ইসলাম-পূর্ব রোমান ও পারস্য সাম্রাজ্যের ধর্মীয় অবস্থা

 


ইসলাম আসার আগের আরবের আশে পাশে মূলত দুইটি সাম্রাজ্য ছিল। রোমান সাম্রাজ্য (বা বাইজেনটিন সাম্রাজ্য)  পারস্য সাম্রাজ্য (বা সাসানিদ সাম্রাজ্য)। রোমান সাম্রাজ্য ছিল খ্রিষ্টান ধর্মের অনুসারী আর পারস্য সাম্রাজ্য  ছিল জোরাস্ট্রিয়ান (আরবী: মাজুস) ধর্মের অনুসারী যারা আগুনের উপাসনা করত।

প্রশ্ন দাঁড়ায় রোমান সাম্রাজ্য কোন ধরনের খ্রিষ্টান ধর্মের অনুসারী ছিল? আজকে আমরা যে খ্রিষ্টান দেখতে পাই – তাদের মতই কি ওদের ধর্মবিশ্বাস ছিল? এ বিষয়টা বুঝতে হলে আমাদের খ্রিষ্টান ধর্মের ইতিহাস সম্পর্কে একটু জানতে হবে।

মহান আল্লাহ নবী ঈসা(আ) কে আসমানে তুলে নেয়ার ৩০-৪০ বছরের মধ্যে খ্রিষ্টান ধর্ম মূলত তিন দলে বিভক্ত হয়ে পড়ে। এর প্রথম দল হলো – নস্টীসিজম (Gnosticism)।  এদের ধর্মবিশ্বাস খুবই জটিল প্রকৃতির ছিল। এরা বিশ্বাস করত – মহাজাগতিক দ্বৈতবাদে (cosmological dualism – সৃষ্টা ও সৃষ্টি একই অস্ত্বিত্তের দ্বৈত অবস্থান), সন্ন্যাসজীবনে, ডসেটিসমে (পৃথিবীতে ঈসা(আ) এর কোন শরীর ছিল না, ছিল শুধু অবমূর্তি, তাই তাকে অত্যাচার করা হলেও তিনি ব্যাথা পাননি)।  এই বিশ্বাসের খ্রিষ্টানরা খুব বেশিদিন টেকেনি – এরা বিলিন হয়ে গেছে।

খ্রিষ্টানদের মূল যে দুইটি দল টিকে ছিল – তার প্রথমটির নাম ছিল ইহুদীয় খ্রিষ্টান (Jewish Christian) আর দ্বিতীয়টীকে বলা হত পল-এর খ্রিষ্টান (Pauline Christian or Saint Paul’s Christian)

 ইহুদীয় খ্রিষ্টানরা মনে করত তাদেরকে মুসা(আ) এর দেয়া হালাল-হারামের বিধি-বিধানগুলোই পালন করতে হবে। ঈসা(আ) হলেন প্রতিশ্রুত মাসিহ (অভিষিক্ত নবী)। অর্থাৎ, এই দল মুসা(আ) ও ঈসা(আ) সম্পর্কে তা-ই বিশ্বাস করত যা মুসলিমরা বিশ্বাস করে।

অন্যদিকে পল, যে নিজেকে ঈসা(আ) এর শিষ্য (Disciple) বলে দাবী করে, কিন্তু যে কোনদিন ঈসা(আ) এর সাক্ষাৎ পর্যন্ত পায়নি, সে খ্রিষ্টান ধর্মের সম্পূর্ণ নতুন তত্ত্ব (theology) প্রচার করা শুরু করে। কি সেই ধর্ম তত্ত্ব? ঈসা(আ) এর মধ্যে দেবত্ব (divinity) বা স্রষ্টার অংশ ছিল, তিনি এসেছিলেন মুসা(আ) এর দেয়া বিধানগুলোকে বাতিল করতে, ঈসা(আ) কে বিশ্বাস করলে আর ধর্মীয় বিধি-বিধান না মানলেও চলবে, সে ট্রিনিট্রী (একের ভিতর তিন – এক স্রষ্টাতেই আছে পিতা, পুত্র ও পবিত্র আত্মা) এর প্রাথমিক ধারণাও দেয়।  

তিনশ বছর ধরে খ্রিষ্টান পন্ডিতেরা বিতর্ক করেছে খ্রিষ্টান ধর্মের বিশ্বাসগুলো নিয়ে – যীশু খ্রিষ্ট আসলে কে? তিনি কি নবী, নাকি ঈশ্বর নাকি ঈশ্বরের পুত্র (নাউজুবিল্লাহ)। এই তর্ক-বিতর্ক চলতে থাকে যতদিন না রোমানরা এর মধ্যে প্রবেশ করে (উল্লেখ্য, রোমানরা তখনো খ্রিষ্টান  ছিল না, তার পৌত্তলিক (pagan) ছিল)। রোমান শাসকরা তখন প্রচন্ড রকম খ্রিষ্টান বিদ্বেষী  ছিল। বলা হয় – রোমান সম্রাট নিরো (৩৭ – ৬৮ খ্রিষ্টাব্দ) খ্রিষ্টানদের শরীর কে শহরের বিভিন্ন প্রান্তে ঝুলিয়ে দিয়ে তাতে মশালের মত আগুন জ্বালিয়ে শহর আলোকিত করত।

