ক্যারিয়ার নির্বাচনে ইসলাম যেভাবে সাহায্য করে
উচ্চমাধ্যমিকের গণ্ডি পেরিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশের সন্ধিক্ষণটি প্রতিটি শিক্ষার্থীর জীবনের অন্যতম সংবেদনশীল বাঁক। এই মোড়ে এসে তরুণ মনস্তত্ত্ব তীব্র অনিশ্চয়তা ও সিদ্ধান্তহীনতায় পতিত হয়। সমাজে অল্প কিছু শিক্ষার্থী হয়তো শুরু থেকেই নিজেদের লক্ষ্য সম্পর্কে নিশ্চিত থাকে; কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠের চিত্রটি বিপরীত।
অভিভাবকদের আকাশচুম্বী প্রত্যাশা, সামাজিক মর্যাদার মোহ এবং নিজের সহজাত ভালোলাগার টানাপোড়েনে উচ্চশিক্ষার পাঠ্যবিষয় ও ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ার নির্বাচন কঠিন হয়ে পড়ে।
ক্যারিয়ার ও বিষয় নির্বাচনের পাঁচটি মৌলিক দিক তুলে ধরা হলো।
১. ইস্তিখারার নামাজ
সিদ্ধান্তহীনতার মুহূর্তে একজন মুমিনের প্রধান আত্মিক অবলম্বন হলো ‘সালাতুল ইস্তিখারা’ বা আল্লাহর কাছে কল্যাণ প্রার্থনার বিশেষ নামাজ। মহানবী (সা.) সাহাবিদের কোরআনের সুরা যেভাবে মুখস্থ করাতেন, ঠিক সেভাবেই জীবনের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ইস্তিখারা করার শিক্ষা দিতেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১১৬২)
ইস্তিখারার ফলাফল প্রকাশ পায় অন্তরের গভীর প্রশান্তি, আত্মবিশ্বাস এবং বাস্তব পরিস্থিতির অনুকূল প্রবাহের মাধ্যমে।
ইবনে হাজার আসকালানি উল্লেখ করেছেন, ইস্তিখারার সারকথা হলো নিজের ব্যক্তিগত ইচ্ছা ও অহমিকা পরিহার করে মহান আল্লাহর ইচ্ছার ওপর সমর্পিত হওয়া এবং সালাতের পর অন্তর যে বিষয়ের প্রতি স্বতঃস্ফূর্তভাবে সায় দেয়, সে পথেই অগ্রসর হওয়া। (আল-আসকালানি, ফাতহুল বারি বি-শারহি সহিহিল বুখারি, ১১/১৮৮, দারুল মা‘রিফাহ, বৈরুত, ১৩৭৯ হি.)
এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে তাকদিরের বিশ্বাস। রাসুল (সা.) নির্দেশ দিয়েছেন, মাতৃগর্ভেই মানুষের জীবিকা, আয়ু ও ভবিষ্যৎ চূড়ান্তভাবে লিপিবদ্ধ হয়ে যায়। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৬৪৫)
২. সহজাত স্বভাবের মূল্যায়ন
ইসলাম প্রতিটি মানুষের মনস্তাত্ত্বিক বৈচিত্র্য ও সহজাত স্বভাবকে (ফিতরাত) গভীরভাবে স্বীকৃতি দেয়। পেশা নির্বাচনের ক্ষেত্রে নিজের মানসিক গঠন অন্তর্মুখী (ইন্ট্রোভার্ড) নাকি বহির্মুখী (এক্সট্রোভার্ট)—তা স্পষ্ট হওয়া জরুরি। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘বলুন, প্রত্যেকেই নিজ নিজ স্বভাব-প্রকৃতি অনুসারে কাজ করে।’ (সুরা ইসরা, আয়াত: ৮৪)
মানুষের এই সহজাত প্রবণতার পথকে ইসলাম রুদ্ধ করে না; বরং তা বিকশিত হতে সহায়তা করে। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা কাজ করে যাও; কেননা যার জন্য যা সৃষ্টি করা হয়েছে, তার জন্য সেই পথটি সহজসাধ্য করা হয়েছে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৪৯৪৯)
নবীজি (সা.) সাহাবিদের দায়িত্ব দেওয়ার সময়ও তাঁদের ব্যক্তিগত স্বভাবের বিষয়টি বিবেচনা করতেন। সাহাবি আবু জর গিফারি (রা.) অত্যন্ত আল্লাহভীরু ও সত্যনিষ্ঠ হওয়া সত্ত্বেও তাঁকে প্রশাসনিক নেতৃত্ব দিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে রাসুল (সা.) বলেছিলেন, ‘হে আবু জর, আমি তোমাকে এই দায়িত্বের ক্ষেত্রে দুর্বল দেখছি; অতএব তুমি দুজনেরও নেতা হয়ো না।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৮২৬)
দূরদর্শী সামরিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের জন্য তিনি খালিদ ইবনে ওয়ালিদ কিংবা আমর ইবনুল আস (রা.)-কে বেছে নিয়েছিলেন।
ইমাম রাগিব আল-ইসফাহানি তাঁর গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, মহান আল্লাহ মানুষের মেধা, প্রবৃত্তি ও যোগ্যতায় যে বৈচিত্র্য সৃষ্টি করেছেন, তার উদ্দেশ্যই হলো মানুষ যেন নিজের স্বভাবোপযোগী পেশা ও দায়িত্ব বেছে নেয়; এতে সমাজব্যবস্থা পরস্পরের ওপর নির্ভর করে ভারসাম্যপূর্ণভাবে টিকে থাকে। (আল-ইসফাহানি, আদ-দারিয়াহ ইলা মাকারিমিশ শারিয়াহ, পৃষ্ঠা: ৩৭৬-৩৭৭, দারুস সালাম, কায়রো, ২০০৭)
ইসলামে জ্ঞানের বিশেষায়নকে উৎসাহিত করা হয়েছে। যার গণিতের ভিত্তি দুর্বল, তার জন্য ফিন্যান্সের জটিল শাখা নির্বাচন করা ঝুঁকিপূর্ণ; আবার যার জৈববিজ্ঞানে অনীহা, তার চিকিৎসাশাস্ত্রের দিকে যাওয়া অবাস্তব।
৩. সামর্থ্যের নির্মোহ উপলব্ধি
নিজের সক্ষমতা ও সীমাবদ্ধতার সৎ মূল্যায়ন ইসলামের একটি মূলনীতি। ইসলাম কারও ওপর সাধ্যাতীত বোঝা চাপিয়ে দেওয়া সমর্থন করে না, ‘আল্লাহ কারও ওপর এমন কোনো দায়িত্ব চাপিয়ে দেন না, যা তার সাধ্যাতীত।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ২৮৬)
রাসুল (সা.) সাহাবিদের সমষ্টিগত মেধার চেয়ে তাঁদের ব্যক্তিক পারদর্শিতাকে বিশেষভাবে মূল্যায়ন করতেন। তিনি বলেছেন, ‘আমার উম্মতের মধ্যে উত্তরাধিকার আইনে সর্বাধিক পারদর্শী জায়েদ ইবনে সাবেত, হালাল ও হারামের বিধানে সর্বাধিক প্রজ্ঞাবান মুআজ ইবনে জাবাল এবং কোরআন পাঠে সর্বাধিক পারদর্শী উবাই ইবনে কাব...।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৩৭৯০)
নবীজির এই ঘোষণা প্রমাণ করে, ইসলামে জ্ঞানের বিশেষায়নকে উৎসাহিত করা হয়েছে। যার গণিতের ভিত্তি দুর্বল, তার জন্য ফিন্যান্সের জটিল শাখা নির্বাচন করা ঝুঁকিপূর্ণ; আবার যার জৈববিজ্ঞানে অনীহা, তার চিকিৎসাশাস্ত্রের দিকে যাওয়া অবাস্তব।
ইমাম ইবনুল কাইয়িম সন্তানের মেধা ও কর্মক্ষেত্র নির্বাচন বিষয়ে লিখেছেন, অভিভাবকদের উচিত সন্তানের সুপ্ত আগ্রহ ও মেধার গতিপ্রকৃতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা। যদি দেখা যায় কোনো বৈধ বিদ্যায় তার সহজাত দক্ষতা রয়েছে, তবে তাকে সেই পথেই এগোতে দিতে হবে। অভিভাবকের জোরজবরদস্তির কারণে যদি তাকে এমন কোনো বিষয়ে বাধ্য করা হয় যার প্রতি তার মন সায় দেয় না, তবে সে সেই বিদ্যায় চরম ব্যর্থ হবে এবং তার ভেতরের স্বাভাবিক সম্ভাবনাও অপচয় হয়ে যাবে। (ইবনুল কাইয়িম, তুহফাতুল মাওদুদ বি-আহকামিল মাওলুদ, পৃষ্ঠা: ১৪৭, মাকতাবাতু দারুল বায়ান, দামেস্ক, ১৯৭১)
৪. অভিজ্ঞদের সঙ্গে পরামর্শ
গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে ইসলাম পারস্পরিক পরামর্শকে বিশেষ মর্যাদা দিয়েছে। কোরআনে সফল মুমিনদের গুণাবলি বর্ণনা করে বলা হয়েছে, ‘এবং তাদের যাবতীয় কাজকর্ম পারস্পরিক পরামর্শের ভিত্তিতে সম্পন্ন হয়।’ (সুরা শুরা, আয়াত: ৩৮)
যা তোমার জন্য কল্যাণকর, তা অর্জনে সচেষ্ট হও এবং আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা করো, কখনো হিম্মত হারিয়ো না।
রাসুল (সা.) বলেন, ‘পরামর্শদাতা হলো আমানতদার।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৮২২)
ইমাম আল-মাওয়ার্দি লিখেছেন, পরামর্শ মানুষের আত্মঅহমিকা দূর করে এবং নিজের সীমাবদ্ধ বুদ্ধির সঙ্গে অন্যের অভিজ্ঞতা ও প্রজ্ঞাকে যুক্ত করে সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে সাহায্য করে। (আল-মাওয়ার্দি, আদাবুদ্দুনয়া ওয়াদ্দিন, পৃষ্ঠা: ৩১৫, দারু মাকতাবাতিল হায়া, বৈরুত, ১৯৮৮)
৫. সিদ্ধান্তের নমনীয়তা
অনেক শিক্ষার্থী মনে করেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো একটি বিষয়ে একবার ভর্তি হয়ে যাওয়াই জীবনের অপরিবর্তনীয় ভাগ্যলিপি। এই ভয় তাঁদের মধ্যে তীব্র মানসিক অবসাদের জন্ম দেয়। অথচ বাস্তব জীবন কোনো একমাত্রিক সরলরেখা নয়। ইসলাম মানুষকে ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার নমনীয়তা শেখায়।
রাসুল (সা.) নির্দেশ দিয়েছেন, ‘যা তোমার জন্য কল্যাণকর, তা অর্জনে সচেষ্ট হও এবং আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা করো, কখনো হিম্মত হারিয়ো না।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৬৬৪)
যদি দেখা যায় নির্বাচিত বিষয়টি নিজের মেধার সঙ্গে একেবারেই খাপ খাচ্ছে না, তবে মাঝপথে বিষয় (মেজর) পরিবর্তন করার সিদ্ধান্ত কোনো ব্যর্থতা নয়; বরং এটি অধিকতর মানানসই একটি ভবিষ্যতের
বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ।পবিত্র কোরআনের অভয়বাণী, ‘নিশ্চয়ই কষ্টের সঙ্গেই রয়েছে স্বস্তি।’ (সুরা ইনশিরাহ, আয়াত: ৬)
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন