পোস্টগুলি

ইমাম মালেক ও তাঁর প্রতিষ্ঠিত মাজহাবের কাহিনি

  তিনি ছিলেন মদিনার আলেম। সম্মান করে তাঁকে বলা হতো হিজরতের শহরের ইমাম। তাঁর বাবা আনাস। তিনি মদিনার ফিকহি ঐতিহ্যের প্রধান রূপকার এবং ইসলামের চার প্রধান মাজহাবের একটি ‘মালেকি মাজহাব’-এর প্রতিষ্ঠাতা। মদিনায় শৈশব ইমাম মালেকের পূর্ণ নাম মালেক ইবনে আনাস ইবনে মালেক ইবনে আবু আমের ইবনে আমর ইবনুল হারিস আল-আসবাহি আল-হিমইয়ারি। কুনিয়াত ‘আবু আবদুল্লাহ’। বংশসূত্রে তিনি ইয়েমেনি বংশোদ্ভূত হিমইয়ারি গোত্রের সদস্য হলেও তাঁর পূর্বপুরুষেরা বহু আগে থেকেই মদিনায় বসতি স্থাপন করেছিলেন। জন্মসন নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে সামান্য মতভেদ থাকলেও অধিকাংশের মতে তিনি ৯৩ হিজরি (৭১১-৭১২ খ্রিষ্টাব্দ) খলিফা ওয়ালিদ ইবনে আবদুল মালেকের শাসনামলে মদিনায় জন্মগ্রহণ করেন। (ইমাম নববি, তাহজিবুল আসমা ওয়াল লুগাত, ২/৭৫-৭৯, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, বৈরুত) তাঁর পারিবারিক পরিমণ্ডলও ছিল ইলমচর্চায় সমৃদ্ধ। দাদা মালেক ইবনে আবু আমের একজন বিশিষ্ট তাবেয়ি ছিলেন, যিনি খলিফা ওমর, ওসমান ও আয়েশা (রা.)-এর মতো শীর্ষ সাহাবিদের থেকে ইলম গ্রহণ করেন এবং খলিফা ওসমানের যুগে কোরআনের প্রামাণ্য মুসহাফ সংকলন কমিটির সদস্যও ছিলেন। তাঁর চাচা নাফে ইবনে ম...

আয়েশা (রা.)–কে কেন ‘আবদুল্লাহর মা’ বলা হয়

  তাঁর পরিচয়ের সঙ্গে ‘সিদ্দিকা’, ‘উম্মুল মুমিনিন’সহ নানা মর্যাদাপূর্ণ উপাধি জড়িয়ে আছে। এর মধ্যে একটি বিশেষ কুনিয়ত বা উপাধি হলো ‘উম্মে আবদুল্লাহ’ বা আব্দুল্লাহর মা। প্রশ্ন জাগে, আয়েশা সিদ্দিকার তো কোনো সন্তান ছিল না, তাহলে তাঁকে ‘উম্মে আবদুল্লাহ’ বলা হতো কেন? এর উত্তর পাওয়া যায় স্বয়ং আয়েশার বর্ণিত একটি সহিহ হাদিসে। একদিন তিনি নবীজির দরবারে আবেদন করলেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল, (আমি ছাড়া) আমার সব সখীদেরই পরিবারিক নাম (কুনিয়াত) আছে। তখন নবীজি (সা.) বললেন, তুমি তোমার (বোনের) ছেলে আবদুল্লাহর নামে কুনিয়াত গ্রহণ করো।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৪৯৭০) বর্ণনাকারী মুসাদ্দাদ এ হাদিসের ব্যাখ্যায় বলেছেন, এখানে আবদুল্লাহ বলতে আবদুল্লাহ ইবনে জুবাইরকে বোঝানো হয়েছে। এর পর থেকেই আয়েশার কুনিয়াত হয়ে যায় উম্মে আবদুল্লাহ। কুনিয়াতের প্রতি আয়েশার আগ্রহ ঘটনাটির সূচনাও বেশ হৃদয়গ্রাহী। তিনি দেখলেন, তাঁর সতীনদের প্রত্যেকেরই একটি করে কুনিয়াত রয়েছে। তাঁরও ইচ্ছা হলো, নিজের এমন একটি সুন্দর পরিচয় থাকুক। তাই তিনি রাসুলের কাছে বিষয়টি তুলে ধরলেন। এতে বোঝা যায়, কুনিয়াত আরব সমাজে শুধু নামের বিকল্প কোন...

সুরা কাহাফ থেকে বন্ধুর পথে অবিচলতার শিক্ষা

  বাঁচার কোনো প্রত্যক্ষ দৃশ্যমান পথ যখন খোলা থাকে না, তখন মানুষের সামনে শুধু একটিই ক্ষীণ অবলম্বন অবশিষ্ট থাকে—নিজের বিশ্বাসকে বুকে ধারণ করে পরম করুণাময়ের এক অদৃশ্য রহমতের আশ্রয়ে নিজেকে সঁপে দেওয়া। ঠিক যেমনটি ঘটেছিল সুদূর অতীতে কয়েক ইমানদার যুবকের জীবনে; পার্থিব নিরাপত্তার কোনো সাজসরঞ্জাম ছাড়াই যাঁদের একমাত্র আশ্রয় হয়েছিল একটি অন্ধকার পাহাড়ের গুহা।  কোরআনের চিরন্তন উপাখ্যান ‘আসহাবে কাহাফ’ মানবজাতির প্রতিটি সংকটময় মুহূর্তের এক শাশ্বত মনস্তাত্ত্বিক পাঠ—কীভাবে নিরেট তাওয়াক্কুল ও অবিচলতা প্রতিকূলতম পরিস্থিতিকেও স্বর্গীয় শান্তিতে রূপান্তর করতে পারে। পার্থিব অনিশ্চয়তায় রহমতের আশ্রয় সুরা কাহাফের সেই তরুণদের ঘটনাটি শুরু হয়েছিল অত্যাচারী বাদশাহ থেকে নিজেদের ইমান রক্ষার তাগিদে। এই যুবকরা নিজেদের রাজকীয় বৈভবের মোহ ত্যাগ করে গুহার পথ বেছে নিয়েছিলেন। কোরআনে তাঁদের কথোপকথন বিধৃত হয়েছে এভাবে, “আর যখন তোমরা তাদের থেকে এবং তারা আল্লাহ ছাড়া যাদের উপাসনা করে তাদের থেকে বিচ্ছিন্ন হলে, তখন তোমরা গুহায় আশ্রয় গ্রহণ করো। তোমাদের প্রতিপালক তোমাদের জন্য তাঁর রহমত প্রশস্ত করে দেবেন এবং তোমাদের জন্য তোমা...

ঘুমের আগে অজু: প্রশান্তির পথে এক ছোট্ট আমল

  রাত গভীর হয়েছে। সারা দিনের ব্যস্ততা শেষে আপনি এবার বিছানায় যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। দিনের ক্লান্তি শরীরজুড়ে, নানা চিন্তা মাথার ভেতর ঘুরপাক খাচ্ছে। কাজের চাপ, সংসারের ভাবনা, ভবিষ্যতের উদ্বেগ কিংবা অকারণ কিছু অস্থিরতা—সব মিলিয়ে মনটাও যেন ক্লান্ত। এমন সময় বিছানায় যাওয়ার আগে নিজেকে একটি প্রশ্ন করুন, অজু করেছেন তো? প্রশ্নটি শুনে হয়তো কেউ একটু অবাক হতে পারেন। অজু তো সাধারণত নামাজের জন্য করা হয়, কোরআন মাজিদ স্পর্শ করার জন্য করা হয়। কিন্তু এখন তো নামাজ পড়তে যাচ্ছেন না, কোরআনও পড়ছেন না; শুধু ঘুমাতে যাচ্ছেন। তাহলে আবার অজু করার প্রয়োজন কী? প্রয়োজন আছে। বরং ঘুমের মতো একটি দৈনন্দিন কাজও যখন একজন মুমিন সুন্নাহর আলোকে সম্পন্ন করেন, তখন সেটি নিছক ঘুম থাকে না; সেটিও হয়ে ওঠে ইবাদতের অংশ। অজু শুধু শরীরের কিছু অঙ্গ ধুয়ে নেওয়ার নাম নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আত্মিক পরিচ্ছন্নতা ও মানসিক প্রশান্তিরও এক গভীর অনুভূতি। দিনের ক্লান্তি যখন আপনাকে অবসন্ন করে ফেলে, মন যখন নানা চিন্তায় ভারী হয়ে ওঠে, তখন অজুর শীতল পানি মুখে, হাতে ও শরীরে স্পর্শ করলে একধরনের স্বস্তি অনুভূত হয়। মনে হয়, দিনের জমে থাকা ক্লান্তির ওপর ...

মানুষের চুল বিক্রি: ইসলাম কী বলে

  আধুনিক বাজারে মানুষের চুল উইগ ও হেয়ার এক্সটেনশনের কাঁচামাল। চুলের দৈর্ঘ্য, ঘনত্ব ও রং অনুযায়ী এর দাম নির্ধারিত হয়। অথচ ইসলামের দৃষ্টিতে মানুষের দেহ কোনো বাণিজ্যিক পণ্য নয়। আল্লাহ-তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আমি আদম সন্তানকে মর্যাদা দান করেছি।’ (সুরা বনি ইসরাইল, আয়াত: ৭০) এই মর্যাদা শুধু জীবিত মানুষের আত্মা ও অস্তিত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, তার দেহ ও দেহের অংশের মধ্যেও এর প্রভাব রয়েছে। এ কারণেই ইসলামে মানুষের অঙ্গপ্রত্যঙ্গকে সাধারণ বেচাকেনার বস্তু হিসেবে বিবেচনা করা হয়নি। চুল কি বিক্রয়যোগ্য ইসলামি ফিকহের প্রামাণ্য গ্রন্থগুলোয় মানুষের চুল বিক্রির ব্যাপারে সুস্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা পাওয়া যায়। ইমাম মারগিনানি (রহ.) লিখেছেন, ‘মানুষের চুল বিক্রি করা এবং তা দ্বারা উপকৃত হওয়া বৈধ নয়। কারণ, মানুষ সম্মানিত, তাকে অপমানিত করা যায় না। তার কোনো অংশকে অপমানিত ও তুচ্ছ বস্তুতে পরিণত করাও বৈধ নয়।’ (আল-হিদায়া শরহু বিদায়াতিল মুবতাদি, ৫/১০৮-১০৯, ইদারাতুল কুরআন ওয়াল উলুমিল ইসলামিয়া, পাকিস্তান) এখানে লক্ষণীয়, নিষেধাজ্ঞার কারণ শুধু চুলের পবিত্রতা বা অপবিত্রতা নয়। বরং মানুষের মর্যাদাই মূল বিবেচনা। ফলে চুল শরীর থেক...

খাদিজার সঙ্গে বিবাহ: একটি নবীপরিবারের সূচনা

  ৫৯৫ খ্রিষ্টাব্দের কাছাকাছি সময়ে সম্পন্ন হওয়া নবীজির প্রথম বিবাহের ঘটনা সিরাতের শুধু একটি পারিবারিক অধ্যায় নয়; এটি মক্কার সামাজিক ও অর্থনৈতিক সমীকরণে এক নতুন মাত্রা যোগ করে। দ্বিতীয় শাম সফর থেকে ফেরার পর তাঁর সততা ও বাণিজ্যিক প্রজ্ঞায় মুগ্ধ হয়ে খাদিজা (রা.) এই বিবাহে এগিয়ে আসেন। বিবাহের সময়কাল দ্বিতীয় শাম সফর থেকে ফেরার দুই-আড়াই মাস পর এই বিবাহ সম্পন্ন হয়। সিরিয়ার বুসরা থেকে গ্রীষ্মকালীন কাফেলাটি মক্কায় ফিরে আসে আনুমানিক আগস্ট ৫৯৫ খ্রিষ্টাব্দে (২৮ হিজরি পূর্বের সফর মাসের শেষ ভাগে)। জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক ও হিজরি পূর্ব পঞ্জিকার পর্যালোচনায় দেখা যায়, বিবাহটি সম্পন্ন হয়েছিল ২৮ হিজরি পূর্ব সনের রবিউল আউয়াল মাসের প্রথমার্ধে (সেপ্টেম্বর–অক্টোবর ৫৯৫ খ্রিষ্টাব্দ)। (ইবনে সাদ, আত-তাবাকাতুল কুবরা, ১/১৩১, দারু সাদির, বৈরুত, ১৯৬৮) বিবাহকালে নবীজির বয়স তখন পঁচিশ বছরের কিছু বেশি (২৫ বছর ২ মাস); যেহেতু তাঁর জন্ম ৫৩ হিজরি পূর্বের রবিউল আউয়াল মাসে। এ বিষয়ে সিরাতের উৎসগুলোর মধ্যে বড় কোনো মতভেদ নেই। খাদিজার বয়স: একটি অমীমাংসিত বিতর্ক নবীজির বয়স নিয়ে ঐকমত্য থাকলেও খাদিজার (রা.) বয়স নিয়ে...

খলিফা ওমরের যুগে পারস্য বিজয়ের কাহিনি

  সুপ্রাচীনকাল থেকে বিশ্বরাজনীতির রঙ্গমঞ্চ শাসন করে আসছিল দুই মহাশক্তি—রোমান বাইজেন্টাইন ও পারস্যের সাসানিয়া সাম্রাজ্য। এর মধ্যে আধুনিক ইরান, ইরাক ও মধ্য এশিয়ার বিশাল ভূখণ্ডজুড়ে বিস্তৃত সাসানীয় সাম্রাজ্য ছিল চার শতাব্দীর এক অপরাজেয় সামরিক ও সাংস্কৃতিক পরাশক্তি। পারস্য সাম্রাজ্যের এই ঐতিহাসিক পতন ছিল এক দীর্ঘ সামরিক ও মনস্তাত্ত্বিক অভিযানের পরিণতি। খলিফা ওমর ইবনুল খাত্তাবের আমলে সংঘটিত দুটি যুদ্ধ ইতিহাসের গতিপথ চিরতরে বদলে দিয়েছিল—প্রথমটি ইরাকের মাটিতে সংঘটিত ‘কাদিসিয়ার যুদ্ধ’; আর দ্বিতীয়টি ইরানের পাহাড়ি প্রান্তরের ‘নাহাওয়ান্দ’। কাদিসিয়ার প্রান্তরে মুখোমুখি খলিফা আবু বকর (রা.)-এর সময় শুরু হওয়া ইরাক অভিযানের ধারাবাহিকতায় মুসলিমরা যখন মেসোপটেমিয়ার উর্বর সমভূমিতে একের পর এক বিজয় অর্জন করতে শুরু করেন, তখন সাসানিয়া রাজদরবার বুঝতে পেরেছিল যে এটি কোনো সাধারণ সীমান্ত সংঘর্ষ নয়। আল্লাহই আমাদের পাঠিয়েছেন মানুষকে মানুষের দাসত্ব থেকে বের করে এক আল্লাহর দাসত্বে ফিরিয়ে আনতে, দুনিয়ার সংকীর্ণতা থেকে মুক্ত করে পরকালের প্রশস্ততার দিকে আহ্বান জানাতে এবং প্রচলিত ধর্মগুলোর শোষণ ও অবিচার থেকে ইসলামের ন্য...