বিয়েতে বিলম্ব হলে কী আমল করবেন

 একটা সময় আমাদের সমাজে নির্দিষ্ট বয়সে পৌঁছালেই বিয়ে হয়ে যাওয়া ছিল স্বাভাবিক ঘটনা। কিন্তু বদলে যাওয়া সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতায় বিয়ের গড় বয়স আজ অনেকটাই পিছিয়ে গেছে।

উচ্চশিক্ষা, ক্যারিয়ার গড়া, আকাশছোঁয়া মূল্যস্ফীতির বাজারে অর্থনৈতিক ভিত্তি তৈরি করা, এসব মিলিয়ে বিয়ের পিঁড়িতে বসতে বসতে জীবনের অনেকটাই সময় পার হয়ে যায়।

এই বিলম্ব আজ আর নিছক ব্যক্তিগত বিষয় থাকে না। উপযুক্ত প্রস্তাব না আসা বা নানা কারণে বিয়ে ভেঙে যাওয়ায় বহু তরুণ-তরুণী মানসিক চাপে ভোগেন, তাঁদের অভিভাবকরাও সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে উৎকণ্ঠায় দিন কাটান।

এই চাপ থেকে মুক্তি পেতে মানুষ আধ্যাত্মিক আমল ও দোয়ার আশ্রয় খোঁজেন। কিন্তু কোনটা সুন্নাহসম্মত আর কোনটা কেবলই লৌকিক প্রথা, তা চিনে নেওয়া জরুরি।

বিলম্বের পেছনে এমন কল্যাণ লুকিয়ে থাকতে পারে, যা মানুষের সীমিত বুদ্ধি দিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে বোঝা সম্ভব নয়। তাই বাহ্যিক চেষ্টা জারি রেখেই আল্লাহর সময়ের ওপর ভরসা রাখতে হবে।

বিলম্বকে ব্যর্থতা না ভাবা

বিয়ের প্রস্তাব আসতে দেরি হওয়া বা মনের মতো জীবনসঙ্গী না পাওয়াকে সমাজ প্রায়ই ব্যর্থতা হিসেবে দেখে। কিন্তু একজন মুমিনের দৃষ্টিভঙ্গি এখানে ভিন্ন হওয়া উচিত।

কোরআনে আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা যা অপছন্দ করো, সম্ভবত তা তোমাদের জন্য কল্যাণকর, আর তোমরা যা পছন্দ করো, সম্ভবত তা তোমাদের জন্য অকল্যাণকর। আল্লাহ জানেন, তোমরা জানো না।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ২১৬)

বিলম্বের পেছনে এমন কল্যাণ লুকিয়ে থাকতে পারে, যা মানুষের সীমিত বুদ্ধি দিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে বোঝা সম্ভব নয়। তাই বাহ্যিক চেষ্টা জারি রেখেই আল্লাহর সময়ের ওপর ভরসা রাখতে হবে।

নবী মুসার দোয়া

সংকটের মুহূর্তে আল্লাহর সাহায্য চাওয়ার সবচেয়ে সুন্দর দৃষ্টান্ত কোরআনে নবী মুসার কাহিনিতে পাওয়া যায়। ফেরাউনের অত্যাচার থেকে পালিয়ে মাদয়ানে পৌঁছে তিনি ছিলেন একা, নিঃস্ব, আশ্রয়হীন। না ঘর, না কাজ, না পরিবার। কুয়ার পাড়ে দুই অসহায় নারীকে সাহায্য করার পর তিনি একটা গাছের ছায়ায় বসে আল্লাহর কাছে যে দোয়া করলেন, তা কোরআনে সংরক্ষিত আছে।

দোয়া: “রব্বি ইন্নি লিমা আনঝালতা ইলাইয়া মিন খইরিন ফাকীর।”

অর্থ: হে আমার প্রতিপালক, আপনি আমার প্রতি যে কল্যাণই অবতীর্ণ করবেন, নিশ্চয়ই আমি তার মুখাপেক্ষী)। (সুরা কাসাস, আয়াত: ২৪)

ইবনে কাসির উল্লেখ করেছেন, মুসা (আ.) যখন এই দোয়া করছিলেন, তখন তিনি শুধু সামান্য খাবারের আশা করছিলেন। কিন্তু আল্লাহ তাঁকে দিলেন খাবার, নিরাপদ আশ্রয়, দশ বছরের সম্মানজনক কর্মসংস্থান, নবী শোআইবের পুণবতী কন্যা এবং পরে নবুয়তের মতো নেয়ামত। (ইবনে কাসির, তাফসিরুল কুরআনিল আজিম, ৬/২২৮, দারুত তাইয়্যিবাহ, মদিনা, ১৯৯৯)

বিয়ের জন্য আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনাকারীদের জন্য এই দোয়াই হতে পারে সবচেয়ে ভালো অবলম্বন।

কুয়ার পাড়ে দুই অসহায় নারীকে সাহায্য করার পর তিনি একটা গাছের ছায়ায় বসে আল্লাহর কাছে যে দোয়া করলেন, তা কোরআনে সংরক্ষিত আছে।

শুধু ‘অজিফা’ নয়, সুন্নাহ পালন

বিয়ের প্রস্তাব দ্রুত আসার জন্য নির্দিষ্ট সংখ্যাভিত্তিক নানা ‘অজিফা’ প্রচলিত আছে। যেমন সুরা ইয়াসিন নির্দিষ্ট নিয়মে পাঠ, ৪১ দিন ৩১৩ বার ‘আল্লাহ’ নাম জপ, সুরা তওবার ১২৯ নম্বর আয়াত ১১০০ বার পাঠ, বা জুমার পর সুরা মুজ্জাম্মিল ২১ বার পাঠ।

মানুষ যখন ব্যাকুল হয়ে আল্লাহর কালামের আশ্রয় নেয়, তখন তাদের সরল নিয়তকে সম্মান জানাতে হবে। কিন্তু একটা বিষয়ে স্পষ্ট হওয়া দরকার, রাসুল (সা.) নিজে যে জিকির বা দোয়ার জন্য কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যা বেঁধে দেননি, তা হুবহু ধর্মের অংশ মনে করা ইসলামের দৃষ্টিতে প্রশ্নবিদ্ধ।

শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভি উল্লেখ করেছেন, এই ধরনের সংখ্যাভিত্তিক আমল মূলত পরবর্তী যুগের বুজুর্গদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে এসেছে, সরাসরি নবীজির সুন্নাহ বা সাহাবিদের আমল দ্বারা প্রমাণিত নয়। (শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভি, আল-ইনসাফ ফি বায়ানি সাবাবিল ইখতিলাফ, ১/৬৭)

সুরা ইয়াসিন, মারইয়াম বা মুজ্জাম্মিল পড়া নিঃসন্দেহে সওয়াবের কাজ, নেক আমলের উসিলায় দোয়া কবুলের সম্ভাবনাও বাড়ে। কিন্তু এগুলো সংখ্যার কাঠামোতে বাঁধার দরকার নেই।

দোয়ার ভেতরের আন্তরিকতা ও কান্নাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা আল্লাহর কাছে এমনভাবে দোয়া করো যেন তোমরা নিশ্চিত যে তা কবুল হবে। জেনে রেখো, আল্লাহ কোনো উদাসীন অন্তরের দোয়া কবুল করেন না।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৩৪৭৯)

যে ৩ আমল করা যায়

সুন্নাহভিত্তিক পথ খুঁজলে আলেমগণ মূলত ৩ বিষয়ে জোর দেন।

প্রথমত, বেশি বেশি ইস্তিগফার (ক্ষমা প্রার্থনা)। এতে পাপের ক্ষমা ছাড়াও বন্ধ রিজিকের দুয়ার খোলে। সুরা নুহের ১০-১২ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ইস্তিগফারের মাধ্যমে আল্লাহ বৃষ্টি বর্ষণ করেন, সম্পদ ও সন্তানসন্ততি বাড়িয়ে দেন।

ইমাম কুরতুবি লিখেছেন, এক ব্যক্তি হাসান বসরির কাছে দারিদ্র্য ও বিয়ের অভাবের কথা জানালে তিনি তাকে বেশি ইস্তিগফারের পরামর্শ দিয়েছিলেন। (কুরতুবি, আল-জামি লি-আহকামিল কুরআন, ১৮/৩০২, দারুল কুতুব আল-মিসরিয়্যাহ, কায়রো, ১৯৬৪)

দ্বিতীয়ত, তাহাজ্জুদ ও শেষ রাতের দোয়া। রাতের শেষ তৃতীয়াংশে আল্লাহ দুনিয়ার আকাশে নেমে আসেন এবং জিজ্ঞেস করতে থাকেন, কার কী প্রয়োজন। এই সময় দোয়া কবুলের সবচেয়ে ভালো সময়। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৭৫৭)

তৃতীয়ত, কোরআনের সার্বজনীন দোয়া পাঠ। বিশেষত সুরা ফুরকানের ৭৪ নম্বর আয়াত (‘রাব্বানা হাব লানা মিন আজওয়াজিনা...’), যা আদর্শ পরিবার গঠনের জন্য কোরআন-নির্দেশিত শ্রেষ্ঠ প্রার্থনা।

সন্তানের বিয়ের বিলম্বে যেসব অভিভাবক মানসিক ক্লান্তিতে ভোগেন, তাঁরা চাইলে ‘তাসবিহে ফাতেমি’ পাঠ করতে পারেন।

অভিভাবকদের ‘তাসবিহ’

সন্তানের বিয়ের বিলম্বে যেসব অভিভাবক মানসিক ক্লান্তিতে ভোগেন, তাঁরা চাইলে ‘তাসবিহে ফাতেমি’ পাঠ করতে পারেন।

ফাতেমা (রা.) যখন কাজের চাপে ক্লান্ত হয়ে একজন সাহায্যকারী চাইলেন, নবীজি (সা.) তাঁকে তার চেয়ে উত্তম আমল শেখালেন: ঘুমানোর আগে ৩৪ বার আল্লাহু আকবার, ৩৩ বার আলহামদুলিল্লাহ, ৩৩ বার সুবহানাল্লাহ পড়া, যা একজন সাহায্যকারী পাওয়ার চেয়েও উত্তম বলে জানিয়েছিলেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৩৬১)

আর সন্তানের জন্য বাবা-মায়ের দোয়া আল্লাহ কখনো ফিরিয়ে দেন না। নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘তিন দোয়া নিঃসন্দেহে কবুল হয়: মজলুমের দোয়া, মুসাফিরের দোয়া, আর সন্তানের জন্য বাবা-মায়ের দোয়া।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ৩৮৬২)

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

ড. খন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর বই Pdf Download

নেক আমলে অবিচল রাখবে যে ১০ আয়াত

দিরিলিসের আরতুগ্রুলের সকল পর্ব কিভাবে দেখবেন?