স্নেহময়ী মাতৃক্রোড়ে, নীড়ে ফেরা
‘তিনি (হালিমা) বললেন, “আমি তোমার জন্য আল্লাহর নিকট আশ্রয় চাই!”
তারপর তিনি একটি উট প্রস্তুত করেন। সওয়ারির ওপর আমাকে সামনে বসিয়ে তিনি বসেন পেছনে। পরিশেষে আমরা আমার মায়ের নিকট পৌঁছালাম। তিনি (হালিমা) বললেন, “আমার ওপর অর্পিত দায়দায়িত্ব আমি নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করেছি।” তারপর তিনি আমার ঘটনা সম্পর্কে আমার মাকে অবহিত করেন।’
ঘটনাটির সংক্ষিপ্ত বর্ণনা আনাস (রা.) থেকে শুনে নেওয়া যাক—
আল্লাহর রাসুল (সা.)-এর কাছে জিবরাইল (আ.) এলেন, তখন তিনি শিশুদের সঙ্গে খেলছিলেন। তিনি তাঁকে ধরে শোয়ালেন এবং বক্ষ বিদীর্ণ করে তাঁর হৎপিণ্ডটি বের করে আনলেন।
তারপর তিনি তাঁর বক্ষ থেকে একটি রক্তপিণ্ড বের করলেন এবং বললেন, এ অংশটি শয়তানের। এরপর হৎপিণ্ডটিকে একটি স্বর্ণের পাত্রে রেখে জমজমের পানি দিয়ে ধৌত করলেন এবং তার অংশগুলো জড়ো করে আবার তা যথাস্থানে পুনঃস্থাপন করলেন।
তখন ওই শিশুরা দৌড়ে তাঁর দুধমায়ের কাছে গেল এবং বলল, মুহাম্মদকে হত্যা করা হয়েছে। কথাটি শুনে সবাই সেদিকে এগিয়ে গিয়ে দেখল তিনি ভয়ে বিবর্ণ হয়ে আছেন! আনাস (রা.) বলেন, ‘আমি আল্লাহর রাসুল (সা.)-এর বক্ষে সে সেলাইয়ের চিহ্ন দেখেছি।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৩১০)
নবীজি (সা.) কত বছর হালিমার (রা.) গৃহে ছিলেন, সে বিষয়ে সিরাতকারগণের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। (শিবলি নোমানি)
ইবনে ইসহাক অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে ছয় বছরের কথা উল্লেখ করেছেন। (ইবনে হিশাম)
এটি নিশ্চিত করে বলা যায় যে দুই বছরের দুগ্ধপানের পর হালিমা (রা.) নবীজিকে নিয়ে মক্কায় মায়ের নিকট এসেছিলেন। মক্কায় তখন মহামারি দেখা দেওয়ার বিষয়টা সবাই উল্লেখ করেছেন। উপরন্তু হালিমার পরিবার চাচ্ছিল নবীজি (সা.) আরও কিছুকাল তাদের পরিবারের বরকত হয়ে থাকুন। ফলে নবীজিকে মক্কা থেকে ‘বাওয়াদিউ আয-যুআইবাত’ পথে আরেকবার পাড়ি দিতে হয়।
প্রশ্ন হচ্ছে, ঠিক কতকাল পর ‘বক্ষ উন্মুক্তকরণ’–এর ঘটনা ঘটে?
ইতিপূর্বে হালিমার (রা.) যে বর্ণনা আমরা ‘আল-মাতালিব আল-উলয়া’ থেকে উদ্ধৃত করেছি, তাতে দ্বিতীয় দফায় ‘বা-দিআতু হালিমা আস-সাআদিয়া’ আসার তিন-চার মাস পর উল্লেখ আছে। এতে নবীজি (সা.)–এর বনু সাদের অবস্থান সর্বসাকল্যে দুই বছর তিন বা চার মাস!
সম্ভবত এ বর্ণনায় দ্বিতীয় দফার দুই বছর তিন-চার মাসের স্থলে শুধু তিন-চার মাস হয়ে গেছে। সফিউর রহমান মোবারকপুরীর মতে, দ্বিতীয় দফায় বনু সা’আদ গোত্রে অবস্থানকালে জন্মের চতুর্থ কিংবা পঞ্চম বছরে তাঁর বক্ষবিদারণের ঘটনাটি ঘটেঅ (আর-রাহিকুল মাখতুম)আর বক্ষ উন্মুক্তকরণের পরিপ্রেক্ষিতে ভীত হয়ে নবীজি (সা.)–কে মক্কায় নিয়ে আসেন হালিমা (রা.)।
ইবনে ইসহাক বলেন, শিশু মুহাম্মাদকে তাঁর মায়ের নিকট ফিরিয়ে দেওয়ার কারণ হিসেবে কোনো কোনো আলেম আমাকে এ কথা বলেছেন যে দুধ ছাড়ার বয়স হওয়ার পর দ্বিতীয়বার যখন হালিমা (রা.) নবীজিকে নিয়ে যান তখন হাবশার খ্রিষ্টধর্মাবলম্বী কিছু লোক তাঁকে দেখে তাঁর পরিচয় জানতে চায় এবং তাঁকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে।
তারপর তারা তাঁকে তাদের দেশে, তাদের রাজার নিকট নিয়ে যেতে চায়। তারা বলে, ‘এই শিশু ভবিষ্যতে বড় কিছু করবে। আমরা তার মধ্যে সেসবের লক্ষণ দেখতে পাচ্ছি।’ হালিমা ভয় পেলেন, তারা হয়তো তাঁকে চুরি করে নিয়ে যেতে পারে। তাই তিনি তাঁর মায়ের নিকট ফিরিয়ে দেন। (সিরাতু ইবনে হিশাম, ১/১৬৭)
হে পাঠক, দুঃখের বিষয়, স্কটিশ প্রাচ্যবিদ উইলিয়াম মুর (১৮১৯-১৯০৫) তাঁর লিখিত ‘নবীজীবনী’ (Mohamed, ১৮৬১) গ্রন্থে বক্ষবিদারণের এ ঘটনাটিকে মূর্ছা (এপিলেপসি) রোগের ফল বলেছেন। শৈশব থেকেই এ রোগগ্রস্ত হওয়ার কারণে তিনি মাঝেমধ্যে অজ্ঞান হয়ে পড়তেন। অতঃপর সেই বিকারের মধ্যে তিনি মনে করতেন যে আল্লাহর নিকট থেকে তিনি বাণী প্রাপ্ত হয়েছেন (মাআযাল্লাহ)। (মোস্তফা চরিত)
জার্মান প্রাচ্যবিদ ড. স্প্রেঙ্গার (১৮১৩-১৮৯৩) আরেকটি অদ্ভুত তথ্য পেশ করেছেন যে অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় বিবি আমেনার কণ্ঠদেশে ও বাহুতে এক খণ্ড লোহা ঝোলানো ছিল। এর দ্বারা তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যে তিনি মৃগীরোগী ছিলেন। (মোস্তফা চরিত)
উইলিয়াম মুর মুহাম্মাদ (সা.)–কে চঞ্চলমতি প্রমাণ করার জন্য একটি ঘটনা বর্ণনা করেছেন, ‘পাঁচ বছর বয়সে মায়ের নিকট রেখে যাওয়ার জন্য হালিমা তাকে নিয়ে মক্কায় আসছিলেন। কাছাকাছি আসার পর বালকটি হঠাৎ হালিমার সঙ্গছাড়া হয়ে উধাও হয়ে যায়। তখন আবদুল মুত্তালিব তার কোনো ছেলেকে পাঠিয়ে দেখেন যে বালকটি এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়াচ্ছে। তারপর তিনি তাকে তার মায়ের কাছে নিয়ে যান।’কেবল মুর নন, ব্রিটিশ প্রাচ্যবিদ স্যামুয়েল মার্গোলিয়থ (১৮৫৮-১৯৪০) লিখেছেন, ‘পিতৃহীন এই বালকের অবস্থা মোটেও প্রীতিকর ছিল না। মুহাম্মদের শেষ বয়সে তাঁর চাচা হামজা (মাতাল অবস্থায়) তাঁকে নিজ পিতার দাস বলে বিদ্রুপ করেছিলেন।’ (মোস্তফা চরিত)
অথচ মূল বিষয়টি একটি বর্ণনায় পাওয়া যায় যে হালিমা যখন শিশু নবীজি (সা.)–কে শেষবারের মতো তাঁর মায়ের নিকট নিয়ে আসছিলেন তখন মক্কার উঁচু ভূমিতে পৌঁছার পর তাঁকে হারিয়ে ফেলেন। পরে ওয়ারাকা ইবন নওফেল ও কোরাইশ গোত্রের অন্য এক ব্যক্তি তাঁকে পান।
তাঁরা দুজন তাঁকে নিয়ে আবদুল মোত্তালিবের নিকট এসে বলেন, ‘এই আপনার ছেলে। আমরা তাকে মক্কার উঁচু ভূমিতে এদিক–ওদিক ঘোরাঘুরি করতে দেখলাম। আমরা তার পরিচয় জিজ্ঞেস করলে সে বলে, “আমি মুহাম্মাদ ইবন আবদিল্লাহ ইবন আবদিল মুত্তালিব।” তাই আপনার কাছে নিয়ে এসেছি।’ (ইবনে কাসির, আস-সিরাহ, ১/১৫)
তারপর আবদুল মোত্তালিব তাঁকে কাঁধে তুলে একটি কবিতা আবৃত্তি করতে করতে কাবা তাওয়াফ করেন। (সিরাতে ইবনে হিশাম, ১/১৬৭)
মাওলানা আকরম খাঁ (১৮৬৮-১৯৬৮) বলেন, ‘এই শ্রেণির বিদ্বেষ-বিষ জর্জরিত অসাধু লোকদিগের কথার প্রতিবাদ করিয়া শ্রম ও সময়ের অপব্যয় করা উচিৎ নহে।’ (মোস্তফা চরিত, ঢাকা: ঝিনুক পুস্তিকা, ১৯৭৫, পৃ. ২৫০)
পাঠক, এ ধরনের কথা যখনই আপনার সামনে এসে পড়ে, তখন পবিত্র কোরআনের ‘সুরা আল-ইনশিরাহ’র অর্থের দিকে লক্ষ রেখে শেষ পর্যন্ত পাঠ করুন। শেষ আয়াতে রাব্বে কারিম একমাত্র তাঁর দিকেই মনোযোগী হতে আদেশ করেছেন। সুতরাং রবের দিকে মনোযোগী হোন।
‘আমি কি আপনার বক্ষ আপনার কল্যাণে প্রশস্ত করে দিইনি? আর আমি অপসারণ করেছি আপনার ভার, যা আপনার পিঠ ভেঙে দিচ্ছিল। আর আমি আপনার খ্যাতিকে সমুচ্চ করেছি। সুতরাং কষ্টের সঙ্গেই তো স্বস্তি আছে, নিশ্চয় কষ্টের সঙ্গেই স্বস্তি আছে। অতএব আপনি যখনই অবসর পান তখনই কঠোর ইবাদাতে রত হোন। আর আপনার রবের প্রতি গভীর মনোযোগী হোন।’ (সুরা ইনশিরাহ, আয়াত: ১-৮)
ড. মুহাম্মদ তাজাম্মুল হক : অধ্যাপক, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন