খাদিজা বিনতে খুয়াইলিদ (রাঃ)

 আব্দুল মুত্তালিব। কুরাইশ গোত্রের সর্বজনসম্মত নেতা। স্বপ্নে দিব্যপ্রেরণাপ্রাপ্ত হয়ে তিনি নতুন করে পুনরায় জমজম কূপ খনন করেন। প্রায় তিন হাজার বছর আগে নবি ইসমাইল আলায়হিস সালামের পদাঘাতে, কাবার প্রান্তরে প্রবাহিত হয়েছিল সেই কূপের ধারা। সময়ের বিবর্তনে একসময় সে কূপ হারিয়ে যায় মরুর ঢিপিময় বিস্তৃত বালির নিচে। তিনি স্বপ্নে উদ্বুদ্ধ হয়ে আবারও খনন করেন সেই কূপ এবং উন্মুক্ত করে দেন জনসাধারনের জন্য। এই উদ্যেগে আবারও তিনি পুরো মক্কা অঞ্চলে অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে সম্মানিত হন।


কিন্তু কূপখননকালে নানা বাধার সম্মুখিন হন তিনি মক্কা ও পাশের অঞ্চলের গোত্রপতি কূপের মালিকানা দাবি করেন। তারা বলেন, যেহেতু এই কূপ কাবাঘরের মালিকানায় তাই তারাও এই কুপের হকদার। কিন্তু এইদিকে আব্দুল মুত্তালিব জানিয়ে দেন, এই মালিকানা তার নিজস্ব কেননা তিনি স্বপ্নে দিব্যপ্রেরনাপ্রাপ্ত হয়েছেন। এই নিয়ে যখন বিবাদ গুরুতর হতে লাগলো তখন সিদ্ধান্ত হয় জমজম কুপের মালিকানা কাবা শরিফের নামে উৎসর্গ করে দেওয়া হলো। প্রতিবছর উপাসনালাভে ধন্য হতে আসে যেই তীর্থযাত্রীরা তাদের তৃষ্ণা মেটানোর জন্য উন্মুক্ত করা হলো এই জমজম কূপ। এই সিদ্ধান্তের পর মক্কায় শান্তি ফিরে আসে। মরুর বালিয়াড়ির নিচে হারিয়ে যাওয়া সেই প্রভু প্রদত্ত জমজম কূপ পুনঃখননের পর আবারও তাঁর প্রাণ ফিরে পেলো। এর কৃতজ্ঞায় আব্দুল মুত্তালিব প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হন যে, তাঁর ছেলেরা বালেগপ্রাপ্ত হবার পর যেকোনো এক পুত্রকে কুরবানি দেবেন যেমনটা আদি পিতা ইবরাহিম আলায়হিস সালাম তাঁর প্রিয় পুত্র ইসমাইলকে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কুরবানি দিয়েছিলেন। জমজম পুনঃখননের পর কেটে গেছে অনেক বছর। আব্দুল মুত্তালিব বৃদ্ধ হয়েছেন আর পুত্ররাও এখন পূর্নবয়স্ক। সময় এসেছে সে প্রতিজ্ঞারক্ষার। তিনি তাঁর সর্বকনিষ্ঠ পুত্র আব্দুল্লাহ কে কুরবানির উদ্দেশ্যে নির্বাচিত করেন। কিন্তু মদিনার সাজাহ নামের এক নারী জ্যোতিষির পরামর্শে আব্দুল্লার পরিবর্তে উট কুরবানী দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। আব্দুল মুত্তালিব ১৩০ টি উট কুরবানি দিলেন। ১৩০ টি উট কুরবানির এই মহাযজ্ঞ শেষ হলো। কাবা ঘরের আশেপাশে পড়ে রইল জবাহকৃত উট। তার পর থেকে আব্দুল্লাহর নাম হয়ে গেলো "জবিহুল্লাহ"-আল্লাহর জন্য উৎসর্গকৃত। মক্কা বাসীর জন্য উন্মুক্ত করে দিলেন আব্দুল মুত্তালিব। উটের মাংস যে যেভাবে ইচ্ছা খেতে পারে কোনো বিধিনিষেধ নেই। সবাই খুশি হয়ে ইচ্ছামত মাংস নিজ নিজ বাড়ি নিয়ে গেলেন। কুরবানির এই ঘটনার মাঝেও আব্দুল্লাহর দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলেন এক নারী। তিনি ফাতেমা উম্মে কিতাল। মক্কার পণ্ডিতব্যক্তি ওয়ারাকা ইবনে নওফেলের বােন। তিনিও তাঁর ভাইয়ের মতো অনেক জ্ঞানের অধিকারী। তাছাড়া ভাই ওয়ারাকার সাহচার্যে তিনিও নবীর আগমনের বিষয়ে টের পেয়েছিলেন। তিনি তার জ্ঞানসীমানার সেই তথ্যের সাথে মিলিয়ে নিচ্ছিলেন আব্দুল্লাহকে। তিনি কি সেই, যার ব্যাপারে বহুসময় ধরে অপেক্ষা করছিলেন ভাই ওয়ারাকা। সুন্দর চরিত্রের অধিকারী, বংশধারা হাশেমী। সবই মিলে যায়। নাকি এ যুবক প্রতীক্ষিত ব্যক্তির পূর্ববর্তী বংশধারার কেউ? হয়তাে-বা তাই হবে। হােক, সে প্রতীক্ষিত ব্যক্তি না হােক, তার পূর্ববর্তী বংশধারার কেউ হলেও তাঁর মনে কোনাে দ্বিধা নেই। সেই প্রতীক্ষিত ব্যক্তির মা হতে পারলেও তাঁর সাত জনমের সাধ পূর্ণ হবে। তাঁর গর্ভ থেকে পূর্ণতা পাবে অনাগত পৃথিবী। আব্দুল্লাহকে তার পিতার পেছনে যেতে দেখে ডাক দিয়ে সরাসরি বিয়ের প্রস্তাব দিলেন এবং যতটি উট কুরবানি দিয়েছেন ততটি উট দেওয়ার প্রস্তাব দিলেন। কিন্তু তিনি, তাঁর পিতার অনুমতি ছাড়া মত দিতে পারবেন না বলে বিদায় নিলেন। দ্বিপ্রহর মক্কানগরী। কাবা তাওয়াফ করছে একদল নারী। নারীদের মধ্যে পূর্ণবয়স্ক, কিশোরী, অনুঢ়া এবং তরুণীরাও রয়েছে। কাবাঘরে স্থাপিত উজ্জা, লাত, মানাত, হোবল দেবতাদের সামনে গীত গেয়ে ভালোবাসা অর্পণ করছে। সেই সময় এক লোক উপস্থিত হলেন। লোকটির বেশভূষা বেশ অদ্ভুত ধরনের। গায়ে লম্বা আলখাল্লা, বহু ব্যবহারে রং চটে হয়ে গেছে। মাথায় একটা সাদা রুমাল পুরোনো রুমাল জড়ানো। গলার দুই পাশ দিয়ে নেমে এসেছে একটি উত্তরীয়, সেটার রং খানিকটা তামাটে। লােকটি বয়স্ক, চেহারায় রাজ্যের বলিরেখার ছাপ। তবে বিশেষভাবে লক্ষণীয় তার চোখ দুটো, অস্বাভাবিক রকমের চকচক করছে চোখজোড়া।বৃদ্ধলােকটি হাঁটছেন একটি লাঠি হাতে। যদিও তাঁকে দেখে বােঝা যাচ্ছে তিনি লাঠি ছাড়া হাঁটতে পারেন, তবু তিনি লাঠিটা ডান হাতে ধরে হেঁটে যাচ্ছেন মক্কার পথ ধরে। লােকটি সম্ভবত ইহুদি।ধর্মপ্রাণ বয়স্ক ইহুদিরা এ ধরনের লাঠি হাতে চলাফেরা করেন। লাঠি তাদের ধর্মের অন্যতম নিদর্শন। তাঁদের নবি মুসার যষ্টির সঙ্গে সাযুজ্য রাখতে তারা এমন লাঠি ব্যবহার করেন। লােকটি মাথা নিচু করে হাঁটছেন। হাঁটার সময় এদিক-সেদিক খুব একটা তাকাচ্ছেন না। কাবার প্রাঙ্গনের এক বেদিতে উঠে সেই বৃদ্ধা জোরে হাঁক দিয়ে সেই তাওয়াফকারী একদল নারীকে ডাক দিলেন। সবাই হকচকিয়ে গেলেন কেননা মক্কায় কেউ তাওয়াফ করার সময় এভাবে ডাক দেয় না। আর কেই এই আগন্তুক মক্কাবাসী বলেও তো মনে হচ্ছেনা। কি বা বলতে চান এই মক্কার নারীদের! বৃদ্ধ বললেন, আমি তোমাদের এক সুসংবাদ দিচ্ছি। শুনে রাখো, নিঃসন্দেহে তোমাদের এই মক্কানগরীতে এক নবী আবির্ভুত হবে যার নাম হবে আহমাদ। তোমাদের মাঝে যার সৌভাগ্য হবে, দ্বিধাহীনভাবে সেই নবীর স্ত্রী হয়ে যেও। এই কথা শুনে,বললো আমরা আমাদের দেবতাদের ভালোবাসি এবং তাদের ই উপাসনা করবো। এই কথা বলেই নারীরা রুদ্রমূর্তি রুপ ধারণ করে এবং নানাভাবে বৃদ্ধাকে আক্রমন করে। বৃদ্ধা কোনো ভাবে প্রাণ বাঁচিয়ে প্রত্থান করলেন। কাবার পাশে একটি বাড়ির ছায়ায় বসে ছিলেন এক নারী। দীর্ঘকায়,উজ্জ্বল মুখাবয়ব, রক্তিম অধর, চেহারায় আভিজাত্যের ছাপ। বয়স ত্রিশের কোঠায়। যৌবনের লালিমা এখনাে ঢাকা পড়েনি তাঁর বয়স আভিজাত্যের আড়ালে। এ নারীর নাম খাদিজা বিনতে খুয়াইলিদ। মক্কার লােকেরা তাঁকে তাহিরা নামে ডাকে। কারণ, তাঁর চরিত্র যেমন নিষ্কলুষ তেমনি পবিত্র তাঁর জীবনালেখ্য। তিনি কখনাে মূর্তিপূজা করেন না। কাবার তাওয়াফে কখনাে এলে কেবল অদৃশ্য একক সত্ত্বার আরাধনা করেন। আজও তিনি অন্য নারীদের সঙ্গে তাওয়াফে অংশ নেননি। তার কয়েকজন স্বজন-বান্ধবী উপাসনায় মগ্ন, তিনি তাদের অপেক্ষায় বসে ছিলেন কাবার পাশে। এমন সময় শুনলেন বৃদ্ধের আগমনী আহ্বান। শােনার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর অন্তর্মহলে শুরু হলাে এক অভাবনীয় ভাঙচুর। একজন নবি আসবেন এ মক্কা নগরীতে, তার বধূ হবেন এ নগরীর কোনাে এক নারী! কে হবেন সেই সৌভাগ্যবতী? বৃদ্ধের কথায় অন্য নারীরা হাসাহাসি করলেও খাদিজা (রাঃ) হাসতে পারলেন না । তার ভেতরে তৈরি হতে লাগল এক তীব্র হাহাকার। যে হাহাকার আজ থেকে বহুদিন আগে তৈরি হয়েছিল তাঁর চাচাতাে বােন উম্মে কিতালের হৃদয় অন্তঃপুরে। একজন নবির আগমনের অপেক্ষায় ছিলেন তিনিও, কিন্তু ভাগ্য তাঁর সহায় হয়নি। এবার তাঁর ভাগ্যে কি হবে সেই নবির চরণতলে এক বিন্দু ভালােবাসার নজরানা পেশ করার? খাদিজা (রাঃ) এর হৃদয় ব্যথায় কুঁকড়ে গেল। নবির সহধর্মিণী না হােক, অন্তত জীবদ্দশায় কি একবার দেখতে পারবেন ঐশী বিভায় আলােকিত সেই চন্দ্রমহিম মুখাবয়ব? চাচাতাে ভাই ওয়ারাকার মুখে যেদিন প্রথম শুনেছেন শেষ নবি আগমনের সুসংবাদ, অত্যাসন্ন তাঁর মহাকাল; সেদিন থেকে হৃদয়ের ছােট্ট মণিকোঠায় সেই নবির জন্য সাজিয়ে রেখেছেন ভালােবাসার ফুলেল বাগিচা। নবি কি কখনাে হাঁটবেন সে বাগিচার ফুল মাড়িয়ে? খাদিজা (রাঃ) আর কিছু ভাবতে পারলেন না, কাবার পাশ থেকে উঠে গেলেন। একা একা হাঁটতে লাগলেন ওয়ারাকা ইবনে নওফেলের বাড়ির দিকে। ওয়ারাকার বয়স হয়েছে। দৃষ্টিশক্তি এখন খুবই দুর্বল। সময়ের ঘূর্ণিপাকে, তাঁর আলোয় ছিনিয়ে নিয়ে দিয়ে গেছে অন্ধকার। পৃথিবীর রুপ দেখার সোভাগ্য ধীরে ধীরে চলে যাচ্ছে। চোখের দৃষ্টি না থাকলেও তাঁর অন্তদৃষ্টি যেন বাঁধনহারা। দুই চোখের বদলে তার অন্তর্দৃষ্টি তাকিয়ে থাকে মহিমান্বিত পৃথিবীর দিকে। সে দৃষ্টি দিয়ে তিনি মরুর কলরােল শুনতে পান, পাহাড়ের গুঞ্জরন বুঝতে পারেন, হাওয়ায় কান পাতলে অনুভব করেন অন্যলােকের অলৌকিক ঝরনার শব্দ। প্রতিটি নৈঃশব্দ্য তাঁর জন্য বয়ে আনে একেকটি মুগ্ধকর দৃশ্যরূপ। তিনি শব্দের অনন্যতা দিয়ে অনুধাবন করেন আলােহীন পৃথিবী। দূর থেকে চাচাতাে ভাই ওয়ারাকার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন খাদিজা (রাঃ)। এ বিদ্বান ভাইটিকে তিনি বেশ পছন্দ করেন। তাঁর জ্ঞান, প্রজ্ঞা,ধর্মানুভূতি তাঁকে আলােড়িত করে। তার বিজ্ঞদর্শিতা দেখলে মুহূর্তে শ্রদ্ধায় মাথা নুয়ে আসে। এ কারণে ওয়ারাকা খাদিজা (রাঃ) এর কেবল ভাই-ই নন, তিনি হয়ে উঠেছেন তাঁর সবচেয়ে বিশ্বস্ত বন্ধু এবং অভিভাবক। এমন বন্ধু, যার কাছে খুলে বলা যায় হৃদয়ের সকল অভিলাষ, আশা ও বেদনার কাহিনিকাব্য। তাই যখনই কোনাে প্রয়ােজন পড়ে, খাদিজা (রাঃ) পরামর্শের জন্য সবার আগে চলে আসেন ওয়ারাকার কাছে। খাদিজা বিনতে খুয়াইলিদ (রাঃ) - ১ম অংশ || উম্মুল মুমিনিন || -জান্নাতুন নেসা তারিন
collected

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

ড. খন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর বই Pdf Download

নেক আমলে অবিচল রাখবে যে ১০ আয়াত

কে ছিলেন ইমাম আল-মাওয়ার্দি