পোস্টগুলি

খাওয়ার আদব ও দোয়া

  ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা, যেখানে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি ছোট-বড় কাজের জন্য রয়েছে সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা। খাবার গ্রহণ কেবল একটি শারীরিক চাহিদা নয়, বরং এটি ইবাদতেরও অংশ। মুসলিম মা-বাবারা একদম শৈশব থেকেই সন্তানদের খাবারের আগে ও পরের দোয়া এবং আদবগুলো শিক্ষা দিয়ে থাকেন, যাতে এই উত্তম অভ্যাসগুলো তাদের চরিত্রের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়ায়। খাবারের আগে ও পরে দোয়া পড়া নবীজি (সা.)–এর গুরুত্বপূর্ণ একটি সুন্নত। এর মাধ্যমে আমরা আল্লাহর দেওয়া নেয়ামতের শুকরিয়া আদায় করি এবং শয়তানের অনিষ্ট থেকে বেঁচে থাকি। খাওয়ার আগে ও পরের দোয়া ১. আহার শুরুর দোয়া: খাবার শুরুতে কেবল ‘বিসমিল্লাহ’ (আল্লাহর নামে শুরু করছি) বলা সুন্নত। তবে পূর্ণ দোয়াটি হলো: উচ্চারণ:  বিসমিল্লাহি ওয়া আলা বারাকাতিল্লাহ। অর্থ:  আল্লাহর নামে এবং আল্লাহর বরকতের ওপর ভরসা করে শুরু করছি। যদি শুরুতে দোয়া পড়তে ভুলে যান: খাবার চলাকালীন মনে পড়লে এই দোয়াটি পড়তে হয়: উচ্চারণ:  বিসমিল্লাহি আওয়ালাহু ওয়া আখিরাহু। অর্থ:  এর শুরুতে এবং শেষেও আল্লাহর নাম নিচ্ছি।২. আহার শেষের দোয়া: খাবার শেষ করে আল্লাহর শুকরিয়া জানিয়ে ...

আল্লাহকে ভালোবাসব না ভয় করব

  একজন মুমিনের অন্তরে অবশ্যই আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা থাকবে। আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা ইমানের দাবি। আল্লাহ-তাআলা বলেন, ‘যারা ইমান এনেছে, আল্লাহর প্রতি তাদের প্রেম প্রগাঢ়।’ (সুরা বাকারা: ১৬৫) আল্লাহর প্রতি ভালোবাসার অংশ হিসেবেই তাঁর রহমত ও ক্ষমার ব্যাপারে আশাবাদী হতে হবে। আবার তাঁর অসন্তুষ্টি, ভালোবাসা হারানো ও শাস্তির ব্যাপারে ভীত থাকতে হবে। কোরআনের বিভিন্ন আয়াতে আল্লাহ একই সঙ্গে তাঁর রহমত ও ক্ষমার জন্য আশাবাদী হতে বলেছেন, আবার তাঁকে ভয় করারও নির্দেশ দিয়েছেন। কোরআনে আল্লাহ তাঁর উত্তম বান্দাদের গুণাবলি বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছেন, ‘তারা সৎকর্মে প্রতিযোগিতা করত, তারা আমাকে ডাকত আশা ও ভীতির সাথে এবং তারা ছিল আমার নিকট বিনীত।’ (সুরা আম্বিয়া: ৯০) কোরআনে আল্লাহর রহমতের ব্যাপারে নিরাশ হতে নিষেধ করে বলেন, ‘তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না।’ (সুরা জুমার: ৫৩) আবার তাঁকে ভয় করার অপরিহার্যতা উল্লেখ করে আল্লাহ বলেন, ‘আমাকে ভয় করো, যদি তোমরা মুমিন হও।’ (সুরা আলে ইমরান: ১৭৫)আরেক আয়াতে আল্লাহ-তাআলা বলেন, ‘তারা কি আল্লাহর পাকড়াও থেকে নির্ভয় হয়ে গেছে? নিশ্চিত ক্ষতিগ্রস্ত সম্প্রদায় ছাড়া আল্লাহর পাকড়াও থেক...

মুসলিম সমাজে আসক্তি: প্রতিকারের উপায় কী

  আসক্তি বা ‘অ্যাডিকশন’ বর্তমান সময়ে বিশ্বজুড়ে একটি জটিল মনস্তাত্ত্বিক ও আধ্যাত্মিক সংকটে পরিণত হয়েছে। মুসলিম উম্মাহ এই সংকটের ঊর্ধ্বে নয়। সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট যা-ই হোক না কেন, আধুনিক যুগের ভোগবাদী জীবনযাত্রা এবং খুব সহজে নেশাজাতীয় দ্রব্যের প্রাপ্যতা মুসলিম সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে এই সমস্যাকে পৌঁছে দিচ্ছে। মাদক, অ্যালকোহল, জুয়া ও পর্নোগ্রাফির মতো আসক্তিগুলো ব্যক্তিজীবন ছাড়িয়ে পারিবারিক ও সামাজিক কাঠামোকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। নিচে মুসলিম সমাজে আসক্তির কারণ এবং ইসলামি ও মনস্তাত্ত্বিক সমাধানের একটি সামগ্রিক রূপরেখা তুলে ধরা হলো। মুসলিম সমাজে আসক্তির মূল কারণ পরিযায়ী বা ‘ডায়াসপোরা’ মুসলিমরা কেন আসক্তির ঝুঁকিতে বেশি থাকেন, তার পেছনে বেশ কিছু মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক কারণ কাজ করে: ১. সাংস্কৃতিক সংঘাত:  নতুন দেশে নিজস্ব ধর্মীয় পরিচয় বজায় রাখা এবং পশ্চিমা সমাজের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার চাপের মধ্যে পড়ে অনেকে মানসিক অস্থিরতায় ভোগেন, যা তাঁদের মাদকের দিকে ঠেলে দেয়। ২. সামাজিক বিচ্ছিন্নতা:  পরিবার বা আগের সামাজিক পরিবেশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লে একাকিত্ব কাটাতে অনেকে পর্নোগ্রাফি বা মা...

কোনো আসক্তি কাটিয়ে ওঠার অসাধারণ ৬টি দোয়া

  জীবনকে মাঝেমধ্যে লক্ষ্য আর সংগ্রামের মধ্যে টানাপোড়েন বলে মনে হয়। কখনো কখনো আমরা এমন চক্রে আটকে যাই, যেখান থেকে বেরিয়ে আসার পথ জানা থাকে না। আসক্তি—তা স্বভাবগত খারাপ অভ্যাস, মাদক বা ক্ষতিকর আচরণ যা-ই হোক না কেন—দূর করা অসম্ভব মনে হয়। দোয়ার দ্বারা কি তা সম্ভব? ইসলাম আমাদের মনে করিয়ে দেয়, আল্লাহর ওপর ভরসা করলে কোনো চেষ্টাই অসম্ভব নয়। দোয়ার মাধ্যমে আল্লাহর কাছে সাহায্য চাওয়া আমাদের শক্তি ও ধৈর্যের উৎস হতে পারে। এখানে আমরা সাতটি দোয়া তুলে ধরছি, যা আসক্তি থেকে মুক্তি ও জীবনের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেতে সহায়তা করবে। ১. পথহারা হলে হেদায়াতের দোয়া যদি মনে হয় পথ হারিয়ে ফেলেছেন, তাহলে জানুন আল্লাহর হেদায়াত আপনার পথপ্রদর্শক। কোরআন থেকে এই দোয়া পড়ুন: ‘ ইহদিনাস সিরাতাল মুসতাকিম। ’ অর্থ, আল্লাহ, আমাদের সরল পথ দেখাও। (সুরা ফাতিহা: ৬) নামাজে তো আমরা পড়িই, যখন একা থাকেন, তখনই বলুন: ‘ইয়া আল্লাহ, আমাকে সঠিক পথ দেখাও।’ ২. আত্মনিয়ন্ত্রণের জন্য দোয়া আসক্তি কাটিয়ে উঠতে ধৈর্য ও আত্মনিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন। এই দোয়া আপনাকে শক্তিশালী করবে: ‘রাব্বানা আফরিগ আলাইনা সাবরান ওয়া সাব্বিত আকদামানা ওয়ান...

সুরা কাউসার: ইতিহাসের বিস্ময়কর প্রতিশোধ

  পবিত্র কোরআনের ক্ষুদ্রতম সুরাগুলোর অন্যতম সুরা কাউসার। সুরাটি মাত্র তিনটি আয়াতে এক গভীর বার্তা বহন করে। মক্কার অবিশ্বাসীদের নেতা আস ইবনে ওয়াইল নবীজি (সা.)–কে ‘আবতার’ (নির্বংশ) বলে উপহাস করেছিল। অথচ ইতিহাসের অদ্ভুত পরিণতিতে তাঁর নাতি আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে আস হয়ে উঠলেন হাদিস সংকলনের পথিকৃৎ। ‘কাউসার’ শব্দটি আরবি ‘কাছরাহ’ থেকে উদ্ভূত, যার অর্থ প্রাচুর্য বা অধিক্য। ইমাম ইবনে কাসির (রহ.) উল্লেখ করেছেন যে কাউসার শব্দটি সীমাহীন কল্যাণ ও আধ্যাত্মিক সম্পদের প্রতীক। ( তাফসির আল-কুরআন আল-আজিম , বৈরুত: দারুল কুতুব আল-ইলমিয়্যাহ, ২০০০, ৪/৫৫৬) সুরাটি নাজিলের পটভূমি আল্লাহর রাসুল (সা.)–এর পুত্রসন্তানদের মৃত্যুর পর মক্কার কাফেররা তাঁকে ‘আবতার’ বা নির্বংশ বলে উপহাস করত। আস ইবনে ওয়াইল ছিলেন মক্কার অন্যতম প্রভাবশালী নেতা এবং ইসলামের কট্টর বিরোধী। সে বলে বেড়াত, ‘তাকে ছেড়ে দাও, সে তো একজন নির্বংশ ব্যক্তি, যার কোনো পুত্রসন্তান নেই। সে মারা গেলে কেউ তাকে স্মরণ করবে না, সুতরাং তাঁকে নিয়ে আমাদের চিন্তার কিছু নেই।’ আবু জাহল, উকবা ইবনে আবু মুআইত এবং আবু লাহাবও একই ধরনের কটূক্তি করত। ( তাফসির আল-কুরআ...

পরিখার যুদ্ধ: ইতিহাসের পালাবদল

  ইসলামি ইতিহাসের কালপঞ্জিতে পঞ্চম হিজরি বা ৬২৭ খ্রিষ্টাব্দ এক অত্যন্ত সংকটপূর্ণ ও গুরুত্ববহ বছর। এই বছরেই আরবের বিভিন্ন গোত্র ও ইহুদি শক্তিগুলো ঐক্যবদ্ধ হয়ে মদিনার ইসলামি রাষ্ট্রকে চিরতরে মুছে ফেলার এক মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করে। ইতিহাসের পাতায় এটি ‘পরিখার যুদ্ধ’ বা ‘আহজাব’ (মিত্রবাহিনী)–এর যুদ্ধ নামে পরিচিত। এই যুদ্ধের মাধ্যমেই আরবের রণকৌশলে এক নতুন দিগন্তের সূচনা হয় এবং যুদ্ধের গতিপথ চিরতরে মুসলমানদের অনুকূলে চলে আসে। যুদ্ধের প্রেক্ষাপট ও কারণ পরিখার যুদ্ধের মূলে ছিল মদিনা থেকে বহিষ্কৃত ইহুদি গোত্র ‘বনু নাজির’–এর ষড়যন্ত্র। বিশ্বাসঘাতকতার দায়ে মদিনা থেকে বিতাড়িত হওয়ার পর তারা খয়বরে আশ্রয় নেয় এবং মুসলমানদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেওয়ার নেশায় মত্ত হয়। প্রায় সাড়ে পাঁচ কিলোমিটার দীর্ঘ এবং গভীর পরিখা খননের কাজ শুরু হয়। সাহাবিরা প্রচণ্ড ক্ষুধা ও শীতের মধ্যে কাজ করতে থাকেন। নবীজি নিজেও সাধারণ শ্রমিকের মতো মাটি কাটেন। বনু নাজিরের নেতারা মক্কায় গিয়ে কুরাইশদের যুদ্ধের উনকানি দেয় এবং আরবের অন্যান্য শক্তিশালী গোত্র যেমন—গাতাফান, বনু আসাদ ও বনু সুলাইমকে এই জোটে শামিল করে। তারা সম্মিলিতভাবে প্রায় ১০ হ...

নবীজি (সা.)-এর ‘পেটে পাথর বাঁধা’ হাদিসের ব্যাখ্যা কী

  নবীজি (সা.)-এর জীবন ছিল ত্যাগ, ধৈর্য ও সহ্যশীলতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তাঁর জীবনে ক্ষুধা এবং দারিদ্র্যের ঘটনা অনেকবার এসেছে, যা মুসলিম উম্মাহকে শিক্ষা দেয় যে দুনিয়ার অভাব-অনটন সত্ত্বেও আল্লাহর ওপর ভরসা রাখতে হবে। একটি প্রসিদ্ধ ঘটনা হলো নবীজি (সা.)-এর পেটে পাথর বাঁধা, যা ক্ষুধার তীব্রতার প্রতীক। এই ঘটনা কীভাবে ঘটেছে, এর অর্থ কী এবং এর সত্যতা কতটুকু—সে সম্পর্কে আমাদের সমাজে ব্যাপক বিভ্রান্তি লক্ষ করা যায়। আমরা আজ সে বিষয়টি তুলে ধরছি। ক্ষুধায় পেটে পাথর বাঁধা হতো কেন নবীজি (সা.)-এর জীবনের প্রথম দিকে, বিশেষ করে মক্কায় দাওয়াতের সময় এবং মদিনায় খন্দক যুদ্ধের মতো কঠিন মুহূর্তে ক্ষুধা একটি সাধারণ ঘটনা ছিল। কোরআনে আল্লাহ বলেন: ‘আর যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য পথ বের করে দেবেন এবং তাকে এমন জায়গা থেকে রিজিক দেবেন, যা সে কল্পনাও করে না।’ (সুরা তালাক, আয়াত: ২-৩) এটি আরবদের মধ্যে একটি সাধারণ প্রথা ছিল, যা ক্ষুধার তীব্রতা কমাতে সাহায্য করত। নবীজি (সা.)-এর এই ঘটনা দেখিয়ে দেয় যে তিনি সাহাবিদের সঙ্গে সমানভাবে কষ্ট সহ্য করতেন। এই আয়াত নবীজি (সা.)-এর জীবনের সঙ্গে সংযুক্ত, কারণ তাঁর ...