যে কাজে বিনষ্ট হয় উপকারের সওয়াব

 ইসলাম মানুষের প্রতি সহযোগিতা ও উপকারকে অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ গুণ হিসেবে দেখে। একে অপরের সুখে আনন্দিত হওয়া, দুঃখে পাশে দাঁড়ানো এবং প্রয়োজনে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়া উত্তম মানবিকতার অংশ।

তবে এমন কিছু আচরণ আছে, যা এসব উপকারের সৌন্দর্য নষ্ট করে, এমনকি আমলের সওয়াবও বিনষ্ট করে দিতে পারে। এর অন্যতম হলো উপকারের কথা স্মরণ করিয়ে খোঁটা দেওয়া।

দান করে খোঁটা দেওয়ার দৃষ্টান্ত

উপকার করার প্রকৃত উদ্দেশ্য হওয়া উচিত আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন। এখানে মানুষের প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতা অর্জন কিংবা নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশের আকাঙ্ক্ষা ঢুকে পড়লে আমলের সৌন্দর্য নষ্ট হয়ে যায়।

আল্লাহ-তাআলা মুমিনদের সতর্ক করে বলেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা তোমাদের দান-সদকা নষ্ট করো না খোঁটা ও কষ্টদানের মাধ্যমে।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ২৬৪)

দান করে খোঁটা দেওয়া কিংবা লোকদেখানো দানের দৃষ্টান্ত এমন মসৃণ পাথরের মতো, যার ওপর সামান্য মাটি জমে আছে। দূর থেকে মনে হয়, সেখানে ফসল ফলবে। কিন্তু প্রবল বৃষ্টি নামলেই মাটির আস্তরণ ধুয়ে যায়, উন্মোচিত হয় পাথরের কঠিন ও অনুর্বর রূপ। সেখানে আর কোনো বীজ অঙ্কুরিত হয় না, কোনো ফসলও ফলে না। তেমনি খোঁটা ও লোকদেখানোর কারণে দান বাহ্যিকভাবে চাকচিক্য পূর্ণ মনে হলেও তাতে আল্লাহর সন্তুষ্টি থাকে না বলে তার সওয়াবও বিনষ্ট হয়ে যায়। (ড. মুহাম্মদ সাইয়্যিদ তানতাবি, আত-তাফসির আল-ওয়াসিত লিল-কুরআনিল কারিম, ১/৬০৮, দারুল মাআরিফ, কায়রো, ১৯৯২)উপকারের পর খোঁটা কেন এত ক্ষতিকর

প্রয়োজনের সময় অন্যের সহযোগিতা গ্রহণ করতে অনেকের ভেতরেই একধরনের সংকোচ ও অস্বস্তি কাজ করে। এমন অবস্থায় উপকারকারী ব্যক্তি যদি বারবার সেই সাহায্যের কথা স্মরণ করিয়ে খোঁটা দেন, তাহলে তা উপকারগ্রহীতার মনে লজ্জা, অপমান ও কষ্টের জন্ম দিতে পারে।

খোঁটা মানুষের পারস্পরিক সম্পর্কেও ফাটল ধরায়। এতে আত্মীয়তার বন্ধন দুর্বল এবং সামাজিক সৌহার্দ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মানুষ তখন এই আশঙ্কায় সহযোগিতা গ্রহণ করতেও ভয় পায় যে আজকের সাহায্য গ্রহণ হয়তো আগামী দিনের অপমানের অস্ত্র হয়ে দাঁড়াবে। (ড. মুহাম্মদ সাইয়্যিদ তানতাবি, আত-তাফসির আল-ওয়াসিত লিল-কুরআনিল কারিম, ১/৬০৯, দারুল মাআরিফ, কায়রো, ১৯৯২)

খোঁটা দেওয়া গুরুতর পাপ

ইসলামে দান ও উপকারের গুরুত্ব যেমন অনেক, তেমনি এরপর খোঁটা দেওয়ার ব্যাপারেও কঠোর সতর্কতা এসেছে। রাসুল (সা.) বলেন, ‘তিন ব্যক্তির সঙ্গে আল্লাহ কেয়ামতের দিন কথা বলবেন না, তাঁদের দিকে তাকাবেন না এবং তাঁদের পবিত্রও করবেন না, তাঁদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।’

সাহাবিরা জিজ্ঞেস করলেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল! তাঁরা কারা?’ তিনি বললেন, ‘(তাঁদের একজন হলো) যে দান করার পর খোঁটা দেয়।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১০৬)

অর্থাৎ যে দান আল্লাহর কাছে নৈকট্য অর্জনের মাধ্যম হতে পারত, খোঁটা দেওয়ার কারণে সেটিই মানুষের জন্য শাস্তির কারণ হয়ে যেতে পারে।

উপকার করে ভুলে যাওয়াই উত্তম

মানুষের উপকার করার ক্ষেত্রে মুমিনের মানসিকতা এমন হবে যে আমি যা দিয়েছি, এর প্রকৃত মালিক তো আল্লাহ, এর প্রতিদানও আমি আল্লাহর কাছেই প্রত্যাশা করি। মানুষ মনে রাখল কি না, কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করল কি না কিংবা বিনিময়ে কিছু দিল কি না, এসব নিয়ে অস্থির হওয়ার প্রয়োজন নেই।

বরং কারও উপকার করার পর সেটিকে ভুলে যাওয়ার অভ্যাস গড়ে তোলা উচিত। এমনকি সম্ভব হলে নিজের উপকারের কথা অন্যের কাছে না বলাই উত্তম। কারণ, মানুষকে সাহায্য করে তার আত্মমর্যাদা রক্ষা করা উপকারেরই অংশ। কাউকে এক হাতে সাহায্য করে অন্য হাতে যদি তাঁর সম্মান কেড়ে নেওয়া হয়, তাহলে সেই সাহায্যের প্রকৃত সৌন্দর্য আর অবশিষ্ট থাকে না।

উপকার হোক ভালোবাসার

সমাজে পারস্পরিক সহযোগিতা টিকে থাকে ভালোবাসা ও সম্মানের ওপর। মানুষ বিপদের সময় মানুষের কাছেই আশ্রয় খুঁজে পাবে, এটাই একটি সুস্থ সমাজের বৈশিষ্ট্য। তাই আমাদের উপকার এমন হওয়া উচিত, যা মানুষের হৃদয়ে নিরাপত্তা ও ভালোবাসা তৈরি করবে।

আমরা যদি সত্যিই আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনা করি, তাহলে কাউকে সাহায্য করার পর সেই সাহায্যের কথা বারবার স্মরণ করিয়ে দেওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে।

  • ফয়জুল্লাহ রিয়াদ: মুহাদ্দিস, জামিয়া আরাবিয়া দারুস সুন্নাহ রাজাবাড়ী, ঢাকা

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

ড. খন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর বই Pdf Download

নেক আমলে অবিচল রাখবে যে ১০ আয়াত

কে ছিলেন ইমাম আল-মাওয়ার্দি