পরিবেশ সুরক্ষায় ইসলামের টেকসই রূপরেখা

 পরিবেশ বিপর্যয় ও জলবায়ু পরিবর্তন পৃথিবীর অন্যতম প্রধান ও মারাত্মক সমস্যা। মানুষের সীমাহীন লোভ, প্রাকৃতিক সম্পদের যথেচ্ছ ব্যবহার এবং শিল্পায়নের নামে প্রকৃতির ওপর চালানো শোষণ আজ পুরো পৃথিবীকে এক অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

ইসলাম পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা ও প্রকৃতির সুরক্ষায় এমন কিছু কালজয়ী নীতিমালা ও আইনি কাঠামো উপহার দিয়েছে, যা যেকোনো পরিবেশবাদী দর্শনের চেয়ে অনেক বেশি আধুনিক ও কার্যকর। ইসলামে পরিবেশের যত্ন নেওয়া সাময়িক নাগরিক ফ্যাশন বা লোকদেখানো চুক্তি নয়, বরং এটি মানুষের সামগ্রিক ইমান ও ঐশী দায়িত্বের অংশ।

ইসলামে পরিবেশের প্রতি দায়িত্ব

ইসলামি চিন্তাধারায় এই মহাবিশ্ব এবং এর মধ্যকার সমস্ত উপাদান—পানি, বাতাস, মাটি, পাহাড় ও উদ্ভিদ—মহান আল্লাহর সুনিপুণ সৃষ্টি এবং তাঁর পরম ক্ষমতার বাস্তব নিদর্শন। প্রকৃতিকে মানুষের কল্যাণে নিয়োজিত করা হলেও মানুষকে এর ওপর স্বেচ্ছাচারী মালিকানা দেওয়া হয়নি।

মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে ‘খলিফা’ (প্রতিনিধি) হিসেবে, যার মূল দায়িত্ব পৃথিবীর বুক থেকে বিপর্যয় দূর করা এবং এর প্রাকৃতিক সুষমা বজায় রাখা।

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ–তাআলা এই ভারসাম্য বজায় রাখার তাগিদ দিয়ে ঘোষণা করেছেন, “আর তোমরা জমিনে শান্তি স্থাপনের পর তাতে বিপর্যয় সৃষ্টি করো না।” (সুরা আরাফ, আয়াত: ৫৬)

মানুষের কৃতকর্মের দরুন স্থলে ও সমুদ্রে বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়েছে।
কোরআন, সুরা রুম, আয়াত: ৪১

কিন্তু আধুনিক মানুষ এই আমানতের খিয়ানত করে চলেছে। মানুষের অবিবেচকমূলক আচরণের কারণেই আজ ওজোন স্তর ধ্বংস হচ্ছে, নদী-নালা দূষিত হচ্ছে এবং বনাঞ্চল বিলুপ্ত হচ্ছে।

এই মানবসৃষ্ট দুরবস্থার নিখুঁত চিত্র তুলে ধরে পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেছেন, “মানুষের কৃতকর্মের দরুন স্থলে ও সমুদ্রে বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়েছে।” (সুরা রুম, আয়াত: ৪১)

ইসলাম এ ধরনের সব বস্তুতান্ত্রিক ও পরিবেশগত ক্ষতিসাধনকে সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ বা হারাম ঘোষণা করেছে। কারণ, পরিবেশের যেকোনো উপাদানের ক্ষতি করা প্রকারান্তরে মানুষের নিজের অস্তিত্ব সংকটে ফেলা।

অপচয় রোধ: পরিবেশ সুরক্ষার ভিত্তি

পরিবেশ ধ্বংসের অন্যতম মূল অনুঘটক হলো সম্পদের অপচয় এবং অতিরিক্ত ভোগবাদী মানসিকতা। ইসলাম জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে মধ্যপন্থা অবলম্বনের নির্দেশ দিয়েছে। এমনকি ইবাদতের মতো পবিত্র কাজেও প্রাকৃতি সম্পদ যেন অপচয় না হয়, সেদিকে কঠোর নজর রাখতে বলা হয়েছে।

পানি ব্যবহারের ক্ষেত্রে নবীজির একটি নির্দেশনা আধুনিক পরিবেশবিজ্ঞানীদের জন্য শিক্ষণীয় হতে পারে। তিনি সাহাবি সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাসকে অজু করার সময় অতিরিক্ত পানি ব্যবহার করতে দেখে বলেছেন, “এই অপচয় কেন?”

সাদ (রা.) বিস্ময় প্রকাশ করে আরজ করলেন, ‘অজুতেও কি অপচয় হয়?’ নবীজি জবাব দিলেন, “হ্যাঁ, এমনকি তুমি যদি কোনো প্রবহমান নদীর তীরেও অবস্থান করো, তবু।” (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ৪২৫)এই নির্দেশনা প্রমাণ করে যে প্রাকৃতিক সম্পদ যদি বিপুল পরিমাণেও সহজলভ্য হয়, তবু তা যথেচ্ছ অপচয় করার অধিকার মানুষের নেই।

প্রকৃতির প্রতি ইসলামের এই সংবেদনশীলতা শুধু শান্তিকালীন সমাজে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং যুদ্ধের মতো চরম অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতেও তা বজায় রাখার বাধ্যবাধকতা ছিল।

মহানবী (সা.) এবং ইসলামের প্রথম খলিফা আবু বকর সিদ্দিক (রা.) যখন মুসলিম বাহিনীকে কোনো অভিযানে প্রেরণ করতেন, তখন প্রধান সেনাপতি ও সৈন্যদের প্রতি কিছু সুনির্দিষ্ট মানবিক ও পরিবেশগত নীতিমালা জারি করতেন—বিজিত অঞ্চলের পরিবেশ, গাছপালা ও ফসলের কোনো ক্ষতি করা যাবে না।

তাঁরা নির্দেশ দিতেন, ‘তোমরা কোনো ফলবান বৃক্ষ কাটবে না, শস্যক্ষেত্র পুড়িয়ে নষ্ট করবে না এবং গবাদিপশু অপ্রয়োজনে জবাই করবে না।’ (মুওয়াত্তা ইমাম মালেক, হাদিস: ৯৬৫)

তৎকালীন আরবের মরু সংস্কৃতির প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে সবুজ প্রকৃতির সুরক্ষায় এমন দূরদর্শী আইনি নির্দেশনা অবাক করার মতো।

কেউ যদি নিজস্ব মালিকানা জায়গায় এমন মিল-কারখানা গড়ে তোলে, যার নির্গত ধোঁয়া বা বর্জ্য পরিবেশের ক্ষতি করে কিংবা প্রতিবেশীর স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ায়, তবে রাষ্ট্র তা বন্ধ করতে আইনি পদক্ষেপ নিতে বাধ্য।

পরিবেশ সুরক্ষায় ইসলামের মৌলিক নীতিমালা

ফকিহগণ (ইসলামি আইনজ্ঞ) পবিত্র কোরআন ও সুন্নাহর সামগ্রিক নির্দেশনার আলোকে এমন কিছু সর্বজনীন আইনি মূলনীতি (আল-কাওয়ায়েদুল ফিকহিয়্যাহ) প্রণয়ন করেছেন, যা বর্তমান যুগের স্থানীয় ও বৈশ্বিক পরিবেশগত সমস্যা সমাধানে সরাসরি প্রয়োগ করা সম্ভব। যেমন:

১. ক্ষতি দূরীকরণ: এই নীতির ভিত্তি নবীজির হাদিস, “ইসলামে নিজের ক্ষতি করা যাবে না এবং অন্যের ক্ষতিও করা যাবে না” (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ২৩৪০)।

ফকিহগণ বলেন, কেউ যদি নিজস্ব মালিকানা জায়গায় এমন মিল-কারখানা গড়ে তোলে, যার নির্গত ধোঁয়া বা বর্জ্য পরিবেশের ক্ষতি করে কিংবা প্রতিবেশীর স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ায়, তবে রাষ্ট্র তা বন্ধ করতে আইনি পদক্ষেপ নিতে বাধ্য।

২. ক্ষতি প্রতিরোধের গুরুত্ব: পরিবেশ থেকে ক্ষণস্থায়ী বা ব্যক্তিগত মুনাফা অর্জনের চেয়ে পরিবেশের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি প্রতিরোধ করা ইসলামের দৃষ্টিতে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। (ড. সালিহা আশি, হিমায়াতু ওয়া রিআয়াতুল বিআতি ফিল ইসলাম, হাজ লাখদার বিশ্ববিদ্যালয়, বাতনা, আলজেরিয়া, ২০০৬, পৃষ্ঠা: ৪৮)।

যদি বন কেটে বা নদী ভরাট করে সাময়িক আর্থিক লাভ পাওয়া যায়, আর তার ফলে আবহাওয়া ও জনস্বাস্থ্যের অপূরণীয় ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা থাকে, তবে ইসলাম সেই লাভজনক প্রকল্প অবিলম্বে বন্ধ রাখার নির্দেশ দেয়।

৩. সাধ্যানুযায়ী ক্ষতি দূর করা: যদি কোনো শিল্পকারখানা বা মানবিক কর্মকাণ্ডের ফলে পরিবেশ বা জনপদের ক্ষতি অলক্ষ্যে হয়েই যায়, তবে তাৎক্ষণিকভাবে তা যতটা সম্ভব দূর করার ব্যবস্থা নিতে হবে। (ইসলামি ফিকহ একাডেমি, আল–বিআতু ওয়াল–ইসলাম, দারুল কলম, দামেস্ক, সিরিয়া, দ্বিতীয় প্রকাশ: ২০০৪, পৃষ্ঠা ১১২)

রাষ্ট্রপ্রধান বা যথাযথ কর্তৃপক্ষ পরিবেশদূষণকারী ব্যক্তি বা সংস্থাকে তাদের সৃষ্ট বর্জ্য বা আবর্জনা নিজস্ব খরচে পরিষ্কার করতে বাধ্য করতে পারে।

৪. গুরুতর ক্ষতি দূরীকরণে লঘুতর ক্ষতির নীতি: যখন পরিবেশের সামগ্রিক স্বার্থের সঙ্গে কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত অর্থনৈতিক স্বার্থের সংঘাত বাধে, তখন এই নীতি প্রযুক্ত হয়।

যেমন, বৃহত্তর জনস্বার্থে ও মারাত্মক বায়ুদূষণ রোধে কোনো আবাসিক এলাকার ভেতর গড়ে ওঠা চামড়ার ট্যানারি বা ইটের ভাটা বন্ধ বা দূরবর্তী স্থানে স্থানান্তর করা জরুরি। এখানে মালিকের কিছুটা আর্থিক ক্ষতি (লঘুতর ক্ষতি) হলেও পুরো এলাকার হাজারো মানুষের জীবন ও স্বাস্থ্য রক্ষা (বৃহত্তর কল্যাণ) করাটাই আইনের দৃষ্টিতে অগ্রগণ্য।৫. যা হারামের দিকে নিয়ে যায়, তা হারাম: মানুষের স্বাস্থ্য ও স্বস্তি নষ্ট করে এমন সব উপাদান তৈরি বা নির্গমন করা ইসলামে নিষিদ্ধ। কারখানার বিষাক্ত কালো ধোঁয়া, ক্ষতিকর রাসায়নিক বা তীব্র শব্দদূষণ যা মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে ব্যাহত করে, তা এই নীতির অধীনে সম্পূর্ণরূপে অবৈধ ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

৬. ওয়াজিবের পরিপূরক উপাদান ওয়াজিব: জনগণকে পরিবেশদূষণের হাত থেকে রক্ষা করা রাষ্ট্রের একটি অন্যতম প্রধান দায়িত্ব বা ওয়াজিব কাজ।

আর এই দায়িত্ব পালনের জন্য যদি পরিবেশবিষয়ক কঠোর আইন প্রণয়ন, কলকারখানার বর্জ্য শোধনাগার (ইটিপি) বাধ্যতামূলক করা কিংবা ক্ষতিকর প্লাস্টিকের ব্যবহার নিষিদ্ধ করার মতো প্রশাসনিক আদেশ জারির প্রয়োজন হয়, তবে সেই আইন ও নীতিমালা তৈরি করাও রাষ্ট্রের জন্য ওয়াজিব হয়ে দাঁড়ায়।

পরিবেশের পরিচর্যায় ইসলামের পদক্ষেপ

ইসলাম পরিবেশ রক্ষায় সুনির্দিষ্ট কিছু কাজের মাধ্যমে পৃথিবীকে সবুজ, সুন্দর ও বাসযোগ্য রাখার কার্যকর দিকনির্দেশনা দিয়েছে।

অনাবাদি জমি পুনরুদ্ধার: ইসলাম অনাবাদি জমি ফেলে রাখার ঘোর বিরোধী। অনাবাদি বা মরুপ্রায় জমিকে গাছপালা লাগিয়ে পুনরুজ্জীবিত করার জন্য ইসলামে বিপুল সওয়াবের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।

মহানবী (সা.) বলেছেন, “যে ব্যক্তি কোনো মৃত (অনাবাদি) জমিকে জীবিত (চাষযোগ্য) করবে, সে জমি তার।” (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ১৩৭৮)

বৃক্ষরোপণ: বৃক্ষরোপণকে ইসলামে ‘সদকায়ে জারিয়া’ বা চিরস্থায়ী দান হিসেবে গণ্য করা হয়েছে।

মহানবী (সা.) বলেন, “যদি তোমাদের কারও হাতে একটি গাছের চারা থাকে আর এরই মধ্যে কেয়ামত কায়েম হতে শুরু করে, তবু সে যেন চারাটি রোপণ করে দেয়।” (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ১২৯৮১)

গাছ কাটায় নিষেধাজ্ঞা: অকারণে বা অপ্রয়োজনে সবুজ গাছপালা সাবাড় করা পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করে। ইসলাম এই ধ্বংসাত্মক কাজ পছন্দ করে না।

মহানবী (সা.) বলেছেন, “যে ব্যক্তি (অকারণে বা পথচারীদের ছায়া নষ্ট করতে) কোনো বরইগাছ কাটবে, আল্লাহ তাকে উপুড় করে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন।” (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৫২৪১)

ইমানের ৭০টির বেশি শাখা রয়েছে, তার মধ্যে সর্বোত্তম হলো ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলা এবং সর্বনিম্ন হলো রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু (আবর্জনা, পাথর বা কাঁটা) সরিয়ে ফেলা।
সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৩৫

রাস্তাঘাট পরিষ্কার ও বর্জ্য অপসারণ: পরিবেশকে পরিচ্ছন্ন রাখা ও জনদুর্ভোগ লাঘব করাকে ইমানের অংশ ঘোষণা করা হয়েছে।

মহানবী (সা.) বলেছেন, “ইমানের ৭০টির বেশি শাখা রয়েছে, তার মধ্যে সর্বোত্তম হলো ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলা এবং সর্বনিম্ন হলো রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু (আবর্জনা, পাথর বা কাঁটা) সরিয়ে ফেলা।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৩৫)

রাস্তাঘাটে যত্রতত্র থুতু ফেলা, মলমূত্র ত্যাগ বা ময়লা ফেলে পরিবেশ দুর্গন্ধময় করাকে ইসলামে অভিশপ্ত কাজ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৫১৬)

শেষ কথা

ইসলামের পরিবেশনীতি স্রষ্টার প্রতি আনুগত্য ও সৃষ্টির প্রতি ভালোবাসার অপূর্ব সমন্বয়। পানি, বাতাস, মাটি আর সবুজ উদ্ভিদ—এই প্রধান উপাদানগুলোর শুদ্ধতার ওপরই মানবজাতির টিকে থাকা নির্ভর করছে।

বিশ্বজুড়ে পরিবেশ রক্ষার জন্য যে হাহাকার চলছে, তার প্রকৃত ও স্থায়ী সমাধান লুকিয়ে আছে ইসলামের এই সংযম, অপচয়হীনতা ও প্রকৃতির প্রতি পরম মমত্ববোধের শিক্ষার মধ্যে।

আমরা যদি ব্যক্তিগত ও রাষ্ট্রীয় জীবনে ইসলামের এই পরিবেশবাদী আইনের যথাযথ প্রতিফলন ঘটাতে পারি, তবেই এই পৃথিবীকে আগামী প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ, সুন্দর ও সবুজ শান্তিময় নীড় হিসেবে রেখে যাওয়া সম্ভব হবে।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

দিরিলিসের আরতুগ্রুলের সকল পর্ব কিভাবে দেখবেন?

ড. খন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর বই Pdf Download

নেক আমলে অবিচল রাখবে যে ১০ আয়াত