ধৈর্যের সংস্কৃতি কেন হারিয়ে গেলো
একটি সুন্দর সমাজ গঠনে একে অপরের প্রতি দয়া, সম্মান ও সহনশীলতা অপরিহার্য। অন্যের দোষ খোঁজা, তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা বা ভার্চুয়াল মাধ্যমে অপপ্রচার চালানো ইসলামি সংস্কৃতির পরিপন্থী। ইসলামের শিক্ষা হলো—নিজে কষ্ট দেওয়া থেকে বিরত থাকা এবং অন্য কেউ কষ্ট দিলে তা ধৈর্যের সঙ্গে মোকাবিলা করা।
আমরা যদি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে প্রাত্যহিক জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে এই নীতি অনুসরণ করি, তবেই সমাজে প্রকৃত শান্তি ফিরে আসবে।
অনেক সময় দেখা যায় মানুষ নিয়মিত নামাজ পড়ে, রোজা রাখে কিন্তু প্রতিবেশীর সঙ্গে তার আচরণ অত্যন্ত রূঢ়। আল্লাহর রাসুলের সামনে একবার এক নারীর কথা উল্লেখ করা হলো, যে প্রচুর নামাজ, রোজা ও সাদাকাহ করত কিন্তু জিহ্বা দিয়ে প্রতিবেশীদের কষ্ট দিত।
নবীজি (সা.) সাফ জানিয়ে দিলেন, “সে দোজখী।” আবার আরেক নারীর কথা বলা হলো যে কেবল ফরজ ইবাদতগুলোই পালন করত কিন্তু কাউকে কষ্ট দিত না; নবীজি (সা.) বললেন, “সে বেহেশতি।” (মুসনাদে আহমদ, হাদিস: ৯৬৭৫)এই ঘটনাটি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, সামাজিক নৈতিকতা ও মানুষের অধিকার (হাক্কুল ইবাদ) রক্ষা করা ইবাদতের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
ইসলাম কেবল অন্যকে কষ্ট দিতে নিষেধ করেনি, বরং অন্যের দেওয়া কষ্ট নীরবে সহ্য করার প্রতিও উদ্বুদ্ধ করেছে। একে বলা হয় ‘ইহতিমাল আল-আযা’। সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ইবাদত করার চেয়ে মানুষের সঙ্গে মিশে তাদের দেওয়া কষ্ট সহ্য করা অধিক সওয়াবের কাজ।
হাদিসে এসেছে, “যে মুমিন মানুষের সঙ্গে মিশে থাকে এবং তাদের দেওয়া কষ্টে ধৈর্য ধারণ করে, সে ওই মুমিনের চেয়ে উত্তম যে মানুষের সঙ্গে মেলামেশা করে না এবং তাদের দেওয়া কষ্টে ধৈর্যও ধরে না।” (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ৪০৩২)
এই ধৈর্যের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা দিতে হয় নিকটাত্মীয় ও বাবা-মায়ের ক্ষেত্রে। অনেক সময় বার্ধক্য বা মেজাজের কারণে বাবা-মা কর্কশ আচরণ করতে পারেন। সেক্ষেত্রেও ইসলাম অত্যন্ত ধৈর্যের সঙ্গে তা মোকাবেলা করতে বলেছে।
মানুষের ক্ষতি করা থেকে বিরত থাকো, এটিও তোমার নিজের জন্য একটি সদকা (দান) হিসেবে গণ্য হবে।সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৫১৮; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৮৪
আল্লাহ তাআলা বলেন, “আর যে ক্ষমা করল এবং আপস-মীমাংসা করল, তার পুরস্কার আল্লাহর কাছে রয়েছে” (সুরা শুরা, আয়াত: ৪০)। মুমিনের বৈশিষ্ট্য হলো তারা ক্রোধ সংবরণ করে এবং মানুষকে ক্ষমা করে। (সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৩৪)
বর্তমানে ফেসবুক বা ইউটিউবে অন্যের দোষ খুঁজে বের করাকে বীরত্ব মনে করা হয়, অথচ এটি মূলত ইমানের দুর্বলতার লক্ষণ। অন্যকে কষ্ট না দেওয়াও যে একটি বড় ‘সাদাকাহ’ হতে পারে, তা আমরা হজরত আবু যার (রা.)-এর হাদিস থেকে জানতে পারি।
তিনি যখন নবীজিকে জিজ্ঞেস করলেন, যদি আমি কোনো দান-খয়রাত করতে না পারি তবে কী করব? নবীজি (সা.) উত্তর দিলেন, “মানুষের ক্ষতি করা থেকে বিরত থাকো, এটিও তোমার নিজের জন্য একটি সদকা (দান) হিসেবে গণ্য হবে।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৫১৮; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৮৪)
মনে রাখতে হবে, আমরা মানুষের সঙ্গে যেমন আচরণ করব, আল্লাহ তাআলাও আমাদের সঙ্গে তেমন আচরণ করবেন। আমরা যদি মানুষের ভুলগুলো ক্ষমা করি ও তাদের ইজ্জত রক্ষা করি, তবে কেয়ামতের দিন আল্লাহ আমাদের অপরাধসমূহ গোপন রাখবেন ও ক্ষমা করবেন। আল্লাহ আমাদের উত্তম আচরণের অধিকারী হওয়ার তৌফিক দান করুন। (সুরা হুজরাত, আয়াত: ১১-১২)

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন