হাদিসে আলোকে মুমিনের ২০ গুণ
ইমানদার আল্লাহ–তাআলার প্রিয় বান্দা। ইমানের আলোয় আলোকিত মানুষই দুনিয়ার পথচলায় সঠিক দিশা পায় এবং আখেরাতের অনন্ত জীবনে সফলতার অধিকারী হয়। পবিত্র কোরআন মুমিনদের এই সৌভাগ্যের কথা সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছে।
আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘তারাই নিজেদের পালনকর্তার পক্ষ থেকে সুপথপ্রাপ্ত, আর তারাই প্রকৃত সফলকাম।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ৫)
তবে ইমান শুধু মুখের স্বীকৃতির নাম নয়, এর রয়েছে কিছু দৃশ্যমান আলামত, নৈতিক বৈশিষ্ট্য ও জীবনঘনিষ্ঠ দাবি। মানুষের অন্তরে ইমানের যে আলো জ্বলে, তার বিচ্ছুরণ আচরণ, চিন্তা, আমল ও জীবনদর্শনে প্রকাশ পায়।
তাই প্রকৃত মুমিনকে চেনার জন্য তার কথার পাশাপাশি কর্ম ও চরিত্রের দিকেও তাকাতে হয়।
ইমানের বাস্তবতা কেমন
এক হাদিসে মুমিনের এমন ২০টি বৈশিষ্ট্যের কথা উঠে এসেছে, যার মধ্যে ইমানের মৌলিক বিশ্বাস, ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ আমল এবং উন্নত নৈতিক গুণাবলি সবই অন্তর্ভুক্ত।
সাহাবি সুওয়াইদ ইবনে হারেস (রা.) বলেন, একবার তিনি তাঁর গোত্রের সাতজন লোককে সঙ্গে নিয়ে রাসুলের দরবারে উপস্থিত হন। তাঁদের চেহারা ও পোশাক দেখে সন্তুষ্ট হয়ে নবীজি জানতে চাইলেন, ‘তোমরা কারা?’
তাঁরা উত্তর দিলেন, ‘আমরা মুমিন।’
তাঁদের এ পরিচয় শুনে নবীজি মুচকি হাসলেন। এরপর বললেন, ‘প্রত্যেক জিনিসের একটা বাস্তবতা রয়েছে। তোমাদের কথার এবং তোমাদের ইমানের বাস্তবতা কী?’
তাঁরা বললেন, ‘পনেরোটি গুণ রয়েছে আমাদের মধ্যে। এর পাঁচটি বিষয়ে আপনার প্রেরিত দূতেরা আমাদের ইমান আনতে বলেছেন, পাঁচটি বিষয়ে আমল করার নির্দেশ দিয়েছেন এবং আরও পাঁচটি গুণ আমরা ইসলামপূর্ব যুগে অর্জন করেছি, এখনো সেগুলোর ওপর অটল আছি। আপনি যদি এগুলোর কোনোটি অপছন্দ করেন, তাহলে আমরা তা পরিত্যাগ করব।’
রাসুল (সা.) প্রথমে জানতে চাইলেন, ‘আমার প্রেরিত দূতেরা তোমাদের কোন কোন বিষয়ে ইমান আনতে বলেছেন?’ তাঁরা বললেন,১. আল্লাহর ওপর ইমান আনা।
মুমিনের বিশ্বাসের কেন্দ্রবিন্দু এক আল্লাহ। তাঁর সত্তা, ক্ষমতা, জ্ঞান ও কর্তৃত্বের প্রতি অবিচল আস্থা ইমানের প্রথম ভিত্তি।
২. ফেরেশতাদের ওপর ইমান আনা।
আল্লাহর নুরানি সৃষ্টি ফেরেশতারা তাঁর নির্দেশ পালন করেন। তাঁদের অস্তিত্ব ও তাঁদের প্রতি অর্পিত দায়িত্বে বিশ্বাস করা ইমানের অপরিহার্য অংশ।
৩. আল্লাহর কিতাবসমূহের ওপর ইমান আনা।
মানবজাতির হিদায়াতের জন্য আল্লাহ যুগে যুগে তাঁর নবীদের ওপর কিতাব ও ওহি নাজিল করেছেন। সেই আসমানি কিতাবসমূহের প্রতি বিশ্বাস রাখা আকিদার অবিচ্ছেদ্য অংশ।
৪. রাসুলদের ওপর ইমান আনা।
মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোয় আনার জন্য আল্লাহ যুগে যুগে অসংখ্য নবী-রাসুল পাঠিয়েছেন। তাঁদের সত্যতা স্বীকার করা এবং তাঁদের আনীত হিদায়াতকে সত্য বলে গ্রহণ করা ইমানের অপরিহার্য দাবি।৫. পুনরুত্থানের ওপর বিশ্বাস রাখা।
মানুষ মৃত্যুবরণ করবে। এরপর একদিন সবাইকে পুনরায় জীবিত করে আল্লাহর সামনে দাঁড় করানো হবে এবং দুনিয়ার প্রতিটি কাজের হিসাব নেওয়া হবে।
এরপর রাসুল (সা.) জানতে চাইলেন, ‘আমার প্রেরিত দূতেরা তোমাদের কী কী আমল করার নির্দেশ দিয়েছেন?’ তাঁরা উত্তর দিলেন,
৬. ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ পাঠ করা।
এই তাওহিদের ঘোষণা ইমানের ভিত্তি। এর মাধ্যমে ইমানদার ব্যক্তি সব মিথ্যা উপাস্য ও পরাধীনতা থেকে মুক্ত হয়ে এক আল্লাহর আনুগত্যে নিজেকে সমর্পণ করে।
৭. নামাজ কায়েম করা।
নামাজ আল্লাহর সঙ্গে মুমিনের সম্পর্ককে জীবন্ত রাখে। ইবাদতের পাশাপাশি এটি অন্তরকে পরিশুদ্ধ ও জীবনকে শৃঙ্খলিত করার অন্যতম প্রধান মাধ্যম।
৮. জাকাত প্রদান করা।
সম্পদ আল্লাহর দেওয়া আমানত। তার নির্ধারিত অংশ হকদারদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যমে মুমিন নিজের সম্পদকে পবিত্র করে এবং সমাজের অসহায় মানুষের প্রতি তার দায়িত্ব পালন করে।
৯. রমজানের রোজা রাখা।
রোজা মানুষকে প্রবৃত্তির ওপর নিয়ন্ত্রণ শেখায়। ক্ষুধা ও তৃষ্ণার মধ্য দিয়ে আত্মসংযম, তাকওয়া ও আল্লাহভীতির যে শিক্ষা অর্জিত হয়, তা মুমিনের চরিত্রে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে।
১০. সামর্থ্য থাকলে হজ করা।
আর্থিক ও শারীরিক সক্ষমতা অর্জিত হলে আল্লাহর ঘরের হজ করা ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিধান। এতে মুমিন আল্লাহর আনুগত্য, ত্যাগ, ঐক্য ও আত্মসমর্পণের অনন্য শিক্ষা লাভ করে।এরপর রাসুল (সা.) জানতে চাইলেন, ‘ইসলামপূর্ব যুগে তোমরা কোন কোন গুণ অর্জন করেছিলে?’ তাঁরা বললেন,
১১. স্বাচ্ছন্দ্যে আল্লাহর শোকর আদায় করা।
সুখ-সমৃদ্ধি মানুষের জন্য যেমন পরীক্ষা, তেমনি বিপদও পরীক্ষা। প্রকৃত মুমিন প্রাচুর্যে আত্মভোলা হয় না। নিজের প্রাপ্তিকে আল্লাহর অনুগ্রহ হিসেবে দেখে কৃতজ্ঞতায় মাথা নত করে।
১২. বিপদের সময় ধৈর্য ধারণ করা।
জীবনের পথ সব সময় মসৃণ থাকে না। দুঃখ, ক্ষতি ও সংকটের মুহূর্তে নিজেকে সামলে রাখা এবং আল্লাহর ওপর আস্থা অটুট রাখা মুমিনের অন্যতম সৌন্দর্য।
১৩. সম্মুখযুদ্ধে অঙ্গীকার রক্ষা করা।
ভয় কিংবা বিপদের মুখেও প্রতিশ্রুতি থেকে সরে না যাওয়া চারিত্রিক দৃঢ়তার পরিচয়। মুমিনের কাছে অঙ্গীকার তার নৈতিক দায়বদ্ধতার অংশ।
১৪. আল্লাহর সব ফয়সালায় সন্তুষ্ট থাকা।
আল্লাহ যা নির্ধারণ করেন, তার পেছনে তাঁর প্রজ্ঞা রয়েছে। এই বিশ্বাস মুমিনের অন্তরে প্রশান্তি সৃষ্টি করে। নিজের ইচ্ছা পূরণ না হলেও সে আল্লাহর সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কোনো কাজ করে না।
১৫. বিপদের সময় শত্রুর বিদ্রূপ সহ্য করা।
প্রতিকূলতার সময় মানুষ যখন বিদ্রূপ ও কটূক্তির শিকার হয়, তখন উত্তেজিত হয়ে প্রতিক্রিয়া দেখানো সহজ। কিন্তু অপমানের জবাবে নিজেকে সংযত রাখা এবং ধৈর্যের পরিচয় দেওয়া উন্নত চরিত্রের লক্ষণ।
এই গুণগুলোর কথা শুনে নবীজি তাঁদের প্রজ্ঞা ও বিচক্ষণতার প্রশংসা করলেন। তিনি বললেন, ‘তোমরা জ্ঞানী ও প্রজ্ঞাবান। তোমাদের বোধবুদ্ধি প্রায় নবীদের কাছাকাছি।’
এরপর নবীজি (সা.) বললেন, ‘তোমরা যদি ইমানের দাবিতে সত্যবাদী হও, তাহলে আমি তোমাদের জন্য আরও পাঁচটি গুণ বাড়িয়ে দিচ্ছি।’
এভাবে ইমানের বৈশিষ্ট্য পূর্ণ হলো ২০টিতে। সেই পাঁচটি গুণ হলো,
১৬. এমন সম্পদ সঞ্চয় না করা, যা নিজে ভোগ করা হবে না।
সম্পদ কেবল প্রয়োজন মেটানোর উপায়, জীবনের একমাত্র লক্ষ্য নয়। প্রয়োজনের সীমা অতিক্রম করে শুধু জমিয়ে রাখার নেশা মানুষকে দুনিয়ার মোহে বন্দী করে ফেলে। তাই মুমিন সম্পদের মালিক হলেও তার দাস হয় না।
১৭. এমন ঘর নির্মাণ না করা, যেখানে বসবাস করার সুযোগ হবে না।
মানুষের জীবন ক্ষণস্থায়ী, অথচ অনেক সময় সে এমন ভবিষ্যতের জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়ে, যার সাক্ষাৎ তার ভাগ্যে নাও জুটতে পারে। মুমিন তাই দুনিয়ার সৌন্দর্য উপভোগ করলেও জীবনের চূড়ান্ত গন্তব্যকে ভুলে যায় না।
১৮. এমন বিষয় নিয়ে বিবাদে না জড়ানো, যা আগামীকাল ছেড়ে যেতে হবে।
দুনিয়ার অসংখ্য বিষয় নিয়ে মানুষ রাগ, বিরোধ ও শত্রুতায় জড়িয়ে পড়ে। অথচ যার জন্য আজ এত উত্তেজনা, মৃত্যুর মুহূর্তে তার কিছুই সঙ্গে যাবে না। বিচক্ষণ মুমিন তাই ক্ষণস্থায়ী বিষয়কে কেন্দ্র করে নিজের শান্তি ও সম্পর্ক নষ্ট করে না।
১৯. সেই আল্লাহকে ভয় করা, যাঁর কাছে ফিরে যেতে হবে।
তাকওয়া মুমিনের অন্তরের প্রহরী। মানুষ যখন একাকী থাকে, যখন তাকে দেখার মতো কেউ থাকে না, তখনো ‘আল্লাহ দেখছেন’ এই অনুভূতিই তাকে গোপন ও প্রকাশ্য উভয় পাপ থেকে দূরে রাখে।
২০. সেই চিরস্থায়ী জীবনের প্রতি আকাঙ্ক্ষী হওয়া, যেখানে অনন্তকাল অবস্থান করতে হবে।
দুনিয়া মুমিনের চূড়ান্ত ঠিকানা নয়। তার আসল আকাঙ্ক্ষা এমন জীবন, যেখানে মৃত্যু, বিচ্ছেদ, দুঃখ-কষ্ট, বিপদ-আপদ এবং কোনো ধরনের অপূর্ণতা নেই। (আবু নুআইম ইস্পাহানি, হিলয়াতুল আউলিয়া ওয়া তবকাতিল আসফিয়া, ৯/২৭৯, দারুল ফিকর, বৈরুত, ১৪১৬ হিজরি)
নাহিদা সুলতানা: আলেমা ও প্রাবন্ধিক
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন