সাইবার পাপ থেকে বেঁচে থাকার ৭ উপায়
আজকাল এ ধরনের প্রশ্ন প্রায়ই শোনা যায়, ফেসবুকের একটা শেয়ার বা কমেন্ট কি দোজখে নিতে পারে? বা না জেনে কোনো তথ্য বা খবর ইন্টারনেটে শেয়ার করার ব্যাপারে পবিত্র কোরআনের বিধান কী?
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রল করা, না জেনে শেয়ার দেওয়া কিংবা কাউকে সাইবার বুলিং করার মতো বিষয়গুলোকে আমরা খুব সাধারণ মনে করলেও ইসলামের দৃষ্টিতে এগুলো অত্যন্ত ভয়াবহ অপরাধ। ইন্টারনেট ব্যবহারের ক্ষেত্রে ইসলামের নীতিগুলো মেনে না চললে আমাদের অজান্তেই আমলনামা শূন্য হয়ে যেতে পারে।
চলুন জেনে নিই ডিজিটাল এই যুগে সাইবার পাপ থেকে বেঁচে থাকার ৭টি কার্যকর উপায়।
১. তথ্যের সত্যতা যাচাই করা
ইন্টারনেটে বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নিউজফিডে কোনো খবর দেখেই তা সত্য বলে বিশ্বাস করা বা শেয়ার দেওয়া ইসলামে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। সমাজে কোনো অস্থিরতা বা বিশৃঙ্খলা ছড়ানোর আগে যেকোনো তথ্যের উৎস ও সত্যতা নিখুঁতভাবে যাচাই করা প্রত্যেক মুসলমানের জন্য অবশ্য পালনীয় কর্তব্য। (কুরতুবি, আল-জামি লি-আহকামিল কুরআন, ১৬/৩১১, দারুল কুতুব আল-মিসরিয়্যাহ, কায়রো, ১৯৬৪)
পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ এ বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশ দিয়ে বলেছেন, ‘হে মুমিনগণ, যদি কোনো পাপাচারী ব্যক্তি তোমাদের কাছে কোনো বার্তা নিয়ে আসে, তবে তোমরা তা যাচাই করো, যাতে অজ্ঞতাবশত তোমরা কোনো সম্প্রদায়ের ক্ষতি না করে বসো।’ (সুরা হুজুরাত, আয়াত: ৬)
২. গুজব ছড়ানো থেকে বিরত থাকা
ডিজিটাল দুনিয়ায় লাইক, কমেন্ট বা রিঅ্যাক্ট পাওয়ার লোভে অনেকেই বানোয়াট ও মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে দেন। কোনো খবরের সত্যতা নিশ্চিত না হয়ে কেবল মানুষের মুখে শুনেই তা প্রচার করাও একধরনের মিথ্যাচার, যা একজন মানুষের অপরাধী হওয়ার জন্য যথেষ্ট। (ইবনে হাজার আসকালানি, ফাতহুল বারি, ১০/৪৩৮, দারুল মা'রিফা, বৈরুত, ১৩৭৯ হিজরি)এ বিষয়ে মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘কোনো মানুষের মিথ্যাবাদী হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে সে যা শোনে (যাচাই না করে) তা–ই বলে বেড়ায়।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৫)
৩. সাইবার বুলিং বা ‘ট্রল’ না করা
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো ব্যক্তির ছবি, ভিডিও বা ভুলত্রুটি নিয়ে ট্রল ও সাইবার বুলিং করা আজকের দিনে একটি মরণব্যাধিতে রূপ নিয়েছে।
অথচ কথায়, লেখায় বা ইঙ্গিতে কোনো মুসলিমকে লজ্জিত বা উপহাস করা হারাম এবং এটি হদ্দের (শাস্তির) আওতাভুক্ত অপরাধ। (ইবনে আবিদিন, রাদ্দুল মুহতার, ৬/৪১১, দারুল ফিকর, বৈরুত, ১৯৯২)
আল্লাহ-তাআলা বলেছেন, ‘হে মুমিনগণ, কোনো পুরুষ যেন অন্য পুরুষকে উপহাস না করে, হতে পারে তারা তাদের চেয়ে উত্তম।’ (সুরা হুজুরাত, আয়াত: ১১)
৪. সাইবার গিবত বা পরনিন্দা বর্জন
গ্রুপ চ্যাট, ইনবক্স কিংবা কমেন্ট বক্সে অন্যের অনুপস্থিতিতে তার দোষ নিয়ে আলোচনা করাও মারাত্মক পাপ, যাকে বলা যায় ‘সাইবার গিবত’।
মুখের কথার মতো কলমের লেখা বা ইন্টারনেটের টাইপিংও জিবের সমতুল্য, তাই অনলাইনে পরনিন্দা করা সরাসরি গিবতের অন্তর্ভুক্ত হবে। গিবতের ভয়াবহতা উল্লেখ করে মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা গিবত বা পরনিন্দা থেকে বেঁচে থাকো। কারণ, গিবত হলো ব্যভিচারের চেয়েও বড় পাপ।’ (বাইহকি, শুআবুল ইমান, হাদিস: ৬৩১২)
৫. ‘ফেক আইডি’ দিয়ে ধোঁকাবাজি না করা
নিজের পরিচয় লুকিয়ে বা অন্যের নামে ভুয়া প্রোফাইল (ফেক আইডি) তৈরি করে মানুষকে ধোঁকা দেওয়া বা ব্ল্যাকমেল করা সম্পূর্ণ অবৈধ।
বাণিজ্যিক বা সামাজিক যেকোনো ক্ষেত্রে নিজের আসল পরিচয় গোপন করে প্রতারণার আশ্রয় নেওয়া চুক্তি ও নৈতিকতার পরিপন্থী। (ইমাম শাফেয়ি, কিতাবুল উম্ম, ৩/২১৩, দারুল মা’রিফা, বৈরুত, ১৯৯০)
মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আমাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করে, সে আমাদের দলভুক্ত নয়, আর যে আমাদের ধোঁকা দেয়, সে–ও আমাদের দলভুক্ত নয়।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১০১)
৬. কারও ব্যক্তিগত তথ্য ‘হ্যাক’ না করা
কারও অনুমতি ছাড়া তাঁর ব্যক্তিগত ইনবক্সের মেসেজ পড়া, ছবি দেখা কিংবা আইডি হ্যাক করে তথ্য চুরি করা ইসলামে মারাত্মক মানবাধিকার লঙ্ঘন।
কোনো মানুষের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা করা শরিয়তের অন্যতম মৌলিক উদ্দেশ্য। তাই অন্যের অগোচরে তার ব্যক্তিগত বিষয়ে উঁকিঝুঁকি দেওয়া বা তথ্য চুরি করা নিষিদ্ধ। (ইমাম নববি, শারহু সহিহ মুসলিম, ১৪/১৩৪, দারুল ইহয়া আত-তুরাস আল-আরাবি, বৈরুত, ১৯৭২)
আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন, ‘আর তোমরা একে অপরের গোপনীয় বিষয় অনুসন্ধান কোরো না।’ (সুরা হুজুরাত, আয়াত: ১২)
৭. ডিজিটাল ‘গুনাহে জারিয়া’ বোঝা
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আপনি ভালো কিছু শেয়ার করলে তা যেমন আপনার মৃত্যুর পরও সওয়াব দেবে (সদকায়ে জারিয়া), তেমনি একটি খারাপ বা অশ্লীল পোস্ট শেয়ার করলে তা যত মানুষ দেখবে, সবার পাপের একটি অংশ আপনার আমলনামায় যোগ হতে থাকবে (গুনাহে জারিয়া)।
মানুষের ভালো বা মন্দ কাজের প্রভাব সমাজ যত দিন থাকবে, তার প্রতিফল সে পেতে থাকবে। (ইবনে কুদামাহ আল-মাকদিসি, আল-মুগনি, ৯/১২০, মাকতাবাতুল কাহেরা, কায়রো, ১৯৬৮)
মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি মানুষকে মন্দ বা ভ্রষ্টতার দিকে ডাকবে, তার ওপর সেই মন্দ কাজের পাপ চাপবে এবং যারা তার অনুসরণ করবে, তাদের পাপের অংশও তার ওপর বর্তাবে।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৬৭৪)
৩টি প্রশ্ন ও উত্তর
প্রশ্ন ১: কারও পোস্টে বা কমেন্টে গালি দেওয়ার বিধান কী?
উত্তর: ইসলামে কোনো মুসলমানকে গালি দেওয়া বা অভিশাপ দেওয়া সম্পূর্ণ হারাম। মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘মুসলিমকে গালি দেওয়া ফাসেকি (পাপ) এবং তার সঙ্গে লড়াই করা কুফরি।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৪৮)
প্রশ্ন ২: কেউ সাইবার বুলিংয়ের শিকার হলে তার করণীয় কী?
উত্তর: এ পরিস্থিতিতে ধৈর্য ধারণ করা এবং অজ্ঞদের এড়িয়ে চলা ইসলামের নির্দেশ। আল্লাহ বলেছেন, ‘আর যখন অজ্ঞ ব্যক্তিরা তাদের সম্বোধন করে, তখন তারা বলে, “সালাম”।’ (সুরা ফুরকান, আয়াত: ৬৩) প্রয়োজনে আইনি বা প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা নেওয়া যেতে পারে।
প্রশ্ন ৩: ইন্টারনেট থেকে আয়ের হুকুম কী?
উত্তর: কনটেন্ট যদি হালাল, শিক্ষণীয় ও অশ্লীলতামুক্ত হয় এবং এর মাধ্যমে কোনো কপিরাইট লঙ্ঘন বা ধোঁকাবাজি না করা হয়, তবে সেই আয় সম্পূর্ণ হালাল। (কিতাবুল খারাজ, ১/১২৫, দারুল মা’রিফা, বৈরুত, ১৯৭৯)

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন