মঙ্গোলীয় ঝঞ্ঝা প্রতিরোধ ও ইসলামের ইতিহাসের বাঁকবদল
৯১ হিজরির পহেলা রমজানে আন্দালুস বিজয়ের যে প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছিল, তার প্রায় ৬০০ বছর পর ৭০২ হিজরির ২ রমজানে সিরিয়ার মাটিতে রচিত হয়েছিল আরেক মহাকাব্য।
সেদিন মঙ্গোলীয় বাহিনী বা তাতারদের সেই প্রলয়ঙ্করী তুফানকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল মুসলিমরা, যারা ইতিপূর্বে অর্ধেক পৃথিবীকে তাদের ঘোড়ার খুরের নিচে পিষ্ট করেছিল।
‘শাকহাবের যুদ্ধ’ (Battle of Shaqhab) কেবল একটি সামরিক বিজয় ছিল না, বরং এটি ছিল মুসলিম সভ্যতার অস্তিত্ব রক্ষার এক চূড়ান্ত লড়াই।
মঙ্গোলীয় আগ্রাসন
সপ্তম হিজরি শতকে মুসলিম বিশ্ব এক ভয়াবহ সংকটের মুখোমুখি হয়। পূর্ব দিক থেকে আসা মঙ্গোলীয় ঝঞ্ঝা তাসের ঘরের মতো গুঁড়িয়ে দিয়েছিল আব্বাসীয় খেলাফত ও আইয়ুবীয় সালতানাতকে।
যদিও ৬৫৮ হিজরির ২৫ রমজানে ঐতিহাসিক ‘আইন জালুত’ যুদ্ধে সুলতান সাইফউদ্দিন কুতুজের নেতৃত্বে মুসলিমরা বড় বিজয় অর্জন করেছিল, তবুও মঙ্গোলদের সিরিয়া ও মিশর দখলের লালসা কমেনি। (ইমাম জাহাবি, সিয়ারু আলামিন নুবালা, ২৩/২০০, মুয়াসসাসাতুর রিসালাহ, বৈরুত, ১৯৮৫)
সুলতান আল-নাসির মুহাম্মদ ইবনে কালাউনের শাসনামলে এই সংকট চূড়ান্ত রূপ নেয়। মঙ্গোল নেতা গাজান খান এক লাখেরও বেশি সেনার এক বিশাল বাহিনী পাঠান সেনাপতি কুতলুশাহর নেতৃত্বে।
তারা দজলা-ফোরাত অতিক্রম করে সিরিয়ার হামা শহর দখল করে দামেস্কের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যায়। পুরো মুসলিম জাহান তখন এক চরম অনিশ্চয়তায় দুলছিল।
রণাঙ্গনে ইবনে তাইমিয়া
শাকহাবের যুদ্ধটি কেবল তরবারির লড়াই ছিল না, এটি ছিল একটি আদর্শিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক যুদ্ধও। এই যুদ্ধে ইতিহাসের অমর ব্যক্তিত্ব আল্লামা তাকিউদ্দিন ইবনে তাইমিয়া (রহ.) এক অনন্য ভূমিকা পালন করেন। তাঁর অবদান ছিল তিনটি প্রধান দিক থেকে:
১. বিভ্রান্তি নিরসন: মঙ্গোলরা নিজেদের মুসলিম বলে দাবি করায় অনেক মুসলিম সৈন্য তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে ইতস্ততবোধ করছিল। ইবনে তাইমিয়া ফতোয়া দিলেন যে, তারা সেই খারেজিদের মতো যারা ইসলামের নাম নিলেও ইসলামের মূল ভিত্তিকে ধ্বংস করছে। ফলে তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করা ওয়াজিব।
২. মানসিক শক্তি সঞ্চার: তিনি সৈন্য ও সেনাপতিদের মাঝে ঘুরে ঘুরে উৎসাহ দিতেন এবং কসম খেয়ে বলতেন, “নিশ্চয়ই তোমরা বিজয়ী হবে!” যখন কেউ বলতেন, ‘ইনশাআল্লাহ বলুন’, তখন তিনি আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলতেন, “ইনশাআল্লাহ—এটি ঘটবেই, কেবল আশা নয়।”
৩. মাঠে সক্রিয় উপস্থিতি: তিনি কেবল তাত্ত্বিক আলোচনা করেননি, বরং রমজানের সেই দিনে সৈন্যদের সামনে নিজে খাবার গ্রহণ করে ফতোয়া দেন যে যুদ্ধের শক্তি সঞ্চয়ের জন্য রোজা ভাঙা জায়েজ। তিনি নিজে দামেস্কের বাহিনীর পতাকাতলে দাঁড়িয়ে যুদ্ধ করেন।
তাঁর সেই বিখ্যাত উক্তি আজও ইতিহাসে অমর, “যদি তোমরা আমাকে শত্রু শিবিরে দেখো আর আমার মাথায় কোরআন রাখা থাকে, তবে আমাকে সেখানেই হত্যা করো।” (ইবনে কাসির, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ১৪/২৩-২৬, দারু ইহয়াইত তুরাসিল আরাবি, বৈরুত, ১৯৮৮)
শাকহাবের যুদ্ধ
৭০২ হিজরির ২ রমজান (১৩০৩ খ্রিষ্টাব্দ) শনিবার দামেস্কের দক্ষিণে শাকহাব প্রান্তরে দুই বাহিনী মুখোমুখি হয়। মুসলিম বাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন সুলতান আল-নাসির মুহাম্মদ এবং সঙ্গে ছিলেন আব্বাসীয় খলিফা আল-মুসতাকফি বিল্লাহ।
যুদ্ধের শুরুতে মঙ্গোলরা প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করে মুসলিম বাহিনীর ডান দিক ভেঙে দেয়। কিন্তু সুলতান আল-নাসির অটল থাকেন।
কথিত আছে, তিনি নিজের ঘোড়ার পা বেঁধে ফেলেছিলেন যাতে পিছু হঠার কোনো সুযোগ না থাকে। এই দৃঢ়তা সৈন্যদের মাঝে নতুন প্রাণ সঞ্চার করে। সূর্যাস্তের সময় পরাজিত মঙ্গোলরা পাহাড়ে আশ্রয় নেয় এবং পরদিন সকালে পলায়নকালে মুসলিমদের হাতে প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়।
এই বিজয়ের মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্য থেকে মঙ্গোল আগ্রাসনের চির অবসান ঘটে।
ইউরোপের সেই দীর্ঘ নীরবতা
২ রমজানের আলোচনায় আন্দালুসের সেই বিয়োগান্তক স্মৃতিও ফিরে আসে। ১১৪ হিজরির এই সময়ে ফ্রান্সের ‘পোয়াতিয়ে’ অঞ্চলে ‘বালাতুশ শোহাদা’ যুদ্ধের পর পশ্চিম ইউরোপে ইসলামের অগ্রযাত্রা থমকে যায়। ঐতিহাসিক ইবনে হাইয়ান আল-কুরতুবি উল্লেখ করেছেন, সেই যুদ্ধের ভয়াবহতার কারণে ওই জনপদে দীর্ঘকাল আজানের ধ্বনি শোনা যায়নি।
ফরাসি দার্শনিক গুস্তাভ লে বন আক্ষেপ করে বলেছিলেন, “যদি আরবরা ফ্রান্স জয় করত, তবে প্যারিস অনেক আগেই সভ্যতা ও বিজ্ঞানের কেন্দ্রে পরিণত হতো। কারণ স্পেনের সাধারণ মানুষ যখন পড়তে ও কবিতা লিখতে জানত, তখন ইউরোপের রাজারা নিজেদের নাম সই করতেও জানতেন না।” (গুস্তাভ লে বন, দ্য সিভিলাইজেশন অব অ্যারাবস, পৃষ্ঠা: ৯৫, তর্জমা: আদেল জুয়াইতার)।
ইতিহাসের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ মোড়
২ রমজানে ইসলামের ইতিহাসে আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটেছে:
উত্তর আফ্রিকা বিজয় (৭৪ হিজরি): বার্বার নেত্রী ‘কাহিনা’র প্রবল প্রতিরোধের পর সেনাপতি হাসান ইবনে নুমান তিউনিসিয়ার কার্থেজ জয় করেন। এর মাধ্যমে তিউনিসিয়ায় বাইজেন্টাইন শাসনের অবসান ঘটে এবং পুরো মাগরেব অঞ্চলে ইসলামের ভিত্তি মজবুত হয়।
আব্দুল মালিক ইবনে মারওয়ানের খেলাফত (৬৫ হিজরি): এই দিনে আব্দুল মালিক ইবনে মারওয়ান খলিফা হিসেবে বায়াত গ্রহণ করেন। তাকে ‘আবুল মুলুক’ বা রাজাদের পিতা বলা হয়। তিনি প্রশাসনিক সংস্কার, আরবি ভাষাকে দাপ্তরিক মর্যাদা দান এবং প্রথম খাটি ইসলামি মুদ্রা প্রবর্তন করেন।
কায়রোয়ান শহর নির্মাণ (৫০ হিজরি): বিখ্যাত সেনাপতি উকবা ইবনে নাফি তিউনিসিয়ায় কায়রোয়ান শহর নির্মাণের কাজ শুরু করেন। এটি ছিল উত্তর আফ্রিকায় ইসলামি সংস্কৃতির প্রধান কেন্দ্র। (জালালুদ্দিন সুয়ুতি, তারিখুল খুলাফা, পৃষ্ঠা: ২০২, মাকতাবাতু নিযার মুস্তফা আল-বায, ২০০৪)
সূত্র: আল–জাজিরা ডটনেট
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন