কোরআন থেকে ‘বরকত’ লাভের ৭ উপায়

 কোরআন সম্পর্কে আল্লাহ নিজেই বলেছেন, ‘(হে রাসুল) এটি এক বরকতময় গ্রন্থ, যা আমি তোমার প্রতি নাজিল করেছি, যাতে মানুষ এর আয়াতের মধ্যে চিন্তা করে এবং যাতে বোধসম্পন্ন ব্যক্তিগণ উপদেশ গ্রহণ করে।’ (সুরা সোয়াদ, আয়াত: ২৯)

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, আমরা এই কোরআন থেকে কীভাবে বরকত গ্রহণ করব এবং কেনই-বা আমরা নিয়মিত কোরআন পড়া সত্ত্বেও এর আলোয় জীবন আলোকিতা করতে পারছি না?

১. নিয়মিত কোরআন পাঠ

কোরআনকে নিজের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ বানিয়ে নিতে হবে। এমন যেন হয় যে কোরআন পাঠ না করলে মনের ভেতর একধরনের অশান্তি বিরাজ করে। এ জন্য এখন থেকেই প্রতিজ্ঞা করতে হবে যে আমি নিয়মিত কোরআন পাঠ করব।

তবে এই পাঠ শুদ্ধভাবে হতে হবে। অশুদ্ধ কোরআন পাঠ কখনো কার্যকর হবে না।

২. বিশুদ্ধ পাঠের চেষ্টা করা

কোরআনের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক তৈরি করতে হবে। এ জন্য কোরআন পড়ার সময় তাড়াহুড়া না করে ধীরে পড়ার নীতি অবলম্বন করতে হবে। আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘এবং ধীরস্থিরভাবে স্পষ্টরূপে কোরআন পাঠ করো।’ (সুরা মুজ্জাম্মিল, আয়াত: ৪)

৩. উঁচু আওয়াজে পাঠ করা

একেবারে মনে মনে পাঠ না করে একটু উঁচু আওয়াজে পাঠ করা। এটি মৃত হৃদয়কে জাগ্রত করতে সহযোগিতা করে।

হজরত কুরাইব (রাহ.) বলেন, ‘আমি ইবনে আব্বাসের কাছে রাতে নবীজির কিরাত পাঠের ধরন সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বললেন, “নবীজি তাঁর হুজরায় এমন স্পষ্ট ও ধীরস্থিরভাবে পাঠ করতেন যে কোনো মুখস্থকারী তা শুনে মুখস্থ করতে চাইলে অনায়াসেই তা মুখস্থ করে নিতে পারত।”’ (আখলাকুন্নবি, হাদিস: ৫৬১)৪. অর্থ বোঝার চেষ্টা করা

কোরআনের অর্থ বোঝা এবং তাতে চিন্তাফিকির করা। এর দ্বারা অন্তরে আল্লাহ–তাআলার মহত্ত্ব ও ভালোবাসা এবং পরকালের চিন্তা তৈরি হবে। এ জন্য সাধারণ মানুষের উচিত কোনো আলেমের তত্ত্বাবধানে কোরআন বোঝার চেষ্টা করা।

আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘(হে রাসুল!) এটি এক বরকতময় কিতাব, যা আমি তোমার প্রতি নাজিল করেছি, যাতে মানুষ এর আয়াতের মধ্যে চিন্তা করে এবং যাতে বোধসম্পন্ন ব্যক্তিগণ উপদেশ গ্রহণ করে।’ (সুরা সোয়াদ, আয়াত: ২৯)

আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বলেন, ‘আমাদের মধ্য থেকে কেউ যখন কোরআনের দশটি আয়াত শিখতেন, তখন তিনি সেই দশটি আয়াতের মর্মার্থ অনুধাবন ও সে অনুযায়ী আমল না করা পর্যন্ত (পরবর্তী আয়াতসমূহ শিখতে) সামনে অগ্রসর হতেন না।’ (ইবনে জারির তাবারি, তাফসিরে তাবারি, ১/৮০, দারু হাজার, কায়রো, ২০০১)

৫. কোরআন থেকে উপদেশ গ্রহণ করা

কোরআনের বিভিন্ন আয়াত ও সুরায় আল্লাহ–তাআলা পূর্ববর্তী উম্মতের ঘটনা, উপমা ইত্যাদি বর্ণনা করেছেন। এসব ঘটনা এ জন্য বর্ণনা করেছেন, যাতে মানুষ এখান থেকে শিক্ষালাভ করে।

কোরআনে বলা হয়েছে, ‘আল্লাহ (এ জাতীয়) দৃষ্টান্ত দেন, যাতে মানুষ উপদেশ গ্রহণ করে।’ (সুরা ইবরাহিম, আয়াত: ২৫)

৬. নিজের জন্য পাঠ করা

কোরআন পাঠের সময় মনের মধ্যে এই ভাব জাগ্রত করা যে আল্লাহ–তাআলা আমাকে সম্বোধন করে এই আয়াত নাজিল করেছেন; আমি যেন এই আয়াত থেকে শিক্ষা এবং হেদায়েত লাভ করতে পারি।

হাদিসে এসেছে, আনাস ইবনে মালিক (রা.) বলেন, ‘যখন এ আয়াত নাজিল হলো, ‘হে মুমিনরা, তোমরা নবীর কণ্ঠের ওপর নিজেদের কণ্ঠ উঁচু করবে না এবং নিজেদের মধ্যে যেভাবে উচ্চ স্বরে কথা বলো, তাঁর সঙ্গে সেরূপ উচ্চ স্বরে কথা বলবে না। এতে তোমাদের আমল বিনষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে; অথচ তোমরা টেরও পাবে না।’ (সুরা হুজুরাত, আয়াত: ২)—তখন সাবিত ইবনে কায়স (রা.) নিজের ঘরে বসে রইলেন এবং (কান্নাকাটি করে) বলতে লাগলেন, ‘আমি তো জাহান্নামি!’ এবং তিনি নবীজির দরবারে যাওয়া বন্ধ করে দিলেন।একদিন রাসুল (সা.) সাহাবি সাদ ইবনে মুআজকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘সাবিতের কী হলো?’ সাদ বললেন, ‘সে তো আমার প্রতিবেশী, তাঁর কোনো অসুখ হয়েছে বলে তো জানি না।’

আনাস (রা.) বলেন, ‘পরে সাদ (রা.) সাবিতের কাছে গেলেন এবং এবং তাঁর সম্পর্কে রাসুলের বক্তব্য উল্লেখ করলেন।’

তখন সাবিত বললেন, “এই আয়াত তো নাজিল হয়েছেই, আর তোমরা জানো যে আমার কণ্ঠস্বর রাসুলের কণ্ঠস্বরের চেয়ে উঁচু হয়ে যায়। সুতরাং আমি জাহান্নামি।” সাদ রাসুলের কাছে ফিরে এসে সাবিতের কথা জানালেন। সব শুনে নবীজি বললেন, “না, (সে জাহান্নামি নয়) বরং সে তো জান্নাতি।”’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৪৮৪৬)

৭. রাতে তেলাওয়াত

রাতে কোরআন তেলাওয়াত করলে এর আলাদা প্রভাব রয়েছে, রাতের তেলাওয়াত মনে শক্তি জোগায়। আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘অবশ্যই রাত্রিকালের জাগরণ এমন, যা কঠিনভাবে প্রবৃত্তি দলন করে এবং যা কথা বলার পক্ষে উত্তম।’ (সুরা মুজ্জাম্মিল, আয়াত: ৬)

কোরআনের বরকত না পাওয়ার ৩ কারণ

আলেমদের মতে, কোরআন থেকে আশানুরূপ উপকৃত হতে না পারার পেছনে মূলত তিনটি কারণ রয়েছে:

  • প্রথমত, নিয়মিত কোরআন পাঠ না করা। যারা কোরআন একেবারেই পাঠ করে না কিংবা করলেও অনিয়মিতভাবে, তারা স্বাভাবিকভাবেই কোরআনের বরকত থেকে বঞ্চিত থেকে যায়।

  • দ্বিতীয়ত, অসুস্থ অন্তরের অধিকারী হওয়া। যাদের অন্তর হিংসা, অহংকার, রিয়া (লোকদেখানো ইবাদত) কিংবা দুনিয়ার মোহের মতো বিভিন্ন আত্মিক রোগে অসুস্থ, তাদের হৃদয়ে কোরআনের বাণী কোনো ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে না।

  • তৃতীয়ত, উদাসীনতা, দুনিয়ার অনর্থক খেলাধুলা, বিনোদন কিংবা পাপকাজে ডুবে থাকায় মানুষের মন থেকে আল্লাহর ভয় উঠে যায়। ফলে কোরআনের বাণী শুনলেও তা তাদের হৃদয়ে দাগ কাটে না।

আল্লাহ বলেন, ‘তাদের কাছে তাদের পালনকর্তার পক্ষ থেকে যখন কোনো নতুন উপদেশ আসে, তারা তা খেলার ছলে শ্রবণ করে।’ (সুরা আম্বিয়া, আয়াত: ২)

আল্লাহ–তাআলা আমাদের কোরআন পড়া, বোঝা এবং এর ওপর আমল করার তওফিক দান করুন, আমিন।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

দিরিলিসের আরতুগ্রুলের সকল পর্ব কিভাবে দেখবেন?

ড. খন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর বই Pdf Download

নেক আমলে অবিচল রাখবে যে ১০ আয়াত