যে বন্ধুর জন্য কেয়ামত দিবসে আফসোস হবে

 কেয়ামতের দিন আপনার সবচেয়ে বড় আফসোস কী হবে জানেন? কোরআন বলছে, ‘হায়, যদি আমি ওই লোকটাকে বন্ধু না বানাতাম!’

আপনার ফ্রেন্ড-সার্কেল চেক করার সময় এসেছে।

ধরুন, আপনার একজন বন্ধু আছে। বহুদিনের চেনা। একসঙ্গে চা খান, আড্ডা দেন, দুঃখের কথা শেয়ার করেন। কিন্তু একদিন খেয়াল করলেন—আপনি চাকরি পেলে কিংবা আপনার প্রমোশন হলে সে খুশি হয় না বরং হিংসা করে।

আপনার গোপন কথা, যা একান্তে তার সঙ্গে শেয়ার করেছিলেন, তা সে অন্যদের কাছে বলে বেড়ায়। আপনি ভালো কিছু করতে গেলে নানা বাহানায় আপনাকে অনুৎসাহিত করে। তখন মনে হয় না, এই মানুষটা কি আসলে বন্ধু নাকি অন্য কিছু?

বন্ধুত্ব আল্লাহর নেয়ামত। কিন্তু ভুল মানুষের সঙ্গে থাকলে শুধু দুনিয়া নয়, আখেরাতও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একটি বিষাক্ত সম্পর্ক আপনার দুনিয়া ও আখেরাত—দুটোই নষ্ট করে দিতে পারে।

বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ

হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘স্টাডি অব অ্যাডাল্ট ডিপার্টমেন্ট’ গবেষণাটি টানা ৮৫ বছর ধরে চলেছে। এতে প্রমাণিত হয়েছে, মানুষের সুখ ও দীর্ঘায়ুর সবচেয়ে বড় নির্ধারক হলো সম্পর্কের মান।

ভালো বন্ধু মানসিক স্বাস্থ্য উন্নত করে এবং আয়ু দীর্ঘ করে। আর বিষাক্ত বন্ধু বিষণ্নতা, উদ্বেগ, এমনকি শারীরিক অসুস্থতার কারণ হয়।  (ওয়ালডিঙ্গার, রবার্ট ও শুলজ, মার্ক, আমেরিকান সাইকোলজিস্ট, ৭৮/২, আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন, ওয়াশিংটন ডিসি, ২০২৩)

কোরআনের সতর্কবার্তা

আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘সেদিন জালিম ব্যক্তি নিজের হাত কামড়াতে কামড়াতে বলবে: হায়! যদি আমি রাসুলের পথ অবলম্বন করতাম! হায় আমার দুর্ভাগ্য, যদি আমি অমুককে বন্ধু না বানাতাম! সে তো আমাকে উপদেশ আসার পরও আল্লাহর স্মরণ থেকে বিভ্রান্ত করেছিল।’ (সুরা ফুরকান, আয়াত: ২৭-২৯)

এই আয়াতে চরম অনুতাপের কথা বলা হয়েছে। কেয়ামতের দিন সবচেয়ে বড় আফসোস হবে ভুল বন্ধু নির্বাচন করা। বিষাক্ত বন্ধুর আসল পরিচয় এটাই—সে আপনাকে আল্লাহ থেকে দূরে সরিয়ে নেয়।

রাসুল (সা.) একটি চমৎকার উপমা দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘ভালো সঙ্গী ও খারাপ সঙ্গীর উদাহরণ হলো সুগন্ধি বহনকারী এবং কামারের হাঁপড়ে ফুঁক দেওয়া ব্যক্তির মতো।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২১০১)

কোরআনের শিক্ষা

১. কেয়ামতে বন্ধুত্বের বিচার: আল্লাহ বলেন, ‘সেদিন (কেয়ামতে) বন্ধুরা একে অপরের শত্রু হবে, শুধু মুত্তাকিরা ছাড়া।’ (সুরা যুখরুফ, আয়াত: ৬৭)

যে বন্ধু আপনাকে নামাজের কথা মনে করিয়ে দেয়, সে জান্নাতেও আপনার সাথী হবে।

২. ইবলিসের ‘বন্ধু’ রূপ: শয়তান আদম (আ.)-কে বলেছিল, ‘আমি তোমাদের হিতৈষী।’ (সুরা আরাফ, আয়াত: ২১)

আজকেও অনেক ‘বন্ধু’ আছে যারা হারাম কাজে উৎসাহ দেয়, নামাজে অবহেলা করতে বলে। এরা মূলত শয়তানের প্রতিনিধি হিসেবে হিতৈষী সেজে আসে।

৩. বন্ধুত্বের আদর্শ মডেল: মুসা (আ.) দোয়া করেছিলেন যেন তাঁর ভাই হারুনকে তাঁর কাজের শরিক করা হয় (সুরা ত্বহা, আয়াত: ২৯-৩২)

এটাই আসল বন্ধুত্ব—যা ইসলামের পথে শক্তি জোগায়। আবু বকর (রা.) সংকটের মুহূর্তে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পাশে থেকে বন্ধুত্বের চরম পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করেছেন।

বিষাক্ত বন্ধু চেনার উপায়

  • সে আপনাকে আল্লাহ থেকে দূরে সরায় (সুরা ফুরকান, আয়াত: ২৯)।

  • সে আপনার দুর্বলতা নিয়ে উপহাস করে (সুরা মুতাফফিফিন, আয়াত: ২৯-৩০)।

  • সে আপনাকে মন্দ কাজে উৎসাহিত করে (সুরা তাওবা, আয়াত: ৬৭)।

  • সে হিংসুক ও ঈর্ষাপরায়ণ হয় (সুরা মায়িদা, আয়াত: ২৭-৩১)।

আমরা কী করতে পারি

১. সার্কেল মূল্যায়ন: আপনার সবচেয়ে কাছের পাঁচজন বন্ধু আপনাকে জান্নাতের দিকে নিচ্ছে, নাকি বিপরীত পথে—তা ভাবুন।

২. সৎসঙ্গ: এমন বন্ধু খুঁজুন যারা আপনাকে ভালো কাজে উৎসাহ দেবে।

৩. দূরত্ব বজায় রাখা: বিষাক্ত সম্পর্ক থেকে সম্মানজনক দূরত্ব বজায় রাখুন। কোরআন শেখায়—‘মূর্খদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নাও।’ (সুরা আরাফ, আয়াত: ১৯৯)

৪. দোয়া করা: সৎ বন্ধুর জন্য আল্লাহর কাছে সাহায্য চান। (সুরা ফুরকান, আয়াত: ৭৪)

মনে রাখবেন, ভুল সঙ্গ গ্রহণ করার চেয়ে একা থাকা অনেক ভালো। আর সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য বন্ধু হলো কোরআন—যা কখনো ধোঁকা দেয় না। আল্লাহ আমাদের সবাইকে ভুল সঙ্গ থেকে থেকে রক্ষা করুন। আমিন।

muhsin.du@gmail.com 

  • মুহাম্মাদ মুহসিন মাশকুর: খণ্ডকালীন শিক্ষক, আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

দিরিলিসের আরতুগ্রুলের সকল পর্ব কিভাবে দেখবেন?

ড. খন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর বই Pdf Download

নিশ্চয়ই কষ্টের সাথেই স্বস্তি আছে