সাফল্য সংহত করতে চাই সহনশীলতা ও সহিষ্ণুতা
মানবজীবনে সাফল্য অর্জন যত কঠিন, তার চেয়েও কঠিন সেই সাফল্যকে সংহত ও স্থায়ী করা। সাময়িক অর্জন অনেকেই করতে পারে; কিন্তু চরিত্রের দৃঢ়তা, আত্মসংযম এবং নৈতিক উৎকর্ষ ছাড়া সেই সাফল্য টেকে না। এ কারণেই ইসলাম মানব চরিত্রের পরিশুদ্ধি ও উৎকর্ষকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছে।
নবী-রাসুল প্রেরণের মূল লক্ষ্যই ছিল মানব চরিত্রকে উন্নত করা। সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ নবী মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন প্রেরণ করেছেন মানবতার উৎকর্ষের পূর্ণতা প্রদানের জন্য। তিনি নিজেই ঘোষণা করেছেন, ‘আমাকে পাঠানো হয়েছে সুন্দর চরিত্রের পূর্ণতা প্রদানের জন্য।’ (মুসলিম, তিরমিজি)। আল্লাহ–তাআলা তাঁর সম্পর্কে বলেন, ‘(হে মুহাম্মাদ সা.!) নিশ্চয় আপনি মহান চরিত্রে অধিষ্ঠিত।’ (সুরা-৬৮ কলম, আয়াত: ৪) অর্থাৎ চরিত্রই সাফল্যের ভিত্তি আর সহনশীলতা ও সহিষ্ণুতা তার প্রধান স্তম্ভ।
ধৈর্যের আরবি শব্দ ‘সবর’, আর সহিষ্ণুতার আরবি ‘হিলম’। এ দুই শব্দের মধ্যে সূক্ষ্ম পার্থক্য রয়েছে। সাধারণভাবে ‘সবর’ হলো প্রতিকূল অবস্থায় নিজেকে সংযত রাখা—কখনো অসহায়ত্বের কারণে প্রতিক্রিয়া না করা। আর ‘হিলম’ হলো শক্তি-সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও প্রতিশোধ না নেওয়া, সংযম প্রদর্শন করা। এ অর্থে হিলম সবরের চেয়ে উচ্চতর গুণ। তবে উভয় শব্দ কখনো কখনো অভিন্ন অর্থেও ব্যবহৃত হয়।
সাফল্য সংহত করতে চাইলে কেবল দক্ষতা বা কৌশল যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন নৈতিক শক্তি। সহনশীলতা আমাদের টিকিয়ে রাখে, সহিষ্ণুতা আমাদের উন্নত করে। এই দুই গুণের সমন্বয়েই সাফল্য হয় স্থায়ী, মর্যাদাপূর্ণ এবং সর্বোপরি আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উপায়।
সাফল্যের পথে বাধা আসবেই। ভয়, ক্ষুধা, সম্পদের ক্ষতি, জীবনহানি কিংবা ফসলের ক্ষয়—বিভিন্নভাবে মানুষকে পরীক্ষা করা হবে। আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘আমি তোমাদের অবশ্যই পরীক্ষা করব কিছু ভয়, ক্ষুধা এবং ধনসম্পদ, জীবন ও ফল-ফসলের ক্ষতি দ্বারা। তুমি সুসংবাদ দাও ধৈর্যশীলদের, যারা বিপদে বলে, “ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।”’ (সুরা-২ বাকারা, আয়াত: ১৫৫-১৫৭)
ধৈর্য কেবল কষ্ট সহ্য করা নয়; এটি সাফল্যের নিয়ামক শক্তি। মহান আল্লাহ বলেন, ‘মহাকালের শপথ! মানুষ অবশ্যই ক্ষতিগ্রস্ত; কিন্তু তারা নয়, যারা ইমান আনে, সৎকর্ম করে এবং পরস্পরকে সত্য ও ধৈর্যের উপদেশ দেয়।’ (সুরা-১০৩ আসর, আয়াত: ১-৩) অর্থাৎ ব্যক্তি ও সমাজ—উভয় পর্যায়ে সাফল্য টিকিয়ে রাখতে সত্যনিষ্ঠা ও ধৈর্যের চর্চা অপরিহার্য।
আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘হে ইমানদারগণ! তোমরা ধৈর্য ধারণ করো, ধৈর্যের প্রতিযোগিতা করো এবং সুসম্পর্ক স্থাপনে আত্মনিয়ন্ত্রণের সংগ্রামে অবিচল থাকো, আল্লাহকে ভয় করো, যাতে তোমরা সফল হতে পারো।’ (সুরা-৩ আলে ইমরান, আয়াত: ২০০)
ইসলাম ধৈর্যকে তিন ভাগে ব্যাখ্যা করেছে: ১. সবর আনিল মাসিয়াত—পাপ ও অন্যায় থেকে বিরত থাকা। ২. সবর আলাত তাআত—ইবাদত ও আনুগত্যে অবিচল থাকা, কষ্ট স্বীকার করা। ৩. সবর আলাল মুসিবাত—বিপদে অধীর না হওয়া। (তাফসিরে বায়যাবি)
মানব সৃষ্টির পূর্বেই আল্লাহ–তাআলা ফেরেশতাদের বলেছিলেন, ‘আমি দুনিয়াতে খলিফা স্থলাভিষিক্ত করব।’ ফেরেশতারা বলেছিল, ‘আপনি কি সেখানে এমন কাউকে স্থাপন করবেন, যারা ফ্যাসাদ করবে ও রক্তপাত ঘটাবে?’ আল্লাহ বললেন, ‘আমি জানি যা তোমরা জানো না।’ (সুরা-২ বাকারা, আয়াত: ৩০)
এই আয়াত আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—মানুষের ভেতরে যেমন প্রবৃত্তির টান আছে, তেমনি আছে আত্মসংযম ও উন্নতির সম্ভাবনাও।
সুতরাং সাফল্য কেবল বাহ্যিক অর্জনের নাম নয়; এটি চরিত্রের পরিপক্বতার ফসল। অর্থ, পদ, খ্যাতি বা নির্বাচনে জিতে ক্ষমতা অর্জন করাই প্রকৃত সাফল্য নয়—বরং সেই অর্জনের ভেতরে নৈতিক দৃঢ়তা, আত্মসংযম ও আল্লাহভীতি আছে কি না, সেটিই মূল প্রশ্ন। বাহ্যিক সাফল্য মানুষকে আলোচনায় আনে, কিন্তু অন্তর্গত চরিত্রই তাকে সম্মানিত করে। চরিত্রহীন সাফল্য অস্থায়ী; সামান্য ঝড়েই তা ভেঙে পড়ে। কিন্তু সহনশীলতা ও সহিষ্ণুতার ভিত্তিতে গড়া সাফল্য সময়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়।
অন্যদিকে সহিষ্ণুতা মানুষকে নৈতিক উচ্চতায় উন্নীত করে। শক্তি থাকা সত্ত্বেও প্রতিশোধ না নেওয়া, ক্ষমা করা, ক্রোধ দমন করা—এসবই সহিষ্ণুতার পরিচয়।
অতএব সাফল্য সংহত করতে চাইলে কেবল দক্ষতা বা কৌশল যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন নৈতিক শক্তি। সহনশীলতা আমাদের টিকিয়ে রাখে, সহিষ্ণুতা আমাদের উন্নত করে। এই দুই গুণের সমন্বয়েই সাফল্য হয় স্থায়ী, মর্যাদাপূর্ণ এবং সর্বোপরি আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উপায়।
অধ্যক্ষ মুফতি মাওলানা শাঈখ মুহাম্মাদ উছমান গনী
সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব, বাংলাদেশ জাতীয় ইমাম সমিতি; সহকারী অধ্যাপক, আহ্ছানিয়া ইনস্টিটিউট অব সুফিজম
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন