শত দুঃখ-দুর্দশার মধ্যেও বিশ্বাসে কীভাবে অবিচল থাকবেন
এই অনিশ্চিত ও সংক্ষুব্ধ পৃথিবীতে মানসিক স্থিরতা এবং সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি বজায় রাখার একমাত্র উপায় হলো সুদৃঢ় বিশ্বাস বা ‘ইয়াকিন’। মানুষ হিসেবে দুনিয়ার সব দুঃখ-কষ্ট দূর করার ক্ষমতা আমাদের নেই। আর এই অক্ষমতার অনুভূতিই মূলত মানুষকে স্মরণ করিয়ে দেয় মহান আল্লাহর কথা।
পবিত্র কোরআনের দ্বিতীয় সুরা ‘আল-বাকারা’-তে মানব ইতিহাসের এমন অনেক সংকট ও তার সমাধানমূলক শিক্ষা ছড়িয়ে রয়েছে, যা সুদৃঢ় বিশ্বাস অর্জনে আমাদের সহায়তা করবে।
বনি ইসরাইলের ইতিহাস থেকে শিক্ষা
মহান আল্লাহ বনি ইসরাইলদের ওপর ফেরাউনের নিষ্ঠুর অত্যাচারের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। কোরআনে বলা হয়েছে, “এবং স্মরণ করো, যখন আমি তোমাদের উদ্ধার করেছিলাম ফেরাউনের গোত্র থেকে; তারা তোমাদের কঠিন শাস্তি দিত, তোমাদের নবজাতক পুত্রসন্তানদের জবেহ করত এবং নারীদের জীবিত রাখত। আর এতে তোমাদের রবের পক্ষ থেকে এক মহাপরীক্ষা ছিল।” (সুরা বাকারা, আয়াত: ৪৯)
আজকের যুগেও বিভিন্ন নিপীড়িত অঞ্চলে শিশুদের আর্তনাদ দেখি আমরা। মনে রাখা উচিত, যে এই চরম পরীক্ষা যেমন আল্লাহর পক্ষ থেকে আসে, তেমনি এই অত্যাচার থেকে মুক্তির একমাত্র মালিকও তিনি।পরীক্ষা ও আল্লাহর সাহায্যের নৈকট্য
অনেকেই মনে করেন ইমান আনলেই হয়তো দুঃখ-কষ্ট বা পরীক্ষা থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে। কিন্তু আল্লাহ-তাআলা বিশ্বাসীদের সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, “তোমরা কি মনে করো যে তোমরা এমনিতেই জান্নাতে প্রবেশ করবে, অথচ এখনো তোমাদের কাছে পূর্ববর্তী অতীতদের মতো অবস্থা আসেনি? দারিদ্র্য ও দুঃখ-কষ্ট তাদের স্পর্শ করেছিল এবং তারা এমনভাবে ভিত্ত হয়ে উঠেছিল যে রাসুল ও তাঁর সঙ্গে থাকা মুমিনরা বলে উঠেছিল—আল্লাহর সাহায্য কখন আসবে? জেনে রাখো, নিশ্চয়ই আল্লাহর সাহায্য অত্যন্ত নিকটে।” (সুরা বাকারা, আয়াত: ২১৪)
এমনকি সর্বকালের শ্রেষ্ঠ মানব নবী-রাসুল ও সুদৃঢ় বিশ্বাসের অধিকারী সাহাবিরাও পরীক্ষার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আল্লাহর সাহায্যের আকুতি জানিয়েছিলেন। এটি প্রমাণ করে যে সংকট আসাই ইমান হারানোর কারণ নয়, বরং সংকটের সময়েও আল্লাহর সাহায্যের ওপর অটল বিশ্বাস রাখাই হলো প্রকৃত সাফল্য।
মানব সৃষ্টির রহস্য ও ফেরেশতাদের সংশয়
