ঘুমের আগে অজু: প্রশান্তির পথে এক ছোট্ট আমল
রাত গভীর হয়েছে। সারা দিনের ব্যস্ততা শেষে আপনি এবার বিছানায় যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। দিনের ক্লান্তি শরীরজুড়ে, নানা চিন্তা মাথার ভেতর ঘুরপাক খাচ্ছে। কাজের চাপ, সংসারের ভাবনা, ভবিষ্যতের উদ্বেগ কিংবা অকারণ কিছু অস্থিরতা—সব মিলিয়ে মনটাও যেন ক্লান্ত। এমন সময় বিছানায় যাওয়ার আগে নিজেকে একটি প্রশ্ন করুন, অজু করেছেন তো?
প্রশ্নটি শুনে হয়তো কেউ একটু অবাক হতে পারেন। অজু তো সাধারণত নামাজের জন্য করা হয়, কোরআন মাজিদ স্পর্শ করার জন্য করা হয়। কিন্তু এখন তো নামাজ পড়তে যাচ্ছেন না, কোরআনও পড়ছেন না; শুধু ঘুমাতে যাচ্ছেন। তাহলে আবার অজু করার প্রয়োজন কী?
প্রয়োজন আছে। বরং ঘুমের মতো একটি দৈনন্দিন কাজও যখন একজন মুমিন সুন্নাহর আলোকে সম্পন্ন করেন, তখন সেটি নিছক ঘুম থাকে না; সেটিও হয়ে ওঠে ইবাদতের অংশ।
অজু শুধু শরীরের কিছু অঙ্গ ধুয়ে নেওয়ার নাম নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আত্মিক পরিচ্ছন্নতা ও মানসিক প্রশান্তিরও এক গভীর অনুভূতি। দিনের ক্লান্তি যখন আপনাকে অবসন্ন করে ফেলে, মন যখন নানা চিন্তায় ভারী হয়ে ওঠে, তখন অজুর শীতল পানি মুখে, হাতে ও শরীরে স্পর্শ করলে একধরনের স্বস্তি অনুভূত হয়। মনে হয়, দিনের জমে থাকা ক্লান্তির ওপর কেউ যেন প্রশান্তির পরশ বুলিয়ে দিল।
অস্থির মন নিয়ে বিছানায় গেলে ঘুমও অনেক সময় সহজে আসে না। চোখ বন্ধ করেও মন ছুটে বেড়ায় নানা দিকে। কখনো অতীতের কোনো ঘটনা, কখনো আগামী দিনের কোনো দুশ্চিন্তা, কখনো কোনো মানুষের কথা—সবকিছু মিলে মনের ভেতর তৈরি হয় এক অদৃশ্য কোলাহল। অথচ ঘুমের জন্য প্রয়োজন শান্ত একটি মন।
সেই শান্তির প্রস্তুতি হতে পারে অজু।
অজু করে যখন আপনি বিছানায় যাবেন, তখন অন্তত নিজের কাছে একটি অনুভূতি থাকবে, আমি এখন পবিত্র অবস্থায় শুতে যাচ্ছি। আল্লাহর স্মরণে রাত শেষ করছি। এই অনুভূতিটুকুও হৃদয়ের অস্থিরতা কমিয়ে দিতে পারে।
তবে অজু করে ঘুমানোর বিষয়টি শুধু যুক্তি বা ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার ওপর নির্ভরশীল নয়। এর পেছনে রয়েছে প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুস্পষ্ট নির্দেশনা।
সাহাবি বারা ইবনে আজিবকে রাসুল (সা.) বলেছেন, যখন তুমি বিছানায় যাবে, তখন নামাজের অজুর মতো অজু করে নেবে। এরপর তিনি ঘুমানোর আরও কিছু আদব শিক্ষা দিয়েছেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৪৭)
কী আশ্চর্য সুন্দর একটি শিক্ষা! ঘুম—যে কাজটি আমরা প্রতিদিন করি, যে কাজটির জন্য আলাদা কোনো প্রস্তুতি নেওয়ার কথা সাধারণত আমাদের মনেই আসে না, সেই ঘুমের মধ্যেও রাসুল (সা.) আমাদের জন্য রেখে গেছেন সুন্নাহর সৌন্দর্য।
আর এই আমলের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে আরও গভীর একটি বিষয়।
হাদিসে এসেছে, অজু করে বিছানায় গিয়ে ঘুমানোর পর যদি কারও মৃত্যু হয়, তবে সে ফিতরাতের ওপর মৃত্যুবরণ করবে। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৭২৫)
এখানে ‘ফিতরাত’ শব্দটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। অন্য একটি হাদিসে রাসুল (সা.) বলেছেন, প্রত্যেক শিশু ফিতরাতের ওপর জন্মগ্রহণ করে। পরবর্তী সময়ে তার মা-বাবা তাকে ইহুদি, খ্রিষ্টান কিংবা অগ্নিপূজক করে তোলে। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৩৮৫)
মুহাদ্দিসরা এ হাদিসের ব্যাখ্যায় ফিতরাত দ্বারা মানুষের স্বাভাবিক তাওহিদি বিশ্বাস ও ইসলামের সহজাত প্রবণতাকে বোঝানোর কথা উল্লেখ করেছেন।অর্থাৎ ঘুমের আগে অজু করে শোয়ার এই ছোট্ট আমলটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে ইমানের এক গভীর তাৎপর্য। একজন মানুষ জানেন না, তার পরবর্তী সকালটি তার জন্য অপেক্ষা করছে কি না। প্রতিদিন আমরা রাতে ঘুমাতে যাই, কিন্তু প্রত্যেক রাতই হয়তো জীবনের শেষ রাত হতে পারে।
ঘুমের সঙ্গে মৃত্যুর একটি অদ্ভুত সাদৃশ্য আছে। দুটিতেই মানুষ নিজের চারপাশের জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, নিজের ইচ্ছাশক্তি হারিয়ে ফেলে। তাই একজন মুমিন যখন ঘুমাতে যান, তখন তার উচিত এমন অবস্থায় যাওয়া, যে অবস্থায় তিনি আল্লাহর সামনে ফিরে গেলেও যেন প্রস্তুত থাকেন।
এই জায়গাতেই অজুর গুরুত্ব নতুন করে অনুভূত হয়।
ভাবুন তো, সারা দিনের ব্যস্ততার পর রাতের শেষ কাজটি যদি হয় অজু করা, আল্লাহকে স্মরণ করা এবং পবিত্র অবস্থায় ঘুমিয়ে পড়া—তাহলে দিনের সমাপ্তিটা কত সুন্দর হতে পারে!
আর যদি সেই ঘুমই জীবনের শেষ ঘুম হয়ে যায়, তবু অন্তত একজন মুমিন তার রবের কাছে যাওয়ার আগে সুন্নত অনুসরণের চেষ্টা করে গেছেন।
অজু করতে কয়েক মিনিটের বেশি সময় লাগে না। অথচ এর মাধ্যমে আমরা শরীরকে পরিচ্ছন্ন করি, মনকে প্রশান্ত করি এবং রাসুল (সা.) একটি সুন্নত জীবনে ধারণ করি।
কে জানে, কোন রাতটি আমাদের শেষ রাত?
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন