শয়তানের সবচেয়ে বড় লক্ষ্য

 শয়তানের সবচেয়ে বড় লক্ষ্য—আপনার সংবেদনশীলতা নষ্ট করে দেয়া

শয়তানকে নিয়ে আমাদের একটা ভুল ধারণা আছে। আমরা ভাবি, সে বুঝি হঠাৎ ঝাঁপিয়ে পড়ে। একদিন সকালে এসে আপনাকে দিয়ে বিরাট কোনো পাপ করিয়ে ফেলবে। কিন্তু কুরআন তার কর্মপদ্ধতির যে ছবি আঁকে, তা এর ঠিক উল্টো। তার আসল শক্তি তাড়াহুড়োয় নয়। তার আসল শক্তি অপেক্ষায়। সূরা আ'রাফে আদম ও হাওয়া (আ)-এর ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে আল্লাহ একটি অসাধারণ শব্দ ব্যবহার করেছেন: فَدَلَّاهُمَا بِغُرُورٍ "সে প্রতারণার মাধ্যমে তাদের ধীরে ধীরে পদস্খলিত করল।" (সূরা আ'রাফ, ৭:২২) "দাল্লাহুমা।" আরবি 'দাল্লা' শব্দটি এসেছে 'দালউ' থেকে, যার অর্থ বালতি। আগের যুগে কুয়া থেকে পানি তোলা হতো দড়ি বাঁধা বালতি দিয়ে। বালতি কুয়ায় ফেলে টেনে টেনে তোলা—এর নাম 'আদলা দালওয়াহু'। এখন ভাবুন, বালতিটা কি এক টানে উঠে আসে? না। ধীরে ধীরে ওঠে। আর সেই প্রক্রিয়া যখন মাত্রাতিরিক্ত ধীর হয়, অস্বাভাবিক লম্বা সময় নেয়—তখন আরবিতে বলা হয় 'দাল্লা'। আল্লাহ শয়তানের কাজ বোঝাতে ঠিক এই শব্দটিই বেছে নিলেন। কেন? কারণ শয়তান আপনাকে পথভ্রষ্ট করতে চায়, কিন্তু সে জানে এক ধাক্কায় তা সম্ভব নয়। সে আপনার কাছে আসে, আপনি বলেন, "আউজুবিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজিম।" সে তখন বলে, "আচ্ছা, ঠিক আছে। আমি একটু পর আবার আসব। চিন্তা করো না। আমাদের হাতে সময় আছে।" আমাদের হাতে সময় আছে। সে আবার আসে। আবার আসে। আবার আসে। সে আপনার উপর প্রতিবার মাত্র এক পারসেন্ট করে কাজ করে। একই সূরায় আল্লাহ বলেন: فَوَسْوَسَ لَهُمَا الشَّيْطَانُ "শয়তান তাদের কুমন্ত্রণা দিল।" (সূরা আ'রাফ, ৭:২০) 'ওয়াসওয়াসা' মানে—সে কাছে আসে, ফিসফিস করে, তারপর সরে যায়। আবার আসে, আবার ফিসফিস করে, আবার সরে যায়। একই বার্তা বারবার, যতক্ষণ না আপনি তা গ্রহণ করেন। প্রোপাগান্ডা ঠিক এভাবেই কাজ করে। ভেবে দেখুন, একই বিজ্ঞাপন কেন বারবার দেখানো হয়? কোকের বিজ্ঞাপন দশ-পনেরো বার দেখার পর হঠাৎ ইফতারিতে আপনার কোকের কথা মনে পড়ে। ভাবেন, "এই চিন্তা মাথায় এলো কোত্থেকে?" আসেনি। ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে। মনোবিজ্ঞানে একটি পরীক্ষার কথা বলা হয়—স্লো বয়েল। একটি ব্যাঙকে ফুটন্ত পানিতে ছাড়লে সে সাথে সাথে লাফ দিয়ে বেরিয়ে যায়। কিন্তু তাকে স্বাভাবিক পানিতে রেখে পাত্রের নিচে ধীরে ধীরে তাপ দিতে থাকলে? তাপ বাড়তে বাড়তে একসময় তীব্র আকার ধারণ করে, কিন্তু ব্যাঙটা আর লাফ দেয় না। সেখানেই তার মৃত্যু হয়। সে বুঝতেই পারে না যে পানি গরম হচ্ছিল। শয়তান আপনাকে দিয়ে প্রথম দিনেই হারাম করাতে চায় না। কারণ সে জানে, তখন আপনি বুঝে ফেলবেন এটা ভুল, আর আল্লাহর আশ্রয় চাইবেন। তাই সে আসে নির্দোষ সব বিষয় নিয়ে। আপনি ভাবেন, "এতে আর কী সমস্যা? মানুষ এটাকে শুধু শুধু খারাপ মনে করে।" এরপর সে সামান্য একটু পদস্খলন ঘটায়। আশেপাশের মানুষ বলে, "এটা করো না।" আর আপনি মুখ ঘুরিয়ে বলেন, "এটা কি হারাম? আমি কি কাউকে খুন করেছি? আপনারা এটাকে এত বড় ব্যাপার মনে করছেন কেন?" যেদিন এই কথাটা মুখ দিয়ে বের হয়, বুঝবেন—বালতি অনেকখানি নেমে গেছে। আয়াতে আরেকটি শব্দ আছে: 'গুরুর'। আরবিতে এর অর্থ প্রতারণা, আবার এর দ্বারা অহংকারও বোঝায়। শয়তান মানুষের অহমিকা জাগিয়ে দেয়। মানুষ যখন ছোটখাটো ভুল করে, আর কেউ তা ধরিয়ে দেয়—স্বামী হোক বা স্ত্রী, বাবা হোক বা মা—সে সাথে সাথে 'মাগরুর' হয়ে ওঠে, রেগে ওঠে: "তুমি কে আমার ভুল ধরার?" এভাবে ইগো তার ভালো হওয়ার পথটাই বন্ধ করে দেয়। যে রোগ শয়তানের নিজের ছিল—অহংকারের রোগ—সে সেই রোগই মানুষের ভেতর ঢুকিয়ে দিতে চায়। কারণ যার কাছে সংশোধনের দরজা বন্ধ, তার কাছে ফিসফিসানির দরজা খোলা। আর ভাববেন না আদম ও হাওয়া (আ) এক কুমন্ত্রণাতেই রাজি হয়ে গিয়েছিলেন। আয়াত পড়ে মনে হতে পারে, শয়তান বলল আর তাঁরা সাথে সাথে গাছের দিকে হাঁটা দিলেন। না। শয়তানের অনেক লম্বা সময় লেগেছিল। বহু চেষ্টার পর সে সফল হয়েছিল। স্বয়ং আমাদের আদি পিতামাতার সাথেই যদি তাকে এত ধৈর্য ধরতে হয়, আমাদের সাথে সে কত ধৈর্য নিয়ে কাজ করছে—ভাবতে পারেন? আর এই ধীর প্রক্রিয়ার শেষ পরিণতি কী? আল্লাহ বলেন: بَدَتْ لَهُمَا سَوْآتُهُمَا "তাদের লজ্জাস্থান তাদের নিকট প্রকাশিত হয়ে পড়ল।" (সূরা আ'রাফ, ৭:২২) এখানেই কুরআনের গভীর একটি শিক্ষা। মানুষ যখন হারামের পথ ধরে—হোক তা হারাম খাদ্য, হারাম উপার্জন, হারাম সম্পর্ক—তখন ধীরে ধীরে, কিন্তু নিশ্চিতভাবে, সে তার লজ্জাশীলতা হারিয়ে ফেলে। নির্লজ্জ কিছুর দিকে তাকাতে আর সংকোচ আসে না। চোখ নিচু রাখতে কষ্ট হয়। জিহ্বা দিয়ে এমন শব্দ বের হয় যার উপর নিজেরই নিয়ন্ত্রণ থাকে না। যে হায়া আল্লাহ প্রতিটি মানুষের সহজাত প্রকৃতিতে গেঁথে দিয়েছেন—দুই-তিন বছরের শিশুও যে লজ্জায় কম্বলের নিচে লুকিয়ে পড়ে—সেই হায়া চুরমার হয়ে যায়। প্রথমে যা দেখে আঁতকে উঠতেন, পরে তা স্বাভাবিক লাগে। তারও পরে, সুন্দর লাগে। এটাই শয়তানের সবচেয়ে বড় সাফল্য: আপনাকে বড় পাপে ফেলা নয়, আপনার সংবেদনশীলতাটাই মেরে ফেলা। কারণ যার অনুভূতিই মরে গেছে, তাকে আর টেনে নামাতে হয় না। সে নিজেই নামে। তাই মনে রাখুন: শয়তান বালতির মতো টানে—এক টানে নয়, একটু একটু করে। সে ফুটন্ত পানিতে ফেলে না, ঠান্ডা পানিতে বসিয়ে আঁচ বাড়ায়। সে প্রথম দিনেই হারাম দেখায় না, প্রথমে "এতে আর কী সমস্যা" শেখায়। আর তার সবচেয়ে বড় জয় সেদিন, যেদিন আপনার ভুল ধরিয়ে দিলে আপনি বলেন, "তুমি কে আমার ভুল ধরার?" আজ যদি জীবনের কোথাও টের পান পানি একটু একটু গরম হচ্ছে—লাফ দেওয়ার সময় এখনই। ব্যাঙটার মতো অপেক্ষা করবেন না। সংবেদনশীলতা নষ্ট হয়ে গেলে জ্ঞানও তখন কাজ করে না। আপনি জাস্ট চিন্তা ভাবনা ছাড়াই হারামে জড়িয়ে পড়বেন। কারণ আপনার ভেতরের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে গেছে। (দেখুন আপনাকে হতাশ করে দেয়া এই পোষ্টের উদ্দেশ্য নয়। কুরআনে আল্লাহ কোন পাপের এবং তার ভয়ঙ্কর পরিণতির কথা উল্লেখ করার পর সাথে সাথেই বলেছেন—কিন্তু যারা তাওবা করে নিজেদের সংশোধন করে নেয় তারা ছাড়া। কুরআনে এই চিত্রটি বারবার দেখা যায়। অর্থাৎ আপনার পক্ষে এখনো ভালো হওয়া সম্ভব। নতুন করে সংবেদনশীলতার দেয়াল নির্মাণ করা সম্ভব।) হে আল্লাহ, শয়তানের ধীর ফাঁদগুলো চেনার দৃষ্টি আমাদের দান করুন। যে পথে এক পা এগিয়ে গেছি, সে পথ থেকে ফিরে আসার শক্তি দিন। আর আমাদের অন্তরের সেই হায়াটুকু রক্ষা করুন, যা আপনি নিজ হাতে আমাদের ভেতর স্থাপন করেছেন। আমীন। —নোমান আলী খানের আলোচনা অবলম্বনে

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

ড. খন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর বই Pdf Download

নেক আমলে অবিচল রাখবে যে ১০ আয়াত

কে ছিলেন ইমাম আল-মাওয়ার্দি