পোস্টগুলি

কর ফাঁকি দেওয়া কি ইসলামে বৈধ

  ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলেন, এমন অনেকের মধ্যে একটি অস্পষ্ট ধারণা কাজ করে যে ইসলামে যেহেতু ‘জাকাত’ নামক একটি বাধ্যতামূলক আর্থিক ইবাদত রয়েছে, তাই রাষ্ট্রকে আলাদাভাবে কর বা ট্যাক্স দেওয়া জরুরি নয়, কিংবা তা ফাঁকি দিলে কোনো পাপ হবে না। এই অস্পষ্টতা দূর করা, রাষ্ট্রীয় আইন ও নাগরিক চুক্তির প্রতি ইসলামের প্রকৃত দৃষ্টিভঙ্গি কী, তা জানা থাকা ভালো। নাগরিক চুক্তি ও ইসলামের ‘অঙ্গীকার রক্ষা’ রাষ্ট্রবিজ্ঞান অনুযায়ী, একজন নাগরিক ও রাষ্ট্রের সম্পর্ক মূলত একটি সামাজিক চুক্তি। নাগরিক রাষ্ট্রকে কর দেবে এবং রাষ্ট্র তার বিনিময়ে নাগরিকের জানমাল, নিরাপত্তা ও মৌলিক অধিকারের সুরক্ষা দেবে। চুক্তি একটি অঙ্গীকার। ইসলাম এই অঙ্গীকার রক্ষার নির্দেশ দিয়েছে। আইনসম্মতভাবে ধার্যকৃত কর ফাঁকি দেওয়া প্রকারান্তরে সেই নাগরিক চুক্তি ভঙ্গ করার শামিল, যা ইসলামের দৃষ্টিতে একটি বড় নৈতিক অপরাধ। ইসলামি আইনশাস্ত্রের (ফিকহ) দৃষ্টিতে, একজন নাগরিক যখন কোনো দেশের পাসপোর্ট, জাতীয় পরিচয়পত্র বা নাগরিক সুবিধা গ্রহণ করে স্বাচ্ছন্দ্যে বসবাস করছেন, তখন তিনি পরোক্ষভাবে সেই দেশের প্রচলিত আইন ও করের ব্যবস্থা মেনে নেওয়ার চুক্তিতে আবদ্ধ হয়েছেন। প...

তওবার অনন্য ৫ সুফল

  মানুষের ভুলের পথ যতই দীর্ঘ হোক না কেন, তার জন্য ফিরে আসার দরজা সব সময় খোলা। আর সেই ফিরে আসার নামই তওবা। তওবা শুধু পাপ মাফের মাধ্যম নয়, বরং এটি মানুষের আত্মশুদ্ধি, চরিত্র গঠন এবং আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের এক অনন্য উপায়। তাই একজন মুমিনের উচিত ভুল বা পাপ হয়ে গেলে দ্রুত আল্লাহর কাছে ফিরে আসা এবং আন্তরিকভাবে তওবা করা। ১. আল্লাহর ভালোবাসা অর্জিত হয় মানুষের সবচেয়ে বড় সৌভাগ্য হলো তার রবের ভালোবাসা অর্জন করা। আর তওবা সেই ভালোবাসা লাভের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তওবাকারীদের ভালোবাসেন এবং যারা পবিত্রতা অর্জন করে তাদেরও ভালোবাসেন।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ২২২) পাপ মানুষের হৃদয়কে কলুষিত করে এবং তাকে আল্লাহ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। কিন্তু তওবা সেই কলুষতা দূর করার এক মহৌষধ। অনেকেই মনে করেন, পাপ মানুষকে আল্লাহর রহমত থেকে চিরতরে দূরে সরিয়ে দেয়। কিন্তু এই আয়াত আমাদের শেখায়, আন্তরিক অনুতাপ ও তওবার মাধ্যমে একজন পাপগারও আল্লাহর প্রিয় বান্দায় পরিণত হতে পারেন। এটি আল্লাহর অসীম দয়া ও করুণার এক অপূর্ব নিদর্শন ২. পরকালীন সফলতা ও বেহেশত লাভ দুনিয়ার জীবন ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু আখিরা...

