কেয়ামতের ছোট ও বড় আলামতসমূহ
কেয়ামতের ছোট ও বড় আলামতসমূহঃ কেয়ামতের পূর্বে কেয়ামতের নিকটবর্তিতার প্রমাণস্বরূপ যে আলামতগুলো প্রকাশ পাবে সেগুলোকে ছোট আলামত ও বড় আলামত এই পরিভাষাতে আখ্যায়িত করা হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে ছোট আলামতগুলো কেয়ামত সংঘটিত হওয়ার অনেক আগেই প্রকাশিতহবে। এর মধ্যে কোন কোন আলামত ইতিমধ্যেই প্রকাশ পেয়ে নিঃশেষ হয়ে গেছে। কোন কোন আলামত নিঃশেষ হয়ে আবার পুনঃপ্রকাশ পাচ্ছে। কিছু আলামত প্রকাশিত হয়েছে এবং অব্যাহতভাবে প্রকাশিত হয়ে যাচ্ছে। আর কিছু আলামত এখনো প্রকাশ পায়নি। কিন্তু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সংবাদ অনুযায়ী সেগুলো অচিরেই প্রকাশ পাবে। কেয়ামতের বড় বড় আলামতগুলো হচ্ছে অনেক বড় বড় বিষয়। এগুলোর প্রকাশ পাওয়া প্রমাণ করবে যে, কেয়ামত অতি নিকটে; কেয়ামত সংঘটিত হওয়ার সামান্য কিছু সময় বাকী আছে। আর কেয়ামতের ছোট ছোট আলামতের সংখ্যা অনেক। এ বিষয়ে অনেক সহিহ হাদিস উদ্ধৃত হয়েছে। এখানে আমরা সম্পূর্ণ হাদিস উল্লেখ না করে হাদিসগুলোর শুধু প্রাসঙ্গিক অংশটুকু উল্লেখ করব। কারণ হাদিসগুলো উল্লেখ করতে গেলে লিখাটির কলেবর অনেক বড় হয়ে যাবে। যিনি আরো বেশি জানতে চান তিনি এ বিষয়ে রচিত গ্রন্থাবলী পড়তে পারেন। যেমন- শাইখ উমর সুলাইমান আল-আশকারের “আলকিয়ামতুস সুগরা”, শাইখ ইউসুফ আলওয়াবেল এর “আশরাতুস সাআ” ইত্যাদি। কেয়ামতের ছোট ছোট আলামতের মধ্যে রয়েছেঃ- ১। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নবুয়ত লাভ এবং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মৃত্যু। ২। বায়তুল মোকাদ্দাস বিজয়। ৩। ফিলিস্তিনের “আমওয়াস” নামক স্থানে প্লেগ রোগ দেখা দেয়া। ৪। প্রচুর ধন-সম্পদ হওয়া এবং যাকাত খাওয়ার লোক না-থাকা। এমনকি বকরির রাখালেরা পর্যন্ত সুউচ্চ অট্টালিকা নির্মাণ করবে। ৫। নানারকম গোলযোগ (ফিতনা) সৃষ্টি হওয়া। যেমন ইসলামের শুরুর দিকে উসমান (রাঃ) এর হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হওয়া, জঙ্গে জামাল ও সিফফিন এর যুদ্ধ, খারেজিদের আবির্ভাব, হাররার যুদ্ধ, কুরআন আল্লাহর একটি সৃষ্টি এই মতবাদের বহিঃপ্রকাশ ইত্যাদি। ৬। নবুয়তের মিথ্যা দাবিদারদের আত্মপ্রকাশ। যেমন- মুসাইলামাতুল কাযযাব ও আসওয়াদ আনসি। ৭। হেজাযে আগুন বের হওয়া। সপ্তম শতাব্দীর মাঝামাঝি ৬৫৪হিঃ তে এই আগুন প্রকাশিত হয়েছে। এটা ছিল মহাঅগ্নি। ৮। আমানতদারিতা না-থাকা। আমানতদারিতা ক্ষুণ্ণহওয়ার একটা উদাহরণ হচ্ছে- যে ব্যক্তি যে দায়িত্ব পালনের যোগ্য নয় তাকে সে দায়িত্ব প্রদান করা। নীচু শ্রেণীর ফালতু টাইপের লোকেরা মুসলমানদের নের্তৃত্ব দেবে। মুসলমানদের উপর নির্মম অত্যাচারী, শয়তানের মতো নিকৃষ্ট শাসকেরা ক্ষমতায় চেপে বসবে। ৯। ইলম উঠিয়ে নেয়া ও অজ্ঞতা বিস্তার লাভ করা। ইলম উঠিয়ে নেয়া হবে আলেমদের মৃত্যু হওয়ার মাধ্যমে। মানুষের মাঝে দ্বীনি জ্ঞান উঠে যাবে, অজ্ঞতা-মূর্খতা বেড়ে যাবে। জাহিল, পথভ্রষ্ট আলেমরা লোকদেরকে গোমরাহ বানাবে। এমনকি মানুষ অল্প বয়ষ্ক (শিশু বক্তা), অযোগ্য লোকদের কাছ থেকে দ্বীন শিখবে। ১০। ব্যভিচার বেড়ে যাওয়া। মানুষ প্রকাশ্যে জিনা করবে। এমনকি অবৈধ সন্তান উতপাদন বৃদ্ধি পাবে। ১১। সুদ ছড়িয়ে পড়া। ১২। বাদ্য যন্ত্র ব্যাপকতা পাওয়া এবং গায়িকাদের সংখ্যা বেড়ে যাওয়া। ১৩। মদ্যপান বেড়ে যাওয়া। ১৪। সন্তানদের মাঝে পিতামাতার অবাধ্যতা ব্যাপকভাবে দেখা দেয়া। সন্তান তার মায়ের সাথে এমন অবমাননাকর ও অসম্মানজনক আচরণ করা যা একজন মনিব তার দাসীর সাথে করে থাকে। ১৫। অন্যায়ভাবে রক্তপাত ও মানুষ হত্যা বেড়ে যাওয়া। ১৬। অধিকহারে ভূমিকম্প হওয়া। ১৭। মানুষের আকৃতি রূপান্তর, ভূমি ধ্বস ও আকাশ থেকে পাথর পড়া। ১৮। কাপড় পরিহিতা সত্ত্বেও উলঙ্গ এমন নারীদের বহিঃপ্রকাশ ঘটা। মুসলমান নামধারী কিছু নারী বের হবে যারা এমন কাপড় পরিধান করবে যে, তার যেনো কাপড় পড়েও উলংগ। ১৯। ঘোড়ার লেজের মতো হাতে চাবুক নিয়ে একদল লোক ঘোরাফেরা করবে আর তারা মানুষকে অন্যায়ভাবে মারধর করবে। ২০। মসজিদ ডিজাইন করা নিয়ে মানুষ প্রতিযোগিতা করবে। ২১। মানুষ মসজিদে গিয়ে তাহিয়াতুল মসজিদের সালাত আদায় না করেই বসে পড়বে। ২২। মসজিদে ক্বুরআনের তালীম না করে মানুষের লিখা কিতাবের তালীম করবে। ২৩। মুমিনের স্বপ্ন সত্য হওয়া। ২৪। মিথ্যা সাক্ষ্য দেয়া বেড়ে যাওয়া; সত্য সাক্ষ্য লোপ পাওয়া। ২৫। নারীদের সংখ্যা বেড়ে যাওয়া। পুরুষের তুলনায় নারীদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে। এমনকি একজন পুরুষের অধীনে ৫০ জন নারী থাকবে। ২৬। পুরুষের পাশাপাশি নারীদের ব্যবসা বাণিজ্যে অংশগ্রহণ করা। ২৭। আরব ভূখণ্ড আগের মত তৃণভূমি ও নদনদীতে ভরে যাওয়া। ২৮। একটি স্বর্ণের পাহাড় থেকে ফোরাত (ইউফ্রেটিস) নদীর উৎস আবিষ্কৃত হওয়া। ২৯। হিংস্র জীবজন্তু ও জড় পদার্থ মানুষের সাথে কথা বলা। ৩০। রোমানদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়া এবং মুসলমানদের সাথে তাদের যুদ্ধ হওয়া। ৩১। কনস্টান্টিনোপল বিজয় হওয়া। ৩২। মুসলমানদের মাঝে কিছু লোক মূর্তিপূজা করা। ৩৩। কাফের জাতি একত্রিত হয়ে মুসলমানদের উপর আক্রমন করবে। ৩৪। সময় সংকুচিত হয়ে যাবে, অর্থাৎ মনে হবে যেনো সময় খুব দ্রুত চলে যাচ্ছে। ৩৫। মুসলমানেরা জিহাদ পরিত্যাগ করবে, দুনিয়া