যে সব কারণে মানুষ ধর্ম থেকে বিচ্যুত হয়ে যায়
আগের পর্বে আমরা জেনেছিলাম, মক্কা-মদীনায় এক সময় মূর্তিপূজা ছিল না। আমর ইবনে লুহাই সিরিয়ায় বেড়াতে যেয়ে আমালিক জাতির মানুষের মূর্তিপূজার উৎসব দেখে মুগ্ধ হন, আর সাথে করে মক্কায় নিয়ে এসে কা’বা ঘরের ঠিক সামনে স্থাপন করেন। মূর্তির সৌন্দর্যে বিমুগ্ধ হয়ে যায় আরববাসী, আর ধীরে ধীরে মূর্তিপূজাকে ধর্মের অংশ হিসাবে মেনে নেয়।
কিন্তু প্রশ্ন দাঁড়ায়, কি কারনে আরবের লোকজন ইব্রাহিম(আ) এর প্রচারিত ধর্ম ছেড়ে আমর ইবনে লুহাই এর কথায় প্রলুব্ধ হয়ে মূর্তিপূজা শুরু করেছিল? এর কারণ খুঁজতে গেলে, মূলত: চারটি কারণ পাওয়া যায়।
১) উন্নত জাতির অন্ধ-অনুকরণ: পার্থিব উন্নয়নের কথা চিন্তা করলে, আমালিকরা আরবদের চেয়ে উন্নত ও শক্তিশালী জাতি ছিল। তারা জ্ঞান-বিজ্ঞানে উন্নত ছিল, আর্কিটেকচার, বড় বড় বিল্ডিং, যুদ্ধাস্ত্র – সব কিছুতেই তারা আরবদের চেয়ে এগিয়ে ছিল। কাজেই, আমর ইবনে লুহাই মক্কাবাসীকে খুব সহজেই এটা বুঝাতে সক্ষম হয়েছিল যে – দেখ, ঐ আমালিকরা সবকিছুতেই আমাদের চেয়ে উন্নত। কাজেই, তাদের ধর্মীয় বিশ্বাসও নিশ্চয়ই উন্নত কিছু হবে। কাজেই তাদের দেশ থেকে যেটাই ইম্পোর্ট করি না কেন, সেটা ভাল কিছুই হবে।
এই একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি কি আজও হচ্ছে না? ইউরোপ-আমেরিকানরা বর্তমান সময়ে জ্ঞান-বিজ্ঞানে সবচেয়ে উন্নত। এই কারণে জীবনযাপনের সকল ক্ষেত্রে কি আমরা মুসলিমরা আজ তাদের অনুসরণের চেষ্টা করছি না? তারা বলছে ধর্ম হলো ব্যাকওয়ার্ডদের জন্য, বিজ্ঞানমনষ্কদের জন্য নয়; আমাদের তরুণ প্রজন্মের অনেকেই এখন এরকমভাবেই ভাবছে। তারা বলছে পরকাল আর স্রষ্টা নিয়ে ভেবে কি হবে, কঠিন পরিশ্রম করো, টাকা রোজগার কর, ভালো থাক, তাহলেই তো চলে, গড আবার কি জিনিস? গড কে কেউ চোখে দেখেছে? সেই অনুসারে আমাদের অনেকেই আজকে ওদের মতই শুধু দুনিয়ার চিন্তায় বুঁদ হয়ে পড়েছে, আল্লাহকে ভুলে মোরালিটি হারিয়ে ফেলেছে। তারা বলছে বিয়ে ছাড়া সেক্স করলে কোন সমস্যা নেই – এটা ব্যক্তিস্বাধীনতা, আমরাও এখন ওদিকেই যাচ্ছি। আমাদের মনে রাখতে হবে – জ্ঞান-বিজ্ঞান, গবেষণায় ও প্রযুক্তিতে আমরা ইউরোপ-আমেরিকানদের অনুসরণ করব, তাদের ছাড়িয়ে যেতে চেষ্টা করব, এতে কোন সমস্যা নেই। কিন্তু, আমাদের ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষা আমরা যখন ইসলামকে ভুলে তাদের থেকে নেয়া শুরু করব, তখন কিন্তু আমরা কুরাইশদের পথেই হাঁটা শুরু করব।
২) দুনিয়ার লোভে পড়ে ধর্মীয় বিধি-নিষেধ ভুলে যাওয়া: ইব্রাহিম(আ) স্পষ্ট করে মূর্তিপূজা নিষেধ করে দিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু, আমালিকদের সাফল্য দেখে ইব্রাহিম(আ) এর ধর্মের বিধি-নিষেধ ভুলে গিয়ে মূর্তিপূজা শুরু করেছিল আরবরা। একইভাবে, আমরাও মহান আল্লাহর স্পষ্ট নিষেধ সত্ত্বেও মিথ্যা কথা বলা, সুদ-ঘুষ খাওয়া, অবৈধ মেলামেশা করাকে সমাজে স্বাভাবিক করে ফেলছি – দুনিয়ার সাময়িক আনন্দ বৃদ্ধি করার জন্য। এভাবে করে ধীরে ধীরে আমরাও ধর্ম থেকে আরো দূরে সরে যাচ্ছি।
৩) অধার্মিক বা ভন্ড-ধার্মিক থেকে ধর্মীয় শিক্ষা গ্রহণ করা: মক্কাবাসীর আরেক বড় ভুল ছিল আমর ইবনে লুহাই ইবনে খুজা’আ ধর্ম নিয়ে যা বলেছে, তা যাচাই-বাছাই না করে চোখ বুঁজে বিশ্বাস করে নেয়া। সে মূর্তি নিয়ে আসলো, আমালিকরা মূর্তিপূজার কারণে উন্নত হয়েছে – সবাইকে এটা বুঝাল, আর সেটাই সবাই বুঝে নিল!
আমর ইবনে লুহাই ইবনে খুজা’আকে কেন মক্কাবাসীরা এত সম্মান করত এটা জানতে হলে আমাদের একটু পেছনে তাকাতে হবে। ইসমাইল(আ) ও তার বংশধরেরা মক্কায় বসতী স্থাপনের কয়েকশত পর, ঘটনাক্রমে তাদেরকে একবার মক্কা থেকে বের করে দেয়া হয়েছিল (পরে তারা কুসাই এর নেতৃত্বে আবার ফিরে আসে)। সেই সময় খুজা’আ গোত্র মক্কার কন্ট্রোলে ছিল। আর আমর ইবনে লুহাই ছিল এই খুজা’আ গোত্রের প্রধান। আমর ইবনে লুহাই তার জনগণের কাছে খুবই জনপ্রিয় ছিল – কারণ সে ছিল ক্ষমতাশীল, দানশীল, সাহসী সেনাপ্রধান যে একাধিকবার বড় বড় যুদ্ধের নেতৃত্ব দিয়ে তার গোত্রের জয় এনে দিয়েছিল। তাই, খুজা’আ গোত্রের কাছে সে ছিল এক অবিসংবাদিত নেতা। অনেকের মতে সে একজন ধর্মীয় নেতাও ছিল। কাজেই, আমর ইবনে লুহাই যখন ইব্রাহিম(আ) এর ধর্মে কোন পরিবর্তন এনেছিল, মক্কাবাসী তা খুব সহজেই মেনে নিয়েছিল।
এই একই কাজ কি আমরা এখনো করছি না? আজকাল ইউটিউব-ফেইসবুকে ভন্ড হুজুরের ছড়াছড়ি। সুর করে উচ্চ স্বরে রসালো গল্প করতে পারলেই এখন যে-কেউ আলেম হয়ে যেতে পারে। এই ভন্ড হুজুরের দল থেকে আমাদের ঈমানকে রক্ষা করতে হবে। নিজে কুরআন খুলে অর্থ বুঝে পড়তে হবে, হাদিসের বই খুঁজে মিলিয়ে দেখতে হবে হুজুরের কথা সত্য কিনা। যে হুজুর নিজের খানা-দানা বাদ দিয়ে অন্য হুজুরের দোষ ধরে বেড়ায়, সেই হুজুরকে আগে ত্যাগ করতে হবে। যে হুজুর গাল-গল্প বাদ দিয়ে কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে কথা বলেন শুধু তার থেকেই ইসলাম নিতে হবে।
এত গেল ভন্ড-হুজুরের কথা। অন্যদিকে, আমাদের ইন্টেলেকচুয়াল শ্রেনীর অনেকেই ধর্মীয় জ্ঞান গ্রহণ করে গদ্য লেখক, ব্লগার, বিজ্ঞানী, আর বিলিয়নিয়ারদের থেকে! আহা অমুকে কত বড় বিজ্ঞানী, উনি কি আল্লাহ নিয়ে ভুল বলবেন? আলবৎ বলবেন! উনি তো আর ইসলাম নিয়ে পড়েননি! বা পড়লেও হয়ত খোলা মনে বুঝার চেষ্টা করেননি!
আমরা যারা পড়াশুনা করতে পারি, আমাদের দায়িত্ব হলো কেউ কিছু বললেই তা চোখ বন্ধ করে বিশ্বাস না করা, উচিত নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী বিষয়টা নিয়ে গবেষনা করা ও জানার চেষ্টা করা। আমাদের আশে পাশে বহু ছোট-খাট আমর ইবনে লুহাই ঘুরে বেড়াচ্ছে, আমরা একটু বেখায়েল হলেই তারা আমাদের ধর্ম পরিবর্তন করে ফেলতে চাইবে।
৪) সাধারণ জনগণের মধ্যে ইসলামিক জ্ঞানের অভাব: ইব্রাহিম(আ) এর চলে যাওয়ার প্রায় ২০০০ বছর পরে আমর ইবনে লুহাই এসেছিল। এই দীর্ঘ সময়ে আরবের মানুষ ধীরে ধীরে ধর্মীয় জ্ঞান থেকে অনেক দূরে সরে এসেছিল। ধর্ম সম্পর্কে সাধারণ মানুষের এই অজ্ঞতার কারণেই অধার্মিক আমর ইবনে লুহাই নিজের যা ইচ্ছা তা-ই ধর্মের মধ্যে ঢুকাতে সক্ষম হয়েছিল।
বর্তমান সময়ে কি এই একই বিষয় হচ্ছে না? সাধারণ জনগনের ইসলামি জ্ঞানের সংকীর্ণতার সুযোগ নিয়ে ইসলামিক ওয়াজের নামে এখন চলছে গান-গাওয়া, গীবত করা, গাজা-খুরি গল্প বলা, মুসলিমদের মধ্যে ঐক্যের পরিবর্তে বিভাজন সৃষ্টি করা আর একে-ওকে কাফির বলে গালি দেয়া। আমাদের সাধারণ জনগণের যদি আজ ইসলামি জ্ঞান থাকত, তাহলে মাহফিলের গাজা-খুরি গল্প গলা হুজুর গুলো পাত্তা পেত না। প্রকৃত আলেমের বক্তৃতা শুনতেই শুধু মানুষের আগ্রহ থাকত।
আল্লাহ আমাদের ইসলাম বুঝার তৌফিক দিন এবং উপরের চার ভ্রান্ত পথ থেকে দূরে থাকা সহজ করে দিন।
[শেইখ ইয়াসির কাযির সীরাহ লেকচার পর্ব-৪ অনুসারে- ড. আদনান ফায়সাল]

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন