মানুষের ‘ক্বালব’ বা আত্মার পবিত্রতা
মানুষের ‘ক্বালব’ বা আত্মার পবিত্রতা সবচাইতে দামী এবং গুরুত্বপূর্ণ জিনিসঃ (১) মহান আল্লাহ বলেন, “নিশ্চয়ই সেই ব্যক্তি সফলতা অর্জন করবে, যে নিজেকে পরিশুদ্ধ করে।” সুরা আল-আ’লাঃ ১৪। আয়াতের তাফসীরঃ যে ব্যক্তি নিজের আত্মাকে নোংরা আচরণ থেকে এবং অন্তরকে শিরক ও পাপাচারের পঙ্কিলতা থেকে পবিত্র করে (নিশ্চয়ই সেই ব্যক্তি সফলতা অর্জন করবে।) তাফসীর আহসানুল বায়ান। (২) সুরা আশ-শামসের প্রথম দশটি আয়াতে এই একই বাণী আল্লাহ তাআ’লা একাধারে তাঁর আটটি বৃহৎ সৃষ্টি এবং তিনবার তাঁর নিজ সত্ত্বার ক্বসম করার পর পুনরায় উল্লেখ করেছেন। মহান আল্লাহ বলেন, “শপথ সূর্যের এবং তার (দিনের প্রথম ভাগের) কিরণের। শপথ চন্দ্রের, যখন তা সূর্যের পর আবির্ভূত হয়। শপথ দিনের, যখন তা সূর্যকে প্রকাশ করে। শপথ রাতের, যখন সে সূর্যকে ঢেকে নেয়। শপথ আকাশের এবং যিনি তা বিস্তৃত করেছেন তাঁর। শপথ জমিনের এবং যিনি তা বিস্তৃত করেছেন তাঁর। শপথ নফস (প্রাণের) এবং যিনি তা সুবিন্যস্ত করেছেন তাঁর। তারপর তাকে (নফসকে) তার সৎকাজের এবং তার অসৎ-কাজের জ্ঞান দান করেছেন। সেই ব্যক্তি সফলকাম হয়েছে; যে নিজের আত্মাকে পবিত্র করেছে। সেই ব্যক্তি ব্যর্থ হয়েছে; যে নিজের আত্মাকে কলূষিত করেছে।” সুরা আশ-শামসঃ ১-১০। (৩) হযরত ইব্রাহীম আ’লাইহিস সালাম এই বলে দুয়া করেছিলেন, “(হে আল্লাহ!) পুনরুত্থান দিবসে তুমি আমাকে লাঞ্ছিত করো না, যেই দিনে কারো ধন-সম্পদ ও সন্তান সন্ততি কোন উপকারে আসবে না। কিন্তু যে ‘ক্বালবিন সালিম’ (সুস্থ অন্তর) নিয়ে আল্লাহর কাছে আসবে (শুধুমাত্র সে-ই মুক্তি পাবে)।” সুরা আশ-শু’আরাঃ ৮৭-৮৯। *ক্বালবিন সালিম বা সুস্থ অন্তর হচ্ছে শিরক, কুফুরী ও নিফাক মুক্ত, অন্তরের বিভিন্ন ব্যধি যেমন, রিয়া, অহংকার, হিংসা, সম্মান-মর্যাদার প্রতি মোহ থেকে মুক্ত, হারাম ও পাপাচারের প্রতি আসক্তিহীন, নেককার লোকদের অন্তর। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লামের হাদীসঃ (৪) নু’মান ইবনে বাশীর রাদিয়াল্লাহু আ’নহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “আমি আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি, ألاَ وَإنَّ فِي الجَسَدِ مُضْغَةً إِذَا صَلَحَت صَلَحَ الْجَسَدُ كُلُّهُ، وَإِذَا فَسَدَتْ فَسَدَ الْجَسَدُ كُلُّهُ، ألاَ وَهِيَ القَلْبُ “জেনে রাখ! দেহের মধ্যে এমন একটি গোশতের টুকরা রয়েছে; যখন তা সুস্থ থাকে, তখন গোটা দেহটাই সুস্থ হয়ে যায়। আর যখন তা খারাপ হয়ে যায়, তখন গোটা দেহটাই খারাপ হয়ে যায়। শোন! আর সেটা হচ্ছে ‘ক্বালব’ (অন্তর, হৃদয় বা heart)।” সহীহুল বুখারীঃ ৫২, সহীহ মুসলিমঃ ১৫৯৯, তিরমিযীঃ ১২০৫, নাসায়ীঃ ৪৪৫৩। (৫) আবু বারযাহ রাদিয়াল্লাহু আ’নহু বর্ণনা করেছেন। নবী সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “নিশ্চয়ই আমি তোমাদের জন্য সবচাইতে বেশি ভয় করি তোমাদের পেট এবং যৌনাংগের শাহওয়াত এবং পথভ্রষ্টকারী হাওয়া (কুপ্রবৃত্তির) ব্যাপারে।” মুসনাদে আহমাদঃ ১৯২৭৪, ইবনুল ক্বাইয়্যিম রহি’মাহুল্লাহ সহীহ বলেছেন, যাম্মুল হাওয়া। (৬) আবী ইয়ালা সাদ্দাদ ইবনে আউস রাদিয়াল্লাহু আ’নহু হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, «العَاجِزُ مَنْ أَتْبَعَ نَفْسَهُ هَوَاَها » “অক্ষম সে ব্যক্তি, যে তার নাফসকে তার কুপ্রবৃত্তির অনুসারী বানায়।” ইবনে মাযাহঃ ৪২৬০, ইমাম হাকিম রহি’মাহুল্লাহ হাদীসটিকে ‘সহীহ’ বলেছেন। (৭) রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “আমার উম্মতের মধ্যে শীঘ্রই এমন একদল লোক বের হবে, যাদের মধ্যে প্রবৃত্তি পরায়ণতা এমনভাবে প্রবহমান হবে, যেইভাবে কুকুরের বিষ (জলাতঙ্ক রোগ) আক্রান্ত ব্যক্তির সারা দেহে সঞ্চারিত হয়। কোন একটি শিরা বা জোড়া বাকী থাকে না যেখানে উক্ত বিষ প্রবেশ করে না।” তিরমিযীঃ ৬৪১, ইবনু মাজাহঃ ৩৯৯২। সহীহ, সিলসিলাহ সহীহাহঃ ১৩৪৮। সাহাবা এবং মুসলিম মনীষিদের বক্তব্যঃ (৮) হযরত খালিদ রাবঈ রহি’মাহুল্লাহ বলেন যে, হযরত লোকমান ছিলেন একজন হাবশী ক্রীতদাস ও ছুতার (অর্থাৎ, তিনি কাঠের কাজ করতেন)। একদা তার মনিব তাঁকে বলেঃ “তুমি একটি ছাগল যবাই কর এবং তার গোশতের উৎকৃষ্ট দুইটি টুকরা আমার কাছে নিয়ে এসো।” তিনি হৃৎপিণ্ড ও জিহ্বা নিয়ে আসলেন। কিছুদিন পর পুনরায় তাঁর মনিব তাঁকে এই আদেশই করলো এবং বকরীর গোশতের নিকৃষ্ট দুইটি খণ্ড আনতে বললো। তিনি এবারও উক্ত দুটি জিনিস (হৃৎপিণ্ড ও জিহ্বা) নিয়ে আসলেন। তার মনিব তখন বললো, “ব্যাপার কি? এটা কি ধরণের কাজ হলো?” উত্তরে তিনি বললেনঃ “এই দুইটি যখন ভাল থাকে তখন দেহের কোন অঙ্গই এ দুইটির চাইতে ভাল নয়। আবার এ দুটি জিনিস যখন খারাপ হয়ে যায় তখন সবচেয়ে নিকৃষ্ট জিনিস এ দুটোই হয়ে থাকে।” তাফসীর ইবনে কাসীর, সুরা লুক্বমানের তাফসীর। (৯) আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আ’নহু বলেন, “ক্বালব (অন্তর) হচ্ছে বাদশাহ আর শরীরের অংগ-প্রত্যংগসমূহ হচ্ছে সৈনিকের মতো। যদি বাদশাহ ভালো হয়, তাহলে সৈনিকেরা নেক হয়। আর যদি বাদশাহ খারাপ হয়, তাহলে সৈনিকেরা নেক হয় খারাপ হয়।” শুয়া’বুল ঈমান, ইমাম আল-বায়হাক্বী রহি’মাহুল্লাহ। (১০) আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আ’নহুমা বলেন, “মানুষের মাঝে এমন একটা সময় আসবে যখন সে তার উদর পূর্তি করা ছাড়া আর কোন কিছুর কথা চিন্তা করবেনা আর তাঁদের দ্বীন হবে তাঁদের প্রবৃত্তির অনুসরণ করা।” আয-যুহদ, ইমাম ইবনে আল-মুবারকঃ ৬১৩। (১১) আলী রদিয়াল্লাহু আ’নহু বলেছেন, “যে ব্যক্তি জাহান্নামকে ভয় করলো, সে প্রবৃত্তি থেকে দূরে সরলো।” আল-ইসতিদাদ লি-ইয়াওমিল মাআ’দ। (১২) আবু হাযেম রহি’মাহুল্লাহ বলেন, “তুমি তোমার শত্রুর সাথে যেইভাবে যুদ্ধ করো, তার চাইতে তোমার প্রবৃত্তির বিরুদ্ধে বেশি যুদ্ধ করো।” হিলইয়াতুল আওলিয়াঃ ২৩১/৩। (১৩) বলা হয়ে থাকে, “হাওয়া (কু-প্রবৃত্তির অনুসরণ) বাদশাহকে পথের ভিখারী বানায়, আর সবর (ধৈর্য ধারণ করা) ভিখারীকে দেশের রাজা বানায়। তুমি কি জানোনা, ইউসুফ আ’লাইহিস সালাম ও জুলাইখা (তৎকালীন মিশরের বাদশাহর স্ত্রীর) ঘটনা?” আল-ইসতিদাদ লি-ইয়াওমিল মাআ’দ। (১৪) আবু আলী আদ-দাকাক বলেছেন, “যৌবনে যে তার প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারল, আল্লাহ তাআ’লা তাকে বৃদ্ধ অবস্থায় সম্মান দান করবেন।” রওদাতুল মুহিব্বিনঃ ৪৮৫-৪৮৬। (১৫) আল-হাফিয আবুল ফারাজ ইবনে আল-হাফিয (মৃত্যু ৫৯৭ হিজরী) রহি’মাহুল্লাহ বলেছেন, “আমাদের প্রতিটা নিঃশ্বাস নেওয়ার মাধ্যমে আমরা মৃত্যুর দিকে অগ্রসর হই। আমরা এই দুনিয়াতে যে সময় কাটাচ্ছি তা খুবই সংক্ষিপ্ত, আমরা কবরে যে সময় কাটাবো তা খুবই দীর্ঘ। আর আমাদের কুপ্রবৃত্তির কারণে কৃত পাপের শাস্তি খুবই ভয়ংকর! (সুতরাং, দুনিয়ার জীবনের ব্যাপারে সাবধান হও!)।” (১৬) ইমাম ইবনে রজব রহি’মাহুল্লাহ বলেন, “সালাফ এবং খালাফদের মধ্যে কোন কোন আলেম বলেছেন, “সেই ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করেনা, যে কেঁদে কেঁদে চোখের পানিতে বুক ভাসায়। বরং প্রকৃতপক্ষে সেই ব্যাক্তি আল্লাহকে ভয় করে, যে তার প্রবৃত্তির অনুযায়ী চলা ত্যাগ করে, যেই ব্যক্তি হারাম থেকে বেঁচে থাকে যদিও সে তা সম্পাদন করতে সক্ষম। সবচাইতে বেশি সওয়াব রয়েছে তার জন্য, যে গোপনে আল্লাহকে মেনে চলে।” মাজমু রাসায়েলঃ ১/১৬৩, ইমাম ইবনে রজব রহি’মাহুল্লাহ। (১৭) আবুল আতাহিয়া রহি’মাহুল্লাহ বলেন, “সবচাইতে বড় যুদ্ধ হচ্ছে নফসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা। আর তাক্বওয়া ছাড়া একজন মানুষকে আর কিছুই সম্মান দিতে পারে না।” (১৮) ইমাম ইবনে ক্বাইয়্যিম রহি’মাহুল্লাহ বলেন, “অন্তরের পবিত্র অর্জনের জন্য সবচাইতে বড় ঔষধ হচ্ছে ‘হাওয়া’ বা কুপ্রবৃত্তির বিরোধীতা করা। মানুষের জন্য সবচাইতে কঠিন কাজ হচ্ছে কুপ্রবৃত্তির বিরোধীতা করা অথচ আত্মার জন্য এর চাইতে উপকারী অন্য কিছু নেই।” ইগাসা আল-লাহফানঃ ১/৬৯।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন