কদর রাতের প্রস্তুতি ও পরিকল্পনা

 রমজানের শেষ দশ রাত মুসলিমদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও মহিমান্বিত সময়। এই রাতগুলোর যেকোনো একটি হতে পারে লাইলাতুল কদর, যে রাত সম্পর্কে কোরআনে বলা হয়েছে—এটি হাজার মাসের চেয়েও উত্তম।

একজন মুমিনের জন্য এই রাতগুলোকে ইবাদত, জিকির ও দোয়ার মাধ্যমে কাটানো পরম সৌভাগ্যের বিষয়। এই বরকতময় রাতকে সুন্দরভাবে কাজে লাগানোর জন্য কিছু প্রস্তুতি ও করণীয় আমল নিচে দেওয়া হলো:

প্রস্তুতি ও পরিকল্পনা

কদরের রাত ইবাদতে কাটানোর জন্য দিনের বেলায় কিছুটা ঘুমিয়ে নিন। এতে রাত জেগে ইবাদত করার শক্তি পাবেন। মাগরিবের পর থেকে সময়গুলো যেন পুরোপুরি ইবাদতে ব্যয় করতে পারেন, সে জন্য প্রয়োজনীয় কাজগুলো আগেই সেরে রাখুন।

ইফতার ও মাগরিব: সূর্যাস্তের সঙ্গে সঙ্গেই সুন্নাহ অনুযায়ী ইফতার করুন। অতিরিক্ত ইফতার না খেয়ে পুষ্টিকর খাবার খান, যেন ক্লান্তিতে ঘুম না আসে। মাগরিবের নামাজ খুশু-খুজুর সঙ্গে দীর্ঘ রুকু ও সিজদার মাধ্যমে আদায় করুন। নামাজের পর নির্ধারিত জিকিরগুলো (সুবহানাল্লাহ ৩৩ বার, আলহামদুলিল্লাহ ৩৩ বার, আল্লাহু আকবার ৩৩ বার) সম্পন্ন করুন।

সাইয়্যিদুল ইস্তিগফার: সন্ধ্যার দোয়া ও জিকিরগুলো মনোযোগ দিয়ে পড়ুন। বিশেষ করে তওবার শ্রেষ্ঠ দোয়া ‘সাইয়্যিদুল ইস্তিগফার’ পড়তে ভুলবেন না।

সতর্কতা: মাগরিবের পর থেকে অহেতুক সোশ্যাল মিডিয়া, টিভি বা মোবাইল স্ক্রিনে সময় কাটানো থেকে বিরত থাকুন। রাগারাগি, গিবত বা পরনিন্দার মতো গুনাহ থেকে নিজেকে দূরে রাখুন, কারণ এগুলো ইবাদতের বরকত নষ্ট করে দেয়।

ইশা, তারাবি ও ইতিকাফ

ইশা ও তারাবিহর নামাজ জামাতে আদায় করার চেষ্টা করুন। কারণ ইমামের সঙ্গে পুরো নামাজ পড়লে সারা রাত নামাজ পড়ার সওয়াব পাওয়া যায়। তারাবিহ নামাজ ধীরে ধীরে ও মনোযোগের সঙ্গে পড়ুন এবং সিজদায় দোয়া করুন।

সম্ভব হলে ইতিকাফ করুন, যা নবীজি (সা.) নিয়মিত করতেন।

কোরআন তেলাওয়াত

লাইলাতুল কদর কোরআন নাজিলের রাত। তাই এই রাতে যত বেশি সম্ভব কোরআন তিলাওয়াত করুন। বিশেষ করে সুরা ইখলাস, সুরা কাফিরুন, সুরা মুলক এবং সুরা বাকারার শেষ দুই আয়াত তেলাওয়াত করার বিশেষ ফজিলত রয়েছে।

সুরা ইখলাস পাঠ কোরআনের এক-তৃতীয়াংশ পাঠের সমতুল্য।

জিকির ও তওবা

এই রাতে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য বেশি বেশি জিকির করুন। ‘সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহি, সুবহানাল্লাহিল আজিম’ এবং ‘লা হাওলা ওয়া লা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ’ অধিক ফজিলতপূর্ণ জিকির।

এছাড়া আন্তরিকভাবে তওবার নিয়তে দুই রাকাত নফল নামাজ পড়ে আল্লাহর কাছে সারাজীবনের গুনাহর জন্য ক্ষমা চান। জিকিরের সময় ‘লা ইলাহা ইল্লা আনতা সুবহানাকা ইন্নি কুনতু মিনাজ জোয়ালিমিন’ দোয়াটি বেশি পড়তে পারেন।

দরুদ ও বিশেষ দোয়া

একবার দরুদ পড়লে আল্লাহ দশবার রহমত বর্ষণ করেন। লাইলাতুল কদরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দোয়া হলো: ‘আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুউন তুহিব্বুল আফওয়া ফাফু আন্নি’ (হে আল্লাহ, আপনি ক্ষমাশীল, ক্ষমা করতে ভালোবাসেন; তাই আমাকে ক্ষমা করুন)।

জান্নাত লাভের জন্য ‘আল্লাহুম্মা ইন্নি আসআলুকাল জান্নাতা ওয়া আউজু বিকা মিনান্নার’ দোয়াটি পড়ুন।

সদকা ও শেষ রাত

রমজানের শেষ দশ রাতে দান-সদকার ফজিলত অনেক। যদি রাতটি লাইলাতুল কদর হয়, তবে সেই দানের সওয়াব হবে হাজার মাসের দানের চেয়ে বেশি।

রাতের শেষাংশে উঠে তাহাজ্জুদ নামাজ পড়ুন এবং সিজদায় দীর্ঘ সময় ধরে নিজের ও মুসলিম উম্মাহর কল্যাণে দোয়া করুন। কদরের রাতে আগামী এক বছরের ভাগ্য নির্ধারিত হয়, তাই নিজের নেক ইচ্ছাগুলো আল্লাহর কাছে আকুলভাবে চান।

নারীদের বিশেষ সময়

পিরিয়ড বা বিশেষ শারীরিক অবস্থার কারণে যেসব নারী নামাজ পড়তে পারেন না, তাঁরা মন খারাপ করবেন না। তাঁরা নামাজ ও কোরআন স্পর্শ করা ছাড়া অন্য সব আমলই করতে পারবেন।

জিকির, দোয়া, দরুদ, ইস্তিগফার ও সাদাকা দেওয়ার মাধ্যমে তাঁরাও লাইলাতুল কদরের পূর্ণ বরকত লাভ করতে পারেন ইনশাআল্লাহ।

সাহ্‌রি ও ইস্তিগফার

অল্প হলেও সাহরি খান, কারণ এটি সুন্নাহ ও বরকতময়। সাহরির শেষে ফজরের আগে নিরিবিলিতে বেশি বেশি ইস্তিগফার করুন। সুফিয়ান আস-সাওরি (রহ.)-এর মতে, লাইলাতুল কদরের রাতে দোয়া করা নফল সালাত আদায়ের চেয়েও বেশি প্রিয় হতে পারে। (ইবনে রজব আল-হাম্বলি, লাতায়িফুল মাআরিফ)

শেষ কথা

কাজের ব্যস্ততা বা অসুস্থতার কারণে বেশি আমল করতে না পারলেও হতাশ হবেন না। আমাদের দয়ালু রব বান্দার নিয়ত ও আন্তরিকতা অনুযায়ী প্রতিদান দেন।

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা আমাদের সবাইকে কদরের সৌভাগ্যের রাত পাওয়ার এবং কবুলযোগ্য ইবাদতে তা পূর্ণ করার সামর্থ্য দান করুন।

writerismat@gmail.com

ইসমত আরা: শিক্ষক ও লেখক

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

দিরিলিসের আরতুগ্রুলের সকল পর্ব কিভাবে দেখবেন?

নিশ্চয়ই কষ্টের সাথেই স্বস্তি আছে

ড. খন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর বই Pdf Download