রোমান সাম্রাজ্যে সংখ্যালঘু (৩%-৪%) খ্রিষ্টানদের উপর এভাবেই প্রায় দুই-তিনশ বছর ধরে অত্যাচার হচ্ছিল, কিন্তু একটা আকস্মিক ঘটনায় পুরো পরিস্থিতিটা হঠাত বদলে যায়। আর তা হলো – হঠাত করে তৎকালীন রোমান সম্রাট কন্সটানটিন (২৭২ – ৩৩৭ খ্রিষ্টাব্দ) খ্রিষ্টান ধর্মে ধর্মান্তরিত হয়ে যায়। সে খ্রিষ্টান ধর্ম গ্রহণ করার পর খ্রিষ্টান ধর্মের সব পন্ডিতদের একত্রিত করল। সে বলল – “এই শোন! তোমরা নিজেদের মধ্যে ঝগড়াঝাঁটি বন্ধ করে সিদ্ধান্তে আস খ্রিষ্টান ধর্মের মূল বিশ্বাসগুলো কি হবে।“ আর  সম্রাট কন্সটানটিন নিজে ও তার জনগণ (রোমান মানুষেরা) যেহেতু পৌত্তলিক ছিল, সে তার পৌত্তলিক যুগের বিভিন্ন উৎসবগুলোকে খ্রিষ্টান ধর্মের মধ্যে ঢুকিয়ে দিল। যেমন – ২৫ ডিসেম্বর তাদের জন্য আগে থেকেই তাদের জন্য উৎসবের দিন ছিল – সে একে ক্রিস্টমাস ডে ঘোষনা করল; পৌত্তলিক ধর্মের সাথে মিলিয়ে বলে দিল ঈশ্বরের পুত্র আছে এবং সেও ঈশ্বরের মত (নাউযুবিল্লাহ), ট্রিনিটিতে বিশ্বাস করতে হবে ইত্যাদি।

সম্রাট কন্সটানটিনের নির্দেশে বাইবেলের যেই কিতাবগুলো (উল্লেখ্য, কুরআন যেমন অনেকগুলো সূরার সমন্বয়, বাইবেল হলো অনেকগুলো কিতাবের সমন্বয়) ট্রিনিট্রির ধারণার সাথে সাংঘর্ষিক, সেই কিতাবগুলোকে পুড়িয়ে ফেলা হল, নিউ টেস্টামেন্টের মাত্র চারটি কিতাবকে বাইবেলে জায়গা দেয়া হল।  

৩২৫ খ্রিষ্টাব্দে নাইসিয়া শহরে (বর্তমান তুরষ্কের একটি জায়গা) নাইসিয়ার সম্মেলন (The Council of Nicaea) অনুষ্ঠিত হয়। এই সম্মেলনে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় – পলের প্রচারিত খ্রিষ্টান ধর্মের বিশ্বাসগুলো, সাথে সম্রাট কন্সটান্টিনের প্রস্তাবিত পরিমার্জন – এটাই এখন থেকে একমাত্র গ্রহণযোগ্য খ্রিষ্টান ধর্ম। এই পলের খ্রিষ্টানই পরবর্তীতে ৩ ভাগ হয়ে হয় – অর্থডক্স, ক্যাথলিক ও প্রোটেস্টান।

নাইসিয়ার সম্মেলনের পর ইহুদীয় খ্রীষ্টানদের (যারা প্রকৃত ঈসা(আ) এর অনুসারী ছিল) উপর অত্যাচার শুরু হয়। গুটিকয় যারা বেঁচে-বর্তে ছিল, তারা আরো অত্যাচারিত হবার ভয়ে রোমান সাম্রাজ্য ছেড়ে এখানে ওখানে পালিয়ে যায়। তাদের কেউ যায় আফ্রিকায়, কেউ ইরানে, কেউ অন্য কোথাও। ইরানে যারা যায় তাদের একজনের উত্তরসূরীর সূত্র ধরে খুবই রোমাঞ্চকর এক ঘটনা ঘটে। আর এই ঘটনার মধ্যমণি আর কেউ নন – বিখ্যাত সাহাবী সালমান আল ফারসি। পরের লেখায় আমরা জানব সালমান আল ফারসির অগ্নিপূজারী থেকে খ্রিষ্টান হওয়া, তারপর খ্রিষ্টান থেকে ইসলামকে খুঁজে পাওয়ার রোমাঞ্চকর কাহিনী।  

[শেইখ ইয়াসির কাযির সীরাহ লেকচার পর্ব-৪ অনুসারে  ড. আদনান ফায়সাল]

স্বত্ব: মহানবীর ﷺ মহাজীবন ফেইসবুক পেইজ ও তার এডমিন

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

ড. খন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর বই Pdf Download

নেক আমলে অবিচল রাখবে যে ১০ আয়াত

কে ছিলেন ইমাম আল-মাওয়ার্দি