অসুস্থতার নিয়ামত ও প্রজ্ঞা
অসুস্থতার নিয়ামত ও প্রজ্ঞা
শাইখ ইয়াসির কাদির জুমার খুতবা থেকে সবকিছুই আল্লাহর তাকদীর অনুযায়ী ঘটে। তাকদীরের কিছু অংশ আমাদের আনন্দিত করে, কিছু অংশ ব্যথিত করে। রসুল (স) বলেছেন, "আমরা কদরে বিশ্বাস করি—এর ভালো ও মন্দে, এর মিষ্টতা ও তিক্ততায়।" আর তাকদীরের কঠিনতম দিকগুলোর একটি হলো রোগ-ব্যাধি। ধনী-দরিদ্র, তরুণ-বৃদ্ধ, নারী-পুরুষ—অসুস্থতা থেকে কেউই নিরাপদ নয়। কেউ অসুস্থ হয় সাময়িকভাবে, কারো রোগ চলে বছরের পর বছর, আবার কেউ পরীক্ষিত হয় মরণঘাতী ব্যাধি দিয়ে। কিন্তু কুরআন বলছে, "হতে পারে তোমরা কোনো কিছু অপছন্দ করো, অথচ তা-ই তোমাদের জন্য উত্তম।" একজন ইমানদার দুনিয়াকে এই দৃষ্টিতেই দেখে। এর মূলে রয়েছে আল্লাহর প্রতি হুসনুয যন—আল্লাহ সম্পর্কে সর্বোত্তম ধারণা পোষণ করা। সুখের দিনে এই সুধারণা সহজ। কিন্তু ইমানের আসল পরীক্ষা হয় তখন, যখন আমি নিজে অসুস্থ, কিংবা আমার সন্তান অসুস্থ। তখনই প্রশ্ন জাগে—সত্যিই কি আমি তাকদীরে বিশ্বাস করি? এই খুতবায় শাইখ তুলে ধরেছেন অসুস্থতার পাঁচটি নিয়ামত। ১. গুনাহ মোচন রসুল (স) অসুস্থ উম্মে সায়িবকে দেখতে গিয়ে শুনলেন, তিনি জ্বরকে অভিশাপ দিচ্ছেন। রসুল (স) বললেন, "জ্বরকে অভিশাপ দিয়ো না। এটি গুনাহ মোচন করে, যেভাবে আগুনের চুল্লি লোহাকে পরিশুদ্ধ করে।" চুল্লিতে কেউ থাকতে চায় না, কিন্তু ২৪ ক্যারেটের খাঁটি সোনা পেতে হলে চুল্লির মধ্য দিয়েই যেতে হয়। আরেক হাদিসে রসুল (স) এক রোগীকে বললেন, "তোমার জন্য সুসংবাদ—এই জ্বর দুনিয়ার জাহান্নাম, যেন আখিরাতের জাহান্নামের মুখোমুখি হতে না হয়।" ২. জীবন নিয়ে নতুন করে ভাবার অবকাশ সালমান আল-ফারেসি (রা) বলেছেন, ইমানদারের অসুস্থতায় আল্লাহর দুটি উদ্দেশ্য থাকে—পাপ মোচন, আর আত্মসমালোচনার মাধ্যমে আরো উত্তম মানুষ হওয়া। সুস্থ থাকলে দুনিয়ার চাকচিক্যে আমরা কিছুটা উদ্ধত হয়ে উঠি। একটা অসুখ আসে, আর আমরা বিছানায় পড়ে বিনয়াবনত হয়ে যাই। উপলব্ধি করি—আমরা মরণশীল। লক্ষ করি পরিবারের ভালোবাসা, বন্ধুদের বন্ধুত্ব। অসুস্থতা যেন ইমানের চার্জিং স্টেশন—শেষ সময় আসার আগেই নিজেকে শুধরে নেয়ার সুযোগ। ৩. সুস্থতার কদর রসুল (স) বলেছেন, দুটি নিয়ামতের ব্যাপারে অধিকাংশ মানুষ দেউলিয়া—সুস্বাস্থ্য ও অবসর সময়। কখন আমরা মন থেকে বলি, "আলহামদুলিল্লাহ, আমি পুরোপুরি সুস্থ"? জ্বর সেরে যাওয়ার পরের দিন। অসুস্থতা অন্তরকে কোমল করে। সামান্য মাথাব্যথায় ভুগে আমরা বুঝি, কেউ কেউ প্রতিদিন মাইগ্রেনের সাথে লড়ে। একটা এমআরআই করিয়ে বুঝি, কাউকে প্রতি মাসে এমআরআই করাতে হয়। ৪. জান্নাতের সুউচ্চ মর্যাদা আবু দাউদের হাদিসে রসুল (স) বলেছেন, কখনো কোনো বান্দার জন্য জান্নাতে এমন মানযিল নির্ধারিত থাকে, যা তার আমল দিয়ে সে অর্জন করতে পারে না। তাই আল্লাহ তাকে পরীক্ষা করেন তার দেহ, সম্পদ বা সন্তান দিয়ে—যতক্ষণ না সবরের বদৌলতে সে সেই মর্যাদায় পৌঁছে যায়। শাইখ বলেন, এই হাদিসটি মুখস্থ রাখুন। পরের বার যখন অসুস্থ হবেন, এটি স্মরণ করবেন। ৫. সবরের ময়দান আল্লাহ সাবিরিনদের ভালোবাসেন, তাদের প্রতিদান দেন বিনা হিসাবে। কিন্তু বই পড়ে সবর শেখা যায় না, খুতবা শুনেও না। সবর শেখা যায় কেবল সংকটের মুহূর্তে। সুতরাং পরের বার যখন পরীক্ষার সম্মুখীন হবেন, বুঝে নেবেন—আপনি অর্জন করছেন সবরের পদক। এ প্রসঙ্গে শাইখ স্মরণ করেছেন উরওয়া ইবনে যুবাইরের ঘটনা। গ্যাংগ্রিনে আক্রান্ত পা কেটে ফেলা হলো—অ্যানেসথেসিয়া ছাড়াই। পুরোটা সময় তিনি যিকিরে মগ্ন। সেই সন্ধ্যায়ই ছাদ ধসে তাঁর এক সন্তান মারা গেল। তিনি বললেন, "আলহামদুলিল্লাহ, ইয়া রব। আপনি সাতটি সন্তান দিয়েছিলেন, একটি নিলেন, ছয়টি রেখে দিলেন। দুটি পা দিয়েছিলেন, একটি নিলেন, একটি রেখে দিলেন।" আরো একটি নিয়ামত—অসুস্থতা খুলে দেয় দোয়ার দরজা। নিজেকে জিজ্ঞেস করুন, শেষ কবে হৃদয়ের গভীর থেকে দোয়া করেছিলেন? সম্ভবত তখন, যখন আপনি বা আপনার সন্তান ভয়ে বা যন্ত্রণায় ছিল। তবে অসুস্থতা আমরা কামনা করি না এক ব্যক্তি দোয়া করেছিল—আখিরাতের সব শাস্তি যেন দুনিয়াতেই দিয়ে দেয়া হয়। ফলে সে ভয়াবহ যন্ত্রণায় পড়ল। রসুল (স) বললেন, "তা সইবার সাধ্য তোমার নেই। বরং আল্লাহর কাছে মু'আফাহ চাও।" চাচা আব্বাস (রা)-কে তিনি বললেন, "'আফিয়াহর চেয়ে উত্তম কিছু আপনার জন্য নেই।" ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি বাস্তবসম্মত—বিপদ চেয়ে নেবেন না, কিন্তু বিপদ এলে গ্রহণ করবেন সবর, ইমান ও হুসনুয যনের সাথে। একই সাথে চিকিৎসাও নেবেন। রসুল (স) বলেছেন, "হে আল্লাহর বান্দারা, চিকিৎসা গ্রহণ করো—আল্লাহ এমন কোনো রোগ নাযিল করেননি, যার আরোগ্য তিনি নাযিল করেননি।" মৃত্যুর রোগ ছাড়া প্রতিটি রোগেরই আরোগ্য আছে। অসুস্থকে দেখতে যাওয়া এক মুসলিমের উপর আরেক মুসলিমের ছয়টি হকের একটি—অসুস্থ হলে দেখতে যাওয়া। অসুস্থ মানুষ নিঃসঙ্গ ও বিমর্ষ বোধ করে। কিয়ামতের দিন আল্লাহ বলবেন, "হে আমার বান্দা, আমি অসুস্থ ছিলাম, তুমি দেখতে আসোনি।" বান্দা বলবে, "আপনি অসুস্থ হবেন কী করে?" আল্লাহ বলবেন, "আমার বান্দা অসুস্থ ছিল, তাকে দেখতে গেলে আমাকে তার পাশেই পেতে।" শেষ কথা অসুস্থতায় কখনো মৃত্যুর চিন্তা আসে। কিন্তু রসুল (স) বলেছেন, মৃত্যু কামনা কোরো না, কারণ মুমিনের জীবন সর্বদাই কল্যাণকর। আর তিনি বলেছেন, "যে সকালে নিজের ঘরে নিরাপদে জেগে ওঠে, যার শরীর সুস্থ, আর যার কাছে সেদিনের আহার আছে—তাকে যেন সমগ্র পৃথিবীর নিয়ামত রুপার থালায় সাজিয়ে দেয়া হয়েছে।" তিনটি সাধারণ নিয়ামত—আমাদের প্রায় সবারই আছে। আল্লাহ আমাদের সবাইকে 'আফিয়াহ দান করুন।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন