শিরকের পরই বড় অপরাধ মানব হত্যা

শিরকের পরই বড় অপরাধ মানব হত্যা

*****************************************************************
শাঈখ মুহাম্মাদ উছমান গনী
*****************************

মানব ইতিহাসে প্রথম সংঘটিত অপরাধ হলো মানব হত্যা। এটি শিরকের পরেই ‘কবিরা গোনাহ’ বা সবচেয়ে বড় অপরাধ। আদি পিতা হজরত আদম (আ.)-এর দ্বিতীয় পুত্র কাবিল প্রথম আপন বড় ভাই হজরত হাবিল (র.)-কে অন্যায়ভাবে হত্যা করে। এ প্রসঙ্গটি কোরআন মজিদে এভাবে এসেছে—‘আদমের দুই পুত্রের বৃত্তান্ত তুমি তাহাদিগকে যথাযথভাবে শোনাও। যখন তারা উভয়ে কোরবানি করেছিল, তখন একজনের কোরবানি কবুল হলো এবং অন্যজনের কবুল হলো না। সে বলল, “আমি তোমাকে হত্যা করবই।” অপরজন বলল, “অবশ্যই আল্লাহ মুত্তাকিদের কোরবানি কবুল করেন। আমাকে হত্যা করার জন্য তুমি হাত তুললেও তোমাকে হত্যা করার জন্য আমি হাত তুলব না। আমি তো জগৎসমূহের প্রতিপালক আল্লাহকে ভয় করি। তুমি আমার ও তোমার পাপের ভার বহন করো এবং অগ্নিবাসী হও, ইহাই আমি চাই এবং ইহা জালিমদের কর্মফল।” অতঃপর তার চিত্ত ভ্রাতৃহত্যায় তাকে উত্তেজিত করল। ফলে সে তাকে হত্যা করল; তাই সে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত হলো। অতঃপর আল্লাহ এক কাক পাঠালেন, যে তার ভ্রাতার শবদেহ কীভাবে গোপন করা যায় তা দেখানোর জন্য মাটি খনন করতে লাগল। সে বলল, “হায়! আমি কি এই কাকের মতোও হতে পারলাম না, যাতে আমার ভ্রাতার শবদেহ গোপন করতে পারি?” অতঃপর সে অনুতপ্ত হলো। এ কারণেই বনি ইসরায়েলের প্রতি এই বিধান দিলাম যে নরহত্যা অথবা দুনিয়ায় ধ্বংসাত্মক কার্য করা; হেতু ব্যতীত কেহ কাহাকেও হত্যা করলে সে যেন দুনিয়ার সব মানুষকেই হত্যা করল, আর কেহ কারও প্রাণ রক্ষা করলে সে যেন সব মানুষের প্রাণ রক্ষা করল। তাদের নিকট তো আমার রাসুলগণ স্পষ্ট প্রমাণ এনেছিল, কিন্তু এরপরও তাদের অনেকে দুনিয়ায় সীমা লঙ্ঘনকারীই রয়ে গেল। যারা আল্লাহ ও তার রাসুলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে এবং দুনিয়ায় ধ্বংসাত্মক কার্য করে বেড়ায়, ইহাই তাদের শাস্তি যে তাহাদিগকে হত্যা করা হবে অথবা ক্রুশবিদ্ধ করা হবে অথবা বিপরীত দিক থেকে তাদের হাত ও পা কেটে ফেলা হবে অথবা তাহাদিগকে দেশ থেকে নির্বাসিত করা হবে। দুনিয়ায় এটিই তাদের লাঞ্ছনা ও পরকালে তাদের জন্য মহা শাস্তি রয়েছে। তবে, তোমাদের আয়ত্তাধীনে আসার পূর্বে যারা তওবা করবে, তাদের জন্য নয়। সুতরাং জেনে রাখো যে আল্লাহ অবশ্যই ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’ (আল কোরআন, পারা: ৬, সূরা-৫ আল মায়িদাহ, আয়াত: ২৭-৩৪)।
ইসলামের শিক্ষা হলো: সব মানুষ এক আল্লাহর বান্দা; যারা বিশ্বাসী, তারা অনুগত বান্দা আর যারা অবিশ্বাসী, তারা পাপাচারী। সব মানুষ একই পিতা-মাতার সন্তান; সব মানুষ একই রক্ত-মাংসে গড়া; তাই সাদা-কালোতে কোনো প্রভেদ নেই। সব মানুষ আখেরি নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর উম্মত {হজরত মুহাম্মদ (সা.)–এর সময় থেকে কেয়ামত পর্যন্ত}। কালেমা পড়া মুসলমান সবাই সমান। কবরে ও হাশরে সবাইকে একই প্রশ্ন করা হবে।
কবরে প্রশ্ন করা হবে না, তুমি কি শিয়া ছিলে নাকি সুন্নি ছিলে। প্রশ্ন করা হবে না, তুমি কি হানাফি ছিলে নাকি সালাফি ছিলে। বরং প্রশ্ন করা হবে, তুমি কি বিশ্বাসী মুমিন ছিলে? নাকি অবিশ্বাসী কাফির ছিলে? আরও প্রশ্ন করা হবে, তোমার জীবন পদ্ধতি কী ছিল? এবং মানবতার মুক্তির দূত শান্তির নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর সঙ্গে তোমার জীবনাচারের কী সম্পর্ক ছিল? প্রশ্ন তিনটি হবে এভাবে—‘মান রব্বুকা, ওয়া মা দ্বীনুকা, ওয়া মান হাযার রজুল’। অর্থাৎ তোমার রব বা প্রভু কে? তোমার ধর্মাচার কী ছিল? এবং এই ব্যক্তি—হজরত মুহাম্মদ (সা.)—কে? একমাত্র সঠিক উত্তর হবে—‘রাদিতু বিল্লাহি রব্বাওঁ, ওয়া বিল ইসলামে দীনাওঁ, ওয়া বি মুহাম্মাদিন (সা.) নাবীয়্যাওঁ ও রসুলা।’ অর্থাৎ আমার রব আল্লাহ, আমার দীন-ধর্ম ইসলাম এবং হজরত মুহাম্মদ (সা.) নবী ও রাসুল; এতেই আমি সন্তুষ্ট। হজরত সাওবান (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি সকাল-সন্ধ্যায় তিনবার করে এই দোয়া পড়বে (অর্থাৎ উপরিউক্ত ঘোষণা দেবে), আল্লাহ তাআলার ওপর ওয়াজিব (অবধারিত) হয়ে যাবে কিয়ামতের দিন তাকে (জান্নাতদানের মাধ্যমে) খুশি করা।’ এবং তার কবরের সওয়ালের জবাব দেওয়া সহজ হবে। (তিরমিজি শরিফ, খণ্ড: ৫, পৃষ্ঠা: ৪৬৫, হাদিস: ৩৩৮৯)।
ইসলামে মানব হত্যার পরকালীন বিধান সম্বন্ধে কোরআন মজিদে বলা হয়েছে: ‘কেহ ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো মুমিনকে হত্যা করলে তার শাস্তি জাহান্নাম; সেখানে সে স্থায়ী হবে এবং আল্লাহ তার প্রতি রুষ্ট হবেন, তাকে লানত করবেন এবং তার জন্য মহা শাস্তি প্রস্তুত রাখবেন।’ (আল-কোরআন, পারা: ৫, সূরা-৪ আন নিসা, আয়াত: ৯৩)। আরও সতর্ক করে বলা হয়েছে: ‘আল্লাহ যার হত্যা নিষিদ্ধ করেছেন, যথার্থ কারণ ব্যতিরেকে তোমরা তাকে হত্যা করবে না।’ (আল-কোরআন, পারা: ৮, সূরা-৬ আল আনআম, আয়াত: ১৫১)। ‘আল্লাহ যার হত্যা নিষিদ্ধ করেছেন, যথার্থ কারণ ব্যতিরেকে তোমরা তাকে হত্যা করো না! কেহ অন্যায়ভাবে নিহত হলে তার উত্তরাধিকারীকে তো আমি উহা প্রতিকারের অধিকার দিয়েছি; কিন্তু হত্যার ব্যাপারে সে যেন বাড়াবাড়ি না করে; সে তো সাহায্যপ্রাপ্ত হয়েছে।’ (আল-কোরআন, পারা: ১৫, সূরা-১৭ আল ইসরা/বনি ইসরাইল, আয়াত: ৩৩)।
