সংসারের টানাপোড়েনে নবীজির ভালোবাসার শিক্ষা

 অনেকেই মনে করেন, নবীজির সংসারে কখনো কোনো মতভেদ, অভিমান কিংবা মনোমালিন্য হয়নি। কিন্তু হাদিসের পাতাগুলো আমাদের অন্য এক বাস্তবতার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়।

সেখানে দেখা যায়, নবীজির স্ত্রীদেরও ছিল স্বাভাবিক চাওয়া-পাওয়া, অনুভূতি, আবেগ ও অভিমান। আর নবীজিও তাঁদের এই স্বাভাবিক মানবিক দিকগুলোকে অসাধারণ ধৈর্য, প্রজ্ঞা ও ভালোবাসার মাধ্যমে সামাল দিয়েছেন।

নবীজির জীবন ছিল দুনিয়াবিমুখ। তিনি কখনো বিলাসিতাকে জীবনের লক্ষ্য বানাননি। তাঁর ঘরে অনেক সময় দিনের পর দিন চুলা জ্বলত না। খেজুর ও পানি দিয়েই দিন কেটে যেত। অথচ তিনি চাইলে পৃথিবীর সব সম্পদ তাঁর পায়ের নিচে এসে জমা হতে পারত।

কিন্তু তিনি বেছে নিয়েছিলেন সরল জীবন, কারণ তাঁর লক্ষ্য ছিল আখেরাতের সফলতা।

অন্যদিকে নারীর স্বাভাবিক প্রকৃতি হলো একটু স্বাচ্ছন্দ্য কামনা করা। সুন্দর পোশাক, কিছুটা আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্য কিংবা পরিবারের প্রয়োজনীয় জিনিসের প্রত্যাশা করা কোনো অপরাধ নয়। তাই নবীজির স্ত্রীরাও মাঝে মাঝে নবীজির কাছে কিছু অতিরিক্ত ভরণপোষণের আবেদন করতেন।

আশ্চর্যের বিষয় হলো, তিনি কখনো এটিকে তাঁদের চরিত্রগত দুর্বলতা হিসেবে দেখেননি। বরং এটিকে মানুষের স্বাভাবিক চাহিদা হিসেবেই গ্রহণ করেছেন।

আশ্চর্যের বিষয় হলো, তিনি কখনো এটিকে তাঁদের চরিত্রগত দুর্বলতা হিসেবে দেখেননি। বরং এটিকে মানুষের স্বাভাবিক চাহিদা হিসেবেই গ্রহণ করেছেন।

হজরত হাফসা (রা.)–এর সঙ্গে একবার একটি বিষয়ে নবীজির আলোচনা হয়। কথোপকথন একসময় এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে নবীজি বললেন—চলো, একজন বিচারক নির্ধারণ করা যাক। হাফসা নিজের পিতা হজরত ওমরকেই সেই দায়িত্বের জন্য সম্মত হলেন।

কিন্তু কথোপকথনের এক পর্যায়ে তিনি বললেন, ‘আপনি যা বলবেন, সত্য বলেই বলবেন।’ এই বাক্য শুনে ওমর (রা.) প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। তিনি নিজের মেয়েকে কঠোরভাবে শাসন করতে উদ্যত হন। কিন্তু মহানবী (সা.) তাঁকে থামিয়ে দেন।

এখানেই ফুটে ওঠে নবীজির চরিত্রের সৌন্দর্য। তিনি রাগের মুহূর্তেও পরিস্থিতিকে শান্ত রাখলেন। স্ত্রীকে অপমান করলেন না, আবার শ্বশুরকেও সীমা অতিক্রম করতে দিলেন না। (সিরাতে হালাবিয়্যা: ৩/২১৭)এই ঘটনা আমাদের শেখায়, সংসারে অনেক সময় রাগের মাথায় এমন কিছু কথা উচ্চারিত হয়, যা প্রকৃতপক্ষে অন্তরের কথা নয়। মুহূর্তের আবেগে বলা এসব বাক্যকে কেন্দ্র করে যদি প্রতিশোধের আগুন জ্বালিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে একটি সুন্দর সম্পর্ক মুহূর্তেই ভেঙে যেতে পারে। তাই একজন স্বামীর উচিত ধৈর্য ধারণ করা এবং রাগের মুহূর্তে সিদ্ধান্ত না নেওয়া।

আরেকটি ঘটনায় দেখা যায়, একদিন হজরত আবু বকর সিদ্দিক ও হজরত ওমর (রা.)মা নবীজির ঘরে প্রবেশ করেন। কথার এক পর্যায়ে ওমর (রা.) মজা করে বলেন, তাঁর স্ত্রী অতিরিক্ত খরচ চাইলে তিনি তাঁকে শাসন করেছেন। তখন নবীজি হেসে বলেন, ‘আমার স্ত্রীরাও তো মাঝে মাঝে আমার কাছ থেকে বেশি খরচ চায়।’

এই কথা শুনে দুই সাহাবি নিজেদের কন্যাদের শাসন করতে উদ্যত হন। তাঁরা বললেন, ‘যা রাসুলের কাছে নেই, তা কেন তোমরা চাও?’

কিন্তু লক্ষণীয় বিষয় হলো, মহানবী (সা.) তাঁদের বাধা দিলেন। তিনি বুঝিয়ে দিলেন, স্ত্রীদের স্বাভাবিক চাওয়া-পাওয়ার কারণে তাঁদের প্রতি কঠোর আচরণ করা উচিত নয়। (হায়াতুস সাহাবা: ২/৬৮৪; আল ওয়াফা বি আহওয়ালিল মুস্তফা: ২/৩৫৯)

তিনি শপথ করেন, এক মাস তাঁদের থেকে পৃথক থাকবেন। সংবাদটি ছড়িয়ে পড়তেই মদিনাজুড়ে গুঞ্জন ওঠে—হয়তো রাসুল তাঁর স্ত্রীদের তালাক দিয়েছেন।

আজকের সমাজে আমরা প্রায়ই এর উল্টো চিত্র দেখি। অনেক পুরুষ মনে করেন, স্ত্রী কোনো দাবি জানালেই তা অবাধ্যতা। অথচ নবীজি আমাদের শিখিয়েছেন—প্রত্যাশা আর অবাধ্যতা এক জিনিস নয়। সংসার পরিচালনার জন্য পারস্পরিক বোঝাপড়া সবচেয়ে বড় বিষয়।

এই ঘটনাগুলোর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো পিতাদের ভূমিকা। হজরত আবু বকর ও হজরত ওমর (রা.) মেয়েদের অন্ধভাবে সমর্থন করেননি। তাঁরা তাঁদের ভুল বুঝিয়ে দিয়েছেন।

আজ অনেক পরিবারে দেখা যায়, স্বামী-স্ত্রীর ছোটখাটো সমস্যাও দুই পরিবারের অহংকারের লড়াইয়ে পরিণত হয়। কিন্তু সাহাবিদের পরিবারে আমরা দেখি প্রজ্ঞা, ন্যায়বোধ এবং আল্লাহভীতির অনন্য দৃষ্টান্ত।

পরবর্তীকালে যখন নবীজির স্ত্রীরা সম্মিলিতভাবে কিছু অতিরিক্ত ভরণপোষণের আবেদন করেন, তখন মহানবী (সা.) গভীরভাবে কষ্ট পান। তিনি শপথ করেন, এক মাস তাঁদের থেকে পৃথক থাকবেন। সংবাদটি ছড়িয়ে পড়তেই মদিনাজুড়ে গুঞ্জন ওঠে—হয়তো রাসুল তাঁর স্ত্রীদের তালাক দিয়েছেন।

এই সংবাদ শুনে হজরত ওমর (রা.) উদ্বিগ্ন হয়ে ছুটে আসেন। বহুবার অনুমতি চাওয়ার পর তিনি নবীজির সাক্ষাৎ পান। ঘরে প্রবেশ করে তিনি দেখলেন, পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মানুষটি একটি খেজুরপাতার চাটাইয়ের ওপর শুয়ে আছেন। সেই চাটাইয়ের দাগ তাঁর শরীরে স্পষ্ট হয়ে আছে। পৃথিবীর রাজাদের মতো নয়, তিনি ছিলেন সরলতার প্রতীক।ওমর (রা.) জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনি কি আপনার স্ত্রীদের তালাক দিয়েছেন?’ তিনি উত্তর দিলেন, ‘না।’

এই উত্তর শুনে ওমর (রা.) আনন্দে ‘আল্লাহু আকবার’ বলে উঠলেন। এরপর তিনি পরিবেশ হালকা করার জন্য কিছু কথা বললেন। নিজের সংসারের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি নবীজিকে হাসানোর চেষ্টা করলেন। তাঁর সেই আন্তরিক প্রচেষ্টায় নবীজির মুখে হাসি ফুটে উঠল। (সিরাতে হালাবিয়্যা: ৩/৩১৭; আর রিয়াযুন নাদিরা: ২/২৯২)

এই দৃশ্য আমাদের একটি গভীর শিক্ষা দেয়। একজন প্রকৃত বন্ধু শুধু দুঃখের খবর শুনে আফসোস করে না; বরং যথাসাধ্য চেষ্টা করে কষ্ট লাঘব করার। ওমর (রা.) ঠিক সেটিই করেছিলেন।

দাম্পত্য জীবনে অভিমান হওয়া অস্বাভাবিক নয়। কখনো কখনো সাময়িকভাবে কথাবার্তা বন্ধও হতে পারে। কিন্তু এটিকে সম্পর্কের সমাপ্তি মনে করা ঠিক নয়। নবীজির সংসারেও এমন ঘটনা ঘটেছে। তবে পার্থক্য হলো, সেখানে রাগের ওপর ধৈর্য, অহংকারের ওপর ভালোবাসা এবং আবেগের ওপর প্রজ্ঞার বিজয় হয়েছে।

দুটি ভিন্ন পরিবেশে বেড়ে ওঠা মানুষের একসঙ্গে জীবন যাপন করতে গেলে কিছু ভুল বোঝাবুঝি, কিছু প্রত্যাশা, কিছু অপূর্ণতা থাকবেই। ইসলাম এই বাস্তবতাকে অস্বীকার করেনি।

পরবর্তীকালে হজরত হাফসা (রা.) নিজের আচরণের জন্য গভীর অনুশোচনা প্রকাশ করেন। তাঁর চোখের অশ্রু প্রমাণ করেছিল, তিনি ভুল বুঝতে পেরেছেন। নবীজিও তাঁর আন্তরিক অনুতাপকে মূল্য দিয়েছেন। কিছু বর্ণনায় এসেছে, তাঁকে এক তালাক দেওয়ার পর ফেরেশতা জিবরাইলের পরামর্শে পুনরায় ফিরিয়ে নেওয়া হয়।

কারণ, হাফসা ছিলেন অধিক রোজাদার, অধিক ইবাদতকারী এবং জান্নাতে নবীজির স্ত্রীদের অন্যতম। (সিয়ারু আ’লামিন নুবালা: ২/২২৮; আল ইসবাহ ফি তাময়িযিস সাহাবা: ৪/২৭৩)

এই ঘটনাগুলো কেবল ইতিহাস নয়; বরং প্রতিটি পরিবারের জন্য একটি জীবন্ত শিক্ষা। আজ দাম্পত্য জীবনের অসংখ্য বিচ্ছেদের পেছনে রয়েছে অস্থিরতা, অহংকার, অসহিষ্ণুতা ও একে অপরকে না বোঝার প্রবণতা। অথচ নববি আদর্শ আমাদের শেখায়—রাগের সময় ধৈর্য ধরো, ভুল হলে ক্ষমা করো, অভিমান হলে কথা বলো, আর সম্পর্ক রক্ষাকে অগ্রাধিকার দাও।

স্বামী যদি নবীজির ধৈর্য অনুসরণ করেন, স্ত্রী যদি উম্মুল মুমিনিনদের মতো ভুল বুঝতে পারলে ফিরে আসেন, আর অভিভাবকেরা যদি হজরত আবু বকর ও হজরত ওমরের মতো ন্যায়পরায়ণ হন, তাহলে অসংখ্য ভাঙনের হাত থেকে পরিবারগুলো রক্ষা পেতে পারে।

দুটি ভিন্ন পরিবেশে বেড়ে ওঠা মানুষের একসঙ্গে জীবন যাপন করতে গেলে কিছু ভুল বোঝাবুঝি, কিছু প্রত্যাশা, কিছু অপূর্ণতা থাকবেই। ইসলাম এই বাস্তবতাকে অস্বীকার করেনি; বরং মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিতে তাকে গ্রহণ করেছে। আর সেই গ্রহণযোগ্যতার সবচেয়ে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় নবীজির পবিত্র সংসারজীবনে।

  • আহমাদ সাব্বির : আলেম ও লেখক

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

দিরিলিসের আরতুগ্রুলের সকল পর্ব কিভাবে দেখবেন?

ড. খন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর বই Pdf Download

নেক আমলে অবিচল রাখবে যে ১০ আয়াত