ইসলামী জ্ঞান বিজ্ঞানের প্রতিটি শাখায় ইরানিদের অবিশ্বাস্য অবদান
ইসলামী জ্ঞান বিজ্ঞানের প্রতিটি শাখায় ইরানিদের অবিশ্বাস্য অবদান
—ডক্টর ইয়াসির কাদি আমি ইরানের সম্পূর্ণ ইতিহাস নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করতে যাচ্ছি না, তবে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মূল বিষয় অবশ্যই উল্লেখ করবো। আমি চাই সবাই জানুক, সেই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর মধ্যে একটি হলো, ইরানি পাণ্ডিত্য ইসলামকে রূপ দিয়েছিলো। এটি একটি অবিসংবাদিত বক্তব্য। সেই অঞ্চলের ইসলামী চিন্তাবিদগণ ইসলামকে রূপ দিয়েছিলেন। তাঁরা ইসলামী জ্ঞানের প্রতিটি শাখায় অবিশ্বাস্যভাবে অবদান রেখেছেন; আর প্রকৃতপক্ষে, নবিজীর হাদিসেও এই বিষয়টির ইঙ্গিত পাওয়া যায়। এই হাদিসগুলো তিরমিজি, মুস্তাদরাক আল-হাকিম, এবং অন্যান্য গ্রন্থেও পাওয়া যায় যে, রসূল (স) সালমান আল-ফারেসীর সাথে বসে ছিলেন, এবং তিনি বলেছিলেন, [لَوْ أَنَّ العِلْمَ فِي الثُّرَيَّا لَتَنَاوَلَهُ رَجُلٌ أَوْ رِجَالٌ مِنْ أَبْنَاءِ فَارِسَ], অন্য একটি বর্ণনায়, তিনি সালমানের দিকে ইঙ্গিত করে বলেছিলেন, [مِنْ قَوْمِ هَؤُلَاءْ]। “যদি জ্ঞান সবচেয়ে দূরের নক্ষত্রগুলোতেও রাখা হতো, পারস্যের লোকেরা এবং অন্য বর্ণনা মতে, সালমান আল-ফারেসীর লোকেরা গিয়ে সেই জ্ঞান ঠিকই অর্জন করে নিয়ে আসতো”। এই হাদিস তিরমিজিসহ অন্যান্য গ্রন্থে রয়েছে এবং বেশ কিছু মুহাদ্দিস হাদিসটিকে সহিহ বলে উল্লেখ করেছেন। তো, বিষয়টি কেনো এরকম? কারণ পারস্য সভ্যতা ছিলো সবচেয়ে বেশি শিক্ষিত এবং সবচেয়ে বেশি পরিশীলিত। এটি বাইজেন্টাইন সভ্যতাকেও ছাড়িয়ে গিয়েছিলো। আর যখন তারা ইসলাম গ্রহণ করেছিলো, ইসলামের খেদমতে তারা তাদের সেই বুদ্ধিমত্তা নিয়ে হাজির হয়েছিলো এমন অনন্য উপায়ে যে অন্য কোনো সভ্যতার কাছে সেই ধরণের দক্ষতাটুকুই ছিলো না। তাহলে, কোথা থেকে শুরু করা যায়? আল্লাহর শপথ, ইসলামের প্রতি পারস্য সভ্যতার এবং পারস্যের চিন্তাবিদগণের অবদান সম্পর্কে অনায়াসেই অনেকগুলো বক্তব্য দেয়া যেতে পারে। কোথা থেকে শুরু করা যায়? আরবি নিজেই। [يَا أَهْلَ لُغَةِ الْعَرَبْ], হে আরবি ভাষার লোকেরা! কে আপনাদের ভাষা বিধিবদ্ধ আকারে সাজিয়েছে? কে সাজিয়েছে? কে ব্যাকরণের সর্বপ্রথম গ্রন্থ রচনা করেছিলো? সিবাওয়াইহ। আপাদমস্তক একজন ইরানী মানুষ। সিবাওয়াইহ জন্মগ্রহণ করেন পারস্যে, আরবির চেয়ে ফারসি ভালো বলতেন। সেটিই ছিলো তাঁর মাতৃভাষা। তিনি তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘আল-কিতাব’ লিখেন। প্রসঙ্গক্রমে, এটিই এই গ্রন্থের নাম—আল-কিতাব। আর এটিই হলো সর্বপ্রথম লিখিত ব্যাকরণ গ্রন্থ এবং সমস্ত ব্যাকরণ গ্রন্থের জননী। তিনিই সিবাওয়াইহ। হাদিস এর ক্ষেত্রে, হায় আল্লাহ! (মূল আলোচনায় বলেছেন, ও মাই গড) [حَدِّثْ وَلَا حَرَجْ]। মনে হয় যেন মুহাদ্দীসগণের বেশীরভাগই এই ভূমি থেকেই উঠে এসেছেন। ইমাম বুখারী, ইমাম মুসলিম, ইমাম তিরমিজি—তিরমিজ থেকে, ইমাম আন-নাসায়ী, ইমাম ইবনে মাজাহ—কাজউইন থেকে। মনে হয় যেন কেবলমাত্র আবু দাউদ, ইমাম আহমাদ এবং অল্প কয়েকজনই মূলত খাঁটি আরবি বংশোদ্ভূত। বিখ্যাত মুহাদ্দীসগণের ক্ষেত্রে তো এটি সত্য। আপনি যদি এর বাইরেও যেতে চান, আমরা একইভাবে আলোচনা চালিয়ে যেতে পারবো; তাই না? আপনি ফিকহ এর বিশিষ্ট পণ্ডিতদের দিকে লক্ষ করু— আবু হানিফা। [النَّاسُ عِيَالٌ فِي الفِقْهِ عَلَى أَبِي حَنِيفَةَ]। কথিত আছে যে ইমাম শাফেয়ী’ একথা বলেছিলেন, ফিকহ এর ক্ষেত্রে সমস্ত মানুষ আবু হানিফার কাছে ঋণী। আবু হানিফা কে ছিলেন? আরব? তিনি ছিলেন আপাদমস্তক ইরানী। নিজ গৃহে তিনি ফারসিতে কথা বলতেন। আবু হানিফা ছিলেন মহান ফিকাহবিদদের মধ্যে সর্বপ্রথম, আর তিনি আপাদমস্তক ইরানি ছিলেন। তাঁর পরেও আপনি এমন অনেককে পাবেন, আল-জাসসাস এবং অন্যান্যরা যারা ঠিক একই সভ্যতা থেকে এসেছেন। তাফসির এর পণ্ডিতগণ, ইমাম আত-তাবারী; ইমাম আত-তাবারী সেই সভ্যতা থেকেই এসেছেন। যামাখশারীও ছিলেন পারস্য বংশোদ্ভূত। আকাইদ এবং কালামশাস্ত্রের পণ্ডিতগণ, ইমাম জুওয়াইনি, ইমাম গাজ্জালি, তাঁরা আপাদমস্তক ইরানি ছিলেন। ইমাম গাজ্জালি একাদশ শতাব্দীর ইরানের প্রকৃত প্রতিনিধিত্ব করেছেন। এটাই ইরানি ইসলাম। ইমাম গাজ্জালি ইরানের তুজ নামক স্থানে জন্মগ্রহণ করেছিলেন, সেখানেই বেড়ে উঠেছিলেন এবং সেখানেই বাস করেছিলেন। তারপর তাঁর জীবনের একেবারে শেষ পর্যায়ে তিনি নিযামিয়্যাহ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান হয়ে ওঠেন। অন্যথায় তিনি ছিলেন আপাদমস্তক একজন ইরানি। আপনি এরকম আরো অনেক চিন্তাবিদকে খুঁজে পাবেন। আর এই উম্মাহর মাঝে সভ্যতা-সংস্কৃতির ধারক এবং বাহক সেই মহান ও শ্রেষ্ঠ কবিদের কথা ভুলে যাওয়া সম্ভব না। এই কবিগণ আসলেই উম্মাহর মাঝে সভ্যতা এবং সংস্কৃতির একটি মাত্রা যোগ করেছিলেন। ফেরদৌসী এবং তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থটি উল্লেখযোগ্য। তাঁর বইটির নাম বলতে পারবেন? কোনটি? ফেরদৌসীর রচিত সেই শাহনামা। হাফেজের নাম উল্লেখযোগ্য। জালালুদ্দিন আল-রুমির নামও উল্লেখযোগ্য। আপনারা সবাই রুমির কথা শুনেছেন। রুমি ঠিক কোন ভাষায় লেখালেখি করতেন? আরবিতে নয়। রুমি কখনোই আরবি ভাষায় কিছু লেখেননি। হাফেজ কখনোই আরবি ভাষায় কিছু লেখেননি। তাঁরা ফারসি ভাষায় লিখছিলেন। আর সেই কারণেই ফারসির স্থান ছিলো আরবির পরেই। এটি ছিল ইসলামী সভ্যতার দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ ভাষা। আমরা পৃথিবীজুড়ে এর বৈশ্বিক প্রভাব দেখতে পাই, এমনকি ভারতবর্ষেও। সেখানে অভিজাতদের ভাষা ছিলো কোনটি? তা ছিলো ফারসি। আর ঠিক সেই কারণেই এমনকি আল্লামা ইকবালও, অর্থাৎ এক শতাব্দী আগে, তিনি কোন ভাষায় লিখছিলেন? ফারসি ভাষায়। এটিই হলো ইসলামের ওপর পারস্য সভ্যতার অসাধারণ প্রভাব। আমাদের বুঝতে হবে যে, ইসলামের উপর প্রভাব বিস্তারকারী এরকম আর কোনো সভ্যতা নেই, অবশ্যই হিজাজ অঞ্চলের আরব সংস্কৃতির বিষয়টি আলাদা। তবে আরব সভ্যতার পরে, ইরানি সভ্যতা, পারস্য সভ্যতা ইসলামকে অন্য যে কোনো সভ্যতার চেয়ে বেশি প্রভাবিত করেছে এবং উপকৃত করেছে। আমি যে সমস্ত মহান নামগুলো উল্লেখ করেছি তাঁরা সকলেই ছিলেন সুন্নি। রুমি এবং অন্য সকলেই ছিলেন সুন্নি। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত আমাদের মনে এই সম্পর্কে কোনো ধারণাই নেই। আমরা ইরানকে শিয়া মতবাদের সাথে মিলিয়ে ফেলি। এখন, এটি একটি স্পর্শকাতর বিষয়। আমি সাম্প্রদায়িকতা উস্কে দিচ্ছি না। আক্ষরিকভাবেই, আমি এখন কেবল ঐতিহাসিক তথ্যই দিচ্ছি। কোনো রায় দিচ্ছি না। আমি শুধু আপনাদের বলছি কী ঘটেছিলো। দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, সাধারণ মুসলিমরা হতাশাজনকভাবেই জানে না যে ইরান ছিলো সুন্নি ইলম, সুন্নি হাদিস, সুন্নি ফিকহ, সুন্নি তাসাউফ, সুন্নি জ্ঞানের একটি শক্ত ঘাঁটি; শুধু সাম্প্রতিক সময়ে এটি পরিবর্তিত হয়েছে। আর বেশিরভাগ মুসলিম ইরানি বা পারস্য সভ্যতার প্রতি আমাদের ঋণটুকু বুঝতে পারেন না। আমি শুধু আপনাদেরকে কয়েকটি নাম বলেছি মাত্র। এছাড়াও উল্লেখযোগ্য আরো অনেক চিন্তাবিদ রয়েছেন।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন