ইসলামি বর্ষপঞ্জির সূচনায় কেন ‘হিজরত’
সময় মানুষের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। পৃথিবীর সব কার্যক্রম সময়ের হিসাবের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এ কারণে মানবসভ্যতার শুরু থেকেই বিভিন্ন জাতি নিজস্ব বর্ষপঞ্জি ও সময় গণনাপদ্ধতি প্রবর্তন করেছে।
মুসলমানদের জন্য হিজরি সন তেমনই এক তাৎপর্যপূর্ণ কালপঞ্জি।
হিজরি সন কী
হিজরি সন হলো মুসলমানদের চন্দ্রভিত্তিক বর্ষপঞ্জি; যা চাঁদের আবর্তনের ওপর নির্ভর করে গণনা করা হয়। রমজানের রোজা, হজ, ঈদুল ফিতর, ঈদুল আজহা, আশুরা ও জাকাত নির্ধারণসহ ইসলামের মৌলিক ইবাদতগুলোর সময় ঠিক করতে হিজরি সন ব্যবহৃত হয়।
তবে নবীজির জীবদ্দশায় কোনো আনুষ্ঠানিক ইসলামি বর্ষপঞ্জি চালু ছিল না। আরবরা তখন বিভিন্ন ঐতিহাসিক ঘটনার নামে বছর চিহ্নিত করত। যেমন নবীজি (সা.)-এর জন্মের বছরটিকে ‘আমুল ফিল’ বা হাতির বছর হিসেবে অভিহিত করা হতো। (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৩৬১৯)
পরবর্তীকালে মুসলিম রাষ্ট্রের প্রশাসনিক প্রয়োজনে একটি সুনির্দিষ্ট বর্ষপঞ্জির দাবি উঠলে হিজরি সনের আনুষ্ঠানিক সূচনা ঘটে।
সরার প্রশাসক আবু মুসা আশআরি (রা.) লিখেছিলেন যে তাদের কাছে এমন অনেক সরকারি চিঠি আসে যার মাস উল্লেখ থাকে, কিন্তু বছর উল্লেখ না থাকায় সেগুলোর প্রকৃত সময় নির্ধারণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
প্রবর্তনের পটভূমি
পৃথিবীতে ইসলামের বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে মুসলিম রাষ্ট্রের প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডও ব্যাপক আকার ধারণ করে। নবীজির ইন্তেকালের পর বিভিন্ন অঞ্চল মুসলিম শাসনের অন্তর্ভুক্ত হয়।
রাষ্ট্র পরিচালনা, জাকাত ও খেরাজ আদায়, বিচারিক কার্যক্রম এবং সরকারি চিঠিপত্র সংরক্ষণের জন্য তখন তারিখ নির্ধারণ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।
সে সময় সরকারি নথিতে মাসের নাম উল্লেখ থাকলেও বছরের কোনো সুনির্দিষ্ট হিসাব ছিল না। ফলে নানামুখী বিভ্রান্তি সৃষ্টি হতো।
ঐতিহাসিক বর্ণনায় এসেছে, দ্বিতীয় খলিফা ওমরকে উদ্দেশ্য করে বসরার প্রশাসক আবু মুসা আশআরি (রা.) লিখেছিলেন যে তাদের কাছে এমন অনেক সরকারি চিঠি আসে যার মাস উল্লেখ থাকে, কিন্তু বছর উল্লেখ না থাকায় সেগুলোর প্রকৃত সময় নির্ধারণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। (ইবনে হাজার আসকালানি, ফাতহুল বারি, ৭/৩২২, মাকতাবাহ আস-সাফা, কায়রো, ২০০৩)এই বাস্তব সমস্যাই একটি স্বতন্ত্র ইসলামি বর্ষপঞ্জি প্রবর্তনের প্রয়োজনীয়তা সামনে নিয়ে আসে। মুসলমানদের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিচয় তখন বিশ্বমঞ্চে সুপ্রতিষ্ঠিত; তাই তাদের নিজস্ব ইতিহাস ও আদর্শের আলোকে একটি কালপঞ্জি প্রবর্তন সময়ের দাবি হয়ে ওঠে।
খলিফা ওমরের ঐতিহাসিক উদ্যোগ
হিজরি সন প্রবর্তনের কৃতিত্ব মূলত দ্বিতীয় খলিফা ওমরের দূরদর্শী নেতৃত্বের ফল। তাঁর শাসনামলে ইসলামি রাষ্ট্র দ্রুত সম্প্রসারিত হয় এবং প্রশাসনিক কাঠামো আরও সুসংগঠিত রূপ লাভ করে। তারিখ নির্ধারণের জটিলতা দূর করার লক্ষ্যে ১৭ হিজরিতে ওমর (রা.) সাহাবিদের সঙ্গে পরামর্শে বসেন।
ইসলামি বর্ষপঞ্জির সূচনা কোন ঘটনা থেকে হবে, তা নিয়ে বিভিন্ন মতামত উত্থাপিত হয়। কোনো কোনো সাহাবি নবুয়তপ্রাপ্তির বছর, কেউ ওফাতের বছর এবং কেউ হিজরতের বছরকে ভিত্তি করার প্রস্তাব দেন।
নবীজির জন্ম, নবুয়তপ্রাপ্তি কিংবা ওফাত—সবই ইসলামের ইতিহাসে অনন্য ঘটনা। তবুও সাহাবিরা হিজরতকেই বর্ষপঞ্জির সূচনা হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন; কারণ হিজরত ছিল সত্য ও মিথ্যার মধ্যে একটি স্পষ্ট বিভাজনরেখা।
দীর্ঘ আলোচনা-পর্যালোচনার পর হিজরতের ঘটনাকেই ইসলামি সনের সূচনাবিন্দু হিসেবে গ্রহণ করা হয়। (ইবনে হাজার আসকালানি, ফাতহুল বারি, ৭/৩২২, মাকতাবাহ আস-সফা, কায়রো, ২০০৩)
খলিফার এই উদ্যোগ মুসলিম সভ্যতার ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। আজ প্রায় চৌদ্দশ বছরেরও বেশি সময় ধরে বিশ্বের কোটি কোটি মুসলমান যে বর্ষপঞ্জি অনুসরণ করছে, তার ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিল তাঁরই সুদূরপ্রসারী সিদ্ধান্তের মাধ্যমে।
হিজরত কেন সূচনাবিন্দু
হিজরি সনের সূচনা হিসেবে হিজরতকে নির্বাচন করার পেছনে গভীর তাৎপর্য রয়েছে। নবীজির জন্ম, নবুয়তপ্রাপ্তি কিংবা ওফাত—সবই ইসলামের ইতিহাসে অনন্য ঘটনা। তবুও সাহাবিরা হিজরতকেই বর্ষপঞ্জির সূচনা হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন; কারণ হিজরত ছিল সত্য ও মিথ্যার মধ্যে একটি স্পষ্ট বিভাজনরেখা।মক্কায় মুসলমানরা দীর্ঘদিন নির্যাতনের শিকার হলেও মদিনায় হিজরতের মাধ্যমে তারা স্বাধীনভাবে ইসলাম প্রতিষ্ঠার সুযোগ লাভ করে। এখানেই ইসলামি সমাজ, রাষ্ট্র ও আইনব্যবস্থার বাস্তব প্রয়োগ শুরু হয়।
হিজরি সন মুসলমানদের সেই আত্মত্যাগ, সংগ্রাম এবং ইমানি চেতনার কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়, যার মাধ্যমে ইসলামের বিজয়যাত্রা নতুন গতি পেয়েছিল। (ইবনে হাজার আসকালানি, ফাতহুল বারি, ৭/৩২২, মাকতাবাহ আস-সফা, কায়রো, ২০০৩)
মহররম কেন প্রথম মাস
একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, হিজরতের ঘটনাটি সংঘটিত হয়েছিল রবিউল আউয়াল মাসে, তাহলে হিজরি বছরের প্রথম মাস হিসেবে মহররমকে নির্ধারণ করা হলো কেন?
ইতিহাসবিদরা উল্লেখ করেছেন, তৃতীয়ত খলিফা ওসমান (রা.)-এর পরামর্শক্রমে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কারণ মহররম ছিল আরবদের প্রচলিত বছরের প্রথম মাস। এ ছাড়া জিলহজ মাসে হজ সম্পন্ন হওয়ার পর মানুষ সাধারণত নতুন বছরের পরিকল্পনা ও নতুন কার্যক্রম শুরু করত।
শুধু ইবাদতের ক্ষেত্রেই নয়, হিজরি সন মুসলিম পরিচয় ও ঐতিহ্যেরও একটি বড় প্রতীক। এটি মুসলমানদের ইতিহাস, আত্মত্যাগ এবং সভ্যতার স্মৃতিকে জীবন্ত রাখে।
আকাবার দ্বিতীয় বাইয়াতের পর সাহাবিদের হিজরতের প্রস্তুতিও মূলত মহররম মাস থেকেই শুরু হয়েছিল। সে বিবেচনায় মহররমকে হিজরতের বাস্তব সূচনার মাস হিসেবে ধরা হয়।
এতে আরবদের প্রচলিত মাস গণনার ধারাবাহিকতা যেমন বজায় থাকে, তেমনি নতুন বর্ষপঞ্জি গ্রহণ করাও সবার জন্য সহজ হয়। (ইবনে হাজার আসকালানি, ফাতহুল বারি, ৭/৩২২, মাকতাবাহ আস-সফা, কায়রো, ২০০৩)
বর্তমান যুগে হিজরি সনের প্রাসঙ্গিকতা
আধুনিক বিশ্বে অধিকাংশ দেশ নাগরিক ও প্রশাসনিক কাজে সৌরভিত্তিক গ্রেগরিয়ান বর্ষপঞ্জি ব্যবহার করলেও হিজরি সনের গুরুত্ব মোটেও কমে যায়নি। ইসলামের মৌলিক ইবাদতগুলোর সময় নির্ধারণ আজও সম্পূর্ণভাবে হিজরি সনের ওপর নির্ভরশীল।
শুধু ইবাদতের ক্ষেত্রেই নয়, হিজরি সন মুসলিম পরিচয় ও ঐতিহ্যেরও একটি বড় প্রতীক। এটি মুসলমানদের ইতিহাস, আত্মত্যাগ এবং সভ্যতার স্মৃতিকে জীবন্ত রাখে। বর্তমান সময়েও মুসলিম দেশগুলো নিজস্ব সংস্কৃতি, শিক্ষা ও ধর্মীয় কার্যক্রমে হিজরি সনের ব্যবহার সগৌরবে অব্যাহত রেখেছে।
ফয়জুল্লাহ রিয়াদ : মুহাদ্দিস, জামিয়া আরাবিয়া দারুস সুন্নাহ রাজাবাড়ী, দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন