথিবীর ইতিহাসে ...

কোরআন যেভাবে জীবনের কথা বলে

  ইমান, কুফর কিংবা আমলের প্রতিদান—দুনিয়ার জীবনে এসবের প্রকৃত রূপ বিষয় চোখে দেখা সম্ভব নয়। অথচ কোরআন এই বিমূর্ত বিষয়গুলো আমাদের চোখের সামনে পরিচিত দৃশ্যের মতো তুলে ধরেছে। কখনো শস্যের মাধ্যমে দানের প্রতিদান, কখনো জমির মাধ্যমে অন্তরের অবস্থা, আবার কখনো মাকড়সার জাল ও বই বহনকারী গাধার মাধ্যমে মানুষের ভুল পথকে স্পষ্ট করেছে। এবার এমনই কয়েকটি উপমার মধ্য দিয়ে আমরা কোরআনকে বোঝার চেষ্টা করব। ১২. দানকারীর সওয়াবের উপমা আল্লাহ-তাআলা বলেন, ‘যারা নিজেদের ধনসম্পদ আল্লাহর পথে ব্যয় করে, তাদের উপমা একটি বীজের মতো—যা সাতটি শিষ উৎপাদন করে, প্রতিটি শিষে ১০০ শস্যদানা। আর আল্লাহ যাকে ইচ্ছে বহু গুণে বৃদ্ধি করে দেন। আর আল্লাহ সর্বব্যাপী প্রাচুর্যময়, সর্বজ্ঞ।’ (সুরা বাকারা, আয়াত ২৬১) যার অন্তর ভালো ও নরম, সে আল্লাহর কথা শুনে সহজেই ভালো কাজের দিকে এগিয়ে যায়। আর যার অন্তর শক্ত ও খারাপ, তাকে যতই ভালো কথা বলা হোক, তাতে খুব বেশি লাভ হয় না। একটি বীজের মধ্যে যেমন বিপুল ফলনের সম্ভাবনা লুকিয়ে থাকে, আল্লাহর পথে ব্যয় করা সম্পদের মধ্যেও তেমনই রয়েছে বহুগুণ প্রতিদানের সম্ভাবনা। এই আয়াতে দানকারীর সওয়াবকে একটি বীজের সঙ্গে ত...

‘ইহসান’ করো, যেমন আল্লাহ শিখিয়েছেন

ছবি
  ইহসান শব্দটির সাধারণ অর্থ ‘দয়া’ বা ‘উপকার’ মনে হলেও এর ব্যাপ্তি অনেক গভীর। এর প্রকৃত অর্থ হলো, যেকোনো কাজে পরম উৎকর্ষ অর্জন করা, আচরণে নিখুঁত সৌন্দর্যের ছোঁয়া দেওয়া এবং হৃদয়ের সমস্ত উষ্ণতা উজাড় করে সৃষ্টির পাশে দাঁড়ানো। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, “সাত আকাশ, পৃথিবী এবং তাদের মধ্যবর্তী সবকিছুই তাঁর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে; এমন কিছু নেই যা তাঁর প্রশংসাসহ পবিত্রতা পাঠ করে না, কিন্তু তোমরা তাদের স্তুতিগান উপলব্ধি করতে পারো না।” (সুরা ইসরা, আয়াত: ৪৪) মানুষ যখন হৃদয়ের চোখ দিয়ে এই সত্য অনুধাবন করে, তখন চারপাশের কোনো কিছুকেই আর তুচ্ছ বা অপ্রয়োজনীয় মনে হয় না। জড় পদার্থের সঙ্গেও যে মানুষের আত্মিক ভালোবাসার সম্পর্ক গড়ে উঠতে পারে, তার সবচেয়ে অনুপম দৃষ্টান্ত মেলে রাসুলের জীবনে। তিনি সাহাবিদের বলেছিলেন, “নিশ্চয়ই মক্কার এমন একটি পাথরকে আমি চিনি, নবুয়ত পাওয়ার আগে থেকেই যে আমাকে সালাম দিত; আমি আজও সেই পাথরটিকে চিনতে পারি।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২২৭৭) গবেষক মুহাম্মদ আস-সুওয়াইয়ানি এক চমৎকার উপলব্ধি তুলে ধরে লিখেছেন, “আমাদের চারপাশের এই নীরব নিসর্গের মধ্যেও অনন্ত প্রার্থনা ও সুর ধ্বনিত হচ্ছে; কিন্তু ...

ইসলামে সন্তানকে শাসন করার সীমা কতটুকু

  বর্তমান সমাজে মা-বাবাদের মধ্যে প্রধানত তিনটি ধারার অভিভাবকত্ব দেখা যায়। এক শ্রেণির মা-বাবা পরিবারকে কোনো সেনা ব্যারাকের মতো কঠোর মনে করেন। তাঁদের নির্দেশই সেখানে শেষ কথা; সন্তানের আবেগ বা মতামতের কোনো সুযোগ থাকে না। এমন পরিবেশে বেড়ে ওঠা সন্তানরা ভেতর থেকে হীনম্মন্যতায় ভোগে। ঠিক এর বিপরীত মেরুতে আছেন আরেক দল অভিভাবক, যাঁরা সন্তানের কোনো ইচ্ছাতেই ‘না’ বলতে পারেন না। অতিরিক্ত প্রশ্রয় পেয়ে বেড়ে ওঠা এসব সন্তান জীবনের বাস্তব চাপ ও প্রতিকূলতা সহ্য করতে পারে না। এই দুই প্রান্তিকতার বাইরে রয়েছেন সচেতন অভিভাবকেরা। তাঁরা ভালো করেই জানেন যে শাসন ছাড়া সন্তানের নীতিবোধ তৈরি হয় না, আবার ভালোবাসাহীন শাসন শিশুর আত্মাকে ভেঙে দেয়। তাঁরা নিয়ম তৈরি করেন স্নেহের ভাষায়, ভুলত্রুটি ক্ষমা করেন পরম মমতায়, কিন্তু নৈতিকতার প্রশ্নে থাকেন অবিচল। সচেতন অভিভাবকেরা শাসন ছাড়া সন্তানের নীতিবোধ তৈরি হয় না, আবার ভালোবাসাহীন শাসন শিশুর আত্মাকে ভেঙে দেয়। তাঁরা নিয়ম তৈরি করেন স্নেহের ভাষায়, ভুলত্রুটি ক্ষমা করেন পরম মমতায়। কোরআনের পারিবারিক দর্শন ইসলাম এই ভারসাম্যপূর্ণ ধারাকেই সন্তান প্রতিপালনের মূল ভিত্তি বানিয়েছে। বাইর...