তোমরা তো এতিমদের সম্মান করো না
তোমরা তো এতিমদের সম্মান করো না
------------------------------- ---------------- আল্লাহ তায়ালা সূরা আল-ফাজরে ইরশাদ করেছেন: كَلَّا بَل لَّا تُكْرِمُونَ الْيَتِيمَ -- “কখনোই নয়, বরং তোমরা এতিমকে সম্মান করো না।” এখানে একটু গভীরভাবে লক্ষ করুন—আল্লাহ কিন্তু এতিমকে সাহায্য না করার জন্য তিরস্কার করেননি; তিনি অভিযোগ করে বলেছেন, তোমরা এতিমকে সম্মান করো না। সবার আগে জেনে নেই, আগেকার দিনে আরবরা এতিম বলতে কাদের বুঝত? সে যুগের সমাজে এতিম মানে শুধু বাবা-মা হারা কোনো শিশু ছিল না। এতিম মানে ছিল এমন এক অসহায় মানুষ—যার কোনো সহায় নেই, কোনো আশ্রয় নেই। যার পাশে এসে দাঁড়ানোর মতো কোনো পরিবার নেই, অসুস্থ হলে কপালে হাত দিয়ে খোঁজ নেওয়ার মতো কেউ নেই, সে আজ খেয়েছে কিনা—তা জিজ্ঞেস করারও কেউ নেই। সমাজে যার কোনো অবলম্বন নেই, এককথায় সেই ছিল এতিম। ভয়ানক এক ব্যাধি: যার উপস্থিতি সম্পর্কেও আমরা সচেতন নই --------------------------------------------------- ----------------------------- দেখুন, সমাজে যারা আমাদের চেয়ে সামাজিক বা অর্থনৈতিক অবস্থানে ওপরে আছেন, তাদের সম্মান করা বেশ সহজ। আমরা খুব সহজেই আমাদের বস, শিক্ষক, মসজিদের ইমাম কিংবা ধনী মানুষদের সম্মান করি। কিন্তু আমাদের চেয়ে নিচের অবস্থানে থাকা মানুষকে সম্মান করাটাই আসল পরীক্ষা। যে মানুষটি আপনার বাড়িতে নষ্ট পানির কলটা ঠিক করতে আসেন কিংবা আপনার বাগানের ঘাস কাটেন, তাদের আলাদাভাবে সম্মান দেখানোর কথা আমাদের মাথায়ও আসে না। বর্তমান মুসলিম সমাজের এটি একটি বড় ব্যাধি। যারা কায়িক শ্রম বা দিনমজুরির কাজ করেন, তাদের আমরা প্রায়ই অত্যন্ত তুচ্ছ নজরে দেখি। অথচ আমরা এমন এক জাতি, যাদের কাছে ওহি এসেছিল—সব মানুষ সমান! আমাদের একমাত্র শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি হলো তাকওয়া—যা কেবল হৃদয়ের গভীরে থাকে, বাইরে থেকে পরিমাপ করা যায় না। দুর্ভাগ্যবশত, মুসলিম বিশ্বেই আজ এমন দৃশ্য অহরহ চোখে পড়ে—কোনো এক ধনী পরিবারের তরুণ সন্তান রেস্তোরাঁর ওয়েটারকে যত্রতত্র ধমকাচ্ছে, যেন সেই ছেলেটি কোনো আবর্জনা! কেবল বিপুল অর্থের দেমাগে তরুণটি এই ঔদ্ধত্য দেখাচ্ছে, আর ওই ছেলেটি স্রেফ পেটের দায়ে মুখ বুজে তা সহ্য করছে। সুবহানাল্লাহ! এই ব্যাধি কেবল অন্য কোথাও নয়, আমাদের অবচেতনেও গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। আমাদের মনস্তত্ত্বে বর্ণবাদ ও আভিজাত্যের অহংকার এমনভাবে ঢুকে গেছে যে, মুখে হয়তো আমরা নিজেদের অসাম্প্রদায়িক দাবি করি, কিন্তু আচরণে তার উল্টোটা প্রকাশ পায়। যখন আমরা শুনি, “অমুক অঞ্চলের লোক এসে পাশের ফ্ল্যাটে উঠেছে!”—তখনই আমাদের ভেতরে এক অদৃশ্য দেয়াল ও বৈষম্য তৈরি হয়। আমরা মানুষকে তার পেশা, অঞ্চল বা গায়ের রঙ দিয়ে বিচার করি এবং অসম্মান করি। আল্লাহর কাঠগড়ায় আমাদের অহংকার -------------------------------- ------------------ এই জঘন্য সামাজিক অপরাধের জন্যই আল্লাহ তায়ালা কঠোর ভাষায় তিরস্কার করেছেন। যেন আল্লাহ বলছেন, “তোমরা নিজেরা আল্লাহর কাছে সম্মানিত হতে চাও, অথচ সমাজে যারা দুর্বল—সেই এতিমদের তোমরা সম্মান করো না! তাহলে আল্লাহ কেন তোমাদের সম্মান দেবেন?” ইসলামের সুমহান ঐতিহ্য আমাদের শেখায়, এতিম ও অসহায়দের কেবল দয়া বা সাহায্য করাই যথেষ্ট নয়; বরং তাদের প্রাপ্য মর্যাদা ও শ্রদ্ধা নিশ্চিত করতে হবে। তাদের এমনভাবে সম্মান করতে হবে যেন তারা রাজকীয় কেউ। এই রাজকীয় শ্রদ্ধাবোধই ছিল আমাদের প্রকৃত মুসলিম ঐতিহ্য, যা আজ আমরা হারিয়ে ফেলেছি। —নোমান আলী খান —সূরা ফাজরের তাফসীর থেকে। (এডিটিং এর কাজ চলছে। কয়েকদিনের মধ্যেই পাবলিশ করবো। ইনশাআল্লাহ।)
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন