সময় ব্যবস্থাপনায় মুমিনের ৩ কৌশল
একজন সাধারণ মানুষের জন্য এটা জাগতিক উন্নতির একটা সোপান হতে পারে, কিন্তু একজন মুমিনের জীবনে সময়ের হিসাব সরাসরি পারলৌকিক জবাবদিহির সঙ্গে জড়িত। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ সময়ের কসম খেয়ে মানুষের প্রতিটি মুহূর্তের মূল্যের কথা মনে করিয়ে দিয়েছেন।
সময় ব্যবস্থাপনা মানে দৈনন্দিন কর্মঘণ্টাকে সুপরিকল্পিতভাবে সাজিয়ে কম সময়ে বেশি কাজ করার একটা দক্ষতা। আজ এমন কিছু অভ্যাসের কথা বলা হলো, যা দিয়ে একজন মুমিন তাঁর সময়কে আরও অর্থবহ করে তুলতে পারেন।
১. যা আপনার নয়, তাকে ‘না’ বলা
সামাজিক লৌকিকতা বা দ্বিধার কারণে আমরা প্রায়ই এমন সব দায়িত্ব ঘাড়ে তুলে নিই, যা আমাদের সময়ের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। নবীজি (সা.) এখানে একটা মূলনীতি দিয়েছেন, ‘একজন মানুষের ইসলামের সৌন্দর্যের একটা অংশ হলো, যা তার সঙ্গে সম্পর্কিত নয়, তা থেকে দূরে থাকা।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৩১৮)
এই হাদিস মূলত অহেতুক কথাবার্তা ও কাজে জড়িয়ে পড়া নিয়ে, কিন্তু এর ভেতরের নীতিটি সময়ের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। নিজের সঙ্গে সম্পর্কহীন বা অপ্রয়োজনীয় দায়িত্বে বিনয়ের সঙ্গে, কিন্তু দৃঢ়ভাবে ‘না’ বলতে শেখাটা সময় রক্ষার একটা গুরুত্বপূর্ণ অভ্যাস।
২. অবসর কাজে লাগানো
নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘এমন দুটি নেয়ামত আছে, যার ব্যাপারে বহু মানুষ ধোঁকায় থাকে—সুস্বাস্থ্য ও অবসর সময়।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৪১২)
এই হাদিসের শিক্ষা হলো, সুস্থতা ও অবসর দুটিই সাময়িক। কখন কোনটি ফুরিয়ে যাবে, তা কেউ জানে না। তাই দৈনন্দিন জীবনে জ্যামে আটকে থাকা, লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা বা কারও অপেক্ষার মতো অপ্রয়োজনীয় মনে হওয়া সময়টুকুও অবহেলা করার মতো নয়।
ছোট একটি নোটবুক রাখা, বই পড়া বা জিকিরে সময়টা কাজে লাগানো। এই ছোট অভ্যাসগুলোই দিনকে অন্যভাবে গড়ে তোলে।
শরীরের প্রতি যত্নশীল হওয়াও এই একই নীতির অংশ। ক্লান্ত ও অসুস্থ শরীর নিয়ে কোনো পরিকল্পনাই কাজ করে না। তাই পরিমিত খাবার, সময়মতো ঘুম, আর কাজের মধ্যে ছোট বিরতি নেওয়া বিলাসিতা নয়; বরং সময়কে দীর্ঘ মেয়াদে কাজে লাগানোর পূর্বশর্ত।
৩. সাধ্যের বাইরে না যাওয়া
অনেক সময় আমরা নিজেদের সাধ্যের বাইরে গিয়ে অতি উচ্চাকাঙ্ক্ষী লক্ষ্য ঠিক করি, যা পূরণ না হলে হতাশা গ্রাস করে।
নবীজি (সা.) এখানেও একটি স্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছেন, ‘যতটুকু সাধ্য, ততটুকু আমল করো। কারণ, সবচেয়ে ভালো আমল সেটাই, যা নিয়মিত করা হয়, যদিও তা পরিমাণে কম হয়।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ৪২৪০)
এই নীতি শুধু ইবাদতের ক্ষেত্রে নয়, যেকোনো কাজের পরিকল্পনায়ও প্রযোজ্য। বাস্তবসম্মত লক্ষ্য ঠিক করে ধাপে ধাপে এগোনোই টেকসই ফলাফল দেয়, একবারে সব করার চেষ্টা নয়।
মনে রাখুন
একসঙ্গে অনেক কাজ করার চেষ্টার বদলে একটি কাজ শেষ করে তারপর আরেকটি কাজে হাত দেওয়া ভালো। গবেষণায় দেখা গেছে, একসঙ্গে অনেক কাজ করলে প্রতিটির মান কমে যায়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অবচেতনভাবে সময় নষ্ট হওয়াটাও আজকের সবচেয়ে বড় সময় অপচয়ের একটি। তাই নির্দিষ্ট সময় ছাড়া স্ক্রিনের দিকে না তাকানোর অভ্যাস অনেক সময় বাঁচিয়ে দেয়।
দিনের শুরুতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো আগে সারার অভ্যাস, প্রতিটি কাজের জন্য নির্দিষ্ট সময় বরাদ্দ রাখা, আর নিজের চেয়ে দক্ষ কেউ থাকলে ছোট দায়িত্ব তাকে ছেড়ে দেওয়া—এসবও ফলপ্রসূ জীবনযাপনের সাধারণ নিয়ম, যা যেকোনো সংস্কৃতি বা বিশ্বাসের মানুষের জন্যই প্রযোজ্য।
একজন মুমিনের জন্য এই অভ্যাসগুলোর বিশেষত্ব একটাই—এগুলোর পেছনের নিয়ত। কাজ যত ছোটই হোক, তা যদি আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে করা হয়, তবে তা নিছক দক্ষতার প্রদর্শনী থেকে অনেক বেশি কিছু হয়ে ওঠে।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন