আমরা তাঁর দিকে ফিরে আসি


 আল্লাহ আমাদের করুণা করার জন্য সৃষ্টি করেছেন শাস্তি দিতে নয়, যদি শুধু আমরা তাঁর দিকে ফিরে আসি

---------------------------------- --------------- আমরা প্রতিনিয়ত প্রচুর মন্দ কাজ করি। আমরা প্রচুর প্রচুর ত্রুটি করি। আমাদের বামদিকের ফেরেশতা খুবই ব্যস্ত থাকে। তাঁর প্রচুর লেখালেখি করতে হয়। আর কেউ যখন আসলেই এসব নিজের ক্ষেত্রে চিন্তা করে, দুটো জিনিস হয় সঙ্গে সঙ্গেই। দুটো জিনিস সাথে সাথেই হয়ে যায়। সেগুলোর একটি হলো—সে আবেগে আচ্ছাদিত হয়ে যায়। সে মনে করে, "আমি তো ধ্বংস হয়ে গেলাম! আমার তো জান্নাতে ঢুকবার কোন উপায়ই নেই। আমি যা যা করেছি, এর কারণে সেখানে তো আমার কোন স্থানই হবে না।" এটা হলো একটি বিষয়। আর এটা কিন্তু ভালো ব্যাপার নয়। এটা নিয়ে বিস্তারিতভাবে একটু পর বলছি। আরেকটি জিনিস যা হয় সেটা মোটামুটি ভালো। সেটা হলো, আপনি অন্য মানুষ সম্পর্কে অতিরিক্ত চিন্তা করা বন্ধ করে দেন। দেখুন, আপনি যখন অন্য মানুষ কি কি ভুল করছে সেটা নিয়ে ব্যস্ত থাকেন, তাদের ভুল, তাদের পাপঃ সেই ভাই এমন করেছে। ওই বোন এমনটা বলেছে… এগুলো কীসের লক্ষণ জানেন? তা হলো আপনি নিজের সম্পর্কে চিন্তিত নন, আপনি নিজের ব্যাপারে এতোই নিশ্চিন্ত যে অন্যকে নিয়ে ভাববার অনেক সময় আপনার আছে। এর অর্থ হলো এটাই। এর মানে হলো, আমি আপনি, আমরা নিজেদের ভুলত্রুটি, নিজেদের পাপ নিয়ে চিন্তিত নই। বরং অন্যদের ছোটখাটো ভুল নিয়ে চিন্তা করার প্রচুর সময় আমাদের হাতে। সেটাই এর অর্থ। তাই আমরা যদি নিজেদের পাপ নিয়ে চিন্তা করি, তবে অন্যেরা কি কি করছে সেটা নিয়ে এতো না ভেবে নিজেদের অবস্থা সম্পর্কে বেশী দুশ্চিন্তা করতে পারবো। এখন, আপনি যদি সত্যি সত্যিই নিজের অবস্থা নিয়ে চিন্তাবোধ করেন, আর ভয়ে আচ্ছন্ন হয়ে পড়েন যে “আমার কোন আশাই নেই, আমার জন্যে কোন ক্ষমাই নেই”, তবে এই সময়েই আমাদের আল্লাহ আযযা ওয়া জাল্লার হেদায়েত প্রয়োজন। কারণ খুবই কষ্টকর আর দুঃখজনক অবস্থা এটি। দেখুন, সবচাইতে কষ্টকর আর সবচাইতে ক্ষতিকর মানসিক অবস্থা হলো একদম নিরাশ হয়ে যাওয়া। সবচাইতে ক্ষতিকর মানসিক অবস্থা এটি। এমনকি অমুসলিমরাও, তারা যখন একেবারেই আশাহীন হয়ে যায় তখন ড্রাগ ওভারডোজ করে, কেউ কেউ আত্মহত্যা করে, সব ধরণের অপরাধ করতে থাকে। যখন তারা নিরাশ থাকে, নিজেদের নিয়ে আর কোন আশাই বাকি থাকে না, তখন যা ইচ্ছে তাই করতে থাকে। যখন কেউ নিজের আত্মার একেবারে নিম্নতর অবস্থায় চলে যায় তখন সে মানুষের মনে আর কোন প্রকার আশারই অস্তিত্ব থাকে না। কিন্তু আল্লাহ আযযা ওয়া জাল্লা আমাদের আশাহীন করে রাখেননি। আল্লাহ্‌র রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের অনেক আগেই বলে গিয়েছেন, “কুল্লু বনি আদম খাত্তাউন!” প্রত্যেক আদম সন্তান ভুল করে। অন্তত এখন তো আমরা জানি এই কথাটি আল্লাহ রাসুল নিজেও স্বীকার করেছেন। সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। কিন্তু এরপর তিনি বলেন, “ওয়া খাইরুল খাত্তাইন আত তাওয়াবুন।” ভুলকারী মানুষদের মধ্যে সর্বোত্তম হলো যারা আল্লাহ্‌র কাছে ফিরে আসে। তারা ফিরে এসে আল্লাহ্‌র কাছে ক্ষমা চায়। অন্যভাবে বললে, আল্লাহ এই দরজা আমাদের জন্য খুলে রেখেছেন। যতো পাপই আমরা করি না কেন, আল্লাহ আমাদের বাম পাশের পুরো আমলনামা মুছে পরিষ্কার করে দিতে রাজি আছেন। কিছু থাকবে না। যেকোনো সমাজে যদি কোন অপরাধ করেন সেটা আপনার পার্মানেন্ট রেকর্ডে চলে যাবে। সেটা মোছা যাবে না আর। সেটা আর সরানো যাবে না। ওটা সেখানেই থাকবে, আজীবন থাকবে। যেন কালো এক মেঘ আপনার উপর। যেসব মানুষ যে কারণেই হোক এসবের মধ্যে দিয়ে গিয়েছেন, বের হবার পর তাদের চাকরি খুঁজতে খুব কষ্ট হয়েছে। কেউ তাদের ব্যাকগ্রাউন্ড চেক করলে আর চাকরি দেয় না। কারণ তাদের রেকর্ডে কিছু একটা আছে। আল্লাহ আযযা ওয়া জাল্লা আপনার আমলনামা একেবারেই মুছে দেবেন, যদি আপনি আমি আন্তরিকভাবেই আল্লাহ্‌র দিকে ফিরে যেতে প্রস্তুত থাকি। যদি আসলেই আমরা চাই এমনটা। আমরা যদি সত্যিই আন্তরিক হই তবে। আল্লাহ সুবহানা ওয়া তা’আলা শুধু কথার কথা বলছেন না। তিনি আসলেই আন্তরিক এক অন্তর চান যে তাঁর দিকে ফিরে আসবে। এমন অন্তর যা নিজ কর্মের ব্যাপারে সত্যিকার অর্থেই লজ্জিত থাকবে। যদি আমরা এমন করতে পারি তবে আল্লাহ একেবারে শুরু থেকে শুরু করবেন আমাদের জন্য। একেবারেই ফ্রেশ স্টার্ট দেবেন। এই আশার আলোই আল্লাহ আযযা ওয়া জাল্লা আমাদের সুরাতুল ফুরকানে দিচ্ছেন। তিনি আসলেই চরম পদক্ষেপ নিয়েছেন এখানে। তিনি শুধু বলছেন না যে আমাদের পাপ ক্ষমা করে দেবেন। তিনি বলছেন, فَأُولٰٓئِكَ يُبَدِّلُ اللَّهُ سَيِّـَٔاتِهِمْ حَسَنٰتٍ - সেসব মানুষ যারা আসলেই আল্লাহ্‌র কাছে ফিরে তাওবা করে, আমি তাদের সকল পাহাড় পরিমাণ পাপ কর্ম নিয়ে ভালো কাজে পরিবর্তন করে দেব। অন্যভাবে বললে, শুধুমাত্র আন্তরিকভাবে যদি আপনি আল্লাহ্‌র কাছে ফিরে আসেন তবে আপনাকে যে শুধু লাখো পাপ কর্মের জন্যে উত্তর দিতে হবে না, বরং তিনি আপনার লাখো পাপকাজকে লাখো পুন্যে রুপান্তর করে দেবেন যে পুণ্য আপনি এখনো করননি। শুধুমাত্র আপনি তাওবা করেছেন এজন্য। শুধুমাত্র এটার জন্যেই। শুধুমাত্র এই একটি জিনিস তিনি আমাদের থেকে চাচ্ছেন। আল্লাহ আযযা ওয়া জাল্লা আমাদের জীবন আর কতোই বা সহজ করবেন?! দেখুন যেসব মানুষ সারাক্ষণ গুনাহ করতেই থাকে, শয়তান তাদের কাছে এসে বলে, তুমি তো এমনিতেও জাহান্নামে যাবে। তার চেয়ে বরং আনন্দ করেই নাও। শয়তান আসলেই এমন বলে। আর তারাও এভাবেই চলতে থাকে। “আরে ধুর! আমি আর কিই বা করবো। তুমি জানোনা ভাই আমি একেবারেই ব্যর্থ আশাহীন। তার চেয়ে বরং পুরোটাই এঞ্জয় করে নেই! শয়তানের প্রত্যেকটি ওয়াসওয়াসা শুনি। ফাটাফাটি করেই যাই দুনিয়া থেকে! জীবন তো একটাই। এরপর মরে যাবো।” এটাই হলো তাদের চিন্তা। (ব্যঙ্গ করে) এমন মানসিকতার কারণে অভিনন্দন। আল্লাহ আযযা ওয়া জাল্লা আমাদের কী বলছেন? مَا یَفۡعَلُ اللّٰهُ بِعَذَابِکُمۡ আল্লাহ বলছেন, তোমাদেরকে শাস্তি দিয়ে আল্লাহ কী করবেন? মনে করো আল্লাহ চান তোমাদের শাস্তি দিতে? আল্লাহ আমাদের কুরআনে এই প্রশ্ন করছেন যে আমাদের শাস্তি দিয়ে তাঁর কি লাভটা হবে? এজন্য তো তিনি তোমাদের বানাননি। আরেক স্থানে আল্লাহ বলছেন, শুধুমাত্র তাদের ক্ষমা করে দেবার জন্যেই তিনি তাদের সৃষ্টি করেছেন। অর্থাৎ, তাদের তিনি সৃষ্টি করেছেন তাদের প্রতি করুণা করবার জন্যেই। তিনি আমাদের সৃষ্টি করেছেন যেন আমরা তাঁর করুণা অর্জন করতে পারি। তিনি বলেননি তিনি আমাদের জাহান্নামের জন্য বানিয়েছে! তিনি আমাদেরকে তাঁর করুণা অর্জনের জন্যেই বানিয়েছেন। তিনি আমাদের করুণা করতে চান, এজন্য এই দরজা খুলে রেখেছেন তিনি। তিনি আমাদের এক পা আগাতে বলছেন, বাকিটুকু তিনিই পূরণ করে দেবেন। বেশী কিছু করতে হবে না আপনাকে, শুধু তাঁর দিকে একটুখানি ফিরে আসুন। একটুখানি দিন তাকে। আর তিনি সে দরজাগুলো খুলে দেবেন।

[ তিনিই তোমাদেরকে মাটি থেকে সৃষ্টি করেছেন। তারপর শুক্রবিন্দু থেকে, তারপর ‘আলাকা’* থেকে। অতঃপর তোমাদেরকে বের করেন শিশুরূপে, অতঃপর তোমরা যৌবনে পদর্পণ কর, অতঃপর বার্ধক্যে উপনীত হও। তোমাদের কারও কারও এর পূর্বেই মৃত্যু ঘটে এবং তোমরা নির্ধারিত কালে পৌঁছ এবং তোমরা যাতে অনুধাবন কর। (সূরা গাফির: আয়াত ৬৭) (দুনিয়ার জীবনের) উপমা হল বৃষ্টির মত, যার উৎপন্ন ফসল কৃষকদেরকে আনন্দ দেয়, তারপর তা শুকিয়ে যায়, তখন তুমি তা হলুদ বর্ণের দেখতে পাও, তারপর তা খড়-কুটায় পরিণত হয়। আর আখিরাতে আছে কঠিন আযাব এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে ক্ষমা ও সন্তুষ্টি। আর দুনিয়ার জীবনটা তো ধোকার সামগ্রী ছাড়া আর কিছুই নয়। (৫৭:২০) ] এমন এক জান্নাতের জন্যে কি চেষ্টা করবেন না? যেখানে আপনি কোনোদিন অসুস্থ হবেন না, বৃদ্ধ হবেন না, মারা যাবেন না। যেখানে আপনার বয়স হবে ৩৩। কোনোদিন কোনো উদ্বেগ উৎকণ্ঠা, দুঃখ-বিষাদ আক্রমণ করবে না। সর্বদা আনন্দ ফুর্তিতে মেতে থাকবেন। জান্নাতে এমনকি ঘুমও নেই। কারণ আপনি কখনো ক্লান্ত হবেন না। আর আল্লাহ চান না আপনি এক মুহূর্তের আনন্দও মিস করেন। আরও বড় ব্যাপার হলো যেখানে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা সবসময় আপনার উপর সন্তুষ্ট থাকবেন। আর কখনো অসন্তুষ্ট হবেন না। তাই, পাপ থেকে হিজরত করুন। তাওবা করুন। দৈনিক নামাজগুলো আদায় করুন। সৎ জীবন যাপন করুন। কুরআনে কত সুন্দরভাবেই না আল্লাহ আমাদেরকে তাঁর জান্নাতের দিকে আহ্বান করছেন- وَ اللّٰهُ یَدۡعُوۡۤا اِلٰی دَارِ السَّلٰمِ - আর আল্লাহ তোমাদেরকে শান্তির নিবাসের দিকে আহবান করেন। (১০:২৫) তাই, এ আহ্বানে সাড়া দিয়ে "তোমরা দ্রুত অগ্রসর হও তোমাদের প্রতিপালকের ক্ষমার দিকে ও সেই জান্নাতের দিকে যার বিস্তৃতি হচ্ছে আসমানসমূহ ও যমীনের সমান, যা মুত্তাকীদের জন্য তৈরী করা হয়েছে। (৩:১৩৩)"

- নোমান আলী খান

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

ড. খন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর বই Pdf Download

নেক আমলে অবিচল রাখবে যে ১০ আয়াত

কে ছিলেন ইমাম আল-মাওয়ার্দি