ব্যবসায় যে ১০ কাজ নিষিদ্ধ করেছে ইসলাম

 ব্যবসায়িক সততা ইবাদতের অন্যতম প্রধান অংশ। বর্তমানের তীব্র প্রতিযোগিতামূলক বাজারে অধিক মুনাফা লাভের আশায় অনেকেই এমন কিছু পদ্ধতি বেছে নেন, যা ইসলামের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ অবৈধ।

যান্ত্রিক ও ব্যস্ত এই জীবনে জেনে বা না জেনে করা এই নিষিদ্ধ কাজগুলো আমাদের হালাল উপার্জনের বরকত পুরোপুরি নষ্ট করে দিতে পারে। চলুন জেনে নিই ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে ইসলামের নিষিদ্ধ করা ১০টি গুরুত্বপূর্ণ দিক এবং এর ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে।

১. পণ্যের কৃত্রিম সংকট তৈরি করা

অধিক মুনাফার লোভে বাজারে পণ্যের কৃত্রিম সংকট তৈরি করা বা সিন্ডিকেটের মাধ্যমে দাম বাড়ানো ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। মানুষের বা গৃহপালিত পশুর খাদ্যশস্য আটকে রেখে বাজারে কৃত্রিম সংকট ও মূল্যবৃদ্ধি করা হানাফি মাজহাবে মাকরুহে তাহরিমি (নিষিদ্ধ)। (আল-মারগিনানি, আল-হেদায়া, ৪/৩৭৫, মাকতাবাতুল বুশরা, করাচি, ২০২১)

রাসুল (সা.) এই বিষয়ে বলেছেন, “যে ব্যক্তি মুসলমানদের খাদ্যশস্য চল্লিশ দিন যাবৎ মজুত করে রাখবে, আল্লাহ তাকে কুষ্ঠরোগ ও দারিদ্র্য দ্বারা শাস্তি দেবেন।” (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ২১৫৫)

২. মাপে ও ওজনে কম দেওয়া

ব্যবসায় ক্রেতাকে ওজনে কম দেওয়া বা ঠকানো একটি সামাজিক ও ধর্মীয় অপরাধ। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ এ বিষয়ে বলেছেন, “যারা মাপে কম দেয়, তাদের জন্য দুর্ভোগ।” (সুরা মুতাফফিফিন, আয়াত: ১)

আল্লাহ আরও নির্দেশ দিয়েছেন, “আর যখন তোমরা পরিমাপ করবে, তখন পূর্ণ পরিমাপ করবে এবং সঠিক দাঁড়িপাল্লায় ওজন করবে।” (সুরা বনি ইসরাইল, আয়াত: ৩৫)

৩. পণ্যের ত্রুটি লুকিয়ে বিক্রি করা

পণ্যের কোনো ত্রুটি থাকলে তা ক্রেতার কাছে স্পষ্ট না করে বিক্রি করা এক ধরনের প্রতারণা। ইমাম আবু হানিফার মতে, বিক্রেতা যদি পণ্যের দোষ গোপন করে এবং ক্রেতা তা না জেনে কেনে, তবে ক্রেতার সেই চুক্তি বাতিল করার পূর্ণ অধিকার থাকে। (ইমাম আল-কুদুরি, আল-মুখতাসার, ১/২১০, মাকতাবাতুল বুশরা, করাচি, ২০১২)

নবীজি (সা.) বলেছেন, “যে ব্যক্তি প্রতারণা করল, সে আমার দলভুক্ত নয়।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১০২)

৪. মিথ্যা কসম খেয়ে পণ্য বিক্রি

পণ্যের গুণগত মান বা দাম নিয়ে বাজারে মিথ্যা কসম খাওয়া আজকের দিনে একটি সাধারণ বিষয়ে পরিণত হয়েছে। মিথ্যা কসম খেয়ে পণ্য বিক্রি করা সম্পূর্ণ হারাম এবং এর মাধ্যমে অর্জিত লভ্যাংশ অপবিত্র হয়ে যায়। (ইবনে আবিদিন, রাদ্দুল মুহতার, ৫/৯৮, দারুল ফিকর, বৈরুত, ১৯৯২)

রাসুল (সা.) বলেছেন, “মিথ্যা শপথ পণ্য দ্রুত বিক্রি করায় বটে, কিন্তু তা ব্যবসার বরকত ধ্বংস করে দেয়।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২০৮৭)

৫. সুদভিত্তিক আর্থিক লেনদেন

ব্যবসায়িক পুঁজি বাড়াতে বা যেকোনো প্রয়োজনে সুদের আদান-প্রদান করা ইসলামে সবচেয়ে বড় গুনাহের একটি। আল্লাহ সুদের ভয়াবহতা সম্পর্কে ঘোষণা করেছেন, “আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন।” (সুরা বাকারা, আয়াত: ২৭৫)

সুদের সাথে জড়িত সবার প্রতি লানত জানিয়ে নবীজি (সা.)। হাদিসে এসেছে, তিনি সুদখোর, সুদদাতা, সুদের লেখক এবং এর সাক্ষীদ্বয়কে অভিসম্পাত করেছেন। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৫৯৮)

৬. ভেজাল ও নকল পণ্য সরবরাহ করা

আসল পণ্যের নামে নকল বা ভেজাল পণ্য বাজারে ছেড়ে ক্রেতাকে ধোঁকা দেওয়া ইসলামি শরিয়তে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। ইমাম শাফেয়ি লিখেছেন, ব্যবসার মূল ভিত্তি হলো সততা, তাই পণ্যের মূল উপাদানে যেকোনো ধরনের ভেজাল মিশ্রণ চুক্তিকে অবৈধ করে তোলে। (ইমাম শাফেয়ি, কিতাবুল উম্ম, ৩/১২৫, দারুল মা'রিফা, বৈরুত, ১৯৯০)

হাদিস শরিফে এসেছে, রাসুল (সা.) একবার এক খাদ্য বিক্রেতার স্তূপের ভেতর হাত ঢুকিয়ে ভিজা দেখতে পেয়ে বললেন, “তুমি কেন এটা ওপরে রাখলে না যাতে মানুষ দেখতে পায়? যে ধোঁকা দেয় সে আমার লোক নয়। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১০২)

৭. কৃত্রিমভাবে দাম বাড়ানো

নিজে পণ্য না কিনে কেবল বাজারে দাম বাড়ানোর উদ্দেশ্যে কোনো পণ্যের অবাস্তব দাম হাঁকা বা ভুয়া ক্রেতা সেজে দাম বাড়িয়ে দেওয়াকে ইসলামে ‘নাজশ’ বলা হয়।

ইমাম মালিক লিখেছেন, বাজারে কৃত্রিম প্রতিযোগিতা তৈরি করে সাধারণ ক্রেতাকে বিভ্রান্ত করার এই প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। (আল-মুয়াত্তা, ২/৬৮৩, দারুল গারব আল-ইসলামি, বৈরুত, ১৯৯৭)

রাসুল (সা.) সরাসরি নির্দেশ দিয়ে বলেছেন, “তোমরা কেউ যেন ‘নাজশ’ করে দাম বাড়ানোর প্রতিযোগিতা না করো।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২১৪২)

৮. হারাম ও অবৈধ পণ্যের ব্যবসা

যেকোনো নেশাজাতীয় দ্রব্য, মূর্তি, শুকরের মাংস বা ইসলামে নিষিদ্ধ এমন যেকোনো বস্তুর ব্যবসা করা মুসলমানদের জন্য পুরোপুরি হারাম। যে জিনিস খাওয়া বা ব্যবহার করা হারাম, তার বাণিজ্যিক লেনদেন ও বাজারজাতকরণও সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ও বাতিল। (ইবনে হাজম, আল-মুহাল্লা, ৭/৫১২, দারুল আফাক আল-জাদিদাহ, বৈরুত, ১৯৮০)

রাসুল (সা.) মক্কা বিজয়ের বছর ঘোষণা করেছিলেন, “নিশ্চয়ই আল্লাহ ও তাঁর রাসুল মদ, মৃত জন্তু, শুকর এবং মূর্তির ব্যবসা হারাম করেছেন।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২২৩৬)

৯. অনিশ্চয়তাযুক্ত ব্যবসা

যে ব্যবসার লেনদেনে পণ্যের অস্তিত্ব, পরিমাণ বা হস্তান্তরের বিষয়টি সম্পূর্ণ অনিশ্চিত ও অস্পষ্ট, তাকে ‘বা–ইউল গারার’ বলা হয়। সাগরের মাছ ধরার আগেই তা বিক্রি করা বা গাছের ফল পাকার আগেই চূড়ান্ত বিক্রি করা এই অনিশ্চয়তার আওতাভুক্ত এবং এটি নিষিদ্ধ। (ইমাম নববি, শারহু সহিহ মুসলিম, ১০/১৫৬, দারুল ইহয়া আত-তুরাস আল-আরাবি, বৈরুত, ১৯৭২)

হাদিস অনুসারে নবীজি ধোঁকা ও অনিশ্চয়তাযুক্ত (গারার) কেনাবেচা করতে নিষেধ করেছেন। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৫১৩)

১০. অন্যের কেনাবেচার ওপর হস্তক্ষেপ করা

কোনো ক্রেতা ও বিক্রেতার মধ্যে যখন একটি পণ্যের দাম চূড়ান্ত হওয়ার পর্যায়ে থাকে, তখন মাঝখানে ঢুকে সেই ব্যবসা ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা করা সামাজিক সম্প্রীতি নষ্ট করে।

এই ধরনের আচরণ বাজারে হিংসা ও বিশৃঙ্খলা তৈরি করে, তাই শরিয়ত একে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে। (ইবনে হাজার আসকালানি, ফাতহুল বারি, ৪/৩৫৪, দারুল মা'রিফা, বৈরুত, ১৩৭৯ হিজরি)

রাসুল (সা.) বলেছেন, “কোনো ব্যক্তি যেন তার ভাইয়ের সওদার ওপর সওদা না করে।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২১৪০)

তিনটি প্রশ্ন ও উত্তর

প্রশ্ন ১: ইসলামে বৈধ ও হালাল ব্যবসার প্রধান শর্ত কী?

উত্তর: ইসলামে হালাল ব্যবসার প্রধান শর্ত হলো পারস্পরিক সন্তুষ্টি, সততা, পণ্যের স্পষ্ট বিবরণ এবং যেকোনো ধরনের ধোঁকা, সুদ ও অনিশ্চয়তা থেকে মুক্ত থাকা১ (সুরা নিসা, আয়াত: ২৯)

প্রশ্ন ২: কেউ অজান্তে ত্রুটিযুক্ত পণ্য বিক্রি করলে তার করণীয় কী?

উত্তর: জানার সঙ্গে সঙ্গে ক্রেতাকে বিষয়টি জানাতে হবে এবং ক্রেতা চাইলে পণ্য ফেরত নিয়ে পুরো টাকা ফেরত দিতে বিক্রেতা বাধ্য থাকবেন। (ইমাম আল-কুদুরি, আল-মুখতাসার, ১/২১০, মাকতাবাতুল বুশরা, করাচি, ২০১২)

প্রশ্ন ৩: সততার সঙ্গে ব্যবসা করার পুরস্কার কী?

উত্তর: সৎ ও বিশ্বস্ত ব্যবসায়ী কেয়ামতের দিন নবী, সিদ্দিক ও শহীদদের সাথে থাকবেন বলে রাসুল (সা.) সুসংবাদ দিয়েছেন। (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ১২০৯)

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

দিরিলিসের আরতুগ্রুলের সকল পর্ব কিভাবে দেখবেন?

ড. খন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর বই Pdf Download

নেক আমলে অবিচল রাখবে যে ১০ আয়াত