আশুরার প্রাচীন সংস্কৃতি ও ইতিহাস-বিবর্তনের গল্প

 মহররম মাসের ১০ তারিখ—আশুরা। বাঙালি মুসলিম সমাজের কাছে এই দিন মানেই কারবালার শোক, ইমাম হোসাইন (রা.)-এর শাহাদাতের বেদনাদায়ক স্মৃতি। কিন্তু ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, আশুরার তাৎপর্য কেবল কারবালার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।

কারবালার বহু শতাব্দী আগে থেকেই এই দিন মানবসভ্যতার বিভিন্ন ঘটনার সঙ্গে যুক্ত ছিল এবং একাধিক সংস্কৃতিতে বিশেষ গুরুত্ব বহন করত।

হিব্রু ঐতিহ্য ও আশুরার সংযোগ

মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) মদিনায় হিজরতের পর দেখলেন, সেখানকার ইহুদি সম্প্রদায় ১০ মহররম বিশেষ রোজা পালন করছে। কারণ জানতে চাইলে তারা বলল, এই দিনে আল্লাহ বনি ইসরাইলকে ফেরাউনের হাত থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন এবং হজরত মুসা (আ.) কৃতজ্ঞতাস্বরূপ রোজা রেখেছিলেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২০০০)

মহানবী (সা.) বললেন, ‘মুসা (আ.)-এর সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক তোমাদের চেয়ে ঘনিষ্ঠ এবং তিনিও এই দিনে রোজা রাখলেন।’

এই বিবরণ থেকে স্পষ্ট যে আশুরার শিকড় আব্রাহামিক ঐতিহ্যের গভীরে প্রোথিত। কেউ কেউ ইহুদিদের ইওম কিপুরের সঙ্গে আশুরার মিল খোঁজেন—উভয় ক্ষেত্রেই উপবাস ও আত্মশুদ্ধির ধারণা আছে। তবে এই তুলনা বিতর্কিত ও দুটি ভিন্ন ধর্মীয় ঐতিহ্যের প্রসঙ্গকে সহজে এক করা উচিত নয়।মহানবী (সা.) পরে মুসলিমদের জন্য ইহুদিদের থেকে আলাদা পরিচয় বজায় রাখতে নবম অথবা একাদশ মহররমের সঙ্গে মিলিয়ে দুটি রোজা রাখার পরামর্শ দেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২০০৩)

প্রাক্‌-ইসলামি আরবে আশুরা

ইসলামের আগেও মহররম মাস ও আশুরার দিনটি আরবে বিশেষ মর্যাদা রাখত। কুরাইশরা এই দিনে কাবা শরিফে নতুন গিলাফ চড়াত এবং বিভিন্ন ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা পালন করত। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৫৯২)

তখন এটি শোকের দিন ছিল না, বরং একধরনের পবিত্র উৎসবের দিন।

পবিত্র কোরআনে মহররমসহ চারটি মাসকে ‘আশহুরুল হুরুম’ বা সম্মানিত মাস হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে, যেখানে যুদ্ধবিগ্রহ নিষিদ্ধ। (সুরা তওবা, আয়াত: ৩৬)

প্রাক্‌-ইসলামি আরবের গোত্রগুলোও এই রীতি মানত—মহররম এলে অস্ত্র নামিয়ে রাখত। ফলে এই মাস, বিশেষভাবে আশুরার দিনটি ইসলামের আগে থেকেই আরবের মানুষের কাছে পবিত্রতা ও সামাজিক শৃঙ্খলার সঙ্গে যুক্ত ছিল।

প্রাচীন কালগণনা ও আশুরা

নৃতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে প্রাচীন সেমিটিক সভ্যতায় চান্দ্রবর্ষের প্রথম মাসের প্রথম দশককে শুদ্ধিকরণ ও নতুন সূচনার সময় মনে করা হতো। মহররম হিজরি বর্ষের প্রথম মাস হওয়ায় এর দশম দিনটি স্বাভাবিকভাবেই প্রাচীন মানুষের কাছে একটি চক্রের সমাপ্তি এবং নতুনের সূচনার প্রতীক হয়ে উঠেছিল।ইসলাম এই প্রাচীন ধারণাকে পৌত্তলিক আচার থেকে মুক্ত করে তাওহিদের ভিত্তিতে পুনর্গঠিত করেছে। বাহ্যিক উৎসব বা গোত্রীয় আনুষ্ঠানিকতার জায়গায় এসেছে রোজা, আত্মশুদ্ধি ও আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা।

কারবালার পর আশুরার রূপান্তর

৬১ হিজরির পর আশুরার সাংস্কৃতিক চরিত্রে বড় পরিবর্তন আসে। এর আগে মুসা (আ.)-এর মুক্তির স্মৃতি ও কৃতজ্ঞতার রোজার সঙ্গে যুক্ত ছিল, হজরত হোসাইনের শাহাদাতের পর তা মুসলিম উম্মাহর একটি বড় অংশের কাছে শোকের প্রতীকে পরিণত হয়।

বিশেষত শিয়া সম্প্রদায়ের মধ্যে ও উপমহাদেশীয় সংস্কৃতিতে তাজিয়া মিছিল ও মাতমের রীতি গড়ে ওঠে। সমাজবিজ্ঞানীরা এটিকে একটি প্রাচীন ধর্মীয় অনুশাসনের ধীরে ধীরে সাংস্কৃতিক রূপান্তর হিসেবে বিশ্লেষণ করেন। (ড. আকবর এস. আহমেদ, ইসলাম, গ্লোবালাইজেশন অ্যান্ড পোস্ট মডার্নিটি, রুটলেজ, লন্ডন, ১৯৯৪)

শেষ কথা

আশুরা একটি বহুস্তরীয় দিন। এর সঙ্গে যুক্ত আছে হজরত মুসা (আ.)-এর মুক্তির ঘটনা, প্রাক্‌-ইসলামি আরবের পবিত্রতার ধারণা, ইসলামের আত্মশুদ্ধির শিক্ষা ও কারবালার ঐতিহাসিক ট্র্যাজেডি।

এই সব কটি স্তরকে একসঙ্গে বোঝার চেষ্টা না করলে আশুরার পূর্ণ তাৎপর্য অনুধাবন করা কঠিন। ইসলামের দৃষ্টিতে এই দিনের মূল শিক্ষা রোজা ও কৃতজ্ঞতার—কুসংস্কার ও অতিরঞ্জন থেকে মুক্ত হয়ে সেই মূল শিক্ষায় ফিরে আসাই সচেতন পাঠকের কাজ।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

দিরিলিসের আরতুগ্রুলের সকল পর্ব কিভাবে দেখবেন?

ড. খন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর বই Pdf Download

নেক আমলে অবিচল রাখবে যে ১০ আয়াত