ঈমানের পরীক্ষা
বিপদ ও কষ্টের সময় ‘সবর’ বা ধৈর্য ধারণ করা, সুখ-শান্তির সময় আল্লাহর ‘শুকরিয়া’ আদায় করা এবং প্রকাশ্য ও গোপনে অর্থাৎ, সর্বাবস্থায় আল্লাহ তাআ’লাকে ভয় করে চলা হচ্ছে দুনিয়া এবং আখিরাতে চূড়ান্ত সফলতা অর্জনের মূল চাবিকাঠি। এ সম্পর্কে ক্বুরআনে অনেক আয়াত এবং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লামের অনেক হাদীস বর্ণিত হয়েছে। => আল-ক্বুরআনের “সর্বোত্তম কাহিনী” সমৃদ্ধ সুরা ইউসুফের শেষের দিকে যখন হযরত ইউসুফ আ’লাইহি সালামকে তাঁর ভাইয়েরা এতো ষড়যন্ত্র এবং বিশ্বাসঘাতকতার পরেও যখন তাঁকে মিশরের রাজ দরবারে উচ্চ মর্যাদায় আসীন দেখতে পেলো এবং তাঁকে চিনতে পারলো, তখন হযরত ইউসুফ আ’লাইহি সালাম আল্লাহর পক্ষ থেকে তাঁর এই নিয়ামত প্রাপ্তির কি কারণ তা উল্লেখ করেছিলেন। হযরত ইউসুফ আ’লাইহি সালামের পরবর্তী সমস্ত মানুষের জন্য তা অমূল্য উপদেশ বাণী হিসেবে মহান আল্লাহ আল-ক্বুরআনে তা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে ওয়াহী করে আমাদের সবাইকে জানিয়ে দিয়েছেন। মহান আল্লাহ বলেন, قَالُوٓاْ أَءِنَّكَ لَأَنتَ يُوسُفُۖ قَالَ أَنَا۠ يُوسُفُ وَهَٰذَآ أَخِيۖ قَدۡ مَنَّ ٱللَّهُ عَلَيۡنَآۖ إِنَّهُۥ مَن يَتَّقِ وَيَصۡبِرۡ فَإِنَّ ٱللَّهَ لَا يُضِيعُ أَجۡرَ ٱلۡمُحۡسِنِينَ ٩٠ অর্থঃ তারা (অর্থাৎ ইউসুফ আ’লাইহিস সালামের ভাইয়েরা) বললো, “তাহলে তুমি কি সত্যিই ইউসুফ?” তিনি বললেন, “আমিই ইউসুফ এবং এই (ছেলেটি, বিন ইয়ামিন) আমার সহোদর ভাই; আল্লাহ তো আমাদের উপর অনুগ্রহ করেছেন। নিশ্চয় যে ব্যক্তি তাক্বওয়া অবলম্বন করে এবং সবর করে, তবে নিশ্চয় আল্লাহ মুহসিন (সৎ কর্মশীল ব্যক্তিদের) কর্মফল নষ্ট করেন না।” সুরা ইউসুফঃ ৯০। এখান থেকে দুনিয়ার জীবনে চলার পথে দুঃখ-কষ্ট, বিপদ-আপদ বা আল্লাহর পক্ষ থেকে পরীক্ষার সময় ধৈর্য ধারণ করা এবং সর্বাবস্থায় তাক্বওয়া অবলম্বনের সুন্দর শিক্ষা পাওয়া যায়। যে ব্যক্তি বলবে, “আমি আল্লাহকে বিশ্বাস করি”, আল্লাহ অবশ্যই তার ঈমানের পরীক্ষা নিবেন। মহান আল্লাহ বলেন, “মানুষ কি মনে করে যে, “আমরা ঈমান এনেছি” - এ কথা বলেই অব্যহতি পেয়ে যাবে, আর তাদেরকে পরীক্ষা করা হবেনা? আমি অবশ্যই তাদের পূর্বে যারা ছিলো তাদেরকে পরীক্ষা করেছি। আর আল্লাহ অবশ্যই জেনে নিবেন কারা সত্যবাদী, আর কারা মিথ্যাবাদী।” সুরা আনকাবুত, আয়াত ২-৩। এই পরীক্ষার বিভিন্ন রকম বা ধরণ রয়েছে। (১) মানুষকে সবচাইতে বড় যে কয়টি বিষয়ে পরীক্ষা করা হয় তা হচ্ছে, “আর আমি তোমাদেরকে অবশ্যই পরীক্ষা করব কিছুটা ভয়, ক্ষুধা এবং ধন-সম্পদ, জীবন ও ফসলের ক্ষয়-ক্ষতি দ্বারা।” সুরা আল-বাক্বারাহঃ ১৫৫। অর্থাৎ, আল্লাহ তাআ’লা মানুষকে ভয়-ভীতি, ক্ষুধা, ধন-সম্পদ, জীবন বা ফল ও ফসলের ক্ষতি বা হানি দ্বারা পরীক্ষা করবেন। (২) মানুষ একজন আরেকজনের জন্য পরীক্ষা। যেমন:- - আল্লাহ মানুষকে বিবাহ করার তোওফিক্ব দানের মাধ্যমে স্বামীকে স্ত্রীর জন্য বা, স্ত্রীকে স্বামীর জন্য পরীক্ষা হিসেবে বানিয়েছেন। - আবার কারো বিয়েতে দেরী বা বাঁধা-বিঘ্ন সৃষ্টির মাধ্যমে আল্লাহ তাকে পরীক্ষা করেন, সে সবর করে কিনা, বা নিজেকে পবিত্র রেখে আল্লাহর ব্যপারে উত্তম ধারণা পোষণ করে কিনা। - আল্লাহ কাউকে সন্তান দিয়ে পরীক্ষা করেন, সে আল্লাহর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে কিনা। আবার কাউকে সন্তান না দিয়ে পরীক্ষা করেন, সে সবর করে কিনা।
(৩) আল্লাহ কাউকে ইলম দিয়ে পরীক্ষা করেন, সে ইলম অনুযায়ী আমল করে কিনা। আবার কাউকে ইলম না দিয়ে পরীক্ষা করেন, সে ইলম বা হেদায়েত তালাশ করে কিনা। যাই হোক মানুষের চিরন্তন একটা স্বভাব হচ্ছে, যাকে যেই ব্যপারে পরীক্ষা করা হয়; সে মনে করে তার পরীক্ষাটাই সবচাইতে বড় এবং সবচাইতে কঠিন। এর কারণ হচ্ছে, আল্লাহর কঠিন পরীক্ষার বাস্তবতা এবং অতীতের নেককার লোকদের আদর্শ সম্পর্কে জ্ঞান না থাকা। মহান আল্লাহ আমাদের প্রতি রহম করুক। আমীন।
❖ কি পরিমাণ ঈমান নিয়ে মৃত্যুবরণ করতে পারলেও, তার জন্য জান্নাতে প্রবেশের সুযোগ রয়েছে বলে হাদিসে উল্লেখ রয়েছে? এই প্রশ্নের সঠিক উত্তরটি হবেঃ সরিষা পরিমাণ। এ বিষয়ে হাদিসে উল্লেখ রয়েছে যে, কিয়ামতের দিন যখন নবী সাল্লাল্লাহু আ'লাইহি ওয়া সাল্লামকে সুপারিশ করার অনুমতি দেওয়া হবে তখন তিনি বলবেন, "হে আমার রব্ব! যার অন্তরে একটা সরিষা পরিমাণ ঈমান আছে, তাকে তুমি জান্নাতে প্রবেশ করাও। তারপর তাদেরকে জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে।" (সহীহ বুখারীঃ ৭৫০৯)
একারণে আলী রাদিয়াল্লাহু আ'নহু বলেছেন, "তোমার জন্য সবচেয়ে বড় খুশির দিন হচ্ছে, যেইদিন তুমি ঈমান নিয়ে দুনিয়া থেকে বিদায় নেবে।" আপনারা উত্তম মৃত্যু অর্থাৎ, ঈমানের সহিত, নেককার অবস্থায় মৃত্যুর জন্য খুব বেশি দুয়া করবেন। যদি আল্লাহ তাআ'লার শিখিয়ে দেওয়া ক্বুরআনী দুয়া করতে চান তাহলে এই দুয়াটা অবশ্যই মুখস্থ করে প্রতিদিন মুনাজাতে বলার অভ্যাস গড়ে তুলবেন ইন শা আল্লাহ। গুনাহ থেকে মাফ পাওয়ার জন্য ও নেককার বান্দা হিসেবে মৃত্যুর জন্য দুয়াঃ رَبَّنَا فَاغْفِرْ لَنَا ذُنُوبَنَا وَكَفِّرْ عَنَّا سَيِّئَاتِنَا وَتَوَفَّنَا مَعَ الْأَبْرَارِ উচ্চারণঃ রব্বানা ফাগফির লানা যুনুবানা ওয়া-কাফফির আ’ন্না সাইয়্যিআ-তিনা ওয়া তাওয়াফ-ফানা মাআ’ল আবরা-র। অর্থঃ হে আমাদের পালনর্তা! তুমি আমাদের গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দাও, আমাদের মন্দ কাজগুলো দূর করে দাও আর আমাদেরকে নেককার হিসেবে মৃত্যু দান করো। (সুরা আলে ইমরানঃ ১৯৩)
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন