পাঁচটি পানীয়, একটি রহস্য — কুরআন কেন মধুর মতো?

 পাঁচটি পানীয়, একটি রহস্য — কুরআন কেন মধুর মতো?

আসুন, আজ কুরআনের সবচেয়ে মিষ্টি অনুচ্ছেদগুলোর একটি নিয়ে কথা বলি—সূরা আন-নাহলের ৬৪ থেকে ৬৯ নম্বর আয়াত। উস্তাদ নোমান আলী খানের ভাষায়, চিত্রকল্পের বিবেচনায় এটি কুরআনের অন্যতম অসাধারণ সূরা। আপাতদৃষ্টিতে আয়াতগুলো ছড়ানো-ছিটানো কিছু বিষয় নিয়ে: বৃষ্টি, দুধ, খেজুর-আঙ্গুর, মৌমাছি। কিন্তু একটু গভীরে তাকালেই দেখবেন, প্রতিটি আয়াত একটি সুতোয় গাঁথা। সুতোটা কী? প্রথমে মনে হবে—পানীয়। আকাশের পানি, দুধ, ফলের রস, মধু। কিন্তু আসল সুতোটা আরও গভীরে। লক্ষ্য করুন, অনুচ্ছেদটা কিন্তু শুরুই হয়েছে এমন একটি আয়াত দিয়ে, যার সাথে পানীয়ের কোনো সম্পর্কই নেই: "আমি আপনার প্রতি কিতাব নাযিল করেছি... পথনির্দেশ ও রহমতস্বরূপ, সেই মানুষদের জন্য যারা ঈমান আনে।" অর্থাৎ, আলোচনার আসল বিষয় হলো ওহী। আর এরপরের প্রতিটি চিত্র আসলে ওহীকেই বোঝার এক-একটি জানালা। প্রথম চিত্র: বৃষ্টি। "আল্লাহ আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করেন, তারপর তা দিয়ে মৃত জমিনকে জীবিত করেন।" ওহীও ঠিক তা-ই করে—আকাশ থেকে নেমে আসে আর মৃত অন্তরগুলোকে জীবিত করে। কিন্তু এখানে একটা সূক্ষ্ম ইঙ্গিত লুকিয়ে আছে। আয়াতের শেষে আল্লাহ কী বললেন? "নিশ্চয়ই এতে নিদর্শন রয়েছে তাদের জন্য যারা শোনে।" একটু দাঁড়ান। বৃষ্টিতে জমিন সবুজ হয়ে ওঠা—এটা কি শোনার নিদর্শন, নাকি দেখার? দেখার! তাহলে "যারা শোনে" কেন? কারণ কোন নিদর্শনটি শোনা যায়? ওহী! আল্লাহ যেন বলছেন—পানির দিকে তাকাও, কিন্তু মন দিয়ে শোনো; আমি কি সত্যিই শুধু পানির কথা বলছি? দ্বিতীয় চিত্র: দুধ। "গবাদি পশুর পেটে গোবর ও রক্তের মাঝখান থেকে আমি তোমাদের পান করাই বিশুদ্ধ দুধ।" ভাবুন তো—অপবিত্রতা আর অপবিত্রতার ঠিক মাঝখান থেকে বেরিয়ে আসছে নিখাদ, বিশুদ্ধ, প্রাণসঞ্চারী পানীয়! সাহাবায়ে কেরাম কেমন পরিবেশে ছিলেন? পৃথিবীর জঘন্যতম পরিবেশগুলোর একটিতে। অথচ সেই সমাজের বুক চিরেই বেরিয়ে এলো ইতিহাসের সবচেয়ে বিশুদ্ধ প্রজন্ম। এটাই ওহীর শক্তি—সবচেয়ে দূষিত পরিবেশেও ওহী আসে সম্পূর্ণ নির্মল হয়ে, আর মানুষকে পুনরুজ্জীবিত করে। তৃতীয় চিত্র: খেজুর ও আঙ্গুর। এবার ঠিক উল্টো দৃশ্য। খেজুর ভালো জিনিস, আঙ্গুরও ভালো জিনিস। কিন্তু আল্লাহ বললেন, "তোমরা তা থেকে তৈরি করো মাদক এবং উত্তম রিজিক।" খেয়াল করুন—আল্লাহ বলেননি "আমি বের করি"; বলেছেন "তোমরা বানাও।" দুধের চিত্রে খারাপ পরিবেশ থেকে ভালো বেরিয়ে এসেছিল; এখানে ভালো জিনিস থেকে মানুষ নিজ হাতে খারাপ বানাচ্ছে! বনী ইসরাইলকে কী দেওয়া হয়েছিল? অসংখ্য নবী, তাওরাত—সব বিশুদ্ধ নিয়ামত। তারা সেই "রিজকান হাসানা"-কে বানিয়ে ফেলেছিল "সাকার"—নেশা। ওহীর জ্ঞানেরও অপব্যবহার সম্ভব। কাকতালীয় নয় যে মাক্কী সূরা হওয়া সত্ত্বেও সূরা নাহলের একেবারে শেষে বনী ইসরাইলের সমালোচনা এসেছে। শিক্ষাটা দুই ধারের তলোয়ারের মতো: জঘন্যতম পরিবেশেও বিশুদ্ধ থাকা সম্ভব, আবার শ্রেষ্ঠ নিয়ামত পেয়েও নিজেকে দূষিত করে ফেলা সম্ভব। চতুর্থ চিত্র: মৌমাছি। আর এখানেই এসে সব সুতো এক বিন্দুতে মিলে যায়। আল্লাহ বললেন—"ওয়া আওহা রাব্বুকা ইলান নাহল"—আপনার রব মৌমাছির প্রতি 'ওহী' করলেন! ভাষাটা লক্ষ্য করেছেন? স্বয়ং ওহী শব্দটাই ব্যবহার করা হলো। মৌমাছি আল্লাহর নির্দেশে পাহাড়ে, গাছে, এমনকি মানুষের দালানেও ঘর বানায়; সব ফল থেকে আহরণ করে; তারপর বিনম্রভাবে তার রবের দেখানো পথগুলো অনুসরণ করে—যেমন ফেরেশতারা আল্লাহর নির্দেশিত পথে ওহী বহন করে আনেন। আর মৌমাছির পেট থেকে বের হয় "শারাবুম মুখতালিফুন আলওয়ানুহু"—বিভিন্ন রঙের পানীয়। কুরআনের সূরাগুলোও কি তেমন নয়? কোনো আয়াত রহমতের, কোনোটি সতর্কবার্তার, কোনোটি জ্ঞানের, কোনোটি প্রজ্ঞার—প্রতিটি সূরার নিজস্ব রং, নিজস্ব স্বাদ, নিজস্ব মিষ্টতা। তারপর সেই অমোঘ ঘোষণা: "ফিহি শিফাউল লিন্নাস"—এতে রয়েছে মানুষের জন্য নিরাময়। জানেন কি, কুরআনে 'শিফা' শব্দটি নিজস্বভাবে আর মাত্র এক জায়গায় ব্যবহৃত হয়েছে? "তোমাদের রবের পক্ষ থেকে এসেছে উপদেশ এবং অন্তরের ব্যাধির শিফা"—অর্থাৎ কুরআন! মধু শিফা, কুরআনও শিফা। মিষ্টতায় এবং ঐশ্বরিক উৎসের বিবেচনায় মধু হলো কুরআনেরই রূপক। শেষ একটি চিন্তা। আপনি চাইলে ঠিক সেই ফুলটির কাছে যেতে পারেন, যেখানে মৌমাছি যায়। কিন্তু আপনি মধু বানাতে পারবেন না। কারণ মধু তৈরি হয় কেবল আল্লাহর নির্দেশিত প্রক্রিয়ায়। ঠিক তেমনি—ইতিহাসবিদরাও সেই একই ঘটনা পর্যবেক্ষণ করেন, যা কুরআনে এসেছে; ফেরাউনের কাহিনি, জাতিগুলোর উত্থান-পতন—এসব নিয়ে মানুষও তো কত মন্তব্য করে। ফুল একই। কিন্তু যখন আল্লাহ সেই ঘটনার ভাষ্য দেন, তখন তা হয়ে ওঠে সম্পূর্ণ ভিন্ন কিছু—মধুর মতো মিষ্টি, পথনির্দেশক, আর মানুষের অন্তরের নিরাময়। "ইন্না ফি যালিকা লাআয়াতাল লিকাওমিঁয় ইয়াতাফাক্কারুন"—নিশ্চয়ই এতে নিদর্শন রয়েছে তাদের জন্য, যারা গভীরভাবে চিন্তা করে। আল্লাহ আজ্জা ওয়া জাল্লা আমাদের কুরআনের এই মধু আস্বাদন করার এবং এর শিফা দিয়ে অন্তর জীবিত করার তৌফিক দান করুন। —নোমান আলী খান — কুরআনের অনুচ্ছেদের গঠন ও যুক্তির ক্রম-অগ্রগতি বিষয়ক লেকচার থেকে — বায়্যিনাহ

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

ড. খন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর বই Pdf Download

নেক আমলে অবিচল রাখবে যে ১০ আয়াত

কে ছিলেন ইমাম আল-মাওয়ার্দি