তাফাক্কুদিল আহওয়াল

 সীরাত থেকে আমরা অতি চমৎকার একটি ইসলামী শিষ্টাচার শিখতে পারি যা আমি মনে করি দুর্ভাগ্যবশত আমরা পরিত্যাগ করেছি। আর তা হলো কারো খোঁজ-খবর নেয়া যখন সে মানসিক চাপ বা কষ্টে থাকে এবং তার কষ্টের বোঝা নিজের কাঁধে ভাগ করে নেয়া। এটাকে বলা হয় [تَفَقُّدِ الْأَحْوَالْ] - (তাফাক্কুদিল আহওয়াল)। রসূল (স) তাঁর চারপাশের মানুষদের পর্যবেক্ষণ করতেন। তিনি খেয়াল করতেন কেউ অনুপস্থিত আছে কিনা। তিনি জিজ্ঞেস করতেন, “আবু হুরায়রা কোথায়? অমুক কোথায়? তাকে তো দেখতে পাচ্ছি না। সেই বয়স্ক নারীটি কোথায় যিনি মসজিদ পরিষ্কার করতেন”? তিনি হয়তো কাউকে কাঁদতে দেখতেন। তিনি কারো চোখের অশ্রু লক্ষ করতেন এবং নিজে গিয়ে তাদেরকে সান্ত্বনা দিতেন।

প্রায়শই আমাদের উদ্বেগগুলো আমাদেরকে গ্রাস করে ফেলে, আর আমরা অন্য কারো স্মরণাপন্ন হই না। এটা একটা ভুল কাজ। তবে বিপরীত দিক থেকে এটা আমাদেরও একটা ভুল। আমরাও আমাদের বন্ধুদের খোঁজ নিতে যাই না। এটি একটি দ্বিমুখী রাস্তার মতো। নিজে কষ্টে পড়লে আপনার উচিত পরিবার এবং প্রিয়জনের স্মরণাপন্ন হওয়া। কিন্তু আবার আপনিই যদি কারো পরিবার এবং প্রিয়জন হয়ে থাকেন, তবে আপনারও উচিত তাদের খোঁজ-খবর নেয়া। যদি জানেন যে তারা কষ্টে আছে, যদি বুঝতে পারেন যে তারা মানসিক চাপে আছে, সীরাত আমাদেরকে শেখায়, তাদের সাথে সাক্ষাত করুন। সাক্ষাত করে বলুন, “আসলে কী ঘটছে? কীভাবে আমি আপনাকে সাহায্য করতে পারি”? রসূল (স) বলেছেন, সর্বোত্তম যে সদকাটি তোমরা প্রদান করতে পারো, তা হলো কোনো ভাইয়ের ওপর থেকে মানসিক চাপ দূর করা অথবা তাকে আনন্দিত করা। এটাই হলো সর্বোত্তম সদকা। কেউ মানসিক চাপে আছে, কেউ কষ্টে আছে, তা দূর করে দিন। সাহায্য করুন; সেই ভাইকে সহায়তা করুন। তার কিছু টাকার প্রয়োজন, কোনো সাহায্য প্রয়োজন, যানবাহন প্রয়োজন। সর্বোত্তম সদকা হলো, সে যেই সমস্যায় আছে তা দূর করে দেয়া। অথবা [إِدْخَالُ السُّرُورْ] - (ইদখালুস সুরুর) - তাকে আনন্দিত করা। তাকে মনোরম কোনো কথা বলুন। আশাব্যঞ্জক কোনো দোয়া শিখিয়ে দিন। কিছু একটা করুন যা তার বিষণ্ণ অবস্থাকে বদলে দেবে। আমাদের মধ্যে অনেকেই আছেন, যাদের কষ্টগুলো নিজেদের হৃদয়ে বন্দী হয়ে আছে। এমনকি আমাদের জীবনসঙ্গী, এমনকি আমাদের সন্তান, এমনকি আমাদের ঘনিষ্ঠ পরিবার এবং বন্ধুরাও সে বিষয়ে অবগত না। আর কখনো কখনো সেই কষ্ট জমাট বাধতে শুরু করে। কখনো কখনো এটি আমাদেরকে এমন অন্ধকার জায়গায় নিয়ে যায় যা মোটেও ভালো নয়। যদি আপনি কোনো বন্ধু বা আত্মীয়কে দেখেন, যদি কোনো প্রিয় মানুষকে লক্ষ করেন যে তারা নিজেদেরকে গুটিয়ে নিয়েছে, তারা কোনো কষ্টের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তবে সেই সর্বোত্তম মুসলিম হয়ে উঠুন যেরকম মুসলিম রসূল (স) আপনাকে হতে বলেছেন। কাছে যান এবং দরজায় কড়া নাড়ুন। কাছে যান এবং শুধুমাত্র সঙ্গ প্রদান করুন। এটুকুই যথেষ্ট। যদি তারা তাদের ব্যক্তিগত সমস্যার কথা বলতে না চায়, সেটাও ঠিক আছে। আপনার উপস্থিতি, মুচকি হাসি, ছোট একটি উপহার হয়তো অনেক বড় পরিবর্তন আনতে পারে। হয়তো তাদের সম্পূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গিকেই বদলে দিতে পারে। দয়াদ্রতার ক্ষুদ্রতম কাজটিও হয়তো তাদের হৃদয়ের সেই বন্ধ দরজা খুলে দিতে পারে। তাই আমাদের সমাজসমূহে, আমাদের মসজিদসমূহে, আমাদের জনপদসমূহে, আমরা একে অপরের খোঁজখবর রাখব। একে অপরের খেয়াল রাখব। একে অপরের খোঁজ নিব। আর যখন সাহায্য করার মতো কোনো সুযোগ থাকে, যখন আপনি জানেন কেউ মানসিক কষ্টে আছে, আপনার কোনো ঘনিষ্ঠ বন্ধুর দাম্পত্য জীবন তিক্ততার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে বা এমন কিছু, সুন্নাহ আমাদের শেখায়, আপনি জিজ্ঞেস করুন — “তোমার কোনো সহায়তা প্রয়োজন? আমি সবসময়‌ই তোমার পাশে আছি”। কেবল জিজ্ঞেস করুন। “তোমার কি কথা বলার জন্য কাউকে প্রয়োজন? আমি সবসময় তোমার পাশে আছি”। এই সামান্য প্রচেষ্টা হয়তো একটি জীবন বদলে দিতে পারে। এটাই হলো আমাদের ধর্মের শিক্ষা। রসূল (স)-এর একটি উক্তি সকলকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে আমি শেষ করছি, যখন তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, “মানবজাতির মধ্যে সর্বোত্তম মানুষ কে”? তিনি বলেছিলেন, "মানবজাতির মধ্যে সর্বোত্তম মানুষ হলো তারা, যারা মানবজাতির সবচেয়ে বেশি উপকারে আসে।" আসুন আমরা তাঁদের অন্তর্ভুক্ত হই যারা মানবজাতির সবচেয়ে বেশি উপকারে আসে। -ড. ইয়াসির কাদি

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

দিরিলিসের আরতুগ্রুলের সকল পর্ব কিভাবে দেখবেন?

ড. খন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর বই Pdf Download

নেক আমলে অবিচল রাখবে যে ১০ আয়াত