মানুষের সৃষ্টি এবং পৃথিবীতে রক্তপাত ও বিশৃঙ্খলা সম্পর্কিত এক গভীর ঐতিহাসিক কথোপকথন বর্ণিত হয়েছে এই সুরায়। প্রথম মানব নবী আদমকে সৃষ্টির পূর্বে মহান আল্লাহ ফেরেশতাদের ডেকে বললেন, “আমি পৃথিবীতে এক প্রতিনিধি সৃষ্টি করতে যাচ্ছি।” (সুরা বাকারা, আয়াত: ৩০)
আর ফেরেশতারা বিস্ময় প্রকাশ করে বলেছিল, “আপনি কি সেখানে এমন কাউকে সৃষ্টি করবেন যে সেখানে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করবে এবং রক্তপাত ঘটাবে, অথচ আমরা আপনার প্রশংসায় তসবিহ পাঠ করছি এবং আপনার পবিত্রতা ঘোষণা করছি?” (সুরা বাকারা, আয়াত: ৩০)তখন মহান আল্লাহ সংক্ষেপে যে উত্তর দিয়েছিলেন, তা সমগ্র মহাবিশ্বের প্রজ্ঞাকে ধারণ করে। বলেছিলেন, “নিশ্চয়ই আমি যা জানি, তোমরা তা জানো না।” (সুরা বাকারা, আয়াত: ৩০)
এই বাক্য আমাদের শেখায় যে পৃথিবীতে যেসব অশুভ ঘটনা বা অনিষ্ট ঘটছে, তার পেছনে আল্লাহর সুগভীর প্রজ্ঞা ও কল্যাণ রয়েছে যা মানুষের সীমাবদ্ধ জ্ঞান দিয়ে পুরোপুরি অনুধাবন করা সম্ভব নয়।
‘শুনলাম ও মেনে নিলাম’
আল্লাহ-তাআলা পবিত্র কোরআনের সত্যতা প্রমাণের জন্য সারা মানবজাতিকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, “আমি আমার বান্দার ওপর যা নাজিল করেছি, তাতে যদি তোমাদের কোনো সন্দেহ থাকে, তবে তোমরা এর মতো একটি সুরা রচনা করে নিয়ে এসো।” (সুরা বাকারা, আয়াত: ২৩)
বনি ইসরাইলদের পতনের মূল কারণ ছিল তাদের আত্মম্ভরিতা ও অবাধ্যতা। যখন তাদের কাছ থেকে অঙ্গীকার নেওয়া হয়েছিল, তখন তারা মুখে বলেছিল, “আমরা শুনলাম ও অমান্য করলাম।” (সুরা বাকারা, আয়াত: ৯৩)
কিন্তু একজন প্রকৃত মুমিন তার ঠিক বিপরীত। সুরা আল-বাকারার একেবারে শেষ আয়াতে মুমিনের দৃষ্টিভঙ্গি সুন্দরভাবে তুলে ধরা হয়েছে। বলা হয়েছে, “রাসুল বিশ্বাস এনেছেন তাতে, যা তাঁর প্রতিপালকের পক্ষ থেকে তাঁর ওপর নাজিল হয়েছে এবং মুমিনগণও বিশ্বাস এনেছে। তারা সবাই আল্লাহ, তাঁর ফেরেশতাগণ, তাঁর কিতাবসমূহ এবং তাঁর রাসুলগণের ওপর বিশ্বাস এনেছে... এবং তারা বলে—আমরা শুনলাম এবং আনুগত্য করলাম। হে আমাদের প্রতিপালক, আমরা আপনার কাছে ক্ষমা চাই এবং আপনার দিকেই চূড়ান্ত প্রত্যাবর্তন।” (সুরা বাকারা, আয়াত: ২৮৫)।
অনিশ্চয়তায় ভরা এই জগতসংসারে স্থির থাকার মূল চাবিকাঠি হলো আমাদের অন্তরের ‘ইয়াকিন’ বা দৃঢ় বিশ্বাস। অগণিত অন্যায় দেখে হতাশ হয়ে পড়া কিংবা ইমান হারিয়ে ফেলার সুযোগ নেই।
বরং নিজেদের ভুলত্রুটি শুধরে, নিজেদের কুপ্রবৃত্তি দমন করে এবং কোরআনের অর্থ অনুধাবন করে আল্লাহর হেদায়েতের কাছে নিজেকে পুরোপুরি সঁপে দেওয়াই হলো মানসিক মুক্তির একমাত্র পথ।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন