পোস্টগুলি

মিসরে ইবনে খালদুন: এক বহুমাত্রিক জীবনের শেষ অধ্যায়

  মুসলিম ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ সমাজবিজ্ঞানী ওলিউদ্দিন আবু জাইদ আবদুর রহমান ইবনে খালদুন আল-হাদরামি (মৃ. ১৪০৬ খ্রি.) মিসরীয়দের নিয়ে একটা চমৎকার পর্যবেক্ষণ লিখে গেছেন যে, তাদের মেজাজে যেন সব সময় আনন্দ আর ভবিষ্যৎ নিয়ে এক অদ্ভুত নিশ্চিন্ততা কাজ করে। মিসরকেই তিনি তাঁর বিখ্যাত আল–মুকাদ্দিমা গ্রন্থে সর্বোচ্চ প্রশংসা করে লিখেছেন, এটা বিশ্বের উদ্যান, মানবজাতির মিলনমেলা। এই পর্যবেক্ষণ ছিল মানবসভ্যতার ওঠাপড়া নিয়ে তার গভীর সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গির একটা অংশ। উত্তর আফ্রিকা ও আন্দালুসের রাজদরবারে দীর্ঘ রাজনৈতিক টানাপোড়েনে বিপর্যস্ত হয়ে ৭৮৪ হিজরিতে (১৩৮২ খ্রি.) ইবনে খালদুন মিসরে আশ্রয় নেন। জীবনের শেষ দুই দশক তিনি কাটান কায়রো শহরে, আর এই সময়ই তাঁর চিন্তাভাবনাকে এক বৈশ্বিক রূপ দেয়। কায়রোয় পৌঁছামাত্র ইবনে খালদুনের পরিচিতি ছড়িয়ে পড়ে। মামলুক সুলতান জাহির বারকুক তাঁকে সম্মানের সঙ্গে গ্রহণ করেন, আল-আজহারে বিশেষ শিক্ষাদানের আসন দেন। কায়রোয় নতুন জীবন কায়রোয় পৌঁছামাত্র ইবনে খালদুনের পরিচিতি ছড়িয়ে পড়ে। মামলুক সুলতান জাহির বারকুক তাঁকে সম্মানের সঙ্গে গ্রহণ করেন, আল-আজহারে বিশেষ শিক্ষাদানের...

নেয়ামতের কৃতজ্ঞতা আদায়ে ৬টি লাভ

  প্রতিদিন সকালে চোখ মেলে তাকানো, এক গ্লাস পানি গিলে ফেলার সামর্থ্য, পাশে থাকা প্রিয়জনের মুখ—এসবই আল্লাহর অসীম অনুগ্রহ, যা আমরা প্রায়ই খেয়াল করি না। একজন মুমিনের অন্যতম গুণ হলো এই নেয়ামতগুলোর জন্য কৃতজ্ঞ থাকা। আর কৃতজ্ঞতা স্রেফ একটা নৈতিক ভালো গুণ নয়, এর পেছনে দুনিয়া ও আখিরাতের বাস্তব কিছু লাভ আছে। ১. নেয়ামত বাড়ে আল্লাহ নিজেই বলেছেন, ‘তোমরা যদি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো, তবে আমি অবশ্যই তোমাদের আরও বৃদ্ধি করে দেব।’ (সুরা ইব্রাহিম, আয়াত: ৭) এখানে কী বৃদ্ধি পাবে, তা নির্দিষ্ট করে বলা হয়নি। মুফাসসিরদের মতে, এর মধ্যে রিজিক, বরকত, মানসিক প্রশান্তি, ইমান—সবকিছুই অন্তর্ভুক্ত। অর্থাৎ কৃতজ্ঞতা শুধু একটা অনুভূতি নয়, এটা নিয়ামত আকর্ষণ করার একটা মাধ্যমও। ২. মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো হয় কৃতজ্ঞতা আল্লাহর প্রতি যেমন, মানুষের প্রতিও তেমন। নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘যে মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না, সে আল্লাহর প্রতিও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ১৯৫৪) যিনি মানুষের উপকারের স্বীকৃতি দিতে জানেন, তিনি সহজেই তাদের ভালোবাসা অর্জন করেন, আর এই অভ্যাসই আসলে আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা...

অতিরঞ্জনের ক্ষতি: ইসলাম কেন মধ্যপন্থার কথা বলে

  মহান আল্লাহ মানুষকে ভারসাম্যপূর্ণ এক জাতি হিসেবে সৃষ্টি করেছেন এবং দান করেছেন ইসলামের মতো একটা ভারসাম্যপূর্ণ জীবনব্যবস্থা। কোরআনে তিনি অবিশ্বাসী আর অকৃতজ্ঞ মানুষের নিন্দা করেছেন। তেমনি আরও একটা দল আছে, যাদের বলা হয় মুসরিফিন—সীমালঙ্ঘনকারী বা অপব্যয়কারী। সহজ কথায়, যারা প্রয়োজনের অতিরিক্ত কিছু করে, তাদের কাজকেই বলা হয় ‘ইসরাফ’। শব্দটা শুনতে কিছুটা অপরিচিত মনে হলেও খুব সম্ভবত আমরা প্রায় প্রতিদিনই কোনো না কোনো ক্ষেত্রে ইসরাফ করি—আবেগে, খাবারে, কেনাকাটায়, বিনোদনে, এমনকি ইবাদতেও। আবেগের ক্ষেত্রে ইসরাফ ইসলাম মানুষকে আবেগহীন হতে বলে না। ভালোবাসা, রাগ, কষ্ট, আনন্দ—এসব স্বাভাবিক মানবিক অনুভূতি। সমস্যা তখনই হয়, যখন তা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। নিয়ন্ত্রণহীন রাগ পরিস্থিতিকে খারাপের দিকে নিয়ে যায়। কিন্তু উল্টো দিকে, অতিরিক্ত চুপ থাকাও কম ক্ষতিকর নয়। অনেক সময় আমরা ভাবি, অন্যায়ের মুখে চুপ থাকাটাই ধৈর্যের পরীক্ষা—আর এই ভাবনায় চুপ থেকে থেকে অন্যায়কারীর অন্যায় আরও বাড়তে দিই। এটাও একরকম ইসরাফ। ইসরাফ মানে শুধু খাবার ফেলে দেওয়া নয়, প্রয়োজনের অতিরিক্ত খাবার রান্না করা বা গ্রহণ করা...

আল-আত্তারিন: যে মাদ্রাসা গরিব ছাত্রদের ভবিষ্যৎ গড়ে দিত

  মরক্কোর ফেজ শহরের সুগন্ধি বাজার সুক আল-আত্তারিনের ঠিক পাশে একটা সাদামাটা দরজা। বাইরে থেকে দেখে বোঝার উপায় নেই ভেতরে কী লুকিয়ে আছে। কিন্তু সেই দরজা পেরিয়ে উঠানে পা রাখলেই চমক লাগে—মেঝে থেকে দেয়াল, সবখানে জেলিজ মোজাইক আর তার ওপরে খোদাই করা স্টাকোর কারুকাজ, যা মারিনিদ স্থাপত্যের সবচেয়ে পরিশীলিত নমুনাগুলোর একটা বলে গণ্য করা হয়। (জর্জ মার্সাইস, লার্কিতেকতুর মুসুলমান দ’অক্সিদঁ , পৃষ্ঠা: ২৮৮-২৮৯, পারি: আর্তস এ মেতিয়ে গ্রাফিক, ১৯৫৪ খ্রি. ) এই হলো আল-আত্তারিন মাদ্রাসা—আকারে বেশি বড় নয়, কিন্তু এর গল্প ফেজের ইতিহাসের একটা গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ১৩২৩ থেকে ১৩২৫ সালের মধ্যে মারিনিদ সুলতান আবু সাইদ উসমান ফেজের প্রধান শিক্ষাকেন্দ্র ‘কারাউইয়িন’ বিশ্ববিদ্যালয়ের একেবারে গা ঘেঁষে এই মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন। (ইয়ানিক লিন্ৎস, মারোক মেদিয়েভাল: আঁ অম্পির দ্য লাফরিক আ লেসপান্য, পৃষ্ঠা: ৪৮৬, পারি: লুভ্র এদিসিওঁ, ২০১৪ খ্রি. ) ছাত্রদের অধিকাংশই ছিল গরিব ঘরের সন্তান—নিজের শহরে ফিরে গিয়ে একটা সম্মানজনক অবস্থান পাওয়ার আশায় তারা এখানে পড়াশোনা করতেন, আর মাদ্রাসা তাদের থাকা–খাওয়ার ব্যবস্থা করত। কেন ...

মানুষ ও পরিবেশের সম্পর্ক: ইসলাম যেভাবে মূল্যায়ন করে

  আল্লাহ–তাআলা এক সুনির্দিষ্ট ও সুষম নিয়মে এই প্রকৃতি সৃষ্টি করেছেন, যাতে সব উপাদান মিলে একটি নির্ধারিত লক্ষ্য পূরণে কাজ করতে পারে। সৃষ্টির সূচনালগ্নেই তিনি এই সবকিছুকে মানুষের কল্যাণে নিয়োজিত করেছেন এবং মানুষ যেন এর অন্তর্নিহিত রহস্য ও নিয়মগুলো উন্মোচন করতে পারে, সেই পথও সুগম করে দিয়েছেন। তাই প্রকৃতির কোনো উপাদান থেকে উপকৃত হলেই মুমিনের অন্তরে আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতার ফল্গুধারা বয়ে যায়। কারণ, মানুষ প্রকৃতিকে নিজের শক্তিতে জয় করেনি, বরং মহান আল্লাহই একে মানুষের জন্য অনুগত ও সহজ করে দিয়েছেন। পবিত্র কোরআনে বিষয়টি চমৎকারভাবে বলা হয়েছে, ‘আর তিনি আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সবকিছুকে তোমাদের কল্যাণে নিয়োজিত করেছেন।’ (সুরা জাসিয়া, আয়াত: ১৩) নিশ্চয়ই আল্লাহ সুন্দর এবং তিনি সৌন্দর্য পছন্দ করেন। মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ৩৭৮৯ এ বিশ্বাসের কারণে প্রকৃতির কোনো রুদ্ররূপ বা শক্তি দেখে মানুষের মনে কোনো অলীক ভয় বা কুসংস্কারের জন্ম হয় না। একজন মুসলিম একমাত্র আল্লাহর ওপর ইমান আনেন, শুধু তাঁরই ইবাদত করেন এবং তাঁরই কাছে সাহায্য প্রার্থনা করেন। প্রকৃতি আল্লাহরই অনন্য সৃষ্টি, তাই মানুষ একে ভালোবাসে, এর রহস্য অনুসন্ধা...

মহাবিশ্বে মানুষের অবস্থান: ফিতরাতি বাস্তুবিদ্যার দৃষ্টিকোণ

  ফিতরাতি বাস্তুবিদ্যা এমন একটি পরিবেশ দর্শন, যা মানুষ, প্রকৃতি এবং সমগ্র সৃষ্টিজগৎকে আল্লাহপ্রদত্ত ফিতরাহ বা স্বাভাবিক বিধানের আলোকে পাঠ করে। এই দৃষ্টিভঙ্গিতে প্রকৃতি কেবল পদার্থগত উপাদানের সমষ্টি নয়, আর মানুষও কেবল একটি উন্নত জৈবিক প্রাণী নয়। বরং উভয়েই একটি বৃহত্তর নৈতিক ও অস্তিত্বগত ব্যবস্থার অংশ, যার ভিত্তি তাওহিদ, আমানত এবং ভারসাম্য। এই দৃষ্টিকোণ মানুষকে নতুনভাবে পুনর্নির্ধারণ করতে চায়। আধুনিক বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যায় মানুষকে প্রায়ই একটি জটিল জৈব-স্নায়বিক ব্যবস্থা হিসেবে দেখা হয়। সেখানে মানুষের চিন্তা, সিদ্ধান্ত এবং আচরণকে ব্যাখ্যা করা হয় স্নায়ুকোষীয় সংযোগজাল (Neural Network), জৈব-রাসায়নিক প্রতিক্রিয়া (Biochemical Reaction) এবং পরিবেশগত প্রভাবসমূহের (Environmental Inputs) সমন্বিত নতিজা হিসেবে। এই ব্যাখ্যা মানুষের জৈবিক বাস্তবতার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক খোলাসা করে। কিন্তু মানুষের সমগ্র পরিচয়কে ধারণ করে না। সে শুধু তথ্য গ্রহণ ও প্রক্রিয়াকরণ করে না; বরং তথ্যের অর্থ, মূল্য, দায় এবং পরিণতি সম্পর্কেও বিচার করতে সক্ষম। মানুষের ভেতরে সিদ্ধান্ত গ্রহণ, নৈতিক মূল্যায়ন এবং জবাবদিহির ক্ষমতা নিহি...

যে ১০ কারণে আত্মার মৃত্যু হয়

  ইব্রাহিম ইবনে আদহাম (রহ.) ছিলেন বলখের বিখ্যাত বুজুর্গ ও আত্মশুদ্ধির পথিকৃৎ। দ্বিতীয় হিজরি শতকের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সাধক হিসেবে তিনি সমধিক পরিচিত। পার্থিব ভোগ-বিলাস ও সম্ভ্রান্ত জীবন ত্যাগ করে তিনি ধর্মের পথে নিজেকে সম্পূর্ণভাবে নিবেদিত করেছিলেন। তাবেয়ি যুগের বহু আলেম ও মুহাদ্দিসের সান্নিধ্য লাভ করেন। জ্ঞান, প্রজ্ঞা, ইবাদত এবং হৃদয়স্পর্শী নসিহার জন্য মুসলিম সমাজে তাঁর বিশেষ মর্যাদা ছিল। তিনি একদিন বসরার বাজার দিয়ে যাচ্ছিলেন। এসময় একদল লোক জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আমরা আল্লাহর কাছে দোয়া করি, কিন্তু আমাদের দোয়া কবুল হয় না কেন?’ তিনি বললেন, ‘১০ কারণে তোমাদের হৃদয়ের মৃত্যু হয়েছে, এজন্য দোয়া কবুল হয় না।’ এরপর তিনি কারণগুলো উল্লেখ করেন— তোমরা আল্লাহকে চিনেছ, কিন্তু তাঁর হক আদায় করোনি। তোমরা কোরআন পড়েছ, কিন্তু তার ওপর আমল করোনি। তোমরা নবীজির প্রতি ভালোবাসার দাবি করেছ, কিন্তু তাঁর সুন্নাহ পরিত্যাগ করেছ। তোমরা বলেছ, শয়তান তোমাদের শত্রু; অথচ তারই অনুসরণ করেছ। তোমরা বলেছ, জান্নাত সত্য, কিন্তু তার জন্য কোনো আমল করোনি। তোমরা বলেছ, জাহান্নাম সত্য, কিন্তু তা থেকে বাঁচার জন্য কোনো চেষ্টা করোনি।...