সরকারি বাজেট এবং ইসলামের ‘বায়তুল মাল’ ব্যবস্থা

  জাতীয় বাজেটের কেন্দ্রে একটা হিসাব-নিকাশ থাকে—রাষ্ট্র কোথা থেকে আয় করবে আর কোথায় তা ব্যয় করবে। যদিও বাজেটের দর্শন হলো সম্পদের সুষম বণ্টন এবং নাগরিকের মৌলিক অধিকারের নিশ্চয়তা দেওয়া। কিন্তু বর্তমান ধনতান্ত্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় বাজেট অনেক সময়ই মুষ্টিমেয় পুঁজিপতির স্বার্থরক্ষা এবং প্রান্তিক মানুষকে করের জালে বন্দী করার হাতিয়ারে পরিণত হয়। ঠিক এই জায়গাতেই ইসলামের রাষ্ট্রীয় আর্থিক ব্যবস্থাপনা, যা ‘বায়তুল মাল’ (রাষ্ট্রীয় কোষাগার) নামে পরিচিত, তা এক কালজয়ী বিকল্প হিসেবে হাজির হয়। যার মূলে রয়েছে খোদায়ি আমানতদারিতা ও নিখাদ মানবকল্যাণ। বায়তুল মাল ব্যবস্থার সৌন্দর্য হলো, এর একটি অংশ সব সময় সমাজের দরিদ্রতম মানুষের সামাজিক সুরক্ষায় নিবেদিত থাকত। ফলে রাষ্ট্রের মূল বাজেটে ঘাটতি থাকলেও প্রান্তিক মানুষ কখনো অনাহারে থাকত না। বাজেটের ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গি আধুনিক কল্যাণকামী রাষ্ট্রগুলোতে বাজেটের মূল লক্ষ্য থাকে সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং জিডিপি (মোট দেশজ উৎপাদন) প্রবৃদ্ধি অর্জন। কিন্তু অনেক সময়ই দেখা যায়, প্রবৃদ্ধি বাড়লেও সমাজে ধনী-দরিদ্রের ব্যবধান জ্যামিতিক হারে বাড়ে। ইসলাম এই কৃত্রিম অসমতাকে ...

সম্পদের ধারণা বদলেছে, বদলে যাক ওয়াক্‌ফের ধারণাও

  এক মুহূর্তের জন্য চোখ বন্ধ করে যদি আপনাকে একটি ‘দানকৃত সম্পদ’ বা ‘ওয়াকফ’ কল্পনা করতে বলা হয়, তবে আপনার চোখের সামনে কী ভেসে উঠবে? সম্ভবত একটি বহুতল আবাসিক ভবন যার ভাড়া গরিবদের মাঝে বিলিয়ে দেওয়া হয়, অথবা একটি বিশাল খেজুর বাগান, কিংবা কোনো মসজিদ বা মাদ্রাসা। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে আমাদের সামষ্টিক মানসপটে ওয়াকফের এই ‘প্রথাগত প্রতিচ্ছবি’ গেঁথে আছে। আমাদের কাছে ওয়াকফ মানেই হলো স্থাবর সম্পত্তি, জমি বা দালানকোঠা—এমন কিছু যা শক্ত, ছোঁয়া যায় এবং যার গায়ে হাত দিয়ে বলা যায়, “এটি আল্লাহর মালিকানাধীন সম্পদ।” কিন্তু বর্তমান একবিংশ শতকে আমরা সম্পদের ধারণায় এক ঐতিহাসিক বিপ্লবের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় কোম্পানিগুলোর দিকে তাকান—গুগল, মাইক্রোসফট বা অ্যাপলের প্রকৃত সম্পদ কোথায়? একটি আবাসিক ভবন ওয়াকফ করার পরিবর্তে আপনি জীবন রক্ষাকারী কোনো ওষুধের ‘পেটেন্ট’ বা স্বত্ব ওয়াকফ করেন যা লাখো মানুষের প্রাণ বাঁচাবে, অথবা একটি শিক্ষামূলক মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন ওয়াক্‌ফ করেন যা বিনামূল্যে লাখো শিক্ষার্থী ব্যবহার করবে তাদের অফিস ভবন বা জমির মালিকানায়? উত্তরটি হবে—না। তাদের প্রকৃত সম্পদ লুকিয়ে আছে ‘অস্প...

ইমাম ইবনে কাসির: শতাব্দী পেরিয়েও কেন প্রাসঙ্গিক

  ইতিহাসের গতিপথ বদলে দেওয়া মনীষীদের কলম কেবল শব্দ বা বাক্য রচনা করে না; বরং যুগের সামষ্টিক আকিদা, মনস্তত্ত্ব ও জীবনদর্শনকে নির্মাণ করে। জ্ঞানচর্চার দীর্ঘ পথপরিক্রমায় মুসলিম উম্মাহ এমন কিছু ক্ষণজন্মা গবেষকের দেখা পেয়েছে, যাঁদের কাজ শতাব্দী পেরিয়েও সমভাবে প্রাসঙ্গিক। অষ্টম হিজরির প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ, মুহাদ্দিস ও ফকিহ হাফেজ ইবনে কাসির (রহ.) ছিলেন তেমনই এক মহান ব্যক্তিত্ব। আজ এত বছর পরও ইসলামি চিন্তাজগতে তাঁর প্রতিটি কাজ নির্ভরযোগ্যতা, বুদ্ধিবৃত্তিক সততা ও অনন্য ভারসাম্যের এক জীবন্ত প্রতীক হিসেবে মূল্যায়িত হয়। সংগ্রামমুখর শৈশব হিজরি ৭০১ সনে সিরিয়ার ঐতিহাসিক বসরা নগরীতে ইবনে কাসির জন্মগ্রহণ করেন, যা ছিল সেকালের ইলমি চর্চার এক অনন্য কেন্দ্র। শৈশবের প্রারম্ভেই তিনি পিতৃস্নেহ হারান। ফলে এক কঠিন সামাজিক ও আর্থিক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে তাঁর জীবন শুরু হয়। পিতার মৃত্যুর পর পরিবারের সঙ্গে তিনি দামেস্কে চলে আসেন। এই স্থান পরিবর্তন তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ অমর কীর্তি হলো ‘তাফসিরে ইবনে কাসির’। এর মূল শক্তি হলো—কোরআনের আয়াত দ্বারা কোরআনের ব্যাখ্যা এবং সহিহ হাদিসের যথাযথ প্রয়োগ। ...

বাজেট, মূল্যস্ফীতি ও সাধারণ মানুষের জীবন: ইসলাম কী বলে

  প্রতিবার বাজেটের পর সাধারণ মানুষের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ থাকে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম নিয়ে। দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির গতিপ্রকৃতি কিংবা মেগা প্রকল্পের বরাদ্দের চেয়েও তাদের কাছে বাজেটের সবচেয়ে বড় অর্থ—বাজার খরচ কমবে না বাড়বে। চাল, ডাল, তেল, চিনি আর ওষুধের দাম কি উঠবে না নামবে। বর্তমান বাজারে মূল্যস্ফীতির যে চাপ, তার সঙ্গে নতুন বাজেটের কর প্রস্তাবনা ও বাজার ব্যবস্থাপনার সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড়। এই পরিস্থিতিতে বাজার নিয়ন্ত্রণ, মূল্যস্ফীতি, সিন্ডিকেট এবং কৃত্রিম সংকটের মুখে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা নিয়ে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি ও নির্দেশনা কী, তা জানা দরকার। যেহেতু ইসলাম শুধু কিছু আনুষ্ঠানিক ইবাদতের সমষ্টি নয়, বরং এটি একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান। মানুষের অর্থনৈতিক জীবন যাতে শোষণমুক্ত, সহজ ও ভারসাম্যপূর্ণ হয়, ইসলামে তার স্পষ্ট রূপরেখা রয়েছে। যারা বাজারকে অস্থিতিশীল করে তোলে, তারা মূলত সমাজের অসহায় মানুষের পকেট কাটে। ইসলাম মনে করে, এ ধরনের উপার্জন কোনোভাবেই বরকতময় হতে পারে না। মজুতদারি ও কৃত্রিম সংকটে ইসলাম বাজারের স্বাভাবিক নিয়ম হলো, পণ্যের সরবরাহ ও চাহিদার ওপর ভিত্তি করে দাম নির্ধারিত হবে। কিন্ত...

হাদিসের আলোয় তিন শ্রেণির বেহেশতি মানুষ

  হাদিসে কুদসিতে মহান আল্লাহ বলেন, ‘আমি আমার সব বান্দাকে একনিষ্ঠ (মুসলিম) হিসেবে সৃষ্টি করেছি। অতঃপর তাদের কাছে শয়তান এসে তাদের ধর্ম থেকে বিচ্যুত করে দেয়। আমি যেসব জিনিস তাদের জন্য হালাল করেছি, শয়তান তা হারাম করে দেয়। অধিকন্তু সে তাদের আমার সঙ্গে এমন বিষয়ে শিরক করার নির্দেশ দেয়, যে বিষয়ে আমি কোনো প্রমাণ পাঠাইনি।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৮৬৫) শয়তানের প্ররোচনায় পড়ে মানুষ অনেক সময় আল্লাহর বিধান ভুলে যায়। সৃষ্টির শুরুতে তাকে যে ইমানি একনিষ্ঠতা ও শুভ্রতা দেওয়া হয়েছিল, তা সে হারিয়ে ফেলে এবং অবাধ্যতার পথে হেঁটে অপরাধের অন্ধকারে শামিল হয়। তবে এই সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক পঙ্কিলতার মধ্যেও যাঁরা নিজেদের চরিত্র ও নৈতিকতা রক্ষা করতে পারেন, তাঁদের জন্য রয়েছে পরকালের পরম সুসংবাদ। এই হাদিসের পরবর্তী অংশে রাসুল (সা.) বেহেশতের স্থায়ী অধিবাসী হবেন—এমন তিন শ্রেণির মানুষের বৈশিষ্ট্যের কথা উল্লেখ করেছেন। এমন ক্ষমতার অধিকারী বা শাসক, যিনি ন্যায়পরায়ণ, দানশীল এবং নেক কাজের তৌফিকপ্রাপ্ত। এমন ব্যক্তি, যিনি অত্যন্ত দয়ালু এবং প্রত্যেক আত্মীয় ও মুসলমানের প্রতি কোমল হৃদয়ের অধিকারী। এমন অভাবী ব্যক্তি, যিনি চরিত্রবা...