দুইবার "হে নবী" — মাঝখানে কী লুকিয়ে আছে?

 দুইবার "হে নবী" — মাঝখানে কী লুকিয়ে আছে?

------------------------------------------------------------- কুরআনের অনুচ্ছেদগুলো আয়নার মতো সাজানো থাকে—প্রথম অংশ মিলে যায় শেষ অংশের সাথে, আর কেন্দ্রে লুকিয়ে থাকে মূল বার্তা। আজ দেখবো একটি সম্পূর্ণ সূরা কীভাবে এই নিখুঁত বৃত্তাকার বিন্যাসে গাঁথা—সূরা আত-তাহরীম। খুব বড় সূরা নয়, মাত্র বারোটি আয়াত। কিন্তু অত্যন্ত শক্তিশালী ও তাৎপর্যপূর্ণ। সূরাটি শুরু হয়েছে "ইয়া আইয়্যুহান্নাবী"—হে নবী! সম্বোধন করে। আর জানেন কি, সূরাটির শেষ অনুচ্ছেদও শুরু হয়েছে ঠিক একই সম্বোধনে—"ইয়া আইয়্যুহান্নাবী"! কিন্তু দুই জায়গায় প্রসঙ্গ সম্পূর্ণ ভিন্ন। শুরুতে আলোচনা নবীজী (স)-এর একান্ত ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে: "লিমা তুহাররিমু মা আহাল্লাল্লাহু লাক"—কেন আপনি তা নিজের জন্য নিষিদ্ধ করছেন, যা আল্লাহ আপনার জন্য হালাল করেছেন—আপনার স্ত্রীদের সন্তুষ্টির জন্য? এক স্ত্রী মধুর গন্ধ অপছন্দ করেছিলেন বলে নবীজী (স) বলেছিলেন, আমি আর মধু খাবো না। আল্লাহ বললেন—না, এটা করবেন না। আর সূরার শেষে? "ইয়া আইয়্যুহান্নাবী, জাহিদিল কুফফারা ওয়াল মুনাফিকীন"—হে নবী! কাফের ও মুনাফিকদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করুন, তাদের প্রতি কঠোর হোন। এখানে তাঁর ব্যক্তিগত জীবন নয়, বরং তাঁর মহান ঐশ্বরিক মিশনের কথা। এবার একটু থামুন এবং ভাবুন। আল্লাহ কোন বিষয়টিকে সূরার শুরুতে রাখলেন? ব্যক্তিগত বিষয়টিকে! মদিনার শাসক হিসেবে অভ্যন্তরীণ সংকট সামলানো, ইসলামকে ধ্বংসের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত শত্রুদের মোকাবেলা করা—এসব বিশাল দায়িত্বের আলোচনা এলো পরে। যেন আল্লাহ আমাদের শেখাচ্ছেন—আপনার ব্যক্তিগত জীবন যদি শৃঙ্খলাপূর্ণ না হয়, ঘরের ছোট ছোট বিষয়গুলো যদি আবেগের বোঝা হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে জীবনের বড় দায়িত্বগুলো আপনি কখনোই পূর্ণ সামর্থ্যে পালন করতে পারবেন না। ঘর ঠিক তো মিশন ঠিক। এই প্রথম অনুচ্ছেদে আমাদের সবার জন্য আরেকটি গভীর শিক্ষা রয়েছে। অনেকেই অন্যকে খুশি করার জন্য নিজেকে বৈধ জিনিস থেকে বঞ্চিত করে, নিজেকে দুরবস্থায় ফেলে দেয়। ফলাফল কী হয়? কেউই সুখী হয় না, বরং ভেতরে ভেতরে জন্ম নেয় অসন্তোষ, যা একদিন ঠিকই বেরিয়ে আসে। আর সম্পর্কের ক্ষেত্রে—স্বামী-স্ত্রী হোক বা বাবা-সন্তান—কাউকে এমন বিষয়ে অপরাধবোধে ভোগাবেন না, যা বৈধ। অনুতাপ কেবল একটি ক্ষেত্রেই সুস্থ—যখন আপনি সত্যিই অন্যায় করেন। ভুল জিনিসে অপরাধবোধ চাপিয়ে দিতে থাকলে আল্লাহর দেওয়া স্বাভাবিক বিবেকের প্রোগ্রামটাই দূষিত হয়ে যায়—তখন মানুষ প্রকৃত অন্যায়ে আর অনুতপ্ত হয় না, অথচ নির্দোষ বিষয়ে অপরাধবোধে ভুগতে থাকে। এবার আসুন সূরার দ্বিতীয় স্তরে। শুরুর দিকে রয়েছে নারীদের একটি ঘটনা—নবীজী (স) তাঁর এক স্ত্রীকে একটি গোপন কথা বলেছিলেন, কিন্তু সেই আমানত রক্ষিত হয়নি। আর শেষের দিক থেকে দ্বিতীয় অংশে? আবারও নারীদের কথা! তবে এবার ইতিহাসের চার নারীর অবিস্মরণীয় দৃষ্টান্ত। নূহ (আ) ও লুত (আ)-এর স্ত্রী—শ্রেষ্ঠ পরিবেশে থেকেও যারা ব্যর্থ। ফেরাউনের স্ত্রী—জঘন্যতম পরিবেশে থেকেও যিনি জান্নাতের ঘরের জন্য দুআ করেছেন। আর মারইয়াম (আ)—পবিত্র নারী, পবিত্র পরিবেশ। ভালো ঘরে মন্দ নারী, মন্দ ঘরে ভালো নারী, ভালো ঘরে ভালো নারী। একটি সম্ভাবনা বাকি রইলো—মন্দ ঘরে মন্দ নারী। সেটার জন্য আলাদা সূরা রয়েছে: "তাব্বাত ইয়াদা আবি লাহাব"—আবু লাহাবের স্ত্রী, লাকড়ি বহনকারিণী! এই দৃষ্টান্তগুলোর মূল বার্তা: আপনার পরিবেশ আপনার পরিণতি নির্ধারণ করে না—ঈমানই নির্ধারণ করে। তাহলে এই আয়না-বিন্যাসের একদম কেন্দ্রে কী রইলো? তওবা। আল্লাহ প্রথমে সেই দুই স্ত্রীকে সম্বোধন করলেন: "ইন তাতুবা ইলাল্লাহ"—তোমরা উভয়ে যদি আল্লাহর কাছে তওবা করো... আর যদি না করো? তাহলে আল্লাহ, জিবরীল, নেককার মুমিনগণ এবং ফেরেশতারা সবাই রাসূলের পক্ষে। আর এর আয়না-প্রতিবিম্বে আল্লাহ সমগ্র উম্মাহকে ডাকলেন: "ইয়া আইয়্যুহাল্লাযিনা আমানু তুবু ইলাল্লাহ"—হে ঈমানদারগণ! আল্লাহর কাছে তওবা করো। সুবহানাল্লাহ! ক্রিয়াপদ পর্যন্ত মিলে যাচ্ছে—"তাতুবা" আর "তুবু"। এমনকি দুই জায়গাতেই ফেরেশতাদের উল্লেখ—একদিকে রাসূলের সাহায্যকারী ফেরেশতা, অন্যদিকে জাহান্নামের কঠোর ফেরেশতা, যারা কোনো অজুহাত শুনবেন না। আর মাঝের এই অংশেই এসেছে সেই আয়াত, যা আমাদের প্রত্যেকের দায়িত্ব নির্ধারণ করে দিয়েছে: "কূ আনফুসাকুম ওয়া আহলিকুম নারা"—তোমরা নিজেদের এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে সেই আগুন থেকে বাঁচাও, যার জ্বালানি হবে মানুষ ও পাথর। অর্থাৎ, উম্মুল মু'মিনিনদের ঘটনায় যে শিক্ষা, তা কেবল তাঁদের জন্য নয়—প্রতিটি ঘরের, প্রতিটি পরিবারের জন্য। তাহলে পুরো সূরার চিত্রটা দাঁড়ালো এমন: দুই প্রান্তে "হে নবী"—ব্যক্তিগত জীবন বনাম প্রকাশ্য মিশন। তার ভেতরের স্তরে নারীদের দুই ঘটনা। আর একদম হৃদয়ে—তওবার আহ্বান। এক নিখুঁত রিং কম্পোজিশন! এখন প্রশ্ন হলো, এই কাঠামো জানা কি শুধুই বুদ্ধিবৃত্তিক বিলাসিতা? না! এটি কুরআন বোঝার দৃষ্টিভঙ্গিই বদলে দেয়। প্রথম অনুচ্ছেদকে যদি শেষ অনুচ্ছেদের সাথে মিলিয়ে না পড়েন, তাহলে নবীজীর ব্যক্তিগত জীবন ও ঐশ্বরিক মিশনের মধ্যকার সেই গভীর সম্পর্কের শিক্ষাটি আপনার চোখেই পড়বে না। আয়াতগুলো তখন বিচ্ছিন্ন মনে হবে, অথচ তাদের মধ্যে চলছে অর্থের অপূর্ব লেনদেন। আর সবচেয়ে বিস্ময়কর ব্যাপার—এই বিন্যাস কোনো লুকানো, টেনেহিঁচড়ে বের করা বিষয় নয়; শব্দে শব্দে, ক্রিয়াপদে ক্রিয়াপদে এতটাই স্পষ্ট যে তা নিজেই আমাদের মনোযোগ দাবি করে। এই সেই কিতাব, যার প্রতিটি সূরা, প্রতিটি অনুচ্ছেদ, এমনকি শব্দচয়ন পর্যন্ত এক মহাজাগতিক পরিমিতিতে সাজানো। আল্লাহ আজ্জা ওয়া জাল্লা আমাদের কুরআনের এই সৌন্দর্য নিয়ে চিন্তা-গবেষণা করার তৌফিক দান করুন। —নোমান আলী খান — কুরআনের সিমেট্রিকাল ও বৃত্তাকার গঠন বিষয়ক লেকচার থেকে — বায়্যিনাহ

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

ড. খন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর বই Pdf Download

নেক আমলে অবিচল রাখবে যে ১০ আয়াত

কে ছিলেন ইমাম আল-মাওয়ার্দি