পোস্টগুলি

শরিয়া আইন কী, কেন এই আইন, কেন এত ভয়

  ‘শরিয়া’ শব্দটি শুনলেই অনেকের ভাবেন হাত কাটা, বেত্রাঘাত বা পাথর ছোড়ার কথা। অথচ বিশ্বের শত কোটি মুসলমানের কাছে একই শব্দ নামাজ, রোজা, বিয়ে, উত্তরাধিকার, সৎ ব্যবসা ও ন্যায়বিচারের নৈতিক দিকনির্দেশনার নাম। ফলে শরিয়া নিয়ে আছে বিভ্রান্তি, আবেগ ও ভয়। এই লেখায় শরিয়া কী, শরিয়া আইন কেন, কত প্রকার, এ নিয়ে ভীতি কেন ইত্যাদি আলোচনা করা হলো। শরিয়া কী ‘শরিয়া’ শব্দটি এসেছে ‘শারাআ’ ধাতু থেকে, যার মূল ইঙ্গিত পানির ঘাট বা উৎসের দিকে যাওয়ার সুস্পষ্ট ও স্থায়ী পথ। মরুভূমির জীবনে পানির উৎসে পৌঁছানোর পথ ছিল প্রাণরক্ষার পথ; সেই রূপকটিকেই পরে ধর্মীয় ও নৈতিক জীবনপথ বোঝাতে শব্দটি ব্যবহৃত হয়। (হাশিম কামালি, শরিয়া ল: অ্যান ইন্ট্রোডাকশন, পৃষ্ঠা: ১৪, ওয়ানওয়ার্ল্ড পাবলিকেশন্স, অক্সফোর্ড, ২০০৮) কোরআনে শব্দটি সরাসরি এসেছে সুরা জাসিয়ার ১৮ নম্বর আয়াতে, যেখানে নবীজিকে ‘শরিয়ার’ ওপর প্রতিষ্ঠিত রাখার কথা বলা হয়েছে। সুরা আল-মায়িদার ৪৮ নম্বর আয়াতে একই মূল থেকে ‘শিরআহ’ ও ‘মিনহাজ’ শব্দ দুটি এসেছে, যার ভাবার্থ প্রত্যেক সম্প্রদায়ের জন্য নির্ধারিত পথ ও পদ্ধতি। ঐতিহাসিকভাবে শরিয়া কোনো রাষ্ট্র-প্রণীত সংকলিত দণ্ড...

ইসলামি রাষ্ট্রে অমুসলিমদের নিরাপত্তা কতখানি

  ইসলামে একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু আধুনিককালে বহুল আলোচিত বিষয় হলো অমুসলিম নাগরিকদের (জিম্মি) অধিকার। ইসলামি রাষ্ট্রব্যবস্থায় অমুসলিমদের জান-মাল ও সম্মানের নিরাপত্তা প্রদান করা কেবল একটি রাজনৈতিক সৌজন্য নয়, বরং এটি একটি পবিত্র ধর্মীয় ও আইনি বাধ্যবাধকতা।  আল্লাহ–তাআলা ও তাঁর রাসুলের পক্ষ থেকে এই অধিকারসমূহ সুনিশ্চিত করা হয়েছে। জান ও মালের নিরাপত্তা ইসলামি রাষ্ট্রে বসবাসকারী কোনো অমুসলিমকে অন্যায়ভাবে হত্যা করা বা তার সম্পদ লুণ্ঠন করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। মহানবী (সা.) এ ব্যাপারে অত্যন্ত কঠোর সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন। তিনি বলেছেন, “যে ব্যক্তি কোনো চুক্তিবদ্ধ অমুসলিমকে (মুআহিদ) হত্যা করবে, সে জান্নাতের সুঘ্রাণও পাবে না; অথচ জান্নাতের সুঘ্রাণ চল্লিশ বছরের দূরত্বের পথ থেকেও পাওয়া যায়।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩১৬৬) ফকিহরা এ বিষয়ে একমত যে, চুক্তিবদ্ধ অমুসলিমের জান ও মালের নিরাপত্তা একজন মুসলমানের জান ও মালের নিরাপত্তার মতোই সমান ও অলঙ্ঘনীয়। একইভাবে তাদের সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও রাষ্ট্রের দায়িত্ব। তাদের সম্পত্তিতে অন্যায় হস্তক্ষেপ করা বা তাদের মালিকানাধীন কোনো বস্তু জবরদস্তি ছিনিয়ে...

শরিয়া আইনে ‘তাজির’ কী, তাজিরে কি মৃত্যুদণ্ড দেওয়া যায়

  সৌদি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতি অনুযায়ী, মক্কার একটি মসজিদে ‘অনৈতিক কর্মকাণ্ডে’ জড়িত থাকার অভিযোগে দুই বাংলাদেশি নাগরিককে গ্রেপ্তার করা হয়। সম্প্রতি আদালত তাঁদের দোষী সাব্যস্ত করে শরিয়া আইনে ‘তাজির’ হিসেবে মৃত্যুদণ্ড দেন। এরপরই প্রশ্ন উঠেছে, ইসলামে ‘তাজির’ হিসেবে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া যায় কি না। কেননা, তাজির বলতে এমন শাস্তি, যার ধরন ও পরিমাণ কোরআন-সুন্নাহয় নির্ধারিত নেই; পরিস্থিতি বিবেচনা করে বিচারক বা শাসক তা ঠিক করেন। ক্লাসিক্যাল ফিকহে তাজিরে মৃত্যুদণ্ড সাধারণ নিয়ম নয়। তবে কোনো কোনো মাজহাবের ফকিহেরা শাসকের ‘সিয়াসাহ’ বা রাষ্ট্রনীতির অধীনে সীমিত ব্যতিক্রম স্বীকার করেছেন। বিস্তারিত আলোচনা করা হলো। তাজিরের ধরন বিচারকের বিবেচনার ওপর নির্ভর করে। ভর্ৎসনা, জরিমানা, সম্পদ বাজেয়াপ্তকরণ, কারাদণ্ড, নির্বাসন, বেত্রাঘাত—এসব ক্লাসিক্যাল ফিকহে আলোচিত। তাজির কী ইসলামি ফৌজদারি আইনে শাস্তি সাধারণত তিন ভাগে আলোচিত হয়। ১. হুদুদ, যা কোরআন-হাদিসে নির্ধারিত শাস্তি; ২. কিসাস ও দিয়াত, অর্থাৎ, হত্যা ও আঘাতের ক্ষেত্রে সমতাভিত্তিক প্রতিশোধ বা রক্তপণ এবং ৩. তাজির। ‘তাজির’ শব্দের মূল ‘আজার’, যার ভা...

দুর্নীতি যেভাবে ইমান ক্ষয় করে

  দুর্নীতি, ঘুষ, স্বজনপ্রীতি, সরকারি বা অপরের সম্পদ আত্মসাৎ এবং আমানতের খেয়ানত মানুষের এই আত্মিক ভিত্তি তথা ইমানকে ধীরে ধীরে ক্ষয়িষ্ণু করে ফেলে। অসাধু উপায়ে উপার্জিত অর্থ বা ক্ষমতা আপাতদৃষ্টিতে বাহ্যিক সাফল্য এনে দিলেও তা মানুষের নৈতিক চেতনাকে পঙ্গু করে দেয় এবং আত্মিক জীবনকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেয়। পবিত্র কোরআন–হাদিসের আলোকে পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, দুর্নীতি কীভাবে পর্যায়ক্রমে মানুষের ইমানকে দুর্বল ও নিঃশেষ করে। কোনো লোক যখন মানুষের দৃষ্টির সামনে মূল্যবান সম্পদ লুণ্ঠন বা আত্মসাৎ করে, তখন সে মুমিন থাকে না। সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৪৭৫ ১. অন্তরের আলো বিনাশ অন্যায় ও দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থ বা সুবিধা মানুষের অন্তরে পাপের দাগ তৈরি করে। মানুষ যখন বারবার দুর্নীতিতে লিপ্ত হয়, তখন তার বিবেকবোধ লোপ পায় এবং অন্যায় কাজকেও সে স্বাভাবিক মনে করতে শুরু করে। এই অবস্থাকে কোরআনের ভাষায় ‘রান’ বা অন্তরের মরিচা বলা হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘কখনো নয়, বরং তারা যা অর্জন করত, তা-ই তাদের অন্তরে মরচে ধরিয়েছে।’ (সুরা মুতাফফিফীন, আয়াত: ১৪) অন্তরে যখন অন্যায়ের মরচে পড়ে, তখন ইমানের শুভ্র আলো...

অনেক আমলের পরও কেন কাঙ্ক্ষিত সফলতা আসে না

  অনেকেই বলেন, ‘আমি তো ধর্মের সব অনুশাসন মেনে চলার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি; ঠিক সময়ে নামাজ পড়ছি, নিয়মিত কোরআন পাঠ ও সকাল–সন্ধ্যার জিকির করছি, মা–বাবার সেবা করছি, পাপ থেকে বেঁচে থাকছি এবং অন্যায় কিছু হয়ে গেলে তওবা করছি। তবুও আমার জীবনে কেন কোনো বড় সাফল্য আসছে না?’ মানুষ যখন দেখে যে সে কোরআন হিফজ করার চেষ্টা চালিয়েও ব্যর্থ হচ্ছে, কিংবা সৎভাবে ব্যবসা করতে গিয়ে কোনোমতে দিন পার করছে, অথবা ভালো বাবা হওয়ার চেষ্টা করেও সন্তানকে কাছে পাচ্ছে না, নিয়মিত দান–সদকা করেও বিপদ কমছে না—তখন তার অন্তরে একধরনের হতাশা তৈরি হতে পারে। অথচ দেখে চারপাশে যারা কোনো ধর্মীয় বিধানের তোয়াক্কাই করে না, তারাই সফল সফল হচ্ছে—তখন এই মানসিক যন্ত্রণা বেড়ে যায়। ইসলামি জীবনদর্শনের দৃষ্টিতে এই ‘না পাওয়া’র পেছনে মহান আল্লাহর কি কোনও রহস্য লুকিয়ে আছে? আসুন আলাপ করা যাক। হতে পারে কোনো বিষয়কে তোমরা অপছন্দ করছ, অথচ তা তোমাদের জন্য কল্যাণকর; আবার হতে পারে কোনো বিষয়কে তোমরা ভালোবাসছ, অথচ তা তোমাদের জন্য ক্ষতিকর। আর আল্লাহ জানেন, তোমরা জানো না। সুরা বাকারা, আয়াত: ২১৬ না পাওয়ার মধ্যেও লুকিয়ে থাকা বরকত আমাদের কাঙ্ক্ষিত...

বেহেশত কিনেছিলেন তিনি একটি খেজুরগাছের বিনিময়ে

  দুনিয়ার সম্পদ অর্জন ও রক্ষার জন্য মানুষ কত পরিশ্রমই না করে! অথচ পরকালের প্রতি দৃঢ়বিশ্বাস মানুষকে কখনো এমন সিদ্ধান্ত নিতে উদ্বুদ্ধ করে, যা সাধারণ দৃষ্টিতে অবিশ্বাস্য মনে হয়। এমনই একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন সাহাবি আবু দাহদাহ (রা.)। বেহেশতের আশায় নিজের খেজুরবাগান বিক্রি করে দিয়েছিলেন তিনি। খেজুরগাছের বিনিময়ে বেহেশতের প্রস্তাব সাহাবি আনাস ইবনে মালিক (রা.) বলেন, এক ব্যক্তি নবীজির কাছে এসে অভিযোগ করলেন, অমুক ব্যক্তির একটি খেজুরগাছ তাঁর বাগানে রয়েছে। গাছটি থাকায় তিনি নিজের বাগানের প্রাচীর নির্মাণ করতে পারছেন না। তাই তিনি নবীজিকে অনুরোধ করলেন যেন গাছের মালিককে বলেন সেটি তাঁকে দিয়ে দিতে। রাসুল (সা.) গাছের মালিককে ডেকে বললেন, তিনি যেন গাছটি ওই ব্যক্তিকে দিয়ে দেন। বিনিময়ে বেহেশতে একটি খেজুরগাছ পাবেন। কিন্তু লোকটি সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলেন। বেহেশতের আশায় নিজের বাগান বিনিময় গাছটির মালিকের প্রত্যাখ্যানের কথা জানতে পেরে সাহাবি আবু দাহদাহ (রা.) এগিয়ে এলেন। তিনি ওই ব্যক্তিকে বললেন, একটি বাগানের বিনিময়ে খেজুরগাছটি বিক্রি করতে। লোকটি রাজি হয়ে গেলেন। নিজের বাগান বুঝিয়ে দিয়ে আবু ...

কোরআনে সুরা তওবার শুরুতে বিসমিল্লাহ নেই কেন

  কোরআনের ১১৪টি সুরার মধ্যে ১১৩টি শুরু হয়েছে ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’ দিয়ে। ব্যতিক্রম শুধু সুরা তওবা। আল্লাহর কালামের প্রতিটি শব্দ যেখানে সযত্নে সংরক্ষিত, সেখানে একটি সুরার শুরুতে বিসমিল্লাহ না থাকার কারণ কী? আলোচনা করা যাক। খলিফা ওসমানের বর্ণনা এ বিষয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দলিল খলিফা ওসমান ইবনে আফফানের বক্তব্য। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) একবার তাঁকে জিজ্ঞেস করেন, সুরা আনফাল ও সুরা তওবার বিষয়বস্তু কাছাকাছি হওয়া সত্ত্বেও তিনি কেন দুটি সুরা পাশাপাশি রেখেছেন, অথচ মাঝখানে বিসমিল্লাহ লেখেননি? প্রত্যুত্তরে ওসমান (রা.) কোরআন সংকলনের সময়কার পটভূমি তুলে ধরেন: নবীজির কাছে কখনো পূর্ণ সুরা, কখনো একাধিক আয়াত অবতীর্ণ হতো। ওহি এলে তিনি ওহি লেখকদের ডেকে বলে দিতেন, কোন আয়াত কোন সুরার কোথায় বসবে। আনফাল ছিল মদিনায় অবতীর্ণ হওয়া প্রথম দিকের সুরাগুলোর একটি, আর তওবা ছিল শেষ দিকে নাজিল হওয়া অংশের অন্যতম। দুই সুরার বিষয়বস্তুতেও মিল ছিল। কিন্তু রাসুল (সা.) ইন্তেকালের আগে তওবা আনফালেরই অংশ কি না, তা স্পষ্ট করে যাননি। তাই তিনি সুরা দুটিকে পাশাপাশি রাখলেন, মাঝখানে বিসমিল্লাহ লিখলেন না। (সুনা...