অর্জনের জন্য একজন আরেকজনের সাথে প্রতিযোগিতা করবে। উপরের সবগুলো বিষয় বিভিন্ন সহীহ হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, আর বর্তমানে এই সবগুলো লক্ষণ-ই কম বেশি দেখা যাচ্ছে। আল্লাহ আমাদেরকে ফিতনা-ফাসাদ থেকে বাচান, আমিন। পক্ষান্তরে কেয়ামতের বড় বড় আলামত হচ্ছে সেগুলো যা নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হুযাইফা বিন আসিদ (রাঃ) এর হাদিসে উল্লেখ করেছেন। সে হাদিসে সব মিলিয়ে ১০টি আলামত উল্লেখ করা হয়েছে। ইমাম মুসলিম হুযাইফা বিন আসিদ (রাঃ) হতে বর্ণনা করেন যে, একবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদেরকে কথাবার্তা বলতে দেখে বললেন: তোমরা কি নিয়ে আলাপ-আলোচনা করছ? সাহাবীগণ বলল: আমরা কেয়ামত নিয়ে আলোচনা করছি। তখন তিনি বললেন: নিশ্চয় দশটি আলামত সংঘটিত হওয়ার আগে কেয়ামত হবে না। তখন তিনি ধোঁয়া, দাজ্জাল, বিশেষ জন্তু, সূর্যাস্তের স্থান হতে সূর্যোদয়, ঈসা বিন মরিয়মের অবতরণ, ইয়াজুজ-মাজুজ, পূর্ব-পশ্চিম ও আরব উপদ্বীপে তিনটি ভূমি ধ্বস এবং সর্বশেষ ইয়েমেনে আগুন যা মানুষকে হাশরের দিকে তাড়িয়ে নিয়ে যাবে উল্লেখ করেন। এই আলামতগুলোর ধারাবাহিকতা কী হবে সে ব্যাপারে সুস্পষ্ট সহিহ কোন দলীল পাওয়া যায় না। তবে বিভিন্ন দলিলকে একত্রে মিলিয়ে এগুলোর ধারাবাহিকতা নির্ধারণ করা হয়ে থাকে। শাইখ উছাইমীনকে প্রশ্ন করা হয়েছিল কেয়ামতের বড় বড় আলামতগুলো কি ধারাবাহিকভাবে আসবে? জবাব দিতে গিয়ে তিনি বলেন: কেয়ামতের আলামতগুলোর মধ্যে কোন কোনটির ধারাবাহিকতা জানা গেছে; আর কোন কোনটির ধারাবাহিকতা জানা যায়নি। ধারাবাহিক আলামতগুলো হচ্ছে- প্রথমে দাজ্জালকে পাঠানো হবে। তারপর ঈসা বিন মরিয়ম এসে দাজ্জালকে হত্যা করবেন। তারপর ইয়াজুজ-মাজুজ বের হবে। সাফফারিনী (রহঃ) তাঁর রচিত আকিদার গ্রন্থে এই আলামতগুলোর ধারাবাহিকতা নির্ধারণ করেছেন। কিন্তু তাঁর নির্ণয়কৃত এ ধারাবাহিকতার কোন কোন অংশের প্রতি মন সায় দিলেও সবটুকু অংশের প্রতি মন সায় দেয় না। তাই এই আলামতগুলোর ধারাবাহিকতা আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয়। আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে- কেয়ামতের বড় বড় কিছু আলামত আছে। এগুলোর কোন একটি প্রকাশ পেলে জানা যাবে, কেয়ামত অতি সন্নিকটে। কেয়ামত হচ্ছে- অনেক বড় একটা ঘটনা। এই মহা ঘটনার নিকটবর্তিতা সম্পর্কে মানুষকে আগেভাগে সতর্ক করা প্রয়োজন বিধায় আল্লাহ তাআলা কেয়ামতের জন্য বেশ কিছু আলামত সৃষ্টি করেছেন। [মাজমুউ ফাতাওয়া, খণ্ড-২, ফতোয়া নং- ১৩৭]। আল্লাহই ভাল জানেন

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন