আপনি এখনো মায়ের পেটেই আছেন—সূরা নাহলের এক অবিশ্বাস্য চিত্রকল্প

  আপনি এখনো মায়ের পেটেই আছেন—সূরা নাহলের এক অবিশ্বাস্য চিত্রকল্প

আসুন, আজ সূরা আন-নাহলের এমন কিছু আয়াত নিয়ে ভাবি, যেগুলো প্রথম দেখায় মনে হবে ছড়ানো-ছিটানো কিছু বিষয়ের তালিকা—মায়ের গর্ভ, পাখি, ঘরবাড়ি, তাবু, ছায়া, গুহা, পোশাক, বর্ম। কিন্তু একটু গভীরে তাকালেই দেখবেন, আয়াতগুলো একের পর এক গেঁথে তুলেছে এক অসাধারণ চিত্রকল্প—যা একবার বুঝে ফেললে পাখির দিকে তাকানোর দৃষ্টিও বদলে যাবে। অনুচ্ছেদটা শুরু হয়েছে এভাবে: وَاللَّهُ أَخْرَجَكُمْ مِنْ بُطُونِ أُمَّهَاتِكُمْ لَا تَعْلَمُونَ شَيْئًا "আল্লাহ তোমাদের বের করে এনেছেন তোমাদের মায়েদের পেট থেকে, যখন তোমরা কিছুই জানতে না" وَجَعَلَ لَكُمُ السَّمْعَ وَالْأَبْصَارَ وَالْأَفْئِدَةَ لَعَلَّكُمْ تَشْكُرُونَ "আর তিনি তোমাদের দিয়েছেন শ্রবণশক্তি, দৃষ্টিশক্তি এবং হৃদয়—যাতে তোমরা কৃতজ্ঞ হতে পারো।" (১৬:৭৮) ক্রমটা লক্ষ্য করেছেন? প্রথমে শ্রবণ, তারপর দৃষ্টি, তারপর হৃদয়। এটা কোনো এলোমেলো তালিকা নয়। আপনি যখন কিছু শোনেন, তা বদলে দেয় আপনার দেখার দৃষ্টিভঙ্গি; আর নতুন দৃষ্টিতে যা দেখেন, তা স্পর্শ করে আপনার হৃদয়কে। আল্লাহর কালাম শুনুন—আপনার চোখ জগৎটাকে নতুনভাবে দেখতে শিখবে—আর প্রতিবার সেই দেখা আপনার অন্তরে রেখে যাবে কৃতজ্ঞতার ছাপ। সামনের আয়াতগুলো ঠিক এই প্রক্রিয়াটারই হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ। এবার ভাবুন। মায়ের গর্ভে আপনি কেমন ছিলেন? পরম প্রশান্তিতে আবৃত—খাবারের চিন্তা নেই, নিরাপত্তার ভয় নেই। আল্লাহ নিজে আপনাকে সেখানে জড়িয়ে রেখেছিলেন। কিন্তু সেই সময়ের কথা কি আপনার মনে আছে? না। তাহলে সেই তত্ত্বাবধান অনুভব করবেন কীভাবে? ঠিক পরের আয়াতেই আল্লাহ বললেন: أَلَمْ يَرَوْا إِلَى الطَّيْرِ مُسَخَّرَاتٍ فِي جَوِّ السَّمَاءِ مَا يُمْسِكُهُنَّ إِلَّا اللَّهُ "তারা কি পাখির দিকে তাকায় না, যারা ঝুলে আছে আকাশের পেটের মাঝখানে? আল্লাহ ছাড়া কেউ তাদের ধরে রাখেনি!" (১৬:৭৯) সুবহানাল্লাহ! ভাষাটা দেখুন—আকাশের "জাও", আকাশের পেট! যেমন আল্লাহ ছাড়া কেউ আপনাকে আপনার মায়ের গর্ভে ধরে রাখেনি, তেমনি আল্লাহ ছাড়া কেউ ওই পাখিকে শূন্যে ধরে রাখছে না। পাখির পৃথিবী হলো আকাশ, আর আপনার প্রথম পৃথিবী ছিল মায়ের গর্ভ। এরপর যখনই আকাশে পাখি দেখবেন, মনে করবেন—আমিও একদিন ঠিক ওভাবেই ভেসে ছিলাম, আল্লাহর করুণার মধ্যে। একটা সাধারণ পাখিও তখন হয়ে উঠবে আপনার ঈমান বাড়ানোর উপলক্ষ। তারপর? মায়ের আবরণ থেকে বের করে এনে আল্লাহ কি আপনাকে খোলা আকাশের নিচে ছেড়ে দিলেন? না। তিনি দিলেন নতুন আবরণ: وَاللَّهُ جَعَلَ لَكُمْ مِنْ بُيُوتِكُمْ سَكَنًا "আল্লাহ তোমাদের ঘরগুলোকে বানিয়েছেন প্রশান্তির স্থান।" মা ছিলেন আপনার প্রথম ঘর; এখন ঘরটাই যেন আপনার নতুন মা। গর্ভে ছিল সুকুন, এখন ঘরে আছে সাকান। কিন্তু ঘর ছেড়ে সফরে বের হলে? তার জন্য পশুর চামড়ার তাবু—হালকা, বহনযোগ্য আবরণ: وَجَعَلَ لَكُمْ مِنْ جُلُودِ الْأَنْعَامِ بُيُوتًا تَسْتَخِفُّونَهَا يَوْمَ ظَعْنِكُمْ وَيَوْمَ إِقَامَتِكُمْ "আর পশুর চামড়া থেকে তিনি তোমাদের জন্য বানিয়েছেন এমন ঘর, যা তোমরা সহজে বহন করো—চলার দিনেও, থামার দিনেও।" তাবুও যদি না থাকে? وَاللَّهُ جَعَلَ لَكُمْ مِمَّا خَلَقَ ظِلَالًا "আর আল্লাহ তাঁর সৃষ্টি থেকেই তোমাদের জন্য করেছেন ছায়ার ব্যবস্থা।" রুক্ষ পাহাড়ি প্রান্তরে ঝড় এলে? وَجَعَلَ لَكُمْ مِنَ الْجِبَالِ أَكْنَانًا "আর পর্বতের মধ্যে তিনি তোমাদের জন্য বানিয়েছেন আশ্রয়ের গুহা।" আর যখন কোনো ছায়া নেই, গুহা নেই? তখনও আপনি আবরণহীন নন: وَجَعَلَ لَكُمْ سَرَابِيلَ تَقِيكُمُ الْحَرَّ وَسَرَابِيلَ تَقِيكُمْ بَأْسَكُمْ "আর তিনি তোমাদের জন্য বানিয়েছেন পোশাক, যা তোমাদের তীব্র গরম থেকে রক্ষা করে; আর এমন পোশাকও (বর্ম), যা তোমাদের যুদ্ধে রক্ষা করে।" লক্ষ্য করুন, একটার পর একটা, একটার পর একটা—প্রতিটি দৃশ্যে একই বার্তা: আপনি কখনোই আবরণের বাইরে নন। আমরা ভাবি, মায়ের পেটে আমরা কত অসহায় ছিলাম, আল্লাহই সব ব্যবস্থা করতেন। আর আল্লাহ মনে করিয়ে দিচ্ছেন—তোমরা তো এখনো তা-ই আছো! এই মুহূর্তেও আপনি পোশাকের ভেতরে আছেন, ছাদের নিচে আছেন, ছায়ার মধ্যে আছেন। পাখিটা যেমন এখনো আকাশের পেটেই ভেসে আছে, আপনিও এখনো আল্লাহর কোনো না কোনো রহমতের আবরণের ভেতরেই আছেন। আয়াতের শুরুতে যে বলা হয়েছিল "তোমরা কিছুই জানো না"—এই না-জানাটা শুধু শৈশবের কথা নয়; আমরা আজও জানি না, প্রতি মুহূর্তে কত আবরণে তিনি আমাদের জড়িয়ে রেখেছেন। আর এই অনুচ্ছেদ শেষ হয়েছে কী দিয়ে? كَذَلِكَ يُتِمُّ نِعْمَتَهُ عَلَيْكُمْ لَعَلَّكُمْ تُسْلِمُونَ "এভাবেই তিনি তাঁর নিয়ামত তোমাদের উপর পূর্ণ করেন, যাতে তোমরা আত্মসমর্পণ করো।" শুরুতে ছিল "লাআল্লাকুম তাশকুরুন"—যাতে কৃতজ্ঞ হও; শেষে "লাআল্লাকুম তুসলিমুন"—যাতে সমর্পিত হও। কৃতজ্ঞতা থেকে আত্মসমর্পণ—এটাই যাত্রা। শেষে একটা কথা, যা শুনলে গায়ে কাঁটা দেয়। কুরআনের অন্য এক জায়গায় আল্লাহ কিয়ামতের দিনের বর্ণনায় বলেছেন: وَتَرَكْتُمْ مَا خَوَّلْنَاكُمْ "আর তোমরা ফেলে এসেছো সেই সবকিছু, যা আমি তোমাদের দিয়েছিলাম।" (৬:৯৪ - সূরা আল-আন'আম) সেদিন সব আবরণ খুলে যাবে—ঘর নেই, পোশাকের মর্যাদা নেই, ছায়া নেই। যিনি সারাজীবন এত আবরণে ঢেকে রাখলেন, সেদিন একটাই আবরণ কাজে আসবে—তাকওয়ার আবরণ, আমলের আবরণ। আল্লাহ আজ্জা ওয়া জাল্লা আমাদের তাঁর অগণিত আবরণের নিয়ামত উপলব্ধি করার, কৃতজ্ঞ হওয়ার এবং পূর্ণ আত্মসমর্পণের তৌফিক দান করুন। —নোমান আলী খান — সূরা আন-নাহলের চিত্রকল্পের ক্রম-অগ্রগতি বিষয়ক লেকচার থেকে — বায়্যিনাহ

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

ড. খন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর বই Pdf Download

নেক আমলে অবিচল রাখবে যে ১০ আয়াত

কে ছিলেন ইমাম আল-মাওয়ার্দি