মানব হত্যার জাগতিক বিধান সম্বন্ধে কোরআনুল কারিমে বলা হয়েছে: ‘হে মুমিনগণ! নিহতের ব্যাপারে তোমাদের জন্য “কিসাস”-এর বিধান দেওয়া হয়েছে। স্বাধীন ব্যক্তির বদলে স্বাধীন ব্যক্তি, ক্রীতদাসের বদলে ক্রীতদাস ও নারীর বদলে নারী, কিন্তু তার ভাইয়ের পক্ষ থেকে কিছুটা ক্ষমা প্রদর্শন করা হলে যথাযথ বিধির অনুসরণ করা ও সততার সহিত তার দেয় আদায় বিধেয়। ইহা তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ হতে ভার লাঘব ও অনুগ্রহ। এরপরও যে সীমা লঙ্ঘন করে, তার জন্য মর্মন্তুদ শাস্তি রয়েছে।’ (আল-কোরআন, পারা: ২, সূরা-২ আল বাকারা, আয়াত: ১৭৮-১৭৯)।
ইসলামি শরিয়তের প্রধান উদ্দেশ্য হলো জীবন রক্ষা, সম্পদ রক্ষা, সম্মান ও সম্ভ্রম রক্ষা, জ্ঞান রক্ষা, বংশ রক্ষা ও ধর্ম রক্ষা। এখানে প্রণিধানযোগ্য যে শরিয়তের মূল পাঁচটি লক্ষ্যের শেষটি হলো ধর্ম রক্ষা এবং প্রথমটি হলো জীবন রক্ষা। কারণ, প্রাণ না থাকলে ধর্ম অচল। আজকাল অনেকেই সামান্য খুঁটিনাটি কারণে সন্ত্রাস, হত্যা, গুপ্তহত্যাসহ খুনখারাবি করতে দ্বিধাবোধ করে না। এটা ইসলামের শিক্ষা নয়; ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা এর সম্পূর্ণ বিপরীত। ইসলামে জীবন রক্ষার জন্য প্রাণ বধের বিধান রয়েছে বটে; কিন্তু তা বাস্তবায়ন করতে হলে শরিয়া আইন অনুসরণ করতেই হবে। ইসলামি আদালত বা খলিফা কর্তৃক মনোনীত প্রতিনিধি বিচারের দায়িত্ব পালন করবেন। কেউ যদি এমন কোনো অপরাধও করেন, যাতে তার প্রাণ নিধনের বিধান আছে; তবে তা কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী কর্তৃক বাস্তবায়ন করা ইসলামসম্মত নয়; বরং তা যথাযথ আদালত ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষই কেবল বাস্তবায়নের এখতিয়ার রাখে। কারণ, কোরআন-হাদিসে বর্ণিত বিধিবিধান, যা অন্যের সঙ্গে সম্পর্কিত অর্থাৎ ব্যক্তির একান্ত নিজের নয়; তথা সমাজ ও রাষ্ট্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট, তা কোনো ব্যক্তি বা সম্প্রদায় নিজেদের মতো করে বাস্তবায়ন করা শরিয়তসিদ্ধ নয়; এটি কেবল আদালত ও সরকারের দায়িত্ব।
মুফতি মাওলানা শাঈখ মুহাম্মাদ উছমান গনী: যুগ্ম মহাসচিব: বাংলাদেশ জাতীয় ইমাম সমিতি; সহকারী অধ্যাপক: আহছানিয়া ইনস্টিটিউট অব সুফিজম।

source--www.prothomalo.com/opinion/article/702073

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

ড. খন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর বই Pdf Download

নেক আমলে অবিচল রাখবে যে ১০ আয়াত

কে ছিলেন ইমাম আল-মাওয়ার্দি