নায়িলা ও আসসাফ এর জঘন্য কাহিনী

নায়িলা ও আসসাফ এর জঘন্য কাহিনী

 ড. আদনান ফায়সাল


মূর্তিপূজা করা খারাপ – এটা আমরা সবাই বুঝি। কিন্তু, সেই মূর্তি যদি ব্যভিচারীর মূর্তি হয় তাহলে তো আরো খারাপ, কিন্তু সেই খারাপ কতটা সীমাহীন হতে পারে – যদি সেই ব্যাভিচারী স্বয়ং মহাপবিত্র কা’বা ঘরের ভিতর ব্যভিচার করতে যেয়ে ধরে পড়ে? আপনি কি কল্পনা করতে পারেন – এই রকম চরম পর্যায়ের ব্যভিচারীদেরকে মানুষ ঘৃণা তো দূরে থাক, শ্রদ্ধা করত, ভালবাসত, এমনকি তাদের মূর্তির পূজা পর্যন্ত করত! আপনার কাছে এটা এখন শুনতে অসম্ভব মনে হতে পারে – কিন্তু ইসলাম-পূর্ব আরবে এমনটাই ঘটেছিল। এই ব্যভিচারী যুগলের নাম ছিল নায়িলা ও আসসাফ। আসুন ঘটনাটার বিস্তারিত জানা যাক। 

ইতিহাসের বইগুলো থেকে আমরা জানি, আয়েশা(রা) বলেন – আমরা যখন ছোট ছিলাম তখন থেকেই নায়িলা আর আসসাফ এর গল্প শুনেছি। এরা ছিল এক প্রেমিকযুগল। এই কপোত-কপোতি অন্তরঙ্গ হওয়ার মত কোন জায়গা পাচ্ছিল না। আর কোন খালি জায়গা না পেয়ে এরা অবশেষে কা’বাঘরের ভিতরে যেয়ে এক হয় (আউযুবিল্লাহ)। তাদের এই কুকর্মের শাস্তিস্বরুপ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তাদের দেহকে পাথরে রূপান্তর করে দেন। কুরাইশবাসীরা এদের পাথুরে দেহকে যখন খুঁজে পেল তখন ভাবল এত আল্লাহর বড় এক মিরাকল! চলো এদেরকে সাফা আর মারওয়া পাহাড়ে বসিয়ে দেই, যাতে সাঈ করার সময় মানুষ এদের কথা মনে করে। কিন্তু, কালের পরিক্রমায় মানুষ এদেরকে ঘৃণা করা তো দূরে থাক, বরং এদের উপাসনা করে শুরু করে! কে জানে, এরা হয়ত তাদের কাছে প্রেমের প্রতীক হয়ে দাড়িয়েছিল! কুরাইশরা যখন তাওয়াফ করত, তখন তারা নায়িলা আর আসসাফ এর মূর্তি ছুঁয়ে তাওয়াফ করত।

প্রিয় নবী মুহাম্মাদ(সা) যখন ইসলাম প্রচার করে আরব ভুখন্ডের প্রধান ধর্ম হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছেন –  তখন সাহাবাদের যখন উমরা/হজ করার নির্দেশ দিললেন। সাহাবাদেরকে বলা হল – সাঈ করতে, তথা সাফা আর মারওয়া পাহাড়ের মধ্যে দৌড়াতে। কিন্তু তারা অতীতের কথা ভেবে চিন্তিত হয়ে পড়ল – হায়! আমাদের কি সাফা-মারওয়া পাহাড়ে দৌড়ানো ঠিক হবে? ইসলাম আসার আগে আমরা তো এই দুই পাহাড়ে দৌড়াতাম নায়িলা আর আসসাফ কে সম্মান করার জন্য! ওটা তো নিশ্চিত ভুল ছিল, তাহলে এখন কেন সাফা-মারওয়ায় দৌড়াব?

মহান আল্লাহ সাহাবাদের সংশয় দূর করতে তখন কুরআনের সূরা বাকারার ১৫৮ নং আয়াত নাজিল করলেন। আল্লাহ বললেন – সাফা ও মারওয়া তে তোমরা দৌড়াবে নায়িলা আর আসসাফকে সম্মান করে নয়। এই সাঈর বিধান তো ইব্রাহিম(আ) এর সময় থেকেই ছিল। এ দৌড় ইসমাইল(আ) এর মা হাজেরার স্যাক্রিফাইসকে স্মরণ করার জন্য।

নিশ্চয়ই ‘সাফা’ এবং ‘মারওয়া’ আল্লাহর নিদর্শনগুলোর অন্যতম। কাজেই যে ব্যক্তি কাবাগৃহের হাজ্জ অথবা ‘উমরাহ করবে, এ দু’টোর সাঈ করাতে তাদের কোনই গুনাহ নেই এবং যে ব্যক্তি স্বেচ্ছায় কোন সৎ কাজ করবে তাহলে নিশ্চয় আল্লাহ (তার ব্যাপারে) গুণগ্রাহী এবং সর্বজ্ঞ।  – (সূরা বাকারাহ ২:১৫৮)

যখন রাসূলুল্লাহ(সা) মক্কা বিজয় করেন, তখন কা’বা ঘর ঘিরে ৩৬০টি মূর্তি ছিল। কিছু মূর্তি ছিল মানুষের মত দেখতে, কিছু ছিল পশুর মত, আর বেশীরভাগ ছিল অর্ধ-মানুষ, অর্ধ-পশু।

আরবীয়দের আরেক অদ্ভূত বিশ্বাস ছিল যে তারা মনে করত – ফেরেশতারা আল্লাহর কন্যাসন্তান (আউযুবিল্লাহ)। আর তারা সেই ফেরেশতাদেরও উপাসনা করত।

আরবীয়রা ইব্রাহিম(আ) এর প্রচারিত ধর্ম ছেড়ে হয়ে পড়েছিল পুরোপুরি মূর্তি-পূজারী। বাকী পৌত্তলিক ধর্মের মত তাদেরও কোন নির্দিষ্ট ধর্ম-বিশ্বাস  (আকিদা/creed)ছিল না। যেমন – আপনি ১০ জন হিন্দুর সাথে কথা বললে দেখবেন, তারা হয়ত ১০জন ভিন্ন দেবতার পূজা করে, কারণ তাদের ধর্মবিশ্বাস নির্দিষ্ট নয়। আরবীয়দের ব্যাপারটাও এরকম ছিল, একেক গোত্র একেক মূর্তির পূজা করত। তাদের কেউ পরকালে বিশ্বাস করত, কেউ করত না। শুধু ধর্মীয় একটা বিষয়ে সব গোত্রের মিল ছিল – তা হলো, তারা এক আল্লাহয় ঠিকই বিশ্বাস করত, কিন্তু ইবাদত করার ক্ষেত্রে তারা মনে করত যে – তারা এত বেশী পাপ করেছে যে সরাসরি আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়ার মতো যোগ্যতা তাদের নেই। তাদের মাধ্যম লাগবে, এই মূর্তিগুলো ছিল সেই মাধ্যম। তারা তাদের কল্পিত মূর্তিগুলোর কাছে দু’আ করার মাধ্যমে, তাদের ইবাদত করার মাধ্যমে এক আল্লাহর প্রিয় হতে চেষ্টা করত।

ভেবে দেখুন – কুরাইশদের ধর্মবিশ্বাসের বিষয়গুলো কি আজকের জামানাতেও দেখা যায় না? আজকাল তো আর ব্যভিচারীরদের কেউ মূর্তি বানিয়ে পূজা করে না, কিন্তু আজকের দিনের বড় বড় সেলিব্রেটি কারা? যারা ব্যভিচার করে, ব্যভিচার করতে উৎসাহ, তারাই আজকে রোল মডেল, তারাই হয় সেলিব্রেটি। অন্যদিকে, আল্লাহর কাছে দু’আ করতে আমরা মূর্তিকে মাধ্যম ধরি না সত্য, কিন্তু ঠিকই ধরা দেই, পীর-বাবা, মাজার আর কবরের কাছে।

মানুষকে বিভ্রান্ত করার মূলনীতিগুলো শয়তান আজও বদলায়নি, বদলেছে শুধু কৌশল।   

[শেইখ ইয়াসির কাযির সীরাহ লেকচার পর্ব-৪ অনুসারে]

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

ড. খন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর বই Pdf Download

নেক আমলে অবিচল রাখবে যে ১০ আয়াত

কে ছিলেন ইমাম আল-মাওয়ার্দি