আল্লাহ কি আমার জীবনেও এক-অদ্বিতীয়?
আল্লাহ কি আমার জীবনেও এক-অদ্বিতীয়?
—নোমান আলী খান আল্লাহ মানব জাতিকে তাঁর নিজের সম্পর্কে জ্ঞান দিয়েই সৃষ্টি করেছেন। মানুষ আগে থেকেই জানে যে, সর্বোচ্চ একজন সত্ত্বা রয়েছেন, আর তিনি হলেন মহান আল্লাহ। এটা শুধু এমন না যে একজন স্রষ্টা আছেন, তিনি আমাদের সৃষ্টি করেছেন, আর এখন আমরা যা খুশি করতে পারি। না। তিনিই হলেন প্রভু। তিনিই হলেন মনিব। আমার জীবনের লক্ষ্য হলো তা-ই করা যা তিনি চান। এটাই আমার জন্য সর্বোত্তম আদর্শ। আমি তাঁর বান্দা—এটাই আমার সর্বকালের সেরা অর্জন। এটাই আমার জন্য সবচেয়ে বড় সম্মানের বিষয়। আল্লাহর রাসুল (স), তাঁর সবচেয়ে বড় সম্মান হলো— [سُبْحَانَ الَّذِي أَسْرَىٰ بِعَبْدِهِ], তিনি আল্লাহর আদর্শ ‘আবদ’ বা বান্দা। আল্লাহর দাস হওয়া এক বিশাল সম্মানের বিষয়। এটাই জীবনের লক্ষ্য। আর আল্লাহ প্রতিটি মানুষের ভেতরেই সেই লক্ষ্যটি আগে থেকেই গেঁথে দিয়েছেন। কিন্তু আপনি যদি সেই লক্ষ্য হারিয়ে ফেলেন, তবে আপনার ভেতরে থাকা সেই লক্ষ্য পূরণের এক দুর্নিবার তৃষ্ণা এবং ক্ষুধা থেকেই যাবে। আল্লাহ আপনাকে সেটি দিয়েই সৃষ্টি করেছেন। কিন্তু যখন আপনার ক্ষুধা স্বাস্থ্যকর খাবার দিয়ে মেটে না, তখন আপনি কী দিয়ে তা পূর্ণ করেন? যদি আপনি সঠিক খাবার না পান, তবে কি বলবেন, “আমি কিছুই খাব না”? না। যখন একজন মানুষ ক্ষুধার্থ থাকে, আর তার পছন্দের কোনো খাবার বা স্বাস্থ্যকর খাবার থাকে না, আশেপাশে আবর্জনা থাকে, গাছের ছাল-বাকল থাকে। খাদ্যের সংকট হলে মানুষ সেগুলোই চিবানো শুরু করবে। যখন আপনার দৃষ্টি থেকে আল্লাহকে হারিয়ে ফেলেন এবং তিনি আর আপনার লক্ষ্য থাকেন না, তখন আবশ্যিকভাবেই আপনি একটি বিকল্প খুঁজে নেবেন। আবশ্যিকভাবেই। যে আল্লাহকে খুঁজে পেয়েছে, তার ক্ষেত্রে কী ঘটে? [إِنَّ صَلَاتِي وَنُسُكِي وَمَحْيَايَ وَمَمَاتِي لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ]। এটা তার জন্য খুবই সহজ। যে সত্যিকার অর্থে আল্লাহকে খুঁজে পেয়েছে, তার নামাজ আল্লাহর জন্য, তার ত্যাগ আল্লাহর জন্য, তার জীবন এবং তার মৃত্যু এখন আল্লাহর জন্য। সে যেভাবে বাঁচে, যেভাবে খায়, যেভাবে ঘুমায়, জীবনে যা করতে চায়, তার দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্য, স্বল্পমেয়াদী লক্ষ্য, তার নিজের সন্তানদের নিয়ে কী পরিকল্পনা, কেনো সে পড়াশোনা করছে, কোথায় কাজ করবে — সবকিছুই এখন আল্লাহর জন্য; এটাই তার লক্ষ্য। কিন্তু সেই লক্ষ্য যার থাকে না, তাকে অন্য কোনো লক্ষ্য খুঁজে নিতে হয়। প্রাচীন সমাজে মূর্তি ছিলো, অন্য ধর্ম ছিলো, অন্য উপাস্যও খুঁজে পাওয়া যেতো। কিন্তু আমাদের এই সময়ে বিষয়টি আরও বেশি মর্মান্তিক হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক বেশি মর্মান্তিক। এখন আপনি এমন মানুষ পাবেন যে নিজের শরীর নিয়ে আচ্ছন্ন, দিনে ১৮ ঘণ্টা ব্যায়াম করছে এবং জীবনে তার একমাত্র লক্ষ্য হলো শরীরকে আরও আরও পেশীবহুল করা। এটাই একমাত্র লক্ষ্য। স্টেরয়েড নেয়া আর শীর্ষে অবস্থান করা। সুঠাম দেহ বজায় রাখা। অথবা তারা শরীরচর্চার লক্ষ্য নির্ধারন করে — “আমাকে ব্যায়ামটি এতোবার করতে হবে বা আমাকে এতোগুলো পুশ-আপ দিতে হবে অথবা আমাকে এতো কেজি ওজন দিয়ে বেঞ্চ প্রেস করতে হবে”, ইত্যাদি। এটাই তাদের লক্ষ্য। এটাই তাদের ‘ইলাহ’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেকের জীবনটা অর্থকেন্দ্রিক হয়ে গেছে। আপনি কি এমন মানুষ দেখেছেন? তারা ক্যারিয়ার ছাড়া অন্য কোনো বিষয়ে কথাই বলতে পারে না। “আমি এই কোম্পানিতে কাজ করি, আমি এটা, এটা, এটা, এটা করি”। আর যে মুহূর্তে তারা চাকরি হারায়, আত্মঘাতী হয়ে ওঠে। কারণ সারাজীবন তারা কেবল এটা নিয়েই ভেবেছে। সারাজীবন ধরে তারা কেবল এটাই করেছে। এটাই তাদের লক্ষ্যে পরিণত হয়েছে। কিছু মানুষের জন্য তাদের সন্তানরাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তারা তাদের সন্তানদের জন্যই বাঁচে। তারা সন্তানদের জন্যই সবকিছু করে। দিন-রাত, শুধু সন্তানদের নিয়েই ভাবে। তাদের মনে অন্য কোনো চিন্তাই কাজ করে না। সন্তান ছাড়া তাদের সামনে আর কোনো লক্ষ্যই থাকে না। তারা কেবল এর পেছনেই ছোটে। যখন আপনি আল্লাহকে খুঁজে না পান, তখন আপনি অন্য কিছু খুঁজে পাবেন। এবং এর পেছনেই ছুটতে থাকবেন। আপনি এর জন্যই জীবন উৎসর্গ করবেন। মানুষের মধ্যে এই ব্যাপারে কোনো ব্যতিক্রম নেই। এখনকার সময়ে অলস মানুষদের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রজোয্য। আপনারা হয়তো জিজ্ঞেস করতে পারেন, অলস ব্যক্তি এরকম হয় কিভাবে? সেই ছেলেগুলোর কথা ভাবুন যারা দিনে ২০ ঘণ্টা ভিডিও গেম খেলে আর সোফা থেকে নড়েও না? তাদের লক্ষ্যটা কী? নিজেকে বিনোদন দেওয়া। স্ক্রিনের সামনে পড়ে থেকে নিজেদের মস্তিষ্কের কোষগুলোকে ফ্রাই করা। এটাই তাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য। এটাই তারা অর্জন করতে চায়। আর এটা অর্জন করার জন্য প্রতিদিন তারা কঠোর পরিশ্রম করে যাচ্ছে; তাই না? এগুলো সবই হলো তাওহীদকে উপলব্ধি না করার মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব। আল্লাহ এক-অদ্বিতীয়—এটা বলা সহজ। কিন্তু তিনি কি আমার জীবনেও এক-অদ্বিতীয়? তিনি কি আমার জন্য সেই ‘এক-অদ্বিতীয়’ সত্তা? নাকি আমার অন্য কোনো ‘এক-অদ্বিতীয়’ সত্ত্বা আছে যার পেছনে আমি ছুটছি? নাকি অন্য কোনো কিছু আছে যাকে আমি সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার প্রদান করি? আল্লাহ কিছুটা ভিন্ন ভাষায় এই প্রশ্নটিই করেছেন। তিনি বলেছেন, [مَا غَرَّكَ بِرَبِّكَ الْكَرِيمِ] - কিসে তোমাকে তোমার মহান রব থেকে বিভ্রান্ত করলো? এত গুরুত্বপূর্ণ কোন বিষয়টা ছিলো যার পেছনে তুমি ছুটেছো? যার কারণে তুমি আমার পথে আসতে পারলে না? সুবহানাল্লাহ! তাই যখন তিনি [هُوَ اللَّهُ أَحَدٌ] শব্দটি ব্যবহার করলেন, তখন এর মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব, আল্লাহর প্রতি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির ওপর এর প্রভাব এবং জীবন নিয়ে আমরা যেভাবে ভাবি, এই সবকিছুই সম্পূর্ণভাবে বদলে যায়। এখন আল্লাহকে খুশি করার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ আমার কাছে আর কিছুই নেই। তাঁর সন্তুষ্টি অর্জন করার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ আমার কাছে আর কিছুই নেই। তিনি আমাকে ক্ষমা করে দিবেন, এর চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ আমার কাছে আর কিছুই নেই। বিচার দিবসে তিনি আমার সাথে কথা বলবেন, আমাকে বলবেন যে আমি সফল হয়েছি — এর চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ আমার কাছে আর কিছুই নেই। তিনি আমার দিকে রহমতের দৃষ্টি দিবেন। আমি তাদের অন্তর্ভুক্ত হবো না যাদের থেকে তিনি মুখ ফিরিয়ে নেন। [وَلَا يُكَلِّمُهُمُ اللَّهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ] - আল্লাহ বিচার দিবসে তাদের সাথে কথা বলবেন না। আল্লাহ যেন আমাদেরকে সেই সব মানুষদের অন্তর্ভুক্ত না করেন। এগুলো হলো [أَحَدْ] শব্দটিকে নিজের মধ্যে ধারণ করার কিছু মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব। শুধুমাত্র ওই একটি শব্দ। সুবহানাল্লাহ! এই হলো আল্লাহর পরিচয়। এ বিষয়ে আল্লামা ইকবালের চমৎকার একটি কবিতার কথা মনে পেড় গেলো। আমি কবিতাটির সরাসরি উদ্ধৃতি দিতে পারবো, না কারণ আমি উর্দু ভাষায় তেমন ভালো না, তবে আমি কবিতার অর্থটি বলছি। এটি আমার পছন্দের একটি কবিতা। এর আলোচ্য বিষয় তাওহীদ। তিনি বলেছেন, “যা একসময় মানুষের হৃদয়ে জ্বলে উঠতো, মানুষের অন্তরে প্রজ্জ্বলিত হতো, তা এখন নিছক দার্শনিক তত্ত্বকথায় ভরা বিতর্কের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে”। আমাদের কাছে এখন তাওহীদ আসলে কী? বিতর্ক। আলোচনা। ধর্মতত্ত্বের তাত্ত্বিক সব আলোচনা। যার কোনো শেষ নেই। যার কোনো সমাপ্তি নেই। কিন্তু তাওহীদ একসময় হৃদয়কে আলোকিত করতো। আমি কি এখনো [أَحَدْ] শব্দটির অধিকার আদায় করতে পেরেছি? আমি কি এখনো [أَحَدْ] শব্দটির প্রতি সুবিচার করতে পেরেছি? আল্লাহ আমাদেরকে তাওহীদের অধিকারী মানুষদের অন্তর্ভুক্ত করুন। ইব্রাহিম (আ), রসুল (স) এবং সাহাবীগণের হৃদয়ে যা জ্বলে উঠতো, আল্লাহ যেনো আমাদের হৃদয়কে-ও তার দ্বারা আলোকিত করেন।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন