‘আধ্যাত্মিক চুরি’ কেন বুদ্ধিবৃত্তিক চুরির চেয়েও ভয়াবহ
আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা ও জ্ঞানতত্ত্বের জগতে ‘প্লেজিয়ারিজম’ বা চৌর্যবৃত্তিকে অত্যন্ত ঘৃণ্য ও ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়। বহু দেশে এটি আইন অনুযায়ী কারাদণ্ডযোগ্য ফৌজদারি অপরাধ।
কারণ এটি অন্যের মেধা ও মেহনতের সরাসরি আত্মসাৎ। কিন্তু পার্থিব এই বুদ্ধিবৃত্তিক চুরির চেয়েও কোটি গুণ বেশি ভয়াবহ, সর্বগ্রাসী ও ধ্বংসাত্মক আরেকটি অপরাধ রয়েছে—যাকে বলা যায় ‘আধ্যাত্মিক চৌর্যবৃত্তি’।
সমগ্র মহাবিশ্বের উপাদান, প্রাকৃতিক নিয়ম, মানুষের অস্তিত্ব, মস্তিষ্ক ও প্রতিভার যাবতীয় কাঁচামাল পরম স্রষ্টার অবারিত দান হওয়া সত্ত্বেও মানুষ যখন অহংকারের সঙ্গে এই নেয়ামতকে নিজের নিরঙ্কুশ একক কৃতিত্ব বলে প্রচার করে এবং স্রষ্টার অস্তিত্ব ও অবদানকে সমূলে অস্বীকার করে, তখনই ঘটে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় মহাজাগতিক ডাকাতি।
আধুনিক বিশ্ব চিকিৎসাবিজ্ঞান, মহাকাশ অভিযান, জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অগ্রগতি দেখে অনেকে সদম্ভে ঘোষণা করছে, ‘মানুষ আজ প্রকৃতিকে জয় করেছে, এখানে স্রষ্টার আর কোনো ভূমিকা নেই!’
‘আধ্যাত্মিক চৌর্যবৃত্তি’ কী
আধ্যাত্মিক চৌর্যবৃত্তি হলো মহান আল্লাহর সৃষ্টি, অফুরন্ত অনুগ্রহ এবং তাঁর মহাজাগতিক নিদর্শনসমূহকে অবাধে ভোগ করা, কিন্তু সেই প্রক্রিয়ার কোনো স্তরেই সেই নেয়ামতের প্রকৃত উৎস, প্রকৃতি ও মহৎ উদ্দেশ্যকে স্বীকার না করা।
আরও মারাত্মক বিষয় হলো, মানুষ যখন আল্লাহর পূর্বে সৃষ্টি করে রাখা কাঁচামাল ও বুদ্ধিমত্তা কাজে লাগিয়ে আধুনিক সভ্যতা, শিল্প ও সংস্কৃতির সৌধ নির্মাণ করে, এবং পরে সেই প্রযুক্তিগত সৌধকে শুধু ‘মানুষের নিজস্ব তৈরি’ হিসেবে প্রদর্শনী করে ধর্মহীন ও খোদাবিমুখ স্বার্থে ব্যবহার করতে শুরু করে।
ইতিহাসের পাতায় এই আধ্যাত্মিক চৌর্যবৃত্তির দৃষ্টান্ত ছিল নবী মুসা (আ.)-এর সমসাময়িক ধনাঢ্য ব্যক্তি কারুন। অঢেল ধনভাণ্ডার ও বৈষয়িক সফলতার অহংকারে মত্ত হয়ে সে তার সমস্ত কৃতিত্ব নিজের ঝুলিতে পুরে বলেছিল, “আমি তো শুধু আমার নিজস্ব জ্ঞান ও বুদ্ধিমত্তার বলেই এই সম্পদ লাভ করেছি।” (সুরা কাসাস, আয়াত: ৭৮)বস্তুবাদী সমাজও যেন কারুনের সেই প্রাচীন অহংকারেরই ডিজিটাল রূপ। আধুনিক বিশ্ব চিকিৎসাবিজ্ঞান, মহাকাশ অভিযান, জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অগ্রগতি দেখে অনেকে সদম্ভে ঘোষণা করছে, ‘মানুষ আজ প্রকৃতিকে জয় করেছে, এখানে স্রষ্টার আর কোনো ভূমিকা নেই!’
স্রষ্টার দেওয়া উপাদান ও মস্তিষ্ক ব্যবহার করে গবেষণার চূড়ান্ত ফলাফল থেকে স্বয়ং স্রষ্টাকেই ব্র্যাকেটবন্দি করে দেওয়া—এর চেয়ে বড় চৌর্যবৃত্তি বিশ্বচরাচরে আর কী হতে পারে?
শূন্য থেকে সৃষ্টি বনাম মানুষের পুনঃপ্রক্রিয়াকরণ
ইসলামি আকিদা ও জ্ঞানতত্ত্বের মূলনীতি হলো, মহাবিশ্বের দৃশ্য ও অদৃশ্য জগতের প্রতিটি অণু-পরমাণু একমাত্র আল্লাহর সৃষ্টি এবং তাঁরই নিরঙ্কুশ মালিকানাধীন। মানুষ, তার নিঃশ্বাস, জীবনের উদ্দেশ্য এবং তার ভেতরের সুপ্ত মেধা—সবকিছুই আল্লাহর আমানত।
মানুষের সমস্ত বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, কারিগরি শিল্প ও বৈষয়িক উৎকর্ষ হলো, আল্লাহর পূর্বে সৃষ্টি করে রাখা পদার্থ, শক্তি, জৈব অণু এবং প্রাকৃতিক নিয়মগুলোকে জোড়াতালি দেওয়া, প্রক্রিয়াজাত করা, সংযোজন-বিয়োজন বা রূপান্তর করা মাত্র।
ইসলাম শেখায় যে প্রকৃত ‘সৃষ্টি’র ক্ষমতা শুধু মহান আল্লাহরই রয়েছে। কারণ তিনি হলেন ‘আল-বাদী’; যিনি কোনো প্রকার পূর্বনমুনা ও উপাদান ছাড়াই শূন্য বা অনস্তিত্ব থেকে অস্তিত্বে রূপ দেন।
কোরআনে তিনিঘোষণা করেন, “তিনিই আসমান ও জমিনের আদি উদ্ভাবক বা শূন্য থেকে রূপদানকারী (কোনো পূর্বনমুনা ছাড়াই সৃষ্টিকর্তা)।” (সুরা বাকারা, আয়াত: ১১৭)
বিপরীতে, মানুষ পৃথিবীতে আল্লাহর প্রতিনিধি (খলিফা) হওয়া সত্ত্বেও এবং তার অসাধারণ চিন্তাশক্তি থাকা সত্ত্বেও সে প্রকৃতপক্ষে নতুন কিছুই ‘সৃষ্টি’ করতে পারে না।
মানুষের সমস্ত বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, কারিগরি শিল্প ও বৈষয়িক উৎকর্ষ হলো, আল্লাহর পূর্বে সৃষ্টি করে রাখা পদার্থ, শক্তি, জৈব অণু এবং প্রাকৃতিক নিয়মগুলোকে জোড়াতালি দেওয়া, প্রক্রিয়াজাত করা, সংযোজন-বিয়োজন বা রূপান্তর করা মাত্র।
মানুষ জীবন সৃষ্টি করতে পারে না; সে শুধু পূর্ববিদ্যমান কোষের রূপ পরিবর্তন করতে পারে। মানুষের কোনো মৌলিক কল্পনাই আল্লাহর সৃষ্টিজগতের বাস্তবতার বাইরে যেতে পারে না। মানুষ যা কিছু ভাবে, তা এই সৃষ্টির কাঠামোর ভেতরেই আবর্তিত হয়।
মানুষ মূলত অভাবী ও ঋণগ্রস্ত এক উপভোক্তা। মানুষের কোনো অর্জনের ক্ষেত্রে ‘সৃষ্টি’ শব্দটি বড়জোর রূপক অর্থে প্রয়োগ করা চলে; বাস্তব সৃষ্টিজগতের একমাত্র একক মালিক ও আদি কারিগর হলেন আল্লাহ।
বুদ্ধিবৃত্তিক সততা ও কৃতজ্ঞতার সংস্কৃতি
জ্ঞানের প্রকৃত উদ্দেশ্য হলো স্রষ্টার মহত্ত্ব অনুধাবন করা এবং অন্তরে বিনয় জাগ্রত করা। একজন সৎ বিজ্ঞানী বা চিন্তাবিদ যখন পরমাণুর গভীরে প্রবেশ করেন কিংবা মানবদেহের ডিএনএর অবিশ্বাস্য স্থাপত্য উন্মোচন করেন, তখন তাঁর অন্তরে অহংকার নয়, বরং রবের প্রতি কৃতজ্ঞতার সিজদা আসার কথা।
যে ব্যক্তি মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞ নয়, সে আল্লাহর প্রতিও কৃতজ্ঞ হতে পারে না।
কোরআনে বলা হয়েছে, “আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে শুধু প্রকৃত জ্ঞানী ও আলেমরাই তাঁকে যথার্থভাবে ভয় ও শ্রদ্ধা করে।” (সুরা ফাতির, আয়াত: ২৮)
বুদ্ধিবৃত্তিক সততার চূড়ান্ত প্রকাশ ঘটে আধ্যাত্মিক কৃতজ্ঞতার মাধ্যমে। মানুষ যদি কোনো একাডেমিক গবেষণাপত্রে সহকর্মীর নাম কৃতজ্ঞতাস্বীকারে (অ্যাকনলেজমেন্ট) উল্লেখ না করলে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত হয়, তবে মহাজাগতিক গবেষণায় মহাবিশ্বের আদি রূপকারের ঋণ স্বীকার না করা এক চরম আত্মপ্রবঞ্চনা।
মুহাম্মদ (সা.) পারস্পরিক কৃতজ্ঞতার মূলনীতি শিখিয়ে বলেছেন, “যে ব্যক্তি মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞ নয়, সে আল্লাহর প্রতিও কৃতজ্ঞ হতে পারে না।” (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ১৯৫৫)
এই হাদিসের সারকথা হলো, স্বীকৃতি ও কৃতজ্ঞতাই হলো সুস্থ মানবীয় বিবেক ও নীতিশাস্ত্রের মূল বুনিয়াদ; আর তার সর্বোচ্চ বহিঃপ্রকাশ ঘটে পরম প্রতিপালকের অসীম সার্বভৌমত্বকে সানন্দে স্বীকার করে নেওয়ার মাধ্যমে।
পার্থিব জ্ঞানচর্চায় চৌর্যবৃত্তির দায়ে অভিযুক্তকে যেভাবে সভ্য সমাজ বয়কট করে, তেমনি প্রতিটি আধুনিক মানুষের উচিত নিজের বিবেকের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করা, আমরা কি প্রতিনিয়ত আল্লাহর নেয়ামত চুরি করে নিজেদের নামে চালিয়ে দেওয়ার স্পর্ধায় লিপ্ত হচ্ছি না?
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন