প্রাণীর অধিকারে ইসলামের দর্শন

 আল্লাহ যত জীব সৃষ্টি করেছেন, ইসলাম তাদের প্রত্যেকের জন্য নির্দিষ্ট অধিকার নির্ধারণ করে দিয়েছে। 

ইসলাম অধিকারের বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেয়; কারণ এগুলো হলো ‘আমানত’, যা তার প্রাপকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন। এর অর্থ হলো, মানুষ তার প্রতিটি কাজের জন্য দায়বদ্ধ, চাই সেই কাজটি আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্কিত হোক, কিংবা মানুষ অথবা প্রকৃতির (জড় পদার্থ, উদ্ভিদ ও প্রাণী) সঙ্গে সম্পর্কিত হোক।

প্রাকৃতিক পরিবেশের অধিকার (যার মধ্যে রয়েছে নদী-নালা, সাগর, উপত্যকা, পাহাড়, সজীব ফসল ও মনোরম বাগান এবং উপকারী ও সুন্দর প্রাণিকুল) হলো, এগুলোর সংরক্ষণ করা এবং এগুলোকে ধ্বংস বা নষ্ট না করা। ফসল এবং পশুপাখি ধ্বংস করা হলো ফাসাদ বা বিপর্যয়ের নিকৃষ্টতম রূপ, যা আল্লাহ–তাআলা ঘৃণা করেন।

রাসুল (সা.) প্রত্যেক মানুষকে এই আহ্বান জানিয়েছেন যেন তারা পৃথিবীকে সবুজ ও সুন্দর করার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করে, এমনকি চরম সংকটের মুহূর্তেও।

তিনি বলেছেন, “যদি কেয়ামত শুরু হওয়ার উপক্রম হয় এবং তোমাদের কারো হাতে একটি গাছের চারা থাকে, তবে সে যেন সম্ভব হলে চারাটি রোপণ করে দেয়।” (বুখারি, আল-আদাবুল মুফরাদ, হাদিস: ৪৭৯)এমনকি মানুষের লাগানো ফসল বা গাছের ফল যদি কোনো মানুষ, পশু বা পাখি খায়, তবে তার জন্য ওই ব্যক্তি সওয়াব পাবে। রাসুল (সা.) বলেছেন, “কোনো মুসলমান যদি কোনো গাছ লাগায় আর তা থেকে কোনো মানুষ, চতুষ্পদ জন্তু বা পাখি খায়, তবে কেয়ামত পর্যন্ত তা তার জন্য সদকা হিসেবে গণ্য হবে।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৫৫২)

পবিত্র কোরআন এমন অনেক আয়াতে ভরপুর যা মানুষের অন্তরে প্রকৃতির সৌন্দর্যের বোধ জাগিয়ে তোলে এবং এই সৌন্দর্যকে মানুষের ওপর আল্লাহর শ্রেষ্ঠ নেয়ামত হিসেবে গণ্য করতে উদ্বুদ্ধ করে। তাই গাছপালা ও সুন্দর ফলমূলসহ এই প্রাকৃতিক পরিবেশের অধিকার হলো, আমরা যেন এগুলো রক্ষা করি, এবং নষ্ট না করি।

প্রাণী অধিকারের বিষয়ে ইসলামের একটি নিজস্ব ও স্বতন্ত্র দর্শন রয়েছে।

ইসলামের একটি সাধারণ মূলনীতি হলো, সকল সৃষ্টির প্রতি কোমলতা ও দয়া প্রদর্শন করা। এই প্রসঙ্গে বর্ণিত আয়েশা (রা.)-এর হাদিসটিই যথেষ্ট, যেখানে বলা হয়েছে, “নিশ্চয়ই আল্লাহ দয়ালু এবং তিনি প্রতিটি কাজে কোমলতা পছন্দ করেন।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬০২৪)

অন্য একটি বর্ণনায় এসেছে, “আল্লাহ অত্যন্ত দয়ালু এবং তিনি কোমলতা বা নম্রতাকে ভালোবাসেন। তিনি নম্রতার বিনিময়ে যা দান করেন, কঠোরতা বা অন্য কিছুর বিনিময়ে তা দান করেন না।” (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৪৮০৭)

এমন অসংখ্য হাদিস রয়েছে যা প্রমাণ করে যে, ‘নম্রতা’ বা ‘দয়া’ হলো ইসলামের একটি অন্যতম ভিত্তি, যার ওপর পুরো ইসলামি শরিয়তের আইন ও উৎসগুলো প্রতিষ্ঠিত।

ইসলামে প্রাণী অধিকারের মূল চাবিকাঠি হলো নিঃশর্ত দয়া ও মমতা, এবং কিছু বিশেষ প্রাণীর ক্ষেত্রে সম্মান ও মর্যাদা। ইসলাম মানুষের জীবনে কিছু প্রাণীর গুরুত্বের দিকে বিশেষ নজর দিয়েছে, তাদের প্রশংসা করেছে এবং মুসলমানদের নির্দেশ দিয়েছে তাদের প্রতি সদয় হতে। 

যেমন, রাসুল (সা.) বলেছেন, “ঘোড়ার কপালে কেয়ামত পর্যন্ত কল্যাণ লিখে দেওয়া হয়েছে।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৮৫২; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৮৭৩)

ইবনে ইদ্রিস কর্তৃক বর্ণিত অন্য একটি রেওয়ায়েতে এসেছে, “উট তার মালিকের জন্য সম্মানের উৎস এবং ছাগল হলো বরকত।” (আরিজাতুল আহওয়াজি, ৪/১২০)এমনকি ক্ষুদ্র প্রাণীর ক্ষেত্রেও রাসুল (সা.) সচেতন থাকতে বলেছেন। যেমন, রাসুল (সা.) বলেছেন, “তোমরা মোরগকে গালি দিও না; কারণ সে নামাজের জন্য মানুষকে জাগিয়ে দেয়।” (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ২১৬৭৯)

প্রাণীর প্রতি দয়া করা এবং তাদের অধিকার আদায় করা ইসলামের এমন এক ইবাদত, যা কখনো কখনো মানুষকে সর্বোচ্চ মর্যাদায় পৌঁছে দেয় এবং মাগফিরাত বা ক্ষমা লাভের শক্তিশালী কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ঠিক একইভাবে, প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুরতা এমন এক গুনাহ যা মানুষকে অপরাধ ও আজাবের অতল গহ্বরে নিয়ে যায়।

যেমন, একজন পাপাচারী নারীকে আল্লাহ কেবল এ কারণে ক্ষমা করে দিয়েছিলেন যে, সে তৃষ্ণায় কাতর একটি কুকুরকে পানি পান করিয়েছিল। অন্যদিকে, একটি বিড়ালকে আটকে রেখে খাবার ও পানি না দিয়ে কষ্ট দেওয়ার কারণে এবং তাকে জমিনের পোকা-মাকড় খেয়ে বাঁচার সুযোগ না দেওয়ার কারণে এক নারীকে জাহান্নামের আজাব ভোগ করতে হয়েছে।

ইসলাম যে কোনো ধরনের প্রাণী নির্যাতনকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে এবং এর লঙ্ঘনকারীদের প্রতি অভিশম্পাত করেছে। নবীজি (সা.) একবার মুখমণ্ডলে দগদগে দাগ দেওয়া (চিহ্নিত করার জন্য গরম লোহা দিয়ে ছ্যাঁকা দেওয়া) একটি গাধার পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় বলেছিলেন, “যে ব্যক্তি এর মুখে এই দাগ দিয়েছে, তার ওপর আল্লাহর লানত!”

অন্য বর্ণনায় এসেছে, রাসুল (সা.) প্রাণীর মুখে আঘাত করতে এবং মুখে আগুনের ছ্যাঁকা দিয়ে চিহ্ন দিতে নিষেধ করেছেন। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২১১৭)

এছাড়াও ইসলাম কোনো প্রাণীকে লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে আটকে রেখে তিলে তিলে হত্যা করা হারাম ঘোষণা করেছে। পাশাপাশি প্রাণীর অঙ্গহানি করা বা জীবন্ত অবস্থায় শরীরের কোনো অংশ কেটে ফেলাকে নিষিদ্ধ করেছে।

ইবনে ওমর (রা.) বলেন, “নবীজি (সা.) সেই ব্যক্তির ওপর লানত দিয়েছেন, যে প্রাণীর অঙ্গহানি করে।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৫১৫)

এই হাদিসগুলো স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, প্রাণীকে কষ্ট দেওয়া ইসলামের দৃষ্টিতে কেবল একটি ভুল কাজই নয়, বরং এটি একটি দণ্ডনীয় অপরাধ।

abdullahalbaqi00@gmail.com

আবদুল্লাহিল বাকি: আলেম, লেখক ও সফটওয়্যার প্রোগ্রামার

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

দিরিলিসের আরতুগ্রুলের সকল পর্ব কিভাবে দেখবেন?

ড. খন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর বই Pdf Download

নিশ্চয়ই কষ্টের সাথেই স্বস্তি আছে