আল্লাহ কেন আমাদের সৃষ্টি করেছেন — অসীম রহমতের এক গল্প

 আল্লাহ কেন আমাদের সৃষ্টি করেছেন — অসীম রহমতের এক গল্প

------------------------------------------------- একটি অপ্রত্যাশিত শুরু: কয়েক সপ্তাহ আগে একটি ডকুমেন্টারিতে ডাইনোসর এবং পৃথিবীর সৃষ্টির বিভিন্ন পর্যায় নিয়ে আলোচনা দেখছিলাম। তখন মাথায় গভীর কিছু ভাবনা জেগে উঠল। এই পৃথিবীতে জুরাসিক যুগ, তার আগের ও পরের যুগগুলো— এই সবকিছু ঘটেছে প্রায় ৩৫ কোটি বছর আগে। আর আমরা মানবজাতি? সম্ভবত মাত্র এক লক্ষ বছর ধরে এই পৃথিবীতে আছি। কিন্তু এই সংখ্যাগুলোর আড়ালে একটি গভীর বিষয় লুকিয়ে আছে। আল্লাহ বিলিয়ন বিলিয়ন বছর ধরে এই পৃথিবীকে প্রস্তুত করেছেন — নিখুঁত বায়ুমণ্ডল, ওজোন স্তর, মাটি, পানি, উপত্যকা — শুধুমাত্র আমাদের জন্য। কুরআনে আল্লাহ বলেছেন, "সমগ্র আকাশমণ্ডলী এবং পৃথিবীর সবকিছু আমি তোমাদের জন্য অনুগত করে দিয়েছি।" সেই বিলিয়ন বিলিয়ন বছরের প্রস্তুতি ছিল কেবল আমাদের আগমনের জন্য। তাহলে প্রশ্ন জাগে — কেন? কেন আল্লাহ এই নতুন প্রজাতি সৃষ্টি করলেন? ফেরেশতাদের প্রশ্ন: ------------- ফেরেশতারা এই প্রশ্নটি আল্লাহকে সরাসরিই করেছিলেন। তাঁরা অবাক হয়েছিলেন — কারণ এই নতুন প্রজাতি উড়তে পারে না, ঘুমাতে হয়, খেতে হয়, বিশ্রাম নিতে হয়। আর সবচেয়ে বড় কথা — এরা ভুলপ্রবণ, পাপপ্রবণ। "আমরা তো অবিরাম আপনার তাসবীহ ও তাকবীর করছি" — ফেরেশতারা বললেন — "তাহলে এই প্রজাতির প্রয়োজন কী?" আর ফেরেশতারা এই কথা বলার যোগ্য। তারা কোটি কোটি বছর ধরে একটানা আল্লাহর ইবাদত করে আসছেন — ক্লান্তি নেই, বিরতি নেই, পাপ নেই। বায়তুল মামুরের চারপাশে অবিরাম তাওয়াফ। কিন্তু কিয়ামতের দিন যখন শিঙ্গায় ফুঁ দেওয়া হবে এবং ফেরেশতারাও সাময়িক মৃত্যুর মুখোমুখি হবেন, তখন তারা বলবেন — "সুবহানাকা রব্বানা, মা আবাদনাকা হাক্কা ইবাদাতিক" — হে আল্লাহ, আমরা আপনার ইবাদত সেভাবে করতে পারিনি যেভাবে করা উচিত ছিল। ভাবুন তো—কোটি কোটি বছরের নিরবচ্ছিন্ন ইবাদতের পরও ফেরেশতারা বলছেন আমরা যথেষ্ট ইবাদত করতে পারিনি। আর এমনকি রাসূল (সা) নিজেও তাহাজ্জুদে দাঁড়িয়ে বলতেন—"ইয়া রব, লা উহসি সানাআন আলাইক"—আমি কখনোই আপনার যথাযোগ্য প্রশংসা করতে পারব না। তাহলে আমরা কে? আমাদের ৬০-৭০ বছরের সীমিত জীবনে, যার বেশিরভাগটাই দুনিয়ার কাজে ব্যয় হয়ে যায়, আমরা কীভাবে আল্লাহর যথাযোগ্য ইবাদত করব? উত্তরটি যেখানে লুকিয়ে আছে: ----------------------- সহিহ মুসলিমে একটি হাদিস আছে যা এই প্রশ্নের অসাধারণ একটি উত্তর দেয়। রাসূল (সা) বলেছেন — "যদি তোমরা নিখুঁত হয়ে যেতে এবং পাপ করা বন্ধ করে দিতে, আল্লাহ তোমাদের নিশ্চিহ্ন করে দিতেন। তারপর তিনি এমন একটি প্রজাতি সৃষ্টি করতেন যারা পাপ করতো, তারপর আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতো, আর আল্লাহ তাদের ক্ষমা করে দিতেন।" এই হাদিসটি বুঝতে পারলে সবকিছু পরিষ্কার হয়ে যায়। আল্লাহ কি পাপ ভালোবাসেন? না, মোটেও না। "আল্লাহ ফাসাদ পছন্দ করেন না।" কিন্তু আল্লাহ ক্ষমা করতে ভালোবাসেন। আর ক্ষমা পেতে হলে, কাউকে আগে ক্ষমার প্রয়োজন তৈরি করতে হয়। ইবনুল কাইয়্যিম এই বিষয়টি সুন্দরভাবে বলেছেন — মানবজাতির অস্তিত্বের মাধ্যমে আল্লাহর এমন অনেক নাম ও গুণাবলির প্রকাশ ঘটে যা ফেরেশতাদের মাধ্যমে কখনো সম্ভব হতো না। আত-তাওয়াব, আল-গাফফার, আল-গাফুর, আর-রহমান — এই নামগুলো তখনই অর্থপূর্ণ হয়, যখন কেউ তওবা করে, ক্ষমা চায়, রহমত কামনা করে। ফেরেশতাদের পাপ নেই, তাই তাদের ক্ষমারও প্রয়োজন নেই। ফলে আল্লাহর এই অসীম রহমতের নামগুলো কেবল আমাদের মাধ্যমেই প্রকাশিত হয়। কুরআনে আল্লাহ নিজেই বলেছেন — "ওয়ালিযালিকা খালাকাহুম" — এই রহমত প্রদর্শন করার জন্যই আমি তাদের সৃষ্টি করেছি। আক্ষরিক অর্থেই। পারফেক্ট এবং নির্ভুল হওয়ার ভার থেকে মুক্তি: --------------------- * --------------- এই উপলব্ধি আমাদের জন্য এক বিশাল স্বস্তির বার্তা নিয়ে আসে। হে মুসলিম, নিখুঁত না হতে পারার কারণে কখনো আশা হারাবেন না। কারণ আল্লাহ আপনাকে নিখুঁত দেখতে চাননি। চাইলে ফেরেশতা সৃষ্টি করতেন, আমাদের সৃষ্টি করতেন না। আল্লাহ আপনার কাছে চান কেবল নিখুঁত হওয়ার আকাঙ্ক্ষা এবং চেষ্টা — এটা জেনেও যে আপনি কখনো নিখুঁত হতে পারবেন না। আমাদের পিতা আদম (আ)-এর কথা ভাবুন। তিনি জান্নাতে ছিলেন, ফেরেশতাদের সাক্ষাৎ পেয়েছিলেন, আল্লাহর সরাসরি কথা শুনেছিলেন। তবুও হোঁচট খেয়েছিলেন। তিনিই আমাদের পিতা। আমরাও তাঁরই সন্তান। আমরাও হোঁচট খাব। কিন্তু আদম (আ) যা করেছিলেন সেটাই আদর্শ — "রব্বানা যালামনা আনফুসানা, ওয়া ইল্লাম তাগফিরলানা ওয়া তারহামনা লানাকুনান্না মিনাল খাসিরিন।" হে আল্লাহ, আমি ভুল করেছি, কিন্তু আপনি ছাড়া আমার আর কোনো আশ্রয় নেই। এটাই রক্ষার পথ। শয়তান ভুল করেও অহংকারে তওবা করেনি। আদম ভুল করে বিনয়ের সাথে আল্লাহর দিকে ফিরেছেন। পার্থক্যটা এখানেই। অপরাধবোধ এবং হতাশা — দুটি ভিন্ন জিনিস ------------------------------------- আমরা যখন এখানে এসেছি, অনেকের মনেই অপরাধবোধ আছে। সেটা থাকা উচিত। অপরাধবোধ হলো একটি স্বীকৃতি — আমি ভুল করেছি। এটি সুস্থ একটি অনুভূতি। কিন্তু অপরাধবোধ যেন হতাশায় রূপ না নেয়। হতাশা হলো শয়তানের অস্ত্র, আদমের পথ নয়। অপরাধবোধ আপনাকে আরও ভালো হওয়ার দিকে ঠেলে দেবে — সেটাই এর কাজ। আল্লাহ বলেছেন, "ওয়ামাই ইয়াক্বনাতু মির রহমাতি রব্বিহি ইল্লাদ দল্লুন" — পথভ্রষ্ট ছাড়া কে আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়? আরেকটি আয়াতে বলেছেন — আল্লাহর রহমত থেকে কেবল কাফেররাই আশা ছেড়ে দেয়। একজন মুমিন সবসময় আশাবাদী। তাওবা। এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। ছোট গুনাহের জন্য সাধারণ তওবা যথেষ্ট। কিন্তু কবিরা গুনাহের জন্য সুনির্দিষ্ট তওবা প্রয়োজন — সেই পাপে আর না ফেরার আন্তরিক নিয়ত সহ। তওবার মাঝেই পাপ ত্যাগের সংকল্প নিহিত। সেই মানসিকতা না থাকলে তা সত্যিকারের তওবা নয়। আর তওবার পাশাপাশি — নামাজ, রোজা, ওযু, তাহাজ্জুদ — এগুলো হলো পাপ মোচনকারী আমল। রাসূল (সা) বলেছেন, যে ব্যক্তি দিনে পাঁচবার নামাজ পড়ে, সে যেন প্রতিদিন পাঁচবার গোসল করছে — কোনো ময়লা অবশিষ্ট থাকে না। আজ রাতে দুআ করুন — শুধু ক্ষমার জন্য নয়, বরং আন্তরিক তওবার তাওফিকের জন্য। হালাল জীবনযাপনকে সহজ করে দেওয়ার জন্য। হারামের দিকে ফিরে না যাওয়ার জন্য। শেষ কথা: রাসূল (সা) বলেছেন, আল্লাহ বলেন — তোমরা যদি আমার দিকে এক বিঘত এগিয়ে আসো, আমি তোমাদের দিকে এক হাত এগিয়ে যাবো। তোমরা যদি হেঁটে আসো, আমি দৌড়ে আসব। আল্লাহ কেবল চেষ্টাটুকুই চান। আপনি একবার ব্যর্থ হলেও সমস্যা নেই। দশবার হলেও। একশবার হলেও — যতক্ষণ আপনি প্রতিবার আল্লাহর দিকে ফিরে আসতে থাকেন। আল্লাহ দেখেন না আপনি কতবার পড়ে গেছেন। আল্লাহ দেখেন আপনি উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছেন কিনা। কখনো হাল ছাড়বেন না। উঠে দাঁড়ান। গুনাহ ঝেড়ে ফেলুন। আল্লাহর দিকে ফিরুন। বারবার ফিরুন। কারণ আল্লাহ আপনাকে এই উদ্দেশ্যেই সৃষ্টি করেছেন — তাঁর রহমতের স্পর্শ পাওয়ার জন্য। আর সেই রহমত পাওয়ার পথ সবসময় উন্মুক্ত। —শায়েখ ইয়াসির কাদী

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

দিরিলিসের আরতুগ্রুলের সকল পর্ব কিভাবে দেখবেন?

ড. খন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর বই Pdf Download

নেক আমলে অবিচল রাখবে যে ১০ আয়াত