আয়াতটা আমরা অনেকেই জানি। সূরা মুহাম্মাদে আল্লাহ প্রশ্ন করছেন—তারা কি কুরআন নিয়ে গভীর চিন্তা করে না, নাকি হৃদয়ে তালা লেগে আছে?
মোটামুটি এভাবেই আমরা আয়াতটা শুনে এসেছি। হৃদয়ে তালা।
একটু দাঁড়ান। আয়াতটা আসলে এ কথা বলছেই না।
أَفَلَا يَتَدَبَّرُونَ الْقُرْآنَ أَمْ عَلَىٰ قُلُوبٍ أَقْفَالُهَا
তারা কি কুরআন নিয়ে গভীর চিন্তা করে না — নাকি হৃদয়গুলো আবদ্ধ হয়ে আছে তাদের নিজেদের তালায়?
লক্ষ্য করুন। আল্লাহ বলেননি "হৃদয়ে তালা আছে"। বললে আরবিতে হতো "আকফাল"— তালা, ব্যস। কিন্তু তিনি বলেছেন "আকফালুহা" —হৃদয়ের নিজের তালা। ওই ছোট্ট সর্বনামটা পুরো ছবিটাই বদলে দেয়। তালাটা বাইরে থেকে কেউ এসে লাগিয়ে যায়নি। শয়তান লাগায়নি, শত্রু লাগায়নি, পরিস্থিতি লাগায়নি। তালাটা হৃদয় নিজেই বানিয়েছে। নিজের কারখানায়, নিজের উপকরণে।
তাহলে উপকরণগুলো কী?
সেগুলোও আল্লাহরই দেওয়া। ভেবে দেখুন—রাগ একটা সুস্থ অনুভূতি; কিন্তু সে আপনার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিতে পারে, আপনাকে বন্দি করে ফেলতে পারে। ভয় একটা সুস্থ অনুভূতি; কিন্তু সে-ও নিয়ন্ত্রণ নিতে পারে। দুঃখ সুস্থ অনুভূতি, কখনো কখনো দুঃখ আপনার দরকারও; কিন্তু সে আপনাকে ধ্বংস করে দিতে পারে। লোভের একটা মাত্রা পর্যন্ত মানুষ কর্মঠ হয়, রিযক খোঁজে; মাত্রা ছাড়ালে সেই লোভই তাকে খেয়ে ফেলে। নারী-পুরুষের পারস্পরিক আকর্ষণ একটা সীমা পর্যন্ত সুস্থ; সীমা পেরোলে সেটাই সর্বনাশ।
খেয়াল করেছেন প্যাটার্নটা? প্রতিটা অনুভূতি আল্লাহই হৃদয়ে দিয়েছেন। প্রতিটাই মাত্রার মধ্যে থাকলে নেয়ামত। আর মাত্রা ছাড়ালে প্রতিটাই একেকটা তালা—যে তালা হৃদয় নিজের হাতে নিজের দরজায় লাগায়। এজন্যই আয়াতে "আকফালুহা"—নিজেদের তালা।
তালার আরেকটা চেহারা আছে, যেটা আরও নীরব।
আমরা কথায় বলি না? অমুকের হৃদয়টা পাথর, সে নড়বেই না? যে মানুষ আগে থেকেই সিদ্ধান্ত নিয়ে বসে আছে, তাকে যা-ই দেখান, সে অবস্থান বদলাবে না। এবার নিজের দিকে তাকাই। আমরা কুরআনের কাছে কীভাবে যাই? অনেক সময় এভাবে—"এটার মানে কী, তা তো আমার জানাই আছে; আমি শুধু আমার কথার পক্ষে একটা দলিল খুঁজছি।"
আর এই খোঁজাখুঁজি কখনো কখনো বেশ ব্যবহারিক পর্যায়ে নেমে আসে। "ভাই, এমন একটা আয়াত খুঁজছি যেটা দিয়ে শাশুড়িকে একটু শায়েস্তা করা যায়। আয়াতটা কোথায় পাব বলতে পারেন?" "ওই যে লোকগুলো এমন এমন কথা বলে, ওদের ব্যাপারে একটা আয়াত দরকার।" "আমার ভাই সেদিন যা করল, ওকে শুনিয়ে দেওয়ার মতো আয়াতটা কোন সূরায়?"
হাসছেন? অথচ এখানেই সবচেয়ে ভয়ের কথাটা লুকিয়ে আছে। রায় আমি আগেই লিখে ফেলেছি; কুরআনের কাছে গেছি শুধু সই আনতে। এর মানে আমি কুরআনের কাছে গেছি তালাসহ। শব্দগুলোর পেছনের রহস্য আর খুঁজছি না—কারণ ধরেই নিয়েছি, রহস্য আমার আগে থেকেই জানা। তখন আমি আর আল্লাহর কালামের খাদেম না। বরং চাইছি, আল্লাহর কালামই কয়েকটা রেফারেন্স জুগিয়ে আমার তালাবদ্ধ হৃদয়ের খেদমত করুক।
কুরআনকে চাবি না বানিয়ে তালার পাহারাদার বানিয়ে ফেলা—এর চেয়ে বড় উল্টোযাত্রা আর কী হয়?
তাহলে চাবিটা কী? আয়াত নিজেই বলে দিচ্ছে। "তারা কি কুরআন নিয়ে গভীর চিন্তা করে না"— তারপরেই তালার কথা। অর্থাৎ তাদাব্বুর— পূর্বনির্ধারিত ধারণা নামিয়ে রেখে, আল্লাহ আসলে কী বলতে চাইছেন সেই রহস্যের সন্ধানে কুরআনের সামনে বসা—এটাই তালা খোলার পথ। আর যেহেতু তালাগুলো ছিল আমাদের বেসামাল অনুভূতিরই নাম, তাই কুরআনের গভীর চিন্তা শুধু আত্মার চিকিৎসা নয়— অনুভূতিরও চিকিৎসা। রাগ, ভয়, দুঃখ, লোভ— তাদাব্বুর এগুলোকে তাড়িয়ে দেয় না; মাত্রায় ফিরিয়ে আনে। যেখানে তারা নেয়ামত ছিল, সেখানে।
তালা যেমন ভেতরের, চাবিও ভেতরেই। শুধু কুরআনের সামনে বসতে হবে খালি হাতে— নিজের রায়টা দরজার বাইরে রেখে।
মনে রাখার কথাটা এটুকুই: সূরা মুহাম্মাদের আয়াতে "আকফালুহা"—হৃদয়ের নিজের তালা। রাগ, ভয়, দুঃখ, লোভ, কামনা—আল্লাহর দেওয়া অনুভূতিই মাত্রা ছাড়ালে হৃদয়ের তালা হয়ে যায়; আর আগে থেকে রায় ঠিক করে কুরআনের কাছে দলিল খুঁজতে যাওয়াও সেই তালারই আরেক নাম। চাবি একটাই—খোলা মনে কুরআনের গভীরে ডুব দেওয়া।
হে আল্লাহ, আমাদের নিজেদের বানানো তালা থেকে আমাদের হৃদয়কে মুক্ত করুন, আর আপনার কালামের সামনে আমাদের বসিয়ে দিন খালি হাতে, খোলা হৃদয়ে। আমিন।
—নোমান আলী খানের আলোচনা অবলম্বনে
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন