হাদিসের আলোয় তিন শ্রেণির বেহেশতি মানুষ
হাদিসে কুদসিতে মহান আল্লাহ বলেন, ‘আমি আমার সব বান্দাকে একনিষ্ঠ (মুসলিম) হিসেবে সৃষ্টি করেছি। অতঃপর তাদের কাছে শয়তান এসে তাদের ধর্ম থেকে বিচ্যুত করে দেয়। আমি যেসব জিনিস তাদের জন্য হালাল করেছি, শয়তান তা হারাম করে দেয়। অধিকন্তু সে তাদের আমার সঙ্গে এমন বিষয়ে শিরক করার নির্দেশ দেয়, যে বিষয়ে আমি কোনো প্রমাণ পাঠাইনি।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৮৬৫)
শয়তানের প্ররোচনায় পড়ে মানুষ অনেক সময় আল্লাহর বিধান ভুলে যায়। সৃষ্টির শুরুতে তাকে যে ইমানি একনিষ্ঠতা ও শুভ্রতা দেওয়া হয়েছিল, তা সে হারিয়ে ফেলে এবং অবাধ্যতার পথে হেঁটে অপরাধের অন্ধকারে শামিল হয়।
তবে এই সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক পঙ্কিলতার মধ্যেও যাঁরা নিজেদের চরিত্র ও নৈতিকতা রক্ষা করতে পারেন, তাঁদের জন্য রয়েছে পরকালের পরম সুসংবাদ।
এই হাদিসের পরবর্তী অংশে রাসুল (সা.) বেহেশতের স্থায়ী অধিবাসী হবেন—এমন তিন শ্রেণির মানুষের বৈশিষ্ট্যের কথা উল্লেখ করেছেন।
এমন ক্ষমতার অধিকারী বা শাসক, যিনি ন্যায়পরায়ণ, দানশীল এবং নেক কাজের তৌফিকপ্রাপ্ত।
এমন ব্যক্তি, যিনি অত্যন্ত দয়ালু এবং প্রত্যেক আত্মীয় ও মুসলমানের প্রতি কোমল হৃদয়ের অধিকারী।
এমন অভাবী ব্যক্তি, যিনি চরিত্রবান, হারাম থেকে বেঁচে থাকেন এবং পরিবার-পরিজন থাকা সত্ত্বেও কারও কাছে হাত পাতেন না।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৮৬৫)ইমাম নববি (মৃ. ৬৭৬ হি.) এই তিন শ্রেণির বেহেশতি মানুষের মনস্তাত্ত্বিক ও সমাজতাত্ত্বিক ব্যাখ্যা প্রদান করেছেন।
এক. ন্যায়পরায়ণ ও দায়িত্বশীল
হাদিসের মূল পাঠে বেহেশতি শাসকের গুণ বর্ণনা করতে গিয়ে ‘মুকসিত’ ও ‘মুওয়াফফাক’ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে।
ইমাম নববি (রহ.) বলেন, এখানে ‘সুলতান’ বা শাসক বলতে কেবল রাষ্ট্রপ্রধান নয়, বরং সমাজের যেকোনো স্তরের দায়িত্বশীল বা সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী ব্যক্তিকে বোঝানো হয়েছে। আর ‘মুকসিত’ শব্দের অর্থ হলো যিনি নিজের পরিবার, অধীন সমাজ বা রাষ্ট্রে আল্লাহর বিধান অনুযায়ী নিখাদ ইনসাফ ও সাম্য কায়েম করেন।
এর পাশাপাশি ‘মুওয়াফফাক’ হলেন সেই ব্যক্তি, যাকে আল্লাহ সর্বদা ভালো কাজের দিকে পরিচালিত করেন এবং সব ধরনের জুলুম ও অন্যায় থেকে দূরে রাখেন। ক্ষমতার দম্ভ যাঁকে স্পর্শ করে না, বরং যিনি নিজের পদটিকে আমানত মনে করে মানুষের সেবা করেন, এমন দায়িত্বশীলের জন্য ক্ষমতা অহংকারের কারণ না হয়ে বেহেশতের সোপান হয়।
দুই. কোমলপ্রাণ ও সর্বজনীন দয়ালু
বেহেশতি মানুষের দ্বিতীয় গুণটি হলো যিনি কোমল হৃদয়ের অধিকারী এবং আত্মীয় ও মুসলিম সমাজের প্রতি দয়ার আচরণ করেন।
ইমাম নববি (রহ.) লিখেছেন, ইসলামে মানুষের প্রতি দয়া ও পারস্পরিক সহানুভূতিকে ইমানের অন্যতম পরিমাপক ধরা হয়েছে। হাদিসে বর্ণিত ‘রকিকুল কলব’ বা কোমল হৃদয়ের অর্থ হলো যিনি অন্য মানুষের দুঃখ, কষ্ট বা বেদনা দেখলে নিজে মনস্তাত্ত্বিকভাবে ব্যথিত হন।
এই শ্রেণির মানুষ সমাজকে হিংসা, বিদ্বেষ, সামাজিক অপরাধ ও নিষ্ঠুরতা থেকে মুক্ত রাখে।
হাদিসে সামগ্রিক মুসলিম ভ্রাতৃত্বের আগে আত্মীয়দের কথা বিশেষভাবে বলার কারণ হলো ইসলামি শরিয়তে ‘সিলাহ রেহেম’ বা রক্তসম্পর্কীয় আত্মীয়দের অধিকার ও খোঁজখবর নেওয়ার নির্দেশ সবার আগে। যার অন্তর দুনিয়ায় মানুষের কষ্টের জন্য কাঁদবে, আল্লাহ আখেরাতে তার জন্য বেহেশত অবধারিত করে দেবেন।
তিন. অনটন সত্ত্বেও আত্মমর্যাদাশীল
এই অংশটি সবচেয়ে গভীর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য দাবি করে। হাদিসের মূল পাঠে ‘আফিফ’ ও ‘মুতাআফফিফ’ শব্দ এসেছে।
এর ব্যাখ্যায় ইমাম নববি (রহ.) লিখেছেন, এখানে ‘আফিফ’ মানে হলো যিনি চরিত্রগতভাবে সম্পূর্ণ পবিত্র, অর্থাৎ মনস্তাত্ত্বিকভাবে সব ধরনের পরধন ও পরনারীর প্রতি কুদৃষ্টি বা লোভ থেকে মুক্ত। আর ‘মুতাআফফিফ’ হলেন সেই ব্যক্তি, যাঁর তীব্র অভাব-অনটন এবং পরিবার-পরিজন বা সন্তানদের ভরণপোষণের প্রচণ্ড চাপ থাকা সত্ত্বেও যিনি মানুষের সামনে নিজের অভাব প্রকাশ করেন না।
লোকলজ্জা ও আত্মমর্যাদার কারণে তিনি ভিক্ষাবৃত্তি, সুদ, ঘুষ বা অন্য কোনো হারাম উপার্জনকে কঠোরভাবে বর্জন করেন। পবিত্র কোরআনেও এই শ্রেণির মানুষের প্রশংসা করে বলা হয়েছে, ‘না চেনার কারণে অজ্ঞ লোকেরা তাদের ধনী মনে করে।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ২৭৩)
এই চরম ধৈর্য, তাওয়াক্কুল ও আল্লাহনির্ভরতার কারণেই তাঁরা দুনিয়ায় অভাবী হলেও আখেরাতে বেহেশতের বিশেষ মর্যাদাপ্রাপ্ত মেহমান হবেন। (ইমাম নববি, আল-মিনহাজ ফি শারহি সহিহ মুসলিম ইবনিল হাজ্জাজ, ১৭/১৯৮–৯৯, দারুল ইহয়াউত তুরাসিল অ্যারাবি, বৈরুত, ১৩৪২ হিজরি)
সারকথা
বিশ্লেষণ থেকে স্পষ্ট যে রাসুল (সা.) এই হাদিসে মানবসমাজের তিনটি প্রধান স্তম্ভের আমূল সংস্কারের কথা বলেছেন—প্রশাসনিক স্তরে নিখাদ ইনসাফ, সামাজিক স্তরে পারস্পরিক দয়া ও সৌহার্দ্য এবং ব্যক্তিগত স্তরে অভাবের মধ্যেও চারিত্রিক সততা ও আত্মমর্যাদা।
এই তিন গুণের সমন্বয়েই পৃথিবীতে একটি আদর্শ ও শান্তিময় সমাজ বিনির্মাণ করা সম্ভব।
মাহমুদ হাসান ফাহিম : শিক্ষক ও লেখক
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন