ইসলামের সৌন্দর্য (তৃতীয় পর্ব)
মসজিদে নামাজ পড়তে গিয়ে মোজার উৎকট গন্ধ পেলে কেমন লাগবে? সিজদাহ দিতে গিয়ে সামনের জনের মোজার গন্ধে মনে হবে পেটের নাড়িভুঁড়ি বের হয়ে আসছে। শীতকালে এটা বেশি হয়।এটাকে অন্যভাবে দেখলে বলা যায়- একজন নামাজী আরেকজন নামাজীকে কষ্ট দিচ্ছে। কিভাবে কষ্ট দিচ্ছে? দুর্গন্ধ দিয়ে। সবাই নামাজ পড়তে আসছে, আল্লাহর ইবাদাত করতে আসছে। আল্লাহর ইবাদাতের মতো মহান কাজ করতে গিয়ে মানুষকে একটু কষ্ট দেওয়া হবে, তা আর এমন কী? কাঁচা পেয়াজ আর রসুন চিবিয়ে খেলে মুখ থেকে দুর্গন্ধ বের হয়। এগুলো খেয়ে মসজিদে গেলে থমথম পরিবেশে দুর্গন্ধ আরেকজনের নাকে যায়, আরেকজন নামাজী এতে বিরক্ত হতে পারে। নবিজী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) পেঁয়াজ ও রসুনের ব্যাপারে বলেন: “কেউ এসব দুর্গন্ধযুক্ত উদ্ভিদ খেলে সে যেনো আমার মসজিদের নিকট না আসে। কেননা মানুষ যেসব জিনিসে কষ্ট পায়, ফেরেশতাগণও সেসব জিনিসে কষ্ট পায়।” [সহীহ মুসলিম: ১১৩৯] পেঁয়াজ-রসুন খাবার পর মুখ থেকে দুর্গন্ধ বের হয় বলে নবিজী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) খুব শক্তভাবে বললেন এগুলো খেয়ে কেউ যেনো মসজিদে না যায়! কারণ কী? কারণ, মানুষের কষ্ট হবে বলে। ইসলাম এমনটা সমর্থন করে না যে- ‘আমি ইচ্ছেমতো আল্লাহর ইবাদাত করবো, আমার ইবাদাতের ফলে কারো কোনো অসুবিধা হচ্ছে কি-না, কেউ বিরক্ত হচ্ছে কি-না সেটা দেখার আমার টাইম নেই!’ আল্লাহর ইবাদাত করতে গিয়ে বান্দাও যেনো বিরক্ত না হয় ইসলাম সেদিকে লক্ষ্য রাখতে বলে। যেমন ধরুন, মানুষ কিছু খাবার পর তার মুখ থেকে দুর্গন্ধ বের হয়। নাস্তা করে মানুষ নামাজ পড়তে যায়, ভাত খেয়ে মানুষ নামাজ পড়তে যায়; কুলি করা সত্ত্বেও তার মুখ থেকে কিন্তু দুর্গন্ধ পুরোপুরি যায় না। নবিজী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: “আমার উম্মতের জন্য যদি কঠিন মনে না করতাম, তাহলে প্রত্যেক নামাজের সাথে তাদেরকে মিসওয়াক করার নির্দেশ দিতাম।” [সহীহ বুখারী: ৮৮৭] নবিজী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যদি নির্দেশ দিতেন, তাহলে তো নামাজের সাথে মিসওয়াক করা অবশ্য কর্তব্য হয়ে যেতো। অনেকেই সাথে করে মিসওয়াক না রাখলে এটা পালন করতে পারতো না, কষ্ট হতো। কিন্তু, নবিজীর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলার ভঙ্গিতেই বুঝা যাচ্ছে নামাজের আগে মিসওয়াক করাটা কতোটা গুরুত্বপূর্ণ। এই মিসওয়াক করলে কী হবে? সবচেয়ে বড়ো সুফল হলো মুখে দুর্গন্ধ থাকবে না। মুখে দুর্গন্ধ না থাকলে আশেপাশের মুসল্লী বিরক্ত হবে না। একজন মানুষ যদি একটানা কয়েকদিন গোসল না করে তাহলে তার শরীর থেকে দুর্গন্ধ বের হয়। সে মানুষের সাথে চলাফেরা করে, মসজিদেও যায়। তার শরীরের দুর্গন্ধে মানুষের কষ্ট হয় না? মানুষকে কষ্ট দিয়ে এভাবে ইবাদাত করা কি ঠিক? নবিজীর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সময়ে জুমুআর নামাজে গ্রামের লোকজন (বেদুঈন) অংশগ্রহণ করতো। তারা জীবিকার্জনে ব্যস্ত থাকার কারণে জুমুআর নামাজে এমনভাবে অংশগ্রহণ করতো যে, তাদের শরীরে ময়লা লেগে থাকতো, শরীরে যখন বাতাস লাগতো, বাতাস দুর্গন্ধযুক্ত হয়ে যেতো। এতে করে মসজিদে উপস্থিত অন্যান্য লোকজনের কষ্ট হতো। অন্যান্য সাহাবীরা নবিজীকে (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বিষয়টি অবহিত করলেন। স্বয়ং আল্লাহর ইবাদাত করতে এসেও কি কার কষ্ট হচ্ছে না হচ্ছে দেখতে হবে? হ্যাঁ, হবে। নবিজী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) গ্রাম্য বেদুঈনদেরকে জিজ্ঞেস করলেন: “তোমরা গোসল করো না কেনো?” [সুনানে আন-নাসাঈ: ১৩৭৯] মানুষের কষ্ট হয় বলে নবিজী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) গ্রাম্য লোকদেরকে গোসল করতে বলেন; নিজের মনমতো আল্লাহর ইবাদাত করাটাই যথেষ্ট না। আশেপাশের লোকজন কষ্ট পাচ্ছে কি-না সেটাও দেখতে হবে। জুমুআর নামাজে সাধারণত অনেক মানুষ অংশগ্রহণ করে, অন্যান্য নামাজে এতো মানুষ হয় না। সেখানে যদি মাত্র একজনের শরীর থেকে দুর্গন্ধ বের হয়, তাহলে অনেক মুসল্লীর অসুবিধা হবে। আল্লাহর ইবাদাত করতে এসে ইবাদাতে মন না দিয়ে গন্ধ ঠেকানোর দিকে তাদের মন থাকবে। এক্ষেত্রে সমাধান কী? ইসলাম এক্ষেত্রেও একটা সমাধান নিয়ে হাজির হলো। নবিজী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: “জুমুআর দিন প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক মুসলিমের গোসল করা ওয়াজিব।” [সহীহ বুখারী: ৮৫৮] মানে কী? আপনি জুমুআর নামাজে গেলে আপনাকে অবশ্যই গোসল করেই যেতে হবে। আল্লাহর ইবাদাত করতে গিয়ে আরেকজনকে কষ্ট দিতে পারবেন না। জুমুআর দিন অনেক মানুষের সাথে আপনার দেখা হবে। ইসলাম শুধু গোসল করে দুর্গন্ধ দূর করতেই বলেনি, সুগন্ধি ব্যবহার করে অন্য মানুষকে স্বাচ্ছন্দ্য দেবার কথাও বলেছে। আপনি জুমুআর দিন এতো কষ্ট করে গোসল করবেন, দুই-তিন মাস তো আবার শীতকালেও গোসল করতে হবে। নিজের টাকা দিয়ে আঁতর কিনে আরেকজনকে সুগন্ধি বিতরণ করবেন। এখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসবে- এতে আপনার লাভ কী? লাভ-ক্ষতি ছাড়া তো মানুষ এক পা আগায় না। দেখি নবিজী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কী বলেন: “যে ব্যক্তি জুমুআর দিন গোসল করে, যথাসাধ্য ভালোরূপে পবিত্রতা অর্জন করে, নিজের তেল ব্যবহার করে বা নিজ ঘরের সুগন্ধি ব্যবহার করে বের হয়, অতঃপর দুজন লোকের মাঝে ফাঁক না রেখে নামাজ আদায় করে এবং ইমামের খুতবা দেবার সময় চুপ থাকে, তাহলে সে জুমুআ থেকে আরেক জুমুআ পর্যন্ত তার যাবতীয় গুনাহ মাফ করে দেয়া হয়।” [সহীহ বুখারী: ৮৮৩] তারমানে পরিপাটি হয়ে মানুষের সামনে যেতে ইসলাম উৎসাহিত করে, সেজন্য ইসলাম পুরস্কারও দিচ্ছে। ইসলাম কল্যাণকামী ধর্ম, রুচিশীল ধর্ম। ইসলাম স্রেফ নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত থাকতে বলে না। আশেপাশের মানুষজন যেনো বিরক্ত না হয় সেদিকে খেয়াল রাখতেও বলে। আমাদের করণীয়: দুর্গন্ধযুক্ত ময়লা পোশাক পরে মানুষের সামনে যাওয়া যাবে না। ঝালমুড়িসহ যেসব খাবারে কাঁচা পেঁয়াজ আছে, সেগুলো খেয়ে ভালোভাবে মুখ পরিস্কার করে মানুষের সামনে যেতে হবে। একদিন মোজা পরলে সেটা থেকে দুর্গন্ধ ছড়ায়। নিয়মিত মোজা পরে ধুতে হবে, রোদে শুকাতে হবে। মোজা থেকে দুর্গন্ধ বের না হবার জন্য জুতোর মধ্যে ট্যালকম পাউডার, বরিক পাউডার দেওয়া যেতে পারে। বাহুর নিচের দুর্গন্ধরোধ করতে লোম পরিস্কার রাখুন, সুগন্ধি ব্যবহার করুন। মানুষ স্বভাবত বিরক্ত হয় এমন কাজগুলো পরিহার করতে হবে। ইসলামের সৌন্দর্য (তৃতীয় পর্ব) আরিফুল ইসলাম
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন