যে দুটি সূরাকে রাসূল (স) নিজেই জোড়া বেঁধে দিয়েছেন
যে দুটি সূরাকে রাসূল (স) নিজেই জোড়া বেঁধে দিয়েছেন
-------------------------------------------- কুরআনের কিছু সূরা জোড়ায় জোড়ায় চলে—এ শুধু গবেষকদের আবিষ্কার নয়। স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (স) কিছু সূরাকে জোড়া-নাম দিয়েছেন। সূরা ফালাক ও সূরা নাসকে তিনি ডেকেছেন "মু'আওয়্যাযাতাইন"—যে দুটি দিয়ে আশ্রয় চাওয়া হয়। আর কুরআনের দুই বিশাল সূরা—বাকারা ও আলে ইমরানকে তিনি নাম দিয়েছেন: اَلزَّهْرَاوَيْنِ "আয-যাহরাওয়াইন"—দুই উজ্জ্বল, দ্যুতিময় জিনিস। এখন প্রশ্ন হলো, পাশাপাশি আছে বলেই কি এরা জোড়া? নাকি এই দুটি সূরা সত্যিই একে অপরের আয়না? চলুন, মিলিয়ে দেখি। প্রথমেই দুটির শুরুতে যান। সূরা বাকারা শুরু হয়েছে "আলিফ লাম মীম" দিয়ে। সূরা আলে ইমরানও শুরু হয়েছে "আলিফ লাম মীম" দিয়ে। এরপর দুটি সূরাই প্রথম নিঃশ্বাসে কথা বলছে একই বিষয়ে, এই কিতাব নিয়ে। ذَٰلِكَ الْكِتَابُ لَا رَيْبَ فِيهِ "এই সেই কিতাব, যাতে কোনো সন্দেহ নেই" (২:২) نَزَّلَ عَلَيْكَ الْكِتَابَ بِالْحَقِّ "তিনি আপনার ওপর সত্যসহ কিতাব নাজিল করেছেন" (৩:৩) এবার শ্রোতাদের দিকে তাকান। সূরা বাকারার শুরুর বিশাল অংশ জুড়ে কাদের সম্বোধন করা হয়েছে? "ইয়া বানী ইসরাইল" অর্থাৎ ইহুদিদের। আর আলে ইমরানে? সেখানে এসেছে মারইয়াম (আ), ঈসা (আ)-এর ঘটনা, আর আহলে কিতাবদের সাথে সংলাপ, অর্থাৎ মূলত খ্রিষ্টানরা। এক জোড়া সূরা, আহলে কিতাবের দুই শাখার সাথে দুই কথোপকথন। এবার আসুন সবচেয়ে হৃদয়স্পর্শী মিলটিতে। সূরা বাকারার শেষের দিকে আল্লাহ মুসলিমদের প্রস্তুত করছেন ইসলামের ইতিহাসের প্রথম বড় সংঘাতের জন্য— বদরের যুদ্ধ। খেয়াল করুন—বদর তখনো ঘটেনি। এগুলো যুদ্ধের আগের নির্দেশনা। আর আলে ইমরানে? সেখানে আল্লাহ বলছেন — قَدْ كَانَ لَكُمْ آيَةٌ فِي فِئَتَيْنِ الْتَقَتَا "তোমাদের জন্য নিদর্শন ছিল সেই দুই দলে, যারা পরস্পরের মুখোমুখি হয়েছিল" (৩:১৩) অর্থাৎ যুদ্ধ ঘটে যাওয়ার পরের পর্যালোচনা। শুধু তা-ই নয়—আলে ইমরানের এক বিশাল অংশ উৎসর্গ করা হয়েছে উহুদ যুদ্ধ-পরবর্তী ভাষ্যে। সেই কঠিন দিনের ক্ষত, ভুলের বিশ্লেষণ, সান্ত্বনা। তাহলে ছবিটা দাঁড়ালো—বাকারা কথা বলে যুদ্ধের আগে, আলে ইমরান কথা বলে যুদ্ধের পরে। একটি সূরা প্রস্তুত করে, আরেকটি ক্ষত সারায়। এবার দুটি সূরার একেবারে শেষে যান। সূরা বাকারা শেষ হয়েছে কুরআনের সবচেয়ে সুন্দর দুআগুলোর একটি দিয়ে: رَبَّنَا لَا تُؤَاخِذْنَا إِن نَّسِينَا أَوْ أَخْطَأْنَا "হে আমাদের রব! আমরা যদি ভুলে যাই বা ভুল করি, আমাদের পাকড়াও করবেন না" (২:২৮৬) আর আলে ইমরানের শেষেও রয়েছে কুরআনের অন্যতম সুন্দর দুআ: رَبَّنَا إِنَّنَا سَمِعْنَا مُنَادِيًا يُنَادِي لِلْإِيمَانِ أَنْ آمِنُوا بِرَبِّكُمْ فَآمَنَّا "হে আমাদের রব! আমরা এক আহ্বানকারীকে শুনেছি, যিনি ঈমানের দিকে ডাকছিলেন—'তোমাদের রবের প্রতি ঈমান আনো'—আর আমরা ঈমান এনেছি" (৩:১৯৩) দুই সূরাই যাত্রা শেষ করছে বান্দার কাতর প্রার্থনায়। আর সবশেষে, একটা সূক্ষ্ম শব্দ-খেলা। বাকারা জোর দিয়েছে ইমান শব্দটির প্রতি, এতে বেশ কিছু সংখ্যক বার ইমান এবং হৃদয়ের কথা এসেছে। আর আলে ইমরান জুড়ে বারবার ধ্বনিত হয়েছে আরেকটি শব্দ—ইসলাম। إِنَّ الدِّينَ عِندَ اللَّهِ الْإِسْلَامُ "নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে একমাত্র দ্বীন হলো ইসলাম" (৩:১৯) وَمَن يَبْتَغِ غَيْرَ الْإِسْلَامِ دِينًا فَلَن يُقْبَلَ مِنْهُ "যে ইসলাম ছাড়া অন্য কোনো দ্বীন চাইবে, তার কাছ থেকে তা কখনো গ্রহণ করা হবে না" (৩:৮৫) একটিতে ঈমান, ঈমান, ঈমান। আরেকটিতে ইসলাম, ইসলাম, ইসলাম। যেন এক মুদ্রার দুই পিঠ, দুই সূরায় ভাগ করা। তাহলে মিলিয়ে নিন: একই "আলিফ লাম মীম" দিয়ে শুরু, দুটিই খোলে কিতাবের বর্ণনা দিয়ে, একটিতে ইহুদি আরেকটিতে খ্রিষ্টান, একটিতে যুদ্ধের আগের প্রস্তুতি আরেকটিতে যুদ্ধের পরের ভাষ্য, একটিতে ঈমানের সুর আরেকটিতে ইসলামের, আর দুটিই শেষ হয়েছে কুরআনের অপূর্ব দুই দুআয়। রাসূল (স) এমনি এমনি এদের নাম দেননি "দুই উজ্জ্বল আলো"—এরা সত্যিই জ্বলে একসাথে। আল্লাহ আমাদের এই দুই দ্যুতিময় সূরার আলোয় নিজেদের জীবন সাজানোর তৌফিক দান করুন। আমীন। —নোমান আলী খান
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন